📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 আভিধানিক ও ব্যবহারবিধি অনুযায়ী ইস্তেওয়া এর অর্থ

📄 আভিধানিক ও ব্যবহারবিধি অনুযায়ী ইস্তেওয়া এর অর্থ


ইস্তেওয়া শব্দটি কুরআন ও সুন্নাহ'র যেখানে যেখানে এসেছে সেখানে দু'টি নিয়ম থেকে মুক্ত নয়:
এক. উন্মুক্তভাবে আসা, অর্থাৎ ইস্তেওয়ার সাথে অর্থে পরিবর্তন আনয়নকারী কোনো অব্যয় যোগ করা হয়নি। তখন তার অর্থ হবে, পূর্ণতা প্রাপ্ত হওয়া। যেমন আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারীমে বলেছেন, ﴿وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَاسْتَوَى﴾ [القصص: ١٤] "আর যখন তিনি তার শক্তিসামর্থ্যে পৌঁছলেন এবং পূর্ণতা প্রাপ্ত হলেন.” [সূরা আলা-কাসাস, আয়াত: ১৪]
দুই. উন্মুক্তভাবে না আসা, অর্থাৎ ইস্তেওয়ার সাথে অর্থে পরিবর্তন আনয়নকারী কোনো অব্যয় যুক্ত হয়ে আসা। তখন তার তিন অবস্থা হতে পারে:
প্রথম অবস্থা: إلى যুক্ত হয়ে আসা। তখন 'ইস্তেওয়া' এর দু'টি অর্থ করা হয়ে থাকে: এক. ইচ্ছা করা এবং এগিয়ে যাওয়া। এ অর্থটি ইবন কাসীর তার তাফসীরে বর্ণনা করেছেন। [১/২১৩]
দুই. উপরে উঠা, যা রবী ইবন আনাস থেকে বর্ণিত হয়েছে, আর ইমাম ইবন জারীর পছন্দ করেছেন। [১/৪৬৫-৪৫৭] অনুরূপ ইবন আবী হাতেম [১/৭৫] আর এ অর্থটি ইবনুল কাইয়্যেম তার মুখতাসারুস সাওয়ায়িকে করেছেন এবং তিনি এটার ওপর ভাষাবিদদের ইজমা' বর্ণনা করেছেন। [২/১২৬-১২৭]
কুরআনে কারীমে এ রকম দু'টি আয়াত এসেছে,
১- আল্লাহ তা'আলা বলেন, ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ) [البقرة: ٢٩] "তারপর তিনি আকাশের উপর উঠলেন.” [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ২৯]
২- অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন, ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ وَهِيَ دُخَانٌ [فصلت: ۱۱] "তারপর তিনি আকাশের উপর উঠলেন আর এটা ছিল ধোঁয়া।” [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ১১] বস্তুত তখন উপরে উঠা এবং ইচ্ছা করা দু'টি অর্থই হয়। যদিও বেশিরভাগ মুফাসসির প্রথম অর্থটি করেছেন এবং সেটাকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
দ্বিতীয় অবস্থা: واو দিয়ে সেটা কোনো কিছুর সাথে থাকার কর্মবাচ্য مفعول معه হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া। তখন 'ইস্তেওয়ার অর্থ হয়, কোনো কিছু সমান সমান হওয়া। যেমন আরবী ভাষায় বলা হয় استوى الماء والخشبـة অর্থাৎ "পানি ও কাঠ সমপর্যায়ে আছে".
তৃতীয় অবস্থা: ۱۰ দিয়ে ব্যবহৃত হওয়া। তখন তার অর্থ হয়:
১- উপরে উঠা। আরবীতে তা তিনটি শব্দের মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে।
এক. ارتفع উপরে উঠা। আর বিশর ইবন 'উমার ইবনুল হিকাম আয-যাহরানী আল-আযদী বলেন, আমি একাধিক মুফাসসিরদের থেকে তা শুনেছি। তারা সেটাকে আবুল 'আলীয়া থেকে বর্ণনা করেছেন। তা ইমাম বুখারী তার সহীহতে মু'আল্লাক নিয়ে এসেছেন। কিতাবুত তাওহীদে [৯/২২১] অনুরূপভাবে তা ইমাম ইবন জারীর আত-ত্বাবারীও বর্ণনা করেছেন। [৮/১৩৮; সূরা ত্বা-হা এর আয়াতের তাফসীরে] তাছাড়া তা রবী' ইবন আনাস থেকেও বর্ণিত। (১০৩)
দুই. ১৬ উপরে উঠা। আর তা মুজাহিদ ইবন জাবর রাহিমাহুল্লাহ থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম বুখারী তার সহীহতে তা মু'আল্লাক হিসেবে নিয়ে এসেছেন। কিতাবুত তাওহীদ [৯/২২১] যা ফিরইয়াবী তার কিতাবে সনদসহ বর্ণনা করেছেন। (১০৪) অনুরূপভাবে তা ভাষাবিদ আবুল 'আব্বাস সা'লাব বলেছেন। (১০৫) অনুরূপভাবে তা ইমাম ইবন জারীর আত-ত্বাবারীও বর্ণনা করেছেন। (১০৬)
তিন. صعد উপরে উঠা। ইমাম বাগাওয়ী তা আবু উবাইদাহ মা'মার ইবনুল মুসান্না থেকে বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম বাইহাকী সনদসহ তা ইবন 'আব্বাস থেকে আবু সালেহ ও কালবীর মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন, সূরা আল-বাক্বারাহ এর আয়াতের তাফসীরে। (১০৭)
'ইস্তেওয়া' শব্দের অর্থে এ তিনটি প্রতিশব্দ ব্যবহারের ব্যাপারে সকল সালাফে সালেহীনের ঐকমত্য আমরা লক্ষ্য করি। আর তা বিভিন্ন ভাষাবিদরাও উল্লেখ করে থাকেন।
ইস্তেওয়া এর সাথে যুক্ত হওয়ার সাথে আরও কিছু অর্থ ও তার সমাধান:
এছাড়াও 'ইস্তেওয়া' শব্দের সাথে যখন على যুক্ত হয়, তখন 'ইস্তেওয়া' এর আরও দু'টি প্রতিশব্দের ব্যবহার দেখতে পাই, যা সরাসরি অর্থের চেয়েও একটু বেশি সাব্যস্ত করে। সে দু'টি শব্দ হচ্ছে,
২- استقر উপরে উঠা ও সেখানে থাকা বা অবস্থান করা। ইমাম বাগাওয়ী কালবী ও মুকাতিল থেকে বর্ণনা করেছেন। (১০৮) বস্তুত এ অর্থটি আগের তিনটি প্রতিশব্দের চেয়ে বেশি ব্যাপক অর্থ প্রদান করে। কারণ আগের তিনটি প্রতিশব্দ শুধু এটাই বুঝাতো যে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর উঠেছেন। কিন্তু استقر বলা হলে তার অর্থ হয়, 'আরশের উপর উঠা এবং সেখানে থাকা। (১০৯)
তবে মৌলিকভাবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আত এ অর্থটিও সাব্যস্ত করে থাকেন। কারণ এ অর্থের সমর্থনে বহু হাদীস বিদ্যমান।
পরবর্তী কোনো কোনো আলেম এ অর্থটি অস্বীকার করেছেন। [শাইখ আবু আবদুর রহমান মুহাম্মাদ নাসেরুদ্দীন আল-আলবানী তার মুখতাসারুল 'উলু গ্রন্থে, শাইখ বকর আবু যাইদ, মু'জামুল মানাহিল লাফযিয়‍্যাহ গ্রন্থে] তাদের অস্বীকারের মূল কারণ দু'টি:
এক. এ শব্দে সরাসরি কোনো আয়াত বা হাদীস না আসা।
দুই. আরবী ভাষাবিদদের নিকট এ শব্দের আরেকটি অর্থ আরামের সাথে স্থির হওয়া। (১১০)
আর আল্লাহর জন্য এমন একটি জিনিস সাব্যস্ত করতে হলে সরাসরি দলীল লাগবে। সেটা তাদের কাছে প্রমাণিত হয়নি বলেই তারা সেটা স্বীকার করার ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করেছেন।
বস্তুত এ ব্যাপারে তাদের ওযর রয়েছে, তারা কখনো সেসব মু'আত্তিলা বা আল্লাহর গুণকে অর্থশূন্যকারীর দলের লোক নয়। তারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের লোক; তারা শুধু সে অর্থটি প্রমাণিত হওয়া কিংবা শব্দটির অপর যে অর্থটি প্রচলিত আছে সেটা সাব্যস্ত করা নিয়ে মতভেদ করেছেন। সুতরাং এ ব্যাপারে কোনো কোনো নব্য জাহমিয়্যার কথা বলার কিছু নেই। যুগ যুগ ধরেই আলেমগণ কোনো শব্দ ব্যবহারের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করেছেন। কিন্তু তারা মৌলিকভাবে আল্লাহর জন্য 'আরশের উপর উঠা এবং 'আরশের উপর আমাদের রবের থাকার বিষয়টি বিশ্বাস করে থাকেন।
কিন্তু যারা আরবী ভাষাবিদ তারা এ অর্থটিকে সাব্যস্ত করেছেন, ফলে দেখা যায় এ অর্থটি অনেক মুফাসসির ও অনেক ভাষাবিদ বর্ণনা করেছেন। যেমন,
• আবুল ফাতহ সুলাইম ইবন আইয়্যুব আর-রাযী (৪৪৭ হিজরী)। (১১১)
• অনুরূপভাবে ইমাম ইবন আবদুল বার (৪৬৩ হিজরী) তার তামহীদ গ্রন্থে বলেছেন, الاستواء الاستقرار في العلو، بهذا خاطبنا الله عزّ وجلّ "ইস্তেওয়া হচ্ছে উপরে অবস্থান করা, আর এটাই আমাদেরকে আল্লাহ জানিয়েছেন। (১১২)
• শাইখুল ইসলাম আল-আনসারী আল-হারওয়ী (৪৮১ হিজরী)।
• ইমাম বাগাওয়ী (৫১০ হিজরী) কালবী ও মুকাতিল থেকে বর্ণনা করেছেন। (১১৩)
• আবু আহমাদ আল-কারজী (৫৩২ হিজরী)। (১১৪) তিনি খলীফা আল-কাদের বিল্লাহ (৪২২ হিজরী) থেকে যে আকীদাহ বর্ণনা করেন, যা "আল-ই'তিক্বাদুল কাদেরী” নামে খ্যাত, তাতে এসেছে, كان ربنا عز وجل واحد لا شيء معه، ولا مكان يحويه، فخلق كل شيء بقدرته، وخلق العرش لا لحاجة إليه، فاستوى عليه استواء استقرار كيف شاء وأراد، لا استقرار راحة كما يستريح الخلق. “আমাদের মহান রব তিনি এক, তাঁর সাথে আর কেউ নেই, কোনো স্থান তাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না। তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন তার ক্ষমতা বলে, আর ‘আরশও তিনি সৃষ্টি করেছেন তবে সেটার প্রতি তাঁর কোনো প্রয়োজনের কারণে নয়, তারপর তিনি তার উপর উঠেছেন, সেখানে অবস্থানের জন্য উপরে উঠা, যেভাবে তিনি ইচ্ছা করেছেন ও চেয়েছেন, তবে আরাম করার জন্য অবস্থান করা নয় যেমনটি সৃষ্টিকুল আরাম করার জন্য অবস্থান করে থাকে.” (১১৫)
• অনুরূপভাবে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (৭২৮ হিজরী) রাহিমাহুল্লাহও তাঁর শারহু হাদীসুন নুযূল গ্রন্থে এ অর্থটি বর্ণনা করেছেন। (১১৬) তাছাড়া দারউ তা’আরাদুল আকলি ওয়ান নাকলি গ্রন্থে তিনি সুলতান মাহমূদ সবুক্তগীনের আকীদাহ বর্ণনা করতে গিয়েও তা বর্ণনা করেছেন। সেখানে এসেছে, فاستوى على استواء استقرار كيف شاء وأراد لا استقرار راحة كما يستريح الخلق “তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন, আর তাতে অবস্থান করেছেন যেভাবে তিনি ইচ্ছা করেছেন এবং চেয়েছেন; তবে কোনোভাবেই আরাম করার জন্য বলা যাবে না, যেমনটি মানুষ আরাম করে থাকে.” (১১৭)
• অনুরূপভাবে ইবনুল কাইয়্যেম (৭৫১ হিজরী) রাহيمাহুল্লাহও তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থে এটিকে কোনো প্রকার বিরোধিতা ছাড়াই বর্ণনা করেছেন। (১১৮)
فلهم عِبَارَات عَلَيْهَا أَربع *** قد حصلت للفارس الطعان . وَهِي اسْتَقر وقد علا وَكَذَلِكَ ارتفع الَّذِي مَا فِيهِ من نكران ..... وكذاك قد صعد الَّذِي هُوَ رَابِع وَأَبُو عُبَيْدَة صاحب الشَّيْبَانِي . يختار هَذَا القَوْل فِي تَفْسِيره *** أَدْرِي من الجهمي بِالْقُرْآنِ . “তাদের এ ব্যাপারে চারটি প্রতিশব্দ; যা এ ময়দানের সাওয়ারীর অর্জিত হয়েছে, আর তা হচ্ছে, (ইস্তাক্কাররা) উপরে অবস্থান করা, উপরে উঠা, অনুরূপ ঊর্ধ্বে উঠা, যাতে কোনো সমস্যা নেই। অনুরূপ “উপরে আরোহণ করা”, যা চতুর্থ অর্থ। আর ইমাম আবু আবদুল্লাহ আশ-শাইবানীর ছাত্র তার তাফসীরে এ অর্থগুলো পছন্দ করেছেন। তিনি অবশ্যই জাহমী থেকে কুরআন সম্পর্কে ভালো জানেন.” (১১৯)
এ বিষয়ে আমাদের শাইখ আবদুল্লাহ আল-গুনাইমান হাফিযাহুল্লাহও আলোচনা করে তা সাব্যস্ত করেছেন। (১২০)
৩- جلس وقعد বসা বা আসীন হওয়া। এ অর্থটি কোনো কোনো সালাফদের থেকে বর্ণিত হয়েছে। এর কারণ চারটি:
এক. 'মাকামে মাহমূদ' এর তাফসীরে এসেছে, আল্লাহ তা'আলা তার নবীকে 'আরশে তাঁর সাথে বসানো সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো। এ বর্ণনাগুলোর অধিকাংশই দুর্বল। তবে প্রখ্যাত তাবে'য়ী মুজাহিদ ইবন জাবর রাহিমাহুল্লাহ থেকে তা বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত হয়েছে।
দুই. হাবশায় এক নারী নির্যাতিত হওয়া সংক্রান্ত হাদীসে সে নারী বলেছিল, “যেদিন আল্লাহ তাঁর কুরসীতে বসবেন" যা ইমাম ইবন খুযাইমাহ বর্ণনা করেছেন। এ বর্ণনাটি শুদ্ধ হওয়া না হওয়া নিয়ে বিস্তর মতভেদ রয়েছে।
তিন. তাছাড়া কুরসী আল্লাহর পা রাখার স্থান সংক্রান্ত ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমার 'আছার' থেকেও তা বুঝা যায়। এটি সহীহ সনদ দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে। আর তা থেকে কেউ কেউ বসার বিষয়টি ধরে নিয়েছে। কিন্তু কথার দাবি দিয়ে ধরে নেয়ার এ নীতিতে সাধারণত সিফাত সাব্যস্ত করা হয় না। এ জন্য বর্তমান সালাফী আলেমগণের কেউই এ 'আসার' থেকে বসার বিষয়টি সাব্যস্ত করেন না।
চার, সালাফদের থেকে বেশি কিছু বর্ণনা এসেছে যার মাধ্যমে কেউ কেউ এ অর্থ সাব্যস্ত করেছেন বলে বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে শা'বীর বর্ণনায় ইবন 'আব্বাস থেকে (যা সনদের দিক থেকে কর্তিত), আবু ইসহাক আস-সাবি'ঈ, আস-সাওরী, আল-আ'মাশ, ইসরাইল, আবদুর রহমান ইবন মাহদী, আবু আহমাদ আয-যাবীরী, ওকী', আহমাদ ইবন হাম্বল প্রমুখ থেকে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ সনদই বিতর্কিত।
আর উপরোক্ত বর্ণনাগুলো সাব্যস্ত হয়েছে কি হয়নি এ ব্যাপারে মতভেদ নিয়েই এ অর্থটি সাব্যস্ত করা হবে কি হবে না তা নির্ভর করছে। যারা সেগুলোকে দুর্বল বলেছেন, তারা তা সাব্যস্ত করেননি। আর যারা সেগুলোকে শক্তিশালী বলেছেন তারা তা সাব্যস্ত করেছেন।
সুতরাং তারাও মূলত আল্লাহর সিফাত সাব্যস্তকারী। তাদের সাথে প্রথম অর্থসমূহ সাব্যস্তকারীদের মধ্যে বিশ্বাসগত ও নীতিগত কোনো পার্থক্য নেই। শুধুমাত্র অর্থটি দলীল প্রমাণ দ্বারা সাব্যস্ত হওয়া বা না হওয়া নিয়েই তাদের মতপার্থক্য। এ ব্যাপারে মতভেদ দেখিয়ে যেসব জাহমী ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার চেষ্টা করছে তাদের জানা উচিত, এরা সবাই অর্থাৎ যারা এ অর্থটি সাব্যস্ত করে আর যারা সাব্যস্ত করে না, সবাই একমত যে, যদি এ ব্যাপারে হাদীস শুদ্ধ হয় তবে তারাও সেটা বলবে। তাদের কাছে আল্লাহর 'বসা' তাঁর হাত, পা, আঙ্গুল, চেহারা, চোখ, 'আরশের উপর উঠা, প্রথম আসমানে অবতরণ, হাসা, আশ্চর্য হওয়ার চেয়ে তা কোনোভাবেই বেশি নয়। তারা সবাই দলীলের ভিত্তিতেই চলে, আর দলীলের ভিত্তিতেই থামে।
এ ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত কথা হচ্ছে, যা শাইখ আবদুর রহমান ইবন নাসের আস-সা'দী বলেছেন, نثبت أنه استوى على عرشه استواء يليق بجلاله، سواء فسر ذلك بالارتفاع، أو بعلوه على عرشه، أو بالاستقرار، أو الجلوس، فهذه التفاسير واردة عن السلف، فنثبت الله على وجه لا يماثله ولا يشابهه فيها أحد، ولا محذور في ذلك إذا قرنا بهذا الإثبات نفي مماثلة المخلوقات "আমরা আমাদের রবের 'আরশের উঠাকে সাব্যস্ত করি, তা যেভাবে তাঁর সম্মান ও মর্যাদার সাথে উপযোগী ও সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটাকে যেভাবেই তাফসীর করা হোক না কেন, চাই সেটাকে উপরে উঠা বলা হোক, অথবা তাঁর 'আরশে উপর উঠা বলা হোক, অথবা 'আরশের উপরে অবস্থানের কথাই বলা হোক অথবা বসা বলা হোক। এসব তাফসীর সালাফদের থেকে এসেছে। আমরা সেগুলোকে এমনভাবে সাব্যস্ত করবো যা অন্য কারও মতো বা কারও সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়া থেকে মুক্ত। আর এতে কোনো নিষিদ্ধ কিছু নেই, যদি এ সাব্যস্তকরণ সৃষ্টির কারও সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়া থেকে মুক্ত ঘোষণা করা যায়.” (১২১)

টিকাঃ
১০৩. ইবন আবী হাতেম (৬/১৯২৫)।
১০৪. ইবন হাজার, তাগলীকুত তা'লীক (৫/৩৪৫)।
১০৫. শারহু উসুলে ই'তিকাদে আহলুস সুন্নাহ (৩/৩৯৯); যাহাবী, আল-আরবা'ঈن ফী সিফাতে রাব্বিল 'আলামীন, পৃ. ৩৭।
১০৬. (৮/১৩৮); সূরা ত্বা-হা এর আয়াতের তাফসীরে।
১০৭. আল-বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত: ৮৭২।
১০৮. তাফসীরে বাগাওয়ী (৩/২৩৫)।
১০৯. মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন, শারহুর আকীদাতিল ওয়াসেত্বিয়্যাহ: (১/৩৩৩)।
১১০. ইবনুল কাইয়্যেম, আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ ৪/১২৮৮; যাহাবী, আল-'উলু (২/১৩০৩)।
১১১. আয-যাহাবী, আল-উলু, ১৮০।
১১২. আত-তামহীদ (৭/১৩১)।
১১৩. তাফসীরে বাগাওয়ী (৩/২৩৫)।
১১৪. আল-'উলূ ২৩৯।
১১৫. আল-ই'তিকাদুল কাদেরী, পৃ. ৩; আল-মুন্তাযাম (১৫/২৮০-২৮২); ইবন কাসীর, আর-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১২/২৬-৪৯); যাহাবী, তারীখুল ইসলাম (২৮/২৬৮-২৮৬)।
১১৬. শারহু হাদীসুন নুযুল, পৃ. ৩৯০।
১১৭. দারউ তা’আরাদুল আকলি ওয়ান নাকলি (৬/২৫৩-২৫৪; ইবনুল কাইয়্যেম, আস-সাওয়া’য়িকুল মুরসালাহ (৪/১২৮৮)।
১১৮. আন-নূনিয়া।
১১৯. নূনিয়াতু ইবনিল কাইয়্যেম, কবিতার ছত্র নং ১৩৫৩-১৩৫৬।
১২০. দেখুন, শারহু কিতাবুত তাওহীদ মিন সহীহিল বুখারী (১/৩৫৬)।
১২১. আল-আজওয়িবাতুস সা'দিয়্যah 'আলাল মাসায়িলিল কওয়াইতিয়্যah পৃ. ১৪৬।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 কুরআনের অন্যত্র ‘ইস্তেওয়া’ শব্দের অর্থ উপরে উঠা

📄 কুরআনের অন্যত্র ‘ইস্তেওয়া’ শব্দের অর্থ উপরে উঠা


এ হচ্ছে রাব্বুল আলামীনের 'ইস্তেওয়া'; আরবী ভাষাতে অন্যদের জন্যেও যখন এ শব্দটি عَلَى বা إِلَى যোগে ব্যবহৃত হয় তখনও তা উপরে উঠা অর্থে এসেছে। এমনকি কুরআনুল কারীমেও সেভাবে মানুষের গুণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, ﴿فَإِذَا اسْتَوَيْتَ أَنتَ وَمَن مَّعَكَ عَلَى الْفُلْكِ فَقُل﴾ [المؤمنون: ٢٨] "অতঃপর যখন আপনি ও আপনার সাথীরা জাহাজের উপর উঠবেন তখন বলুন...". [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ২৮]
﴿لِتَسْتَوُوا عَلَى ظُهُورِهِ، ثُمَّ تَذْكُرُوا نِعْمَةَ رَبِّكُمْ إِذَا اسْتَوَيْتُمْ عَلَيْهِ﴾ [الزخرف: ١٣] "যাতে করে তোমরা তার পিঠের উপর উঠতে পার, তারপর তোমাদের রবের নি'আমতকে স্মরণ করতে পার যখন তোমরা তার উপর উঠবে..". [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ১৩]
﴿مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ .... كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْأَهُ فَآزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَى عَلَى سُوقِهِ، يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ ﴾ [الفتح: ٢٩] "মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; আর তার সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর, তাদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল; .... তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন একটি চারাগাছ, যা থেকে নির্গত হয় কচিপাতা, তারপর তা শক্ত ও পুষ্ট হয় এবং পরে কাণ্ডের উপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে যা চাষীর জন্য আনন্দদায়ক.” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ২৯] অনুরূপ আয়াতে আল্লাহ বলেন, ﴿وَاسْتَوَتْ عَلَى الْجُودِيِّ﴾ [هود: ٤٤] "আর তা জুদী পাহাড়ের উপর উঠলো.” [সূরা হুদ, আয়াত: ৪৪]
সুতরাং বুঝা গেল যে, 'ইস্তেওয়া' শব্দটি যখন عَلَى বা إِلَى যোগে ব্যবহৃত হয়, তখন উপরে উঠার অর্থই সর্বজন স্বীকৃত।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 সত্তা অনুসারে গুণ হয়ে থাকে

📄 সত্তা অনুসারে গুণ হয়ে থাকে


আর এটাও জানা কথা যে, স্রষ্টা ও সৃষ্টির জন্য শব্দ এক রকম ব্যবহৃত হলেই তার ধরন এক রকম হওয়া জরুরী নয়। বরং আল্লাহর জন্য উপরে উঠার বিষয়টি তাঁর সম্মান ও মর্যাদার সাথে যেভাবে সামঞ্জস্যশীল সেভাবে হবে, আর সৃষ্টির জন্য উপরে উঠার বিষয়টি তার সাথে যেভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে সেভাবে সাব্যস্ত করা হবে।
তবে মানুষের জন্য ব্যবহৃত হলেই তা আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত হবে না বলে কেউ যেন না বলে। কারণ, আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারীমে এমন বহু গুণ নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন, যেগুলোকে আবার তিনি বান্দার গুণ হিসেবেও সাব্যস্ত করেছেন, যেমন,
তিনি আল্লাহ নিজেকে সামী' (শ্রোতা) ও বাসীর (দ্রষ্টা) বলেছেন, [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] অপর দিকে তিনি মানুষদেরকেও সামী' (শ্রোতা) ও বাসীর (দ্রষ্টা) বলেছেন। [সূরা আদ-দাহর, আয়াত: ০২]
তিনি আল্লাহ নিজেকে ক্বাদীর (সক্ষম) বলেছেন, [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ২০] অপর দিকে তিনি মানুষদেরকেও (সক্ষম) বলেছেন। [সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৩৪; ফাতহ, আয়াত: ২১]
তিনি নিজেকে 'হাই' (জীবিত) গুণে গুণান্বিত বলেছেন, [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ২২৫] অপরদিকে তিনি মানুষদেরকেও 'হাই' (জীবিত) গুণে গুণান্বিত করেছেন, [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩০]
তিনি নিজেকে 'ইরাদা' (ইচ্ছা) করার গুণে গুণান্বিত করেছেন, [সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৪২; বুরুজ, আয়াত: ১৬] অপরদিকে তিনি মানুষদেরকেও 'ইরাদা' (ইচ্ছা) করার গুণে গুণান্বিত করেছেন, [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১০৮; আন-নিসা, আয়াত: ৮৮; আন-নিসা, আয়াত: ১৪৪; আল-আনফাল, আয়াত: ৬৭; আল-কাহাফ, আয়াত: ২৮ আরও অনেক]
তিনি নিজেকে 'আলীম' (জ্ঞানী) গুণে গুণান্বিত করেছেন, [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ২৯] অপরদিকে সৃষ্টিকেও তিনি অনুরূপ গুণ দিয়েছেন। [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৫৩; আয-যারিয়াত, আয়াত: ২৮]
তিনি নিজেকে 'কালাম' (কথা বলা) গুণে গুণান্বিত করেছেন, [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৬৪] অনুরূপ তার সৃষ্টিকেও কালাম বা কথা বলার গুণে গুনান্বিত করেছেন। [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৩]
অনুরূপ আরও বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। আর সবার জানা বিষয় যে, আল্লাহর জন্য যেভাবে এসব গুণ সাব্যস্ত হবে মানুষের জন্য সেভাবে হবে না। আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত হবে তাঁর সম্মান ও মর্যাদা অনুযায়ী, আর মানুষের জন্য সাব্যস্ত হবে তাদের অবস্থা অনুযায়ী। প্রত্যেক সত্তা অনুযায়ী তার গুণ নির্ধারিত হয়ে থাকে। আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত হবে পূর্ণরূপে; আর মানুষের জন্য তা সাব্যস্ত হবে অপূর্ণরূপে। (১২২)

টিকাঃ
১২২. আশ-শানকীত্বী, মানহাজ ও দিরাসাত ফী আয়াতিল আসমা ওয়াস সিফাত, পৃ. ৫-৭।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 “ইস্তেওয়া ‘আলাল ‘আরশ’” এর ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আকীদার মৌলিক দিকসমূহ

📄 “ইস্তেওয়া ‘আলাল ‘আরশ’” এর ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আকীদার মৌলিক দিকসমূহ


আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। ( الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ) [طه: ٥] "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন.” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫]
সুতরাং কোনো মানুষের ঈমান ও তাওহীদ ততক্ষণ শুদ্ধ হবে না, যতক্ষণ আল্লাহ তা'আলার জন্য এ গুণটি সাব্যস্ত না করবে। যতক্ষণ বিশ্বাস না করবে যে, তিনি স্বয়ং সত্তাগতভাবে তাঁর গুণসমেত সম্মানিত 'আরশের উপর উঠেছেন। যে 'আরশ সকল আসমান ও যমীনের উপরে, সকল সৃষ্টির উপরে, বাস্তবিক অর্থেই, কোনোরূপ রূপক অর্থে নয়। তিনি তাঁর সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা। এতে কোনো ধরন নির্ধারণ করা যাবে না, শরীর বা দেহ সাব্যস্ত করে নয়, উদাহরণ দিয়ে নয়, অপব্যাখ্যা করে নয়, অর্থহীন করে নয় এবং বিকৃতি সাধন করে নয়।
আরও বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যে, আসমান তাঁকে বহন করে না, তাঁকে ছায়া দেয় না, তাঁকে পরিবেষ্টন করে না। 'আরশও তাঁকে বহন করে না, কুরসীরও তিনি সাহায্য নেন না, বরং তিনি তাঁর 'আরশের উপর, 'আরশকে তিনি পরিবেষ্টন করেন। তিনি 'আরশ ও তার চেয়ে নিম্ন যা কিছু আছে সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী। নূরের পর্দা তাঁকে তাঁর সৃষ্টি থেকে পর্দাবৃত করে দেয় না, বরং তাঁর চেহারার আলোতে জলসে যাওয়া থেকে পর্দাসমূহ সৃষ্টিকে পর্দাবৃত করে। তিনি সৃষ্টিকে শত পর্দার পিছন থেকেও দেখেন, তাদের গোপন শলা-পরামর্শ শোনেন, ভালো কিংবা মন্দ যাই তারা করুক না কেন, আর তিনি জানেন অন্তরের অন্তঃস্থলে যা কিছু গোপন করেছে, যা কোনো অন্তর আড়াল করে রেখেছে। তিনি 'আরশের উপর থেকেই তাদের জীবন-জীবিকা নিয়ন্ত্রণ করেন, বরং সকল কিছুই তিনিই পরিচালনা করেন।
(ইস্তেওয়া 'আলাল 'আরশ) এর ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ নিম্নোক্ত কয়েকটি পয়েন্টে আমরা তুলে ধরতে পারি:
১- আল্লাহ তা'আলা তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। এ 'উঠা' বাস্তব অর্থেই। এ ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নায় যা এসেছে তা সাব্যস্ত করেন। তারা কোনো প্রকার অর্থ বিকৃতি করে তা সাব্যস্ত করার নীতি গ্রহণ করেন না। আর অর্থ না করে কেবল শব্দের ওপর ঈমান আনা যা কারও কারও নিকট 'তাফওয়ীদ্ব' নামে পরিচিত তা তাদের নীতি নয়। বরং তা জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের মত।
২- আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠা এটি একটি 'ফি'লী সিফাত' কর্মগত গুণ যা আল্লাহর ইচ্ছা ও চাওয়ার সাথে সম্পৃক্ত। তখন যা ইচ্ছা তা করেন। তাঁর কর্মে বাধা প্রদানকারী কেউ নেই।
৩- আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠা, তাঁর সবকিছুর উপরে থাকা অতিরিক্ত আরেকটি গুণ। কারণ সবকিছুর উপরে থাকা তাঁর সত্তাগত গুণ যা মানব মনের স্বাভাবিক নীতি, বিবেকের যুক্তি, সকল জাতির ঐকমত্য দ্বারা সাব্যস্ত। কিন্তু 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি তিনি বা তাঁর রাসূল না জানালে আমাদের জানার কোনো সুযোগ নেই।
৪- 'আরশের উপর উঠা' এ কথাটি আমরা বুঝি; কিন্তু তিনি কীভাবে 'আরশের উপর উঠলেন সেটা আমাদের কারও জানা নেই। এ জন্য সুফইয়ান আস-সাওরী, আল-আওযা'ঈ, লাইস ইবন সা'দ, সুফইয়ান ইবন 'উয়াইনাহ, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকসহ বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ ইমামগণ বলতেন, "أمرّوها كما جاءت بلا كيف "এ ভাষ্যগুলোকে কোনো প্রকার ধরন নির্ধারণ ব্যতীত সাব্যস্ত করে যাও.”(১২৩) এখানে লক্ষণীয় যে তারা সবাই 'ধরন নির্ধারণ ব্যতীত' কথাটি বলেছেন। সুতরাং অর্থ সাব্যস্ত যদি না করা হয় তাহলে এ 'ধরন নির্ধারণ ব্যতীত' কথাটি মূল্য থাকে না।
৫- 'আরশের উপর উঠা'র ধরন সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদ'আত বা নতুন বিষয়; কারণ সাহাবায়ে কেরাম এ প্রশ্নটি তুলেননি; তারা জানতেন যে, এটি গায়েবী বিষয়; আর গায়েবী বিষয়ে যতটুকু আল্লাহ জানিয়েছেন ততটুকুতেই আমাদের সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। কোনো কোনো সাহাবী, তাবে'য়ী এবং তাবে তাবে'য়ীদের স্পষ্টভাবে ধরন সম্পর্কে প্রশ্ন করাকে বিদ'আত বলা হয়েছে।
৬- 'আরশের উপর উঠা'র ধরনের প্রকৃত বিষয়টি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে হবে। তবে এর অর্থ এটা নয় যে, 'আরশের উপর উঠার কোনো ধরন নেই, বরং ধরন আছে; কারণ যেকোনো কাজ ও বস্তুরই একটি ধরন আছে; কিন্তু আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার ধরণ আল্লাহও বলেননি, তাঁর রাসূলও বলেননি, তাঁর সাহাবীগণও নির্ধারণ করে কিছু বলেননি, আর আমরা আল্লাহকেও দেখিনি, তাঁর মতোও কাউকে দেখিনি, আমাদের বিবেকের যুক্তি দ্বারা নির্ধারণ করা অসম্ভব। সুতরাং ধরন নির্ধারণ করার কোনো সুযোগ নেই। তবে অর্থ অবশ্যই জানা আছে। কারণ, সালাফগণ এর অর্থ করেছেন, স্পষ্ট করে বর্ণনা দিয়েছেন, যারা অর্থ করে না সেসব জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লড়েছেন, বই লিখেছেন। আর এ 'ইস্তেওয়া' শব্দটি একেবারে স্পষ্ট ও প্রকাশিত আরবী শব্দ, যার অর্থ আরবী ভাষার অভিধানে পাওয়া যায়। সুতরাং অর্থ করতে হবে, অর্থ না করলে জাহমিয়্যাহ ফেরকার লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
৭- আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি কখনও মুতাশাবিহ বা অস্পষ্ট আয়াতসমূহের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা আল্লাহর সিফাতের আয়াতগুলোর কোনোটিই মুতাশাবিহ বা অস্পষ্ট আয়াতসমূহের অন্তর্ভুক্ত নয়। সালাফে সালেহীন এগুলোর অর্থ করেছেন যা আমরা ইতোপূর্বে দেখিয়েছি।
৮- আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি কখনও সৃষ্টিকুলের কারও উঠার মতো নয়। কারণ, যেভাবে তার সত্তার অস্তিত্ব আমরা স্বীকার করি ধরণ না জেনেও, তেমনিভাবে তার গুণের ধরন না জেনেও আমরা তা মানতে বাধ্য।
৯- সবচেয়ে বড় সৃষ্টি। 'আরশ আল্লাহর বহনকারী নয়। আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং 'আরশ ও তার বাহকসহ সকল সৃষ্টির রক্ষাকারী।
১০- আল্লাহ তা'আলার 'আরশ সবকিছুর উপর। মহান আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপরে অর্থাৎ সবকিছুর উপরে। তাঁর কাছে আমলনামা উত্থিত হয়, ফিরিশতারা উঠেন, রূহ উপরে নীত হয়, হাত তার দিকেই তোলা হয়। সুতরাং মহান আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত হবে, সত্তাগতভাবে উপরে থাকা, ক্ষমতা ও মর্যাদাগত উপরে থাকা, গুণগতভাবে উপরে থাকা।
১০- 'আরশ' শব্দের ভাষাগত দু'টি অর্থ রয়েছে, এক. কোনো কিছুর উপরস্থিত জিনিস। সকল সৃষ্টির উপরে 'আরশ। দুই. বিছানা, যার উপর অবস্থান করা হয়। এ অর্থেও আল্লাহর তা'আলার 'আরশ প্রযোজ্য।
১১- 'আরশের উপরে থাকার পরও তিনি সৃষ্টির সবকিছু সম্পর্কে জানেন, দেখেন, শুনেন, সাহায্য- সহযোগিতা করেন, তাদের কর্মকাণ্ড তিনিই পরিচালনা করেন, এটাই তাঁর সাথে থাকার অর্থ। এটিই সালাফে সালেহীন ইমামগণ অর্থ করেছেন ও ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। এটা কোনো অপব্যাখ্যা নয় বা বিকৃতি নয়। এ ব্যাপারে জাহমিয়্যাহ, সর্বেশ্বরবাদী, অহংবাদী, সোহংবাদী ও হুলুলী সম্প্রদায় ব্যতীত অপর যাবতীয় ফেরকার লোকেরা আহলুস সুন্নাতের আকীদাহ'র বিরোধিতা করেনি।
১২- 'আরশের উপর থেকেও আল্লাহ তা'আলা বান্দার নিকটবর্তী হন, যেভাবে সেটা তার জন্য প্রযোজ্য। কুরআন ও হাদীসে যেখানে যেখানে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে, তা প্রকৃত অর্থেই নিকটবর্তী হওয়া। তবে তার ধরন আমাদের অজানা।
১৩- 'আরশের উপর থেকেও তিনি নিকটবর্তী আসমানে নাযিল হন, সেটার ওপর ঈমান আনতে হবে। তাঁর নাযিল বা অবতীর্ণ হওয়া প্রকৃত অর্থেই, সেটার ধরন আমাদের অজানা। এটা তার উপরে থাকাকে নিষেধ করে না। কারণ এটা আল্লাহর ব্যাপার, তাঁর সত্তার অস্তিত্ব যেভাবে ধরন না দেখে মানতে পারি, তেমনি তাঁর গুণাবলিও সেভাবে ধরন না দেখে মানতে হবে।
১৪- আসমান তাঁকে বহন করে না, তাঁকে ছায়াও দেয় না, আর আসমান তাঁকে ঘিরেও রাখতে পারে না। কোনো স্থান তাঁকে ঘিরে রাখে না বরং তিনি সবকিছুকে তাঁর জ্ঞান, ক্ষমতা ও পরিচালনা দ্বারা পরিবেষ্টন করে আছেন। সত্তাগতভাবে ঘিরে থাকা নয়, অনুরূপ সৃষ্টিও স্রষ্টার অভ্যন্তরে নয়।
১৫-'আরশ তাঁকে বহন করে না, কুরসীরও সাহায্য তাঁর লাগে না। বরং তিনিই 'আরশ, কুরসী ও সেগুলার বাহকদেরকে তাঁর কুদরতে বহন করে আছেন। তিনিই আসমানকে তাঁর বড়ত্ব দিয়ে উপরে তুলে রেখেছেন, তাকে যমীনের উপর পড়ে যাওয়া থেকে নিয়ন্ত্রণ করে আছেন। ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেন, "যে কুরসীর অভ্যন্তরে আসমান ও যমীনের জায়গা হয় তা তাঁর দু' কদম রাখার স্থান, আর 'আরশের পরিমাণ যিনি সেটা সৃষ্টি করেছেন তিনি ব্যতীত আর কেউ জানে না। আর আসমানসমূহ আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টির উপর যেন একটি মরুভূমির উপর একটি গম্বুজ.”(১২৪)
১৬-আল্লাহ তা'আলা 'আরশের মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কারণ, তিনি 'আস-সামাদ'। বরং সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী। সবাই ফকীর, তিনিই হচ্ছেন দাতা।
১৭- 'আরশ ও কুরসী ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। 'আরশের সামনে কুরসী একটি স্থান, যাতে আসমান- যমীন সহ সকল সৃষ্টির জায়গা হয়। তবুও 'আরশের সামনে কুরসীর কোনো তুলনা হয় না। কুরসী 'আরশের সামনে ফেলে রাখা একটি ছোট ভূমি ব্যতীত আর কিছু নয়। আর আল্লাহর 'আরশের পরিমাণ আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না। মহান আল্লাহ সেখানে থেকেও তাঁর সৃষ্টির সকল অবস্থা জানেন, দেখেন। তাদের ডাক শুনেন ও তাদের প্রয়োজন পূরণ করেন।
১৮-কুরসী হচ্ছে 'আরশের সামনে থাকা মহান আল্লাহর পা রাখার স্থান, যা ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে। আর এটাই বিশুদ্ধ আকীদাহ যা একজন ঈমানদার পোষণ করবে, কখনও তা শুধু জ্ঞান নয়, বা শুধু রাজত্ব নয় যেমনটি ভ্রষ্ট লোকেরা বলে থাকে।
১৯-আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর কথাটি বুঝানোর জন্য বলতে হবে, তিনি তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা। অর্থাৎ তিনি কখনও তাঁর সৃষ্টির কারও সাথে মিশে যাননি, কারও ভিতরে ঢুকে পড়েননি, কারও সাথে লেগে থাকেননি। সুতরাং তাঁকে সত্তাগতভাবে সব স্থানে আছে বলা কুফুরী।
২০-যে কেউ আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি অস্বীকার করবে, তাঁকে তাঁর সৃষ্ট আসমান ও যমীনের উপরে অবস্থিত 'আরশের উপর উঠা ও সেখানে থাকার বিষয়টি মানবে না, তাকে সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা সত্তায় সৃষ্টিকুলের বাইরে মানবে না, সে কাফির হয়ে যাবে, আল্লাহ তা'আলার লা'নতের হক্কদার হবে। কারণ, সে কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যকে অস্বীকার করছে।
২১-আল্লাহ তা'আলার 'আরশের সামনে সৃষ্টিজগত থেকে নূরের পর্দাসমূহ রয়েছে, যার কারণে সৃষ্টি পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنَّ اللَّهَ لَا يَنَامُ وَلَا يَنْبَغِي لَهُ أَنْ يَنَامَ، يَرْفَعُ الْقِسْطَ وَيَخْفِضُهُ، وَيُرْفَعُ إِلَيْهِ عَمَلُ النَّهَارِ بِاللَّيْلِ، وَعَمَلُ اللَّيْلِ بِالنَّهَارِ» “নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা ঘুমান না, তাঁর জন্য ঘুম উপযোগীও নয়, পাল্লা উপরে উঠান এবং নিচে নামান (বান্দার আমল অনুযায়ী), তাঁর কাছে দিনের আমল রাতে উপস্থাপন করা হয়, আর রাতের আমল দিনে তুলে ধরা হয়। তাঁর পর্দা হচ্ছে নূরের। যদি তিনি সে পর্দা উন্মুক্ত করতেন তবে তাঁর চেহারার আলোর ঝলকানি তাঁর সৃষ্টির যতটুকুতে তাঁর চোখ পড়ত সবটুকুই পুড়ে যেত.” (১২৫)
ইবন আবী শাইবাহ বলেন, 'তাঁর সেসব পর্দা, যা দিয়ে তিনি বান্দাদের থেকে নিজেকে আলাদা রেখেছেন, তা কখনও তাঁর বান্দাদের সবচেয়ে নিম্ন যমীনে যা আছে তা দেখতে ও শুনতে তার কোনো বাধা হয় না. (১২৬)
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তবে তাঁর পর্দাসমূহ সৃষ্টিকুলের নিকট তাঁর আলো আসতে বাধা দেয়। কারণ হাদীসে এসেছে, "তাঁর পর্দা হচ্ছে নূরের। যদি তিনি সে পর্দা উন্মুক্ত করতেন তবে তাঁর চেহারার আলোর ঝলকানি তাঁর সৃষ্টির যতটুকুতে তাঁর চোখ পড়ত সবটুকুই পুড়ে যেত”. এর অর্থ হচ্ছে, তাঁর চোখ সকল সৃষ্টিকে দেখে, কিন্তু তাঁর চেহারার আলো সেটা পর্দা দ্বারা আবৃত। (১২৭)
ইমাম দারেমী বলেন, কে এ পর্দার পরিমাণ নির্ণয় করতে পারবে যা দিয়ে মহা প্রতাপশালী রব পর্দার অন্তরালে রয়েছেন? কে বলতে পারবে সেটা কেমন? তবে তিনি সবকিছুকে তাঁর ইলম বা জ্ঞানে পরিবেষ্টন করে আছেন। "সবকিছুর সংখ্যা তিনি গুনে রেখেছেন" [সূরা আল-জিন্ন, আয়াত: ২৮] এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, তিনি সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা, তাদের থেকে পর্দার আড়ালে। জিবরীল 'আলাইহিস সালাম আল্লাহর নৈকট্যবান ফিরিশতা হওয়া সত্ত্বেও সে পর্দার নিকটে যাওয়ার অধিকার রাখেন না. (১২৮)
ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেন, "সবকিছু সম্পর্কে চিন্তা কর, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে চিন্তা করো না; কারণ সপ্তম আসমান ও তাঁর কুরসীর মাঝখানে হাজার নূর। আর তিনি তার উপরে.” (১২৯)
চিন্তা না করার কারণ হচ্ছে আল্লাহ সম্পর্কে চিন্তা করে কোনো কূল কিনারা করতে কেউ পারবে না। কারণ চিন্তাজগত কেবল সৃষ্টির মাঝেই কার্যকর হয়, স্রষ্টার মাঝে নয়.

টিকাঃ
১২৩. মারাসীলে আবী দাউদ, পৃ. ১৮২; আস-সিফাত লিদ দারাকুতনী, ৭১; আল-উলু পৃ. ১৫৬, সিয়ার (৮/৪৬৭); আকীদাতুস সালাফ পৃ. ৬৮; বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/১৫৮, ৩০৭)।
১২৪. সহীহ, আবদুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ, ৫৮৬; ইবন খুযাইমাহ, আত-তাওহীদ (১/২৪৮); হাকিম, মুস্তাদরাক (২/২৮২), এর সনদকে আলবানী রাহিমাহুল্লাহ মুখতাসারুল উলু গ্রন্থে সহীহ বলেছেন।
১২৫. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭৯।
১২৬. আল-'আরশ, পৃ. ২৮৯।
১২৭. মাজমূ'উল ফাতাওয়া (৬/১০)।
১২৮. দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যা ৩১; আল-রাদ্দু আলা বিশر আল-মারিসী ৫২৬।
১২৯. এর সনদ উত্তম। আসবাহানী, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব (২/১৭৩); আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ, বাইহাকী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত: ৫৩০; সুয়ূত্বী, আল-জামে'উস সাগীর (১/১৩২); মানাওয়ী, ফাইদুল কাদীর (৩/২৯৩); সাখাওয়ী, আল-মাকাসিদুল হাসানাহ, ১৫৯; ইবন আবী শাইবাহ, আল-আরশ, ৩৪৩। ইমাম ইবন হাজার, ফাতহুল বারী, (১৩/৩৮২) বলেন, এর সনদ উত্তম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00