📄 “ইস্তেওয়া আলাল ‘আরশ’” এর ওপর কুরআন থেকে দলীল
কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা 'ইস্তেওয়া আলাল 'আরশ' এর ঘোষণা প্রদান করেছেন। সেগুলো হচ্ছে,
১- সূরা আল-আ'রাফে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ ﴾ [الأعراف: ٥٤] "নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন." [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪]
২- সূরা ইউনুসে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ [يونس : ٣] "তোমাদের রব তো আল্লাহ্, যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন। তিনি সবকিছু পরিচালনা করেন.” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ০৩]
৩- সূরা আর-রা'দ এ আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّمَوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ [الرعد: ٢] "আল্লাহ্, যিনি আসমানসমূহ উপরে স্থাপন করেছেন খুঁটি ছাড়া, তোমরা তা দেখছ। তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন”. [সূরা আর-রা'দ, আয়াত: ০২]
৪- সূরা ত্বা-হা তে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ﴾ [طه: ٥] "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন”. [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫]
৫- সূরা আল-ফুরকানে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَنُ فَسْئَلْ بِهِ، خَبِيرًا ﴾ [الفرقان: ٥٩] "তিনি আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু'য়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেন; তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন। তিনিই 'রহমান', সুতরাং তাঁর সম্বন্ধে যে অবহিত তাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।” [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৫৯]
৬- সূরা আস-সাজদাহয় আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ﴾ [السجدة:٤] "আল্লাহ্, যিনি আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু'য়ের অন্তর্বর্তী সবকিছু সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে। তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন.” [সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ০৪]
৭- সূরা আল-হাদীদে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ [الحديد: ٤] "তিনি ছয় দিনে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন.” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ০৪]
উপরে আসা আয়াতসমূহের ভাষ্যে 'ইস্তেওয়া আলাল 'আরশ' কথাটির অর্থ আমরা করেছি, "আরশের উপর উঠলেন". এর কারণ কী? কারণ এর মাধ্যমে আমরা আল্লাহর একটি 'সিফাতে ফিলিয়্যাহ' বা কর্মগত গুণ সাব্যস্ত করার বিষয়টি প্রমাণ করতে চাচ্ছি।
সরাসরি কুরআনুল কারীমের সাতটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলা নিজ পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে তাঁর এ গুণটির কথা বলেছেন। এত স্পষ্টভাবে বার বার আসা এ গুণটিকে যারা অস্বীকার করে, কিংবা অপব্যাখ্যা করে, তারা কী আসলে আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছে কিনা এ ব্যাপারে একজন ঈমানদারের মনে সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক।
📄 “ইস্তেওয়া আলাল ‘আরশ’” এর ওপর হাদীস থেকে দলীল
১- আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর হাদীসে এসেছে, নবী তার হাত ধরলেন, তারপর বললেন, হে আবু হুরায়রা!
إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِينَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ، ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ. "নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা আসমান, যমীন ও তার মাঝখানের সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করলেন, তারপর তিনি তার 'আরশের উপর উঠলেন।” (৯৯)
২- কাতাদাহ ইবনুন নু'মান রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণিত হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, لما فرغ الله من خلقه؛ استوى على عرشه». "যখন আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টির কাজ সম্পন্ন করলেন তখন তিনি তার 'আরশের উপর উঠলেন।” (১০০)
৩- আবু রাযীন আল-উকাইলী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ثم خلق العرش ثم استوى عليه. وفي لفظ آخر : ثم كان على العرش فارتفع على عرشه "...তারপর তিনি পানির উপর তাঁর 'আরশ তৈরি করেন। তারপর তিনি তাঁর 'আরশের উপরে উঠেছেন।” অন্য বর্ণনায় আছে, "অতঃপর 'আরশের উপরে ছিলেন। তারপর 'আরশের ঊর্ধ্বে হন।”(১০১)
৪- আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, নিশ্চয় রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমু'আর দিন সম্পর্কে বলেছেন, "এই দিনে তোমাদের রব 'আরশের উপর উঠেছেন." এই হাদীস ইমাম শাফে'য়ী তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। (১০২)
এ হাদীসগুলো সবই সরাসরি আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক 'আরশের উপরে উঠার কর্মবাচক গুণ সাব্যস্ত করছে। এসব হাদীসে 'ইস্তেওয়া' শব্দটি তাঁর জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যবহার করেছেন যা কোনো জাহমী বা মু'তাযিলী ব্যতীত কেউ অস্বীকার করতে পারে না।
এখন আমরা 'ইস্তেওয়া' শব্দের কয়টি অর্থ হতে পারে তা আমাদের সালাফে সালেহীন (সাহাবী, তাবে'য়ীন) মুফাসসিরীন, মুহাদ্দেসীন, আয়িম্মায়ে মুজতাহিদীন ও ভাষাবিদদের মত থেকে জেনে নিব।
টিকাঃ
৯৯. নাসায়ী, আত-তাফসীর, তাফসীর সূরাতুস সাজদাহ ২/১৫৩; নং ১৫৪, আরও অনেকে। আলবানী রাহিমাহুল্লাহ মুখতাসারুল উলু (১১২) তে এর সনদকে জাইয়েদ বলেছেন। আর তাফসীর আন-নাসায়ী এর মুহাক্কিকদ্বয় এর সনদকে হাসান বলেছেন।
১০০. আল-খাল্লাল আস-সুন্নাহ; ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমাউল জুয়ূশিল ইসলামিয়্যাহ, ১০৭, ১০৮ আর বলেছেন, বুখারীর শর্ত অনুযায়ী এর সনদ সহীহ; যাহাবী, আল-উলু পৃ. ১১০, আর বলেন, এর বর্ণনাকারীরা সবাই নির্ভরযোগ্য; যাহাবী, আল-আরশ, (২/৯০) আরো অনেকে। তবে মনে রাখা দরকার এ হাদীসের মত আরেক হাদীসে কেউ কেউ বাড়িয়ে বলে, "তারপর তিনি পায়ের উপর পা রেখে পিঠের উপর শুয়ে পড়লেন". এটি বানোয়াট যা আমাদের বর্ণিত হাদীস নয়।
১০১. ইমাম যাহাবী বলেন, এটি হাসান হাদীস। ইমাম তিরমিযী (হাদীস নং ৩১০৯) তিনি বলেছেন, হাদীসটি হাসান। হাদীসটির ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা: ১- হাদীসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন, ২৬/১০৮, (১৬১৮৮) ইয়ায়ীদ ইবন হারুন, হাম্মাদ ইবন সালামাহ, ইয়া'লা ইবন 'আত্বা, ওকী' ইবন 'উদুস বা হুদুস, তার চাচা আবু রাযীন লাক্কীত্ব ইবন 'আমের ইবনুল মুনতাফিক্ক থেকে। আবার তিনি বর্ণনা করেছেন, ২৬/১১৭, (১৬২০০) বাহয ইবন আসাদ আল-'আম্মী, হাম্মাদ ইবন সালামah, ইয়া'লা ইবন 'আত্বা, ওকী' ইবন হুদুস, তার চাচা আবু রাযীন আল-উকাইলী থেকে।
২- ইবন বাত্তাহ আল-'উকবারী, আল-ইবানাতুল কুবরা (২৫৩৬) ইয়াযীদ ইবন হারূন,......
৩- ইবন মাজাহ, আস-সুনান (১/৬৪) (হাদীস নং ১৮২), ইয়াযীদ ইবন হারুন......
৪- তিরমিযী, আল-জামে'উ (৫/২৮৮) (হাদীস নং ৩১০৯), ইয়াযীদ ইবন হারুন....
৫- ইবন আবী শাইবাহ, আল-আরশ, (নং ৭, পৃ. ৩১৩) ইয়াযীদ ইবন হারুন.....
৬- ত্বাবারী, তাফসীর (১৫/২৪৭), (১৭৯৮১), ইয়াযীদ ইবন হারুন... তাবারী, তারীখ (১/৩৭-৩৮), কাত্তান, ইয়াযীদ ইবন হারুন...... তাবারী, তাফসীর (১৫/২৪৬) নং (১৭৯৮০), হাজ্জাজ ইবন মিনহাল থেকে....
৭- ত্বাবারানী ফিল কাবীর (১৯/২০৭) আসাদ ইবন মূসা ও হাজ্জাজ ইবন মিনহাল থেকে, তারা দু'জন হাম্মাদ ইবন সালামah থেকে....
৮- ইবন হিব্বান, (১৪/৮) (৬১৪১), হাজ্জাজ ইবন মিনহাল........
৯- ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ (৩৩১), হাজ্জাজ ইবন মিনহাল থেকে...
১০- আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ (১/৩৬৩), আবু দাউদ আত-তায়ালিসী, হাম্মাদ ইবন সালামah.....
১১- আবু দাউদ আত-ত্বায়ালিসী পৃ. ১৪৭ (১০৯৩) হাম্মাদ ইবন সালামah.....
১২- বাইহাক্বী আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/২৩৫), (২/৩০৩) ইবন আবী ইয়াস, হাম্মাদ ইবন সালামah....
১৩- ইবন আব্দুল বার, আত-তামহীদ (৭/১৩৭) মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ আল-খুযা'ঈ, হাম্মাদ ইবন সালামah...
হাদীসটিকে যারা সহীহ বলেছেন, ১- ইমাম ইসহাক্ক ইবন রাহওয়াইহ। (আল-ইবানah ৩/১৭০) মুহাক্কিক শাইখ ইথিওবী বলেছেন, সহীহ সনদে। ২- আবু উবাইদ ক্বাসেম ইবন সালাম। (গারীবুল হাদীস (২/৯) (মাহমূদ শাকের, তা'লীক আলা তাফসীর আত-ত্বাবারী)। ৩- ইমাম তিরমিযী তার সুনানে হাসান বলেছেন। (তিরমিযী ৫/২৮৮) হাশিয়াতু ইবনুল কাইয়্যেম আলা সুনানি আবী দাউদ) ৪- ইমাম ইবন জারীর আত-তাবারী। (তারীখুল উমামি ওয়াল মুলুক (১/৩১-৩২) ৫- ইবন তাইমিয়্যাহ আল-হাররানী (ইস্তেকামাহ ১/১২৬), (সাফাদিয়্যাহ (২/৭৯), মাজমূ' ফাতাওয়া ২/২৭৫, ৫/৫৫, ৩১৫) ৬- ইমাম যাহাবী। (আল-উলু পৃ. ১৮) ৭- ইবনুল কাইয়্যেম। (ই'লামুল মুওয়াক্কে'ঈন ৪/২৬৭)। ৮- ইবন কাসীর। (ফাতাওয়া ইমামুল মুফতীন পৃ. ১৩)।
হাদীসটিকে যারা দুর্বল বলেছেন, ১- ইবনুল জাওযী, (দাফ'উ শুবahi মান তামাররাদা (২৫৩-২৫৪) ২- ইবন কুতাইbah (তা'ওয়ীল মুখতালাফুল হাদীস (২২২) ৩- বাদরুদ্দীন ইবন জামা'আহ (ঈযাহুদ দলীল পৃ. ১৯৯) ৪- শাইখ আলবানী। (মিশকাত ৩/২৪৪), (যিলালুল জান্নাত ৩৩১) দ্বায়ীফاه (১১/৩২১), (মুখতাসারুল উলু ১৯৩, ২৫০)
মোটকথা: হাদীসটি গ্রহযোগ্য। কারণ ওকী' ইবন হুদুসকে ইবন হিব্বান তাওসীক করেছেন। জাওযাকানী সাদূক বলেছেন। অনেকেই তার ব্যাপারে চুপ ছিলেন। যাহাবী তাওসীক করেছেন; ইবন হাজার মাকবুল বলেছেন। অর্থাৎ অপর বর্ণনা থাকলে। তার থেকে আরো বর্ণনা মুসনাদে আহমাদ এ এসেছে। বিস্তারিত দেখুন, [http://www.ahlalhdeeth.com/vb/showthread.php?t=200307]
১০২. মুসনাদ আশ-শাফে'য়ী পৃ. ৭০; আল-উম্ম (১/২০৮-২০৯); আবদুল্লাহ ইবন আহমাদ, আস-সুন্নাহ পৃ. ৫৬।