📄 কুরসীর ব্যাপারে বিভিন্ন ভুল মতামত
কুরসী বলতে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আত কী বুঝেন তা আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয়, এ কুরসী নিয়েও কিছু লোক সঠিক পথবিচ্যুত হয়েছে। তাদের মতগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো:
এক. কোনো কোনো আলেমের মতে, 'আরশ ও কুরসী একই জিনিস। এটি হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। তবে কয়েকটি কারণে শুদ্ধ নয়।
১- ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে এ বর্ণনা শুদ্ধ নয়, যেমনটি ইমাম ইবন কাসীর বলেছেন।
২- তাছাড়া কুরআন, হাদীস ও আসারে এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য বর্ণিত হয়েছে।
দুই. কুরসী বলে বাস্তবে কিছু নেই। কুরসী একটি ধারণা করা জিনিস মাত্র, যা দিয়ে উপমা দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার বড়ত্বের উদাহরণ পেশ করা হয়েছে মাত্র। যারা আল্লাহর সেসব গুণকে অস্বীকার করে যা আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশক, তারাই সাধারণত এ ধরনের কথা বলে। তারা আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশক আয়াতসমূহ যেমন, وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَوَاتُ مَطْوِيَّتُ بِيَمِينِهِ ﴾ [الزمر: ٦٧] "সকল যমীন তাঁর মুষ্ঠির ভিতর থাকবে, আর আসমানসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬৭] এ জাতীয় আয়াত ও হাদীসসমূহ সম্পর্কে মনে করে থাকে যে, এগুলো দ্বারা উদ্দেশ্য বড় বড় ধারণায় নিপতিত করা উদ্দেশ্য। বাস্তবে সে রকম নয়। এরা সাধারণত দীনের সঠিক জ্ঞানে দীন না বুঝে আবেগ দিয়ে চলতে চায়। মু'তাযিলারা এটা সাধারণত বলে থাকে, তাদের সাথে কিছু আশায়েরা মতবাদের লোকও রয়েছে। বর্তমান কালের তাফসীরকারকদের মধ্য হতে সাইয়্যেদ কুতুব তার যিলালুল কুরআনে সূরা আয-যুমারের ৬৭ নং আয়াতে এ মতকে পছন্দ করেছেন এবং একটি মৌলিক নীতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বস্তুত এ জাতীয় কথা বলা বড় ধরনের পথভ্রষ্টতা। কারণ:
১- এ জাতীয় কথা বলার অর্থ হচ্ছে দীনকে খেয়াল খুশির অধীন করে দেয়া। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা বলেছেন সেগুলোকে যদি এভাবে দেখা হয়, তাহলে গায়েবী কোনো জিনিসেই আর ঈমান থাকবে না। নাউযুবিল্লাহ।
২- মু'তাযিলা মুফাসসিররা এ নীতির ওপর ভিত্তি করেই যা তাদের যুক্তিবিরুদ্ধ হয়ে যায় সেটাকেই এ পর্যায়ে নিয়ে রাখে। যেমনটি করেছেন যামাখশারী তার তাফসীরে।
৩- কুরআন ও হাদীসে সুস্পষ্ট বহু ভাষ্যকে এভাবে খেয়াল বা ধারণাপ্রসূত মনে করা সুস্পষ্ট কুফুরী। কুরআন ও হাদীসে যা এসেছে তার ওপর ঈমান না আসলে সে আল্লাহর বাণী ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে বিশ্বাসী হতে পারেনি।
তিন. কুরসী বলে ইলম বা জ্ঞান বুঝানো হয়েছে। এটি ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। এ মতটিও শুদ্ধ নয়। কারণ,
১- ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে যা বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত হয়েছে এটি তার বিপরীত।
২- আরবী ভাষায় তার যে অর্থ হয়, তাতে কুরসী বলে ইলম বা জ্ঞান অর্থ নেয়া যায় না।
৩- তাছাড়া শরী'আতের নসও তা বুঝাচ্ছে না। এগুলো কালামশাস্ত্রবিদদের বাড়তি কথার অন্তর্ভুক্ত।
৪- কুরসী সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন যে, তা আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টন করে আছে [সূরা বাক্বারাহ: ২৫৫]। কিন্তু আল্লাহর ইলম তো আরও ব্যাপক, আল্লাহ বলছেন, ﴿الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ ﴾ [غافر: ٧] "যারা 'আরশ ধারণ করে আছে এবং যারা এর চারপাশে আছে, তারা তাদের রবের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে প্রশংসার সাথে এবং তাঁর ওপর ঈমান রাখে, আর মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, 'হে আমাদের রব! আপনি দয়া ও জ্ঞান দ্বারা সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করে রেখেছেন। অতএব যারা তাওবা করে এবং আপনার পথ অবলম্বন করে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন। আর জাহান্নামের শাস্তি থেকে আপনি তাদের রক্ষা করুন।” [সূরা গাফির, আয়াত: ০৭]
তিনি আরও বলেছেন, ﴿هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ فَسَوَّلَهُنَّ سَبْعَ سَمَوَاتٍ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ ﴾ [البقرة: ٢٩] "তিনিই যমীনে যা আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি আসমানের প্রতি মনোনিবেশ করে সেটাকে সাত আসমানে বিন্যস্ত করেছেন; আর তিনি সবকিছু সম্পর্কে সবিশেষ অবগত." [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ২৯] সেটার পরিধিতে আসমান ও যমীনের বাইরে জান্নাত, জাহান্নামও রয়েছে।
কোনো কোনো মুহাদ্দিস ও মুফাসসির থেকে কুরসী অর্থ ইলম বর্ণিত হলেও মনে রাখতে হবে যে, তারা এটা বাড়তি একটি অর্থ হিসেবে বলে থাকবেন। অর্থাৎ যেহেতু আসমান ও যমীন এ দু'টি কুরসীতে অতীব ক্ষুদ্র, তাই তিনি সেগুলোর মধ্যকার সবকিছুর জ্ঞানই রাখেন। সম্ভবত এটা বলা উদ্দেশ্য। আল্লাহ ভালো জানেন।
চার. কারও কারও মতে, কুরসী বলে রাজত্ব বুঝানো হয়েছে, তারা 'আরশকেও রাজত্ব হিসেবে বুঝেছে। বস্তুত তাদের বক্তব্যও শুদ্ধ নয়। ইতোপূর্বে তাদের বক্তব্য খণ্ডন করা হয়েছে। (৯৮)
টিকাঃ
৯৮. শারহু সালেহ আলুশ শাইখ, শারহুত তাহাওয়িয়্যাহ।