📄 ‘আরশের দলীল-প্রমাণ
শরী'আতের পরিভাষায়: আল্লাহর 'আরশ হচ্ছে পায়া বিশিষ্ট একটি খাট যা ফিরিশতাগণ বহন করে; আর তা জগত-সৃষ্টির উপর গম্বুজের মতো, সকল সৃষ্টিকুলের ছাদ, সবার উপরে ও সবচেয়ে বড়। ইমাম ত্বাবারী রাহিমাহুল্লাহ ]وَتَرَى الْمَلَائِكَةَ حَافِّينَ مِنْ حَوْلِ الْعَرْشِ ﴾ [الزمر: ٧٥ এর ব্যাখ্যায় বলেন, এখানে 'আরশ অর্থ খাট। তারপর তিনি সেটা তার সনদ দিয়ে সুদ্দী থেকে বর্ণনা করে বলে, "আরশের চার পার্শ্বে তারা ঘিরে আছে, আর 'আরশ হচ্ছে খাট।” (২০)
ইমাম ত্বাবারী রাহিমাহুল্লাহ অন্য আয়াত ذُو الْعَرْشِ الْمَجِيدُ ) [غافر: ১৫] এর ব্যাখ্যায় বলেন, খাটওয়ালা, যা তিনি ব্যতীত সকল কিছুকে পরিবেষ্টনকারী। (২১)
বাইহাক্বী বলেন, তাফসীরকারদের মত হচ্ছে, 'আরশ বলতে বুঝানো হয়েছে 'খাট'কে, আর তা একটি দেহ বিশিষ্ট বস্তু, যা আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। ফিরিশতাদেরকে তা বহন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাদেরকে সেটার সম্মান ও সেটার চার পাশে তাওয়াফ করে ইবাদাত করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন তিনি যমীনের বুকে একটি ঘর বানিয়েছেন, বনী আদমকে তার চারপাশে তাওয়াফ করার নির্দেশ দিয়েছেন, সালাতে সেটার দিকে মুখ করতে আদেশ করেছেন। তাফসীরকারগণ যে মতের দিকে গিয়েছেন সেটার সপক্ষে কুরআন, হাদীস, আছার এর প্রমাণসমূহ রয়েছে। (২২)
তিনি আরও বলেন, 'আল-আরশ' তা বিবেকবানদের বিখ্যাত মত অনুযায়ী খাটকে বলা হয়।
ইমাম ইবন কাসীর বলেন, 'আরশ হচ্ছে এমন খাট যার পায়া রয়েছে, ফিরিশতারা তা বহন করে, আর তা জগতের উপর গম্বুজের মতো, সকল সৃষ্টিকুলের ছাদ। (২৩)
ইমাম যাহাবী বলেন, 'তোমার কী ধারণা সে 'আরশের ব্যাপারে, যা সর্বোচ্চ মহান সত্তা নিজের জন্য গ্রহণ করেছেন, তার উচ্চতা, প্রশস্ততা, পায়া, গঠনশৈলী, বহনকারী, কুরূবীগণ, যারা সেটাকে চারপাশে ঘিরে আছে, তার সৌন্দর্য ও তার মূল্য সম্পর্কে? যেখানে বলা হচ্ছে যে, লাল রুবী পাথরের তৈরি।' (২৪)
বস্তুত ত্বাবারী, বাইহাকী, ইবন কাসীর, যাহাবী তারা যে মতটি বলেছেন, এটিই সকল সালাফে সালেহীনের মত।
'আরশের দলীল-প্রমাণ:
'আরশের দলীল-প্রমাণ অনেক। তবে আমরা কয়েকটি বর্ণনা করব,
১- আল্লাহ তা'আলার বাণী, ﴿ ذُو الْعَرْشِ الْمَجِيدُ ﴾ [البروج: ١٥] "আরশের অধিকারী ও সম্মানিত." [সূরা আল-বুরূজ, আয়াত: ১৫]
২- আল্লাহ তা'আলার বাণী, ﴿ الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ﴾ [طه: ٥] “দয়াময় (আল্লাহ্) 'আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫]
৩- আল্লাহর বাণী, ﴿رَفِيعُ الدَّرَجَاتِ ذُو الْعَرْشِ﴾ [غافر: ١٥] "তিনি সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী, 'আরশের অধিপতি।” [সূরা গাফির, আয়াত: ১৫]
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِذَا سَأَلْتُمُ اللَّهَ، فَاسْأَلُوهُ الفِرْدَوْسَ، فَإِنَّهُ أَوْسَطُ الْجَنَّةِ وَأَعْلَى الْجَنَّةِ - أَرَاهُ - فَوْقَهُ عَرْشُ الرَّحْمَنِ، وَمِنْهُ تَفَجَّرُ أَنْهَارُ الْجَنَّةِ "যখন তোমরা আল্লাহর কাছে চাইবে তখন তাঁর কাছে ফিরদাউস চাইবে; কারণ তা জান্নাতের মধ্যমনি, সর্বোচ্চ জান্নাত আর তার উপরে রয়েছে রহমানের 'আরশ।”(২৫)
অপর হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنَّ النَّاسَ يَصْعَقُونَ يَوْمَ القِيَامَةِ، فَأَصْعَقُ مَعَهُمْ، فَأَكُونُ أَوَّلَ مَنْ يُفِيقُ ، فَإِذَا مُوسَى بَاطِشُ جَانِبَ العَرْشِ، فَلَا أَدْرِي أَكَانَ فِيمَنْ صَعِقَ، فَأَفَاقَ قَبْلِي أَوْ كَانَ مِمَّنِ اسْتَثْنَى اللَّهُ "সেদিন মানুষ বেহুঁশ হয়ে যাবে, তখন আমিই প্রথম হুঁশে আসব, তখন আমি দেখব যে, মূসা 'আরশের পায়াসমূহের কোনো একটি অংশ ধরে আছেন, আমি জানি না তিনি কি বেহুঁশ হয়েছিলেন, নাকি আমার আগে হুঁশে ফিরেছেন, নাকি যাদেরকে আল্লাহ বেহুঁশ হওয়া থেকে ব্যতিক্রম করেছেন তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত।” (২৬)
কুরআন ও হাদীসে এ জাতীয় ভাষ্য অনেক।
টিকাঃ
২০. ত্বাবারী, (২৪/৩৭-৩৮)।
২১. ত্বাবারী (২৪/৪৯)।
২২. বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত: ৪৯৭।
২৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (১/১২)।
২৪. আল-উলু, ৫৭।
২৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৭৯০।
২৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৪১১।
📄 ‘আরশের কিছু বৈশিষ্ট্য
আল্লাহর 'আরশের যেসব বৈশিষ্ট্য কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত তা হচ্ছে,
১- 'আরশ হচ্ছে খাট: ইবন কুতাইবাহ বলেন, বাতিলপন্থীরা 'আরশ বলতে খাট ব্যতীত অন্য কিছু বুঝাতে চায়, অথচ আলেমগণ ভাষাতে 'আরশ বলে খাটকেই বুঝেন। (২৭) অনুরূপ ইবন কাসীর বলেন, অভিধানে 'আরশ বলতে খাটকেই বুঝানো হয়। এটা গোলক নয়, আরবরা তা বুঝে না। আর কুরআন কেবল আরবদের ভাষাতেই নাযিল হয়েছে। তাদের নিকট 'আরশ হচ্ছে পায়া বিশিষ্ট চৌকি বা খাট। (২৮)
২- 'আরশ পায়া বিশিষ্ট: ইবন আবিল ইয্য বলেন, শরী'আতে 'আরশকে পা বিশিষ্ট বলা হয়েছে যা ফিরিশতাগণ বহন করেন। যেমন, হাদীসে এসেছে, النَّاسُ يَصْعَقُونَ يَوْمَ القِيَامَةِ، فَأَكُونُ أَوَّلَ مَنْ يُفِيقُ، فَإِذَا أَنَا بِمُوسَى آخِذٌ بِقَائِمَةٍ مِنْ قَوَائِمِ العَرْشِ، فَلَا أَدْرِي أَفَاقَ قَيْلِي أَمْ جُوزِيَ بِصَعْقَةِ الطُّورِ» "মানুষরা বেহুঁশ হয়ে যাবে, তারপর প্রথম আমি হুঁশে আসব, তখন আমি দেখব যে, মূসা 'আরশের পায়াসমূহের একটি আঁকড়ে ধরে আছেন। আমি জানি না তিনি কি আমার আগে হুঁশে এসেছেন, নাকি তুর পাহাড়ের সে বেহুঁশ হওয়ার প্রতিদানস্বরূপ তাকে আর বেহুঁশ হতে হয়নি?” (২৯) এ হাদীস দ্বারা তাদের মতের খণ্ডন হয়ে যায়, যারা 'আরশ বলতে মুলক বা রাজত্ব বুঝেছেন; রাজত্বের আবার পায়া হয় কী করে? রাজত্বের পায়া ধরা হবে কী করে?(৩০)
৩- 'আরশ সৃষ্ট জিনিস: আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ فَاعْبُدُوهُ﴾ [الانعام: ١٠٢] "তিনিই তো আল্লাহ্, তোমাদের রব; তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ্ নেই। তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা; কাজেই তোমরা তাঁর 'ইবাদাত কর।” [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১০২]
অনুরূপ আল্লাহর বাণী, ﴿وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ﴾ [التوبة: ١٢٩] "আর তিনি মহান 'আরশের রব". [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১২৯] হাফেয ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ আয়াত ইঙ্গিত করছে যে, 'আরশ লালন-পালনকৃত জিনিস। আর যা পালনকৃত জিনিস হবে তা অবশ্যই সৃষ্ট হবে। (৩১)
তাছাড়া হাদীসে 'আরশ সৃষ্টির কথা স্পষ্টভাবে এসেছে, যেখানে বলা হয়েছে, «وَخَلَقَ عَرْشَهُ عَلَى الْمَاءِ» "আর তিনি পানির উপর তাঁর 'আরশ সৃষ্টি করলেন।” (৩২)
৪- আল্লাহ তা'আলা ফিরিশতাদেরকে 'আরশ বহন করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাদেরকে এর সম্মান করা ইবাদাত হিসেবে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ، وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا﴾ [غافر: ٧] "যারা 'আরশ বহন করে আর যারা 'আরশের চার পাশে রয়েছে তারা তাদের রবের প্রশংসংস তাসবীহ পাঠ করে।” [সূরা গাফির, আয়াত: ০৭]
তিনি আরও বলেন, ﴿وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَانِيَةٌ﴾ [الحاقة: ١٧] "আর সেদিন আপনার রবের 'আরশ বহন করবে আটজন।” [সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত: ১৭]
ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, আটজন ফিরিশতা রয়েছেন যারা বন্য ছাগলের সূরতে রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, তাদের পায়ের খুর থেকে হাঁটু পর্যন্ত সত্তর বছরের রাস্তার দূরত্ব। (৩৩)
অনুরূপ জাবের ইবন আবদুল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أُذِنَ لِي أَنْ أُحَدِّثَ عَنْ مَلَكِ مِنْ مَلَائِكَةِ اللَّهِ مِنْ حَمَلَةِ الْعَرْشِ، إِنَّ مَا بَيْنَ شَحْمَةِ أُذُنِهِ إِلَى عَائِقِهِ مَسِيرَةُ سَبْعِ مِائَةِ عَامٍ "আমাকে 'আরশ বহনকারী আল্লাহর ফিরিশতাদের মধ্যে একজন ফিরিশতার বর্ণনা দিতে অনুমতি দেয়া হয়েছে, তার কানের লতি থেকে কাঁধের দূরত্ব সাতশ' বছরের রাস্তা।” (৩৪) অপর হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, من قال حين يصبح اللهم إِنَّا أَصْبَحْنَا نُشْهِدُكَ وَنُشْهِدُ حَمَلَةَ عَرْشِكَ وَمَلَائِكَتَكَ وَجَمِيعَ خَلْقِكَ أَنَّكَ أَنْتَ اللَّهُ لا إله إلا أنت وحدك لا شريك وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُكَ وَرَسُولُكَ إِلَّا أَعْتَقَ اللَّهُ رُبُعَهُ فِي ذَلِكَ الْيَوْمِ، وَمَنْ قَالَهَا مَرَّتَيْنِ أَعْتَقَ اللهُ نِصْفَهُ مِنَ النَّارِ، وَمَنْ قَالَهَا أَرْبَعَ مَرَّاتٍ أَعْتَقَهُ اللَّهُ مِنَ النَّارِ فِي ذلك اليوم “যে কেউ সকাল বেলা বলবে, 'হে আল্লাহ আমরা সকালে উপনীত হয়েছি, আপনাকে সাক্ষী রাখছি, আপনার 'আরশ বহনকারীদেরকে সাক্ষী রাখছি, সকল ফিরিশতাদেরকে সাক্ষী রাখছি এবং আপনার সকল সৃষ্টিকে সাক্ষী বানাচ্ছি যে, নিশ্চয় আপনিই হচ্ছেন আল্লাহ, কেবল আপনি ব্যতীত আর কোনো সত্য ইলাহ নেই, আপনার কোনো শরীক নেই, আর মুহাম্মাদ আপনার দাস ও আপনার রাসূল' আল্লাহ তার চারভাগের একভাগ সে দিনের জন্য (জাহান্নাম থেকে) মুক্ত করে দিবেন। আর যে কেউ দু'বার বলবে, আল্লাহ তার অর্ধেক অংশকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন, আর যে কেউ চার বার বলবে, আল্লাহ তাকে সে দিনের জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন।” (৩৫) ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেন, 'আরশ বহনকারীদের কারও কারও পায়ের গোড়ালী থেকে দু' পায়ের নিচ পর্যন্ত পাঁচশ' বছরের দূরত্ব। (৩৬)
﴿ الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ ﴾ [غافر: 7] এবং ﴿وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَانِيَةٌ ﴾ [الحاقة: ১৭] এ আয়াতদ্বয়ের তাফসীরে বলেন, এ আয়াত প্রমাণ করছে যে, আল্লাহর এমন কিছু ফিরিশতা রয়েছেন যারা তার 'আরশ বহন করে, আরও কিছু রয়েছেন যারা 'আরশের চারপাশে ঘিরে থাকে। আরও প্রমাণ করছে যে, কিয়ামতের দিন 'আরশ বহন করবে আটজন। (৩৭) এ বক্তব্য তাদের বিপরীত, যারা বলে, 'আরশ বলে রাজত্ব বুঝানো হয়েছে; কারণ রাজত্ব আটজনের বহনের বিষয় নয়। আরও একটি বিষয় এখানে জানানো দরকার তা হচ্ছে, ইবন কাসীর ও ইবনুল জাওযী প্রাধান্য দিয়েছেন যে বর্তমানে 'আরশ বহনকারী ফিরিশতা চার জন আর কিয়ামতের দিন তা হবে আটজন।
৫- 'আরশ হচ্ছে সর্বোচ্চ সৃষ্টি, সর্ববৃহৎ সৃষ্টি, সকল সৃষ্টির ছাদ, তা জগতের উপর গম্বুজের মতো, তার নিচের অংশ তার তুলনায় বিস্তীর্ণ ভূমিতে একটি কড়ার মতো। ইমাম ইবন আবী যামানীন বলেন, "আহলুস সুন্নাহ'র মত হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশ সৃষ্টি করেছেন, সেটাকে সকল সৃষ্টির সর্বোচ্চে ও উপরে রাখার মাধ্যমে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন।”(৩৮)
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, আর 'আরশ তা তো গম্বুজের মতো; কারণ সুনান গ্রন্থে আবু দাউদ রাহিমাহুল্লাহ জুবাইর ইবন মুত'ঈম রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, »إِنَّ اللَّهَ فَوْقَ عَرْشِهِ، وَعَرْشُهُ فَوْقَ سَمَاوَاتِهِ« “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপর, আর তাঁর 'আরশ সকল আসমানের উপর” (৩৯) তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আঙ্গুলকে গম্বুজের মতো করে দেখালেন। আর 'আরশ সবকিছুর উপর সেটার প্রমাণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাণী, فَإِذَا سَأَلْتُمُ اللَّهَ، فَاسْأَلُوهُ الفِرْدَوْسَ، فَإِنَّهُ أَوْسَطُ الْجَنَّةِ وَأَعْلَى الْجَنَّةِ - أَرَاهُ – فَوْقَهُ عَرْشُ الرَّحْمَنِ، وَمِنْهُ تَفَجَّرُ أَنْهَارُ الجَنَّةِ» “যখন তোমরা কোনো কিছু চাইবে তখন তাঁর কাছে ফিরদাউস চাইবে, কারণ তা মধ্য বা সর্বোত্তম জান্নাত, সর্বোচ্চ জান্নাত। তার উপরে রহমানের 'আরশ, আর তা থেকেই জান্নাতের নালাসমূহ প্রবাহিত।” (৪০) সুতরাং এসব দ্বারা বুঝা গেল যে, জান্নাত সর্বোচ্চ সৃষ্টি, সৃষ্টির ছাদ, আর তা কুব্বা বা গম্বুজের মতো। (৪১)
অনুরূপ আবু যর রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর বিখ্যাত হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার কাছে যা নাযিল হয়েছে তন্মধ্যে কোন আয়াত সবচেয়ে বড়? তিনি বললেন, “আয়াতুল কুরসী”, তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, يَا أَبَا ذَرُ مَا السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ مَعَ الْكُرْسِيِّ إِلَّا كَحَلْقَةٍ مُلْقَاةٍ بِأَرْضِ فَلَاةٍ وَفَضْلُ الْعَرْشِ عَلَى الْكُرْسِيِّ كَفَضْلِ الْفَلَاةِ عَلَى الْحَلْقَةِ “হে আবু যর, সাত আসমান কুরসীর তুলনায় বিস্তীর্ণ ভূমিতে ফেলে রাখা একটি রিং এর মতো, আর কুরসী থেকে 'আরশের বাড়তি হচ্ছে সে কোনো বিস্তীর্ণ ভূমিতে পড়ে থাকা রিং এর মতো." (৪২)
৬- আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীন সৃষ্টির আগেই 'আরশ সৃষ্টি করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, كَانَ اللهُ وَلَمْ يَكُنْ شَيْءٌ غَيْرُهُ، وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى المَاءِ، وَكَتَبَ فِي الذِّكْرِ كُلَّ شَيْءٍ، وَخَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ» "আল্লাহ তা'আলাই ছিলেন, তাঁর সাথে তিনি ব্যতীত আর কিছু ছিল না, আর তাঁর 'আরশ ছিল পানির উপর, তিনি সবকিছু যিকির তথা লাওহে মাহফুযে লিখলেন, আর আসমান ও যমীন সৃষ্টি করলেন।"(৪৩) এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, 'আরশ প্রথম সৃষ্টি। (৪৪) আর এটিই অধিকাংশের মত বলে ইবন কাসীর ও ইবন হাজার রাহিমাহুমাল্লাহ আবুল আ'লা আল- হামাদানী থেকে বর্ণনা করেছেন।
এর বিপরীতে কেউ কেউ বলেছেন, প্রথম সৃষ্টি কলম। তাদের দলীল হচ্ছে, إِنَّ أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللهُ القَلَمَ، فَقَالَ: اكْتُبُ “নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা প্রথম কলমকে সৃষ্টি করেন তখন বলেন, লিখ..।”(৪৫) বস্তুত এখানে অনেকেই হাদীসে আসা 'কালাম' শব্দটিকে 'নাসব' হিসেবে পড়েছেন, তখন অর্থ হবে, কলম লিখার ক্ষেত্রে প্রথম, সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রথম নয়।
৭- আসমান ও যমীন সৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায়: আসমান ও যমীন সৃষ্টির পর্যায়সমূহ সম্পর্কে ধারণা 'আরশ সৃষ্টি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, قُلْ أَبِنَّكُمْ لَتَكْفُرُونَ بِالَّذِي خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ وَتَجْعَلُونَ لَهُ أَندَادًا ذَلِكَ رَبُّ الْعَالَمِينَ ) وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِيَ مِن فَوْقِهَا وَبَرَكَ فِيهَا وَقَدَّرَ فِيهَا أَقْوَاتَهَا فِي أَرْبَعَةِ أَيَّامٍ سَوَاءَ لِلسَّابِلِينَ * ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ وَهِيَ دُخَانٌ فَقَالَ لَهَا وَلِلْأَرْضِ ائْتِيَا طَوْعًا أَوْ كَرْهًا قَالَتَا أَتَيْنَا طَابِعِينَ * فَقَضَلَهُنَّ سَبْعَ سَمَوَاتٍ فِي يَوْمَيْنِ وَأَوْحَى فِي كُلِّ سَمَاءٍ أَمْرَهَا وَزَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ وَحِفْظًا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ ﴾ [فصلت: ٩، ١٢] "বলুন, 'তোমরা কি তাঁর সাথেই কুফরী করবে যিনি যমীন সৃষ্টি করেছেন দু'দিনে এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ তৈরী করছ? তিনি সৃষ্টিকুলের রব! আর তিনি স্থাপন করেছেন অটল পর্বতমালা ভূপৃষ্ঠে এবং তাতে দিয়েছেন বরকত এবং চার দিনের মধ্যে এতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন সমভাবে যাচঞাকারীদের জন্য। তারপর তিনি আসমানের প্রতি ইচ্ছে করলেন, যা (পূর্বে) ছিল ধোঁয়া। অতঃপর তিনি ওটাকে (আসমান) ও যমীনকে বললেন, 'তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়।' তারা বলল, 'আমরা আসলাম অনুগত হয়ে।' অতঃপর তিনি সেগুলোকে সাত আসমানে পরিণত করলেন দু'দিনে এবং প্রত্যেক আসমানে তার নির্দেশ ওহী করে পাঠালেন এবং আমরা নিকটবর্তী আসমানকে সুশোভিত করলাম প্রদীপমালা দ্বারা এবং করলাম সুরক্ষিত। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের ব্যবস্থাপনা." [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৯-১২] আয়াত অনুযায়ী আসমান ও যমীন সৃষ্টির স্তরবিন্যাস নিম্নোক্তভাবে হবে:
প্রথম স্তর: যমীন সৃষ্টি, আর তা দু'দিনে: আল্লাহ তা'আলা বলেন, قُلْ أَبِنَّكُمْ لَتَكْفُرُونَ بِالَّذِي خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ ﴾ [فصلت: ٩] "বলুন, 'তোমরা কি তাঁর সাথেই কুফুরী করবে যিনি যমীন সৃষ্টি করেছেন দু'দিনে?” [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ০৯]
দ্বিতীয় স্তর: যমীনকে বিস্তৃত করেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿ وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَلِكَ دَحَهَا أَخْرَجَ مِنْهَا مَاءَهَا وَمَرْعَهَا وَالْجِبَالَ أَرْسَهَا ﴾ [النازعات: ٣٠-٣٢] "আর যমীনকে এর পর বিস্তৃত করেছেন। তিনি তা থেকে বের করেছেন তার পানি ও তৃণভূমি, আর পর্বতকে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করেছেন।” [সূরা আন-নাযি'আত, আয়াত: ৩০-৩২]
- যমীন বিস্তৃত করার অর্থই হচ্ছে, তা থেকে ঝর্ণা বের করা, নদী-নালা বের করা, ক্ষেত-খামার ও ফসলের উপযোগী করা, আর এটাই খোরাকীর ব্যবস্থা করা, তারপর তার উপর পাহাড় পর্বত পেরেগের মতো গেঁথে দেয়া; যাতে তা টল-টলায়মান না হয়ে যায়। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿ وَجَعَلْنَا فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَن تَمِيدَ بِهِمْ وَجَعَلْنَا فِيهَا فِجَاجًا سُبُلًا لَّعَلَّهُمْ يَهْتَدُونَ ﴾ [الانبياء: ٣١] "এবং আমরা পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছি সুদৃঢ় পর্বত, যাতে যমীন তাদেরকে নিয়ে এদিক-ওদিক ঢলে না যায় এবং আমরা সেখানে করে দিয়েছি প্রশস্ত পথ, যাতে তারা গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারে।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩১] ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেন, আর যমীন অস্থির হলো, তখন পাহাড় দিয়ে সেটাকে সুস্থির করলেন। (৪৬) সেটা অনুযায়ী আল্লাহ তা'আলা যমীন সৃষ্টি ও তা বসবাস উপযোগী করেছেন চারদিনে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿ وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِيَ مِن فَوْقِهَا وَبَرَكَ فِيهَا وَقَدَّرَ فِيهَا أَقْوَاتَهَا فِي أَرْبَعَةِ أَيَّامٍ ﴾ [فصلت: ١٠] "আর তিনি স্থাপন করেছেন অটল পর্বতমালা ভূপৃষ্ঠে এবং তাতে দিয়েছেন বরকত এবং চার দিনের মধ্যে এতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন।” [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ১০]
তৃতীয় স্তর: আর তা হচ্ছে সাত আসমান সৃষ্টি, যা তিনি ধোঁয়া থেকে সৃষ্টি করেছেন। সে ধোঁয়া হচ্ছে পানির বাষ্প। এ হচ্ছে মোট ছয় দিন। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿ فَقَضَهُنَّ سَبْعَ سَمَوَاتٍ فِي يَوْمَيْنِ وَأَوْحَى فِي كُلِّ سَمَاءٍ أَمْرَهَا ﴾ [فصلت: ١٢] "অতঃপর তিনি সেগুলোকে সাত আসমানে পরিণত করলেন দু'দিনে এবং প্রত্যেক আসমানে তার নির্দেশ ওহী করে পাঠালেন।” [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ১২]
ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেন, তারপর তিনি পানির বাষ্পকে উপরে উঠালেন, আর এতে করে আসমানসমূহ আলাদা হলো।
তারপর তিনি সকল আসমানে তাঁর ফয়সালা জারী করলেন, তারকাসমূহকে নিকটতম আসমানে রাখলেন তার সৌন্দর্য্যের জন্য, তাকে হিফাযতের জন্য।
৮- আসমান ও যমীন সৃষ্টির পরে আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مَا مِن شَفِيعٍ إِلَّا مِنْ بَعْدِ إِذْنِهِ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ ﴾ [يونس: ٣] "তোমাদের রব তো আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন। তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন। তাঁর অনুমতি লাভ না করে সুপারিশ করার কেউ নেই। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব; কাজেই তোমরা তাঁরই ইবাদাত কর। তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?" [সূরা ইউনুস, আয়াত: ০৩] তিনি আরও বলেন, اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّمَوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ يَجْرِى لِأَجَلٍ مُّسَمًّى يُدَبِّرُ الْأَمْرَ يُفَصِّلُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُم بِلِقَاءِ رَبِّكُمْ تُوقِنُونَ ﴾ [الرعد: ٢] "আল্লাহ্, যিনি আসমানসমূহ উপরে স্থাপন করেছেন খুঁটি ছাড়া, তোমরা তা দেখছ। তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন এবং সূর্য ও চাঁদকে নিয়মাধীন করেছেন; প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলবে। তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন, আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা তোমাদের রবের সঙ্গে সাক্ষাত সম্পর্কে নিশ্চিত বিশ্বাস করতে পার." [সূরা আর-রা'দ, আয়াত: ০২]
ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেন, তিনি সবকিছু সৃষ্টির আগেও 'আরশের উপর ছিলেন (৪৭), এর দ্বারা বুঝা গেল, আল্লাহ তা'আলা আসman ও যমীন সৃষ্টির আগেও তাঁর 'আরশের উপর ছিলেন, যখন তাঁর 'আরশ পানির উপর ছিল। যখন তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেন তখনও তিনি সৃষ্টির উপর ছিলেন, তারপর আসমান ও যমীন সৃষ্টির পরে আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর আরোহন করেন।
৯- আল্লাহ তা'আলার 'আরশ আল্লাহ তা'আলার সবচেয়ে বড় সৃষ্টি: 'আরশ অনেক বড়, অনেক সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ সৃষ্টি। আল্লাহ তা'আলা সেটার সম্মান বৃদ্ধি করেছেন সেটার উপর উঠার সাথে নিজেকে বিশেষিত করে। আর এ উপরে উঠার ধরন আমরা জানি না। যেভাবে সেটা তাঁর মর্যাদা ও সম্মানের সাথে উপযোগী সেভাবেই তিনি তার উপর উঠেছেন।
কুরআনে কারীমের একুশটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি তাঁর 'আরশের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ ﴾ [النمل: ٢٦] “আল্লাহ, তিনি ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই, তিনি মহা 'আরশের রব।” [সূরা আন-নামল, আয়াত: ২৬] তিনি আরও বলেন, ﴿فَتَعَالَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ ﴾ [المؤمنون: ١١٦] “সুতরাং আল্লাহ্ মহিমান্বিত, প্রকৃত মালিক, তিনি ছাড়া কোনো হক্ক ইলাহ্ নেই; তিনি সম্মানিত 'আরশের রব।” [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ১১৬] তিনি আরও বলেন, ﴿ذُو الْعَرْشِ الْمَجِيدُ فَعَّالٌ لِمَا يُرِيدُ ﴾ [البروج: ١٥، ١٦] "আরশের অধিকারী ও সম্মানিত। তিনি যা ইচ্ছে তা-ই করেন.” [সূরা আল-বুরূজ: ১৫-১৬]
এসব আয়াতে যদি "আল-আযীমে, আল-কারীমে, আল-মাজীদে” পড়া হয়, তবে সেটা 'আরশের গুণবাচক। আর যদি "আল-আযীমু, আল-কারীমু, আল-মাজীদু" পড়া হয়, তবে সেটা আল্লাহর গুণবাচক।
অনুরূপ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিপদের সময় যে দো'আ পড়তেন, তা হচ্ছে, لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ العَظِيمُ الْحَلِيمُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ العَرْشِ العَظِيمِ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ السَّمَوَاتِ وَرَبُّ الْأَرْضِ، وَرَبُّ العَرْشِ الكَرِيمِ» "আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি অতীব মহান ও অত্যন্ত সহিষ্ণু; আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি মহান 'আরশের রব, আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি আসমানসমূহের রব, যমীনের রব ও সম্মানিত 'আরশের রব।”(৪৮)
১০-আল্লাহ তা'আলার 'আরশ সবচেয়ে প্রশস্ত সৃষ্টি, তা আসমান ও যমীন থেকে বহু বহু গুণ প্রশস্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'আরশ ও কুরসী সম্পর্কে বলেন, مَا السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ مَعَ الْكُرْسِيِّ إِلَّا كَحَلْقَةٍ مُلْقَاةٍ بِأَرْضِ فَلَاةٍ وَفَضْلُ الْعَرْشِ عَلَى الْكُرْسِيِّ كَفَضْلِ الْفَلَاةِ عَلَى الحلقة "সাত আসমান তো কুরসীর মাঝে কেবল বিস্তীর্ণ ভূমিতে পড়ে থাকা একটি রিং এর মতো, আর কুরসীর তুলনায় 'আরশের বাড়তি হচ্ছে সে কোনো বিস্তীর্ণ ভূমিতে পড়ে থাকা রিং এর ন্যায়।”(৪৯)
টিকাঃ
২৭. ইবন কুতাইবাহ, আল-ইখতিলাফু ফিল লাফযি পৃ. ২৪০।
২৮. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১/১১-১২)
২৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৩৯৮।
৩০. দেখুন: শারহুত ত্বাহাওয়িয়্যাহ, পৃ. ৩১০-৩১১।
৩১. ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১৩/৪০৫)।
৩২. সুনানে তিরমিয়ী, হাদীস নং ৩১০৯।
৩৩. সহীহ, দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল বিশর আল-মারিসী, ৪৪৯; ইবন খুযাইমাহ, আত-তাওহীদ ১০৯; ইবন আবী শাইবাহ, আল-'আরশ ৩৭৭; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক (২/৩৭৮) এবং সহীহ বলেছেন, আর যাহাবী একমত হয়েছেন।
৩৪. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৭২৭; ত্বাবারানী, আল-আওসাত্ব ১৭৩০; ইবন আসাকির, তারীখে দিমাশক (১২/৪৬২); ইবন কাসীর, আত-তাফসীর (৪/৪১৪); ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (৮/৬৬৫)।
৩৫. হাসান, বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদীস নং ১৭৬; তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫০১; আবু দাউদ, হাদীস নং ৫০৬৭; ইবনুস সুন্নী, আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লাইলাহ, হাদীস নং ১৩৮; ইবন আবী শাইবাহ, আল-আরশ, হাদীস নং ৩৬১; নাওয়াওয়ী, আল-আযকার, হাদীস নং ৭৪; ইবন হাজার, নাতাইজুল আফকার।
৩৬. আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ, ৮২; বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত ৫০৫; সুয়ূত্বী, আল-হাবায়িক ৪৯; ইবন আবী শাইবাহ, আল-'আরশ, ৩৭১।
৩৭. নাক্কছু তা'সীসিল জাহমিয়া (১/৫৭৫)।
৩৮. ইবন আবী যামানীন, উসুলুস সুন্নাহ পৃ. ২৮২।
৩৯. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৭২৬।
৪০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৭৯০।
৪১. মাজমূ'উল ফাতাওয়া (৫/১৫১)।
৪২. সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩৬১।
৪৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩১৯১।
৪৪. ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমু'উল ফাতাওয়া (১৮/২১৩); ইবনুল কাইয়্যেম, মুখতাসারুস সাওয়া'য়িক (২/৩২৩), ইজতিমা'উল জুয়ূশ ৯৯; ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১/৯); ইবন আবিল ইয্য আল-হানাফী, শারহুল আকীদাতুত তাহাওয়ীয়্যাহ, পৃ. ২৯৫; ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (৬/২৮৯)।
৪৫. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২১৫৫।
৪৬. সহীহ সনদে, ইবন জারীর, তাফসীর ২৯/১৪; আল-আজুররী, আশ-শরী'আহ ১৭৮; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক (২/৪৯৮); বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত: ১২৭; ইবন আবী শাইবাহ, আল-আরশ ৩০৫; হাকিম বলেন, বর্ণনাটি সহীহ, যাহাবী তার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।
৪৭. দারেমী, আর-রাদ্দু 'আলাল জাহমিয়্যাহ ১৫; তাবারী, আত-তাফসীর (২৯/১৭); আল-আজুররী, আশ-শরী'আহ ১৭৯; লালেকাঈ, শারহু উসুলি ই'তিক্বাদি আহলিস সুন্নাহ (৩/৩৯৬); ইবন আবী শাইবাহ, আল-আরশ ৩০৭।
৪৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৩৪৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৩০।
৪৯. হাসান হাদীস, ইবন আবী শাইবাহ, হাদীস নং ৫৮; ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ, আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ, হাদীস নং ২২; ইবন হিব্বান, আস-সহীহ, হাদীস নং ৩৬১; আবু নু'আইম, আল-হিলইয়া (১/১৬৬); বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত, হাদীস নং ৮৬২; আর শাইখ আলবানী সেটাকে সহীহ বলেছেন, আস-সিলসিলাহ আস-সহীহাহ, নং ১০৯।
📄 আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের বাইরে অবস্থানকারীদের ‘আরশের ব্যাপারে অভিমত
১১- আল্লাহ তা'আলা 'আরশকে তাঁর নাম রহমানের সাথে সম্পৃক্ত করে বর্ণনা করেছেন: আল্লাহ বলেন, ﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ﴾ [طه: ٥] "দয়াময় (আল্লাহ) 'আরশের উপর উঠেছেন." [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] তিনি আরও বলেন, ﴿الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَنُ فَسْأَلْ بِهِ خَبِيرًا ﴾ [الفرقان: ٥٩] "তিনি আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু'য়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেন; তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন। তিনিই 'রহমান', সুতরাং তাঁর সম্বন্ধে যে অবহিত তাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।” [সূরা আল-ফুরক্বান, আয়াত: ৫৯]
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, রহমান নামটিকে 'আরশের সাথে সম্পৃক্ত করার হিকমত হচ্ছে, মহান আল্লাহ আমাদেরকে জানাচ্ছেন যে, তিনি সবচেয়ে প্রশস্ত সৃষ্টির উপর উঠেছেন, সবচেয়ে বড় গুণ নিয়ে। কারণ, 'আরশ সকল সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে আছে, সবকিছুর জন্য তা প্রশস্ত। আর সৃষ্টির জন্য রহমতও তাদের সবার জন্য প্রশস্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, ﴿ وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ ﴾ [الأعراف: ١٥٦] "আর আমার রহমত সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে." [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬] (৫০)
১২- মহান আল্লাহ 'আরশের উপর লিখেছেন, তাঁর রহমত তাঁর ক্রোধের ওপর প্রাধান্য পাবে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنَّ اللَّهَ لَمَّا قَضَى الخَلْقَ ، كَتَبَ عِنْدَهُ فَوْقَ عَرْشِهِ : إِنَّ رَحْمَتِي سَبَقَتْ غَضَبِي "যখন আল্লাহ সৃষ্টিকর্ম সম্পন্ন করলেন, তখন তাঁর কাছে তাঁর 'আরশের উপর লিখে নিয়েছেন, 'আমার রহমত আমার ক্রোধের ওপর প্রাধান্য পাবে।”(৫১)
১৩- 'রেহেম' 'আরশের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নিয়েছে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, الرَّحِمُ مُعَلَّقَةٌ بِالْعَرْشِ تَقُولُ مَنْ وَصَلَنِي وَصَلَهُ اللَّهُ، وَمَنْ قَطَعَنِي قَطَعَهُ اللَّهُ "রেহেম 'আরশের সাথে লটকে আছে, সে বলে, যে আমার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করবে আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করবেন, আর যে আমার সাথে সম্পর্কচ্যুতি ঘটাবে আল্লাহ তার সাথে সম্পর্কচ্যুতি ঘটাবেন।” (৫২)
১৪- 'আরশ সবচেয়ে ভারী জিনিস (৫৩): হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রী জুওয়াইরিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহার কাছ থেকে ফজরের সালাতের পর বের হলেন, তখন তিনি তাঁর সালাতের স্থানে বসা ছিলেন, তারপর চাশতের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে দেখেন এখনও জুয়াইরিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহা সে বসায় আছেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কি এখনো সে বসায় রয়েছ, যাতে আমি তোমাকে ছেড়ে গিয়েছিলাম? তিনি উত্তরে বললেন, হ্যাঁ। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, لَقَدْ قُلْتُ بَعْدَكِ أَرْبَعَ كَلِمَاتٍ، ثَلَاثَ مَرَّاتٍ، لَوْ وُزِنَتْ بِمَا قُلْتِ مُنْذُ الْيَوْمِ لَوَزَنَتُهُنَّ : سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، عَدَدَ خَلْقِهِ وَرِضَا نَفْسِهِ وَزِنَةَ عَرْشِهِ وَمِدَادَ كَلِمَاتِهِ» "আমি তোমার কাছ থেকে যাওয়ার পরে তিনটি বাক্য বলেছি, যা ওজন করলে তুমি দিনের এতক্ষণ সময় ধরে যা বলেছ তা থেকে বেশি ভারী হবে, সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহী আদাদা খালকিহী, ওয়া রিদা নাফসিহী, ওয়া যিনাতা আরশিহী ওয়া মিদাদা কালিমাতিহী।”(৫৪)
১৫- 'আরশ লাল রূবী পাথর (ইয়াকৃত): ইমাম যাহাবী বলেন, ما الظَّن بالعرش الْعَظِيمِ الَّذِي اتَّخَذَهُ العلي العظيم لنفسه في ارتفاعه وسعته وقوائمه وماهيته وحملته والكروبيين الحافين من حوله وحسنه ورونقه وقيمته فقد ورد أنه من ياقوته حمراء "তোমার কী ধারণা সে 'আরশের ব্যাপারে, যা সর্বোচ্চ মহান সত্তা নিজের জন্য গ্রহণ করেছেন, তার উচ্চতা, প্রশস্ততা, পায়া, গঠনশৈলী, বহনকারী, কুরূবীগণ, যারা সেটাকে চারপাশে ঘিরে আছে, তার সৌন্দর্য ও তার মূল্য সম্পর্কে? যেখানে বলা হচ্ছে যে, লাল রুবী পাথরের তৈরি।”(৫৫)
ইমাম ইবন কাসীর বলেন, وَجَاءَ عَنْ بَعْضِ السَّلَفِ أَنَّ بُعْدَ مَا بَيْنَ الْعَرْشِ إِلَى الْأَرْضِ مَسِيرَةَ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ، وَبُعْدَ مَا بَيْنَ قُطْرَيْهِ مَسِيرَةً خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ، وَهُوَ مِنْ يَاقُوتَةٍ حَمْرَاءَ. "কোনো কোনো সালাফ বলেন, 'আরশের দু'দিকের দূরত্ব পঞ্চাশ হাজার বছরের দূরত্বের মতো, আর সেটা লাল রূবী পাথরের তৈরি।”(৫৬)
১৬- 'আরশ সকল সৃষ্টির উপর গম্বুজের মতো: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, إِنَّ عَرْشَهُ عَلَى سَمَاوَاتِهِ هَكَذَا» وَقَالَ بِأَصَابِعِهِ مِثْلَ الْقُبَّةِ عَلَيْهِ "নিশ্চয় তাঁর 'আরশ তাঁর আসমানসমূহের উপর এরকম, তারপর তা তিনি তার আঙ্গুলগুলো দিয়ে দেখালেন যে, তা এগুলোর উপর গম্বুজের মতো।” (৫৭)
অপর বর্ণনায় এসেছে, إِنَّ عَرْشَهُ عَلَى سَمَاوَاتِهِ وَأَرَضِيهِ فَكَذَا مِثْلُ الْقُبَّةِ» "নিশ্চয় আল্লাহর 'আরশ তাঁর আসমান ও যমীনের উপর এরকম, গম্বুজের মতো।”(৫৮)
ইমাম ইবন কাসীর রাহিমাহুল্লাহ 'আরশের বর্ণনায় বলেন, 'তা এমন এক খাট, যাতে পায়া রয়েছে, যা ফিরিশতারা বহন করে, আর তা জগতের উপর গম্বুজের মতো, যা সকল সৃষ্টির উপর ছাদ। (৫৯)
১৭- 'আরশের রয়েছে ছায়া: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, الْمُتَحَابُّونَ فِي اللَّهِ عَلَى مَنَابِرَ مِنْ نُورٍ فِي ظِلَّ الْعَرْشِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ». "যারা আল্লাহর জন্য পরস্পরকে ভালোবাসবে, তারা নূরের মিম্বরের উপর আল্লাহর 'আরশের ছায়ায় অবস্থান করবে, যে দিন তার ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না।”(৬০)
অপর বর্ণনায় এসেছে, أَيْنَ الْمُتَحَابُّونَ بِجَلَالِي الْيَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِي ظِلِّي يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلِّي» "আমার সম্মান ও আনুগত্যের কারণে যারা পরস্পরকে ভালোবেসেছে, (দুনিয়ার কারণে নয়) তারা কোথায়? আজ আমি তাদেরকে আমার 'আরশের ছায়ায় ছায়া দান করব, যেদিন আমার ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না।” (৬১)
অপর হাদীসে এসেছে, سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلَّهِ، يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ "সাত শ্রেণির লোককে আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের ছায়ায় রাখবেন, যেদিন তার ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না।” (৬২)
অপর হাদীসে এসেছে, مَنْ أَنْظَرَ مُعْسِرًا، أَوْ وَضَعَ لَهُ ، أَظَلَّهُ اللَّهُ يَوْمَ القِيَامَةِ تَحْتَ ظِلَّ عَرْشِهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ "যে কেউ কোনো অভাবীকে ঋণ আদায়ে সময় দিবে অথবা তার থেকে তা বাদ দিয়ে দিবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাঁকে তাঁর 'আরশের নিচে ছায়ায় রাখবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না।” (৬৩)
১৮-'আরশ কারও কারও সাক্ষাতের জন্য খুশী হয়ে কেঁপে উঠেছিল: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "সা'দ ইবন মু'আযের মৃত্যুতে রহমানের 'আরশ কেঁপে উঠেছিল।”(৬৪) অপর বর্ণনায়, اهْتَزَّ عَرْشُ الرَّحْمَنِ لِمَوْتِ سَعْدِ بْنِ مُعَادٍ لَقَدِ اهْتَزَّ الْعَرْشُ حُبِّ لِقَاءِ اللَّهِ سَعْدًا. "আরশ কেঁপে উঠেছিল আল্লাহ কর্তৃক সা'দের ভালোবাসার কারণে।”(৬৫) অপর বর্ণনায়, لَمَّا تُوُفِّيَ سَعْدُ بْنُ مُعَادٍ صَاحَتْ أُمُّهُ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : أَلَا يَرْقَأُ دَمْعُكِ، وَيَذْهَبُ حُزْنُكِ، فَإِنَّ ابْنَكِ أَوَّلُ مَنْ ضَحِكَ اللَّهُ لَهُ، وَاهْتَزَّ لَهُ الْعَرْشُ» "যখন সা'দ ইবন মু'আয রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর মৃত্যু হলো, তখন তার মা চিৎকার করে কাঁদতে লাগলে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, "তোমার অশ্রু কি সম্বরণ করবে না, তোমার পেরেশানী কি চলে যাবে না, তোমার সন্তান হচ্ছে প্রথম ব্যক্তি যার জন্য আল্লাহ হাঁসলেন, আর তার 'আরশ খুশিতে কেঁপে উঠেছে।”(৬৬)
১৯- 'আরশের রয়েছে ভারজনিত শব্দ: কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা বলেন, تَكَادُ السَّمَوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِن فَوْقِهِنَّ وَالْمَلَائِكَةُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِمَن فِي الْأَرْضِ) [الشورى: ٥] "আসমানসমূহ উপর থেকে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়, আর ফিরিশতাগণ তাদের রবের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং যমীনে যারা আছে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে.” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ০৫]
ইমাম ত্বাবারী, ইবন কাসীর ও কুরতুবী ইবন 'আব্বাস, দাহহাক, ক্বাতাদাহ, সুদ্দী ও কা'ব আল-আহবার থেকে বর্ণনা করেন, এ চূর্ণ হওয়ার উপক্রম ও ফেটে যেতে চাওয়া কেবল আল্লাহর সম্মান ও মর্যাদার কারণেই। ক্বাতাদাহ বলেন, এ ফেটে যাওয়ার উপক্রম হওয়া আল্লাহ তা'আলার মাহাত্ম্য ও দাপটের কারণেই।(৬৭)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, سَلُوا اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ الْفِرْدَوْسَ؛ فَإِنَّهَا سُرَّةُ الْجُنَّةِ، وَإِنَّ أَهْلَ الْفِرْدَوْسِ يَسْمَعُونَ أَطِيطَ الْعَرْشِ» "তোমরা আল্লাহর কাছে ফিরদাউস চাও; কেননা তা জান্নাতের সর্বোত্তম স্থান, আর ফিরদাউসের অধিবাসীরা 'আরশের 'আত্মীত্ব' বা ভারের শব্দ শুনতে পাবে।”(৬৮)
অপর হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أَطَّتِ السَّمَاءُ، وَحُقَّ لَهَا أَنْ تَشِطَّ مَا فِيهَا مَوْضِعُ أَرْبَعِ أَصَابِعَ إِلَّا وَمَلَكٌ وَاضِعٌ جَبْهَتَهُ سَاجِدًا اللَّهِ "আসমান ভারজনিত শব্দ করছে, আর এ ভারজনিত শব্দ করা তার জন্য যথার্থ; কারণ এর এমন চার আঙ্গুল স্থান নেই যাতে একজন ফিরিশতা তার কপাল রাখা অবস্থায় নেই; আল্লাহর জন্য সাজদায় রত রয়েছে।”(৬৯)
২০-ফিরিশতাগণ 'আরশের চারপাশে তাওয়াফ করেন: ইমাম বাইহাক্বী বলেন, তাফসীরবিদগণের মত হচ্ছে, 'আরশ হচ্ছে খাট, আর তা একটি বস্তু যা আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, তাঁর ফিরিশতাদেরকে বহন করার নির্দেশ দিয়েছেন। সেটাকে সম্মান করা ও তার চার পাশে তাওয়াফের মাধ্যমে ইবাদাত করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন তিনি যমীনে একটি ঘর নির্মাণ করেছেন, বনী আদমকে সেটার তাওয়াফের নির্দেশ দিয়েছেন এবং সেটার দিকে ফিরে সালাত আদায় করার আদেশ করেছেন। তাদের মতের পক্ষে কুরআনের বহু আয়াত, হাদীসের বহু ভাষ্য ও বহু আসার সেটার প্রতি প্রকাশ্য প্রমাণ দিচ্ছে।(৭০)
২১- যিকিরকারীদের যিকির 'আরশের চারপাশে গুঞ্জন তৈরি করে: হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, إِنَّ مِمَّا تَذْكُرُونَ مِنْ جَلَالِ اللَّهِ التَّسْبِيحَ، وَالتَّهْلِيلَ، وَالتَّحْمِيدَ يَنْعَطِفْنَ حَوْلَ الْعَرْشِ، هُنَّ دَوِيٌّ كَدَوِيُّ النَّحْلِ، تُذَكِّرُ بِصَاحِبِهَا، أَمَا يُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَوْ لَا يَزَالَ لَهُ مَنْ يُذَكِّرُ بِهِ؟» "তোমরা আল্লাহর সম্মান ও মর্যাদা বর্ণনা করে যেসব তাসবীহ, তাহলীল, তাহমীদ করো সেগুলো 'আরশের চারপাশে ঘুরতে থাকে, মৌমাছির গুঞ্জনের মতো তাদের গুঞ্জন শোনা যায়; এগুলোর যিকিরকারীর কথা স্মরণ করতে থাকে, তোমাদের কেউ কি চায় না তার জন্য হবে অথবা সর্বদা তার জন্য থাকবে এমন কেউ যে তার কথা (সেখানে) স্মরণ করবে?”(৭১)
কা'ব আল-আহবার বলেন, উত্তম কালেমা 'আরশের চারপাশে মৌমাছির গুঞ্জনের মতো গুঞ্জরিত হতে থাকে, যা তার যিকিরকারীর কথা স্মরণ করতে থাকে। (৭২)
অপর বর্ণনায় কা'ব বলেন, "সুবহানাল্লাহ, আল-হামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার এগুলোর রয়েছে গুঞ্জন 'আরশের চারপাশে, যা মৌমাছির গুঞ্জনের ন্যায়, যারা এগুলোর আমল করেছে তাদের কথা স্মরণ করে।” (৭৩)
২২-'আরশ হচ্ছে আসমান ও যমীনের উপরে: 'আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, مَا بَيْنَ السَّمَاءِ الدُّنْيَا وَالَّتِي تَلِيهَا مَسِيرَةُ خَمْسِمِائَةِ عَامٍ، وَبَيْنَ كُلِّ سَمَاءَ بْنِ مَسِيرَةُ خَمْسِمِائَةِ عَامٍ، وَبَيْنَ السَّمَاءِ السَّابِعَةِ وَبَيْنَ الْكُرْسِيِّ خَمْسُمِائَةِ عَامٍ، وَبَيْنَ الْكُرْسِيُّ إِلَى الْمَاءِ خَمْسُمِائَةِ عَامٍ، وَالْعَرْشُ عَلَى الْمَاءِ، وَاللَّهُ تَعَالَى فَوْقَ الْعَرْشِ، وَهُوَ يَعْلَمُ مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ» "নিকটতম আসমান ও যা তার কাছে তার মধ্যকার দূরত্ব পাঁচশত বছর, প্রতি আসমানের দূরত্ব পাঁচশত বছর, সপ্তম আসমান ও কুরসীর দূরত্ব পাঁচশত বছর, কুরসী থেকে পানির দূরত্ব পাঁচশত বছর, আর 'আরশ পানির উপর, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর, তবে তিনি জানেন তোমাদের অবস্থা, যার উপর তোমরা আছ।” (৭৪)
২৩-আরশ জান্নাতের উপর: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, إِنَّ فِي الْجَنَّةِ مِائَةَ دَرَجَةٍ، أَعَدَّهَا اللَّهُ لِلْمُجَاهِدِينَ فِي سَبِيلِهِ، كُلُّ دَرَجَتَيْنِ مَا بَيْنَهُمَا كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ، فَإِذَا سَأَلْتُمُ اللَّهَ فَسَلُوهُ الفِرْدَوْسَ، فَإِنَّهُ أَوْسَطُ الجَنَّةِ، وَأَعْلَى الْجَنَّةِ، وَفَوْقَهُ عَرْشُ الرَّحْمَنِ، وَمِنْهُ تَفَجَّرُ أَنْهَارُ الْجَنَّةِ "জান্নাতে রয়েছে একশটি স্তর, যা আল্লাহ তা'আলা তাঁর পথের মুজাহিদদের জন্য তৈরি করে রেখেছেন। প্রতি দু'টি দরজার মধ্যে দূরত্ব, আসমান ও যমীনের মধ্যকার দূরত্বের মত, সুতরাং যখন তোমরা আল্লাহর কাছে চাইবে তখন তাঁর কাছে ফিরদাউস চাইবে, কারণ তা মধ্যম বা সর্বোত্তম জান্নাত, সর্বোচ্চ জান্নাত, আর তার উপরে রয়েছে রহমানের 'আরশ, তা থেকেই জান্নাতের নালাসমূহ প্রবাহিত।”(৭৫)
ক্বাতাদাহ বলেন, ফিরদাউস হচ্ছে, জান্নাতের উঁচু ভূমি (মালভূমি), মধ্যম ভূমি, সর্বোচ্চ, সর্বोत्কৃষ্ট ও সবচেয়ে উপরের স্থান। সুতরাং জান্নাত, সে তো গম্বুজের মতো; কারণ তার মধ্যমনি হচ্ছে উঁচু অংশ। (৭৬)
২৪- 'আরশকে আল্লাহ তা'আলা পানির উপর সৃষ্টি করেছেন: আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ﴾ [هود: ٧] "আর তিনিই আসমানসমূহ ও যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেন, আর তাঁর 'আরশ ছিল পানির উপর।” [সূরা হূদ, আয়াত: ০৭]
মুজাহিদ বলেন, "আর তার 'আরশ পানির উপর ছিল" অর্থাৎ আসমান ও যমীন সৃষ্টির আগে তাঁর 'আরশ পানির উপরে ছিল। (৭৭)
অনুরূপ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, يَدُ اللَّهِ مَلْأَى لَا تَغِيضُهَا نَفَقَةٌ سَحَّاءُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ ، وَقَالَ : أَرَأَيْتُمْ مَا أَنْفَقَ مُنْذُ خَلَقَ السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ، فَإِنَّهُ لَمْ يَغِضُ مَا فِي يَدِهِ، وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى المَاءِ، وَبِيَدِهِ المِيزَانُ يَخْفِضُ وَيَرْفَعُ» "আল্লাহ তা'আলার হাত পরিপূর্ণ, রাত-দিন যতই খরচ করুক তাতে কম পড়ে না অথবা খরচ তাতে ঘাটতি ঘটায় না। দিন-রাত তিনি বদান্যতার সাথে প্রদান করেন। আরও বলেন, তোমরা আমাকে জানাও, তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টির পর থেকে যা খরচ করেছেন তা তার হাতে যা আছে তাতে সামান্যতমও ঘাটতি ঘটায়নি। আর তার 'আরশ ছিল পানির উপর, অপর হাতে মীযান, সেটাকে (বান্দার আমল নেক ও বদ অনুযায়ী) তিনি নীচু করেন ও উপরে করেন।” (৭৮)
হাফেয ইবন হাজার আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এখানে পানি দ্বারা সমুদ্রের পানি বুঝানো হয়নি। কারণ সমুদ্রের পানি তো আসমান ও যমীন সৃষ্টির পরে অস্তিত্বে আসলো। বরং এটা ভিন্ন প্রকার পানি যা 'আরশের নিচে যেভাবে আল্লাহ চেয়েছেন।' (৭১)
ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমাকে ﴾وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ﴿ এ আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, এ পানি কিসের উপর ছিল? তিনি বলেন, তা ছিল বাতাসের পিঠের উপর। (৮০)
সুলাইমান আত-তাইমী বলেন, "যদি আমাকে প্রশ্ন করা হয়, আল্লাহ কোথায়? তবে জবাবে বলবো, উপরে। আর যদি আমাকে প্রশ্ন করা হয়, আসমান সৃষ্টির আগে আল্লাহর 'আরশ কোথায় ছিল? তাহলে অবশ্যই বলবো, পানির উপর। আর যদি বলে, পানি সৃষ্টির আগে তাঁর 'আরশ কোথায় ছিল? তবে অবশ্যই বলবো, আমি জানি না।”(৮১)
যদি প্রশ্ন করা হয়, وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ كَ الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْش এর মাঝে সামঞ্জস্য কীভাবে হবে? তখন উত্তর হবে, আসমান ও যমীন সৃষ্টির আগে 'আরশ পানির উপরে থাকা অবস্থায় বহন করা হয়েছিল। আর আসমান ও যমীন সৃষ্টির পরে আল্লাহ তা'আলা ফিরিশতাদেরকে পানির উপরে থেকে 'আরশ বহন করার নির্দেশ দিলেন।
২৫-আল্লাহ তা'আলা তিনি আসমান ও যমীনসমূহের উপর, জান্নাতের উপর এবং 'আরশের উপর: হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, هَلْ تَدْرُونَ كَمْ بُعْدُ مَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ ؟» قَالُوا: لَا ، وَالله مَا نَدْرِي، قَالَ: «فَإِنَّ بُعْدَ مَا بَيْنَهُمَا إِمَّا وَاحِدَةٌ وَإِمَّا اثْنَتَانِ، أَوْ ثَلَاثُ وَسَبْعُونَ سَنَةٌ، وَالسَّمَاءُ الَّتِي فَوْقَهَا كَذَلِكَ، حَتَّى عَدَّدَهُنَّ سَبْعَ سَمَوَاتٍ كَذَلِكَ، ثُمَّ قَالَ: فَوْقَ السَّمَاءِ السَّابِعَةِ بَحْرٌ بَيْنَ أَعْلَاهُ وَأَسْفَلِهِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ إِلَى السَّمَاءِ، وَفَوْقَ ذَلِكَ ثَمَانِيَةُ أَوْعَالٍ بَيْنَ أَظْلَافِهِنَّ وَرُكَبِهِنَّ مِثْلُ مَا بَيْنَ سَمَاءٍ إِلَى سَمَاءٍ، ثُمَّ فَوْقَ ظُهُورِهِنَّ العَرْشُ، بَيْنَ أَسْفَلِهِ وَأَعْلَاهُ مِثْلُ مَا بَيْنَ سَمَاءٍ إِلَى سَمَاءٍ، وَاللَّهُ فَوْقَ ذَلِكَ» "তোমরা কি জান, আসমান ও যমীনের দূরত্ব কত? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, না। আল্লাহর শপথ আমরা জানি না। রাসূল বললেন, এ দুয়ের মধ্যে দূরত্ব হয় এক, না হয় দুই অথবা তিন ও সত্তর বছর, আর তার উপরে থাকা আসমানও অনুরূপ দূরত্বে, এভাবে রাসূল সাত আসমান গুনে বর্ণনা করলেন। তারপর বললেন, সাত আসমানের পরে একটি সমুদ্র রয়েছে যার উপর ও নিচের দূরত্ব এক আসমান থেকে আরেক আসমানের দূরত্ব। তার উপর রয়েছে আটটি বন্য ছাগল, যাদের খুর ও হাঁটুর মাঝখানের দূরত্ব এক আসমান ও অপর আসমানের মাঝখানের দূরত্বের মতো। তারপর এদের পিঠে রয়েছে 'আরশ; যার উপর ও নিচের মধ্যকার দূরত্ব এক আসমান ও আরেক আসমানের মাঝখানের দূরত্বের মতো। আর আল্লাহ এর উপর.” (৮২)
আসমান থেকে আসমানের দূরত্ব এ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, ৭১ বছর অথচ অপর হাদীসে পাঁচশত বছর, এর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান হচ্ছে, এটি সফর কীভাবে করা হচ্ছে সেটার উপর নির্ধারিত হবে। যদি উটে সফর করে তবে ৫০০ বছর আর যদি দ্রুতগামী ঘোড়ায় সফর হয় তবে তা হয় যাবে ৭১ বছর। (৮৩)
২৬-'আরশ আল্লাহর সবচেয়ে নিকটতম সৃষ্টি: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, وَلَكِنْ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى اسْمُهُ، إِذَا قَضَى أَمْرًا سَبَّحَ حَمَلَةُ الْعَرْشِ ، ثُمَّ سَبَّحَ أَهْلُ السَّمَاءِ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، حَتَّى يَبْلُغَ التَّسْبِيحُ أَهْلَ هَذِهِ السَّمَاءِ الدُّنْيَا ثُمَّ قَالَ الَّذِينَ يَلُونَ حَمَلَةَ الْعَرْشِ لِحَمَلَةِ الْعَرْشِ : مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ؟ فَيُخْبِرُونَهُمْ مَاذَا قَالَ : قَالَ فَيَسْتَخْبِرُ بَعْضُ أَهْلِ السَّمَاوَاتِ بَعْضًا، حَتَّى يَبْلُغَ الْخُبَرُ هَذِهِ السَّمَاءَ الدُّنْيَا، فَتَخْطَفُ الْجِنُّ السَّمْعَ فَيَقْذِفُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ، وَيُرْمَوْنَ بِهِ ، فَمَا جَاءُوا بِهِ عَلَى وَجْهِهِ فَهُوَ حَقٌّ، وَلَكِنَّهُمْ يَقْرِفُونَ فِيهِ وَيَزِيدُونَ» "কিন্তু আমাদের রব তাঁর সত্তা বরকতময়, তাঁর নাম অনেক সুউচ্চ, তিনি যখন কোনো নির্দেশ জারী করেন, তখন 'আরশ বহনকারীগণ তাসবীহ পাঠ করেন, তারপর যে আসমান তাদের কাছে আছে সেখানকার অধিবাসীরা তাসবীহ পাঠ করেন, এভাবে তাসবীহের ধারা পৌঁছতে পৌঁছতে তা যমীনের নিকটতম আসমানে পৌঁছে যায়। তারপর যারা 'আরশ বহনকারীদের নিকটতম আসমানে আছে তারা 'আরশ বহনকারীদেরকে বলেন, তোমাদের রব কী বলেছেন? তখন তিনি তাদেরকে সে ব্যাপারে সংবাদ দেন। তখন আসমানবাসীরা একে অপরের নিকট সে সংবাদ আদান-প্রদান করেন, অবশেষে সে সংবাদ যমীনের নিকটতম আসমানে পৌঁছে যায়, অতঃপর জিন্নেরা সেটার শোনা অংশকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে তাদের বন্ধুদের কানে ঢেলে দেয়, আর তাদের উপর আগুন নিক্ষেপ করা হয়, অতঃপর তারা যা সঠিকভাবে চুরি করে নিয়ে আসতে পেরেছে তা সত্য হয়, কিন্তু তারা সেটাতে মিথ্যার সংমিশ্রণ ঘটায় ও বৃদ্ধি ঘটায়।”(৮৪)
হাদীস থেকে বুঝা গেল যে, 'আরশ বহনকারীরা প্রথম আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ লাভ করেন। তারপর তারা তাদের নিকটস্থ আসমানবাসীদের কাছে তা পৌঁছে দেন। এভাবে তারা আল্লাহ তা'আলার নিকটতম সৃষ্টি হওয়ার অর্থ হচ্ছে 'আরশও তাদের নিকটে, কারণ তারাই তো তা বহন করে থাকে।
এর দ্বারা আরও বুঝা গেল যে, 'আরশ আসমান ও যমীনের উপরে, জান্নাতের উপরে, আর তা সকল সৃষ্টির সর্বোচ্চে। সকল সৃষ্টি যতই উঁচু ও উপরে হোক না কেন তা 'আরশের নিচে।
২৭-কিয়ামতের দিন আসমান ও যমীন ভাঁজ করে আল্লাহ তা'আলা তাঁর হাতের উপর রাখবেন, কিন্তু 'আরশ ও কুরসী ভাঁজ করা হবে না।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَحُمِلَتِ الْأَرْضُ وَالْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةً وَاحِدَةً فَيَوْمَئِذٍ وَقَعَتِ الْوَاقِعَةُ وَانشَقَّتِ السَّمَاءُ فَهِيَ يَوْمَئِذٍ وَاهِيَةٌ وَالْمَلَكُ عَلَى أَرْجَابِهَا وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَانِيَةٌ ) [الحاقة: ١٤, ١٧] "আর পর্বতমালা সহ পৃথিবী উৎক্ষিপ্ত হবে এবং মাত্র এক ধাক্কায় ওরা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। ফলে সেদিন সংঘটিত হবে মহাঘটনা, আর আসমান বিদীর্ণ হয়ে যাবে ফলে সেদিন তা দুর্বল-বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে। আর ফিরিশতাগণ আসমানের প্রান্তদেশে থাকবে এবং সেদিন আটজন ফিরিশতা আপনার রবের 'আরশকে ধারণ করবে তাদের উপরে।” [সূরা আল- হাক্কাহ, আয়াত: ১৪-১৭]
সুতরাং পাহাড় চুর্ণ হয়ে যাবে, যমীন ফেটে চৌচীর হয়ে যাবে, কিন্তু নিঃসন্দেহে 'আরশকে তার বহনকারীরা বহন করবে, আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ، وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَاوَاتُ مَطْوِيَّتُ بِيَمِينِهِ، سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ ﴾ [الزمر : ٦٧] "আর তারা আল্লাহকে যথোচিত সম্মান করেনি অথচ কিয়ামতের দিন সমস্ত যমীন থাকবে তাঁর হাতের মুঠিতে এবং আসমানসমূহ থাকবে ভাঁজ করা অবস্থায় তাঁর ডান হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে." [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬৭]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন, ﴿يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَوَاتُ وَبَرَزُوا لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ ﴾ [ابراهيم: ٤٨] "যেদিন এ যমীন পরিবর্তিত হয়ে অন্য যমীন হবে এবং আসমানসমূহও; আর মানুষ উন্মুক্তভাবে উপস্থিত হবে এক, একচ্ছত্র অধিপতি আল্লাহর সামনে.” [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৪৮]
অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, يَقْبِضُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى الْأَرْضَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَيَطْوِي السَّمَاءَ بِيَمِينِهِ ثُمَّ يَقُولُ: أَنَا الْمُلِكُ أَيْنَ مُلُوكُ الْأَرْضِ؟ "কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাবারক ওয়া তা'আলা যমীনকে মুষ্ঠিবদ্ধ করবেন, আর আসমানকে ডান হাতে ভাঁজ করে রাখবেন, তারপর বলবেন, "আমি রাজাধিরাজ, যমীনের বাদশারা কোথায়?” (৮৫)
সুতরাং আসমান ও যমীন কিয়ামতের দিন মুষ্টিবদ্ধ করা হবে, ভাঁজ করা হবে, পরিবর্তন করা হবে, তবে 'আরশ এর ব্যতিক্রম; কারণ সেটার সাথে 'আরশের উল্লেখ আসেনি। আল্লাহ তা'আলা কেবল সেগুলোকে ভাঁজ করবেন যা তিনি ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন, তিনি এ ছয়দিন ও আসমান-যমীন সৃষ্টির আগেই তো 'আরশকে সৃষ্টি করেছিলেন।
শাইخুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আর 'আরশ, সেটা তো ছয়দিনে আল্লাহ তা'আলা যা সৃষ্টি করেছেন তার বাইরের জিনিস, সুতরাং তা ধ্বংস কিংবা চূর্ণ হবে না। বরং বিখ্যাত হাদীস সেটাই প্রমাণ করে যা কুরআন প্রমাণ করছে, তা হচ্ছে আল্লাহর 'আরশ অবশিষ্ট থাকবে। (৮৬)
২৮-'আরশ ধ্বংস হবে না, যেমনিভাবে জান্নাত ও জাহান্নাম ধ্বংস হবে না: আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي صَدَقَنَا وَعْدَهُ وَأَوْرَثَنَا الْأَرْضَ نَتَبَوَّأُ مِنَ الْجَنَّةِ حَيْثُ نَشَاءُ فَنِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ ) وَتَرَى الْمَلَائِكَةَ حَافِينَ مِنْ حَوْلِ الْعَرْشِ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَقُضِيَ بَيْنَهُم بِالْحَقِّ وَقِيلَ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ﴾ [الزمر: ٧٤، ٧٥] "আর তারা (প্রবেশ করে) বলবে, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের প্রতি তাঁর প্রতিশ্রুতি সত্য করেছেন এবং আমাদেরকে অধিকারী করেছেন এ যমীনের; আমরা জান্নাতে যেখানে ইচ্ছে বসবাসের জায়গা করে নেব।' অতএব নেক আমলকারীদের পুরস্কার কত উত্তম! আর আপনি ফিরিশতাদেরকে দেখতে পাবেন যে, তারা 'আরশের চারপাশে ঘিরে তাদের রবের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছে। আর তাদের মধ্যে বিচার করা হবে ন্যায়ের সাথে এবং বলা হবে, সকল প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহর প্রাপ্য।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৭৪-৭৫]
এ আয়াত প্রমাণ করছে যে, কিয়ামতের দিন হিসাব-নিকাশ শেষ হওয়া পর্যন্ত 'আরশ অবশিষ্ট থাকবে, এমনকি জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশের পরও।
অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِذَا سَأَلْتُمُ اللَّهَ، فَاسْأَلُوهُ الفِرْدَوْسَ، فَإِنَّهُ أَوْسَطُ الْجَنَّةِ وَأَعْلَى الْجَنَّةِ - أَرَاهُ - فَوْقَهُ عَرْشُ الرَّحْمَنِ، وَمِنْهُ تَفَجَّرُ أَنْهَارُ الجَنَّةِ "যখন তোমরা আল্লাহর কাছে চাইবে তখন তার কাছে ফিরদাউস চাইবে; কেননা তা মধ্যম বা সর্বোত্তম জান্নাত, সর্বোচ্চ জান্নাত, মনে হচ্ছে, (রাসূল বলেছেন) তার উপর রহমানের 'আরশ, আর তার থেকে জান্নাতের নহরসমূহ প্রবাহিত।”(৮৭)
সালাফে সালেহীন আল্লাহর 'আরশের ব্যাপারে যা যা বলেছেন তা কুরআন ও সহীহ হাদীসের ওপর নির্ভর করেই বলেছেন, সালাফে সালেহীন তাদের কিতাবে এসব তথ্য সবসময় উল্লেখ করতেন।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের বাইরে অবস্থানকারীদের 'আরশের ব্যাপারে অভিমত:
ক. ফালাসিফা বা দর্শনতত্ত্ববিদ ও কালামশাস্ত্রবিদদের একটি অংশের নিকট 'আরশ: তাদের কেউ কেউ 'আরশ বলতে বুঝেছেন জগত সৃষ্টির চারপাশ ঘিরে থাকা এক গোলককে। তাদের নিকট নবম গোলক বা সর্বশেষ গোলক, যাতে কোনো ফাঁক নেই বা ছিদ্র নেই। বস্তুত তাদের এ বক্তব্য কয়েকটি কারণে সম্পূর্ণ বাস্তবতা বিবর্জিত:
১- ভাষাগতভাবে কখনও 'আরশ বলে গোলক বুঝায় না। এটা কোনো দিন কোনো অভিধানবিদ বলেননি।
২- এটি তখনকার সময় তথাকথিত গ্রীকদর্শন দ্বারা প্রভাবিত ধারণাপ্রবণ ও অনুমাননির্ভর দার্শনিকরা বলেছিল। তারা মনে করেছিল সবকিছু পৃথিবী কেন্দ্রিক। সেজন্য তারা পৃথিবীর চতুর্দিকে প্রথমে সাতটি গোলক আঁকে। প্রতি গোলকে যথাক্রমে, বুধ, শুক্র, মঙ্গল, শনি ইত্যাদির বলয় নির্ধারণ করে। তখন তারা মনে করতো সূর্য বোধহয় পৃথিবীকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। তারপরে একজন এসে বলল যে, অষ্টম একটা গোলক আছে যাতে তারকারাজি গ্রথিত। তারপর আরেকটি গোলক আছে যা সবকিছুকে ঘিরে আছে, এটাকেই তারা তখন 'আরশ না কুরসী নামে অভিহিত করতো। এভাবে তখনকার দিনে তারা মানুষকে বোকা বানিয়ে নিজেরা পণ্ডিত সাজলেও বর্তমানে এসব জিনিস একেবারেই যে ফালতু তথ্য তা সাধারণ স্কুল পড়ুয়াও ভালো করে জানে। সুতরাং তাদের সেসব বক্তব্য একেবারেই ভুল। তাই কোনোভাবেই 'আরশকে নবম গোলক বলার কোনো সুযোগ নেই। যত গ্রহ-নক্ষত্র, ছায়াপথ সবই 'আরশের নিচে অতি ক্ষুদ্র জিনিস। এরকম লক্ষ লক্ষ নক্ষত্র 'আরশের তুলনায় কণা বিশেষ।
৩- তাদের এসব বক্তব্য সরাসরি কুরআন ও হাদীস বিরোধী। হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, 'আরশের পায়া আছে, তা বহন করা হয়। আর এসব গোলকের আবার পায়া আছে নাকি? তাছাড়া যেখানে কুরসীতে সকল ইউনিভার্সের জায়গা হয়, সেখানে 'আরশ কত বড় তা কি কেউ চিন্তা করে বের করতে পারবে। এসব বিষয়ে কুরআন, হাদীস ও সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীগণের ভাষ্য এতো বেশি যে, এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। অচিরেই তার কিছু বর্ণনা আমাদের কাছে আসবে -ইনশাআল্লাহ।
খ. কালামশাস্ত্রবিদদের আরেকটি অংশের নিকট 'আরশ: কালামশাস্ত্রবিদদের আরেকটি অংশ বলে থাকে, 'আরশ বলতে আল্লাহর মুলক বা রাজত্বকে বুঝানো হয়েছে। রাজত্বকে 'আরশ দ্বারা বুঝানো হয়েছে, একটি অপরটিকে আবশ্যক করার কারণে। তাই 'আরশ বলে রাজত্ব বুঝতে কোনো অসুবিধা নেই। বস্তুত এটি মারাত্মক ভুল; তার কারণ হচ্ছে,
১- কুরআন ও হাদীসে 'আরশের যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে তাতে সেটা দ্বারা রাজত্ব বুঝার কোনো সুযোগ নেই; কারণ রাজত্ব বহন করার বিষয় নয়। অথচ 'আরশ বহনকারীরা রয়েছে।
২- রাজত্ব ফিরিশতাগণ দ্বারা তাওয়াফ কীভাবে হবে?
৩- কিয়ামতের দিন রাজত্ব বহন করবে কী করে?
৪- রাজত্ব অশারীরিক বিষয়, আর 'আরশ একটি জিসম শারীরিক জিনিস, যার পা আছে, যেটা তুলে ধরে আছে ফিরিশতাগণ।
গ. কারো কারো মতে, 'আরশ আর কুরসী একই: বস্তুত এ মতটিও শুদ্ধ নয়। এটি হাসান বসরী থেকে বর্ণনা করা হয়। তবে তা শুদ্ধ নয়। এর বর্ণনা আমরা অচিরেই করছি।
ঘ. আশায়েরা ও মাতুরিদিয়াদের নিকট 'আরশ কী? আশায়েরা ও মাতুরিদিয়া সম্প্রদায় এ ব্যাপারে একমত হতে পারেননি।
• আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের মতোই তাদের অধিকাংশ মতপোষণ করে থাকে।
• তাদের কারও কারও মত হচ্ছে, 'আরশ নবম গোলকের নাম, যা ইতোপূর্বে আমরা দেখেছি তা হচ্ছে সেসব লোকদের মত যারা গ্রীক দার্শনিক ও তাদের অন্ধ অনুসরণকারী হয়েছে।
• তাদের কেউ কেউ বলেন, 'আরশ আল্লাহর এমন এক সৃষ্টি, যার প্রকৃত ঘটন আমরা কিছু জানি না, আর সেটার উপর 'ইস্তেওয়া' কী সেটাও আমরা জানি না।
• তাদের কেউ কেউ 'আরশ বলে রাজত্ব বুঝেছেন।
• তাদের কারও কারও মতে, 'আরশ বলে আসলে একটি উদাহরণ পেশ করা হয়েছে। তাদের নিকট বাস্তবে 'আরশ বলতে কোনো কিছু নেই, আর সেটার উপর আল্লাহও নেই, 'আরশের কথাটি বলা হয়েছে মানুষদেরকে বুঝানোর জন্য।
টিকাঃ
৫০. মাদারিজুস সালেকীন (১/৩৩)।
৫১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৮৭২।
৫২. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৫৫।
৫৩. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, আর-রিসালাতুল 'আরশিয়্যাহ, পৃ. ০৮।
৫৪. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭২৬।
৫৫. আল-'উলু, ৫৭।
৫৬. ইবন আবী শাইবাহ, আল-আরশ; ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (১/১৯); আত-তাফসীর (৪/৪২৯)।
৫৭. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৭২৬।
৫৮. ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ (১/২৫২) নং ৫৭৫।
৫৯. ইবন কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ (১/১৯)।
৬০. আহমাদ (৩৬/৩৮৪); ইবন হিব্বান ২৫১০; হাকিম, আল-মুস্তadরাক (৪/১৬৯); ইবনুল মুবারক, আয-যুহদ ৭১৫; আর তিনি সেটাকে সহীহ বলেছেন।
৬১. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৬৬।
৬২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৬০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৩১।
৬৩. তিরমিযী, হাদীস নং ১৩০৬।
৬৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৮০৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৬৬; হাদীসের শব্দ বিন্যাস মুসলিমের।
৬৫. ইবন আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ ১২৩৬৬; আল-আরশ ৪১৭; ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাক্বাত (৩/৪৩৩); হাকিম, আল-মুস্তাদরাক (৩/২০৬); যাহাবী, আল-উলু: ৭১ আর তিনি এর সনদকে উত্তম বলেছেন।
৬৬. ইবন খুযাইমা, আত-তাওহীদ, হাদীস নং ২৩৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ ২৭৫৮১; ফাদ্বায়িলুস সাহাবাহ ১৫০০; ইবন সা'দ, আত-ত্বাবাক্বাত (৩/৪৩৪); ইবন আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ ১২৩৬৮; আল-আরশ ৪১৭; ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ (২/২৪৬); হাইসামী, আয-যাওয়ায়িদ (৯/৩০৯); হাকিম, আল-মুস্তাদরাক (৩/৩০৬); আর যাহাবী তার সাথে একমত পোষণ করেছেন।
৬৭. সহীহ, আব্দুর রাযযাক, আত-তাফসীর (১/১৫৯); ইবন জারীর আত-তাফসীর (৭/২৫); আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ ৩২।
৬৮. সহীহ, ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ, ১৯৫; আত-ত্বাবারানী, আল-কাবীর, ৭৯৬৬; ইবন আবী শাইবাহ, আল-আরশ ৩৩৩; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক (২/৩৭১) আর তিনি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
৬৯. হাসান, তিরমিযী, ২৩১২; ইবন মাজাহ ৪১৯০; আহমাদ (৫/১৭৩); সহীহুত তারগীব ৩৩৮০।
৭০. বাইহাক্বী, আল-আসma ওয়াস সিফাত: ৪৯৭।
৭১. সহীহ, আহমাদ, আল-মুসনাদ (৪/২৭১); ইবন মাজাহ (২/১২৫৩); হাকিম, আল-মুস্তাদরাক; ইবন কাসীর।
৭২. সহীহ, ইবন আবী শাইবাহ, আল-আরশ, ৪০৭; যাহাবী, আল-উলু ৯৩।
৭৩. ইবন জারীর আত-ত্বাবারী (২২/১২০); যাহাবী, আল-উলু, ৯৩; ইবন আবী শাইবাহ, আল-আরশ, ৪০৫; ইবন কাসীর (৩/৫৪৯); তিনি বলেন, এর সনদ সহীহ।
৭৪. সহীহ, ইবন খুযাইমাহ, আত-তাওহীদ ১০৫; দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ, ৬২; আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ; আল-লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিক্বাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (৩/৩৯৬); ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ ১০০।
৭৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭৪২৩।
৭৬. ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (৬/১৩); ইবনুল কাইয়্যেম, হাদীউল আরওয়াহ, পৃ. ৭৫, ইবনু মানযূর, লিসানুল আরব (২/১০৬৯); আন-নিহায়াহ লি ইবন কাসীর (২/২৩৩)।
৭৭. তাফসীর ত্বাবারী।
৭৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭৪১১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৯৩।
৭৯. ইবন হাজার ফাতহুল বারী (১৩/৪১১)।
৮০. তাবারী, তাফসীর (১৫/২৪৯); ইবন আবী শাইবাহ, আল-আরশ ৩০১; দারেমী, আর-রাদ্দু আলা বিশর আল- মারীসী ৪৪৫; ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ (১/২৫৮); বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত, পৃ. ৪৮০; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক (২/৩৪১) এবং বলেছেন, এটি বুখারী ও মুসলিমের শর্তের ওপর সহীহ, যাহাবী তাতে একমত হয়েছেন।
৮১. বুখারী, খালকু 'আফ'আলিল ইবাদ ১২৭।
৮২. সহীহ। তিরমিযী, হাদীস নং ৩৩২০; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৯৩; আহমাদ, আল-মুসনাদ (১/২০৭); সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৭২৩; দারেমী, আর-রাদ্দু আলা বিশর আল-মারীসী, ৪৮৮; আজুররী, আশ-শরী'আহ ২৯৩; লালেকাঈ, আস-সুন্নাহ (৩/৩৯০); ইবন আবী আসেম, আস-সুন্নাহ (১/২৫৩); ইবন খুযাইমাহ, আত- তাওহীদ ১০১; ইবন মানদাহ, আত-তাওহীদ (১/১১৭)। জাওযাকানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন (১/৭৯); অনুরূপ ইবন তাইমিয়্যাহ তার ফাতাওয়ায় এটিকে সহীহ বলেছেন (৩/১৯২); ইবনুল কাইয়্যেম, তাহযীবুস সুনানে হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন (৭/৯২); যদিও কোনো কোনো আলেম দুর্বল বলেছেন।
৮৩. ইবনুল কাইয়্যেম, তাহযীবুস সুনান (৭/৯৪)।
৮৪. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২২৯।
৮৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৮১২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৮৭; শব্দ বিন্যাস মুসলিমের।
৮৬. নাকছু তা'সীসিল জাহমিয়্যাহ (১/১৫৫)।
৮৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৭৯০।