📄 প্রথম থেকে ষষ্ঠ জবাব
প্রথম জবাব:
মতপার্থক্য রয়েছে এমন কোনো বস্তুর হারাম হওয়ার বিষয়টি দু' অবস্থা থেকে মুক্ত নয়: (ক) মতপার্থক্য রয়েছে এমন বিষয়টি হারাম বলে সাব্যস্ত হবে, (খ) অথবা বিষয়টি হারাম বলে সাব্যস্ত হবে না। যদি মতপার্থক্য রয়েছে এমন কোনো স্থানেই হারাম সাব্যস্ত না হয়, তাহলে এ কথা অনুসারে কোনো বস্তু কেবল তখনই হারাম হতে পারে, যখন সেটা হারাম হওয়ার ওপর সবাই ঐকমত্য পোষণ করে। সে হিসেবে, যে সকল বিষয় হারাম হওয়ার ব্যাপারে মতপার্থক্য পাওয়া যাবে, সেটা হালাল বিবেচিত হবে। অথচ এ কথাটি উম্মতের সর্বসম্মত মত (ইজমা’) এর বিরোধী কথা। দীনে ইসলামে তা নিশ্চিতভাবে বাতিল বলে সবার জানা বিষয়।
দ্বিতীয় জবাব:
কোনো কাজের হুকুম বা বিধান ইজমা' তথা ঐকমত্যের মাধ্যমে সাব্যস্ত হওয়া অথবা মতবিরোধপূর্ণ হওয়া সে কাজের সত্বা ও গুণের বাইরের বিষয়। বরং সেটা আপেক্ষিক বিষয়। তা কিছু সংখ্যক আলিমের (বিপরীত মত) জানা ও না জানার ওপর নির্ভর করে বলা হয়ে থাকে। আর যখন কোনো ব্যাপক অর্থবোধক শব্দকে বিশেষ অর্থে ব্যবহার করা হবে, তখন তার জন্য দলীলের উপস্থিতির প্রয়োজন।
তৃতীয় জবাব:
এ জাতীয় বাক্য দ্বারা উম্মতকে সম্বোধন করা হয়েছে, যাতে করে তারা এর দ্বারা হারাম চিনে নিয়ে তা থেকে বেঁচে থাকে এবং তাদের মধ্যকার ইজমা' বা ঐকমত্যের ভিত্তি হতে পারে। কিন্তু শাস্তির হুমকি-ধমকি আগত হাদীসকে যদি যেখানে আলিমদের ঐকমত্য রয়েছে শুধু সেখানেই কার্যকর করা হয়, তবে সেগুলোর উদ্দেশ্য জানা ইজমা' তথা ঐকমত্যের ওপর নির্ভরশীল হবে, ফলে ঐকমত্য না হওয়া পর্যন্ত তা দ্বারা দলীল পেশ করা শুদ্ধ হয় না।
চতুর্থ জবাব:
এর দ্বারা আবশ্যক হয়ে পড়ে যে, ঐ সমস্ত হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না জানা যায় যে, ঐ হাদীস উক্ত অবস্থায় দলীল হিসেবে গ্রহণীয় হওয়ার ব্যাপারে উম্মতের ইজমা সংঘটিত হয়েছে। ফলে প্রথম যুগের লোকদের পক্ষে এ সব হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করা বৈধ হয় না; বরং যে সমস্ত সাহাবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে সে সব হাদীস শ্রবণ করতেন, তাদের জন্যও তা দ্বারা দলীল পেশ করা বৈধ হয় না।
পঞ্চম জবাব:
হয়ত এই সম্বোধনটি ব্যাপকতার দলীল হওয়ার জন্য সে বিষয়ে সমস্ত উম্মতের দৃঢ় বিশ্বাস থাকা শর্ত অথবা কেবল আলিমগণের দৃঢ় বিশ্বাস থাকাই যথেষ্ট। প্রথম অবস্থায় শাস্তি সম্পর্কিত হাদীস দ্বারা কোনো বস্তুর হারাম হওয়ার দলীল গ্রহণ করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সমস্ত উম্মত তার হারাম বা অবৈধতায় দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ না করে। এটা কোনো মুসলিম কেন, কোনো বুদ্ধি সম্পন্ন লোকেও সঠিক বলে বিবেচনা করবে না।
ষষ্ঠ জবাব:
কখনও কখনও শাস্তির ধমক আগত হাদীসগুলো, মতভেদের স্থানে সরাসরি প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যেমন, "হিলা বিবাহের মাধ্যমে যার জন্য হালাল করা হয়েছে, তার ওপর লা'নত (অভিশাপ)” এর বিষয়টি। আলিমগণের কেউ কেউ বলেন, কোনো অবস্থাতেই সে গুনাহগার হবে না। কিন্তু যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের স্ত্রী হালাল করার জন্য বিয়ে করে, যদিও বিয়ের সময় ঐ শর্তের উল্লেখ না থাকে, সে শাস্তির যোগ্য।
টিকাঃ
১০২. সুতরাং যে সব হাদীসে শাস্তির ধমকি এসেছে সেগুলোকে সর্বাবস্থায় প্রযোজ্য বললে যেহেতু মুজতাহিদকে গযব, লা'নত ও আযাবের সম্মুখীন হতে হয়, সেহেতু কেন এটা বলা হবে না যে, যেখানে কাজটি হারাম হওয়ার ব্যাপারে সকল আলেম ঐকমত্য পোষণ করেছেন কেবল সেখানেই সেই ধমকিটি কার্যকর হবে? এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন, যার উত্তর শাইখুল ইসলাম পরবর্তীতে দিচ্ছেন। [সম্পাদক]
১০৩. অর্থাৎ ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ বিশেষ অর্থে ব্যবহারের বিষয়ে আলিমগণের মধ্যে দু'টি মত পরিলক্ষিত হয়।
১০৪. অন্যের জন্য কোনো স্ত্রী হালাল করার নিয়তে বিয়ে করা।
১০৫. কারণ, এতে করে সকল ব্যাপক শব্দের উপর আমল করা দুরূহ হয়ে পড়বে। [সম্পাদক]
১০৬. অর্থাৎ সে মৌলিকভাবে লা'নতের সম্মুখীন হবে। [সম্পাদক]
১০৭. কারণ, হাদীসে যা বর্ণিত হয়েছে, তা হচ্ছে, হিলা বিবাহ করা। সেটাই মূলতঃ লা'নতে পড়ার কারণ। [সম্পাদক]
১০৮. কারণ, সে তো শরী'আতের অন্যান্য বিধানকেও অস্বীকার করে থাকে। [সম্পাদক]
১০৯. কুরআন ও সুন্নাহর কোনো বাক্য এ ধরণের নয়। [সম্পাদক]
১১০. মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবন মাজাহ।
১১১. সন্দেহ নেই যে, এভাবে হাদীসকে একটি বিরল প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ করা হয়ে যায়, যা হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য নয়। [সম্পাদক]
১১২. যে গ্রন্থটির দিকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন সেটি হচ্ছে, ইকামাতুদ দালীল আলা ইবতালিত তাহলীল।
📄 কবর যিয়ারত এবং শাস্তির হাদীসের উদাহরণ
অনুরূপভাবে লা'নত ও জাহান্নামের শাস্তি ইত্যাদি সংক্রান্ত বিশেষ হুমকি-ধমকি সম্বলিত দলীলসমূহও বিভিন্ন স্থানে এসেছে, যদিও তাতে আমলের ব্যাপারে আলিমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। যেমন, ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীস, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "বেশি বেশি কবর যিয়ারতকারিণী মহিলা, কবরকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণকারী এবং কবরের ওপর বাতি প্রজ্জলনকারীদের ওপর আল্লাহ তা'আলার অভিশাপ"।
আরও উদাহরণ হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: "যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর পিছনের রাস্তা দিয়ে যৌন সহবাস করে, সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অবতীর্ণ বস্তুকে অস্বীকার করল।" তদ্রূপ আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস: “যে দ্রব্যাদি বিক্রয়ের জন্য বাজারে নিয়ে যায়, আল্লাহ কর্তৃক সে রুজিপ্রাপ্ত হয়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মালামাল বাজারজাত না করে মওজুদ করে রেখে দেয়, সে অভিশপ্ত।"
এছাড়াও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিভিন্ন পন্থায় সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন: “যে ব্যক্তি অহঙ্কারপূর্বক পায়ের গিরার নিচে কাপড় পরিধান করে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামত দিবসে তার প্রতি তাকাবেন না।" নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র বলেছেন: "পরচুলা পরিহিতা স্ত্রীলোক এবং পরচুলা তৈরিকারী স্ত্রী লোকের প্রতি আল্লাহ তা'আলার লা'নত বা অভিশাপ"।
টিকাঃ
১১৩. অর্থাৎ যেখানে শাস্তির হুমকি-ধমকির বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা এসেছে সেখানেও মতভেদ থাকার কারণে তা কার্যকর হবে। [সম্পাদক]
১১৪. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ উল্লিখিত হাদীসের প্রথম অংশের সনদ হাসান। দ্বিতীয় অংশের সনদ দুর্বল।
১১৫. মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী ও ইবন মাজাহ।
১১৬. সহীহ মুসলিম, ইবন মাজাহ।
১১৭. সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ।
১১৮. সহীহ মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবন মাজাহ।
১১৯. আহমদ, সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম।
১২০. সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম।
১২১. অর্থাৎ মতপার্থক্য আছে বলেই সেটা হারাম হবে না বা সেগুলোতে উল্লেখিত শাস্তি প্রযোজ্য হবে না, এমনটি বলা যাবে না। [সম্পাদক]
📄 সপ্তম থেকে দশম জবাব
সপ্তম জবাব:
সপ্তম জবাব এই যে, ব্যাপক হওয়ার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত বিষয়। পক্ষান্তরে সেটার চাহিদার বিপরীত যে যৌক্তিকতা প্রদর্শন করা হয়েছে তা প্রকৃতপক্ষে বিপরীতে দাঁড়ানোর যোগ্যই নয়। হাদীসে বর্ণিত সাধারণ হুকুম হতে ঐ সব লোক বাদ পড়বে, যারা অজ্ঞতা, ইজতিহাদ ও তাকলিদ বা অনুকরণের কারণে অপারগ ও অক্ষম।
অষ্টম জবাব:
ব্যাপক শব্দটিকে যখন আমরা ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করে যারা সে কাজ করবে তাদের সবাইকে তা শামিল করলে, হাদীসের মধ্যেই সে লা'নত বা অভিশাপের কারণ উল্লেখ হয়েছে বলে ধর্তব্য হবে। প্রতিবন্ধকতার কারণে কোনো ব্যক্তির ওপর সেটা প্রযোজ্য না হওয়া মানে এই নয় যে হাদীসটি বিশেষ নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রের জন্য।
নবম জবাব:
শান্তির ধমকি আসা হাদীসগুলোর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা বর্ণনা করা যে, এসব কাজ লা'নতের কারণ। এর দ্বারা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই সে হুকুম প্রযোজ্য হওয়া অপরিহার্য হয় না। হুকুম প্রযোজ্য না হলেও এতে হুকুমের কারণটি অবশ্যই রয়েছে।
দশম জবাব:
যদি এসব হাদীস তার চাহিদার ওপর বর্তমান থাকে, তবে কোনো কোনো মুজতাহিদকে শাস্তির ধমকির অন্তর্ভুক্ত করা জরুরী হয়ে পড়ে। মুজতাহিদগণ হলেন ওযরসম্পন্ন, তাদের ওযর গৃহীত হবে। শুধু তাই নয়, তারা সাওয়াবও প্রাপ্ত হবেন। সুতরাং তাদের বেলায় শাস্তিতে প্রবেশের শর্ত রহিত হয় এবং তাদের বেলায় কখনও শাস্তি প্রযোজ্য হবে না।
দশম জবাবের ওপর একটি আপত্তি ও তার জবাব:
প্রশ্নকারী বলতে পারে যে, আমি বিশ্বাস করি শাস্তির ধমকিযুক্ত হাদীসসমূহ মতভেদপূর্ণ স্থানকে শামিল করে না। জবাবে বলা হবে, ঐ সব কাজের আমলকারীকে লা'নত বা অভিশাপ দেওয়া যদি তোমাদের নিকট ইজতিহাদী মাসআলার অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে দালিলিক ভাষ্যে বর্ণিত প্রকাশ্য অর্থের দ্বারাই সেটার ওপর দলীল গ্রহণ করা জায়েয হয়ে যায়।
টিকাঃ
১২২. যখনই হক স্পষ্ট হবে, জ্ঞান আসবে, দলীল পাওয়া যাবে, তখনই তাকে দলীলের দিকে ফিরে আসতে হবে। [সম্পাদক]
১২৩. এটি তাদের আপত্তির দশম উত্তর, যারা শাস্তির নির্দেশ বাস্তবায়ণের ব্যাপারে আপত্তি তুলে বলেছিল যে, শাস্তির হাদীসসমূহ শুধু সেখানেই প্রযোজ্য হবে যেখানে সেটি হারাম হওয়ার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। [সম্পাদক]
১২৪. সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম।
১২৫. সহীহ মুসলিম।
১২৬. তিরমিযী, আবু দাউদ।
১২৭. এর দ্বারা দশম কারণটিই উদ্দেশ্য। [সম্পাদক]
১২৮. অথচ কাজটিকে হালালও তো বলা যাচ্ছে না। [সম্পাদক]
📄 একাদশ ও দ্বাদশ জবাব
একাদশ জবাব:
যখন শাস্তির হাদীস দ্বারা হারাম বুঝায়, তখন তাতে আমল করা আলিমগণের সম্মিলিত রায় মোতাবেক ওয়াজিব। হাদীসের মধ্যে কোনো কাজের ব্যাপারে শাস্তির হুমকি-ধমকি আসলে সেটা দ্বারা হারাম সাব্যস্ত হওয়া অধিকতর যুক্তিযুক্ত। যারা এ জাতীয় হাদীস দ্বারা আমল করা এবং শাস্তি আপতিত হওয়ার বিশ্বাস করে থাকেন তাদের কথাই অধিক প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত।
দ্বাদশ জবাব:
শাস্তির ধমকি আগত দলীল কুরআন ও হাদীসে অনেক বেশি। কোনো ব্যক্তিকে নির্দিষ্টকরণ ব্যতীত সেসব দলীলের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাপক ও নিঃশর্তভাবে সেগুলোর ওপর আমল করা ওয়াজিব। সুতরাং কাউকে নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না যে, এ ব্যক্তি অভিশপ্ত, গজবপ্রাপ্ত অথবা জাহান্নামের উপযোগী। বিশেষ করে, ঐ ব্যক্তি সৎ ও পূণ্যবান হলে তাকে এরূপ বলা জঘন্য অন্যায়।
টিকাঃ
১২৯. এখানে শাইখুল ইসলাম অধিকাংশের মতামতকে সম্মিলিত রায় হিসেবেই দেখছেন।