📄 হাদীস কুরআনের ব্যাখ্যা ও তাফসীর
ইমাম শাফে'ঈ রহ. এ (কুরআনের আয়াতের যাহের বা প্রকাশ্য অর্থ ও হাদীসের نص কে দ্বান্দ্বিক মনে করা সংক্রান্ত) ধারাটির ব্যাপারে যে জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য দিয়েছেন, তা সর্বজন বিদিত। ইমাম আহমদ রহ.-এর বিষয়ে লেখা পুস্তিকাখানিও বেশ প্রসিদ্ধ, যাতে তিনি বিশদভাবে ঐ সব লোকের দাঁত ভাংগা জবাব দিয়েছেন, যারা মনে করে, প্রকাশ্য (যাহেরী) কুরআনের আয়াতই যথেষ্ট এবং হাদীসের ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। তিনি তার সে পুস্তিকাখানিতে তার বক্তব্যের সপক্ষে এমন অনেক দলীল-প্রমাণ নিয়ে এসেছেন, কলেবর বৃদ্ধির ভয়ে তার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া এখানে সম্ভব হলো না।
হাদীসে আমল না করার যে কারণটি এখানে বর্ণিত হলো, (অর্থাৎ উক্ত হাদীসটির বিপক্ষে এমন কিছু দলীল-প্রমাণ থাকা, যার ফলে মুজতাহিদ ব্যক্তি বা ইমাম মনে করেন যে, উক্ত হাদীস দুর্বল, মনসুখ (রহিত) অথবা তাতে তাবিল তথা ব্যাখ্যা করে ভিন্ন মত গ্রহণের অবকাশ রয়েছে)-এর আরও কিছু উদাহরণ হলো: (ক) কুরআনুল কারীমের (عموم) বা অনির্দিষ্ট কে (تخصيص) নির্দিষ্ট করে আসা হাদীসের ওপর আমল না করা। (খ) অথবা কুরআনের আয়াতে আগত (مطلق) শর্তমুক্ত বিধানকে (تقیید) করে আসা হাদীসের ওপর আমল না করা। (গ) অথবা কুরআনের বিধানের চেয়েও হাদীসে কিছু সংযোজন রয়েছে এমন হাদীসের ওপর আমল না করা।
📄 হাদীসে আমল না করার অন্যান্য কারণসমূহ
কখনও আলিম ব্যক্তি হাদীসে এমন কারণে আমল ত্যাগ করে, যে সম্পর্কে আমরা জ্ঞাত নই। অনেক হাদীস রয়েছে, যেগুলোর ব্যাপারে আলিমের কাছে এমন কোনো দলীল-প্রমাণাদি থাকা বৈধ, যার ভিত্তিতে তিনি সেটার ওপর আমল ত্যাগ করবেন, যে দলীলগুলো সম্পর্কে আমরা জ্ঞাত নই। কেননা ইসলামের ক্ষেত্র অত্যন্ত প্রশস্ত। আমরা আলিমগণের অন্তর্নিহিত সকল তত্ত্ব জানতে পারি না। আর আলিম কখনও কখনও হাদীস পরিত্যাগ করার সঙ্গত কারণ প্রকাশ করেন, আবার কখনো কখনো তা প্রকাশ করেন না। প্রকাশ করলেও কোনো কোনো সময় আমাদের কাছে পৌঁছে, আবার কোনো কোনো সময় আমাদের কাছে পৌঁছে না।
আলিমগণের জন্য তাদের মতের সপক্ষে দলীল থাকলেও আমাদের জন্য করণীয়: সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, আর যার সপক্ষে আলিম সমাজের একদল মত পোষণ করেছেন এমন কোনো প্রমাণ ত্যাগ করে, এর বিপরীত মত পোষণকারী আলিমের মত গ্রহণ করা জায়েয নয়। এমন সম্ভাবনায় যে হয়ত সে আলিমের কাছে এমন কোনো প্রমাণ রয়েছে যার ভিত্তিতে তিনি হাদীসের সপক্ষের প্রমাণের ওপর আমল করেন নি। যদিও তিনি অন্যান্য আলিমের চেয়েও বড় আলিম হোক না কেন। কারণ, শরী'আতের দলীল-প্রমাণাদিতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনার চেয়ে আলিমগণের মতামতে ভুল হওয়ার অবকাশ বেশি।
কোনো ব্যক্তির কথার ভিত্তিতে হাদীস পরিত্যাগ করা যায় না:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহীহ হাদীসের বিপরীতে কোনো মানুষের কথা বা মতকে দাঁড় করা যাবে না। যেমন, ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু কোনো মাসআলার প্রশ্নকারীকে হাদীস দ্বারা উত্তর দিয়েছিলেন। প্রতি উত্তরে লোকটি বললেন, আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এরূপ বলেছেন। তখন ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা বললেন, সত্বর তোমাদের ওপর আকাশ থেকে প্রস্তর বৃষ্টি বর্ষিত হবে। কেননা আমি বলছি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আর তোমরা বলছো আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন!
উল্লিখিত কারণগুলোর কোনো কারণে হাদীস পরিত্যাগ করা হলে সে মুজতাহিদ ব্যক্তি বা ইমাম সম্পর্কে খারাপ কথা বলা যাবে না:
যখন উল্লিখিত কারণগুলোর কোনো কারণে হাদীস পরিত্যাগ করা হয়, (এমতাবস্থায়) যদি হালাল ও হারাম কিংবা অন্য নির্দেশপূর্ণ সহীহ হাদীস থাকে, তবে এরূপ হাদীসকে বর্ণিত কারণের পরিপ্রেক্ষিতে পরিত্যাগ করলে, তিনি যেহেতু হালালকে হারাম কিংবা হারামকে হালাল অথবা আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাবের পরিপন্থী হুকুম দিয়েছেন। সেহেতু সেই আলিম ব্যক্তি শাস্তি প্রাপ্ত হবে, এরূপ বলা উচিৎ নয়।
টিকাঃ
৫৪. অর্থাৎ তখন অবস্থা এমন দাঁড়াবে যে, যখনই কোনো সহীহ হাদীসভিত্তিক মতের বিপরীতে দলীল-প্রমাণবিহীন মত সম্পর্কে বলা হবে যে, আপনার মতের সপক্ষে দলীল দিন, তখনই হয়ত বলবে যে, আমার ইমামের কাছে এমন কোনো দলীল আছে যা আমাদের কাছে পৌঁছায় নি।
৫৫. কিন্তু আমল ত্যাগ করার ওযর থাকা ঐ সময় পর্যন্তই গ্রহণযোগ্য, যখন আমাদের কাছে সেই ইমামের দলীল-প্রমাণাদি - তা স্বয়ং শুদ্ধ হোক বা না হোক - সেটা পেশ করা হবে।
৫৬. অর্থাৎ মু'তাযিলা ব্যতীত সকল সহীহ হকপন্থী ইমামের মতই হচ্ছে যে, ইজতেহাদী ভুলের কারণে শাস্তির মুখোমুখি হবে না।
৫৭. তিনি হচ্ছেন, বিশর ইবন গিয়াস ইবন আবী কারীমা আবদুর রহমান আল-মাররীসি... মুরজিয়ারা তার দিকেই সম্পর্কযুক্ত।
৫৮. হারাম কাজের জন্য শাস্তি প্রযোজ্য হওয়ার শর্ত হলো, হারাম কাজটি সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া কিংবা হারাম হওয়া সম্পর্কে দৃঢ়ভাবে জ্ঞাত হওয়ার শক্তি রাখা।
📄 ইজতেহাদের শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতা
ইজতেহাদের শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতা এবং মুজতাহিদ তার ইজতেহাদের ফলে পুণ্য লাভ। উপরোক্ত কথার সপক্ষে প্রমাণসমূহ নিম্নরূপ: ১- মহান আল্লাহ বলেন: “আর দাউদ এবং সুলাইমান এক ব্যক্তির শষ্য বিনষ্ট সম্পর্কে মীমাংসা করছিলেন, তখন ঐ ব্যক্তির শষ্যের মধ্যে ছাগল প্রবেশ করেছিল। আমি ঐ মীমাংসা দেখছিলাম। ঐ মীমাংসা সম্পর্কে আমি সুলায়মানকে সঠিক জ্ঞান দান করেছিলাম। অবশ্য আমি উভয়কেই জ্ঞান ও হিকমত দান করেছিলাম”। [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৭৮-৭৯] এখানে আল্লাহ সুলাইমানকে বোধশক্তি দ্বারা বিশেষিত করেছেন এবং তাদের উভয়ের প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের প্রশংসা করেছেন।
📄 মুজতাহিদ তার ইজতেহাদের ফলে পুণ্য লাভ করবেন
২- সহীহ বুখারী ও মুসলিমে 'আমর ইবনুল 'আস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যখন বিচারক সঠিক ইজতিহাদ করে, তখন তার জন্য দু'টি প্রতিদান থাকে। আর ইজতেহাদে ভুল করলে একটি প্রতিদান পাবে।” এ হাদীসে মুজতাহিদ ভুল করলেও প্রতিদানের কথা পরিস্কার বর্ণনা করা হয়েছে। এটা তার যথাসাধ্য ইজতিহাদ তথা প্রচেষ্টার কারণেই। সুতরাং তার ভুল মার্জনীয়। ৩- মহান আল্লাহ বলেন: "দীনের মধ্যে তোমাদের জন্য সমস্যাকর কিছুই নেই”। [সূরা আল-হজ, আয়াত: ৭৮] ৪- অন্যত্র আল্লাহ ঘোষণা করেন: “আল্লাহ্ তোমাদের সরল ও সহজ চান, বক্র এবং কঠিন কিছু চান না”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৫]