📄 দুঃখ-কষ্ট রোগ-ব্যাধির কারণ : কোরানিক ব্যাখ্যা
কি দার্শনিক, কি বিজ্ঞানী, কি ধার্মিক, কি রোগী, কি ডাক্তার—আমরা সবাই ধ'রে নেই যে জীবন থাকলে দুঃখ-কষ্ট থাকবে; দেহ-মন থাকলে রোগ-ব্যাধি থাকবে। কিন্তু কেন থাকবে?
কেন-র জবাব না জানার কারণে আমরা সবকিছুর ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে আল্লাহকে দোষারোপ করি। এটা খোদাদ্রোহ ছাড়া আর কিছু নয়।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে—তাহলে কি দুঃখকষ্ট তিনি দেন না? সুন্দর প্রশ্ন। সুতরাং সুন্দর জবাব দরকার। অনেকে শুধু প্রশ্নটা ক'রেই হুংকার দিয়ে চ'লে যায়। ভাবখানা এমন যেন তাদের প্রশ্নের ধরণটাই তাদের জবাব এবং ফলে তারা অন্য কোনো জবাবের আশা করে না।
জবাব হলো : যদি এই বিশ্বাস থেকেই থাকে যে দুঃখকষ্ট আল্লাহ দিচ্ছেন, তাহলে তো চোখ বুজে আনন্দের সাথেই মেনে নেয়া উচিত যে এই মুহূর্তে আমার জন্যে এই দুঃখকষ্টই সবচেয়ে মঙ্গলজনক। সেভাবে সবকিছুকে মেনে নিচ্ছেন না কেন?
আসলে আমরা এতই মোনাফেকি চরিত্রের যে সব ভালো কাজের সুনাম আমরা নিজেরা ভোগ ক'রে সব খারাপ কাজের দোষ আল্লাহর ওপর চাপাই কিংবা অকৃতজ্ঞের মতো আচরণ করি :
আমি যখন মানুষকে অনুগ্রহের স্বাদ দিই, তখন ওরা ওতে আনন্দিত হয়। এবং ওদের কৃতকর্মের ফলে ওরা দুর্দশাগ্রস্ত হলেই ওরা হতাশ হয়ে পড়ে। (সূরা রুম, আয়াত : ৩৬)
মানুষের প্রতি দয়া দেখালে সে মুখ ফিরিয়ে নেয়, এবং অহংকারে দূরে সরে যায় এবং তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করলে সে তখন দীর্ঘ প্রার্থনায় রত হয়। বল [হে মুহাম্মদ (সঃ)]—তোমরা ভেবে দেখেছ কি যদি এই কোরাআন আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ হয়ে থাকে এবং এ তোমরা প্রত্যাখ্যান কর, তাহলে যে ব্যক্তি ঘোর বিরুদ্ধাচারণে লিপ্ত আছ তার চেয়ে অধিক বিভ্রান্ত আর কে? আমি ওদের জন্য আমার নির্দশনাবলী বিশ্বজগতে প্রকাশ করব এবং (প্রকাশ করব) ওদের নিজেদের (মনোজগতের) মধ্যেও, ফলে ওদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে এই (কোরআন) সত্য। এ কি যথেষ্ট নয় যে তোমার প্রতিপালক সব বিষয়ে জ্ঞাত? জেনে রাখ, এরা এদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে: জেনে রাখ, আল্লাহ সব কিছুকে ঘিরে আছেন। (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ, আয়াত: ৫১-৫৪)
আল্লাহ বলেছেন যে ভালো-খারাপ কোনোকিছুই তাঁর অনুমতি ছাড়া ঘটে না; কিন্তু তিনি ভালো কাজের আদেশ করেন এবং খারাপ কাজের নিষেধ করেন; কেউ নাছোড় হয়ে খারাপ কাজ করতে চাইলে তিনি অবশেষ তাতে অনুমতি দেন। কোরআন দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করছে যে সব ভালো আল্লাহ থেকে এবং সব খারাপ মানুষ থেকে:
আল্লাহ কখনও তার বান্দাদের সাথে অন্যায় আচরণ করেন না। (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫১)
যে সৎ কাজ করে, সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে, এবং কেউ মন্দ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। তোমার প্রতিপালক তাঁর দাস-দাসীদের প্রতি কোন জুলুম করেন না। (সূরা হা-মীম-আস্ সিজদাহ্, আয়াত: ৪৬)
আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি। আর আমার দয়া-তা তো প্রত্যেক বস্তুতেই প্রাপ্ত। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬)
কিন্তু আল্লাহ তাদের কোনো ক্ষতি করেননি; তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে। (সূরা নহল, আয়াত: ৩৩)
আল্লাহ যদি মানুষের অকল্যাণ ত্বরান্বিত করতেন, যেভাবে তারা তাদের কল্যাণ ত্বরান্বিত করতে চায়, তাহলে তাদের ভাগ্য মীমাংসিত হয়ে যেত (তারা নিজেদের কর্মফল দ্বারাই ধ্বংস হয়ে যেত)। সুতরাং যারা আমার সাক্ষাতের আশা করে না, আমি তাদেরকে নিজ অবাধ্যতায় উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াতে দেই।
তোমাদের অমঙ্গল তোমাদেরই। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১৯)
তোমরা সৎকাজ করলে তা করবে নিজেদের জন্যে এবং মন্দ কাজ করলে তাও করবে নিজেদের জন্য। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ৭)
মানুষের কৃতকর্মের জন্য জলে স্থলে বিপদ ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে ওদেরকে ওদের কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করানো হয়, যেন ওরা পথে ফিরে আসে। (সূরা রুম, আয়াত: ৪১)
কিন্তু সবকিছুর ফল আসে তাঁর কাছ থেকে: প্রকৃতপক্ষে সব কিছুর ক্ষেত্রেই আদেশ আল্লাহর। পূর্ব ও পরের সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩১)
কিন্তু তার দোষ তাঁর নয়। তাঁকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না: (সূরা রুম, আয়াত: ৪)
তিনি যা করেন সে ব্যাপারে তাঁকে প্রশ্ন করা যাবে না, বরং ওদেরকে প্রশ্ন করা হবে। (সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ২৩)
মানুষ যেভাবে কল্যাণ কামনা করে সেইভাবেই অকল্যাণ কামনা করে। মানুষ তার মনে যা আসে তার পরিণাম চিন্তা না ক'রে তার আশু রূপায়ণ কামনা করে। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ১১)
আমি কাউকেই তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপাই না। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৪২)
আল্লাহ তাঁর সকল দাসকে জীবনোপকরণে প্রাচুর্য দিলে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত; কিন্তু তিনি যে পরিমাণ ইচ্ছা সেই পরিমাণ দিয়ে থাকেন। (সূরা শুরা, আয়াত: ২৭)
বুঝাই যাচ্ছে যে আল্লাহ এমন কোনো সুযোগ রাখেননি যাতে মানুষ তাঁকে প্রশ্ন করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের সকল দুঃখের কারণ হলো তার নিজের পরিচয় সম্বন্ধে তার অজ্ঞতা। যে নিজেকে জানেনি, সে তো কষ্ট পাবেই, অসন্তুষ্ট থাকবেই। কারণ সে আল্লাহকে জানার উপযুক্ত হয়নি।
দুঃখ-কষ্ট দুই ধরনের: মানসিক এবং দৈহিক।
মনোকষ্ট, অর্থকষ্ট, দৈহিক কষ্ট সবকিছু থেকেই মানসিক কষ্ট অনুভূত হ'তে পারে। কিন্তু কোরানিক সত্য হলো এই যে মনোকষ্ট ব'লে কিছু নেই; মনের অজ্ঞতা, সংকীর্ণতা, এবং মায়াচ্ছন্নতাই মনের যাবতীয় কষ্টের কারণ। মনোকষ্ট হলো মন সম্বন্ধে মনের ভুল ধারণা। মনোকষ্ট ব'লে বাস্তবতাতে কিছু নেই, তা আছে কেবল মনে। সুতরাং মন ঠিক হয়ে গেলে তার সমস্ত দুঃখ-কষ্টের অবসান ঘটবে।
এই সত্য কোরআনের। এবং এটাই আসল সত্য:
...আমি অবিশ্বাসীদের দৃষ্টিতে তারা যা করছে তা শোভনীয় করেছি। (অর্থাৎ তারা খারাপকে ভালো মনে করছে—এ হলো তাদের মনেরই ধারণামাত্র।) (সূরা আন'আম, আয়াত: ১২২)
আল্লাহ বিশ্বাসীদের মনোরোগ নিরাময় ক'রে দেবেন। (অর্থাৎ তারা যখন সত্যকে জানবে তখন তাদের অসম্পূর্ণ ধারণার বিলুপ্তি ঘটবে।) (সূরা তওবা, আয়াত: ১৪)
আমি তাদের ভোগান্তিকে/দুঃখ-কষ্টকে সমৃদ্ধিতে রূপান্তরিত ক'রে দিয়েছিলাম। (অর্থাৎ দুঃখ-কষ্টের দ্বারা তাদের মনের কালিমা ধুয়ে গিয়েছিল এবং তারা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে মনে এবং আর্থিক দিকে আল্লাহর করুণা লাভ করল।) (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৯৫)
নিশ্চয়ই আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত বিশ্রামের প্রশান্তি পায়। (তখন চিত্ত সকল ভ্রান্তিকে অতিক্রম ক'রে সঠিক ভারসাম্যে স্থিত হয়।) (সূরা রা'দ, আয়াত:)
একথার সত্যতার প্রমাণ কী?
হ্যাঁ, আমরা স্পষ্ট প্রমাণের দিকে যাব।
দেহের কষ্ট বা রোগ-ব্যাধি ইত্যাদির কোরানিক রহস্য হলো: আল্লাহ যখন কাউকে ভালোবাসেন বা কারো ওপর রহমত বর্ষণ করেন বা কাউকে ক্ষমা করেন, তখন তার দেহ রোগাক্রান্ত হয়।
শুনে পাঠকের মনে হতে পারে—এ কি উদ্ভট কথা! হ্যাঁ, এটাই সত্য। এর স্পষ্ট প্রমাণও আমরা দেখব। নিচের আয়াতগুলোর সম্মিলিত মর্ম অনুধাবন করার চেষ্টা করতে হবে।
তিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেককে যথোচিত প্রকৃতি বা পরিমাপ দান করেছেন। (ফলে সবকিছুই তার প্রকৃতি এবং পরিমাপ অনুযায়ী নিজে একটি বিশেষ অবস্থায় থাকতে চায় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বস্তু বা সিস্টেমের সংস্পর্শে একটি বিশেষ ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকতে চায়। এবং একারণে ঐ বস্তু বা সংশ্লিষ্ট যে-কোনো বস্তুর প্রকৃতির বা পরিমাপের ওপর হস্তক্ষেপ করলে গোটা ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটে। এই ব্যাঘাত বা মোচড়কে ভারসাম্যের নিজস্ব স্থিতিশক্তি নস্যাৎ ক'রে দিয়ে বিলুপ্ত ক'রে আবারও ভারসাম্যকে ফিরিয়ে আনতে চায়। কিন্তু সংঘটিত মোচড় বা বিশৃঙ্খলাটুকুর কারণে মূল্য ভারসাম্য থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে নতুন আপাত-ভারসাম্য বা ক্ষণস্থায়ী ভারসাম্য গঠিত হয়। এই দূরত্বই মূল ভারসাম্যের বিকৃতির পরিমাণকে (যেমন কোনো রোগব্যাধি) নির্দেশ করে।) (সূরা ফোরকান, আয়াত: ২)
আল্লাহ কখনও তার বান্দাদের সাথে অন্যায় আচরণ করেন না। (তাঁর আচরণ মানেই তাঁর বিধান। তাঁর বিধান সুনির্ধারিত এবং অপরিবর্তনীয়। ফলে তাঁর মধ্যে বৈজ্ঞানিক এবং গাণিতিক বিশুদ্ধতা ও যান্ত্রিকতা রয়েছে, খামখেয়াল বা স্বেচ্চাচারিতা নেই। মানুষ যা করে, এই বিধান অনুযায়ী তার ফলশ্রুতি তৈরি হয়। এ কারণে মানুষের সব অমঙ্গলের দায়ভার তার নিজের। আল্লাহ কোনো অমঙ্গল সৃষ্টি করেননি—তিনি সৃষ্টি করেছেন বিধান বা নিয়ম—তথা প্রকৃতিজগতের মূল স্বভাবধর্ম; এই স্বভাবধর্ম অনুযায়ী প্রকৃতি মানুষের ক্রিয়ার প্রতি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। পরবর্তী আয়াত দ্রঃ।) (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫১)
তোমাদের অমঙ্গল তোমাদেরই। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১৯)
বড় শাস্তির আগে আমি ওদেরকে অবশ্যই ছোট শাস্তি আস্বাদন করাব, যেন ওরা (আমার দিকে) ফিরে আসে। (এই শাস্তি হলো মানুষেরই কর্মফল—যা মানুষের প্রাপ্য বটে। কিন্তু আল্লাহ করুণা ক'রে মানুষকে তারই কর্মফলের ছোট আঘাতগুলো দ্বারা হুঁশিয়ার ক'রে দেন, যেন সে পথে ফিরে আসে। ব্যাপারটা পুরোপুরি বিজ্ঞানসম্মত—বরং তার সাথে দয়া ও করুণা মিশ্রিত।) (সূরা সিজদাহ, আয়াত: ২১)
আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না। (সীমালঙ্ঘন মানেই বস্তুর প্রকৃতি ও পরিমাপকে লঙ্ঘন করা। যার প্রতি বস্তু তার নিজস্ব প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেই। আল্লাহ কখনোই তাঁর নিয়মের লঙ্ঘনকে উৎসাহিত বা বরদাস্ত করবেন না, কারণ তার জন্য সংশ্লিষ্ট অন্য সবার ক্ষতি হবে। পরবর্তী আয়াতেই এই সত্যের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।) (সূরা শুরা, আয়াত: ৪০)
যদি কেউ আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে, তাহলে এরূপ লোকেরা (নিজেদের এবং অপরের) ক্ষতি ক'রে থাকে। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২২৯)
আমি তোমাদের মধ্যে একজনকে অপরের পরীক্ষাস্বরূপ করেছি। তোমারা ধৈর্যধারণ করবে কি? তোমার প্রতিপালক সবকিছু দেখেন। (মানুষ সীমালঙ্ঘন করলেই—তার শাস্তি হোক বা না হোক-তার দ্বারা সংশ্লিষ্ট অন্যেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু যেহেতু মানুষকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে, এবং ফলে সে অবিবেচকের মতো সীমালঙ্ঘন ক'রে ফেলতে পারে, সেহেতু অন্যদেরকে একটু ধৈর্য ধারণ করতে বলা হয়েছে। এরূপ ধৈর্যধারণকারী তার বিনিময়ে পুরস্কৃত হবে-হয় তার মাধ্যমে সে তার কর্মফল ভোগ করবে, না হয় তার প্রশিক্ষণ হবে, না হয় সে পূণ্য অর্জন করবে। যে পরকালের সনদপত্র পেতে চায় তাকে ইহকালে পরীক্ষা দিতেই হবে।) (সূরা ফোরকান, আয়াত: ২০)
... আমি প্রত্যেক জনপদে অপরাধীদের প্রধানদেরকে সেখানে চক্রান্ত করার অবকাশ দিয়েছি; কিন্তু তারা নিজেদের বিরুদ্ধে ছাড়া চক্রান্ত করে না। কিন্তু তারা তা বুঝতে পারে না। (এই অবকাশের উৎস হলো মানুষের choice এর স্বাধীনতা। ফলে অবকাশ ভোগকারী এবং যারা তার দ্বারা প্রভাবিত হয় তারা সবার জন্যই তা পরীক্ষাস্বরূপ। মানুষের স্বাধীনতাই তার পরীক্ষা-আল্লাহ দেখতে চান কে তা কিছাবে ভোগ করতে চায়। একটা সীমার পর তার কর্মফলই তার কাছে ফিরে এসে তাকে হুঁশিয়ারি দেয় এবং পরে ধ্বংস করে।) (সূরা আন'আম, আয়াত: ১২৩)
সময়ের শপথ। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে। (এই ক্ষতির সাথে সাক্ষাৎ হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। প্রকৃতপক্ষে, এই সময়ই হলো মানুষের কুকর্মের সৃষ্টি। সময়ই তার ক্ষতির প্রমাণ। আল্লাহর বিধানকে লঙ্ঘন করলে সেই বিধান অনুযায়ীই সময় প্রতিকূল হয়ে যায়। সে দোষ সময়ের নয়, মানুষের। সময় বরং মানুষের কুকর্মের সাক্ষী-শুধু তাই নয়, সময়ই তার কর্মের ফলশ্রুতি। এ কারণে রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে সময়কে গাল দেয়া যাবে না।- তা তো আল্লাহর বিধানেরই অনুগামী। পরবর্তী আয়াতটি দ্রঃ।) (সূরা আছর, আয়াত: ১-২)
কিন্তু আল্লাহ তাদের কোনো ক্ষতি করেননি; তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে। (সূরা নহল, আয়াত: ৩৩)
তুমি কখনও আল্লাহর বিধানে কোনো পরিবর্তন পাবে না। (এটাও প্রমাণ করে যে আল্লাহর বিধান বিশুদ্ধভাবে গাণিতিক এবং তিনি মানুষের সাথে অন্যায় আচরণ করেন না। পরবর্তী আয়াত দ্রঃ।) (সূরা আহযাব, আয়াত: ৬২)
যে সৎ কাজ করে, সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে, এবং কেউ মন্দ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। তোমার প্রতিপালক তাঁর দাস-দাসীদের প্রতি কোন জুলুম করেন না। (সূরা হা-মীম-আস্ সিজদাহ্, আয়াত: ৪৬)
আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি। আর আমার দয়া-তা তো প্রত্যেক বস্তুতেই প্রাপ্ত। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬)
মানুষের কৃতকর্মের জন্য জলে স্থলে বিপদ ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে ওদেরকে ওদের কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করানো হয়, যেন ওরা পথে ফিরে আসে। (এই প্রক্রিয়াটা অত্যন্তভাবে গাণিতিক এবং বিজ্ঞানসম্মত। এখানেই ব'লে দেয়া হয়েছে যে মানুষের যাবতীয় রোগ-ব্যাধি বিপর্যয়কে তাঁরই কর্মফল অনুযায়ী আল্লাহ তাঁর পূর্বনির্ধারিত বিধান বা আদেশবলে সৃষ্টি করেছেন। এই আয়াত থেকেই প্রমাণিত হয় যে 'যদি এরূপ ঘটে তাহলে তার ফল হবে এরূপ'-বিজ্ঞানের এই কার্য-কারণ সূত্র বা Cause and Effect Relationship-টা আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং সকল বিজ্ঞান-দর্শনই তাঁর।) (সূরা রুম, আয়াত: ৪১)
সত্য যদি ওদের কামনা বাসনার অনুগামী হতো, তাহলে আকাশমণ্ডলী পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। (কারণ স্বেচ্ছাচারীর মতো আচরণ কখনও বিজ্ঞানসম্মত হতে পারে না; কার্য-কারণ সূত্রের সক্রিয়তার কারণেই তা বিশৃঙ্খল ফলশ্রুতির সৃষ্টি করে। বিজ্ঞানসম্মত বিধানের এটাই দাবি যে তা কেউ লঙ্ঘন করলে অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। একথা সত্য না হলে উক্ত বিধানই হতো অবৈজ্ঞানিক। এই আয়াতও প্রমাণ দিচ্ছে যে সব কার্য-কারণ বিধি এবং বিজ্ঞান তাঁরই। এই আয়াতও প্রমাণ করে যে রোগ-ব্যাধি বিপর্যয় এগুলোর জন্য মানুষই দায়ী।)
আমি যখন মানুষকে অনুগ্রহের স্বাদ দিই, তখন ওরা ওতে আনন্দিত হয়। এবং ওদের কৃতকর্মের ফলে ওরা দুর্দশাগ্রস্ত হলেই ওরা হতাশ হয়ে পড়ে। (অনুগ্রহ আল্লাহর-ফলে ভালো কাজের ফলশ্রুতির কৃতিত্ব মানুষের নয়, আল্লাহর। কারণ এরূপ ফল সৃষ্টি হয় যে বিধান অনুসারে তা আল্লাহরই। এরূপ সুফলদায়ী বিধানকেই আল্লাহ তাঁর করুণা নামে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু খারাপ কাজের দোষ আল্লাহর নয়, মানুষের। খারাপ কাজ সম্পর্কিত বিধানও আল্লাহর-অর্থাৎ 'এরূপ খারাপ কাজ করলে এরূপ খারাপ ফলশ্রুতির সৃষ্টি হবে'-এই বিধানও তাঁর; তবে একথা ব'লে তাঁকে দোষ দেয়া যাবে না যে, 'এরূপ বিধান তো তিনি না রাখলেও পারতেন', কারণ এরূপ বিধানই মানুষের অস্তিত্বের শর্ত। ফলে একথা আবারও প্রমাণিত হচ্ছে যে মানুষের রোগ-ব্যাধি-বিপর্যয়ের কারণগুলো বিজ্ঞানসম্মত, কারণ বিজ্ঞান আল্লারই।)
আল্লাহ যদি মানুষের অকল্যাণ ত্বরান্বিত করতেন, যেভাবে তারা তাদের কল্যাণ ত্বরান্বিত করতে চায়, তাহলে তাদের ভাগ্য মীমাংসিত হয়ে যেত (তারা ধ্বংস হয়ে যেত)। সুতরাং যারা আমার সাক্ষাতের আশা করে না, আমি তাদেরকে নিজ অবাধ্যতায় উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াতে দেই। (এ থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে সব উপায়ে নিজের কল্যাণ কামনা করাও বিজ্ঞানসম্মত নয়। বরং তার মধ্যে অকল্যাণই নিহিত। প্রকৃত কল্যাণ হলো আল্লাহর সার্বিক বিধানকে একত্রে মেনে চলার মধ্যে-কারণ এই বিধানগুলোই অস্তিত্বের নির্মাণ-সূত্র এবং ধারক। আল্লাহ জগৎ সৃষ্টি করেছিলেন শুধু 'কুন্' বা 'হও' বলার মাধ্যমে। আসলে তাঁর এই উচ্চারণ হলো তাঁর বিধানেরই প্রকাশমাত্র। ফলত তাঁর বিধানই বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যে সূত্রগুলোকে আবিষ্কার করা হয়, সেগুলো হলো তাঁর কিছু বিধানমাত্র। আল্লাহ মানুষকে বলেছেন তথ্য-পর্যবেক্ষণ গবেষণা ক'রে তাঁর এই বিধানাবলী সম্বন্ধে জানতে-'তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং লক্ষ্য কর তিনি কিভাবে সৃষ্টি আরম্ভ করেছেন।)
আমি তোমাদের শান্তি কিছুকালের জন্য রহিত করলে তোমরা তো আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। (তার মানে এই নয় যে আল্লাহ কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে শান্তি দেন। তিনি তো বলেছেনই যে তিনি বান্দর সাথে অন্যায় আচরণ করেন না এবং তাঁর বিধানের কোনো পরিবর্তন নেই। আসলে শাস্তি হলো মানুষেরই কৃতকর্মের ফল। মন্দ কাজ করলে প্রকৃতির সংশ্লিষ্ট উপকেন্দ্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যার ফলে সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলার বা শান্তির। এই শাস্তি যদি মানুষের আচরণকে শুধরাতে পারে, তাহলে ভারসাম্য আবারও পুনস্থিত হয়। অর্থাৎ ভারসাম্য পুনস্থিত না হওয়া পর্যন্ত শাস্তির অস্তিত্ব থাকবে-এটাই বিজ্ঞানসম্মত। বরং আল্লাহ যদি এমন বিধান করতেন যে মানুষকে তার কৃতকর্মের ফলে উদ্ভূত শান্তি ভোগ করা লাগত না এবং একই সাথে তার দ্বারা সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা এমনিতেই ভারসাম্যে ফিরে আসত, তাহলে মানুষ শুধু খারাপ কাজ ক'রে যেতেই থাকত, সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে হুঁশিয়ার হতে পারত না, এবং ফলে নেমে আসত বৃহত্তর বিপর্যয়, কিংবা একজনের কর্মফলকে ভোগ করতে হতো অন্যকে-তার প্রতিক্রিয়া নষ্ট করার জন্য, যা হতো অন্যায়, কিংবা তার সমস্ত কর্মফল তারই অজান্তে পরকালে পৌঁছে যেত এবং তা হতো মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। প্রশ্ন উঠতে পারে-বিধান কি এমন হতে পারত না যে খারাপ কাজের কোনো খারাপ ফলই সৃষ্টি হবে না?-এরূপ প্রশ্নই বোকামিপূর্ণ। তা যদি হতো, তাহলে সৃষ্টিতত্ত্বকে আর বিজ্ঞান বলা হতো না, কারণ তখন কার্য-কারণ ব'লে কিছু থাকত না। কার্য-কারণই হলো অস্তিত্বের নির্ণায়ক। মানুষের পরীক্ষা চলছে তারই ভিত্তিতে। তবে আশার কথা এই যে সকল কার্য-কারণকে অতিক্রম করা যাবে পরকালে। আল্লাহ বলেছেন যে সেখানে মানুষকে তাই-ই করতে দেয়া হবে যা তার মন চাইবে। আবারও প্রশ্ন উঠতে পারে-তখন যদি কার্য-কারণ না থাকে, তাহলে সেই বাস্তবতা টিকবে কিভাবে?-সুন্দর প্রশ্ন। আসলে তখন মন বস্তুর অধীন থাকবে না, বস্তুই হবে মনের অধীন। মনই হবে সব কার্য-কারণের উৎস। কারণ সেই মনের ওপর আল্লাহর সম্মতি থাকবে। মনে রাখতে হবে যে আল্লাহই সকল কার্য-কারণের স্রষ্টা। পরকালের বাস্তবতা আল্লাহর আদেশে আমাদেরই আমল দ্বারা সৃষ্ট-৩য়, ১০ম, এবং ১২শ আয়াত দ্রঃ ফলে তা হবে মনের অধীন।- আসল সত্য কথা হলো, দিব্যদৃষ্টিধারীগণ জানেন যে পরকালে মিনটাই হবে বাস্তবতা! ফলে সেখানে মানুষ যা চাইবে তাই পাবে, যা করতে চাইবে, তাই করতে পারবে- কোনো বিরোধিতা। সেখানে কারো কাজ দ্বারা অন্য কেউও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, কারণ সবার মন/আত্মা হবে এক-আল্লাহর তাওহীদ বা ঐক্যে লীন-সে ঐক্যের থাকবে বিভিন্ন স্তর, যার ফলে মানুষের থাকবে শ্রেণীভেদ-কারণ পৃথিবীতে সবাই নিজেকে সমান মাত্রায় আল্লাহর তাওহীদে একাকার ক'রে দেয়নি, নিজের কামনা-বাসনাকেও বিভিন্ন জনে বিভিন্ন মাত্রায় প্রাধান্য দিয়েছে; তবুও সার্বিক ঐক্য থাকবেই, কারণ আল্লাহ এক এবং তাঁর তাওহীদ। অনন্য। এ এক রহস্যময় ব্যাপার, যা সবাইকে বোঝানোও যায় না-শুধু বুদ্ধি দিয়ে এ বোঝা যায় না।) (সূরা দোখান, আয়াত: ১৫)
প্রত্যেক মানুষের চিন্তা করা উচিত যে, সে আগামীকালের জন্য আগে/সামনে কী পাঠিয়েছে। (অর্থাৎ মানুষের সকল আগামীকাল বা ভবিষ্যৎ গঠিত হয় তার বর্তমানের কাজ দ্বারা। এই বিচারে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে, মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যনিয়ন্তা। শুধু তাই নয়, তার ভবিষ্যৎ সময়ও তার বর্তমানের কাজ দ্বারা সৃষ্ট হয়ে তার দিকে ভবিষ্যৎ থেকে বর্তমানের দিকে ছুটে আসে। ভাগ্যের পূর্বনির্ধারণ বলতে যা বুঝায়, তা ভিন্ন জিনিস, যা তার কর্মফলের সাথেই ক্রিয়া করে। ব্যাপারটা সৃষ্টি রহস্যের মধ্যে সবচেয়ে জটিল ব'লে এখানে আলোচ্য নয়।) (সূরা হাশর, আয়াত: ১৮)
পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করার আগেই তা লিপিবদ্ধ করি; আল্লাহর পক্ষে এ অতি সহজ। এ জন্য যে, তোমাদের ওপর যা অতীত হয়েছে (অর্থাৎ যা হারিয়েছে), তার জন্য দুঃখিত হয়ো না, এবং তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তার জন্য হর্ষোৎফুল্ল হয়ো না, আল্লাহ উদ্ধত অহংকারীকে ভালোবাসেন না। (আমাদের জীবনে তাই ঘটে যা একবার লিখিত হয়ে যায়। আর তাই-ই লিখিত হয়ে যায়, যা সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার ভারসাম্যে স্থিত হয়ে যায় বা সংশ্লিষ্ট সীমা লঙ্ ঘনের পর নতুন বিকৃতিতে স্থিত হয়। সাময়িক বা স্থায়ী স্থিতি তথা ভারসাম্য ছাড়া কোনো প্রক্রিয়া কোনো ফল উৎপাদন করে না। আমাদের কর্মকাণ্ড, গতিবিধি, চিন্তা-পরিকল্পনা এসব প্রক্রিয়ামাত্র। এরা তখনই ফল উৎপাদন করে বা তখনই এসব প্রক্রিয়া থেকে কোনো কাজ উৎপাদিত হয় যখন আল্লাহর সৃষ্টি-পরিচালনা-সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক কার্য-কারণ বিধান অনুসারে তাতে কোনো অস্থায়ী বা স্থায়ী ভারসাম্য সৃষ্ট হয়। সুতরাং যা একবার ঘটে গেছে, তা না ঘটে পারত না-আমাদের কর্মের প্রতিফল হিসেবে আল্লাহই তাঁর বিধান দ্বারা তা ঘটিয়েছেন। এজন্য তা যদি কোনো ভালো কিছু হয়ে থাকে, তাহলে অযথা অহংকার করার কিছু নেই-আল্লাহর করুণা ছাড়া তা ঘটত না, তার বিধান অনড় না হলে তার উল্টোটাও ঘটতে পারত; এবং তা যদি দুর্ভাগ্যজনক কিছু হয়, তাহলে দুঃখ করার কিছু নেই, কারণ তা ন্যায্য বিধান অনুযায়ীই ঘটেছে, এবং দুঃখ করা মানে নিজের কর্মফলের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানো এবং বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। আমার বিশ্বাস, কেউ যদি ধর্মের পতে চ'লে শুধু এই আয়াতের আদেশটাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন ক'রে চলতে পারেন, তাহলে তিনি আল্লাহর অলি হয়ে যাবেন। (পরবর্তী আয়াত দ্রঃ।) (সূরা হাদীদ, আয়াত: ২২-২৩)
আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদই পতিত হয় না, এবং যে আল্লাহকে বিশ্বাস করে তিনি তার অন্তরকে সুপথে পরিচালিত করেন। আল্লাহ সব বিষয়ে পুরোপুরি অবহিত। (সূরা তাগাবুন, আয়াত: ১১)
আমি আজ তাদেরকে তাদের ধৈর্যের কারণে এমনভাবে পুরস্কৃত করলাম যে, তারাই সফলকাম হলো। (পূর্ববর্তী ব্যাখ্যার কথা স্মরণ রাখলে সহজেই বুঝা যাবে ধৈর্য কেন দরকার।) (সূরা মু'মিনূন, আয়াত: ১১১)
আল্লাহ যথাযথভাবে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এই উদ্দেশ্যে যে, যেন প্রত্যেক মানুষ তার কর্মানুযায়ী ফল পেতে পারে। (এই আয়াতটি এবং পরবর্তী আয়াতটি থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে আমাদের সব কর্মকাণ্ডকে ধারণ করার এবং তা অনুযায়ী যথাযথ ফল সৃষ্টি করার, অর্থাৎ তার প্রতি সঠিক সময়ে সঠিক সাড়াটি প্রদান করার, সমস্ত যান্ত্রিকতা এবং পাওয়ার-সাপ্লাই আকাশ এবং পৃথিবীতে সুষমভাবে স্থাপিত করা রয়েছে। আর এ কারণেই পৃথিবীতে কার্য-কারণ বিধি কাজ করে, বস্তু তার বৈজ্ঞানিক ধর্ম লঙ্ঘন করে না। কি রহস্যময় আয়াত! মানুষ যেন তার কর্মফল পেতে পারে এই উদ্দেশ্যেই আকাশ-পৃথিবীকে সুষমভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে! বাস্তবে বিজ্ঞানও তো তাই দেখছে! আমরা যাকিছু করি, তাই-ই পরবর্তীতে ফলস্বরূপ আমাদের কাছে ফিরে আসে। এরূপ একটা আয়াত প'ড়ে বা শুনেই কোনো জ্ঞানী ব্যক্তির মুসলমান হয়ে যাওয়া উচিত। কোরআনেই বলা হয়েছে (বারবার। অসংখ্য বার!) যে, কোরআন কেবল জ্ঞানী এবং চিন্তাশীলদের জন্যই।) (সূরা জাসিয়া, আয়াত: ২২)
বল-আসমান ও জমিন থেকে কে তোমাদেরকে জীবিকা সরবরাহ করেন? বল-আল্লাহ। হয় আমরা সৎপথে স্থিত, এবং তোমরা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছ, না হয় তোমরা সৎপথে আছ, এবং আমরা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছি। (সূরা সাবা, আয়াত: ২৪)
আল্লাহ সকলের খোঁজ-খবর রাখেন, এবং তিনি সবকিছু জানেন। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৪৭)
যারা বিশ্বাসী তারা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখুক। (সূরা মাঈদা, আয়াত: ১১)
প্রথমেই আসা যাক দৈহিক পীড়া, দুর্বলতা, এবং যাবতীয় রকমের রোগ-ব্যধির প্রসঙ্গে। আধুনিক জীববিজ্ঞান এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে দেহকে এবং দেহের যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে একটা বিশেষ ধারণার সাহায্যে ব্যাখ্যা করা হয় যার নাম সিস্টেমস্ কনসেপ্ট্। এর সাধারণ অর্থটা পুরোপুরি গাণিতিক এবং শ্বাশ্বত। তা হলো গোটা দেহ এমন একটা ব্যবস্থা যার কর্মকাণ্ডের উৎস এবং প্রকাশ এবং প্রক্রিয়া সেই ব্যবস্থার (System) মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং পর্যাপ্ত এবং গোটা ব্যবস্থাটার মধ্যে যতগুলো উপ-ব্যবস্থা (Subsystem) আছে তারা প্রত্যেকে পারস্পরিক ক্রিয়াকাণ্ডের দ্বারা একে-অপরের সাথে জড়িত, যেখানে একটা সব-সিস্টেমেরে প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত কাঁচামাল বা INPUT সংশ্লিষ্ট অন্য একটা সাব-সিস্টেমের প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত উৎপাদ বা ফল বা OUTPUT। এবং এর ফলে গোটা দেহ-ব্যবস্থার সুস্থতা এবং অস্তিত্ব প্রতি-মুহূর্তের প্রয়োজন (INPUT) অনুসারে স্থাপিত ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। এই সার্বিক গতিশীল ভারসাম্যের অবস্থায় প্রত্যেকটা সাব-সিস্টেমেও আলাদ-আলাদা ভারসাম্য ক্রিয়াশীল। ফলে কোনো একটা সাব-সিস্টেমের ভারসাম্য কোনো কারণে বিঘ্নিত হ'লে তা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সাব-সিস্টেমের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে এবং এই বিঘ্ন সংশ্লিষ্ট সাব-সিস্টেমের সীমার মধ্যে থাকলে উক্ত সাব-সিস্টেমের আঞ্চলিক (Local) ক্রিয়াণ্ডে যে অনিয়মের সৃষ্টি হয়, তা একটা রোগ বা ব্যধি নামে গণ্য হয়। এই বিঘ্ন জীবাণুর মাধ্যমে বা অন্য কোনো কারণে হতে পারে। এই বিঘ্ন যদি সংশ্লিষ্ট সাব-সিস্টেমের নিজস্ব সহনশীলতার সীমা কিংবা আঞ্চলিকতাকে অতিক্রম করে, তাহলে তা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সাব-সিস্টেমের ক্রিয়াকাণ্ডকেও প্রভাবিত করে। চিকিৎসা মানে হলো সংশ্লিষ্ট সাব-সিস্টেমে বা সাব-সিস্টটেমগুলোতে আবশ্যক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা। এই সিস্টেমস্ কনসেপ্ট্ থেকে পরবর্তীতে আরো বিশুদ্ধ গাণিতিক System ফিল্ড বা 'মরফোজেনেটিক ফিল্ড' এর ধারণাও এসেছে। এসব ধারণা সর্বাধুনিক রোগের জেনেটিকতত্ত্বেও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত এবং প্রযুক্ত হয়েছে।
জেনেটিক রোগতত্ত্বের সূত্রটা সাধারণ কথায় এরূপ সুস্থ ভারসাম্যপূর্ণ দেহের জিনবিন্যাস, বা আরো বিশেষভাবে, DNA বিন্যাস, একটা রেল লাইনের মতো, যার ওপর দিয়ে দেহগাড়ির বগিগুলো মসৃণ গতিতে এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু কোনো কারণে লাইনের স্লিপারে সমস্যা ঘ'টে গেলে বা রেলগুলোর পারস্পরিক সমান্তরলতায় ব্যাঘাত ঘটলে, বগি তখন চলতে গিয়ে হোচট খেয়ে পাশে প'ড়ে যায়। সৃষ্টি হয় ব্যাঘাত বা রোগ-ব্যধির। জেনেটিক চিকিৎসার বা আস্ত্রোপচারের মাধ্যমে লাইনটাকে আবার ঠিক ক'রে দিলে বগিটা আবারও যথাস্থানে ফিরে আসে এবং যথানিয়মে চলতে শুরু করে। এই বিশৃঙ্খলতা মানুষের ভুল আচরণের জন্যই ঘটে থাকে।
সত্য যদি ওদের কামনা বাসনার অনুগামী হতো, তাহলে আকাশমণ্ডলী পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। (সূরা মোমেনুল, আয়াত: ৭১)
আসল কথা হলো এই যে এই দেহের সবকিছুর জন্য একটা নির্দিষ্ট জায়গা আছে, ভারসাম্য আছে। উদাহরণস্বরূপ, একটা বিশেষ বয়সের নারী বা পুরুষের সুস্থ অবস্থায় তার শরীরের সবগুলো সাব-সিস্টেমের সূচক যেমন রক্তসংবহনতন্ত্র, (রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ/সংখ্যা, শুগারের পরিমাণ), রেচনতন্ত্র (প্রশ্রাব-পায়খানার বিভিন্ন অবস্থা, প্রশ্রাবে ইউরিয়ার পরিমাণ ইত্যাদি), পরিপাকতন্ত্র, রক্তের চাপ, দেহের তাপ, দৃষ্টিশক্তির উর্ধ্বসীমা-নিম্মসীমা, কর্মপেরণা ইত্যাদির একেকটা বিশেষ মান থাকে।
এগুলোর সার্বিকতাকে একটা বহুমাত্রিক গ্রিডে বা ম্যাট্রিক্সে ফেলে বলা যায় যে ঐ বিশেষ বয়সের জন্য ঐ বিশেষ লিঙ্গের মানবসন্তানের দেহের ভারসাম্যের চিত্র বা সূত্র হলো ঐ গ্রিড বা ম্যাট্রিক্সটা। এদের যে-কোনো একটা সূচকের মান যদি গ্রহণযোগ্য সীমার বাইরে চ'লে যায়, তাহলে, অন্যান্য সূচকগুলোর মান 'স্বাভাবিক' থাকলেও, একথা বলতে হ'বে যে ব্যক্তির দেহে কমপক্ষে একটা অস্বাভাবিকতা আছে, তা যে কারণেই হোক। এই 'অস্বাভাবিকতাটাই' চিকিৎসা বিজ্ঞানে ব্যাধি নামে পরিচিত। অনাকাঙ্খিত জটিলতা এড়ানোর জন্য আমরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকলাম।
আমরা পাঠককে অবাক ক'রে দিয়ে আবারও ব'লে রাখি: দেহে এরূপ যে-কোনো অস্বাভাবিকতার উপস্থিতিই সেই দেহের ওপর আল্লাহর করুণার সক্রিয়তাকে স্পষ্টভাবে এবং প্রত্যক্ষভাবে নির্দেশ করে। অর্থাৎ, এই অস্বাভাবিকতাই তার রহমত!
কোনো কোনো পাঠক হয়তো এতক্ষণে ক্ষেপে গিয়ে থাকবেন। কিন্তু আপনি যদি কোনো ডাক্তার হন-এবং আমার বিশ্বাস যে আমার প্রিয় পাঠকদের মধ্যে কমপক্ষে একজন জ্ঞানী ডাক্তার রয়েছেন-তাহলে, আমার অনুরোধ, আপনার ক্ষেপে ওঠা একদম উচিত হবে না, কারণ আমাদের পরবর্তী ব্যাখ্যা এবং রায় আপনার বিদ্যার এবং পেশার পক্ষেই যাবে!
আমরা আরেকটু বাড়িয়ে বলতে চাই যে, মৃত্যু বা ধ্বংসের আগ পর্যন্ত দেহে বা দেহের কোনো অংশে যত ধরনের ব্যাধির সৃষ্টি হয়ে থাকে, তার সবই মূলত আল্লাহর তরফ থেকে রহমত বা করুণা। তা স্বয়ং রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন।
তাহলে আমরা এই দেহযন্ত্রের বিভিন্ন অবস্থাকে আরেকটু বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি। লক্ষণীয় যে:
■ দেহের প্রত্যেকটা বয়সের একেকটা সীমা বা Rangeকে একেকটা স্তর হিসেবে বিবেচনা করলে বলা যায় যে, বয়সের এক-একটা স্তরের জন্য (পুরুষ এবং নারীর জন্য আলাদাভাবে) মানবদেহের সার্বিক ভারসাম্য এক-এক রকমের।
■ প্রত্যেকটা সার্বিক ভারসাম্যের অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট সাব-সিস্টেমগুলোর নিজ-নিজ ভারসাম্যগুলোর বা স্বাভাবিক অবস্থাগুলোর (Normal Value) একটা সুনির্দিষ্ট সমন্বয়। এই সমন্বয়কে গ্রিড বা ম্যাট্রিক্স বলা যায়।
■ বয়সের এক-এক স্তরের জন্য দেহের সার্বিক ভারসাম্য বা ম্যাট্রিক্স এক-একরকমের ব'লে শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত দেহের গতিবিধি মূলত একটা পরিবর্তনশীল ভারসাম্যের (Dynamic Equilibrium) চলার পথ—অন্যকথায়, একগুচ্ছ ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থার একটা সারিবদ্ধ সজ্জা।
উদাহরণস্বরূপ, ১-৩ বছর, ৩-৬ বছর, ৬-৯ বছর, ৯-১২ বছর, ১২-২০ বছর, ২০-৩০ বছর ইত্যাদি বয়সের স্তরগুলোর (যা এখানে কাল্পনিক) জন্য একই দেহের সার্বিক ভারসাম্য হবে ভিন্ন ভিন্ন, এবং কোনো বিশেষ দেহের গোটা জীবনধারাকে এই ভারসাম্যগুলোর ধারাটা (Series) দ্বারা বর্ণনা করা যাবে।
এভাবে মানবদেহের গোটা বয়সের জন্য একটা সাধারণ বা গড় বক্ররেখা বা Curveবা চিত্র বা ভারসাম্যপথ পাওয়া যাবে। মজার ব্যাপার হলো, সহস্র বছরের ব্যবধানে বা আবহাওয়ার ব্যবধানে এই চিত্র বিভিন্ন রকমেরও হতে পারে! এই সত্যটা জানলেই বুঝা যায় কেন একেক যুগে একেক ধরনের রোগ-ব্যধির প্রকোপ বেশি দেখা দিত বা দেবে। হাদিসেও বর্ণিত আছে যে শেষ যুগে নতুন নতুন ব্যধি এবং ঔষধের উদ্ভব ঘটবে। ভারসাম্যের এই সচলতার কারণেই ভিন্ন ভিন্ন যুগের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধর্মগ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন:
সত্য এসেছে তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে, সুতরাং তুমি সন্দেহকারীদের অন্তর্গত হয়ো না। (সূরা আলইমরান, আয়াত: ৬০)
তাহলে তুমি কি (হে মুহাম্মদ (সঃ)) তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তার কিছু অংশ বাদ দেবে এবং তোমার বক্ষ সংকুচিত করবে? যেহেতু তারা বলে—কেন তার প্রতি ধনভাণ্ডার অবতীর্ণ হয়নি, অথবা তার সাথে ফেরেস্তা আসেনি? (সূরা হুদ, আয়াত: ১২)
নিশ্চয়ই আমি মুসাকে কেতাব দিয়েছিলাম, অতএব তুমি তার (মূসা (আঃ) এর) কেতাব প্রাপ্তির বিষয়কে সন্দেহ ক'র না। (সূরা সিজদাহ, আয়াত: ২৩)
হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যেন তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)
তোমাদের সকলের সৃষ্টি এবং পুনরুত্থান একটামাত্র প্রাণীর সৃষ্টি এবং পুনরুত্থানেরই অনুরূপ।
সময়ের শপথ। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে। (সূরা আছর, আয়াত: ১-২)
প্রত্যেক যুগের জন্য রয়েছে একটি ধর্মগ্রন্থ (যা আমি অবতীর্ণ করেছি)। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩৮)
প্রত্যেকটা জাতির জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত আছে; যখন তাদের সময়সীমা শেষ হয়ে যায়, তখন তারা তাকে এক ঘণ্টার জন্যও বিলম্ব করাতে পারে না, কিংবা তারা তা ত্বরান্বিতও করতে পারে না। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৩৪)
তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মে প্রতিষ্ঠিত কর। আল্লাহর স্বভাবের অনুসরণ কর, যে-স্বভাব অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর স্বভাবের কোনো পরিবর্তন নেই— এটাই সরল চিরস্থায়ী দ্বীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই (তা) জানে না। বিশুদ্ধ চিত্তে তাঁরই অভিমুখী হও; তাকে ভয় কর, নামাজ কায়েম কর ... (সূরা রুম, আয়াত: ৩০-৩১)
তুমি কখনও আল্লাহর বিধানে কোনো পরিবর্তন পাবে না। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৬২)
যদি কেউ আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে, তাহলে এরূপ লোকেরা (নিজেদের এবং অপরের) ক্ষতি ক'রে থাকে। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২২৯)
পূর্ব ও পরের সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। (সূরা রুম, আয়াত: ৪)
প্রকৃতপক্ষে সব কিছুর ক্ষেত্রেই আদেশ আল্লাহর। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩১)
তিনি আদি, তিনি অন্ত, তিনি ব্যক্ত, তিনি গুপ্ত, এবং তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত। (সূরা হাদীদ, আয়াত: ৩)
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, দেহ-ঘড়ির সূচক বা কাঁটাটি সব বয়সের ক্ষেত্রে যেমন সমান ঘোরে না, তেমনি সব যুগের বা আবহাওয়ার ক্ষেত্রেও সমান ঘোরে না। অর্থাৎ পূর্ণ দেহটাও একটা পূর্ণাঙ্গ সিস্টেম নয়, এটাও একটা সাব-সিস্টেম, যা বাইরের প্রকৃতির সঙ্গে ক্রিয়াশীল ব'লে গোটা প্রকৃতির তাৎক্ষণিক ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। এভাবে কোনো একটা বিশেষ সময়ের জন্য কোনো দেহের চারপাশের ধারণকারী এবং লালনকারী বাস্তবতার ভারসাম্য পাওয়া গেলে এটাও বের করা যায় যে ঐ দেহের ভারসাম্যের সাথে উক্ত ভারসাম্যের পারস্পরিক ক্রিয়ার সৃষ্টি হয় বৃহত্তর একটা ভারসাম্যের, যাকে লক্ষ্য ক'রে শুধু দেহটা নয়, পারিপার্শ্বিকতার ভারসাম্যের সূচক বা গোটা অস্তিত্বের ঘড়ির কাঁটাটাই ঘুরছে। এই সার্বিক ভারসাম্যবিন্দু হলো আলোচ্য সময় বা যুগের জন্য সার্বিক ক্রিয়াকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। একটা কথা জেনে রাখা দরকার, আল্লাহ নিজেই কিন্তু নিজেকে সমস্ত অস্তিত্বের ক্রিয়াকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিহ্নিত করেছেন, এবং সময়ের সাথে তিনি তার কর্মকাণ্ড পরিচলনার ভারসাম্যবিন্দু বদলে দিয়ে নতুন নতুন পরিবর্তনশীল দেন্দ্রস্থল থেকে কাজ করেন একথাও তিনি বলেছেন:
আমি প্রত্যেক ধর্ম সম্প্রদায়ের জন্য ধর্ম পদ্ধতি নির্ধারিত ক'রে দিয়েছি, যা তারা পালন করে; সুতরাং তারা যেন তোমার সাথে এ ব্যাপারে তর্ক না করে। তুমি ওদেরকে তোমার প্রতিপালকের দিকে আহ্বান কর। তুমি সরল পথেই আছ। '(সূরা হজ্ব, আয়াত : ৬৭)
বল-পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং অনুধাবন কর কিভাবে তিনি সৃষ্টি আরম্ভ করেছেন। (সূরা আনকাবুত, আয়াত: ২০)
প্রত্যেকটা জাতির জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত আছে; যখন তাদের সময়সীমা শেষ হয়ে যায়, তখন তারা তাকে এক ঘণ্টার জন্যও বিলম্ব করাতে পারে না, কিংবা তারা তা ত্বরান্বিতও করতে পারে না। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৩৪)
প্রত্যেক যুগের জন্য রয়েছে একটি ধর্মগ্রন্থ (যা আমি অবতীর্ণ করেছি)। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩৮)
নিশ্চয় তোমরা এক স্তর থেকে অন্যস্তরে আরোহণ করবে। (সূরা ইনশিক্বাক, আয়াত: ১৯)
(এ কোরআন) অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়। পূর্ববর্তী কেতাবসমূহে অবশ্যই এর উল্লেখ আছে। (সূরা শুয়ারা, আয়াত: ১৯৫-৯৬)
এবার মনটাকে আরেকটু চাঙ্গা করার জন্য নিচের আয়াতগুলো একবার প'ড়ে নিলে ভালো হবে:
কেয়ামতের ঘোষণা না থাকলে ওদের ফলাসালা তো হয়েই যেত। (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ, আয়াত: ২১)
বড় শাস্তির আগে আমি ওদেরকে অবশ্যই ছোট শাস্তি আস্বাদন করাব, যেন ওরা (আমার দিকে) ফিরে আসে। (সূরা সিজদাহ, আয়াত: ২১)
কারো আয়ু বৃদ্ধি হলে বা হ্রাসপ্রাপ্ত হলে তা তো হয় কেতাব (সংরক্ষিত ফলক) অনুসারে। (সূরা ফাতির, আয়াত: ১১)
পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করার আগেই তা লিপিবদ্ধ করি; আল্লাহর পক্ষে এ অতি সহজ। এ জন্য যে, তোমাদের ওপর যা অতীত হয়েছে (অর্থাৎ যা হারিয়েছে), তার জন্য দুঃখিত হয়ো না, এবং তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তার জন্য হর্ষোৎফুল্ল হয়ো না, আল্লাহ উদ্ধত অহংকারীকে ভালোবাসেন না। (সূরা হাদীদ, আয়াত: ২২-২৩)
আমি কি তোমাদের দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে তখন কেউ সতর্ক হবে চাইলে সতর্ক হতে পারতে না? (সূরা ফাতির, আয়াত: ৩৭)
তুমি কি জান (হে মুহাম্মদ (সঃ))- সম্ভবত কেয়ামত আসন্ন। যারা বিশ্বাস করে না তারাই কামনা করে যে তা ত্বরান্বিত হোক। কিন্তু যারা বিশ্বাসী তারা তাকে ভয় করে এবং জানে যে তা সত্য। (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ, আয়াত: ১৭-১৮)
... তোমাদের জন্য নির্ধারিত দিন আছে, যা তোমরা মুহূর্তকাল বিলম্বিত করতে পারবে না, ত্বরান্বিতও করতে পারবে না। (সূরা সা-বা, আয়াত: ৩০)
আমিই ... লিখে রাখি যা ওরা (মানুষ) আগে পাঠায় এবং যা পেছনে রেখে যায়। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১২)
যদি কেউ আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে, তাহলে এরূপ লোকেরা (নিজেদের এবং অপরের) ক্ষতি ক'রে থাকে। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২২৯)
প্রকৃতপক্ষে সব কিছুর ক্ষেত্রেই আদেশ আল্লাহর। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩১)
কেয়ামতের লক্ষণসমূহ তো এসে পড়েছে। (সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১৮)
আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা শুরা, আয়াত: ৪০)
পূর্ব ও পরের সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। (সূরা রুম, আয়াত: ৪)
শপথ সমুন্নত আকাশের। এবং শপথ উদ্বেলিত সমুদ্রের-তোমার প্রতিপালকের শাস্তি অবশ্যম্ভাবী। তা অনিবার্য। যেদিন আকাশ আন্দোলিত হবে প্রবলভাবে। এবং পর্বতমালা উন্মুলিত হবে। সেই দিন মিথ্যাবাদীদের জন্য দুর্ভোগ। যারা খেলাচ্ছলে অসার কার্যকলাপে লিপ্ত থাকে। (সূরা তৃর, আয়াত: ৫-১১)
তাঁর (আল্লাহর) প্রমাণ বা নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে আকাশ এবং পৃথিবীর সৃজন, এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই জ্ঞানীদের জন্য এর মধ্যে রয়েছে প্রমাণ। (সূরা রুম, আয়াত: ২২)
তোমরা অবিশ্বাসী হলে নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন-তিনি তাঁর সেবকগণের অকৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন না। (সূরা যুমার, আয়াত: ৭)
যে সৎ কাজ করে, সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে, এবং কেউ মন্দ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। তোমার প্রতিপালক তাঁর দাস-দাসীদের প্রতি কোনো জুলুম করেন না। (সূরা হা-মীম-আস্ সিজদাহ্, আয়াত: ৪৬)
তুমি কখনও আল্লাহর বিধানে কোনো পরিবর্তন পাবে না। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৬২)
দয়া করাকে তিনি তাঁর কর্তব্য হিসেবে স্থির করেছেন। কেয়ামতের দিন অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে একত্রিত করবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারাই অবিশ্বাস করবে যারা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলেছে। (সূরা আন'আম, আয়াত: ১২)
যে কেউ খারাপ কাজ করবে তাকে অধোমুখে নিক্ষেপ করা হবে অগ্নিতে, এবং ওদেরকে বলা হবে তোমরা যা করতে তারই প্রতিফল তোমরা ভোগ করছ। (সূরা নাম্ল, আয়াত: ৯০)
তোমরা সৎকাজ করলে তা করবে নিজেদের জন্যে এবং মন্দ কাজ করলে তাও করবে নিজেদের জন্য। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ৭)
আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি। আর আমার দয়া-তা তো প্রত্যেক বস্তুতেই প্রাপ্ত। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬)
তোমাদের অমঙ্গল তোমাদেরই। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১৯)
বল-তোমরা আমার প্রতিপালককে না ডাকলে তাঁর কিছু আসে যায় না। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ৭৭)
কিন্তু আল্লাহ তাদের কোনো ক্ষতি করেননি; তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে। (সূরা নহল, আয়াত: ৩৩)
উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কী হতে পারে? (সূরা রহমান, আয়াত: ৬০)
আল্লাহ যা ইচ্ছা বাতিল করেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন এবং তাঁরই কাছে আছে কেতাবের মূল। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩৯)
এমনকি কোরআনে বলা হয়েছে যে মানবদেহকে এবং এমনকি বিশ্বজগৎটাকেই সৃষ্টি করা হয়েছিল ছয়টি ধাপে ফেলে, বিবর্তনের মাধ্যমে।
হে মানুষ। পুনরুত্থান সম্বন্ধে যদি তোমরা সন্দেহপূর্ণ হও, (তাহলে চিন্তা কর) আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর শুক্রবিন্দু থেকে, তারপর রক্তপিণ্ড থেকে, তারপর পূর্ণ বা অপূর্ণ আকৃতিবিশিষ্ট মাংসপিণ্ড থেকে। যেন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেই (তোমরা কিভাবে জীবন লাভ করেছ এবং কিভাবে মৃত্যুর পর আবার পুনরুত্থিত হবে)। আমি যা ইচ্ছা করি, তা এক নির্দিষ্টকালের জন্য মাতৃগর্ভে রেখে দিই, তারপর আমি তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি, যেন তোমরা নিজ নিজ যৌবনে উপনীত হতে পার। তোমাদের মধ্যে (শিশু অবস্থায়) কারো কারো মৃত্যু ঘটে এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে রোগগ্রস্ত করা হয়, যার ফলে তারা যা জানত সে সম্বন্ধে তারা ভুলে যায়। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৫)
তুমি বল, তোমরা কি তাকে অস্বীকার করবেই—যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দুদিনে, এবং তোমরা তার সমকক্ষ দাঁড় করাতে চাও? তিনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক! তিনি ভূ-পৃষ্ঠে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, এবং পৃথিবীতে রেখেছেন কল্যাণ এবং চারদিনের মধ্যে এতে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। সমানভাবে সকলের জন্য, যারা এর অনুসন্ধান করে। অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন, যা ছিল ধূম্রপুঞ্জ বিশেষ। অনন্তর তিনি ওকে (আকাশকে) এবং পৃথিবীকে বললেন— তোমরা উভয়ে ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় হোক—আমার আদেশ পালনের জন্য প্রস্তুত হও। ওরা বলল আমরা তো আনুগত্যের সাথেই প্রস্তুত আছি। অতঃপর তিনি আকাশমণ্ডলীকে দুদিনে সপ্ত আকাশে পরিণত করলেন; এবং প্রত্যেক আকাশের নিকট তার কর্তব্য ব্যক্ত করলেন এবং তিনি প্রথিবীর নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত এবং সুরক্ষিত করলেন। এসব পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহ কর্তৃক সুবিন্যস্ত। (সূরা হা-মীম-আস্ সিজদাহ, আয়াত: ৯-১২)
এভাবে দেখা যায় যে গোটা সৃষ্টিকুলের একটা অংশের জন্য যেমন রয়েছে একটা সাময়িক (যুগের) কেন্দ্র বা আঞ্চলিক কেন্দ্র, তেমনি একাধিক আঞ্চলিক বা সাময়িক কেন্দ্রেরও রয়েছে বৃহত্তর কেন্দ্র—এরূপ একাধিক বৃহত্তর কেন্দ্রেরও রয়েছে কেন্দ্র। এভাবে সৃষ্টি প্রক্রিয়াকে আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন বৃত্ত আকারে, যেখানে রয়েছে বৃত্ত, তাকে ঘিরে বৃত্ত, তাকে ঘিরে বৃত্ত, তাকে ঘিরে বৃহত্তর বৃত্ত, তাকে ঘিরে ... অসীম পর্যন্ত সময়ের সাথে ধাবমান এই সব বৃত্তের দ্বারা বৃত্তকে মুড়ে দেয়ার প্রক্রিয়া। ফলে বিশেষ কোনো অবস্থার যেমন একটা তাৎক্ষণিক কেন্দ্র রয়েছে, তেমনি বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যাবে যে সেই কেন্দ্রই চূড়ান্ত নয়, সেই ক্ষুদ্র বৃত্ত এমন এক বৃহত্তর বৃত্তের অংশ যার রয়েছে ভিন্ন কেন্দ্র ... ইত্যাদি। তীব্র এবং উদ্ভিদের ফসিলের আকৃতির ক্রমবিবর্তনকে অধ্যয়ন ক'রেও আমরা দেখতে পাই যে প্রতি ক্ষেত্রেই রয়েছে একই জাতীয় আকৃতির (Form) পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন, কোরআনে যার প্রতি লক্ষ্য করতে বলা হয়েছে*:
বল—পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং অনুধাবন কর কিভাবে তিনি সৃষ্টি আরম্ভ করেছেন। (সূরা আনকাবুত, আয়াত : ২০)
নিশ্চয় তোমরা এক স্তর থেকে অন্যস্তরে আরোহন করবে। (সূরা ইনশিক্বাক, আয়াত: ১৯)
কেন্দ্রের এই ধারাবাহিক পরিবর্তনশীলতা এবং লক্ষ্য-চালিত গতিবিধি থেকে কী অনুমান করা যায়? গণিত বলে যে অসীম সংখ্যক কেন্দ্রের এই ধারটা (Series) উৎপন্ন হয়েছে একটা কেন্দ্র থেকে এবং সমাপ্ত হয়েছে সেই একই কেন্দ্রে। এই সার্বিক কেন্দ্রটা দৃশ্য এবং অদৃশ্য, প্রকাশ্য এবং গুপ্ত সব বাস্তবতাকে গ্রাস ক'রে রেখেছে। কিন্তু দৃশ্য বা প্রকাশিত বাস্তবতার স্থান এবং কাল দ্বারা সীমিত ব'লে তার প্রকাশিত কেন্দ্র একটা। কেন্দ্র মানেই হলো সব ক্রিয়াকাণ্ডের উৎস এবং লক্ষ্য। যেমন, পদার্থবিদ্যার একটা সরলতম উদাহরণ নেয়া যাক: একটা সুতোকে আঙুলে বেঁধে তার অপর প্রান্তে একটা আংটি বেঁধে আংটিটাকে যে-কোনো দিকে বৃত্তাকারে ঘুরাতে থাকলে দুটো বলের সৃষ্টি হবে—
একটা কেন্দ্রমুখী বল (Centripetal Force) F1, যা আংটিটাকে কেন্দ্রের দিক বরাবর টানবে, এবং একটা কেন্দ্রবিমুখী বল (Centrifugal Force) F2, যা আংটিটাকে কেন্দ্রের ঠিক উল্টো দিক বরাবর ঠেলবে। এই টানা এবং ঠেলা (Push & Pull) ঘটবে কেন্দ্র বরাবর একই সরলরেখায়— অন্য কথায়, তাদের উভয়ের মিলিতক্রিয়ার লক্ষ্য এবং উৎস হলো একই কেন্দ্র—F2 এর উৎস যে কেন্দ্র, সেই কেন্দ্রই হলো F1 এর লক্ষ্য। উভয় বলের মান সমান এবং বিপরীতমুখী ব'লে বৃত্তটা গঠিত হতে পেরেছে। কিন্তু F2 ভেতর থেকে বাইরে এসেছে ব'লে, তার আত্মচেতনা বহির্মুখী ব'লে, সে তার কেন্দ্রকে খুঁজছে বাইরে কোথাও— তাঁর প্রক্রিয়ার বহির্মুখীতার মায়ার মধ্যে হারিয়ে গেছে কেন্দ্রটা। অথচ তারই যে-ধারা উল্টোদিকে ক্রিয়াশীল, সেই আসল ধারা, F1, সব সময়েই তার কেন্দ্রের মুখোমুখী হয়ে ক্রিয়াশীল থাকে এবং সে তার কেন্দ্রকে চিনতে ভুল করে না।
আমরা আমাদের বহির্মুখী আমিত্বকে যদি যথাযথ আমলের দ্বারা ঠেলে ভেতরমুখী করতে পারতাম তাহলে আমরা আমাদের আমিত্বের এমন এক ধারার সাক্ষাৎ পেতাম যা তার উৎস এবং লক্ষ্যকে, সেই মহাকেন্দ্রকে চেনে।
তাঁরই আদেশে আসমান ও জমিনের স্থিতি (ভারসাম্য)। (সূরা, রুম, আয়াত: ২৫)
কিন্তু আত্মজাহিরী অহংকারী জ্ঞানী একথা জেনেও এই জ্ঞান জীবনের কাজে লাগাতে পারবে না। কারণ তার জন্য দরকার আমিত্বকে ত্যাগ করা; তা করতে পারলে তা ক্ষণস্থায়ী মায়ার বাস্তবতা থেকে মুক্তি পেয়ে পৌঁছে যাবে চিরস্থায়ী শ্বাশ্বত বাস্তবতায়, যেখানে আর জন্ম নেই, মৃত্যু নেই, নেই কোনো দুঃখ-কষ্ট-অবসান-আফসোস-হতাশা।
যাহোক, দৃশ্য বাস্তবতার যে-কেন্দ্র, অদৃশ্য বাস্তবতারও সেই কেন্দ্র। কারণ আল্লাহ এক। তিনি কখনও দুই নন। শুধু পার্থক্য হলো এটাই যে অদৃশ্য পরম বাস্তবতা কেন্দ্রের মুখোমুখী হয়ে আবর্তনশীল এবং দৃশ্যমান বাস্তবতা কেন্দ্রের দিকে পিছু ফিরে তার ছায়ার চারদিকে আবর্তনশীল। কিন্তু আল্লাহই কোরআনে বলেছেন: তিনিই গুপ্ত, তিনিই ব্যক্ত; তিনিই আদি, তিনিই অন্ত।
তিনি আদি, তিনি অন্ত, তিনি ব্যক্ত, তিনি গুপ্ত, এবং তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত। (সূরা হাদীদ, আয়াত: ৩)
আকাশ এবং পৃথিবী উভয়স্থানেই তিনি আল্লাহ। (সূরা আন'আম, আয়াত: ৩)
তবুও তিনি দুই নন, এক। দোষ তাঁর নয়-মায়াচ্ছন্ন চোখের। চোখ যখন বাস্তবতার নির্দেশিত পথে ক্রিয়াশীল না হয়ে ভ্রান্ত পথ বেছে নেয়, তখন তা প্রতি মুহূর্তে ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্রে নিজেকে খুঁজে পায়, যেমনটা দেখা যাচ্ছে নিচের চিত্রে:
কেন্দ্রবিমুখী বল F2 মূলত কেন্দ্র-ভ্রান্ত এবং লক্ষ্যভ্রষ্ট এক বিদ্রোহী খর্বিত আমিত্ব। সে তার অবস্থান বিন্দুর পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত কেন্দ্রের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়। সে তার একত্ব হারিয়ে বহুধাবিভক্ত হয়েছে। এই বিভ্রান্তি শুরু হয়েছিল ইবলিস দ্বারা প্রতারিত হয়ে আদম (আঃ) এবং হাওয়া (আঃ) যখন নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়েছিলেন তখন। ইঞ্জিল শরীফে বর্ণিত আছে যে তাঁরা জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেয়েছিলেন। কোরআনেও বর্ণিত হয়েছে যে ইবলিস তাঁদেরকে জ্ঞান এবং অনন্ত জীবনের লোভ দেখিয়েছিল। এই সূত্র ধ'রে কপটাচারী অহংকারী নাস্তিক এবং আত্মজাহিরকারী লেখক- কবি সম্প্রদায় তাদের জ্ঞানের তীব্রতা সামলাতে না পেরে এর মধ্যে প্রচ্ছন্ন বিদ্রোহের আগুনের সেঁকা খেয়ে দপ্ ক'রে জ্ব'লে উঠে ব'লে বসেন-তাহলে ইবলিসই ভালো; আল্লাহ চাননি যে মানুষ জ্ঞানী হোক, অথচ ইবলিস মানুষকে জ্ঞানের পথটা দেখিয়ে দিয়েছিল। প্রমিথিউস আগুন চুরি ক'রে (এখানে আগুন হলো জ্ঞানের প্রতীক) শাস্তি খেয়েছিল-আমরাও সেই জ্ঞানের পথের পথিক।- এভাবে তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। কিন্তু নির্বোধ ছাড়া আর সবাই একথা বোঝে যে ইবলিস তাদের আল্লাহর মুখোমখি হয়ে থাকা অখণ্ড আত্মচেতনাকে খণ্ডিত ক'রে জড়োদেহমুখী ক'রে দিয়েছিল, যার ফলে তারা আবিষ্কার করতে পারলেন যে তারা মূলত দেহসার দুটো জীব ছিলেন, যাদের পারস্পরিক বন্ধনের উছিলা হিসেবে আল্লাহর করুণা এবং একত্বকে বাদ দিলে বাকি থাকে কেবল নগ্ন দেহভিত্তিক যৌনতা, যা তাঁদের কাজে উন্মুক্ত হয়ে পড়াতে তাঁরা যারপরনাই লজ্জিত হলেন: তাঁরা বুঝতে পারলেন যে তারা খণ্ড আত্মচেতনাকে অবলম্বন ক'রে কেন্দ্রবিমুখী হ'য়ে পড়েছেন। এখন নিজেদেরকে বহির্মুখী অবস্থায় শতধাবিভক্ত ক'রে পাস্পরিক কলহ-বিবাদে জড়িয়ে পড়া ছাড়া তাদের আর কোনো পথ নেই। কি অভিশাপ! নিজেকে খণ্ড খণ্ড ক'রে নিজেরই খণ্ড আমিত্বের পক্ষে রায় দিতে গিয়ে নিজেদেরই বিরুদ্ধে খুন- খরাবি-হিংসা-লালসায় মত্ত হতে হবে:
শয়তান যা নিক্ষেপ করে, তিনি তা পরীক্ষাস্বরূপ করেন-তাদের জন্য যাদের অন্তরে ব্যধি আছে, যারা পাষাণ হৃদয়। সীমালঙ্ঘনকারীরা অশেষ মতভেদে আছে। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৫৩)
অতঃপর আমি বললাম হে আদম! (ইবলিস) তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু; সুতরাং সে যেন কিছুতেই তোমাদেরকে বেহেস্ত থেকে বের ক'রে না দেয়, দিলে তোমরা কষ্ট পাবে। তোমার জন্য এটাই থাকল যে, তুমি বেহেস্তে ক্ষুধার্ত হবে না ও বস্ত্রহীন (বা নগ্ন) হবে না। সেখানে পিপাসার্ত হবে না, এবং রৌদ্র-ক্লিষ্টও হবে না। অতঃপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিল; সে বলল-হে আদম! আমি কি তোমাকে ব'লে দেব অনন্ত জীবন দায়ী বৃক্ষের কথা ও অক্ষয় রাজ্যের কথা? অতঃপর তারা তার ফল খেল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল, এবং তারা উদ্যানের গাছের পাতা দিয়ে নিজেদেরকে আবৃত করতে লাগল। আদম তার প্রতিপালকের অবাধ্য হলো, ফলে সে পথভ্রষ্ট হলো। এরপর তার প্রতিপালক তাকে মনোনীত করলেন, তার প্রতি ক্ষমাপরবশ হলেন এবং তাকে পথ দেখালেন। তিনি বললেন-তোমরা একে অপরের শত্রুরূপে একই সাথে বেহেস্ত থেকে নেমে যাও। (সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১১৭-১২৩)
তখন শয়তান তাদেরকে বেহেস্তের বাগান থেকে নামিয়ে ছাড়ল, এবং তাদেরকে আনন্দময় অবস্থা থেকে বের ক'রে আনল যাতে তারা অবস্থান করছিল। আমি বললাম। “নেমে যাও সবাই, একে-অপরের মধ্যে শত্রুতা নিয়ে। কিছু সময়ের জন্য পৃথিবী হবে তোমাদের আবাসভূমি এবং রুজি-রোজগারের স্থান।" (সূরা বাকারা, আয়াত: ৩৬)
কিন্তু আল্লাহ তাদের কোনো ক্ষতি করেননি; তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে। (সূরা নহল, আয়াত: ৩৩)
তোমাদের অমঙ্গল তোমাদেরই। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১৯)
তোমরা সৎকাজ করলে তা করবে নিজেদের জন্যে এবং মন্দ কাজ করলে তাও করবে নিজেদের জন্য। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ৭)
যে সৎ কাজ করে, সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে, এবং কেউ মন্দ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। তোমার প্রতিপালক তাঁর দাস-দাসীদের প্রতি কোন জুলুম করেন না। (সূরা হা-মীম-আস্ সিজদাহ্, আয়াত: ৪৬)
মানুষের এই স্ববিরোধী আচরণের কারণ হলো আল্লাহর একত্ব এবং শ্বাশ্বত স্বভাবধর্ম সম্বন্ধে তার স্মৃতিলোপ এবং অনীহা। সব মানুষের হৃদয় হওয়া উচিত ছিল একটাই। অথচ মানুষ আজ শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত।
তোমাদের সকলের সৃষ্টি এবং পুনরুত্থান একটামাত্র প্রাণীর সৃষ্টি এবং পুনরুত্থানেরই অনুরূপ।
তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মে প্রতিষ্ঠিত কর। আল্লাহর স্বভাবের অনুসরণ কর, যে- স্বভাব অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর স্বভাবের কোনো পরিবর্তন নেই- এটাই সরল চিরস্থায়ী দ্বীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই (তা) জানে না। বিশুদ্ধ চিত্তে তাঁরই অভিমুখী হও; তাকে ভয় কর, নামাজ কায়েম কর ... (সূরা রুম, আয়াত: ৩০-৩১)
এতকাল অসীম বৈচিত্র্য এবং বহুত্ব ছিল তাঁদের স্বভাবের অংশ, তৃপ্তির ভিত্তি, এবং পূর্ণতার নিদর্শন। কারণ সব বহুত্ব এবং বৈচিত্র একই ঐক্যের বা তাওহীদের সুতোয় হৃদয়ের সাথে বাঁধা ছিল। আজ সেই বৈচিত্র্য ভেতর থেকে বাইরে প্রকাশিত হয়ে পড়ল।
হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যেন তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)
কিন্তু তাতে কোনো সমস্যা হতো না, যদি প্রত্যেক খণ্ড মানবের অমিত্ব বহির্মুখী কাল্পনিক বৃত্তের কেন্দ্রমুখী হয়ে স্বার্থপর এবং অহংকারী হয়ে না উঠত।
তাঁরা তাঁদের ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেন। আল্লাহ তাঁদেরকে ক্ষমা চাওয়ার সঠিক পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়ে নির্দিষ্ট কালের জন্য পৃথিবীতে অবস্থান করার আদেশ দিলেন, যে-মেয়াদের পর তাঁদেরকে এবং তাঁদের সন্তানদেরকে আবারও বাধ্যতামূলকভাবে কেন্দ্রমুখী হতে হবে।
রাব্বানা জ্বলামনা আংফুসানা অইল্লাম্স্তাগফিরলানা অতারহামনা লা-না কুনান্না মিনাল খছিরুন। অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নক্সের ওপর জুলুম করেছি। যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না কর, আমাদের প্রতি দয়া না কর, তাহলে অবশ্যই আমরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যাব।
তাঁদের তথা গোটা মানবজাতির নিয়তি এমনভাবে নির্ধারিত হলো যে, যে-কেউ বহির্মুখী থাকা অবস্থায় তার প্রকৃত কেন্দ্রকে ভুলে না যাবে, সে পরম বাস্তবতায় ফিরে গিয়ে আল্লাহর সাক্ষাতে লজ্জিত হবে না:
ইউনুস রসূলগণের অন্তর্ভুক্ত ছিল। যখন সে পরিপূর্ণ নৌকার দিকে পলায়ন করেছিল, তখন তার ভাগ্য নির্ণয় কর হলো, ফলত সে (সমুদ্রে) নিক্ষিপ্তগণের অন্তর্গত হলো। পরে এক বৃহদাকার মৎস তাকে গিলে ফেলল, তখন সে ধিক্কারযোগ্য। সে যদি আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা না করত, তাহলে তাকে মাছের পেটে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত থাকতে হতো। (সূরা সাফ্ফাত, আয়াত: ১৩৯-১৪৪)
তোমাদের নিটক শাস্তি আসার আগেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের দিকে মুখ ফিরাও এবং তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ কর। শান্তি এসে পড়লে সাহায্য পাবে না। তোমাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের ওপর অতর্কিতভাবে শাস্তি আসার আগেই তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালক যে উত্তম কেতাব অবতীর্ণ করেছেন তার অনুসরণ কর, যেন (পরে) কাউকে বলতে না হয়-হায়! আল্লাহর প্রতি আমার কর্তব্যে আমি তো শৈথিল্য করেছি এবং আমি ঠাট্টবিদ্রূপ করতাম। অথবা কেউ যেন না বলে-আল্লাহ আমাকে পথপ্রদর্শন করলে আমি তো অবশ্যই সংযমীদের অন্তর্গত হতাম। (সূরা যুমার, আয়াত: ৫৪-৫৭)
আমি তোমাদের মধ্যে একজনকে অপরের পরীক্ষাস্বরূপ করেছি। তোমারা ধৈর্যধারণ করবে কি? তোমার প্রতিপালক সবকিছু দেখেন। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ২০)
আমি প্রত্যেক জনপদে অপরাধীদের প্রধানদেরকে সেখানে চক্রান্ত করার অবকাশ দিয়েছি; কিন্তু তারা নিজেদের বিরুদ্ধে ছাড়া চক্রান্ত করে না। কিন্তু তারা তা বুঝতে পারে না। (সূরা আন'আম, আয়াত: ১২৩)
কখন কেয়ামত হবে তা কেবল আল্লাহই জনেন। তিনি ... জানেন যা জরায়ুতে আছে; কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে, এবং কেউ জানে না কোন দেশে তার মৃত্যু ঘটবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ। (সূরা লোকমান, আয়াত: ৩৪)
... আমি অবিশ্বাসীদের দৃষ্টিতে তারা যা করছে তা শোভনীয় করেছি। (সূরা আন'আম, আয়াত: ১২২)
আল্লাহ বিশ্বাসীদের মনোরোগ নিরাময় ক'রে দেবেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ১৪)
আমি তাদের ভোগান্তিকে/দুঃখ-কষ্টকে সমৃদ্ধিতে রূপান্তরিত ক'রে দিয়েছিলাম। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৯৫)
নিশ্চয়ই আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত বিশ্রামের প্রশান্তি পায়। (সূরা রা'দ, আয়াত: )
আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে আগেই যে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন, তোমরা যদি তাতে বিশ্বাসী হও, তাহলে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে কে সে তোমাদের বাধা দেয়? (সূরা হাদীদ, আয়াত: ৮)
আল্লাহ কখনও তার বান্দাদের সাথে অন্যায় আচরণ করেন না। (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫১)
যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ১০৮)
তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, তাই আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গেছেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৬৭)
যে অবিশ্বাস করে, অবিশ্বাসের জন্য সেই দায়ী; যারা সৎকাজ করে তারা নিজেদের জন্যই রচনা করে সুখশয্যা। কারণ যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে পুরস্কৃত করেন। (সূরা রুম, আয়াত: ৪৪-৪৫)
তারা অন্যদেরকে এ (কোরআন) থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, এবং নিজেদেরকেও; কিন্তু তারা তো শুধু নিজেদের আত্মাকেই ধ্বংস করে, কিন্তু তারা তা বোঝে না। (সূরা আন'আম, আয়াত: ২৬)
হে মানবজাতি, তোমাদের ঔদ্ধত্য তোমাদেরই বিরুদ্ধে যায়। (সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৩)
হে মানুষ! নিশ্চয় তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে কঠোর সাধনায় সাধনা কর, তবে তার দর্শন লাভ করবে। (সূরা ইনশিক্বাক, আয়াত: ৬)
যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর শান্তি থেকে সাবধান থাকে, তারাই সফলকাম। (সূরা নূর, আয়াত: ৫২)
যে ব্যক্তি তওবা করে ও সৎকাজ করে সে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অভিমুখী হয়। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ৭১)
যারা আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর শান্তি থেকে সাবধান থাকে তারাই সফলকাম। (সূরা নূর, আয়াত: ৫২)
তোমাদের প্রতিপালক বলেন—তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব; যারা অহংকারে আমার নামে বিমুখ, তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (সূরা মুমিন, আয়াত: ৬০)
তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণে স্মরণ কর। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৪১)
তারা ক্ষমাপ্রার্থনা (তওবা) করলে তাদের জন্য কল্যাণ হবে, কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে-আল্লাহ তাদের ইহকালে ও পরকালে যন্ত্রণাপ্রদ শাস্তি দেবেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৭৪)
কিন্তু যে-কেউ তাঁর কাল্পনিক বহির্মুখী বৃত্তের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ ক'রে ঘুরবে, অর্থাৎ উদ্ভ্রান্ত আমিত্বকে এবং উচ্ছৃঙ্খল আশা-আকাঙ্খাকে উপাসক বানিয়ে নেবে, সার্বিক ভারসাম্যের কথা বিবেচনায় আনবে না, সে যখন কেন্দ্রমুখী হবে তখন তার কেন্দ্র প্রকৃত কেন্দ্রকে বিকর্ষণ করবে ব'লে সে নিজেরই আমিত্ব দ্বারা নির্মিত দোজখের আগুনে পুড়তে থাকবে।
আল্লাহ সর্বদাই করূণাময়। তাঁর করুণা তাঁর আক্রোশকেও অতিক্রম ক'রে যায়। তাঁর ভালোবাসাই কারো জন্য বেহেস্ত, কারো জন্য দোজখ। বিড়ালকে ভালোবাসা মানে ইঁদুরের মৃত্যুর কারণ হওয়া; অপরপক্ষে ইঁদুরকে ভালোবাসা মানে বিড়ালের অনাহারে থাকার কারণ হওয়া। তিনি সবাইকে একই কাতারে থাকতে বলেছেন। আমরা কাতারচ্যুত হলে সে দায়-দায়িত্ব আমাদের। তিনি পরকালে তার করুণাই প্রকাশ করবেন। কিন্তু তা তাদের জন্য আক্রোশ হয়ে দেখা দেবে যাদের পেটে ঘি সয় না। সে দোষ আল্লাহর নয়। তিনি সকল দোষ এবং প্রশ্নের উর্দ্ধে:
দয়া করাকে তিনি তাঁর কর্তব্য হিসেবে স্থির করেছেন। কেয়ামতের দিন অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে একত্রিত করবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারাই অবিশ্বাস করবে যারা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলেছে। (অর্থাৎ তিনি সবাইকে একত্রিত করবেন তাঁর দয়ার আকর্ষণ দ্বারা, কিন্তু সেই দয়ার দান গ্রহণ করার উপযুক্ত যে হয়নি, সে নিজেরই সৃষ্ট নরকে নিজে পুড়বে।) (সূরা আন'আম, আয়াত: ১২)
আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি। আর আমার দয়া-তা তো প্রত্যেক বস্তুতেই প্রাপ্ত। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬)
তুমি কখনও আল্লাহর বিধানে কোনো পরিবর্তন পাবে না। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৬২)
আমি কাউকেই তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপাই না। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৪২)
যারা বিশ্বাসী তারা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখুক। (সূরা মাঈদা, আয়াত: ১১)
হে মানবজাতি, তোমাদের ঔদ্ধত্য তোমাদেরই বিরুদ্ধে যায়। (সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৩)
তিনি যা করেন সে ব্যাপারে তাঁকে প্রশ্ন করা যাবে না, বরং ওদেরকে প্রশ্ন করা হবে। (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ২৩)
বুঝাই যাচ্ছে যে আল্লাহ মানুষকে একত্র করবেন তাঁর দয়ার আকর্ষণ দিয়েই, অথচ সেই দয়াই কতক লোকের জন্য শাস্তি স্বরূপ হবে। ধরুন এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু তার ভালোবাসা এবং সরলতার সুযোগ নিয়ে তার উদ্ভ্রান্ত স্ত্রী অন্য এক পুরুষের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ক’রে তা চালু রাখতে থাকে। কিন্তু তার স্বামী সব জেনেও না জানার ভান করে এবং তাকে দ্বিগুণ ভালোবাসতে থাকে। এক পর্যায়ে তার স্ত্রী তার ভুল বুঝতে পারে এবং আগের পথে ফিরে যায়। সে তার ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং স্বামীর সাথে স্বাভাবিক হওয়ার জন্য কিছু শাস্তিও মনে মনে কামনা করে। কিন্তু তার স্বামী তাকে শাস্তি দেয়া তো দূরে থাক, আরো বেশি ক'রে ভালোবাসতে থাকে। ফলে লজ্জাহত স্ত্রীলোকটার কাছে স্বামীর এই ভালোবাসাই অসহনীয় শাস্তি ব'লে মনে হতে থাকে। সে তার বিবেকের এবং স্বামীর ভালোবাসার আগুনে জ্বলতে থাকে। প্রায়শ্চিত্ত ছাড়া তার পক্ষে আর স্বাভাবিক হবার কোনো উপায় নেই। ফলে সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
আল্লাহ সবাইকে ভালোবাসেন। তা তিনি কোরআনেও ঘোষণা করেছেন :
আল্লাহ কখনও তার বান্দাদের সাথে অন্যায় আচরণ করেন না। (সূরা আনফাল, আয়াত : ৫১)
আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি। আর আমার দয়া—তা তো প্রত্যেক বস্তুতেই প্রাপ্ত। (সূরা আ'রাফ, আয়াত : ১৫৬)
যেদিন আকাশ মেঘাপুঞ্জসহ বিদীর্ণ হবে এবং ফেরেস্তাগণকে নামিয়ে দেয়া হবে, সেদিনই প্রকৃত কর্তৃত্ব হবে দয়াময়ের এবং সত্য প্রত্যখ্যানকারীদের জন্য সেদিন হবে কঠিন। (সূরা ফোরকান, আয়াত : ২৫-২৬)
শেষোক্ত আয়াতের প্রতি বিশেষ নজর দেয়া চাই। এখান থেকেই বুঝা যাচ্ছে যে তিনি প্রকৃত কর্তৃত্ব ফিরিয়ে নেবেন তাঁর ভালোবাসা এবং দয়ার শক্তি দ্বারা, আক্রোশের নয়, কিন্তু অকৃতজ্ঞ হৃদয় পরকালে তাঁর এই ভালোবাসার বিপরীতে নিজের মধ্যে দোজখের আগুন দেখতে পাবে। তখন যে প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য বারবার মৃত্যু চাইবে, কিন্তু সে সুযোগ আর থাকবে না :
আজ তোমরা একবারের জন্য ধ্বংস কামনা ক'র না, বহুবার ধ্বংস কামনা করতে থাক। (সূরা ফোরকান, আয়াত : ১৪)
কেন্দ্র সর্বদাই আকর্ষণ করে, কখনও বিকর্ষণ করে না। কেন্দ্র সর্বদাই ভালোবাসে, কখনও দূরে ঠেলে না। কিন্তু বহির্মুখী আত্মচেতনা সেই ভালোবাসাকে অস্বীকার করতে করতে নিজের মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে যা পরবর্তীতে কেন্দ্রমুখী হলে দোজখের আগুনের রূপ নেয়। তখন কেন্দ্রের ভালোবাসার তীব্রতা তার কল্পিত কেন্দ্রের আগুনের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়।
দয়া করাকে তিনি তাঁর কর্তব্য হিসেবে স্থির করেছেন। কেয়ামতের দিন অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে একত্রিত করবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারাই অবিশ্বাস করবে যারা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলেছে। (সূরা আন'আম, আয়াত : ১২)
সে আগুনে নিজে পোড়া ছাড়া অন্যকে তার ভাগ দেয়ার কোনো উপায় নেই। আল্লাহ ছাড়া তখন কেউই সহায় হবে না। কোরআনে তাই তো বলা হয়েছে:
তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণে স্মরণ কর। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৪১)
তারা ক্ষমাপ্রার্থনা (তওবা) করলে তাদের জন্য কল্যাণ হবে, কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে-আল্লাহ তাদের ইহকালে ও পরকালে যন্ত্রণাপ্রদ শাস্তি দেবেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৭৪)
তোমাদের প্রতিপালক বলেন- তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব; যারা অহংকারে আমার নামে বিমুখ, তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (সূরা মুমিন, আয়াত: ৬০)
তোমাদের উপাস্যই একমাত্র উপাস্য, সুতরাং যারা পরলোকে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর সত্য-বিমুখ এবং তারা অহংকারী। এ নিঃসন্দেহ যে, আল্লাহ জানেন যা ওরা গোপন করে এবং যা ওরা প্রকাশ করে। তিনি অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা নহল, আয়াত: ২২-২৩)
অর্থাৎ আমাদের স্বেচ্ছাচারী, অহংকারী আত্মচেতনাই দোজখে পুড়বে, চেতনা নয়। চেতনা বা চৈতন্য হলো সার্বিক বাস্তবতার অখণ্ডিত প্রতিচ্ছবি। মনের আদমীয় স্তরে, বেহেস্ত থেকে পতনের আগে, আত্মচেতনা চেতনার সামগ্রিকতাকে স্বীকৃতি দিত-ফলে তখন অস্তিত্বের ধারণকারী ফর্মুলা ছিল একটাই-তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ব। আদম-হাওয়া (আঃ) আল্লাহর একত্বের রজ্জুতে তাঁর সাথে এমনভাবে বাঁধা ছিলেন যে আল্লাহই ছিলেন তাঁদের নিকটতম প্রতিবেশী, যা হাদীসে বলা হয়েছে। কিন্তু তথাকথিত জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেয়ে আদম-হাওয়া (আঃ) সংকীর্ণ আত্মজ্ঞান লাভ করলেন-তাঁরা আর আল্লাহর সাথে লীন হয়ে বা প্রেমপূর্ণভাবে আবদ্ধ হয়ে থাকতে পারলেন না। তাদের খণ্ডিত আত্মচেতনার আলোর পেছনে যে প্রখর আগুন ছিল তা তারা টের পেলেন আল্লাহ-কেন্দ্রিকতা ভুলে যাবার পরেই, আগে নয়। তবে এখনও যে-কেউ আল্লাহ কেন্দ্রিক হয়ে তাঁরই দিকে মুখ ক'রে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছে:
ইন্নি অজ্জাহাতু অজিহালিল্লাজি ফাতারাস্ সামাওয়াতি অয়াল আরদা হানীফাও অমা-আনা মিনাল মুশরিকীন।
সে মুক্তি পেয়েছে-কার কবল থেকে? - নিজের আমিত্বের আগুনের কবল থেকে। আমরা নামাজে দাঁড়িয়েই এই আয়াতটা পড়ি। হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর প্রশ্নাতুর মন যখন সৃষ্টিজগতের পুজোর বাসনা ছেড়ে তাঁর ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর দিকে মুখ ক'রে দাঁড়ালেন, তখন তিনি এই শব্দগুলো উচ্চারণ করেছিলেন।
... আমি ইব্রাহীমকে আসমান ও জমিনের পরিচালনা-ব্যবস্থা দেখাই, যেন সে নিশ্চিত বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। তারপর যখন তার ওপর রাত আচ্ছন্ন হলো, তখন সে নক্ষত্র দেখে বলর, এটাই আমার প্রতিপালক। অতঃপর যখন তা অস্তমিত হলো, তখন সে বলল, যা অস্তমিত হয় আমি তা পছন্দ করি না। অতঃপর যখন সে চন্দ্রকে উদিত হতে দেখল, তখন সে বলল, এটাই আমার প্রতিপালক। যখন সেটাও অস্তমিত হলো, তখন সে বলল, আমাকে আমার প্রতিপালক সৎপথ প্রদর্শন না করলে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হব। অতঃপর যখন সে সূর্যকে উদিত হতে দেখল, তখন বলল, এটাই আমার প্রতিপালক। এটাই সর্ববৃহৎ। যখন তাও অস্তমিত হলো, তখন সে বলল-হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যাকে আল্লাহর সমকক্ষ কর, তা থেকে আমি মুক্ত। নিশ্চয় আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁরই দিকে মুখ স্থাপন করলাম যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। এবং আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই। (সূরা আন'আম, আয়াত: ৭৫-৭৯)
আমরা আমাদের ওপরই জুলুম ক'রে থাকি। এজন্য আল্লাহর মুখোমুখী হয়ে আমাদেরকে বিনীতভাবে দোয়া করতে হয়। হযরত আবু বকর (রাঃ) রসুলুল্লাহ (সঃ) কে অনুরোধ করলেন এমন একটা দোয়া শিখিয়ে দিতে যা তিনি নামাজের মধ্যে পড়তে পারবেন। রসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এই দোয়াটা শিখিয়ে দিয়েছিলেন:
আল্লাহুম্মা ইন্নি জ্বালামু নাক্সি জুম্মান কাছিরাও অলাইয়াগফিরুজ্জুনূবা ইল্লা আনতা ফাগফিরলি মাগফিরাতাম্ মিন্ 'ইন্দিকা অরহামনী ইন্নাকা আন্তাল গাফুরুর রহীম।
অর্থ: হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আমার নক্সের ওপর জুলুম করেছি, বড় ধরনের জুলুম। এবং তুমি ছাড়া ক্ষমা করার কেউ নেই। সুতরাং তোমার পক্ষ থেকে আমাকে ক্ষমা ক'রে দাও। এবং আমার প্রতি দয়া কর। নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।
আমাদের আত্মচেতনা সহ গোটা আমিত্বের ধারক ও বাহককে একত্রে বলা হয় নফস বা Soul বা আত্মা। এর জীবনের উৎস হলো রূহ্। এই নক্সের ওপর জুলুম করা মানেই হলো একে কেন্দ্রবিমুখী ক'রে রাখা, পার্থিব বাহ্যিক ভোগলালসায় মত্ত রাখা।
তাহলে আমরা আবার সেই দেহতত্ত্বে ফিরে যাই। দৃশ্যজগতের সার্বিক ভারসাম্য দ্বারা তার অন্তর্ভুক্ত প্রত্যেকটা ব্যক্তির এবং ব্যবস্থার ভারসাম্য নির্ধারিত। প্রত্যেকটা সাব-সিস্টেমের (যেমন মানুষ, জলবায়ু) রয়েছে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় নিজস্ব চলার পথ। এই গোটা পথটাকেই তার গতিশীলতার ভারসাম্য ব'লে আখ্যায়িত করা যায়। এই ভারসাম্যের অর্থ হলো: কোনো ব্যক্তির নিজস্ব জীবনের পরম উদ্দেশ্য হলো তার নিজস্ব গতিশীলতার ভারসাম্যের পথ ধ'রে চলা। এই পথ ধ'রে চললে তার দেহ-মন-আত্মা ইত্যাদি সার্বিকতার যে সমন্বয় বজায় থাকবে, তার ইহকাল এবং পরকালের জন্য সেটাই সবচেয়ে উত্তম অবস্থা। এর একটু এদিক-ওদিক হলে যে বিচ্যুতি বা অনিয়ম দেখা দেবে তা পূরণ হবে দৈহিক বা মানসিক বা আর্থিক বিপদাপদের আবির্ভাবের মধ্যে দিয়ে, কারণ বিচ্যুতি যদি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম না করে তাহলে ভারসাম্য বিঘ্নিত হয় না, শুধু বিচ্যুতির সাথে সংশ্লিষ্ট একটা উপসর্গের সৃষ্টি হয়ে তার তাৎক্ষণিক খেসারত হয়ে যায়।
উদাহরণস্বরূপ, আপনি এক দিনে ঠান্ডা পানি দিয়ে পাঁচবার গোছল করলেন। সেক্ষেত্রে আপনার জ্বর হতেও পারে। কারণ শরীর থেকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপ বের হয়ে গেছে। জ্বর তো এই তাপের ঘাটতিই পূরণ করছে, নয় কি? তাহলে এক্ষেত্রে জ্বরের কী দোষ? তার যখন আসবার কথা সে তখন এসেছে কিনা এটাই দেখবার বিষয়। জ্বরের মাধ্যমে শরীরে তাপের ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা না থাকলে, অর্থাৎ কোনো ঘাটতিকে পূরণের ব্যবস্থা না থাকলে, স্থায়ী ঘাটতি সৃষ্টি হতে থাকত। এটাই হতো অস্বাভাবিক, উদ্দেশ্যহীনতার লক্ষণ। কিন্তু প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব ভারসাম্যবিন্দু একই সাথে একটা লক্ষ্য এবং একটা উৎস: উৎস এজন্যে যে তা থেকেই ব্যক্তির যাবতীয় আচরণ-ঘাটতির প্রতি সাড়া দেয়া হবে, ফলে তা তার সার্বক্ষণিক শিক্ষক এবং গতিবিধির উৎস, এবং গন্তব্য এ জন্য যে তাকে সেই ভারসাম্যের শর্তকে সর্বদা বজায় রাখার চেষ্ট করতে হবে, নইলে তাকে ঘাটতির কষ্ট পেতে হবে। এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আছে ব'লে আমরা নিশ্চিতভাবে আস্থার সাথে জীবন-যাপন করতে পারি, এই ভেবে যে আমি নিজের প্রতি লক্ষ্য রাখি বা না রাখি, আমার ভারসাম্য আমার দিকে লক্ষ্য রাখছে; আমার কোনো ভুলত্রুটি হয়ে গেলে সে আমাকে রোগ-ব্যাধির মাধ্যমে জানিয়ে দেবে। এজন্য রোগ-ব্যাধিকে হাদিসে দেহের সাদকা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে-তা আচরণের ত্রুটির খেসারত বা সাদকা স্বরূপ।
সঠিক আচরণবিধি থেকে যত ধরনের বিচ্যুতি হয়ে থাকে তাদেরকে নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা যায়:
ভ্রান্তি-যা ব্যক্তি স্বেচ্ছায় করে না
ত্রুটি-যা ব্যক্তি স্বেচ্চায়, সচেতনভাবে করে।
এদের মধ্যে প্রথম বিচ্যুতির ফল পরকালে পৌঁছায় না ব'লে তার সমস্তটুকু ইহজীবনেই ভোগ করতে হয়। দ্বিতীয় ধরনের ভুল মনের কপটতা এবং পাপ-প্রবণতা থেকে উদ্ভূত হয়। তবুও একটা বিশেষ সীমা (যা সংশ্লিষ্ট পাপের জঘন্যতা, তা থেকে উদ্ভূত ক্ষতির পরিমাণ, ক্ষতিগ্রস্ত লোকের সংখ্যা, ক্ষতির প্রকৃতি পাপকারীর অন্যান্য ভালোকাজের প্রকৃতি এবং পরিমাণ, ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীল) অতিক্রম করার আগ পর্যন্ত তা চূড়ান্তভাবে পরকালের খাতায় লেখা হয় না, তার ফলকে ব্যক্তির ওপর ইহকালে বিভিন্ন বিদাপদের মাধ্যমে চাপানো হয়। বিপদ চাপানো মানেই হলো ভারসাম্যকে ঠিক রাখা-ব্যক্তিকে সম্মানের গদি থেকে নামিয়ে দেয়া হয় না, কেবল জরিমানা করা হয় মাত্র। যেমন, হযরত সুফিআন সওরী (রঃ) মারা গেলে আল্লাহ তাঁকে বললেন-তুমি অত কাঁদতে কেন? তিনি জবাব দিলেন-তুমি আমাকে ক্ষমা কর কিনা সেই ভয়ে। আল্লাহ বললেন-লজ্জা করতো না কাঁদতে? তুমি জানতে না যে আমি পরম করুণাময়? তোমার কান্না দেখে আমি তো লেখককে আদেশ ক'রে দিয়েছিলাম তোমার কোনো খারাপ কাজ লিপিবদ্ধ না করতে। কোরআনেও এই অপূর্ব ক্ষমার কথা বলা হয়েছে:
বড় শাস্তির আগে আমি ওদেরকে অবশ্যই ছোট শাস্তি আস্বাদন করাব, যেন ওরা (আমার দিকে) ফিরে আসে। (এটাও এক ধরনের ক্ষমা।) (সূরা সিজদাহ, আয়াত: ২১)
তারা ক্ষমাপ্রার্থনা (তওবা) করলে তাদের জন্য কল্যাণ হবে, কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে-আল্লাহ তাদের ইহকালে ও পরকালে যন্ত্রণাপ্রদ শাস্তি দেবেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৭৪)
অতঃপর আমি বললাম হে আদম! (ইবলিস) তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু; সুতরাং সে যেন কিছুতেই তোমাদেরকে বেহেস্ত থেকে বের ক'রে না দেয়, দিলে তোমরা কষ্ট পাবে। তোমার জন্য এটাই থাকল যে, তুমি বেহেস্তে ক্ষুধার্ত হবে না ও বস্ত্রহীন (বা নগ্ন) হবে না। সেখানে পিপাসার্ত হবে না, এবং রৌদ্র-ক্লিষ্টও হবে না। অতঃপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিল; সে বলল-হে আদম! আমি কি তোমাকে ব'লে দেব অনন্ত জীবন দায়ী বৃক্ষের কথা ও অক্ষয় রাজ্যের কথা? অতঃপর তারা তার ফল খেল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল, এবং তারা উদ্যানের গাছের পাতা দিয়ে নিজেদেরকে আবৃত করতে লাগল। আদম তার প্রতিপালকের অবাধ্য হলো, ফলে সে পথভ্রষ্ট হলো। এরপর তার প্রতিপালক তাকে মনোনীত করলেন, তার প্রতি ক্ষমাপরবশ হলেন এবং তাকে পথ দেখালেন। তিনি বললেন-তোমরা একে অপরের শত্রুরূপে একই সাথে বেহেস্ত থেকে নেমে যাও। (সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১১৭-১২৩)
বল, যারা বিভ্রান্তিতে আছে, দয়াময় তাদেরকে প্রচুর অবকাশ দেবেন। যতক্ষণ না তারা প্রত্যক্ষ করবে যে বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে-তা শাস্তি হোক অথবা কেয়ামত হোক। (সূরা মরিয়ম, আয়াত: ৭৪)
আমি তাদেরকে সময় দিয়ে থাকি। আমার কৌশল অত্যন্ত বলিষ্ঠ। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৮৩)
... আল্লাহ তার কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর যে করুণা বর্ষণ করেছেন তা কখনও পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের মনকে পরিবর্তন না করে ... (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫৩)
যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ১০৮)
যে ব্যক্তি তওবা করে ও সৎকাজ করে সে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অভিমুখী হয়। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ৭১)
আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি। আর আমার দয়া-তা তো প্রত্যেক বস্তুতেই প্রাপ্ত। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬)
কেয়ামতের ঘোষণা না থাকলে ওদের ফলাসালা তো হয়েই যেত। (কিন্তু তিনি তাদের ভুল শোধরাবার সুযোগ দিচ্ছেন।) (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ, আয়াত: ২১)
কারো আয়ু বৃদ্ধি হলে বা হ্রাসপ্রাপ্ত হলে তা তো হয় কেতাব (সংরক্ষিত ফলক) অনুসারে। (এভাবেও তিনি তাঁর করুণা বর্ষণ করেন।) (সূরা ফাতির, আয়াত: ১১)
পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করার আগেই তা লিপিবদ্ধ করি; আল্লাহর পক্ষে এ অতি সহজ। এ জন্য যে, তোমাদের ওপর যা অতীত হয়েছে (অর্থাৎ যা হারিয়েছে), তার জন্য দুঃখিত হয়ো না, এবং তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তার জন্য হর্ষোৎফুল্ল হয়ো না, আল্লাহ উদ্ধত অহংকারীকে ভালোবাসেন না। (সূরা হাদীদ, আয়াত: ২২-২৩)
আমি কি তোমাদের দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে তখন কেউ সতর্ক হবে চাইলে সতর্ক হতে পারতে না? (এই দীর্ঘ জীবনটাই সবচেয়ে বড় করুণা) (সূরা ফাতির, আয়াত: ৩৭)
তুমি [হে মুহাম্মদ (সাঃ)] বল যারা নিজ জীবনের প্রতি জুলুম করেছ, তারা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহর সমস্ত পাপ ক্ষমা ক'রে দেবেন; তিনি নিশ্চয় ক্ষমাশীল, দয়াময়। (সূরা যুমার, আয়াত: ৫৩)
তারা ক্ষমাপ্রার্থনা (তওবা) করলে তাদের জন্য কল্যাণ হবে, কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে-আল্লাহ তাদের ইহকালে ও পরকালে যন্ত্রণাপ্রদ শাস্তি দেবেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৭৪)
...যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে আমি নিশ্চয়ই তাদের মন্দকাজগুলো মিটিয়ে দেব, এবং তাদের কাজের উত্তম ফল দেব। (সূরা আনকাবুত, আয়াত: ৭)
কেউ কোনো সৎকাজ করলে সে তার দশগুণ পাবে এবং কেউ কোনো অসৎ কাজ করলে তাকে শুধু তারই প্রতিফল দেয়া হবে, আর তারা অত্যাচারিত হবে না। (সূরা আন'আম, আয়াত: ১৬০)
কিন্তু ব্যক্তির ঔদ্ধত্য চরমে যেতে থাকলে তার ওপর পার্থিব বিপদাপদ বহুগুণে বর্ধিত ক'রে দেয়া হয়, যেন সে তওবা ক'রে পথে ফিরে আসার সুযোগ পায়:
আমি তোমাদের শান্তি কিছুকালের জন্য রহিত করলে তোমরা তো আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। (সূরা দোখান, আয়াত: ১৫)
মানুষের কৃতকর্মের জন্য জলে স্থলে বিপদ ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে ওদেরকে ওদের কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করানো হয়, যেন ওরা পথে ফিরে আসে। (সূরা রুম, আয়াত: ৪১)
সত্য যদি ওদের কামনা বাসনার অনুগামী হতো, তাহলে আকাশমণ্ডলী পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। (সূরা মোমেনুল, আয়াত: ৭১)
আমি যখন মানুষকে অনুগ্রহের স্বাদ দিই, তখন ওরা ওতে আনন্দিত হয়। এবং ওদের কৃতকর্মের ফলে ওরা দুর্দশাগ্রস্ত হলেই ওরা হতাশ হয়ে পড়ে। (সূরা রুম, আয়াত: ৩৬)
কিন্তু তার পরও যদি ব্যক্তি না বোঝে, কিন্তু সে বিশ্বাসী হয়, তাহলে তাকে আল্লাহ করুণা ক'রে পাশাপাশি বেশি বেশি ভালো কাজ করার সুযোগ ক'রে দিতে পারেন।
কিংবা তিনি যদি মনে করেন যে তাকে মৃত্যু দেবেন বা তার আয়ু বাড়িয়ে দেবেন, তাহলে তাও করতে পারেন।
কারো আয়ু বৃদ্ধি হলে বা হ্রাসপ্রাপ্ত হলে তা তো হয় কেতাব (সংরক্ষিত ফলক) অনুসারে। (সূরা ফাতির, আয়াত: ১১)
প্রকৃতপক্ষে সব কিছুর ক্ষেত্রেই আদেশ আল্লাহর। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩১)
কিন্তু আল্লাহর উদ্দেশ্য থাকে বান্দার পরকালের পথটাকে পিরষ্কার ক'রে রাখা, যদি সে বিশ্বাসী হয়। একটা হাদিসে আছে, আল্লাহ রসুলুল্লাহ (সঃ) কে বলছেন:
আমার কোনো বিশ্বাসী বান্দা যদি পাপ করে তাহলে আমি ইহকালে তাকে রোগ-ব্যাধি অভাব-অনটন ইত্যাদি বিপদাপদ দিয়ে ভ'রে দেই। তাতেও যদি তার পাপ না কাটে, তাহলে তার মৃত্যুর যন্ত্রণা বাড়িয়ে দেই। তাতেও যদি তার পাপ অবশিষ্ট থাকে তাহলে আমি তার কবরের আযাব বাড়িয়ে দেই, যেন তার পরকালের অনন্ত জীবন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
দেখলেন আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের লক্ষ্য কোনদিকে? আমাদের চিন্তা বড়জোর মৃত্যু পর্যন্ত পৌঁছায়, অথচ তাঁর চিন্তা আমাদের পরকাল নিয়ে, যা সচরাচর আমাদের চিন্তায় গাঢ়ত্ব লাভ করতে চায় না, যেহেতু আমরা সবাই বর্তমানটা নিয়েই ব্যস্ত। মানুষ বড়ই অস্থির। তা কোরআনেই বলা হয়েছে। কোরআনে আল্লাহ বলছেন যে, আমাদের মঙ্গল-অমঙ্গল আমাদের অনুভূতির যুক্তিতে ধরা পড়ার নয়।
সত্য যদি ওদের কামনা বাসনার অনুগামী হতো, তাহলে আকাশমণ্ডলী পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। (সূরা মোমেনুল, আয়াত: ৭১)
মানুষ অধিকাংশ ব্যাপারেই বিতর্কপ্রিয়। (সূরা কাহাফ, আয়াত: ৫৪)
তোমরা অনুমান ও নিজেদের স্বভাবের অনুসরণ কর, যদিও তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পথনির্দেশ এসেছে। (সূরা নাজম, আয়াত: ২৩)
আমি কি তোমাকে জানাব কার প্রতি শয়তান অবতীর্ণ হয়? ওরা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটা ঘোর বিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। ওরা কান পেতে থাকে, এবং ওদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। এবং কবিদেরকে অনুসরণ করে তারাই যারা বিভ্রান্ত। তুমি কি দেখ না, ওরা লক্ষ্যহীনভাবে সর্ব বিষয়ে কল্পনা-বিহার ক'রে থাকে। এবং ওরা যা বলে তা করে না। তবে তাদের কথা আলাদা যারা বিশ্বাস করে ও সৎ কাজ করে এবং আল্লাহকে বারবার স্মরণ করে ... (সূরা শুয়ারা, আয়াত: ২২১-২২৭)
তুমি কি দেখো না তাকে যে তার কামনা-বাসনাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তুমি কি মনে কর যে ওদের অধিকাংশ শোনে ও বোঝে? ওরা তো পশুর মতোই, বরং ওরা আরো অধম। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ৪৩-৪৪)
মানুষ যেভাবে কল্যাণ কামনা করে সেইভাবেই অকল্যাণ কামনা করে। মানুষ তার মনে যা আসে তার পরিণাম চিন্তা না ক'রে তার আশু রূপায়ণ কামনা করে। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ১১)
তারাই বিশ্বাসী যারা আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি বিশ্বাস করার পর সন্দেহ পোষণ করে না... (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১৫)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রসুলুল্লাহ (সঃ) কে আরও বলেছেন পূর্ববতী কথাটার ঠিক উল্টো কথাটাও :
কোনো অবিশ্বাসী যখন কোনো ভালো কাজ করে তখন আমি তার পুরস্কারস্বরূপ তাকে সুস্বাস্থ্য, ভোগ-উপভোগের উপকরণ, অঢেল সম্পদ, মান-যশ ইত্যাদি দান করি। কিন্তু তাতেও যদি তার পুণ্য কিছু বাকি রয়ে যায় তাহলে আমি তার মৃত্যুর যন্ত্রণা কমিয়ে দেই। তাতেও যদি তার পুন্য কিছুটা অবশিষ্ট থাকে তাহলে আমি তার কবরের আযাব লাঘব ক'রে দেই, যেন সে পরকালের অনন্ত জীবনে দোজখের আগুনে জ্বলতে পারে।
কি বিস্ময়কর! আসলে এই পদ্ধতিটিই ঢুকানো রয়েছে ভারসাম্যের মধ্যে- ভারসাম্য একটা মজবুত বাক্সের মতো, তাতে আছে কিছু জ্বালানি : আপনি যতটুকু জ্বালানি খারাপ কাজে খরচ করবেন ততটুকুর জায়গা আপনার জন্য দোজখ আকারে সঞ্চিত থাকবে; আর আপনি যতটুকু জ্বালানি পুড়িয়ে ভালো কাজ করবেন, ততটুকু জায়গায় পুন্য সঞ্চিত হবে, যার বিনিময় হলো প্রশান্তি এবং আনন্দ-কিন্তু আপনি যদি আল্লাহকে বা পরকালকে বিশ্বাস না করেন, তাহলে আপনার পুন্যের সবটুকুকে ইহকালে দিয়ে দেয়া হবে; অপরপক্ষে আপনি যদি গভীরভাবে বিশ্বাসী হন, তাহলে আপনার বাক্সটাকে এমনভাবে দুই ভাগে ভাগ করা হবে যেন সব খারাপ কাজের ফল ইহকালের এবং সব ভালো কাজের ফলই পরকালের ভাগে পড়ে। তখন ইহকালে আপনাকে শুধু তাই দেয়া হবে যা না হলে আপনার স্বাভাবিক জীবনধারা ব্যাহত হবে। আল্লাহ কোরআনেই বলেছেন যে, যে-কেউ ইহকাল চায়, তাকে সব প্রাপ্য ইহকালেই দিয়ে দেয়া হয়। এ হলো আল্লাহর করুণা-হয় আমি যা চাচ্ছি তিনি আমাকে তা দিচ্ছেন, না হয় তিনি আমাকে তাই দিচ্ছেন যা পেলে আমি খুশি হব, যা আমার চর্মচক্ষু কখনও দ্যাখেনি, মস্তিষ্ক কখনও কল্পনা করেনি :
কেউই জানে না তার জন্য তার কৃতকর্মের কী নয়ন-প্রীতিকর কী পুরস্কার লুকিয়ে আছে। (সূরা সিজদাহ, আয়াত: ১৭)
তিনি মানুষকে ভালোই বাসেন, মানুষ সেই ভালোবাসাকে দোজখে রূপান্তরিত করে:
আল্লাহ সকলের খোঁজ-খবর রাখেন, এবং তিনি সবকিছু জানেন। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৪৭)
মোট কথা কেউ যা চায় তিনি তাকে তাই দিয়ে থাকেন।
এতক্ষণ আমরা আলোচনা করেছি কর্মফল নিয়ে। দুঃখ-যাতনা অন্য দিক থেকেও আসতে পারে—পরীক্ষা। এই পরীক্ষা শুধু তাদেরই জন্যে যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে বা করে ব’লে প্রচার করে। আল্লাহ কোরআনে স্পষ্টভাবে বলেছেন যে তিনি প্রত্যেক বিশ্বাসীকে তার বিশ্বাসের সমান গুরুত্বের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে চালিত করেন:
মানুষ কি মনে করে যে, শুধু আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে, এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? নিশ্চয়ই আমি তাদের পূর্ববর্তীদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম; আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ ক’রে দেবেন কারা সত্যবাদী ও কারা মিথ্যাবাদী। (সূরা আনকাবুত, আয়াত: ১-৩)
কেন এই পরীক্ষা? সাধারণ মানুষ এর অর্থ বোঝে না। কারণ তারা অধিকাংশ সময়ে খেয়ালই রাখে না যে তাদেরকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু আল্লাহর একনিষ্ঠ ভক্তগণ পরীক্ষার প্রতি সচেতন এবং তারা পরীক্ষাহীন ব্যধিহীন দুর্দশাহীন অবস্থায় কিছুদিন থাকলে কষ্ট পান—ভাবেন, আল্লাহ কি তাদেরকে ভুলে গেলেন? এরূপ ব্যক্তিদেরকে যে-পরীক্ষা করা হয় তা কোনো স্বেচ্ছাচারিতা নয়। ব্যাপারটা অত্যন্ত মজার। আপনি যদি কায়মনোবাক্যে তওবা ক'রে আল্লাহর পথে ফিরে আসেন এবং আপনার হৃদয়ে তার জিকির সদা বলবৎ রাখেন, তাহলে তিনি আপনাকে একের পর এক বিপদের মধ্যে ফেলবেন—শারিরীক ব্যধি, অর্থকষ্ট, প্রিয়জনের বিয়োগ-ব্যথা ইত্যাদি। এটা ঘটে দুটো কারণে: প্রথমত, কেউ বিশুদ্ধ হৃদয়ে তওবা করলে আল্লাহ এতই খুশি হন যে তার জন্য পরকালে বেহেস্ত নসিব ক'রে দেন—ফলে তার পাপকর্মের ফলগুলোকে তার কাছে দ্রুত পেশ করা হয়, যেন সে তা এখানেই নিঃশেষ ক'রে ফেলতে পারে। এই অবস্থায় আল্লাহর ওপর সর্বান্তকরণে নির্ভর করলে সব প্রয়োজন তিনিই পূরণ ক'রে দেন—এমন এমন জায়গা থেকে তিনি বান্দার জন্য রিযিক প্রেরণ করেন যা বান্দা ভাবতেও পারে না। দ্বিতীয়ত, যার মধ্যে যত ওপরে ওঠার কামনা বর্তমান, তার কাছে সিঁড়ির একধাপ শেষ হবার সাথে সাথে পরবর্তী ধাপকে এনে হাজির করা হয়। ফলে বিপদ তার থামতেই চায় না। আমি যে-সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছি, তার পরবর্তী সিঁড়ি যদি তা থেকে খুব বেশি দূরে হয়, তাহলে আমি উপরে উঠব কিভাবে? অন্য কথায়, বিপদ একটা অতিক্রান্ত হলে পরবর্তীটা আসতে যদি খুব বেশি দেরি করে, তাহলে উপরে ওঠাও যে বিলম্বিত হয়ে যাবে। যে-ছাত্র এস.এস.সি. পাশ করেনি, তাকে তো এইচ.এস.সি পরীক্ষায় ডাকা হয় না। যে-ব্যক্তি মাথাটা যতটা নত করে, তাকে তত সুযোগ দেয়া হয়, তত পরীক্ষার মধ্যে ফেলা হয়।
এখন প্রশ্ন হলো—সুযোগ দেয়ার সাথে বিপদাপদের কী সম্পর্ক? হ্যাঁ, এখানেই তো রহস্য। কেউ যখন একটা নির্দিষ্ট ভারসাম্য বিন্দুর সব দাবি সুন্দরভাবে পূরণ করতে পারে তাকে পরবর্তী ভারসাম্যবিন্দুতে, অর্থাৎ আরো উচ্চ মর্যাদার অবস্থানে, দাঁড়াতে সুযোগ ক'রে দেয়া হয়। এই প্রক্রিয়া একেবারে স্বয়ংক্রিয়-আল্লাহ সৃষ্টি-পরিচালন ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজিয়ে রেখেছেন যে কেউ কোনো পরীক্ষায় পাশ করার সাথে সাথে তাকে পরবর্তী শ্রেণীর পরীক্ষার্থী হিসেবে গণ্য ক'রে নেয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী ভারসাম্যে স্থিত হওয়ার জন্য তার রয়েছে অনেক ঘাটতি-আমলের অভাব, ভালো কাজের অভাব, জ্ঞানের অভাব, ধৈর্যের অভাব। অভাব পূরণ না ক'রে যথাযথ প্রশিক্ষণ না নিয়ে, সেখানে পৌঁছানো তার দ্বারা কিভাবে সম্ভব? এজন্য তাকে তার ঘাটতি পূরণ করার জন্য সুযোগ দেয়া হয়-হয় প্রচুর সেলামী বা খেসারত দাও, নইলে বিনা পারিশ্রমিকে কিছু কাজ ক'রে দাও, নইলে বিপদাপদের মুখোমুখী হও এবং ধৈর্য সহকারে আল্লাহকে ডাক। অপেক্ষা করতে শেখাই সবচেয়ে বড় প্রশিক্ষণ। তা- আবশ্যক। যার প্রশিক্ষণ নেই, তাকে পদমর্যাদা দেয়া হবে কিসের ভিত্তিতে?
ব্যাপারটা এরকম : ধরা যাক কাউকে লেফটেন্যানট থেকে সরাসরি মেজর পদে উন্নীত করা হবে; শর্ত তেমন কিছু না, একটাই-প্রার্থীর ওজন হতে হবে মাত্র পঞ্চাশ কেজি। এখন কোনো প্রার্থীকে যদি ঠিক এই ওজন অবস্থায় পাওয়া যায়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই, সে পদটা পেয়ে যাবে। কিন্তু যার ওজন বেশি তাকে ওজন কমাতে হবে। সে যদি তাতে অপারগ হয়, তাহলে তার মাথার ওপর এমন বোঝা চাপানো হয় এবং এমন সময় পর্যন্ত তাকে তা বইতে বাধ্য করা হয় যেন তার ওজন পঞ্চাশ কেজিতে নেমে আসে। এ অবস্থায় তাকে অভাবে অনাহারে রাখার প্রয়োজন হতে পারে। এ হলো করুণাময়ের ভালোবাসা।
ধরুন আপনার একটা দশ বছর বয়সের ছেলে বা ভাই আছে। সে বাইরে খেলাধুলা ক'রে বেড়াতে পছন্দ করে। কিন্তু ছেলেধরা, অপহরণকারী, খারাপ বন্ধুদের সঙ্গ ইত্যাদির ভয়ে আপনি তাকে ঘরে আটকে রাখছেন। এই কারারুদ্ধ হয়ে থাকার কারণে সে অতীষ্ঠ। সে আপনার ওপর ক্ষিপ্ত। তার ধারণা আপনিই তার সব চেয়ে বড় শত্রু এবং আপনি তার জীবনের সুখ চান না। অথচ সে যদি আপনার মাথার মধ্যে ঢুকে আপনার তরফ থেকে চিন্তা করত, তাহলে বুঝত যে তার ওপরে আপনার প্রবল ভালোবাসার কারণেই আপনি তাকে গৃহবন্দী ক'রে রাখছেন।
সে যদি আপনার অনুভূতিটা বুঝত, তাহলে তার ভুল ধারণা তাকে আর কষ্ট দিতে পারত না। বরং সে কৃতজ্ঞ থাকত, আপনার কাছে তার যে কত মূল্য তা বুঝতে পেরে সে বরং আনন্দিতই হতো। এবং ঘরে আটকা পড়ে থাকার কষ্টটুকুকে সে সাধনা হিসেবে নিত।
সুতরাং যাবতীয় বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করতে হবে। পবিত্র কোরআনে এই তাগিদ দেয়া হয়েছে। রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে যে-কোনো রোগ-ভোগের সাথে আল্লাহর রহমত এবং পাপ-ক্ষয় জড়িত।
তারপরও যন্ত্রণা মানুষকে কষ্ট দেবেই। সুতরাং তা থেকে পরিত্রাণের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে, চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে।
তার পরও দুটো উপায়ের কথা ব'লে দেই: এক, যন্ত্রণাকে অগ্রাহ্য করা এবং তাকে ভুলে থাকা এবং দুই, যন্ত্রণার মধ্যে ঢুকে পড়া এবং তাকে উপভোগ করা-এবং মনে-মনে নিজেকে বলা: হে দেহ, হে মন, এটাই তো আমি চাই। সুতরাং সহ্য তোমাকে করতেই হবে। তা যদি তুমি না কর, তাহলে আমি তোমাকে অস্বীকার করি। তবে যন্ত্রণা যখন কোনোভাবেই উপশম হচ্ছে না, তখন তাকে কাজে লাগানোই উত্তম। একজন বিশ্বাসী তার যন্ত্রণাকেও বৃtha যেতে দেন না। তিনি জ্ঞানী এবং উদারমনা হয়ে থাকলে প্রার্থনা করেন: প্রভু গো! যে যন্ত্রণা তুমি আমাকে দিচ্ছ তা আমার প্রাপ্য-তা আমারই মঙ্গলের জন্য, কারণ তা হয় আমার কর্মফল, যার দ্বারা আমার পাপক্ষয় হবে, কিংবা তা তোমার তরফ থেকে আমার ওপর পরীক্ষা, যার বিনিময়ে আমি যোগ্যতা এবং রহমত প্রাপ্ত হব। কিন্তু এই কষ্টের অনুভূতি বৃtha যাক, আমি তা চাই না, প্রভু। সুতরাং হে পরওয়াদেগার! আমার এই যন্ত্রণার সদ্ব্যবহার হোক। সুযোগ হাতছাড়া হোক তা আমি চাই না, প্রভু। হে আল্লাহ, আমার প্রত্যেকটা যন্ত্রণার ওজনের লক্ষগুণ ওজনের সালাম এবং রহমত তুমি রসুল (সঃ) এবং তাঁর পরিবারবর্গের এবং তাঁর সাহাবাকেরামগণের এবং তাঁর রক্তের বংশধর যারা ছিলেন এবং আছেন তাদের এবং সারা পৃথিবীর খাঁটি বুযুর্গ ও মুমিন বান্দাদের কাছে পাঠিয়ে দাও। আমার যন্ত্রণা এবং রোগভোগ সফল হোক।-বিশুদ্ধ এবং প্রেমাপ্লুত হৃদয়ে এই প্রার্থনা করতে পারলে এক রহস্যজনক ঘটনা ঘটবে। কী ঘটবে তা আমি বলব না।
একটা প্রত্যক্ষ প্রামাণ দেই। নামাজে কি আপনি মন স্থির করতে পারেন? না। এমনকি আপনার দেহটাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না-চোখ বিক্ষিপ্ত হয়, কান বাইরের কথা শোনে, নাকের ওপর বিড়বিড় করে, পিঠে পিঁপড়া যেয়ে বেড়ায়, হাই আসে-ঠিক যেগুলোকে প্রশ্রয় দেয়া নিষেধ, সেই উপসর্গগুলোই বেশি ক্ষ্যাপে। দেহ বাগ মানে না-এখন না, একটু পরে নামাজ পড়া যাবে। সারাদিন ক্রিকেট খেলেও ক্লান্তি আসে না, অথচ মাত্র চার রাকাত নামাজ পড়তে সে কি কষ্ট!
এসবের আর্বিভাবই প্রমাণ করে যে নামাজ সত্য!
যাহোক, আল্লাহর পথে যারা পাগলের মতো ছোটেন, তাদের এই সমস্যা আরো বেশি হয়। নামাজে মন যেমন বাগ মানে না, সেই অবস্থা এক পর্যায়ে তাদের মনে সার্বক্ষণিকভাবে বিরাজ করে। সাধক তখন পাগলের মতো হয়ে যায়। বিশেষত যারা গভীর মনোযোগের সাথে নামাজ পড়ে এবং তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে, তাদের এই অবস্থা হয়।
কেন হয় এরূপ? কারণ কোরআনে এবং হাদিসে আছে যে নামাজ দেহ-মনের সমস্ত পাপ এবং ময়লা পরিষ্কার ক'রে দেয়। গভীরভাবে নামাজ পড়লে এক পর্যায়ে গিয়ে নিজের মনের গভীরের ময়লা আত্মচেতনায় চ'লে আসে এবং তা মন থেকে বিলুপ্ত হতে থাকে। মন খালি হতে থাকে। এ অবস্থায় বিভিন্ন কুকথাও মনে আসে। এমতাবস্থায় যতদিন মনটা পরিষ্কার না হয়, ততদিন যতবারই মনের এসব ময়লা উঠে আসে, ততবারই ইস্তেগফার পড়তে হয় (আস্তাগফিরুলালাহা...)- দিনে হাজার বার হলেও।
মনের ময়লার সাথে দেহের ময়লা যখন সাফ হওয়া শুরু হয় তখন চোখ ফেটে রক্ত বের হতে পারে, গলা দিয়ে রক্ত পড়তে পারে, প্রস্রাবের সাথে রক্ত আসতে পারে, কফের সাথে রক্তাক্ত মাংসখণ্ডের মতোও পড়তে পারে, মনটা হাইপার অ্যাকটিভ্ হওয়ার কারণে অ্যাসিডিটি অত্যন্ত বেশি ক্ষেপে যেতে পারে। সুফিয়ান সওরী (রহঃ) আল্লাহর ভয়ে কুঁজো হয়ে গিয়েছিলেন। আল্লাহর ভয়ে তাঁর প্রস্রাবের সাথে কলিজা টুকরো টুকরো হয়ে পড়ত, যা এক ইহুদী ডাক্তার চিকিৎসা করতে এসে সব দেখেশুনে মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন। এরূপ অবস্থায় আল্লাহর স্মরণ নিতে হবে, তাঁকে ভয় করতে হবে, যতটা করা সম্ভব। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন- তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যতটা করা উচিত।
... আল্লাহর দাসদের মধ্যে যারা জ্ঞানী, তারাই তাঁকে ভয় করে; আল্লাহ পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল। (সূরা ফাতির, আয়াত: ২৮)
তারা শয্যাত্যাগ ক'রে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশংকায় ...। (সূরা সিজদাহ্, আয়াত: ১৬)
কিন্তু তার করুণার ব্যাপারে নিরাশ হওয়া যাবে না। অনেকে এরূপ অবস্থায় আত্মহত্যার কথা ভাবে। সাবধান! আল্লাহর করুণাকে যে ছোট ক'রে দ্যাখে সে কাফের। আল্লাহ নিজেই কোরআনে তা বলেছেন। তাছাড়া তিনি বড় পাপীকেও সাহস দিয়েছেন:
তুমি [হে মুহাম্মদ (সাঃ)] বল যারা নিজ জীবনের প্রতি জুলুম করেছ, তারা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহর সমস্ত পাপ ক্ষমা ক'রে দেবেন; তিনি নিশ্চয় ক্ষমাশীল, দয়াময়। (সূরা যুমার, আয়াত: ৫৩)
দয়া করাকে তিনি তাঁর কর্তব্য হিসেবে স্থির করেছেন। কেয়ামতের দিন অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে একত্রিত করবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারাই অবিশ্বাস করবে যারা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলেছে। (সূরা আন'আম, আয়াত: ১২)
তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণে স্মরণ কর। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৪১)
তারা ক্ষমাপ্রার্থনা (তওবা) করলে তাদের জন্য কল্যাণ হবে, কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে-আল্লাহ তাদের ইহকালে ও পরকালে যন্ত্রণাপ্রদ শাস্তি দেবেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৭৪)
তোমাদের প্রতিপালক বলেন-তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব; যারা অহংকারে আমার নামে বিমুখ, তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (সূরা মুমিন, আয়াত: ৬০)
এখানে লক্ষণীয় যে নামজ এমনই একটা আধ্যাত্মিক সাধনা যার সীমানার মধ্যে সাধকের জীবনের এবং অস্তিত্বের সবগুলো দিক যেমন দেহ মন আত্মা ইহকাল পরকাল বাঁধা পড়েছে। উদ্ভ্রান্ত নাস্তিকরা নামাজকে কল্পনার সারবস্তু হিসেবে ব্যাখ্যা ক'রে বলতে চায় যে তা কেবল অদৃশ্যের সাথে জড়িত। কিন্তু আসল সত্যটা তা নয়। যে জ্ঞানী সে নামাজ পড়েই দেখুক। এর মধ্যেই রয়েছে ব্যক্তির গোটা অস্তিত্বের কেন্দ্র-যা দেহ-মনকে দূরে রাখেনি। দেহের রক্ত, সর্দি-কাশি, জৈবিকতা এসব নামাজের বাইরে নয়! নামাজে এর সবই পরিষ্কার হয়। তবে শর্ত একটাই-সঠিক নিয়মে ঠাণ্ডা মাথায় নামাজ পড়তে হবে। আমাদের দেহের অপবিত্রতা দেহেই রয়ে যায়। একটা সীমার পরে তা মনে প্রবেশ করে। মন থেকে তা প্রবেশ করে আত্মায়। এভাবে তা ইহকাল থেকে পৌঁছে যায় পরকালে। কেউ তওবা করলে এবং বেশি-বেশি নামাজ পড়লে ও ভালোকাজ করলে, তার জীবদ্দশাতেই তার পরকাল পরিষ্কার হয়ে যায়। একথা প্রমাণিত এবং প্রমাণযোগ্য। সমস্যা শুধু এখানেই যে আমি যা বলছি তার প্রমাণ রয়েছে আপনার মধ্যে। আপনি তা নিজে না দেখা পর্যন্ত আমার প্রমাণের সত্যতাকে বুঝবেন কিভাবে?
রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে ওজু করার সময়ে পাপ ধুয়ে যায়। নাকে পানি দিয়ে ভালোভাবে নাক ধুলে পাপ ধুয়ে যায়। কী এই পাপ? তা যাই হোক, তার প্রকাশ্য রূপ সরাসরি রক্ত, মাংস, শ্লেষ্মা ইত্যাদির সাথে মিশে থাকে। সুতরাং দেহ, মন, কাজ, বিশ্বাস, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি-সবকিছুর জন্যই ধর্ম।
যাহোক, আমি বলতে চাচ্ছিলাম অন্য কথা। প্রাথমিক সাধনার অবস্থায় দেহ এবং মনকে কন্ট্রোল করার ক্ষমতা কারো থাকে না। এজন্য আল্লাহ করুণা ক'রে রোগ-ব্যাধি দ্বারা দেহকে দুর্বল এবং ক্ষতবিক্ষত ক'রে দেন। মুহুর্মুহু তাকে মৃত্যুর ভয়ে দলিত করতে থাকেন। এই পথে যিনি এগিয়েছেন তিনি জানেন এটা আল্লাহর তরফ থেকে কত বড় করুণা। যে-দেহকে আপনি কন্ট্রোল করতেই পারেন না, তাকে আল্লাহ এমনভাবে কন্ট্রোল ক'রে দেবেন যা আপনি ভাবতেই পারবেন না।
টিকাঃ
* দেখুন এই লেখকের অন্ধকারের বস্ত্রহরণ (১ম খণ্ড)