📘 কোরানিক সেলফ কন্ট্রোল এবং মৃত্যুহীন জীবন > 📄 সৃষ্টির সময় বনাম সময়ের সৃষ্টি

📄 সৃষ্টির সময় বনাম সময়ের সৃষ্টি


ব'লে চললাম-তবুও তোমাকে রহস্যের একটা বিশেষ মাত্রার কথা বলি। তোমার ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা তুমিও জান।
হ্যাঁ। তোমার দেহ-মনের মধ্যেই প্রতিনিয়ত ঘটছে তোমার ভবিষ্যত কাজকে নিয়ন্ত্রণ ও তা অনুসারে তোমার ইচ্ছাকে প্রভাবিত করার কাজ। এসব ঘটছে তোমার গোটা দেহমনের ক্রিয়াকাণ্ডের ফর্মুলার মধ্যে। মানুষ এক মহারহস্য। সে নিজেই একটা সৃষ্টি আবার নিজেই একটা ফর্মুলা। তার ক্রিয়াকাণ্ড মুক্ত-ইচ্ছা ইত্যাদি দ্বারা পারিপার্শ্বিকতা, সমাজ, দেশ, এমনকি জলবায়ু-আকাশও প্রভাবিত হয়। পবিত্র কোরআনে তা বলা হয়েছে, ফলে সে নিজেই তার পরিবেশ সৃষ্টির ফর্মুলা। আবার সে পরিবেশকে যেভাবে পাল্টে দেয়, পরিবেশও তার ওপর সেভাবে প্রভাব ফ্যালে। বিজ্ঞান 'গয়া থিওরি' সহ অন্যান্য সিস্টেমস্ থিওরি দ্বারা একথা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করেছে। এ ব্যাপারে প্রথমেই বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এখন শুধু সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেয়াই যথেষ্ট।
আল্লাহ যথাযথভাবে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, যেন প্রত্যেক মানুষ তার কর্মানুযায়ী ফল পেতে পারে, তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না। (সূরা জাসিয়া, আয়াত : ২২)
মানুষের কৃতকর্মের জন্য জলে স্থলে বিপদ ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে ওদেরকে ওদের কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করানো হয়, যেন ওরা পথে ফিরে আসে। (সূরা রুম, আয়াত : ৪১)
তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং (পরিমাপের জন্য) ভারসাম্য স্থাপিত করেছেন, যেন তোমরা পরিমাপে বৃদ্ধি না কর (ভারসাম্য লঙ্ঘন না কর)। ন্যায্য ওজনের মাপ প্রতিষ্ঠিত কর এবং মাপে কম দিয়ো না। (সূরা রহমান, আয়াত : ৭-৯)
আকাশে রয়েছে তোমাদের জীবনোপকরণের উৎস এবং প্রতিশ্রুতি। আসমান ও জমিনের প্রতিপালকের শপথ, নিশ্চয় এ তোমাদের বাক্যালাপের মতোই সত্য। (সূরা যারিয়াত, আয়াত : ২২)
তিনি জানেন-যা কিছু ভূমিতে প্রবেশ করে ও ভূমি থেকে নির্গত হয়, এবং আকাশ থেকে যা বর্ষিত হয়, এবং আকাশে যা কিছু উত্থিত হয় ... (সূরা হাদীদ, আয়াত : ৪)
আল্লাহ মানুষকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিলে ভূ-পৃষ্ঠে কোনো জীব-জন্তুকেই রেহাই দিতেন না। (সূরা ফাবির, আয়াত: ৪৫)
পরিবেশই মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের ফর্মুলা হিসেবে কাজ করে। কিন্তু আল্লাহ এমনভাবে বাস্তবতাকে সৃষ্টি করেছেন যে প্রত্যেকটা মাত্রার বাস্তবতার ভারসাম্যের একটা নিয়ম আছে বা অন্যান্য মাত্রার বাস্তবতার সাথে সহাবস্থানের জন্য প্রত্যেকের একটা উর্ধ্বসীমা ও একটা নিম্নসীমা আছে। তারা সেই সব সীমাকে অতিক্রম করলে বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে:
আল্লাহ তার কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর যে করুণা বর্ষণ করেছেন তা কখনও পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের মনকে পরিবর্তন না করে ... (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫৩)
মানুষের কৃতকর্মের জন্য জলে স্থলে বিপদ ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে ওদেরকে ওদের কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করানো হয়, যেন ওরা পথে ফিরে আসে। (সূরা রুম, আয়াত: ৪১)
কিন্তু মানুষ তার খামখেয়াল অনুসারে জীবন-যাপন করলে তার জীবনাচরণ এরূপ সব খণ্ড বাস্তবতার সীমা এবং ভারসাম্যের নিয়মের অধীন থাকতে পারে না, কারণ এরূপ অধিকাংশ বাস্তবতাই অদৃশ্যে বা গায়েবে ক্রিয়াশীল, যা বিজ্ঞান দ্বারা পরিমাপযোগ্য নয়।
সত্য যদি ওদের কামনা বাসনার অনুগামী হতো, তাহলে আকাশমণ্ডলী পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। (সূরা মোমেনুল, আয়াত: ৭১)
আল্লাহ যদি মানুষের অকল্যাণ ত্বরান্বিত করতেন, যেভাবে তারা তাদের কল্যাণ ত্বরান্বিত করতে চায়, তাহলে তাদের ভাগ্য মীমাংসিত হয়ে যেত (তারা ধ্বংস হয়ে যেত)। সুতরাং যারা আমার সাক্ষাতের আশা করে না, আমি তাদেরকে নিজ অবাধ্যতায় উদ্‌ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াতে দেই।
মানুষ যেভাবে কল্যাণ কামনা করে সেইভাবেই অকল্যাণ কামনা করে। মানুষ তার মনে যা আসে তার পরিণাম চিন্তা না ক'রে তার আশু রূপায়ণ কামনা করে। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ১১)
বল, 'সত্য এসেছে তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে'; যে বিশ্বাস করতে চায়, করুক, এবং সে তা অস্বীকার করতে চায়, করুক। (সূরা কাহাফ, আয়াত: ২৯)
এবং তোমার প্রতিপালকের বাক্য সত্য ও সুবিচারে পূর্ণাঙ্গ। কেউই তাঁর বাক্যের পরিবর্তনকারী নেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সূরা আন'আম, আয়াত: ১১৫-১১৬)
এজন্য সবচেয়ে 'বিজ্ঞানসম্মত' পদ্ধতিতে জীবন-যাপন ক'রেও দেখা যায় যে সেই জীবনাচরণই ভারসাম্য নষ্টের কারণ হয়েছে। পরিবেশের এই ভারসাম্য মানব মনের আবেগ-ইচ্ছা-শক্তি-স্পৃহা-অস্থিরতা-আনন্দ-বেদনা ইত্যাদির ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে এবং এভাবে বাইরের ভারসাম্য বদলালে মনের ভেতরের ভারসাম্য বদলায়, ভেতরের ভারসাম্য বদলালে বাইরের ভারসাম্য বদলায়। মনের এই মুহূর্তের সিদ্ধান্ত-অর্থাৎ আমি এখন কী কাজ করব-নির্ভর করে তার এই মুহূর্তের ভারসাম্যের ওপর। আসলে চিন্তা, যুক্তি যা-ই বলুন না কেন, কোনো মুহূর্তে ইচ্ছা বা choice হলো ঐ মুহূর্তের 'মেধা-মন' এর ভারসাম্য। একটু চিন্তা করলেই তা বুঝা যায়। আমাদেরকে অধিকাংশ সময়ে তাই-ই করতে হয় যার পক্ষে হয় আমাদের মন না হয় মেধা সায় দেয়নি। ফলে সেরূপ কাজ করার সময়েও আমরা আফসোস করি। কিন্তু আমরা ভেবে দেখি না যে প্রত্যেকটা সুচিন্তিত স্বাভাবিক এবং ভালো কাজই ঐ মুহূর্তের জন্য সবচেয়ে উত্তম, কারণ তা ঘটেছে ভারসাম্যবিন্দুতে। এবং এরূপ কাজ যে ফল সৃষ্টি করবে তার দায়ভার আল্লাহর ওপর চাপিয়ে বিদ্রোহ-চেঁচামেচি করলে ফল হবে আরো খারাপ, কারণ কর্ম আমার ফলও আমার। এজন্য কেউ তার ভুল বুঝতে পারলে এবং তওবা করলে তার মনের ভেতরকার ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়, তবে তার পক্ষে সর্বশ্রেষ্ঠ ভালো কাজগুলো সঙ্গে সঙ্গেই করা সম্ভক না-ও হতে পারে, কেননা তার মনের ভারসাম্য আবার নির্ভর করছে আকাশ-পৃথিবী তথ্য পরিবেশের ভারসাম্যের ওপর, যা জড়-জগতের ভারসাম্য ব'লে বিশেষ নিয়মের অধীন এবং ধীরে ধীরে বদলায়। এ কারণে অভ্যাসকে হঠাৎ পাল্টানো যায় না। এ কারণেই আল্লাহ মানুষকে ভালো পথে থেকে বিপদে-আপদে ধৈর্য ধারণ করতে বলেছেন। কারণ কোনো ব্যক্তির সাথে ক্রিয়াশীল সব মানুষ-জন্তু-বস্তুর আচরণ দ্বারা তার ভারসাম্য প্রভাবিত হচ্ছে। সে যদি ধৈর্য ধারণ ক'রে সঠিক আচরণগুলো করে, তাহলে ধৈর্যের একটা সীমার পর সবকিছু তার কাছে নতি স্বীকার করবে। কোরআনে একথাই বলা হয়েছে:
আমি তাদের ভোগান্তিকে/দুঃখ-কষ্টকে সমৃদ্ধিতে রূপান্তরিত ক'রে দিয়েছিলাম। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৯৫)
আমি তোমাদের মধ্যে একজনকে অপরের পরীক্ষাস্বরূপ করেছি। তোমারা ধৈর্যধারণ করবে কি? তোমার প্রতিপালক সবকিছু দেখেন। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ২০)
ওদেরকে দুবার (পৃথিবীতে এবং পরকালে) পুরস্কৃত করা হবে, কারণ ওরা ধৈর্যশীল, এবং ওরা ভালো'র দ্বারা মন্দের মোকাবেলা করে, এবং আমি ওদের যে জীবিকা দিয়েছি, তা থেকে ওরা ব্যয় করে। (সূরা ক্বাসাস, আয়াত: ৫৪)
এ কারণেই রসুল (সঃ) বলেছেন যে কেউ যখন তওবা করে, এবং তওবা করতেই থাকে, তখন তার রিযিক আসে এমন সব জায়গা থেকে যা সে জানে না। জানবে কিভাবে? তা আসবে এমন ভারসাম্য থেকে যা ভবিষ্যতে ঘটবে, এবং ফলে ব্যক্তির বর্তমানের ভারসাম্যের অন্তর্ভুক্ত নয় ব'লে সে সে-ব্যাপারে সচেতনও নয়।
এখন জানা দরকার কী সেই 'সঠিক আচরণগুলো' যে-পথে চললে গোটা সৃষ্টিজগৎ ব্যক্তির অধীন হয়ে যায়। এই আচরণগুলো হলো রসুল (সঃ) এর শরীয়ত বা সুন্নাহ-অর্থাৎ তিনি যে-পথে চলতেন, যে-আচরণ করতেন, যে-ভাবে চলতে বলতেন। তাঁর প্রত্যেকটা আচরণের সাথে গোটা সৃষ্টিজগতের কাঙ্খিত শ্রেষ্ঠতম ইতিবাচক ভারসাম্যের অনুকূল সম্পর্ক রয়েছে। তাই কেউ তাঁর পন্থায় দাড়ি রাখাকে যতই হাস্যকর ভাবুক, তাঁর কথামতো বহুবিবাহের বেলায় যতই নাক সিঁটকাক- যিনি জানেন কী সেই আচরণের রহস্য, তিনি এই ভেবে কৃতজ্ঞ হন যে এই পথ জানার সুযোগ তার হয়েছে। তাঁর আচরণবিধি অনুসারে চলা এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, আল্লাহর মারেফত বা গোপন জ্ঞান অর্জনের চেয়েও তার অগ্রাধিকার। কারণ আল্লাহর মারেফত অন্যান্য ধর্ম অনুসরণ করলেও পাওয়া যেতে পারে, যার প্রমাণ চিরকাল ছিল, আছে এবং থাকবে। খোদ ইসলামেই একদল ভণ্ড মারেফতপন্থী আছে যারা শরীয়ত ত্যাগ করেছে। তারাও কিছু রহস্য জানে-শুনে শুনে। কিন্তু সে সব জ্ঞানের মধ্যে ফাঁক থেকেই যাবে। রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-কোরআনের প্রত্যেকটা আয়াতের দুইটা অর্থ আছে-একটা গোপন, একটা প্রকাশ্য; তোমরা উভয়টাই গ্রহণ কর। সুতরাং এর একটাকে যে বাদ দেবে, সে মুসলমান নয়। সঠিকভাবে শরীয়ত অনুসারে চললে মারফত এমনিতেই এসে যায়। এটাই শরীয়তের রহস্য। সব পূর্ববর্তী ধর্মের আচরণবিধি পরম করুণাময় আল্লাহই সেই সব যুগের প্রয়োজন বা সঠিক ভারসাম্য অনুসারে তাঁর নবীদের (আঃ) মাধ্যমে প্রকাশ এবং প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সেই পরম দয়াময়ই দিয়েছেন রসুল (সঃ) এর সুন্নাহ। তা অনুসরণ না করলে সঠিক দৃশ্য এবং অদৃশ্য বাস্তবতার সাথে তোমার দূরত্ব রয়েই যাবে। রসুলের (সঃ) সুন্নাহ অনুসারে চলার অঙ্গীকারই আমরা আমাদের প্রচুর কাছে, ক'রে পৃথিবীতে এসেছিলাম, যদিও এখন আমরা তা ভুলে গেছি। সেই পথ পবিত্র হবার, আল্লাহকে স্মরণ করার, কোরআনের রহস্য বোঝার, খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার, নিজের প্রতি সুবিচার করার, তথা আল্লাহর স্বভাবধর্মে স্থিত হওয়ার সর্বোৎকৃষ্ট পথ। সেই পথে না চললে বিশ্বাস মজবুত থাকবে না, এবং তখন নিজের আত্মাকে হারিয়ে ফেলা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।
যারা নিজেদের আত্মাকে হারিয়ে ফেলেছে তারা বিশ্বাস করতে অস্বীকার করে। (অর্থাৎ তারা ধ্বংস হবে না, তারা ধ্বংসপ্রাপ্তই।) (সূরা আনআম, আয়াত: ২০)
আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে আগেই যে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন, তোমরা যদি তাতে বিশ্বাসী হও, তাহলে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে কে সে তোমাদের বাধা দেয়? (এই অঙ্গীকার হলো আল্লাহর পথে চলার অঙ্গীকার। তা পূরণ না করলে ব্যক্তি স্রষ্টার একত্ব এবং সামাগ্রিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকবে।) (সূরা হাদীদ, আয়াত: ৮)
আল্লাহ কখনও তার বান্দাদের সাথে অন্যায় আচরণ করেন না। (সুতরাং সব দোষ বান্দার।) (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫১)
যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। (আর আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়াই তাঁর সাথে মিলিত হওয়া।) (সূরা তওবা, আয়াত: ১০৮)
তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, তাই আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গেছেন। (ফলে সৃষ্ট হয়েছে তাদের একাকীত্ব ও অসহায়ত্ব।) (সূরা তওবা, আয়াত: ৬৭)
যে অবিশ্বাস করে, অবিশ্বাসের জন্য সেই দায়ী; যারা সৎকাজ করে তারা নিজেদের জন্যই রচনা করে সুখশয্যা। কারণ যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে পুরস্কৃত করেন। (অর্থাৎ বিশ্বাসীর কাজ মানে আল্লাহরই কাজ, কিন্তু অবিশ্বাসীর কৃতঘ্নতা হলো স্ববিরোধিতা।) (সূরা রুম, আয়াত: ৪৪-৪৫)
তারা অন্যদেরকে এ (কোরআন) থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, এবং নিজেদেরকেও; কিন্তু তারা তো শুধু নিজেদের আত্মাকেই ধ্বংস করে, কিন্তু তারা তা বোঝে না। (সূরা আন'আম, আয়াত: ২৬)
হে মানবজাতি, তোমাদের ঔদ্ধত্য তোমাদেরই বিরুদ্ধে যায়। (ফলে মানুষ নিজেই শতভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে।) (সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৩)
ওরা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিল, তারা ওদের সাহায্য করল না কেন? (অর্থাৎ আল্লাহকে খুশি করার জন্যও তাঁর আদেশ অমান্য করা যাবে না।) (সূরা আহক্বাফ, আয়াত: ৮)
তাদের খারাপ কাজ তাদেরকে আনন্দ দেয়। (এ কারণে তারা বুঝতে পারে না যে তারা খারাপ কাজ করছে।) (সূরা তওবা, আয়াত: ৩৭)
তারাই বিশ্বাসী যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস করার পর সন্দেহ পোষণ করে না... (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১৫)
তারা নিজেদের বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দেবে (অর্থাৎ তারা স্বীকার করবে যে তারা অবিশ্বাসী ছিল)। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৩৭)
তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মে প্রতিষ্ঠিত কর। আল্লাহর স্বভাবের অনুসরণ কর, যে-স্বভাব অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর স্বভাবের কোনো পরিবর্তন নেই—এটাই সরল চিরস্থায়ী দ্বীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই (তা) জানে না। বিশুদ্ধ চিত্তে তাঁরই অভিমুখী হও; তাকে ভয় কর, নামাজ কায়েম কর ... (সূরা রুম, আয়াত: ৩০-৩১)
... কেউ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত পবিত্র অনুষ্ঠানগুলির সম্মান করলে তার প্রতিপালকের নিকট তার জন্য এটাই উত্তম। (অন্য উপায়ে তাঁর সান্নিধ্য পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ মানুষের উদ্ভাবিত পথকে ইবলিস সহজেই এলোমেলো ক'রে দিতে পারে।) (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৩০)
যারা আল্লাহ ও তার রসুলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর শান্তি থেকে সাবধান থাকে, তারাই সফলকাম। (রসুলের (সঃ) আনুগত্য না ক'রে আল্লাহর আনুগত্য করা অসম্ভব এবং হাস্যকর।) (সূরা নূর, আয়াত: ৫২)
কাজেই রসুল (সঃ) এর কিছু আচরণবিধি দেখে তুমি যতই হাস না কেন, ওটাই সত্য। কোরআনে তোমাদের এই ঠাট্টার প্রসঙ্গটাও বাদ দেয়া হয়নি। আল্লাহ বলেছেন—হে মুহাম্মদ, তুমি তো অবাক হচ্ছ, আর ওরা ঠাট্টা করছে।
তুমি তো অবাক হচ্ছ, আর ওরা করছে ঠাট্টা। (সূরা সাফ্ফাত, আয়াত : ১২)
একথাই প্রমাণ করে যে রসুলের (সঃ) সুন্নাহ দেখলে উবলিসের হাসিই পায়। এবং নির্বোধ মনের এই হাসি-ঠাট্টাই প্রমাণ করে যে তাঁর সুন্নাহ সত্য। স্বয়ং রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে আল্লাহর নৈকট্য লাভের অসংখ্য পথের মধ্যে সব পথেই ইবলিস ব'সে আছে, কেবল তাঁর মাধ্যমে প্রকাশিত এবং প্রতিষ্ঠিত পথ ছাড়া।
কাজেই তোমার হাসি পেলেই প্রমাণ হয়ে গেল যে তাঁর পথই আসল পথ। সে পথে না চললে তেমাকেই ক্ষতির ক্ষত বইতে হবে।
একটা উদাহরণ নেয়া যাক। রসুলুল্লাহ (সঃ) কুকুর নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। তিনি এও বলেছেন—কুকুর যদি একটা উম্মত (বা জীবগোষ্ঠী) না হতো, তাহলে আমি সব কুকুরকে মেরে ফেলার নির্দেশ দিতাম। তাঁর এই কথা থেকেই প্রমাণিত হয় যে কুকুরকে তিনি একটা প্রাণীর মর্যাদা অবশ্যই দিয়েছেন, কিন্তু দৃশ্য বা অদৃশ্য উপায়ে তার দ্বারা কোনো ক্ষতি হয় ব'লে তিনি কথাটা বলেছিলেন। তিনি যদি কুকুরকে ধ্বংস করার আদেশ দিতেন, তবে পৃথিবীর অন্য কোনো আদেশ পালিত না হলেও মহামানব মুহাম্মদ (সঃ) এর আদেশ পালন না হয়ে পারার কোনো উপায় নেই ব'লে তা পালিত হতো। কিন্তু এত বড় কঠোর একটা কথা বলার পরও তিনি আদেশটা দেননি। এর মানে এই যে তার এই কথার মধ্যে বিরাট এক রহস্য লুকিয়ে আছে, যা অদৃশ্য জগতের সাথে জড়িত। তিনি এই রহস্যের প্রতি ইঙ্গিত করার জন্যই কথাটা বলেছিলেন। এরূপ রহস্য আল্লাহ করুণা ক'রে তাঁর কিছু বুযুর্গ ব্যক্তিকে জানান।
যাহোক, আজ কুকুর নিয়ে কি সবচেয়ে বেশি মাতামতি হচ্ছে না? কুকুরের পেছনে মাসে লক্ষ টাকা খরচ, কুকুরের সঙ্গী হয়ে ঘুরে বেড়ানো এমনকি বিদেশ ভ্রমণ করা, কুকুরের সাথে রাতে নিদ্রাযাপন, কুকুরকে স্ত্রী/স্বামীর চেয়েও বেশি সঙ্গ দেয়া এবং আপন ভাবা, কুকুর পোষার নেশায় উন্মত হয়ে থাকা— এসব কি প্রমাণ করে না যে তিনি যা বলেছিলেন তা প্রশ্নাতীতভাবে সত্য? তিনি যা যা নিষেধ করেছেন সে-সব আচরণই তো বেশি বাড়াবাড়ি পাচ্ছে, নয় কি? এমন তো নয় যে তিনি কোনো কাজ করতে আদেশ বা নিষেধ করেছেন ব'লে তা জেনেই সচেতনভাবে সবাই তার বিরোধিতা ক'রে থাকে।
তুমি যদি একদল লোককে কোনো নির্জন দ্বীপে ছোটবেলা থেকেই বড় হয়ে ওঠার সুযোগ দাও, এবং তাদেরকে যদি রসুল (সঃ) এর আদেশ-নিষেধের কথা কিছুই না জানাও, তাহলে দেখবে যে তাদের মধ্যে তাদেরই সমাজের জন্য ক্ষতিকর লোকগুলো তাই-ই করবে বা সেসব কাজেরই আদেশ করবে যা রসুল (সঃ) এর আচরণবিধির ঠিক বিপরীত দিকে যাবে। এটাই প্রমাণ করে যে তিনি যা বলেছিলেন এবং করেছিলেন একমাত্র তাই-ই আসল সত্য। কারণ যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে গোটা সৃষ্টিজগতে যে বিবর্তন হয়েছে তা অনুসারে মানুষের জ্ঞান বিজ্ঞান মানোভাব আচরণ স্বাস্থ্য সবকিছু বদলেছে এবং এরূপ পরিবর্তন যেভাবেই ঘটুক না কেন, তার প্রত্যেকটা যুগের জন্য রয়েছে বিশেষ সর্বিক ভারসাম্যবিন্দু, যা অনুসারে সে-সব যুগের নবী-রসুল (আঃ) গণের আচরণবিধি নির্ধারিত হয়েছে—এমনকি যুগোপযোগী ধর্মগ্রন্থও অবতীর্ণ হয়েছে:
প্রত্যেকটা জাতির জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত আছে; যখন তাদের সময়সীমা শেষ হয়ে যায়, তখন তারা তাকে এক ঘণ্টার জন্যও বিলম্ব করাতে পারে না, কিংবা তারা তা ত্বরান্বিতও করতে পারে না। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৩৪)
প্রত্যেক যুগের জন্য রয়েছে একটি ধর্মগ্রন্থ (যা আমি অবতীর্ণ করেছি)। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩৮)
পূর্ব ও পরের সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। (সূরা রুম, আয়াত: ৪)
আল্লাহ যা ইচ্ছা বাতিল করেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন এবং তাঁরই কাছে আছে কেতাবের মূল। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩৯)
তুমি কখনও আল্লাহর বিধানে কোনো পরিবর্তন পাবে না। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৬২)
আমি প্রত্যেক ধর্ম সম্প্রদায়ের জন্য ধর্ম পদ্ধতি নির্ধারিত ক'রে দিয়েছি, যা তারা পালন করে; সুতরাং তারা যেন তোমার সাথে এ ব্যাপারে তর্ক না করে। তুমি ওদেরকে তোমার প্রতিপালকের দিকে আহ্বান কর। তুমি সরল পথেই আছ। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৬৭)
(এ কোরআন) অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়। পূর্ববর্তী কেতাবসমূহে অবশ্যই এর উল্লেখ আছে। (সূরা শুয়ারা, আয়াত: ১৯৫-৯৬)
বিশ্বজগতের জন্য এ (কোরআন) উপদেশমাত্র। এর সংবাদের সত্যতা কিছুকাল পরে তোমরা অবশ্যই জানবে। (সূরা সাদ, আয়াত: ৮৭-৮৮)
তবে কি ওরা এই বাণীর ব্যাপারে চিন্তা করে না? না ওদের নিকট এমন কিছু এসেছে যা ওদের পূর্বপুরুষদের নিকট আসেনি? (সূরা মোমেনুন, আয়াত: ৬৮)
বুঝাই যাচ্ছে যে এ সবই আল্লাহরই পরিকল্পনা মাত্র—নিয়ম তাঁরই; নিয়ম বদলের নিয়মও তাঁর। এখানে বলা হয়েছে যে যুগে যুগে মানবজাতির জন্য যত ধর্ম পাঠানো হয়েছে তা পবিত্র কোরআনের প্রেরণকর্তা আল্লাহর কাছ থেকেই এসেছে। অর্থাৎ তিনিই স্পষ্ট ক'রে বলছেন যে তিনিই যুগে যুগে নিয়ম পাল্টেছেন। এটা তাঁরই পূর্বপরিকল্পনায় ছিল, যে-কারণে তিনি পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলোতে কোরআনের কথা উল্লেখ করেছিলেন এবং কোরআনেও সেগুলোর প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্তু তিনি এও বলছেন যে তাঁর বিধানে কোনো পরিবর্তন নেই। তাহলে এই কথাটার অর্থ কী? এখানেই লুকিয়ে রয়েছে আসল রহস্য যা আল্লাহর স্বভাবধর্মে স্থিত পূর্ণাঙ্গ হৃদয় ছাড়া কেউ অনুভব করতে পারে না। ব্যাপারটি হলো এই: বিভিন্ন যুগে বিশ্বজগতের সার্বিক অবস্থা ছিল বিবর্তনের ভিন্ন ভিন্ন স্তরের ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু আল্লাহর স্বভাবধর্ম তথা পরকালের বাস্তবতা চিরকাল একই রকমের। ফলে ভিন্ন ভিন্ন যুগের প্রেক্ষাপট থেকে আল্লাহর স্বভাবের দিকে অগ্রসর হতে হলে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ-পদ্ধতি অনুসরণ করার প্রয়োজন ছিল। অন্য কথায়, যুগ অনুসারে আচরণবিধিগুলো এমন ছিল যেন স্ব স্ব যুগ তার স্ব স্ব আচরণপদ্ধতির সাথে মিলিত হয়ে অভিন্ন বেহেস্তের শ্বাশ্বত বাস্তবতায় উন্নীত হতে পারে। ধরা যাক t₁, t₂, t₃, ..., tₙ বছর আগের যুগের ধর্মীয় আচরণবিধিগুলো ছিল যথাক্রমে s₁, s₂, s₃, ..., sₙ, এবং পরকালের বাস্তবতায় মনের অবস্থা হলো U। তাহলে, t এর প্রেক্ষাপটে s এর পারলৌকিক রূপান্তর (transformation) হবে এরূপ:
t₁⊕ s₁ = U
t₂⊕ s₂ = U
t₃⊕ s₃ = U
tₙ⊕ sₙ = U
এখানে ⊕ দ্বারা t এবং s এর মিলিত ক্রিয়াকে নির্দেশ করা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে যে প্রতিক্ষেত্রেই একই ফল পাওয়া যাচ্ছে— U, এবং এটাই তো কাম্য। এক্ষেত্রে t এর সাপেক্ষে s এর পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু মৌলিক বিধানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। মৌলিক নিয়মটা হলো— s ⊕ t = U। এজন্যেই আল্লাহ বলেছেন যে তাঁর নিয়ম (s ⊕ t = U) এবং স্বভাবধর্মের (U) কোনো পরিবর্তন নেই।
লক্ষ্যের (U) যেন কোনো পরিবর্তন না হয় সেজন্য আল্লাহ জাগতিক সূচকগুলোর বা প্যারামিটারগুলোর পরিবর্তন ঘটান। এর কারণ হলো—মানুষকে প্রদত্ত স্বাধীনতার ক্ষতিপূরণ হিসেবে (মানুষকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে ব'লেই তো সে ভুল ক'রে নিজের ক্ষতি নিজে ডেকে আনে) তিনি তাকে কিছু ছাড় দিয়েছেন। এর ফলেই তিনি মানুষের ভাগ্য পর্যন্ত পরিবর্তন করেন, আয়ুকে নতুনভাবে নির্ধারণ করেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে তাঁর সার্বিক নিয়ম কখনও পরিবর্তিত হয় না। এই আসল কেরামতিটাই তিনি নিজের হাতে ধ'রে রেখেছেন। নিয়মের যত আপাত-পরিবর্তন হয়, তার বিধান তিনি ঠিক ক'রে রেখেছেন। নিয়ম বদলের সুযোগ তিনি রেখেছেন এই প্রশ্নটা করার জন্য— 'আমি কি তোমাদেরকে দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে তখন কেউ সতর্ক হতে চাইলে সতর্ক হতে পারতে না?' (সূরা ফাতির, আয়াত: ৩৭)। কিভাবে তিনি নিয়ম বদলান, কিভাবে তিনি তারই নির্ধারিত ভাগ্যালিপির পরিবর্তন করেন, তার কিছু সার্বিক চিত্র এই আয়াতগুলো থেকে পাওয়া যাবে। বলা বাহুল্য, ব্যাপারটা নিয়ে আমরা আগেও আলোচনা করেছি। বিষয়টা জটিল ব'লে আয়াতগুলোকে আবার স্মরণ করিয়ে দেয়া হলো:
কেয়ামতের ঘোষণা না থাকলে ওদের ফলাসালা তো হয়েই যেত। (অর্থাৎ ওরা যে কাজ করেছে তা ওদের ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু মূল কেতাবে (উম্মুল কিতা) কেয়ামত পর্যন্ত অবকাশের প্রতিজ্ঞা আগে থেকেই রয়েছে ব'লে প্রাথমিক বিচারে সেটাই কার্যকর থাকবে, বর্তমানের সীমালঙ্ঘন নয়। ধ্বংস যদি এখন ঘটে তাহলে তো কেয়ামতের প্রতিজ্ঞার বরখেলাপ হয়ে গেল। পরবর্তী আয়াত দ্রঃ।) (সূরা হা-মীম-আস-সিজদাহ, আয়াত: ২১)
ওদের নিকট জ্ঞান আসার পর কেবলমাত্র পারস্পরিক বিদ্বেষবশত ওরা নিজেদের মধ্যে মতভেদ ঘটায়। এক নির্ধারিত কাল পর্যন্ত অব্যাহতি সম্পর্কে তোমার প্রতিপালকের পূর্বঘোষণা না থাকলে ওদের বিষয়ে ফয়সালা হয়ে যেত। (সূরা শুরা, আয়াত: ১৪)
বড় শাস্তির আগে আমি ওদেরকে অবশ্যই ছোট শাস্তি আস্বাদন করাব, যেন ওরা (আমার দিকে) ফিরে আসে। (এরূপ শাস্তি পথে ফিরে আসার সুযোগ দেয়ার জন্য, ধ্বংস করার জন্য নয়। কিন্তু শাস্তি ছোট হোক আর বড়ই হোক, তা সংঘটিত করার আগে তা লিপিবদ্ধ হয়ে যায়-পরবর্তী আয়াতদ্বয় দ্রঃ। এর থেকেই বুঝা যাচ্ছে যে ছোট শাস্তির কথাই আগে লিপিবদ্ধ হয়। বড় শাস্তি একবার লিপিবদ্ধ হয়ে গেলে তো তা সংঘটিত হয়ে যেত, তখন 'পথে ফিরে আসার সুযোগ দেয়া' কথাটার কোনো অর্থই থাকত না।- পরবর্তী তৃতীয় উদ্ধৃতি দ্রঃ। অবশ্য এমনও হতে পারে যে শাস্তি একবার লেখা হলেও তা প্রেরিত হবার আগ পর্যন্ত তওবা করার সুযোগ থাকে। আল্লাহই একমাত্র জ্ঞাতা।) (সূরা সিজদাহ, আয়াত: ২১)
কারো আয়ু বৃদ্ধি হলে বা হ্রাসপ্রাপ্ত হলে তা তো হয় কেতাব (সংরক্ষিত ফলক) অনুসারে। (আয়ু লিখিত ছিল বা আছে কেতাবে। আবার তা পরিবর্তিত হলেও তা হয় কেতাব অনুসারে। তাহলে স্থির এবং অপরিবর্তনীয় কেতাব কোনটা? আসলে এই দ্বিতীয় ইঙ্গিতের কেতাবই হলো মূল কেতাব বা উম্মুল কেতাব-বিধান পরিবর্তনের বিধান তাতেই লেখা আছে এবং তা অপরিবর্তনীয়।) (সূরা ফাতির, আয়াত: ১১)
পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করার আগেই তা লিপিবদ্ধ করি; আল্লাহর পক্ষে এ অতি সহজ। এ জন্য যে, তোমাদের ওপর যা অতীত হয়েছে (অর্থাৎ যা হারিয়েছে), তার জন্য দুঃখিত হয়ো না, এবং তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তার জন্য হর্ষোৎফুল্ল হয়ো না, আল্লাহ উদ্ধত অহংকারীকে ভালোবাসেন না। (সূরা হাদীদ, আয়াত: ২২-২৩)
তোমাদের নিটক শাস্তি আসার আগেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের দিকে মুখ ফিরাও এবং তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ কর। শাস্তি এসে পড়লে সাহায্য পাবে না। তোমাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের ওপর অতর্কিতভাবে শাস্তি আসার আগেই তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালক যে উত্তম কেতাব অবতীর্ণ করেছেন তার অনুসরণ কর, যেন (পরে) কাউকে বলতে না হয়-হায়! আল্লাহর প্রতি আমার কর্তব্যে আমি তো শৈথিল্য করেছি এবং আমি ঠাট্টবিদ্রূপ করতাম। অথবা কেউ যেন না বলে-আল্লাহ আমাকে পথপ্রদর্শন করলে আমি তো অবশ্যই সংযমীদের অন্তর্গত হতাম। (সূরা যুমার, আয়াত: ৫৪-৫৭)
আমি কি তোমাদের দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে তখন কেউ সতর্ক হতে চাইলে সতর্ক হতে পারতে না? (অর্থাৎ কৃত পাপের তুলনায় দ্রুত মৃত্যু/ধ্বংস দেয়া হয়নি-মূল কেতাব অনুসারে বারবার অবকাশ দেয়া হয়েছে-যার কারণে জীবনকে অবশ্যই দীর্ঘ বলতে হবে। অবকাশ মানেই আল্লাহর করুণা।) (সূরা ফাতির, আয়াত: ৩৭)
তুমি কি জান (হে মুহাম্মদ (সঃ)) - সম্ভবত কেয়ামত আসন্ন। যারা বিশ্বাস করে না তারাই কামনা করে যে তা ত্বরান্বিত হোক। কিন্তু যারা বিশ্বাসী তারা তাকে ভয় করে এবং জানে যে তা সত্য। (স্বয়ং আল্লাহই বলছেন 'সম্ভবত'। তাহলে কি তিনি নিজেই জানেন না কখন তা ঘটবে? অবশ্যই জানেন। আসলে মূল কেতাবে লিকিত আছে-'পাপের পরিমাণ এই স্তরে উঠলে সৃষ্টিজগতের ভারসাম্য পুরোপুরি বিঘ্নিত হবে, ফলে কেয়ামত হবে'-এরূপ কোনো বিধান। অর্থাৎ কেয়ামতের জন্য সময় নির্ধারিত ক'রে রাখা হয়নি, পাপের পরিমাণ দ্বারা নির্ধারিত করা হয়েছে, যার ফলে তার আসন্নতাকে মাপা যায় কেবল লক্ষণ/উপসর্গ দ্বারা। পরবর্তী আয়াত দ্রঃ। সেই লক্ষণগুলো রসুল (সঃ) বলেই গেছেন। সময়টাকে আল্লাহ আমাদের কর্মপদ্ধতির সাথে সম্পর্কিত ক'রে দিয়েছেন ব'লে তিনি সময়ের হিসাবটা আমাদেরকে ব'লে দেননি। আমরা যদি বেশি বেশি পাপ ক'রে দ্রুত আমাদের সময়কে ক্ষয় ক'রে ফেলি, তাহলে তা তো শীঘ্রই আসবে। নির্ধারিত দিন (সময়ের মাপে) কেবল আল্লাহই জানেন। তা প্রকাশ করলে তো আর পরীক্ষা অর্থপূর্ণ হতো না-সবকিছু ফয়সালা হয়ে যেত।) (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ, আয়াত: ১৭-১৮)
কেয়ামতের লক্ষণসমূহ তো এসে পড়েছে। (এখানে কেয়ামতের 'আসন্নতাকে' মাপা হয়েছে লক্ষণ দ্বারা, সময় দ্বারা নয়!) (সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১৮)
... তোমাদের জন্য নির্ধারিত দিন আছে, যা তোমরা মুহূর্তকাল বিলম্বিত করতে পারবে না, তুরান্বিতও করতে পারবে না। (সূরা সা-বা, আয়াত: ৩০)
আমি তাদেরকে সময় দিয়ে থাকি। আমার কৌশল অত্যন্ত বলিষ্ঠ। (সূরা আ'রাফ, আয়াত ১৮৩)
আমিই ... লিখে রাখি যা ওরা (মানুষ) আগে পাঠায় এবং যা পেছনে রেখে যায়। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১২)
যদি কেউ আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে, তাহলে এরূপ লোকেরা (নিজেদের এবং অপরের) ক্ষতি ক'রে থাকে। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২২৯)
প্রকৃতপক্ষে সব কিছুর ক্ষেত্রেই আদেশ আল্লাহর। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩১)
আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা শুরা, আয়াত: ৪০)
নিশ্চয় তোমরা এক স্তর থেকে অন্যস্তরে আরোহন করবে। (সূরা ইনশিক্বাক, আয়াত: ১৯)
সরলপথের নির্দেশ আল্লাহর দায়িত্ব, এবং তার মধ্যে বক্র কুপথও আছে। (সূরা নহল, আয়াত: ৯)
... আল্লাহ-তিনিই পরম বাস্তবতা। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৬২)
বল-পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং অনুধাবন কর কিভাবে তিনি সৃষ্টি আরম্ভ করেছেন। (অর্থাৎ কত রূপান্তরের মধ্যদিয়ে তিনি জগৎ সৃষ্টি করেছেন।) (সূরা আনকাবুত, আয়াত: ২০)
গোটা সৃষ্টিজগতের সর্বকালের সার্বিক ভারসাম্য স্থিত হয়েছে যে বিন্দুতে, সেই বিন্দুটা ক্রিয়াশীল একটা হৃদয়ের মধ্যে, যে-হৃদয়ের ধারকের নাম হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা (সঃ)। তিনিই হলেন সকল সৃষ্টিকূলের কেন্দ্রবিন্দু। তার কিছু ভবিষ্যদ্বাণী শোনো তাহলে:
• শেষ যুগে একই স্থানে বারবার ভূমিকম্প হবে ভূমিকম্পের সংখ্যা ও পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
• মানুষের রূপ পরিবর্তন হবে (যেমন, হরমোন থেরাপি, কসমেটিক সার্জারী, হিউম্যান ক্লোনিং এর মাধ্যমে)।
• নতুন নতুন ওষুধ এবং রোগের আবির্ভাব ঘটবে।
• সমাজের অধিপতি হবে নিষ্ঠুর এবং নিম্নশ্রেণীর লোকেরা।
• ইলম (জ্ঞান) বাড়বে কিন্তু 'আমল (তদনুযায়ী কাজ করা) কমবে।
• মানুষের লজ্জা ক'মে যাবে। মানুষ রিপুর পূজা করবে।
• ধর্ম নিয়ে ব্যবসা হবে।
• ইসলামের তথাকথিত ধার্মিকেরা বহু ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে।
• আরববাসীগণ তথা পৃথিবীর মানুষ অত্যন্ত ধনবান হবে।
• মানুষ বড় বড় ভবন বানাবার প্রতিযোগিতা চালাবে। ইত্যাদি।
এগুলো কি অক্ষরে অক্ষরে সত্য ফলেনি? একটু ভেবে দ্যাখ।
প্রশ্ন হলো: তিনি এসব ভবিষ্যত তথ্য আগে থেকে জানলেন কিভাবে? জবাব হলো: আল্লাহ-ই তাঁকে জানিয়েছেন। তাঁকে গোটা সৃষ্টিজগতের কেন্দ্রস্থানে স্থাপন করা হয়েছে-তাঁর এই কেন্দ্রিকতাই তাঁর সমস্ত জ্ঞানের উৎস এবং অধিকার। যিনি কেন্দ্র, তাঁকে প্রশ্নও করার প্রয়োজন হয় না তিনি কিভাবে তাঁরই শাখা-প্রশাখার জ্ঞান রাখেন: তাঁর চেতনা এবং জ্ঞানের মধ্যে প্রশ্ন এবং উত্তরের ব্যবধান ছিল না।
যাহোক, তোমার ভবিষ্যত তুমি নিজেও জান। কিন্তু তুমি সচেতন নও যে তুমি তা জান।
হ্যাঁ। আমরা তো আগইে জেনেছি যে মানুষের মনোবৃত্তি কর্মধারা জৈবিক ক্রিয়াকাণ্ড এগুলো থেকেই সময়ের সৃষ্টি হয়। মানুষের কর্মফলকে সময় বয়ে নিয়ে তা তার দিকে ধাবিত হয় ভবিষ্যত থেকে বর্তমানের দিকে। সময় তাকে বর্তমানে এসে তাই-ই উপহার দেয় যা সে অতীতে করেছিল। ব্যাপারটা একটা বৃত্তের মতো, যেখানে তুমি স্থির হয়ে আছ এবং সময় তোমা থেকেই সৃষ্ট হয়ে ভবিষ্যত হয়ে তোমার বর্তমানে এসে তোমার সাথে দেখা করছে।
কর্মফল সময় অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ
বিজ্ঞানও এখন তাই বলে। কোরআনেও একথা বলা হয়েছে:
প্রত্যেক মানুষের চিন্তা করা উচিত যে, সে আগামীকালের জন্য আগে/সামনে কী পাঠিয়েছে। (সূরা হাশর, আয়াত: ১৮)
আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদই পতিত হয় না, এবং যে আল্লাহকে বিশ্বাস করে তিনি তার অন্তরকে সুপথে পরিচালিত করেন। আল্লাহ সব বিষয়ে পুরোপুরি অবহিত। (সূরা তাগাবুন, আয়াত: ১১)
পৃথিবীতে বা তোমাদের মনোজগতে এমন কোনো দুঃখ-দুর্দশায় কারণ ঘটে না যা ঘটানোর আগে আমি লিপিবদ্ধ ক'রে রাখিনি; আল্লাহর জন্য তা খুবই সহজ। পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করার আগেই তা লিপিবদ্ধ করি; আল্লাহর পক্ষে এ অতি সহজ। এ জন্য যে, তোমাদের ওপর যা অতীত হয়েছে (অর্থাৎ যা হারিয়েছে), তার জন্য দুঃখিত হয়ো না, এবং তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তার জন্য হর্ষোৎফুল্ল হয়ো না, আল্লাহ উদ্ধত অহংকারীকে ভালোবাসেন না। (সূরা হাদীদ, আয়াত ২২-২৩)
সময়ের ফর্মুলায় আটকানো জীবনকে কোরআনে স্বপ্নের সাথে তুলনা করা হয়েছে। স্বপ্নের মধ্যে অবস্থান করার সময়ে তাকে দীর্ঘ মনে হয়, অথচ ঘুম ভেঙ্গে গেলে আমরা বুঝতে পারি যে তা ছিল সামান্য দশ মিনিট ঘুমের মধ্যে এক ঝলকের কিছু দৃশ্য। আল্লাহ বলেছেন যে জীবনটাও দীর্ঘ, যদি তাকে ভেতর থকে মাপা হয়, কিন্তু তা সংক্ষিপ্ত, যদি তাকে পরকালের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে মাপা হয়:
ওরা নিজেদের মধ্যে চুপিচুপি বলাবলি করবে—তোমরা পৃথিবীতে মাত্র দশদিন অবস্থান করেছিলে। ওরা কী বলবে তা আমি ভালো জানি। ওদের মধ্যে যে অপেক্ষাকৃত সৎপথে ছিল, সে বলবে—তোমরা মাত্র একদিন অবস্থান করেছিলে। (সূরা ত্বা-হা, আয়াত : ১০৩-১০৪)
...তারা বলবে কে আমাদের পুনরুত্থিত করবে? বল—তিনিই, যিনি তোমাদের প্রথমবারের মতো সৃষ্টি করেছেন; অতঃপর ওরা তোমার সামনে মাথা নাড়বে ও বলবে—তা কবে? বল—হবে। সম্ভবত শ্রীঘ্রই। যেদিন তিনি তোমাদেরকে আহ্বান করবেন, এবং তোমরা প্রশংসার সাথে তার আহ্বানে সাড়া দেবে, এবং তোমরা মনে করবে—তোমরা অল্পকালই অবস্থান করেছিলে। (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ৫১)
আমি কি তোমাদের দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে তখন কেউ সতর্ক হবে চাইলে সতর্ক হতে পারতে না? (সূরা ফাতির, আয়াত : ৩৭)
তুমি কি লক্ষ্য কর না যে আমি অবিশ্বাসীদের কাছে শয়তান ছেড়ে রেখেছি—ওদের মন্দ কাজে বিশেষভাবে উৎসাহ দেবার জন্য। সুতরাং ওদের বিষয়ে তাড়াতাড়ি ক'র না, আমি তো গণনা করছি—ওদের জন্য নির্ধারিত কাল। (আল্লাহ নিজেই গণনা করেছেন—একথার অর্থ কী? এর অর্থ হলো—নির্ধারিত রয়েছে মোট জীবনীশক্তি; ওরা পাপের দ্বারা তা দ্রুত ক্ষয় ক'রে আয়ুকে সময়ের নগদ টাকায় ভাঙিয়ে কত দ্রুত ফতুর হচ্ছে এবং ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে—তার প্রতি নির্দেশ করার জন্য আল্লাহ এভাবে কথা বলেছেন। সঞ্চয়পত্র ভাঙালে যেমন নগদ টাকা পাওয়া যায়—এবং একেক মেয়াদে ভাঙালে একেক পরিমাণের টাকা পাওয়া যায়, তেমনি মোট নির্ধারিত জীবনীশক্তি ভাঙালেও সময় পাওয়া যায়—তাকে পাপ দ্বারা ভাঙালে তার বিনিময় ক'মেই যেতে পারে।) (সূরা মরিয়ম, আয়াত : ৮০-৮৪)
প্রত্যেকটা জাতির জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত আছে; যখন তাদের সময়সীমা শেষ হয়ে যায়, তখন তারা তাকে এক ঘণ্টার জন্যও বিলম্ব করাতে পারে না, কিংবা তারা তা ত্বরান্বিতও করতে পারে না। (সূরা আ'রাফ, আয়াত : ৩৪)
কারো আয়ু বৃদ্ধি হলে বা হ্রাসপ্রাপ্ত হলে তা তো হয় কেতাব (সংরক্ষিত ফলক) অনুসারে। (সূরা ফাতির, আয়াত : ১১)
প্রকৃতপক্ষে সব কিছুর ক্ষেত্রেই আদেশ আল্লাহর। (সূরা রা'দ, আয়াত : ৩১)
কেয়ামতের লক্ষণসমূহ তো এসে পড়েছে। (এখানে কেয়ামতের 'আসন্নতাকে' মাপা হয়েছে লক্ষণ দ্বারা, সময় দ্বারা নয়!) (সূরা মুহাম্মদ, আয়াত : ১৮)
তুমি কি জান (হে মুহাম্মদ (সঃ))—সম্ভবত কেয়ামত আসন্ন। যারা বিশ্বাস করে না তারাই কামনা করে যে তা ত্বরান্বিত হোক। কিন্তু যারা বিশ্বাসী তারা তাকে ভয় করে এবং জানে যে তা সত্য। (সূরা হা-মীম-আস-সিজদাহ, আয়াত : ১৭-১৮)
তিনি আদি, তিনি অন্ত, তিনি ব্যক্ত, তিনি গুপ্ত, এবং তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত। (সূরা হাদীদ, আয়াত : ৩)
আল্লাহ যদি মানুষের অকল্যাণ ত্বরান্বিত করতেন, যেভাবে তারা তাদের কল্যাণ ত্বরান্বিত করতে চায়, তাহলে তাদের ভাগ্য মীমাংসিত হয়ে যেত (তারা ধ্বংস হয়ে যেত)। সুতরাং যারা আমার সাক্ষাতের আশা করে না, আমি তাদেরকে নিজ অবাধ্যতায় উদ্‌ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াতে দেই। (অর্থাৎ কোনো ঘটনাকে ত্বরান্বিত করা-না-করারও একটা অর্থ আছে, কারণ তা সম্ভব। ত্বরান্বিত করা মানেই হলো সময়ের মাপে কোনো ঘটনাকে দূর ভবিষ্যৎ থেকে আরো কাছে বর্তমানের দিকে এগিয়ে আনা।)
আল্লাহ যথাযথভাবে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এই উদ্দেশ্যে যে, যেন প্রত্যেক মানুষ তার কর্মানুযায়ী ফল পেতে পারে। (একেক আসমানের সময়-মাপ একেক রকমের : বিজ্ঞানও তাই বলে, হাদীসে এবং কোরআনেও তাই বলা হয়েছে। মানুষ যে কাজ করে তার জন্য তাকে কতটুকু সময় বাড়িয়ে বা কমিয়ে দিতে হবে তা আসমানের সৃষ্টিফর্মুলার সাথে ঠিক করা আছে। এভাবে মানুষ যে-কাজ করে, আসমান থেকে তা অনুসারে তার জন্য মূল কেতাবের বিধান অনুযায়ী পুনঃপুন সময় সৃষ্ট এবং নির্ধারিত হয়।) (সূরা জাসিয়া, আয়াত: ২২)
আকাশে রয়েছে তোমাদের জীবনোপকরণের উৎস এবং প্রতিশ্রুতি। আসমান ও জমিনের প্রতিপালকের শপথ, নিশ্চয় এ তোমাদের বাক্যালাপের মতোই সত্য। (সূরা যারিয়াত, আয়াত: ২২)
তোমার প্রতিপালকের পূর্বঘোষণা না থাকলে এবং একটা সময় নির্ধারিত না হলে আশু শাস্তি অবশ্যম্ভাবী হতো। (অর্থাৎ পূর্বঘোষণা অনুসারে অবকাশ বা সময় দেয়া হচ্ছে অথচ তাদের আমল বা কাজ এর বিচারে তাদের শাস্তির সুযোগ সৃষ্ট হয়েছে, অর্থাৎ তাদের কৃতকর্মকে আর চলতে দেয়ার সময় শেষ হয়েছে। তারা তাদের সময়কে ফুরিয়ে ফেলেছে-এখন তারা ভোগ করছে আল্লাহর দেয়া অবকাশ বা অতিরিক্ত সুযোগ। এ সুযোগ তিনি তাদেরকে দিয়েছেন তাঁর পূর্বঘোষণাকে বহাল রাখার জন্য। লক্ষ্য করতে হবে; সময়কে স্থির ধ'রে 'তার গতিকে কম বা বেশি ত্বরান্বিত করার সুযোগ আল্লাহ দিয়েছেন' এভাবে বিবেচনা করলেও সব হিসাব মিলে যায়! তার মানে হলো এই যে আল্লাহ একটা স্বাধীনতা আমাদের দিয়েছেন, তা হলো-সবকিছু নির্ধারিত এবং স্থিরীকৃত-তোমরা শুধু তাকে আগুপিছু করতে পার, মূল বিধান বাদে। অবশ্য আল্লাহই ভালো জানেন।) (সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১২৯)
প্রথম আয়াতে স্পষ্টভাবে বলেই দেয়া হয়েছে যে মানুষের আজকের কাজ দ্বারা তার আগামীদিনের প্রাপ্য এবং ভবিষ্যৎ সৃষ্ট হয়ে তা ভবিষ্যৎ থেকে তার বর্তমানের দিকে ছুটে আসছে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় এবং চতুর্থ আয়াত একথাকে সমর্থন করছে। এতে বলা হচ্ছে যে মানুষের গতদিনের কাজ আল্লাহর অনুমতি লাভ ক'রে ফলশ্রুতি নিয়ে তার আজকের সময় এবং ঘটনায় রূপান্তরিত হয়েছে। ফলে আজ যা ঘটেছে তার জন্য তার দুঃখ পাবার বা অহংকার করারও কিছু নেই-তা তো ঘটবে ব'লে নির্ধারিত হয়ে গেছে; তাকে রদ করার কোনো উপায় নেই। আল্লাহ স্পষ্টভাবেই পূর্বনির্ধারণের কথা বলছেন, আবার তা অনুসারেই তিনি নির্ধারিত ঘটনার সময়কে সামনে বা পেছনে সরিয়ে দেয়ার কথাও বলছেন। তিনি এও বলছেন যে পরকালে সবার মনে হবে যে তারা অল্পকালই ঘুমিয়েছিল-সবচেয়ে কম সময় ঘুমিয়ে থাকার কথা বলবে তারা যারা সৎকাজ করে- একথাও কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। এখানে ইঙ্গিত করাই হচ্ছে যে সময় এক-এক জনের জন্য এক-এক রকমের। এবং প্রত্যেকের মৃত্যু হলো তার নিজস্ব সময়ের শেষপ্রান্ত। প্রত্যেকের মৃত্যু মানেই তার জন্য কেয়ামত-ঠিক সার্বিক কেয়ামতের মতো। অর্থাৎ কেউ ম'রে গেলেও পৃথিবীর সময় ঠিকঠাক থাকে-মৃতের কাছে একথার কোনো অর্থ নেই। সে তখন সবারই সময়ের শেষ দেখে ফ্যালে। কিন্তু তা পৃথিবীর কাউকে জানাতে পারে না, স্বপ্নযোগে কিছু করুণাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া। অর্থাৎ সময় একটা অনুভূতিমাত্র। কারণ মানুষের কাজ থেকেই সময়ের অনুভূতির সৃষ্টি হয়। কঠোর সাধনা ক'রে যারা অসীমের সাক্ষাৎ লাভ করেন, তারা পার্থিব সময়ের সীমাকেই, অর্থাৎ সময়-নামক আঠালো মায়াকেই, অতিক্রম ক'রে যান।
সময় কখনও অতীতে পৌঁছায় না। সময়ের সাথে জীবনধারা এবং গতি জড়িত। অতীত রয়েছে কেবল চিত্রে-অর্থাৎ স্মৃতিতে, যা সময়ের রং মাখলেও সময়কে অতিক্রম করেছে। সময় সর্বদাই কিছু পরিবর্তন আনে। আমরা সময়কে চিনি বা চিহ্নিত করি এই পরিবর্তন দ্বারাই। তোমার দেশের আবহাওয়া এবং সব মানুষ ও জীবজন্তুর মধ্যে যদি দশ বছর ধ'রে কোনো পরিবর্তন না আসত, তাহলে তুমি ঘড়ি ছাড়া অন্য কোনোভাবেই সেই দশ বছরকে মাপতে পারতে না। যেহেতু তখন তুমি কোথাও কোনো পরিবর্তন দেখতে পেতে না। তুমি সময়কে অনুভব করতে না।
অতীত ব'লে কোনো স্থান বা রাজ্য নেই। সব স্থান বা স্পেসই বর্তমানের। অতীত বর্তমান ভবিষ্যতের ইঙ্গিত রয়েছে কেবল আমাদের আত্মচেতনায়, যার সম্প্রসারণের সাথে সাথে সময়ের বাস্তবতাও পাল্টে যায়।
কোনো স্পেস বা স্থান ছাড়া সময় ব'লে কিছু থাকতে পারে না। ফলে অতীত শুধু স্মৃতিমাত্র-তা কোনো অস্তিত্ব বা বাস্তবতা নয়।
বর্তমানকে যদি একটা প্যাঁচানো কাগজের চাকা বলা যায় তাহলে বলতে হয় যে অতীত হলো তার বিভিন্ন স্তর বা ভাঁজ মাত্র। অন্য কথায়, অতীত হলো বর্তমানের একটা স্তরমাত্র। বর্তমানও ভবিষ্যতের একটা স্তরমাত্র, যার সাথে আমাদের আত্মসচেতনতা আঠার মতো গেলে আছে। আল্লাহর বুযুর্গগণ জীবনের এক মুহূর্তের জন্যে হলেও এই শ্বাশ্বত সময়হীন বাস্তবতার সাথে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য লাভ করেন। অবশ্য একথা সত্য যে সবাইকে বাস্তবতার সব স্তরের জ্ঞান দেয়া হয় না। এমনকি তুমি নিজেও এমন কিছু ঘটনার স্বপ্ন দেখতে পার যা তোমার জীবনে ভবিষ্যতে ঘটবে। এবং এরূপ ঘটনা সবার জীবনেই ঘটে।
আমাদের স্বপ্নের লীলাভূমি হলো আমাদের চেতনা-আসলে চেতনা আর বাস্তবতার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য সৃষ্টি করে আমাদের আত্মচেতনা, যার জ্ঞানের পরিধিটুকুই তার কাছে সত্য, বাকি সব তার কাছে মিথ্যা।
ফলে অনেক সময়ে স্বপ্নে আমরা তাই দেখি যা ভবিষ্যতের জন্য ঘটে গেছে, যদিও আমাদের আত্মচেতনা তার সাথে এখনও মিলিত হয়নি। স্বপ্নের বাস্তবতার লজিক এমন যা জাগরণের বাস্তবতার সাথে খাপ খায় না। অথচ যতক্ষণ আমরা স্বপ্ন দেখি, ততক্ষণ আমাদের মনেই হয় না যে যা ঘটছে তা অযৌক্তিক। স্বপ্নের ঘটনাকে আমরা অযৌক্তিক বলি কেবল জাগরণের যুক্তি-বিচার প্রয়োগ ক'রেই। আসলে আমাদের দৃশ্য জগতের চেয়ে স্বপ্নের জগতের মাত্রা একটা বেশি। ফলে যে-ঘটনা দৃশ্যজগতে আত্মবিরোধের সমতুল্য ব'লে এখানে ঘটতে পারে না, স্বপ্নরাজ্যের যুক্তিতে তা সম্ভব এবং আত্মবিরুদ্ধ নয় এবং সেখানে তা ঘটেও।
বাস্তবতা থেকে যুক্তির সৃষ্টি হয়, যুক্তি বাস্তবাতাকে সৃষ্টি করে না। তুমি যখন স্বপ্নে বিচরণ কর, তখন দূর থেকে কোনো ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ কর না, তুমি নিজেও সেই ঘটনার অংশ হিসেবে নিজেকে খুঁজে পাও। অর্থাৎ স্বপ্ন কোনো কল্পনা বা মনের অনুভূতিজাত যুক্তির কাহিনীসুলভ বর্ণনা নয়-তা নিজেই একটা বাস্তবতা। তাতে তুমি রয়েছ, ছিলে, থাকবে। তোমার অস্তিত্ব চলছে ভবিষ্যত থেকে বর্তমানের দিকে; তোমার আত্মসচেতনতা তাকিয়ে আছে বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের দিকে। কোনো ঘটনাকে মানুষ সেভাবেই দ্যাখে যেভাবে তা তার আত্মচেতনার আয়নায় বিম্বিত হয়।
তুমি যদি ভবিষ্যতের দিকে পেছনে ফিরে অতীতমুখী হয়ে তোমার আত্মচেতনাকে ক্রিয়াশীল করতে পারতে, তাহলে দেখতে যে তুমি বাইরে থেকে আবার ভেতরে ঢুকে গেছ-এবং তুমি সব 'বাহিরকে' অতিক্রম করতে এবং এমন রাজ্যে পৌঁছে যেতে যেখান থেকে সময় সৃষ্টি হয় এবং সেখানেই তা আবার ফেরত যায়। তুমি যদি দূর থেকে সময়ের তীরকে দেখতে পেতে, তাহলে তাকে অতিক্রম করতে পারতে-আর কোনো যন্ত্রপাতিরই দরকার হতো না। কিন্তু সময়ের তীর তোমার আত্মচেতনার মধ্য দিয়েই ক্রিয়াশীল। তার তীরের মধ্য দিয়েই তুমি বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে আছ। এ কারণে তার চশমার মধ্য দিয়েই তোমাকে তাকাতে হয়-তুমি তার চশমার রং-এর বাইরের কোনো রং দেখতেও পার না। তার 'বাহির' ব'লে কিছু আছে কি-না তাও তুমি ধারণা করতে পার না; কারণ তুমি যার মধ্যে আছ সে তার ভেতরটাকে তোমার 'বাহির' ব'লে সংজ্ঞায়িত করবে। অর্থাৎ তুমি সময়ের হাতে বন্দী; কেননা সময় তোমার থেকেই সৃষ্ট হয়। এ কারণে প্রত্যেক ব্যক্তির মৃত্যুই তার জন্য কেয়ামত স্বরূপ হবে-সে মৃত্যুর সময়ে তার সময়-ভ্রমণের প্রান্তে গিয়ে হাজির হবে।
সময়ের শপথ। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে। (অর্থাৎ মানুষ এ ব্যাপারে বুঝতে না পারলেও তা জানবে তার আয়ু নামক ক্ষুদ্র সময়-ভ্রমণের প্রান্তে গিয়ে।) (সূরা আছর, আয়াত: ১-২)
আসমান ও জমিনের অদৃশ্য-জ্ঞান আল্লাহরই-এবং সেই মুহূর্তের (কেয়ামতের) ব্যাপার তো চোখের পলকের মতো, এবং তার চেয়েও নিকটবর্তী। (সূরা নহল, আয়াত: ৭৭)
সময়ের ফর্মুলায় আটকানো জীবনকে কোরআনে স্বপ্নের সাথে তুলনা করা হয়েছে। স্বপ্নের মধ্যে অবস্থান করার সময়ে তাকে দীর্ঘ মনে হয়, অথচ ঘুম ভেঙ্গে গেলে আমরা বুঝতে পারি যে তা ছিল সামান্য দশ মিনিট ঘুমের মধ্যে এক ঝলকের কিছু দৃশ্য। আল্লাহ বলেছেন যে জীবনটাও দীর্ঘ, যদি তাকে ভেতর থকে মাপা হয়, কিন্তু তা সংক্ষিপ্ত, যদি তাকে পরকালের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে মাপা হয়।
আমি কি তোমাদের দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে তখন কেউ সতর্ক হবে চাইলে সতর্ক হতে পারতে না? (সূরা ফাতির, আয়াত: ৩৭)
জীবনের ভেতরকার স্কেলের মাপে তার দৈর্ঘ্য যথেষ্ট বড়, কিন্তু শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে গোটা সৃষ্টিজগতের বয়সকে মাপলেও তাকে তুচ্ছ মনে হবে-ঠিক যেন স্বপ্ন!
ওরা নিজেদের মধ্যে চুপিচুপি বলাবলি করবে-তোমরা পৃথিবীতে মাত্র দশদিন অবস্থান করেছিলে। ওরা কী বলবে তা আমি ভালো জানি। ওদের মধ্যে যে অপেক্ষাকৃত সৎপথে ছিল, সে বলবে-তোমরা মাত্র একদিন অবস্থান করেছিলে। (সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১০৩-১০৪)
আবার গোটা সৃষ্টিকুলের কেয়ামতও হবে সার্বিকভাবে-যার চিত্রও হবে প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব কেয়ামতের অনুরূপ। কেয়ামতের সময়ে ঘটবে কী? প্রত্যেকের আত্মচেতনা বাইরে থেকে আবার ভেতরে ঢুকে যাবে। আর তখনই জানা যাবে যে এই বাইরের জগৎ ছিল মায়া-এর সবকিছু চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গুড়িয়ে যাবে:
আকাশ যখন বিদীর্ণ হবে। সে তার প্রতিপালকের আদেশ পালন করবে, এবং এটাই তার স্বভাবগত কর্তব্য (অর্থাৎ তার কর্মপদ্ধতির ফর্মুলার মধ্যে প্রবিষ্ট নিয়ম)। এবং পৃথিবীকে যখন সম্প্রসারিত ক'রে সমতল করা হবে। এবং পৃথিবী তার গর্ভে যা আছে তা বাইরে নিক্ষেপ করবে ও শূন্যগর্ভ হবে। (সূরা ইনশিক্বাক, আয়াত: ১-৪)
যখন সূর্যকে সংকুচিত করা হবে। যখন নক্ষত্র খ'সে পড়বে। পর্বতসমূহ যখন অপসারিত হবে। যখন পূর্ণগর্ভা উস্ত্রী উপেক্ষিত হবে। যখন বন্য পশুর একত্র সমাবেশ হবে। সমুদ্র যখন স্ফীত হবে.... যখন আকাশের আবরণ অপসারিত হবে। তখন প্রত্যেক ব্যক্তি জানবে সে কী নিয়ে এসেছে। আমি ভ্রাম্যমাণ গ্রহনক্ষত্রের শপথ করি, যা গতিশীল ও স্থিতিবান। (এবং শপথ) রজনীর যখন তা গত হয়। এবং উষার, যখন তার আবির্ভাব হয়। নিশ্চয় এ কোরআন এক সম্মানিত রসূলের ওপর অবতারিত আল্লাহর বাণী। (সূরা তাক্বীর, আয়াত: ১-১৯)
স্পেস বা শূন্যতাও ফেটে যাবে। শূন্যতাও যে একটা সৃষ্টি, তাও যে ফেটে যেতে পারে, তা বিজ্ঞানও জানত না-কিছুদিন আগে আইনস্টাইনই প্রথমে একথা তত্ত্বীয়ভাবে বলেছিলেন। অবশ্য তিনি বললে কী হবে, প্রথম দিকে বিজ্ঞানীরাই বুঝতে পারেননি তিনি কী বলেছিলেন। কিন্তু পবিত্র কোরআনে সেই চোদ্দশ' বছর আগেই আল্লাহ ব'লে দিয়েছেন যে সৃষ্টিজগৎ ধ্বংসের সময়ে শূন্যতা ফেটে যাবে। ফলে বোঝা যাবে যে এতদিন যা ছিল সবই মরিচিকা, মায়া। কোরআনেও তাই বলা হয়েছে:
মানুষ বলবে—একী হলো?... কারণ ওদেরকে ওদের কর্মফল দেখানো হবে। কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে সে তা দেখবে। এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকাজ করলে তাও দেখবে। (সূরা যিলযাল, আয়াত: ১-৮)
এই দেখা বড়ই কঠোর। যাদের তওবা আল্লাহ কবুল ক'রে নেন, তাদেরকে তাদের জীবদ্দশাতেই এই কর্মফলের কদর্যতা দেখিয়ে তাদের মধ্যে নিজের অতীতের প্রতি ঘৃণাপ্রবণ করা হয়। যে সব পাপ ক্ষমা হয়নি, তা দেখানো হয় মৃত্যুর সময়ে। হযরত মনসুর হাল্লাজ (রহঃ)-কে প্রাণদণ্ড দেবার সময়ে তিনি আফসোস ক'রে বলেছিলেন— 'একদিন এক যুবতীর প্রতি কুদৃষ্টি দিয়েছিলাম, আজ তার প্রতিশোধ নিয়ে নেয়া হলো।' তাঁকে সেই পাপ দেখানো হয়েছিল। মৃত্যুর সময়ে মানুষ দেখবে যে তার কাছে গোটা বাস্তবতা চুরমার হয়ে গেছে—সে অন্য এক বাস্তবতায় পৌঁছে যাচ্ছে।
...তোমরা এই জগতের ক্ষুণিকের দ্রব্য সামগ্রীর দিকে তাকাও, কিন্তু আল্লাহ তাকান পরকালের দিকে... (সূরা আনফাল, আয়াত: ৬৭)
এই পার্থিব জীবন তো খেলা-ধুলা ছাড়া আর কিছু নয়। পারলৌকিক জীবনই তো প্রকৃত জীবন। (সূরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৪)
...এখন তোমাদের সামনে থেকে পর্দা সরিয়ে নিয়েছি, আজ তোমরা স্পষ্ট দেখছ। (সূরা ক্বাফ, আয়াত: ২২)
সেদিন প্রকৃত বাস্তবতা নিকটবর্তী হবে। এ কারণে বাস্তবতার ছায়া বিলুপ্ত হতে থাকবে। আসলের দৌরাত্বে নকল নিশ্চিহ্ন হবে:
তোমরা প্রাসাদ নির্মাণ করছ এই ভেবে যে তোমরা চিরস্থায়ী হবে। (সূরা শোয়ারা, আয়াত: ১২৯)
কেয়ামতের ঘোষণা না থাকলে ওদের ফলাসালা তো হয়েই যেত। (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ, আয়াত: ২১)
তারা কি অপেক্ষা করবে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না আল্লাহ মেঘের আবরণ নিয়ে এসে উপস্থিত হন, এবং ফেরেস্তাদেরকে নিয়ে, এবং সেভাবে বিষয়টা মীমাংসা হয়ে যায়? (সূরা বাকারা, আয়াত: ২১০)
আকাশ যখন বিদীর্ণ হবে। সে তার প্রতিপালকের আদেশ পালন করবে, এবং এটাই তার স্বভাবগত কর্তব্য। এবং পৃথিবীকে যখন সম্প্রসারিত ক'রে সমতল করা হবে। এবং পৃথিবী তার গর্ভে যা আছে তা বাইরে নিক্ষেপ করবে ও শূন্যগর্ভ হবে। (সূরা ইনশিক্বাক, আয়াত: ১-৪)
যখন সূর্যকে সংকুচিত করা হবে। যখন নক্ষত্র খ'সে পড়বে। পর্বতসমূহ যখন অপসারিত হবে। যখন পূর্ণগর্ভা উস্ত্রী উপেক্ষিত হবে। যখন বন্য পশুর একত্র সমাবেশ হবে। সমুদ্র যখন স্ফীত হবে.... যখন আকাশের আবরণ অপসারিত হবে। তখন প্রত্যেক ব্যক্তি জানবে—সে কী নিয়ে এসেছে। আমি ভ্রাম্যমাণ গ্রহনক্ষত্রের শপথ করি, যা গতিশীল ও স্থিতিবান। (এবং শপথ) রজনীর যখন তা গত হয়। এবং উষার, যখন তার আবির্ভাব হয়। নিশ্চয় এ কোরআন এক সম্মানিত রসূলের ওপর অবতারিত আল্লাহর বাণী। (সূরা তাক্বীর, আয়াত: ১-১৯)
যেদিন আকাশ মেঘাপুঞ্জসহ বিদীর্ণ হবে এবং ফেরেস্তাগণকে নামিয়ে দেয়া হবে, সেদিনই প্রকৃত কর্তৃত্ব হবে দয়াময়ের এবং সত্য প্রত্যখ্যানকারীদের জন্য সেদিন হবে কঠিন। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ২৫-২৬)
সেইদিনই আল্লাহর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হবে। তিনিই ওদের বিচার করবেন। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৫৬)
তখনকার যে-বাস্তবতা হবে তার গঠনকাঠামো হবে এমন যে তাতে অবস্থানকারী কোনো ব্যক্তির আত্মচেতনা তার কেন্দ্রের মুখোমুখি হয়ে ক্রিয়াশীল থাকবে। ফলে যার জীবনের আচরণ এবং কাজকর্ম গোটা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবতার সার্বিক ভারসাম্যের সাথে মিলে যায়, অর্থাৎ রসুল (সঃ)-এর বা স্ব-স্ব যুগের নবী-রসুলের (আঃ) আচরণের অনুগামী হয়, সে এভাবে বাস্তবতার কেন্দ্রের সাথে নিজেকে একাত্ম হিসেবে খুঁজে পায়-এবং ফলে সে গোটা সৃষ্টিজগৎকে দেখতে পায় নিজের মধ্যে-অর্থাৎ তারই আমিত্বের সাথে প্রবল মমতার টানে বাঁধা। অন্য কথায়, সব বেহেস্তবাসীর মন হবে একটা, কারণ তাদের সবার আমিত্বের একটাই কেন্দ্র হবে:
আল্লাহ মানুষকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিলে ভূ-পৃষ্ঠে কোনো জীব-জন্তুকেই রেহাই দিতেন না। (অর্থাৎ সব জীবজন্তুর অস্তিত্বই মানুষের মনের সাথে বাঁধা।) (সূরা ফাতির, আয়াত: ৪৫)
তোমাদের সকলের সৃষ্টি এবং পুনরুত্থান একটামাত্র প্রাণীর সৃষ্টি এবং পুনরুত্থানেরই অনুরূপ।
(আমি) তাদের অন্তর থেকে ঈর্ষা দূর করব। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৪৩)
আমি তাদের অন্তর থেকে ঈর্ষা দূর করব-তারা ভ্রাতৃভাবে পরস্পর মুখোমুখী হয়ে আসনে অবস্থান করবে। (সূরা আল্-হিজর, আয়াত :৪৭)
কিন্তু বর্তমানের আপেক্ষিক-মাত্রার মধ্যে আমরা প্রত্যেকের আমিত্ব নিয়ে ব্যস্ত। এখানে বাস্তবতা আমাদের সেবায় নিয়েজিত ব'লে আমরা সবাই বিচ্ছিন্নতাবাদী স্বার্থপরের মতো সুযোগ-গ্রহণে ব্যস্ত:
অতঃপর আমি বললাম হে আদম! (ইবলিস) তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু; সুতরাং সে যেন কিছুতেই তোমাদেরকে বেহেস্ত থেকে বের ক'রে না দেয়, দিলে তোমরা কষ্ট পাবে। তোমার জন্য এটাই থাকল যে, তুমি বেহেস্তে ক্ষুধার্ত হবে না ও বস্ত্রহীন (বা নগ্ন) হবে না। সেখানে পিপাসার্ত হবে না, এবং রৌদ্র-ক্লিষ্টও হবে না।, অতঃপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিল; সে বলল-হে আদম! আমি কি তোমাকে ব'লে দেব অনন্ত জীবন-দায়ী বৃক্ষের কথা ও অক্ষয় রাজ্যের কথা? অতঃপর তারা তার ফল খেল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল, এবং তারা উদ্যানের গাছের পাতা দিয়ে নিজেদেরকে আবৃত করতে লাগল। আদম তার প্রতিপালকের অবাধ্য হলো, ফলে সে পথভ্রষ্ট হলো। এরপর তার প্রতিপালক তাকে মনোনীত করলেন, তার প্রতি ক্ষমাপরবশ হলেন এবং তাকে পথ দেখালেন। তিনি বললেন-তোমরা একে অপরের শত্রুরূপে একই সাথে বেহেস্ত থেকে নেমে যাও। (সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১১৭-১২৩)
তখন শয়তান তাদেরকে বেহেস্তের বাগান থেকে নামিয়ে ছাড়ল, এবং তাদেরকে আনন্দময় অবস্থা থেকে বের ক'রে আনল যাতে তারা অবস্থান করছিল। আমি বললাম। "নেমে যাও সবাই, একে-অপরের মধ্যে শত্রুতা নিয়ে। কিছু সময়ের জন্য পৃথিবী হবে তোমাদের আবাসভূমি এবং রুজি-রোজগারের স্থান।" (সূরা বাকারা, আয়াত: ৩৬)
সময়ের শপথ। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে। (অর্থাৎ মানুষ এ ব্যাপারে বুঝতে না পারলেও তা জানবে তার আয়ু নামক ক্ষুদ্র সময়-ভ্রমণের প্রান্তে গিয়ে।) (সূরা আছর, আয়াত: ১-২)
মানুষ অধিকাংশ ব্যাপারেই বিতর্কপ্রিয়। (বিতর্কই বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি করে।) (সূরা কাহাফ, আয়াত: ৫৪)
তুমি কি দেখো না তাকে যে তার কামনা-বাসনাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? ... তুমি কি মনে কর যে ওদের অধিকাংশ শোনে ও বোঝে? ওরা তো পশুর মতোই, বরং ওরা আরো অধম। (কামনা-বাসনার উপাসনা করার কারণেই প্রত্যেকে যার যার স্বার্থের কথা ভাবে, বিচ্ছিন্নতাবাদীর মতো আচরণ করে।) (সূরা ফোরকান, আয়াত: ৪৩-৪৪)
কিন্তু পরকালের পরম (Absolute) বাস্তবতা যাবতীয় আত্মচেতনাকে দুভাগে ভাগ ক'রে ফেলবে। আল্লাহর আদেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তা ঘটে যাবে-কারণ পরম বাস্তবতা কষ্টিপাথরের মতো, তা কোনটা সোনা কোনটা লোহা তা যাচাই করবে; এই যাচাইয়ের প্রক্রিয়াই আসল থেকে নকলকে বিচ্ছিন্ন ক'রে দেবে। অন্যভাবে বিচার ক'রে দেখ, পরকালের বাস্তবতায় আল্লাহর ঐক্য বা তাওহীদ পূর্ণভাবে এবং দৃশ্যমানরূপে প্রকাশিত হবে। এই একত্বকে স্বীকারকারী আত্মা তাঁর সাথে পূর্ণাঙ্গ সহাবস্থানে থাকবে এবং তাঁকে অস্বীকারকারী বা অংশীদারী আত্মা তাঁকে কোনো বিভেদ সৃষ্টি করতে না পেরে নিজেই নিজেকে শতধা করবে, অত্যাচার করবে, দোষারোপ করবে:
আজ তোমরা একবারের জন্য ধ্বংস কামনা ক'র না, বহুবার ধ্বংস কামনা করতে থাক। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ১৪)
আল্লাহ্ তোমাদের কাছ থেকে আগেই যে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন, তোমরা যদি তাতে বিশ্বাসী হও, তাহলে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে কে সে তোমাদের বাধা দেয়? (সূরা হাদীদ, আয়াত: ৮)
তারা নিজেদের বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দেবে (অর্থাৎ তারা স্বীকার করবে যে তারা অবিশ্বাসী ছিল)। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৩৭)
তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মে প্রতিষ্ঠিত কর। আল্লাহর স্বভাবের অনুসরণ কর, যে-স্বভাব অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর স্বভাবের কোনো পরিবর্তন নেই—এটাই সরল চিরস্থায়ী দ্বীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই (তা) জানে না। বিশুদ্ধ চিত্তে তাঁরই অভিমুখী হও; তাকে ভয় কর, নামাজ কায়েম কর ... (সূরা রুম, আয়াত: ৩০-৩১)
সেদিন (বিচারের দিন) অত্যাচারী নিজের হাত দুটো দংশন করতে করতে বলবে-হায়! আমি যদি রসুলের (সাঃ) সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায়! দুর্ভোগ আমার! আমি যদি (অমুক) শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমার নিকট কোরআন পৌঁছাবার পর সে আমাকে বিভ্রান্ত করেছিল। শয়তান তো মানুষকে বিপদকালে পরিত্যাগ করে। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ২৭-২৯)
তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, তাই আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গেছেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৬৭)
(এবং বলা হবে) হে অপরাধীগণ! তোমরা আজ আলাদা হয়ে যাও। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৫৯)
কেন্দ্রের সাথে নিজেদের আমিত্বকে যারা মেলায়নি কেন্দ্র তাদেরকে বিকর্ষণ করবে—এবং সে দোষ কেন্দ্রের নয়, তাদেরই। তারা নিজেরাও কেন্দ্রকে দোষ দেবে না, তারা দোষারোপ করবে নিজেদেরকেই।
আল্লাহর অলিগণ জীবদ্দশাতেই তাঁদের আমিত্বের ক্ষুদ্রত্বকে ধ্বংস ক'রে কেন্দ্রের সাথে নিজেদের আত্মসচেনতাকে একাত্ব ক'রে দেন বা একই সরলরেখায় অবস্থান করেন, এবং ফলে তারা জীবদ্দশাতেই তাই জেনে যান যা মানুষ জানবে মৃত্যুর পরে; তারা হয়ে যান সত্যের প্রত্যক্ষ সাক্ষী; তারা সাক্ষ্য দেন : আশ্-শাহদু আল্-লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু অয়াহদাহু লা-শারীকালাহু অশ্-হাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু অ-রসুলুহু। তারা শুনেও সাক্ষ্য দেন, দেখেও সাক্ষ্য দেন। তারা মৃত্যুকে অতিক্রম ক'রে যান। তারা এমন অবস্থায় চ'লে যান যেখানে তাদের আত্মচেতনাও আর লোপ পায় না এবং ফলে তাদের আমিত্বের কোনো মৃত্যু হয় না—মৃত্যু হয় শুধু দেহের। তারা তাদের গোটা আমিত্বকে দেহের পরাধীনতা থেকে মুক্ত করেছেন ব'লে তারা মৃত্যুর আগেই মুক্তি লাভ করেছেন।
কিছু মানুষ ভুলবশত মনে ক'রে বসে যে মৃত্যুর সময়ে সবাই-ই মুক্ত হয়ে যাবে এবং বেহেস্তে চ'লে যাবে। পরকালে দোজখ বলে কিছু নেই, দোজখ হলো ইহকালটাই।
তারা ভ্রান্ত! হাত-পায়ে বেড়ি লাগানো কয়েদিকে জেল থেকে ছেড়ে দিলেও সে মুক্তি পেয়েছে বলা যায় না। তেমনি যে-আত্মা পথ দ্যাখেনি এবং পরম বাস্তবতাতে বসবাসের উপযুক্ত হয়নি, সে মৃত্যুর সময়ে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ছাড়া পাবে, মুক্তি পাবে না। মুক্তি হলো আমিত্বের সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি এবং কেন্দ্রের সাথে ধর্মীয় আচরণ যেমন নামাজের মাধ্যমে নিজেকে একই সমতলে বা সরললেখায় স্থাপন করানো। তা ঘটতে হবে জীবদ্দশাতেই। তা না হলে আমরাই আমাদের এখানকার দোজখকে পরকালে নিয়ে যাব এবং তাতে হাত-পা গুটিয়ে নিজেরই পাপের জ্বালানির তীব্র শিখায় জ্ব'লে-পু'ড়ে ছাই হতে থাকব।
একথা ঠিক যে আল্লাহ আমাদেরকে পৃথিবীতে দোজখের মধ্যেই পাঠিয়েছেন, যেন আমরা সব জ্বালা-পোড়ার কাজ এখানেই সাঙ্গ ক'রে যাই। অথচ আমরা আমাদের দোজখকেই পরকালের জন্য রেখে দিয়ে বেহেস্তটাকে এখানে ভোগ করতে ব্যস্ত।
... তোমরা এই জগতের ক্ষণিকের দ্রব্য সামগ্রীর দিকে তাকাও, কিন্তু আল্লাহ তাকান পরকালের দিকে... (সূরা আনফাল, আয়াত: ৬৭)
মানুষ নিজের ওপরেই জুলুম ক'রে থাকে। আল্লাহ কারো ওপর জুলুম করেন না। আমরা ভবিষ্যতের জন্য যা সঞ্চয় করি, ভবিষ্যতে তাই-ই ভোগ করি।
প্রত্যেক মানুষের চিন্তা করা উচিত যে, সে আগামীকালের জন্য আগে/সামনে কী পাঠিয়েছে। (সূরা হাশর, আয়াত: ১৮)
আমরা যদি আমাদের সৃষ্ট দোজখকে ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখি, তহলে ভবিষ্যতে আমাদেরকে সেখানেই বসবাস করতে হবে।
তোমাদের অমঙ্গল তোমাদেরই। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১৯)
নামাজ হলো বেহেস্তের চাবি। তুমি যদি তা হারিয়ে ফেল, তাহলে তোমাকে কেউই বেহেস্তের দরজা খুলে দেবে না।
আমার সেই বন্ধু সেদিনের মতো বিদায় নিল।
কিছুদিন পর জানতে পারলাম সে মুসলমান হয়ে গেছে। তাকে শুধু এটুকুই বললাম—ভেতরে যে তুমি মহৎ ছিলে, তোমার ভেতরে যে সত্যিকারের একটা ভালোমানুষ লুকিয়ে ছিল, তুমি তার প্রমাণ দিলে। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00