📘 কোরানিক সেলফ কন্ট্রোল এবং মৃত্যুহীন জীবন > 📄 ধ্বংসের সৃষ্টি

📄 ধ্বংসের সৃষ্টি


ধ্বংস মানে মৃত্যু। ধ্বংস মানে ব্যাধি। ধ্বংস মানে অস্থিরতা, হতাশা, অবসন্নতা, আস্থাহীনতা, অবিশ্বাস, আত্মবিশ্বাসের অভাব, অনিশ্চয়তা, সন্দেহ, ভয়। জীবনের উপভোগের পথে বাধা সৃষ্টি করার জন্য এদের যে-কোনো একটা বাধাই যথেষ্ট। জীবনের সব সুখ হরণ করার জন্য এদের যে-কোনোটাই সমান শক্তিশালী। এই জাতীয় ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হওয়া মানে মৃত্যু দ্বারাই আক্রান্ত হওয়া। জীবনে এগুলোর উপস্থিতি মনকে মৃত্যুভয়কাতর ক'রে দেয়। মনে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে-তা থেকে সংসারে, তারপর সমাজে, কৃষ্টি-কালচার-সাহিত্যে, রাষ্ট্রকাঠামোতে, অর্থনীতিতে, বিশ্বব্যবস্থায়।
জীবনের সাথেই বেড়ে উঠতে থাকে মৃত্যু। মৃত্যু আসার আগেও বারবার আসে-জ্বরা-ব্যধি-ভয়-হতাশা আকারে। জীবন মরার আগেই বারবার মরে।
একটা মানুষ একটা জীবন্ত লাশ। সে যদি সাথে তার কফিনটা বয়ে নিয়ে বেড়াত, তাহলে তা তার স্মরণে থাকত। কিন্তু সে ভুলে থাকে যে সে প্রতি মুহূর্তে পিছলে পড়ছে। এই ভুলে থাকার জন্যই সে কিছুটা স্বাভাবিকভাবে সংসারকাজ চালিয়ে যায়। কিন্তু তাতে ক্ষতি হয় আরো বেশি। বড় ধরনের ব্যাধি বা শোক বা মৃত্যু যখন দুয়ারে হানা দেয়, তখন সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যায়।
জাগতিক বা সেকুলার-মাইন্ডের লোকেরা পার্থিবতার মধ্যে তাদের সেই অস্থিরতা এবং ভয়কে লুকিয়ে রেখে জীবন-যাপন করে। কিন্তু তাদের সেই বেঁচে থাকা আত্মপ্রবঞ্চনার সামিল।
মৃত্যুকে ভুলে থেকে মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায় না।
জীবনের মধ্যে ডুবে গিয়েও মৃত্যুর আতংক থেকে মুক্ত হওয়া যায় না।
মৃত্যুকে একটা আবশ্যিক প্রাকৃতিক ঘটনা ব'লে মেনে নিয়েও স্বাভাবিক হওয়া যায় না। তথাকথিত নাস্তিকদের নির্ভেজাল চকচকে হাসিমাখা মুখ দেখেই বলা যাবে না যে তারা সুখী। তারা সুখের যে সংজ্ঞাটা জানে, বাস্তবে তার সাক্ষাৎ কোনোদিনও পায়নি। মৃত্যুকে বাদ দিয়ে যে-জীবন, তার প্রতিটি পদে-পদে থাকে বিকৃত, উদ্ভট মেজাজের মৃত্যু।
তাহলে বেঁচে থাকার কি কোনো উপায় নেই?
আছে। বেঁচে তো আছে সবাই। বেঁচে থাকেও। প্রকৃতির নিয়মগুলোর মধ্যে না-মরা পর্যন্ত বেঁচে থাকাও একটা নিয়ম। এই অর্থে বেঁচে আছে সবাই।
তবুও মনের গভীরে চিন্তা করলে বুঝা যায় যে এ হলো জীবিত থাকা। জীবিত থাকা আর বেঁচে থাকা এক কথা নয়। বেঁচে থাকা মানে অন্য কিছু। বেঁচে থাকা মানে জীবিত থেকে জীবনের উদ্দেশ্য সাধন করা। সেই উদ্দেশ্য হাসিল না হওয়া পর্যন্ত একজন ব্যক্তির পক্ষে স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা সম্ভব নয় সে বেঁচে আছে কি না।
প্রকৃত বেঁচে থাকা তাকেই বলে যা বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য অর্জন করেছে। প্রকৃত জীবন সেটাই যা মৃত্যুর গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ নয়।
প্রকৃত জীবন সেটাই যা জীবনেরও গণ্ডিকে অতিক্রম করেছে।
প্রিয় পাঠক! জীবনকে বায়োলজিক্যালি বা জৈবিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে গেলেই দেখা যাবে যে তার শুরুতে জীবন ছিল না—শুধু ছিল জৈবিকতা বা প্রাণ— এবং শেষেও থাকবে মৃত্যু। সুতরাং বেঁচে থাকাই জীবনের উদ্দেশ্য হতে পারে না।
বেঁচে থাকা একটা প্রক্রিয়ামাত্র। একে আমরা শুরু করিনি। আমরা একে সমাপ্ত করারও যোগ্যতা রাখি না। এ কারণে আমরা যদি আমাদের খামখেয়াল অনুসারে বেঁচে থাকি তাহলে জীবন থেকে যা চাই তা পাই না।
তাহলে জীবনটা আসলে কী?
এই একটা প্রশ্নই কোটি কোটি জীবনকে ভারাক্রান্ত ক'রে তুলেছে—যুগে যুগে। ফলে ঘটনা হয়েছে এরূপ যে, জীবনটাকেই মনে হয়েছে জীবনের বোঝাস্বরূপ। এই বোঝা বহন করা বড়ই কষ্টকর। ফলে আমরা চারদিকে দেখি অপমৃত্যু—আত্মহত্যা, ড্রাগ-এডিকশান, ফ্যাশান-নাস্তিকতা, প্রতিমা-পূজা, অগ্নি-পূজা, বৃক্ষ-পূজা, নক্সের পূজা, শব্দ-পূজা (বা উদ্দেশ্যহীন কবিতাপ্রীতি) অস্থিরতা, বিষণ্ণতা, হাহাকার।
তাহলে কি জীবনটার অর্থই ওলটপালট হয়ে গেল না?—পাঠককে হয়তো এই প্রশ্নবাণ এই মুহূর্তে আহত করছে। কিংবা আপনি হয়তো ভাবছেন যে লেখক সাহেব জীবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তাকে অযথা জটিল করে তুলছেন।
কিন্তু প্রিয় পাঠক, ভেবে দেখুন তো, যে-জীবন নিয়ে একটু ওলট-পালট কথা বললেই তা ওলট-পালট হয়ে যায়, তার সার্থকতা এই অর্থে কতটুকু?
আপনার মনে আবারও প্রশ্ন জাগতে পারে—তাহলে কি জীবন মানে অপমৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করা?
না। আমি আগেই বলেছি যে জীবনও জীবনের উদ্দেশ্য নয়। জীবন একটা সাদা কাগজ। তাতে আপনি কী লিখলেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। জীবনীশক্তি বা জীবিতাবস্থা জীবনের একটা বস্তুগত এবং জৈবিক এবং রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যমাত্র। আগে জীবন পরে লক্ষ্য এভাবে বাস্তবতা রচিত নয়। প্রকৃত বাস্তবতা হলো একটা লক্ষ্য। চেতনা যখন দৃশ্য এবং অদৃশ্য অবয়বের প্রকাশ ঘটিয়ে সেই লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হতে থাকে, তখন স্থান-কালের সাথে সেই অবয়বের যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সংঘটিত হয় তাকেই বলে জীবন। সুতরাং বেঁচে থাকা মানে হলো জীবনের সেই প্রক্রিয়া যার কিছু ঘটনা আপনি ঘুমিয়ে থাকলেও ঘটত। এসবকে ঘটিয়ে বা ঘটতে দিয়ে কোনো সার্থকতা অর্জন করা যায় না বা বলা যায় না যে আমি আনন্দিত হয়েছি।
তাহলে এই ঝামেলাটা মানুষের ওপর চাপানো হয়েছিল কেন? কেন আমাকে আমার অনুমতি ছাড়াই জোর ক'রে সৃষ্টি করা হলো এবং তারপর এমন নিয়মের বোঝাও আমার ওপর চাপানো হলো যে আমি যা করতে চাই তা করলে আমি যা পেতে চাই তা পেতে পারি না? কেন?-বিদ্রোহী মন এভাবে প্রশ্ন ক'রে উঠতে চায়। এই প্রশ্ন মনের নিজস্ব। এর জবাব পেতেই হবে। জীবনের একটা প্রধান লক্ষ্য হলো এই প্রশ্নের জবাব খোঁজা এবং জীবনের একটা বিরাট সার্থকতা হলো এর জবাব খুঁজে পাওয়া। অন্য কথায়, জীবনের জন্য কোনো লক্ষ্যই বা কেন দরকার?-এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাওয়াই জীবনের প্রথম লক্ষ্য। মন যখন এটুকু বুঝে ফেলবে তখন দেখা যাবে যে বেঁচে-থাকা একটা সার্থকতার আকাঙ্ক্ষা অর্জন করতে যাচ্ছে।
মানুষকে জীবন দেয়া হয়েছিল কেন?
মৃত্যুকে অতিক্রম করার জন্য।
মানুষকে মৃত্যু কেন দেয়া হয়েছিল?
জীবনের সংকীর্ণ গণ্ডি পার হবার জন্য।
আবারও সেই প্রশ্ন: জীবন কেন দেয়া হয়েছিল? জীবন দেয়া হয়েছিল 'এ জীবন কেন দেয়া হয়েছে?' এই প্রশ্নের জবাব পাবার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।
সে জবাব পাবার পর কী ঘটবে?
মৃত্যু ঘটবে?
তারপর আর কোনো মৃত্যু এসে জীবনকে সংজ্ঞায়িত করবে না। রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেন:
তোমরা মরার আগে মর, তাহলে তোমাদের আর মৃত্যু হবে না।
বেঁচে থেকেই! এবার কি কথাগুলো নিরুদ্দেশ হয়ে যাচ্ছে না?
না। এ জীবনকে কেউ তাঁর নিজের খেয়ালে খেলনার সামগ্রী ক'রে সৃষ্টি করেননি।
আমাদের যেন নজরুলের 'খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে/বিরাট শিশু আনমনে'- মন্তব্যটা শুনে বিভ্রান্তি না লেগে যায় সেজন্য আল্লাহ পরম করুণাময় পবিত্র কোরআনেই স্পষ্ট ক'রে বলে দিয়েছেন যে তিনি মানুষকে ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করেননি:
যারা দাঁড়িয়ে বসে, ও শুয়ে আল্লহকে স্মরণ করে, এবং আসমান ও জমিনের সৃষ্টি বিষয়ে চিন্তা করে যে-হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এ অনর্থক সৃষ্টি করনি ... (সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১৯১)
আমি আসমান ও জমিন এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী কোনো কিছুই অনর্থক সৃষ্টি করিনি; যদিও অবিশ্বাসীদের ধারণা তাই ... (সূরা সাদ, আয়াত: ২৭)
তিনি চান না যে সৃষ্টি-মানুষের মনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করুক:
তবে কি তারা আল্লাহর এমন শরিক করেছে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মতো সৃষ্টি করেছে, যে- কারণে সৃষ্টি ওদের মধ্যে বিভ্রান্তি ঘটিয়েছে?-বল, আল্লাহই সকল বস্তর স্রষ্টা; তিনি এক পরাক্রমশালী। (সূরা রা'দ, আয়াত: ১৬)
আসলে এত জটিলতা কেন আসছে?
কারণ আমরা সমস্ত জটিলতা থেকে মুক্ত হতে চাই।
প্যাঁচ খুলতে গেলে উল্টো প্যাঁচ দিতে হয়।
আমরা ভুল ক'রে ভেবে বসি যে আমরা জীবিত ছিলাম এবং তারপর আমাদেরকে জোর ক'রে মৃত্যুর বোঝা বহন করতে বাধ্য করা হচ্ছে। ব্যাপারটা আদৌ তা নয়।
তথাকথিত 'বৈজ্ঞানিক' মন ভেবে বসে যে জীবন মৃত্যুর দ্বারা সংজ্ঞায়িত, অর্থাৎ জীবনের মতো মৃত্যুও একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু মৃত্যুকে এভাবে কর্তব্য হিসেবে ধরে নিয়ে বেঁচে থেকে কোনো কার্ল মার্কস বা বার্ট্রান্ড রাসেলও কি তৃপ্তি পেয়েছেন? পাননি।
কারণ তারা নিজেদেরকে সঠিক প্রশ্নটাই করতে পারেননি। ফলে জবাব যা পেয়েছেন সব ভুল। তা জীবনের কোনোই কাজে আসেনি। তা দিয়ে অর্থনীতি চাঙ্গা হতে পারে বা বদলে যেতে পারে, দর্শন সমৃদ্ধ হতে পারে বা তার পূর্ববর্তী দারিদ্র্য ধরা পড়তে পারে, বড় বড় খেতাব এবং পুরস্কার এবং যুদ্ধ এবং বিপ্লব এবং সরাইখানা এবং বেশ্যালয় এবং গোরস্থান রচিত হতে পারে, কিন্তু তা পৃথিবীর কোনো মানব সন্তানের জীবনের কোনো কাজে আসেনি।
আসল সত্যটা হলো: জীবনের সৃষ্টি হয়নি, সৃষ্টি হয়েছিল ধ্বংসের। আর সেই ধ্বংসযজ্ঞের ধ্বংসাবশেষের প্রত্নতত্ত্বে আটকে গিয়েছিল জীবন-আল্লাহর চিরশ্বাশ্বত বৈশিষ্ট্যাবলীর এক অপূর্ব সমন্বয়। এই ধ্বংস সৃষ্টি হয়েছিল তখনই যখন আদি পিতা আদম (আঃ) এবং আদি মাতা হাওয়া (আঃ) ইবলিসের প্ররোচণায় সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়েছিলেন। নষ্ট হয়েছিল আল্লাহর সাথে তাঁদের ঐক্য। সৃষ্ট হয়েছিল ক্ষুদ্র অস্তিত্ব, নশ্বর মন। ব্যাঙ তার কুয়োর মধ্যে পড়ে সেখানেই চিরকাল আবদ্ধ থাকার অবস্থা সৃষ্টি ক'রে নিল। এবং সে তখন সাগরকে ভাবতে শিখল তার কুয়োর চেয়েও ক্ষুদ্র আকারে।
যত সমস্যা সৃষ্টি হলো এই ভাবনা থেকেই। ফলে এখন মন তার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে পথ খুঁজে পায় না, তখন সে হয় মৃত্যু খোঁজে না হয় মরতে বাধ্য হয়। এর কোনোটাতেই মুক্তি নেই। এমনকি আদম-হাওয়াকে (আঃ) দোষারোপ করাতেও কোনো মুক্তি বা সদুত্তর লুকিয়ে নেই। এখানে এসে রহস্য আরো ঘনীভূত হয়ে যায়।

📘 কোরানিক সেলফ কন্ট্রোল এবং মৃত্যুহীন জীবন > 📄 মৃত্যুর মধ্যে জীবনের হাতছানি

📄 মৃত্যুর মধ্যে জীবনের হাতছানি


এখন তাহলে মুক্তি কোথায়?
এখন মুক্তি জীবনের মধ্যে নেই, মৃত্যুর মধ্যে। এখন মুক্তি মৃত্যুর মধ্যে নেই, মৃত্যুর কিভাবে সৃষ্টি হলো তার রহস্য জানার মধ্যে।
এখন মুক্তি মৃত্যুর রহস্যের মধ্যে নেই, তাকে অতিক্রম করার মধ্যে। মৃত্যু অতিক্রমের প্রকৃত অর্থ হলো জীবন-মৃত্যু উভয়ের গণ্ডি পার হয়ে সেই শ্বাশ্বত ঘরে ফিরে যাওয়া যার সম্বন্ধে আমরা ভুলে গেছি বিধায় আল্লাহ দয়াপরবশ হয়ে যুগে যুগে নবী-রসুলগণকে (আঃ) পাঠিয়ে বারবার আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে আমরা এখনও জন্মাইনি, এক ধারাবাহিক মৃত্যুর মোহতন্দ্রার মধ্যে অবস্থান করছি। এই রহস্য জানলে অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচা যায়। জীবনের উদ্দেশ্য হলো জীবনের উৎসকে স্মরণ করা। জীবনের উদ্দেশ্য হলো আবার সেই উৎসের কাছে আত্মসমর্পণ ক'রে শ্বাশ্বত ঘরে ফিরে যাওয়া।
আপনি পরকালে বিশ্বাস করেন বা না করেন, পরকাল আপনাকে টেনে নেবেই। আপনি বেহেস্তে যেতে চান বা না চান, বেহেস্ত এবং দোযখের মধ্যে আপনাকে একটা বেছে নিতে হবেই।
আপনি মৃত্যুর নিদ্রায় শায়িত থাকতে চাইলেও মৃত্যুর সময়ে আপনি জেনে আতংকিত হবেন যে আপনার আর কোন মৃত্যু হবে না। বিগত জীবনের কাজ অনুসারে অনন্তকাল ফল ভোগ করতে হবে। তখন কঠোরভাবে বলা হবে: আজ তোমরা একবারের জন্য ধ্বংস কামনা ক'র না, বহুবার ধ্বংস কামনা করতে থাক। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ১৪)
মৃত্যু সম্বন্ধে মানুষের একটা ভুল ধারণা আছে। মানুষ ভ্রান্তিবশত ভেবে বসে যে মৃত্যুর সময়ে মুমূর্ষ ব্যক্তি চোখে অন্ধকার দ্যাখে, যেমন হয়ে থাকে অজ্ঞান হয়ে পড়ার সময়ে।
বরং সত্যটা ঠিক এর উল্টো। মৃত্যুর সময়ে আমাদের চোখে অন্ধকার ঘনিয়ে আসবে না, চোখের অন্ধকার এবং মায়ার ঘোর কেটে যাবে। সেই শ্বাশ্বত জগতের বিশাল রহস্যের দ্বার খুলে যাবে। এই রহস্য দেখেই সবার মনে পড়বে কে তাকে বানিয়েছিলেন, কেনই বা বানিয়েছিলেন, তার ওপর আদৌ কোনো অবিচার করা হয়েছে কিনা। অসার্থক মন তখন আফসোসে ফেটে পড়বে। হা ক'রে তাকিয়ে থাকবে, যা আমরা প্রত্যেক লাশের ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করি। যাদের কৃতকর্ম খারাপ ছিল, তারা আবার ফেরত আসবে চাইবে পৃথিবীতে:
এখন তোমাদের সামনে থেকে পর্দা সরিয়ে নিয়েছি, আজ তোমরা স্পষ্ট দেখছ। (সূরা ক্বাফ, আয়াত: ২২)
যখন ওদের কারে মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন সে বলে—হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আবার (পৃথিবীতে) পাঠাও, যাতে আমি সৎকাজ করতে পারি, যা আমি আগে করিনি।—না এ হবার নয়। এ তো আর একটা উক্তিমাত্র। ওদের সামনে পর্দা থাকবে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত। (সূরা মু'মিনুন, আয়াত: ৯৯-১০০)
তারা দেখবে যে কোরআনের প্রতিশ্রুতি সত্য, কিন্তু তারা আল্লাহকে বা তার রহস্যকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করবে না। এ কোনো বানোয়াট গল্প নয়। মৃত্যুকে অতিক্রম ক'রে যারা আল্লাহ্র অলি হয়েছেন, তাদেরকে সান্নিধ্য দেয়ার আগে আল্লাহ্ করুণা ক'রে এসব রহস্য চাক্ষুসভাবে দেখিয়ে থাকেন।
সুতরাং ভয় পাবার প্রয়োজন আছে। মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য স্বেচ্ছাচারিতাপূর্ণ জীবনের মধ্যে ঢুকে পড়লে কোনো লাভ নেই।
আবার এই সত্যকে জানলে ভয় পাবার বদলে আস্থাই বেড়ে যাবার কথা। আমি যখন জানতেই পারলাম যে আমার মৃত্যুই আমার আমিত্বের পরিসমাপ্তি নয়, আমাকে আল্লাহ্ তাঁরই প্রকাশিত বৈশিষ্ট্যের সম্মানে অনন্তকাল বাঁচিয়ে রাখবেন, তাহলে আর সময় নষ্ট করা কেন, তাহলে মনটাকে তাঁকে কেন দিয়ে দিচ্ছি না যিনি সকল জীবন-মৃত্যু-ধ্বংস-ক্ষয়ের উর্ধ্বে এবং যিনি এগুলোর স্রষ্টা?
মৃত্যুকে ফাঁকি দেয়ার উদ্দেশ্যে মৃত্যুর মধ্যেই লুকিয়ে পড়া যায়। ব্যথা থেকে রক্ষা পাবার জন্য ব্যথার মধ্যে ঢুকে পড়া যায়। যিনি তীর ছুড়ছেন তার কাছে আশ্রয় নিলে তো আর তীর বেঁধার ভয় থাকে না।

📘 কোরানিক সেলফ কন্ট্রোল এবং মৃত্যুহীন জীবন > 📄 কোত্থেকে এলাম, কোথায় এলাম?

📄 কোত্থেকে এলাম, কোথায় এলাম?


এতক্ষণে আমরা কোনো আলোচনা সৃষ্টি করতে পারিনি, শুধু নিজেদের উৎস-সন্ধানের লক্ষ্যে মনটাকে কিছুটা লক্ষ্যমুখী করতে পেরেছি। সুতরাং এখন একটু স্পষ্টতর প্রশ্ন করা যাক।
আমরা কোত্থেকে এসেছি? কোথায় এসেছি?
উন্নাসিক নাস্তিক বলবেন, আমরা প্রকৃতিরই সন্তান। এখানেই আমরা সৃষ্ট হয়েছি। আবার এখানেই আমরা মাটিতে মিশে যাব। ডাস্ট টু ডাস্ট।
আমার এক নাস্তিক বন্ধু একবার আমাকে এই জবাব দিয়েছিল। আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম—তাহলে তুমি এই মাটি, এই ইট, কাঠ, লোহা-লক্কড়, পানি এগুলোর সন্তান? তার মানে তুমি এগুলোর মধ্য থেকে জন্ম নিয়ে কয়েকদিন বুদ্বুদের মতো ভেসে বেড়াচ্ছ এবং তুমি ম'রে যাবে আর এগুলো এখানে থাকবে?
হ্যাঁ, তা তো বটেই—সে নির্ভেজাল জবাব দিল।
তাহলে এই ইট, কাঠ, পাথর এরা তোমার চেয়েও শ্রেষ্ঠ? তুমি এদের মতোও হতে পারলে না। এরা তোমাকে জন্ম দিয়েছে। এরাই তোমাকে মৃত্যু দেবে। এর পর আর কিছু কি নেই?
সে অবাক হবার ভান ক'রে বলল—এরপর আবার কী? এরপর আবার এসব। বড়জোর পুনর্জন্মটা সত্য হতে পারে।
বললাম—এ কি বন্ধু, তুমি তো আবার ধর্মের মধ্যে ঢুকে পড়ছ। পুনর্জন্মবাদ তো হিন্দু ধর্মের এবং বৌদ্ধ ধর্মের কথা।
না—সে বলল—এগুলো ধর্মের ব্যাপার না। এক্ষেত্রে এগুলোই বিজ্ঞানসম্মত, আধুনিক।
এবার আমি হেসে না উঠে পারলাম না। তাকে একটু ভেংচি কেটেই বললাম—আধুনিক? তুমি আধুনিকতার কথা বলছ? অথচ আমি তো নিশ্চিত জ্ঞানে জানি যে ঐ একটা রিক্সার ওপরে ছেঁড়া জামা পরে টুপি-মাথায় এক রিক্সাঅলা ব'সে বিশ্রাম নিচ্ছে, ঐ দ্যাখ, ঐ লোকটাও তোমার চেয়ে ঢের আধুনিক।
সে রাগে গরগর করতে লাগল। কারণ মার্কসবাদী নাস্তিকরা অনেক কিছু সহ্য করলেও এটা সহ্য করতে পারে না যে কেউ তাদেরকে কম-আধুনিক এবং কম-জ্ঞানী বলুক। সে ঠোঁট-মুখ বাঁকিয়ে তার ক্ষোভটা একটু সামলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করল— কিভাবে?
বললাম—কেন, তুমি এই আধুনিক যুগেও, উচ্চশিক্ষিত লোক হয়েও, মনে করছ যে তুমি এই মাটি থেকেই জন্মেছ এবং এখানেই তোমার পরিসমাপ্তি; অথচ আধুনিকতার কল্পনার ফানুস উড়াবার সময় তোমরা হরেক-রঙের ঘটনা দিয়ে গল্প সাজাও, যে সব গল্পের নায়কেরা আসে ভিনগ্রহ থেকে; তোমাদের সায়েন্স ফিকশানের নায়ক-নায়িকারা সময়কেও পার হয়ে চ'লে যায় অতীত থেকে ভবিষ্যতে, ভবিষ্যত থেকে উঠে আসে বর্তমানে। এই যদি হয় আধুনিকতা, তাহলে তো তুমি হেরে গেলে ঐ সামান্য রিক্সাওলার কাছেও। কারণ তার কোনো জ্ঞান-বিজ্ঞান জানা না থাকলেও সে নির্ভেজালভাবে বিশ্বাস করে যে সে এই গ্রহ তো দূরের কথা, এমনকি এই গ্যালাক্সিরও বাসিন্দা নয়! সে এখানে পথভুলে সামান্য ত্রুটির জন্য এসেছিল অসীম দূর থেকে, এবং সে আবার সেখানেই ফেরত যাবে। সে জানে যে শুধু তার দেহটাই তার এখানকার পোশাক। যাবার সময়ে সে ওটাকেই এখানে ফেলে যাবে। কারণ দীর্ঘ আকাশ-ভ্রমণ এবং সময়-ভ্রমণের পথে এই মাটির দেহের পোশাক প'রে থাকা যায় না। সে জানে যে তার এই মাটির পোশাকের মধ্যেও আছে একটা আলোর পোষাক যা শ্বাশ্বত, যা প'রে সে অনন্তভ্রমণে বের হতে পারে। তোমাদের সায়েন্স ফিকশানের নায়ক-নায়িকারা ভিনগ্রহে যেতে হলে নতুন পোশাক প'রে নেয়, অথচ ঐ রিক্সাঅলা জানে যে চিরকালীন আলোর পোশাক তার পরাই আছে। তাহলে কে আধুনিক—তুমি? নাকি ঐ রিক্সাঅলা?
আমার নাস্তিক বন্ধুটা কাচুমাচু করতে লাগল। আমি তার মুখের ওপর বললাম— তোমরা শত-সহস্র বছরের কল্পনা-চিন্তা-তথ্য ব্যবহার ক'রে যে গল্প তৈরি করতে শিখেছ, ঐ রিক্সাঅলা পুরোপুরি নাদান-মূর্খ হয়েও নিজেকেই তার চেয়েও চমৎকার গল্পের নায়ক ভাবে।
আমার নাস্তিক বন্ধুটা চুপসে গেল।
আমি তাকে বললাম— দ্যাখ, আমরা যেখান থেকে এসেছি সেখানেই ফেরত যাব। আমাদের এই আসা-যাওয়াও টামই-মেশিনের চেয়ে আধুনিক কায়দায় ঘটে। রসুল (সঃ) মে'রাজে গিয়ে দেখিয়ে দিলেন যে তিনি সময়কে পার হয়ে তার অতীতে এক সময়হীনতার জগতে গিয়েছিলেন।
দ্যাখ বন্ধু, সময়টাও একটা সৃষ্টিমাত্র।
সুতরাং সময়ের কাঠামোতে বাক্য গঠন ক'রে তা দিয়ে সময়ের স্রষ্টাকে নিয়ে প্রশ্ন করো না।
স্থান বা স্পেসও একটা সৃষ্টিমাত্র।
সুতরাং স্থানিক অবয়ব দ্বারা স্থানের স্রষ্টার বিশালতা মাপতে যেয়ো না।
মৃত্যু একটা সৃষ্টিমাত্র। জীবন কোনো সৃষ্টি নয়। জীবন শ্বাশ্বত। হাদিসে আছে যে পরকালে মৃত্যুকেও এক সময়ে মেরে ফেলা হবে। মৃত্যু এবং জীবন উভয়ই সৃষ্টি- যদি জীবনকে সময়-স্থান-কর্মধারার এই দৃশ্যমান সমষ্টি হিসেবে ধরা হয়, যে কথা সূরা 'মুলক'-এর প্রথমেই এবং আরো অনেক জায়গায় বলা হয়েছে। কিন্তু জীবনেরও যা জীবন, অর্থাৎ প্রাণমূল বা রূহ, তা আল্লাহরই আদেশ, তা শ্বাশ্বত-শুরুহীন, সমাপ্তিহীন। আমরা মৃত্যুবরণ করি ব'লে সেই মৃত্যুর ছকে ফেলে প্রশ্ন গঠন ক'রে আমরা ب'লে বসি-আল্লাহকে কে সৃষ্টি করল?
দ্যাখ বন্ধু, এই প্রশ্নটাকেও আল্লাহ সৃষ্টি করেছেনে-কে এই প্রশ্নটাকেই উল্টো তাঁর ওপর প্রয়োগ করে তা জানার জন্য।
সব কার্য-কারণ যিনি সৃষ্টি করেছেন, তার ওপর কার্য-কারণের সূত্র প্রয়োগ করতে যেয়ো না। হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রাঃ) যথার্থই বলেছিলেন-কার্য-কারণকে অতিক্রম কর, তাহলে কার্য-কারণের স্রষ্টার কাছে পৌঁছে যাবে।
শোনো বন্ধু, তোমাকে একটা মহারহস্যের কথা বলি, যা সব বড় মানের আউলিয়াগণ জানতেন এবং এখনও জানেন। সময়ের রহস্য। বিজ্ঞানীরাও বা দার্শনিকরাও বা কল্পনাবিলাসী সায়েন্স ফিকশানের লেখকরাও কিংবা তাওহীদ জ্ঞানহীন আলেমও আজ পর্যন্ত যা কল্পনা করেননি। তারা মানুষকে সময়ের খাপে বন্দী বন্দুকের গুলির মতো ভাবেন যে-গুলির সময় শেষ, তার চলা শেষ। কিন্তু পবিত্র কোরআনে আল্লাহ্ এ বলেননি। তিনি বলেছেন যে সময় হলো একটা গতির অনুভূতি মাত্র, অনুভূতির ধারবাহিকতার আবশ্যিক একমুখিতামাত্র। মানুষ সৃষ্টির ফর্মুলাটা তিনি এমনভাবেই ক'রেছেন যে মানুষই-অর্থাৎ মানুষের গতিবিধি এবং মন এবং কাজই-তার নিজস্ব সময় সৃষ্টি করে। কথাটা একজন 'আলেমের কাছেও বেখাপ্পা লাগতে পারে। তিনি ভাবতে পারেন-এমন উদ্ভট কথা কোরআনে কোথায় বলা হয়েছে? কিন্তু একথা আমরা প্রমাণ করব ইনশাল্লাহ-এই মুহূর্তে এ ব্যাপারে কিছু ভাববার দরকার নেই; আমার সবটুকু আলোচনা গভীর মনোযোগের সাথে শুনতে হবে। পৃথিবীর সর্বপ্রথম সার্থকতম সময়-বিজ্ঞানী আইনস্টাইন একটা ছোট মজার উদাহরণ দিয়ে এটাই বুঝিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সময় যে একেক জনের কাছে একেক রকমের তা বুঝার জন্য শুধু এটুকু খেয়াল করাই যথেষ্ট তুমি বাথরুমের ভেতরে আছ নাকি বাইরে আছ! এ হলো সময়ের আপেক্ষিকতা। কিন্তু সময় যে মানুষেরই সৃষ্টি তা বিজ্ঞান জানে না।
তিনি চমৎকার বলেছিলেন। বাথরুমের বাইরে থেকে যে-ব্যক্তি ভেতরে যাবার জন্য অপেক্ষা করে, তার এক নিনিট আর যে-ব্যক্তি ভেতর থেকে বাইরে বের হবে তার এক মিনিট সমান নয়। তোমার (মানসিক) ব্যস্ততাই তোমার সময়ানুভূতিকে দীর্ঘ ক'রে দেয়-যাকে বিজ্ঞানে বলে Time Dilution। একজন সাধারণ নামাজীও নামাজের সময়ে এই রহস্যের মুখোমুখি হন, যদিও তিনি সচেতনভাবে জানেন না ব্যাপারটা আসলে কী। যাদের নামাজ সুদৃঢ় হয়নি, তাদের প্রতি রাকাত নামাকের সময়ে মন থাকে সামনে-কখন পরের রাকাতটা আসবে, কখন নামাজটা শেষ হবে, আর ক'রাকাত আছে? নামাজ এক মহারহস্য। এতে প্রবেশ করা মাত্রই আমাদের ব্যস্ত এবং অস্থির আমিত্ব থেকে সময় সৃষ্টি হয়ে তা আমাদের আত্ম-সচেতনতাকে আমাদের সচেতনতা থেকে টেনে লম্বা ক'রে ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু নামাজ যাদের নির্মল হয়েছে, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের কাছে বর্তমান ছাড়া ভবিষ্যত ব'লে কিছু নেই। তাদের সচেতনতা যেখানে, আত্মসচেতনতাও সেখানে। তারা তাদের নামাজে সময়কে অতিক্রম ক'রে যান। তারা এমনকি পরবর্তী নিঃশ্বাসকেও বিশ্বাস করেন না। ফলে তাদের জীবনে থাকে না কোনো ভবিষ্যত পরিকল্পনা। ভবিষ্যতের মিছে মায়া তাদেরকে হাতছানি দিয়ে ডেকে নিতে পারে না। এ এক মহারহস্য! নামাজ। কি বিস্ময়কর উপহার! সাধেই কি আর একে মু'মিনের মে'রাজ বলা হয়েছে?
আরেকটা রহস্যের কথা বলি। টাইম মেশিন। মেশিনটা কাল্পনিক, কারণ তা এখনও তৈরি করা সম্ভব হয়নি (তা সম্ভবও নয়)। কিন্তু ধারণাটা মিথ্যা নয়, কারণ তা কাল্পনিক নয়; তার পেছনে পুরোপুরি গাণিতিক ফর্মুলা আছে। বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারের মধ্যে একটা ঘটেছিল গণিতে যা তোমরা জান না। সাধারণ মানুষ শুধু দ্যাখে বাইরেরটা, ভেতরেরটা নয়। বিশেষ প্রতিভাবান মানুষদের মধ্যেও অধিকাংশ দ্যাখে শুধু সেটাই যার দ্বারা তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিল হবে, যেমন মার্কসবাদীরা। তারা বাকি সত্যগুলো প্রথমত এড়িয়ে যায় এবং পরে স্বভাব তাদের চিন্তাকে এত মারাত্মকভাবে আচ্ছন্ন করে ফ্যালে যে তারা তা আর খুঁজেও পায় না। তারা তখন শুধু দ্যাখে সেই মতবাদই যা তাদের কাজে লাগছে। এবং তারা তাদের মস্তিষ্কের সর্বশক্তি নিয়োগ ক'রে তার পক্ষে বিভিন্ন তথ্য প্রমাণাদি এনে হাজির করার চেষ্টা করে। তোমাদের মতো আঁতেলরা খোঁজ না রাখলেও সত্য কিন্তু সত্যই-তা-ই সব বাস্তবতার ভিত রচনা করে। ১৯৩১ সালে আমেরিকার গণিতবিদ-দার্শনিক কুর্ট গোডেল গাণিতিকভাবে প্রথমে প্রমাণ করেন যে সময়ের অতীতে পৌঁৗঁছানো সম্ভব-যদি বিশেষ শর্তপালনকারী কিছু যান্ত্রিক সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা করা যায়। সেই থেকে সারাবিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল টাইম মেশিন নিয়ে। মানুষের যোগ্যতার চেয়ে তার কল্পনাই আগে চলে। সুতরাং সায়েন্স ফিকশান লেখকরা তা নিয়ে রমরমা ব্যবসা চালানোর সাথে সাথে গোটা পৃথিবীবাসীর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখল চটকদার গল্প-কাহিনীর প্রতি। মানুষ এভাবেই যুগে যুগে সত্য থেকে দূরে থাকার সুযোগ ক'রে নিয়েছে। যাহোক, একদল বিজ্ঞানী অবশ্য এ নিয়ে কাজ করতেই থাকলেন। আজ পর্যন্ত টাইম-মেশিনের যে গাণিতিক ধারণাটা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে তার মূল সূত্রটা সাধারণ কথায় এভাবে বলা যায় : আমি হাজার হাজার মাইল বা লক্ষ লক্ষ মাইল দূরের কোনো স্থানে যেতে চাই। তাহলে আমাকে বিশেষভাবে নির্মিত টাইম-মেশিনটিতে প্রবেশ করতে হবে। আমি সুইচটা অন করার সঙ্গে সঙ্গেই দেখব যে আমার মেশিনটা লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে। কিন্তু কিভাবে? মেশিনটা কিন্তু বায়ু বা শূন্যতা ভেদ ক'রে চলেনি। তা কোনোভাবে গতিশীল হয়নি!
এখানেই তো রহস্য। আমার যাত্রাবিন্দু এবং লক্ষ্যবিন্দুর মাঝামাঝি স্পেস বা শূন্যস্থানটাই সংকুচিত হয়ে গেছে! বিস্ময়কর আইডিয়া। গাণিতিক প্রমাণে এই পদ্ধতিটাই টিকে আছে।
অথচ শুনে আরো বেশি অবাক হবে যে আটশ' বছর আগে গোঁড়া মুসলিম ধার্মিক এবং আউলিয়া হয়রত ইমাম গাজ্জালী (রঃ) তাঁর 'দাকায়েকুল আখবার' বইতে কথাপ্রসঙ্গে কুতুব-আবদালগণ (উচ্চতম পর্যায়ের আউলিয়া) কিভাবে সেকেন্ডের মধ্যে হাজার মাইল পথ অতিক্রম করতেন তা বলতে গিয়ে বলেছেন যে 'তাঁদের জন্য পৃথিবীকে সংকুচিত ক'রে দেয়া হয়'। ফর্মুলায় কি মিলে যায়নি? এবং আরো বিস্ময়কর হলো এই যে, টাইম-মেশিন কখনও তৈরি হবে না, অথচ আবদালগণ চিরকালই এই ফর্মুলায় সেকেন্ডের মধ্যে হাজার মাইল পথ অতিক্রম করবেন।
কিভাবে তাঁরা তা করেন?
নামাজই হলে ইউনিভার্সাল টাইম মেশিন!
একটা কথা কি ভেবে দেখেছ? রসুলুল্লাহ্ (সঃ) আল্লাহ্র আরশে আল্লাহ্র সাথে সাক্ষাৎ ক'রে ফিরে আসার সময়ে মুখটা মলিন ক'রে রইলেন। আল্লাহ্ তাঁকে প্রশ্ন করলেন তিনি কেন মুখ ভার করলেন। ব্যাপারটা রহস্যজনক না? আল্লাহ্-ই হলেন মানবের মূল লক্ষ্য। তাঁকে সান্নিধ্যে পেলে সৃষ্ট-অসৃষ্ট, দৃশ্য-অদৃশ্য সবকিছু পাওয়া হয়ে যায়। দুঃখ কষ্ট, মৃত্যু সব ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যায়। অথচ তিনি মুখ-মোবারক মলিন ক'রে রইলেন? আল্লাহ্র প্রশ্নের জবাবে রসুলুল্লাহ্ (সঃ) জানালেন যে তিনি তাঁকে দেখে ব্যক্তিগতভাবে সার্থক এবং পূর্ণ হয়েছেন, কিন্তু তাঁর উম্মতদের বা অনুসারীদের কী হবে, তারা কিভাবে এই সৌভাগ্য অর্জন করবে, আদৌ তাদের এই সুযোগ হবে কিনা, তা নিয়েই তিনি চিন্তিত।
তখন আল্লাহ্ পরম করুণাময় রসুলুল্লাহ্ (সঃ) এর অনুসারীদেরকেও মেরাজের প্রতিশ্রুতি দিলেন।
তা হলো নামাজ!
কোথায় মেরাজ—সশরীরে আরশ ভ্রমণ, আর কোথায় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সামান্য সময়ের জন্য বিশেষ নিয়মে ওঠাবসা! এভাবে দুটো ভিন্ন জিনিসকে কেনই বা তুলনা করা হলো? জ্ঞানী নাস্তিকদের বুঝা উচিত যে নিশ্চয়ই এর মধ্যে কিছু আছে এবং তাদের উচিৎ নামাজ নিয়ে চেঁচামেচি না ক'রে সরাসরি নামাজ প'ড়ে দেখা। কেন, তোমরা পুজো দেখতে যাও, গীর্জায় প্রার্থনা শুনতে যাও, হোলি দেখতে যাও—কেউ কি কখনও বন্ধুদেরকে বলেছ: চল, নামাজ হচ্ছে, দেখে আসি? না। কারণ, ইবলিস সত্যকে পছন্দ করে না এবং সে তোমাদেরকেও দূরে রাখে।
মনের খামখেয়ালির উপাসনা করা আর সত্যের উপাসনা করা পুরোপুরি দুই মেরুর জিনিস। এমনকি আল্লাহকে খুশি করার জন্যেও ধর্মের মধ্যে ইচ্ছামতো কোনোকিছু ঢুকানো যাবে না!
তোমরা অনুমান ও নিজেদের স্বভাবের অনুসরণ কর, যদিও তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পথনির্দেশ এসেছে। (সূরা নাজম, আয়াত: ২৩)
...খারাপ এবং ভালো কখনও সমান নয়, এমনকি যদিও খারাপের আধিক্য তোমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিতে পারে... (সূরা মাঈদা, আয়াত: ১০০)
তুমি কি দেখো না তাকে যে তার কামনা-বাসনাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে?... তুমি কি মনে কর যে ওদের অধিকাংশ শোনে ও বোঝে? ওরা তো পশুর মতোই, বরং ওরা আরো অধম। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ৪৩-৪৪)
ওরা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিল, তারা ওদের সাহায্য করল না কেন? (সূরা আহক্বাফ, আয়াত: ২৮)
তারপর তাদের পর অসৎ বংশীয়েরা উত্তরাধিকারী হয়েছিল, যারা নামায নষ্ট করেছিল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করেছিল; ফলত তারা অচিরেই শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। (সূরা মরিয়ম, আয়াত ৫৯)
সুতরাং আল্লাহকে খুশি করার জন্যও তাঁর বিধানকে পাল্টানো যাবে না। তাঁর আদেশ পালন করাই তো ইবাদত। আল্লাহ অন্যত্র কোরআনে বলেছেন যে সন্ন্যাসবৃত্তি বা বৈরাগ্যসাধনা তিনি খ্রিস্টানদের জন্য বাতলে দেননি, তারাই তাঁকে খুশি করার জন্য তা নিজেরা উদ্ভাবন করেছিল। আর এটা উদ্ভাবন ছিল বলেই তারা এতে অটল থাকতে পারেনি। ইবলিস আল্লাহকে সিজদা করেছিল কিন্তু আদমকে (আঃ) সিজদা করেনি। সে বুঝতে পারেনি যে আল্লাহর আদেশ পালন করাই ইবাদত।
আমার বন্ধু জানতে চাইল—সময়কে যদি মানুষই সৃষ্টি করে তাহলে নিয়তি সত্য হলো কিভাবে? অর্থাৎ একথা সত্য হয় কিভাবে যে কোনো মানুষের জীবনকাল আগে থেকে নির্ধারিত?
বললাম—জীবনকে কি কোরআন হাদীসে কোথাও ঘন্টা-মাস দ্বারা হিসাব করা হয়েছে? মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি। মানুষের তথা গোটা সৃষ্টিজগতের ফর্মুলার মধ্যে সময়কেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ তা আল্লাহ্রই সৃষ্টি। তুমি আইনস্টাইনকে সত্য ভেবে আবদালগণকে মিথ্যা ভাববে, তা হয় না। তুমি জীবনকে অন্যভাবে কেন মাপতে চাচ্ছ না? ধর তোমার জীবনের মেয়াদ হলো তোমার হার্টবিট—যেমন তুমি বিশ লক্ষ হার্টবিট পর্যন্ত বাঁচবে। এখন এই হার্টবিট পরিমাণ আয়ুকে তুমি যদি সময়ের স্কেলে টেনে লম্বা ক'রে নাও, তাহলে বেশিদিন বাঁচলে—দিনের হিসাবে। ধর তোমার জীবন মেপে দেয়া হয়েছে মোট তওবার সংখ্যা দ্বারা—অর্থাৎ, উদাহরণস্বরূপ, তোমাকে ১০টা কবিরা গোনাহ এবং ১ লক্ষ ছগিরা গোনাহ্ করা পর্যন্ত বাঁচতে দেয়া হবে, যদি তুমি তার মধ্যে তওবা না কর। অন্যথায় তোমাকে তার সমপরিমাণ বা equivalent পরিমাণ অঙ্গচালনা পর্যন্ত—হাত-পা-চোখ ইত্যাদির ব্যবহার পর্যন্ত—বাঁচতে দেয়া হবে। তাহলে এই গোনাহগুলো করতে বা অঙ্গচালনাগুলো করতে তোমার যে শক্তির প্রয়োজন হবে তা নির্ধারিত। এই শক্তিটুকু তুমি ইচ্ছামতো ভালো বা মন্দ যে কোনো কাজে ব্যবহার করতে পার। এটাই তোমার সীমা। আল্লাহ কাউকে তার জন্য নির্ধারিত সীমার বাইরে যেতে দেন না:
কেয়ামতের ঘোষণা না থাকলে ওদের ফয়সালা তো হয়েই যেত। (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ, আয়াত: ২১)
বড় শাস্তির আগে আমি ওদেরকে অবশ্যই ছোট শাস্তি আস্বাদন করাব, যেন ওরা (আমার দিকে) ফিরে আসে। (সূরা সিজদাহ, আয়াত: ২১)
কারো আয়ু বৃদ্ধি হলে বা হ্রাসপ্রাপ্ত হলে তা তো হয় কেতাব (সংরক্ষিত ফলক) অনুসারে। (সূরা ফাতির, আয়াত : ১১)
পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করার আগেই তা লিপিবদ্ধ করি; আল্লাহর পক্ষে এ অতি সহজ। এ জন্য যে, তোমাদের ওপর যা অতীত হয়েছে (অর্থাৎ যা হারিয়েছ), তার জন্য দুঃখিত হয়ো না, এবং তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তার জন্য হর্ষোৎফুল্ল হয়ো না, আল্লাহ উদ্ধত অহংকারীকে ভালোবাসেন না। (সূরা হাদীদ, আয়াত: ২২-২৩)
তুমি কি জান (হে মুহাম্মদ (সঃ)) - সম্ভবত কেয়ামত আসন্ন। যারা বিশ্বাস করে না তারাই কামনা করে যে তা ত্বরান্বিত হোক। কিন্তু যারা বিশ্বাসী তারা তাকে ভয় করে এবং জানে যে তা সত্য। (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ, আয়াত: ১৭-১৮)
... তোমাদের জন্য নির্ধারিত দিন আছে, যা তোমরা মুহূর্তকাল বিলম্বিত করতে পারবে না, ত্বরান্বিতও করতে পারবে না। (সূরা সা-বা, আয়াত: ৩০)
আমিই ... লিখে রাখি যা ওরা (মানুষ) আগে পাঠায় এবং যা পেছনে রেখে যায়। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১২)
কেয়ামতের লক্ষণসমূহ তো এসে পড়েছে। (এখানে কেয়ামতের 'আসন্নতাকে' মাপা হয়েছে লক্ষণ দ্বারা, সময় দ্বারা নয়!) (সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১৮)
আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা শুরা, আয়াত: ৪০)
যদি কেউ আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে, তাহলে এরূপ লোকেরা (নিজেদের এবং অপরের) ক্ষতি ক'রে থাকে। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২২৯)
আমি কি তোমাদের দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে তখন কেউ সতর্ক হবে চাইলে সতর্ক হতে পারতে না? (সূরা ফাতির, আয়াত: ৩৭)
পূর্ব ও পরের সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। (সূরা রুম, আয়াত: ৪)
প্রকৃতপক্ষে সব কিছুর ক্ষেত্রেই আদেশ আল্লাহর। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩১)
আল্লাহ নিজেই বলেছেন যে সম্ভবত কেয়ামত আসন্ন! তাহলে কি তিনি জানেন না কখন তা সংঘটিত হবে? অবশ্যই তিনি তা জানেন। আসলে কেয়ামত কবে হবে তা সময় দ্বারা মেপে হিসাব করা হয়নি; অর্থাৎ এমনটি নয় যে আল্লাহ জোরপূর্বক নির্ধারিত ক'রে রেখেছেন অমুক দিন কেয়ামত হবেই। আদৌ তা নয়। অধিকাংশ আলেমই একথা জানেন না। কেয়ামত সংঘটিত হবে মানুষের আচরণের সীমালঙ্ঘনের কারণেই। আল্লাহ শুধু এরূপ একটা নিয়ম ঠিক ক'রে দিয়েছেন- "মানুষ যখন সীমালঙ্ঘনের একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে পৌঁছাবে তখন মহাবিশ্ব ধ্বংস হবে"- যার ফলে তিনি মানুষের সীমালঙ্ঘনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধাপে তাকে ছোট ছোট বিপর্যয়ের মুখোমুখি ক'রে দেন, যেন সে তওবা করার সুযোগ পায়। মহাবিশ্বের সার্বিক ধ্বংসের প্রতিজ্ঞা রয়েছে বলেই আল্লাহ মানুষের কর্মফলকে তাৎক্ষণিকভাবে তার দিকে ফিরিয়ে দেন না-তাকে সুযোগ দিয়ে থাকেন, আকাশ এবং পৃথিবীকে এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে যে তারা কুকর্মের ফলকে বিশেষ সীমা পর্যন্ত ধারণ ক'রে রেখে বিপর্যয়কে বিলম্বিত করতে পারে। আমরা আরও জানতে পারছি যে মানুষের আয়ুও পরিবর্তিত হয় এবং এরূপ পরিবর্তনও নির্ধারিত বিধি মোতাবেক ঘটে। অন্য কথায়, সকল পরিবর্তন এবং রদবদলকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যও পূর্বনির্ধারিত বিধান রয়েছে। বিধান দ্বারা বিধান নির্ধারিত হয় এবং কোনো বিশেষ বিপর্যয় সংঘটিত হয় তখনই যখন তা লিপিবদ্ধ হয়ে যায়, বা মানুষের আচরণ বিশেষ সীমাকে অতিক্রম ক'রে যায়। ফলে কোনোকিছু ঘটতে দেখলে স্পষ্টতই বুঝতে হবে যে সেক্ষেত্রে একটা সীমালঙ্ঘন ঘটেছিল এবং তার আগে বহুবার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সুযোগও দেয়া হয়েছিল। সর্বদা মনে রাখতে হবে যে সময় হলো সৃষ্টিফর্মুলার একটা উৎপাদ বা output, তা ফর্মুলার অংশ বা input নয় আদৌ। তা যদি হতো, তাহলে আবদালগণ (উচ্চতম পর্যায়ের আউলিয়াগণ) সময়কে অতিক্রম করতে পারতেন না। কেউ, কিংবা কোনো জাতি, তার নিজস্ব সীমা অতিক্রম করলে সে বা সেই জাতি ধ্বংসের মুখে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে, যা তার ফর্মুলাতেই ঢুকানো ছিল। চাবি শেষ হয়ে গেলে ঘড়ি তো থেমে যাবেই। সেক্ষেত্রে তাকে বাইরে থেকে কেউ জোরপূর্বক থামাবে না—চাবিই তাকে থামিয়ে দেবে। একটা মিসাইলকে নিক্ষেপ করার সময়ে নিক্ষেপকারী যন্ত্রটা তাকে ধাক্কা দেয়ার সাথে-সাথে তা যে-শক্তিতে বিস্ফোরিত ও নিক্ষিপ্ত হয় তা নির্ধারিত। কিন্তু মিসাইলটা কত দূরত্ব অতিক্রম করবে তা নির্ভর করবে তাকে কত কোণে (৪৫° কোণে নাকি ৩০° কোণে ...) নিক্ষেপ করা হলো তার ওপর। বলা বাহুল্য, মিসাইলটা সবচেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করবে তাকে ৪৫ ডিগ্রী কোণে শূন্যে নিক্ষেপ করলে। তোমার একটা রেডিও আছে যার ব্যাটারি হলো দুটো। তুমি তাকে সারাক্ষণ চালালে যত দিন ব্যবহার করতে পারবে, মাঝে-মাঝে চালালে তার চেয়ে বেশিদিন ব্যবহার করতে পারবে। জীবনটার ক্ষেত্রেও তাই। জীবনের মোট জীবনীশক্তি পূর্বনির্ধারিত। তুমি সেই শক্তিকে অত্যন্ত ভালো কাজে বা অত্যন্ত খারাপ কাজে বা মিশ্র কাজেও লাগাতে পার। কিন্তু তুমি যদি তা ব্যবহার ক'রে মানুষ খুন করার কাজে লেগে যাও এবং খুব দ্রুত শক্তি ক্ষয় ক'রে ফেল, তাহলে তোমার শক্তি যেদিন শেষ হবার কথা, সেদিন হয় তুমি আত্মহত্যা করবে না হয় খুন হবে না হয় ফাঁসিতে ঝুলবে না হয় কোনো দুর্ঘটনায় তোমার মৃত্যু হবে। শুধু তাই নয়, সীমারও স্তর আছে: ব্যক্তিজীবনের সীমা, জাতীয় জীবনের সীমা ইত্যাদি। কোনো ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করলেও আল্লাহ্ তার জাতীয় সীমার দিকে তাকিয়ে তা বৃদ্ধি করতে পারেন। সক্ষেত্রে 'ব্যক্তি + জাতি' এই সমগ্রের কোনো পরিবর্তন হবে না, সমগ্রের পূর্বনির্ধারণ ঠিকই থাকবে, শুধু একটার ঘাটতি পূরণ করার জন্য অন্যটা ব্যবহৃত হবে। যেমন, তুমি খুব বড় ধরনের খুনী হলে, এবং তোমার জাতিতে যদি এমন জঘন্য পাপী লোকের সংখ্যা বেশি থাকে যাদের খুন হওয়া উচিত, তাহলে আল্লাহ তাদেরকে খুন করার জন্য তোমার মোট আয়ু বাড়িয়েও দিতে পারেন, যদি তুমি তখনও খুনের নেশায় মশগুল থাক এবং তওবা ক'রে ফিরে না আস।
ইউনুস রসূলগণের অন্তর্ভুক্ত ছিল। যখন সে পরিপূর্ণ নৌকার দিকে পলায়ন করেছিল, তখন তার ভাগ্য নির্ণয় কর হলো, ফলত সে (সমুদ্রে) নিক্ষিপ্তগণের অন্তর্গত হলো। পরে এক বৃহদাকার মৎস তাকে গিলে ফেলল, তখন সে ধিষ্কারযোগ্য। সে যদি আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা না করত, তাহলে তাকে মাছের পেটে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত থাকতে হতো। (তাঁর কর্মফল তিনি পেলে তাঁকে কেয়ামত পর্যন্ত মাছের পেটে থাকতে হতো, কারণ আল্লাহ তাঁকে পরকালে শাস্তি দিতে চান না; কিন্তু আল্লাহর পবিত্রনামের মহিমার বদৌলতে তিনি কর্মফল থেকে রেহাই পেলেন।) (সূরা সাফফাত, আয়াত: ১৩৯-১৪৪)
তোমাদের নিটক শাস্তি আসার আগেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের দিকে মুখ ফিরাও এবং তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ কর। শাস্তি এসে পড়লে সাহায্য পাবে না। তোমাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের ওপর অতর্কিতভাবে শাস্তি আসার আগেই তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালক যে উত্তম কেতাব অবতীর্ণ করেছেন তার অনুসরণ কর, যেন (পরে) কাউকে বলতে না হয়—হায়! আল্লাহর প্রতি আমার কর্তব্যে আমি তো শৈথিল্য করেছি এবং আমি ঠাট্টবিদ্রূপ করতাম। অথবা কেউ যেন না বলে—আল্লাহ আমাকে পথপ্রদর্শন করলে আমি তো অবশ্যই সংযমীদের অন্তর্গত হতাম। (শাস্তি তখনই আসে যখন তা লিখিত হয়ে যায়। তার আগ পর্যন্ত আমল বা ভালো কাজ দ্বারা তা পাল্টানোও যায়।) (সূরা যুমার, আয়াত: ৫৪-৫৭)
আমি তোমাদের মধ্যে একজনকে অপরের পরীক্ষাস্বরূপ করেছি। তোমারা ধৈর্যধারণ করবে কি? তোমার প্রতিপালক সবকিছু দেখেন। (সবাইকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে ব’লে প্রত্যেককে একটা সীমার মধ্যে অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অনুমতিও দেয়া হয়েছে—পরীক্ষাস্বরূপ। কিন্তু কেউ ধৈর্য ধারণ করলে উক্ত সীমার পর সবকিছু তার পক্ষেই যাবে। আসলে পরীক্ষা হয় ধৈর্যের। এবং ধৈর্য ধারণ করলেই পরীক্ষায় কৃতকার্যতা আসে। এই সীমাগুলোই পূর্বনির্ধারিত, কোনো সময় বা ঘণ্টা-দিন-মাস-বছর নয়। ইউনুস (আঃ) যে ধৈর্য এবং ক্ষমা প্রার্থনার আশ্রয় নিয়েছিলেন, সময়ের স্কেলে তার মূল্য ছিল কেয়ামত পর্যন্ত দীর্ঘ কষ্টভোগ। কিন্তু তাঁর ক্ষমাপ্রার্থনা ও আল্লাহর মহিমা প্রকাশের একাগ্রতা সেই দৈর্ঘ্যকে ছোট ক’রে দিয়েছিল।) (সূরা ফোরকান, আয়াত: ২০)
আমি প্রত্যেক জনপদে অপরাধীদের প্রধানদেরকে সেখানে চক্রান্ত করার অবকাশ দিয়েছি; কিন্তু তারা নিজেদের বিরুদ্ধে ছাড়া চক্রান্ত করে না। কিন্তু তারা তা বুঝতে পারে না। (এই অবকাশই স্বাধীনতা, তওবা করার সুযোগ, এবং সংশ্লিষ্ট নির্যাতিতের ধৈর্য ও সত্যান্বেষীতার পরীক্ষাকে সার্বিকভাবে সুবিধাজনক করার জন্য। একে আল্লাহ সময় দ্বারা মেপে নির্ধারিত করেননি এর প্রকৃতিকে সময়ের স্কেলে মেপে প্রয়োজন অনুসারে প্রসারিত বা সংকুচিত করা হয়—এরূপ সংকোচন-প্রসারণ মূলত পূর্বনির্ধারিত বিধান অনুসারে ফর্মুলাতেই ঢুকানো আছে।) (সূরা আন’আম, আয়াত: ১২৩)
কখন কেয়ামত হবে তা কেবল আল্লাহই জনেন। তিনি... জানেন যা জরায়ুতে আছে; কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে, এবং কেউ জানে না কোন দেশে তার মৃত্যু ঘটবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ। (এখানে ‘কখন’ দ্বারা সময়কে নির্দেশ করা হচ্ছে, কারণ এই সময়টা মাপা রয়েছে কিছু সীমা বা লক্ষণ দ্বারা—বিশেষ বিশেষ আচরণের সীমা অতিক্রম হলে এক-একটি লক্ষণ প্রকাশিত হয়ে পড়বে। কিন্তু মানুষ সার্বিকভাবে তার সীমার ব্যাপারে অজ্ঞ ব’লে কেয়ামতের সময় সম্বন্ধে সে কখনই অনুমান করতে পারবে না। কেয়ামতের সময়ের সাথে গোটা সৃষ্টিকুলের সবগুলো উপ-বাস্তবতার শৃঙ্খলের সবগুলো সীমার সার্বিক মান জড়িত, যা মানুষের পক্ষে হিসাব করা সহজ নয়।) (সূরা লোকমান, আয়াত: ৩৪)
এই রহস্যময় আয়াতগুলো থেকে আমরা আরও জানতে পারছি যে কর্মফলের ওপর ভিত্তি ক’রে ভাগ্য পুনর্নির্ধারিত হয় এবং তা একবার নির্ধারিত হয়ে গেলে তাকে আর রদ করা যায় না, কারণ তার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অনেক সময় দেয়া হয়েছিল। এজন্য আমাদের জীবনে যাকিছু ঘটে তাকে হাসিমুখে মেনে নিয়ে ধৈর্যধারণ করাই আমাদের জন্য উৎকৃষ্টতম পন্থা। ধৈর্যধারণ করলে সেই ধৈর্যের শক্তি কর্মফলের প্রতিকূলতাকে এক পর্যায়ে গিয়ে নির্মূল ক’রে দেয়। সুতরাং মনকে সময়মতো ঘরে ফেরাতে হবে।
ভাগ্যের পরিবর্তন হয়-কিন্তু সামগ্রিকতার মান অপরিবর্তনীয়। এই সার্বিক মান (আয়ু/জাগতিক আয়ু) পর্যন্ত আমাদেরকে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, যে স্বাধীনতার মধ্যে আমাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ সীমার বাইরে আমরা যেতে পারি না। এই সীমার পর সমস্ত কর্তৃত্ব আল্লাহ্ নিয়ে নেবেন-আমাদের লাগামহীন পরীক্ষাধীন স্বাধীনতার সমাপ্তি ঘটবে:
যেদিন আকাশ মেঘাপুঞ্জসহ বিদীর্ণ হবে এবং ফেরেস্তাগণকে নামিয়ে দেয়া হবে, সেদিনই প্রকৃত কর্তৃত্ব হবে দয়াময়ের এবং সত্য প্রত্যখ্যানকারীদের জন্য সেদিন হবে কঠিন। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ২৫-২৬)
তারা কি অপেক্ষা করবে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না আল্লাহ মেঘের আবরণ নিয়ে এসে উপস্থিত হন, এবং ফেরেস্তাদেরকে নিয়ে, এবং সেভাবে বিষয়টা মীমাংসা হয়ে যায়? (সূরা বাকারা, আয়াত: ২১০)
এ হলো আসলে একটা গতিশীল বা ডাইনামিক ভারসাম্য, যার সার্বিকতার কোনো পরিবর্তন নেই, ভেতরকার রদবদল হতে পারে। আমাদের উচিত আল্লাহর নিকট থেকে প্রেরণা লাভ করার জন্য ধৈর্যধারণ ক'রে থাকা। নইলে তিনি সমস্ত স্বাধীনতাকে নিজের কাছে ফেরত নিয়ে তাঁরই কর্তৃত্বকে বহাল করবেন। তখন আর সময় থাকবে না।
এবং আমি শিষ্যদের মনে আমাকে বিশ্বাস করার প্রেরণা সৃষ্টি ক'রে দিলাম ... (সূরা মাঈদা, আয়াত: ১১১)
বন্ধু বলল-তাহলে তো একথা সত্য যে প্রত্যেককে আলাদা-আলাদা ব্যাটারি দেয়া হয়েছে।
সবাইকে সমান দেয়া হয়নি?
তাহলে এটা অবিচার হয়ে গেল না?
না। কারণ প্রত্যেককে সেটুকু শক্তি দেয়া হয়েছে যেটুকু আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে তার জন্য যথেষ্ট-কমও না, বেশিও না। কারো ওপর অবিচার করা হয়নি।
তাহলে ঐ যে রিকসাওয়ালা টুপি মাথায় দিয়ে বসে আছে, ওর ক্ষেত্রে কী বলবে? সে তো লেখাপড়ারও সুযোগ পায়নি, প্রচুর দান-খয়রাত করারও সুযোগ পায়নি। ওর কী হবে?
বললাম, এমনও তো হতে পারে যে তাকে সুযোগ দেয়া হয়েছিল কিন্তু সে তা অকাজে ব্যয় করেছে। হতেও পারে সে ছোটবেলা থেকেই ঠিক পথে আছে। সেক্ষেত্রে সে তার পরীক্ষায় ১০০র মধ্যে ১০০ই পাবে, যদি তাকে যে-শক্তি দেয়া হয়েছে সে তা সঠিক কাজে ব্যয় করে। প্রত্যেকের প্রশ্নপত্র আলাদা-প্রত্যেককে নম্বর দেয়ার পদ্ধতিও আলাদা। আল্লাহ তো বলেছেন যে কাউকে তার সাধ্যের অতীত বোঝা চাপানো হয় না।
আমি কাউকেই তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপাই না। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৪২)
ধনী হলেই বা কী হতো? হিসাব বেড়ে যেত। তুমি কি তাহলে ইহকালেই সব চাও। এটাই তো বিশ্বাসহীনতা। সে গরিব না হলে রিকসা চালাত কে? আল্লাহ নিজেই বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ সৃষ্টি করেছেন:
বল-আমার প্রতিপালক যার প্রতি ইচ্ছা তার জীবিকা বর্ধিত করেন অথবা সীমিত করেন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এ জানে না। (সূরা সা-বা, আয়াত: ৩৬)
আল্লাহ জীবিকার ব্যাপারে তোমাদের কাউকে কারো ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন; যাদের শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে, তারা তাদের অধীনস্থ দাস-দাসীদেরকে নিজেদের জীবিকা থেকে এমন কিছু দেয় না, যাতে ওরা এ বিষয়ে তাদের সমান হয়ে যায়। তাহলে কি ওরা আল্লাহরই অনুগ্রহকে অস্বীকার করে? (সূরা নহল, আয়াত: ৭১)
আমিই ওদের পর্থিব জীবনে ওদের মধ্যে জীবিকা বণ্টন করি, এবং একজনকে অপরের ওপর মর্যাদায় উন্নত করি, যেন (তারা) একে অপরের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে... (সূরা যুখরোফ, আয়াত: ৩২)
আল্লাহ তাঁর সকল দাসকে জীবনোপকরণে প্রাচুর্য দিলে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত; কিন্তু তিনি যে পরিমাণ ইচ্ছা সেই পরিমাণ দিয়ে থাকেন। (সূরা শুরা, আয়াত: ২৭)
কত সুন্দর কথা! দাস-দাসীদেরকে অর্থ দিলে তারাও ধনী হয়ে যাবে এই আকাংকায় যারা দান করা বা উপযুক্ত মজুরি দেয়া থেকে বিরত থাকে, তাদেরকে আল্লাহ যথেচিতভাবে তিরস্কার করেছেন। এরূপ উচিত কথা কমুনিজমও কখনও বলতে পারেনি। কমুনিস্টরা কেবল অপরের অর্থ দেখে হিংসা করে এবং মতবাদ ও 'রক্তলাল' বিপ্লবের দ্বারা তা কেড়ে নিয়ে নেতাদের উদর পূর্ণ করতে চায়। আল্লাহ যার যতটুকু দরকার এবং যার যতটুকু প্রাপ্য এবং যাকে যতটুকু দিলে সমাজে অরাজকতা যথাসম্ভব কম থাকবে তাকে ততটুকুই দিয়ে থাকেন। তিনি সীমার ব্যাপারে সচেতন, যদিও মানুষ স্বভাবতই সীমালঙ্ঘন করতে চায়। আল্লাহর লক্ষ্য তাঁর বান্দাদের কর্মফলকে ইহকালে প্রদান ক'রে তাদের জন্য পরকালকে কণ্টকমুক্ত ক'রে রাখা:
তোমরা এই জগতের ক্ষণিকের দ্রব্য সামগ্রীর দিকে তাকাও, কিন্তু আল্লাহ তাকান পরকালের দিকে... (সূরা আনফাল, আয়াত: ৬৭)
ইহকাল এবং পরকালকে একত্রে বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে আল্লাহ কোনো বিশেষ মুহূর্তে কাউকে যা কিছু দিয়েছেন, সেই মুহূর্তে তার জন্য তাই সর্বোচ্চ মঙ্গলের, তার মন সে-ব্যাপারে যা-ই বলুক না কেন। মানুষের লাগামহীন কামনা অনুসারে জগৎটা চললে তা তার জন্যেই ক্ষতিকর হতো:
মানুষ যেভাবে কল্যাণ কামনা করে সেইভাবেই অকল্যাণ কামনা করে। মানুষ তার মনে যা আসে তার পরিণাম চিন্তা না ক'রে তার আশু রূপায়ণ কামনা করে। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ১১)
তুমি কি দেখো না তাকে যে তার কামনা-বাসনাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে?... তুমি কি মনে কর যে ওদের অধিকাংশ শোনে ও বোঝে? ওরা তো পশুর মতোই, বরং ওরা আরো অধম। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ৪৩-৪৪)
সত্য যদি ওদের কামনা বাসনার অনুগামী হতো, তাহলে আকাশমণ্ডলী পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। (সূরা মোমেনুল, আয়াত: ৭১)
বস্তুতপক্ষে, মানুষকে তার কর্মফল ছাড়া আর কিছুই আস্বাদন করানো হয় না আর চেষ্টা, উদ্দেশ্য, কাজের ধরণ, যোগ্যতা সবই তো কর্মফলের রচয়িতা, নয় কি?:
আমি যখন মানুষকে অনুগ্রহের স্বাদ দিই, তখন ওরা ওতে আনন্দিত হয়। এবং ওদের কৃতকর্মের ফলে ওরা দুর্দশাগ্রস্ত হলেই ওরা হতাশ হয়ে পড়ে। (সূরা রুম, আয়াত ৩৬)
এতকিছুর পরও আল্লাহ সমাজে অর্থব্যয়ের মাধ্যমে অর্থের প্রবাহকে সচল রাখার তাগিদ দিয়েছেন, যেন কর্মফল ভোগ করা সত্ত্বেও পারস্পরিক সহানুভূতির মাধ্যমে সবাই সচ্ছলতা লাভ করতে পারে:
বিত্তবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে, এবং যে অভাবগ্রস্ত, সে আল্লাহ যা দান করেছেন তা থেকে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন তা অপেক্ষা গুরুতর বোঝা তিনি তার ওপর চাপান না। আল্লাহ অভাবের পর সচ্ছলতা দান ক'রে থাকেন। (সূরা তালাক, আয়াত: ৭)
হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে। যারা উদাসীন হবে, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্থ। আমি তোমাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি, তোমরা প্রত্যেকে তা থেকে ব্যয় কর-মৃত্যু আসার আগে, নইলে মৃত্যু আসলে সে বলবে-হে प्रतिपालक! আমাকে আরো কিছুকালের জন্য সময় দিলে আমি দান করতাম, এবং সৎশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। কিন্তু নির্ধারিত কাল উপস্থিত হলে আল্লাহ কাউকে সময় দেন না। (সূরা মোনাফেকুন, আয়াত: ৯-১১)
এর পরও স্বাভাবিকভাবেই সমাজে অর্থনৈতিক শ্রেণীভেদ থাকবে, যার ওপর ভিত্তি ক'রে সৃষ্টি হবে কাজের শ্রেণীভেদ। এতে পৃথিবীর কাজকর্মে সুবিধা হয়। আজ পশ্চিমা বিশ্বে কাজের লোক নেই ব'লে-তারা সবাই ধনী ব'লে-আমাদের মতো গরিব দেশ থেকে তারা শ্রমিক নেয়। তোমার যে ভাইটা একটা ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতা ছিল, সেও তো গত বছর রাজনীতি ছেড়ে ইটালি গেছে। তোমাদের তো পয়সার তেমন অভাব নেই। অথচ তার পরও একজন গরিব যেখানে যেতে পারত সেখানে সে যেতে পেরে তো খুশিই হলো। গরিব না হয়েও সে গরিব সেজেছে। এক্ষেত্রে তুমি কী বলবে? সে চুপ ক'রে রইল।
আমি ب'লে চললাম: আসলে আমাদের প্রত্যেককে অপরের ওপর হস্তক্ষেপ করার স্বাধীনতাও দেয়া হয়েছে—একটা সীমার মধ্যে। এতে উভয় পক্ষেরই পরীক্ষা হয়ে যায়—যে অত্যাচারিত হয় তার এবং যে অত্যাচার করে তারও। কিন্তু অত্যাচারিত যদি ধৈর্য ধারণ করে এবং সহজে পাল্টা অসদ্ব্যবহার না করে, এবং ভালোবাসার পথে অটল থাকে, তাহলে সবকিছুই তার পক্ষে যাবে—হয় অত্যাচারী তওবা ক'রে পথে ফিরে আসবে, না হয় আল্লাহ অন্য কোনো উপায়ে তাকে নিবৃত্ত করবেন, না হয় অত্যাচারিত ব্যক্তির দ্বারাই আল্লাহ তাকে সীমালঙ্ঘনের পর শায়েস্তা করবেন। আমরা স্বাধীনতার সম্মান ভোগ করছি ব'লে এটুকু ধৈর্যের খেসারত আমাদেরকে দিতে হবে, এবং তার বিনিময়ও পাওয়া যবে—ইহকালে ও পরকালে:
এই চরিত্রের অধিকারী কেবল তারাই হয়, যারা ধৈর্যশীল; এই চরিত্রের অধিকারী কেবল তারাই হয়, যারা মহাভাগ্যবান। (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ, আয়াত: ৩৫)
আমি আজ তাদেরকে তাদের ধৈর্যের কারণে এমনভাবে পুরস্কৃত করলাম যে, তারাই সফলাকাম হলো। (সূরা মু'মিমূন, আয়াত: ১১১)
কেউ ধৈর্য ধারণ করলে এবং ক্ষমা ক'রে দিলে তা বীরত্বের কাজ। (সূরা শুরা, আয়াত: ৪৩)
ভালো এবং মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত কর উৎকৃষ্ঠ দ্বারা, ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে, সে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো হয়ে যাবে। এই চরিত্রের অধিকারী কেবল তারাই হয়, যারা ধৈর্যশীল; এই চরিত্রের অধিকারী তারাই হয়, যারা মহাভাগ্যবান। যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তাহলে আল্লাহর স্মরণ নেবে। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী। (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ্, আয়াত: ৩৪-৩৬)
যারা বিশ্বাসী তারা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখুক। (সূরা মাঈদা, আয়াত: ১১)
মানুষের শ্রেণীভেদ হলো কাজের শ্রেণীভেদ। ঠিক যেন মিল-কারখানার মতো: সেখানে ভিন্ন ভিন্ন দল ভিন্ন কাজ করে এবং কাউকে খারাপ কাউকে ভালো বলা হয় না। যে জুতোর জিহ্বা বানায় তার কাছ থেকে ফিতার হিসাব নেয়া হয় না; যে-ব্যক্তি জুতোর সোল বানায় তার কাছে রঙ-পালিশের হিসাব চাওয়া হয় না। কাজের শ্রেণীভেদের মধ্যে সামাজিক মর্যাদার স্তরভেদ ছাড়া 'অন্য অর্থে' ভালো-মন্দের স্তরভেদ ব'লে কিছু নেই। ইহকালে তো শ্রেণীভেদ খুব কম, পরকালে শ্রেণী থাকবে আরো অনেক বেশি। সেখানেও তা হবে ইহকালের কাজ অনুসারে, যা প্রত্যেককে মেনে নিতে হবে।
লক্ষ্য কর কিভাবে আমি ওদের একদলকে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে থাকি; পরকাল নিশ্চয়ই মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ ও শ্রেয়ত্বে শ্রেষ্ঠতর। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ২১)
তোমরা তো সাম্যবাদে বিশ্বাসী, শ্রমিকসংগ্রামে বিশ্বাসী। তোমাদের নেতারা কি কোনোদিন শ্রমিক ছিল? বরং তোমাদের নেতাদের এত অহংকার যে তারা নিজেদেরকেই মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান ব'লে দাবি করে।
বন্ধুটি বলল: যেসব শিশু মারা যায় তাদের আয়ু নির্ধারিত ছিল?
হ্যাঁ। হাদিসে তো বলাই হয়েছে যে শিশুরা বেহেস্তে যাবে। শুধু তাই নয়, রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, 'যার দুটো শিশু সন্তান মারা যায়নি, আমি তাকেই আটকুরো বলি,' কারণ তাদের উছিলায় তাদের বাবা-মা বেহেস্তে চ'লে যাবে। এখানেও, প্রকৃত অর্থে, সময় দ্বারা পরিমাপিত আয়ু পূর্বনির্ধারিত নয়। পূর্বনির্ধারিত হলো কিছু শর্ত-যদি এরূপ হয়, তাহলে তার ফল এরূপ হবে, এবং তার পারলৌকিক ফল হবে এরূপ। যেমন, হাদীসে বলা হয়েছে যে যদি কেউ তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হওয়ার আগে ওযু না করে এবং কমপক্ষে বিসমিল্লাহ ব'লে মিলন শুরু না করে, তাহলে ঐ মিলন থেকে যে সন্তান জন্মাবে তার ওপর ইবলিসের প্রভাব দৃঢ় হবে। এই বিধানটাই পূর্বনির্ধারিত। তোমার এইডস থাকলে তোমার সস্থানেরও এইডস হবে-এটাই তো নিয়ম। তখন তোমার সন্তান এইডসে মারা গেলে তুমি কি বলবে যে আল্লাহই তার আয়ুকে ক্ষুদ্র ক'রে পাঠিয়েছিলেন? আসলে আল্লাহ নির্ধারণ ক'রে দিয়েছিলেন তার মোট জীবনীশক্তি-যা ক্ষয় হতে পারত ৫০০ বার জ্বর হবার মাধ্যমে, তা ক্ষয় হয়ে গেল ১ বার এইডস হয়ে। এইডস হলে যা হবার কথা তা হয়েছে কি না সেটাই দেখবার বিষয়। তুমি অপরাধ করবে, অথচ তোমার অর্থ-সম্পদ সন্তান মান-মর্যাদা তার দ্বারা প্রভাবিত হবে না, তা কী ক'রে হয়? তুমি তো সে-সবের কারণেই আল্লাহকে ভুলে থাক, এ কারণে তোমার কর্মফল সে-সবের মধ্যে প্রবেশ ক'রেই তোমার কাছে শান্তি ও পরীক্ষা হয়ে ফিরে আসে। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন যে তিনি মানুষের শান্তি এবং পরীক্ষাকে তার সন্তান-সন্তুতির জীবন-মৃত্যুর মধ্যেও প্রবিষ্ট করেছেন যুগে যুগে। ফেরাউন তৎকালীন ধার্মিকদের কন্যাসন্তানদেরকে বাঁচিয়ে রেখে পুত্রসন্তানদেরকে হত্যা করত। তা কি আল্লাহ করতেন? আল্লাহ নিজে যা করেন, তার জন্য মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে কেন? মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে তার জন্য যা সে আল্লাহর অবকাশের সুযোগ নিয়ে নিজে করে। কোরআনে বলা হয়েছে যে পরকালে শিশুকেও জিজ্ঞাসা করা হবে কারা তাকে হত্যা করেছিল এবং কেন। তোমার সবকিছু আল্লাহর বিধান দ্বারা পরিচালিত—এবং এই বিধানই পূর্বনির্ধারিত, সময়-পরিমাপিত আয়ু নয়। আল্লাহ মানুষের দ্বারাই মানুষকে পরীক্ষা করেন ও শাস্তি দেন। কোরআনে বলা হয়েছে যে ফেরাউন ছিল তার জাতির পরীক্ষাস্বরূপ।
আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে অন্যদল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে বিধ্বস্ত হয়ে যেত খ্রীস্টান-বৈরাগীদের উপাসনাস্থান, গির্জা, ইহুদিদের উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ, যাতে অধিক স্মরণ করা হয় আল্লাহর নাম। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৪০)
তবুও আল্লাহ দয়াময়, করুণাশীল। এ কারণে তিনি তোমার শাস্তির বা পরীক্ষার জন্য সন্তানের 'অকালমৃত্যু'র সুযোগ ক'রে দিলেও সেই সন্তানের প্রতি কোনো অবিচার করবেন না-তাকে তিনি বেহেস্তেই স্থান দেবেন। কারণ তার তো কোনো দোষ ছিল না, সে তার জাতিগত অভিশাপের শিকার। আল্লাহ তার পরীক্ষা, শাস্তি, অভিশাপকে সংশ্লিষ্ট জাতির মধ্যে বিস্তৃত ক'রে দেন। এটা ইহকালের ফলশ্রুতি। জাতি খারাপ হওয়ার কারণে ঐ জাতির কোনো ভালোমানুষকেও সে শাস্তির ভাগ নিতে হবে-কারণ সে নিজে ভালো হওয়া সত্ত্বেও অন্যদেরকে ভালোর পথে আহ্বান করেনি। তবে তার পরকালের বিচার হবে তারই আমলনামা অনুসারে। সে ভালো কাজ করলে বেহেস্তেই যাবে। মানুষের দায়িত্ব এবং অস্তিত্ব সামাজিকভাবে দলীয়-সে একা বাঁচতে পারে না; এ কারণে তার সমাজের যন্ত্রণার ভাগ তাকেও নিতে হবে, যেভাবে সে তার সমাজের সুখের ভাগও পার্থিব নিয়মে পেয়ে থাকে। কিন্তু কোরআনে বিভিন্ন আয়াতে স্পষ্ট ক'রেই বলা হয়েছে যে তা দ্বারা তার পরকাল বিঘ্নিত হবে না। মানুষের কর্ম, শাস্তি, পরীক্ষা, অস্তিত্বের এরূপ 'জাতীয়করণ' মানুষেরই মর্যাদা এবং দায়িত্বের ব্যাপ্তির কারণেই প্রতিষ্ঠিত-প্রতিটি মানুষের মধ্যেই রয়েছে তার গোষ্ঠী/জাতির আর সব মানুষের প্রতিবিম্ব। কারণ তাদের জন্মগত উৎস এক। আর সার্বিক অস্তিত্বের লড়াইয়ের পরীক্ষা পার্থিব নিয়মে গোটা জাতির জন্যই কার্যকর। আল্লাহ রক্তের দ্বারা সম্পর্কিত জাতিকে পরীক্ষার এক-একটি 'একক' হিসেবে বিবেচনা করেন:
প্রত্যেকটা জাতির জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত আছে; যখন তাদের সময়সীমা শেষ হয়ে যায়, তখন তারা তাকে এক ঘণ্টার জন্যও বিলম্ব করাতে পারে না, কিংবা তারা তা ত্বরান্বিতও করতে পারে না। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৩৪)
প্রত্যেক যুগের জন্য রয়েছে একটি ধর্মগ্রন্থ (যা আমি অবতীর্ণ করেছি)। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩৮)
আমি প্রত্যেক ধর্ম সম্প্রদায়ের জন্য ধর্ম পদ্ধতি নির্ধারিত ক'রে দিয়েছি, যা তারা পালন করে; সুতরাং তারা যেন তোমার সাথে এ ব্যাপারে তর্ক না করে। তুমি ওদেরকে তোমার প্রতিপালকের দিকে আহ্বান কর। তুমি সরল পথেই আছ। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৬৭)
তারপর তাদের পর অসৎ বংশীয়েরা উত্তরাধিকারী হয়েছিল, যারা নামায নষ্ট করেছিল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করেছিল; ফলত তারা অচিরেই শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। (সূরা মরিয়ম, আয়াত: ৫৯)
তিনিই 'আদ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছিলেন; এবং সামুদ সম্প্রদায়কেও-কাউকেই তিনি অব্যাহতি দেননি। এবং এদের আগে নূহের সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছিলেন; ওরা ছিল অতিশয় অত্যাচারী, অবাধ্য। তিনিই লূত সম্প্রদায়ের আবাসভূমিকে শূন্যে উত্তোলন ক'রে নিক্ষেপ করেছিলেন। সর্বগ্রাসী শান্তি ওকে আচ্ছন্ন করল।... কেয়ামত আসন্ন। আল্লাহ ছাড়া কেউই তা ঘটাতে সক্ষম নয়। তবে কি তোমরা এ কথায় বিস্ময়বোধ করছ? এবং হাসিঠাট্টা করছ? ক্রন্দন করছ? তোমরা তো উদাসীন। অতএব তোমরা আল্লাহকে সিজদা কর এবং তাঁরই উপাসনা কর। (সূরা নাজম, আয়াত: ৫০-৬২)
ওরা কি পৃথিবীকে ভ্রমণ করে না? করলে দেখত ওদের পূর্ববর্তীদের কী পরিণাম হয়েছিল। পৃথিবীতে তারা ওদের চেয়ে শক্তি এবং কীর্তিতে প্রবলতর ছিল। অতঃপর আল্লাহ তাদের অপরাধের জন্য তাদেরকে শাস্তি দিয়েছিলেন, এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে তাদেরকে রক্ষা করার কেউ ছিল না। (সূরা মুমিন, আয়াত: ২১)
গোটা কোরআন এরূপ আয়াতে ভরপুর। তবে এই যুগে মিলিত হয়েছে বিভিন্ন গোষ্ঠী। মিশ্রিত হয়ে গেছে সব ধরনের রক্ত এবং বৈশিষ্ট্য। ফলে এখন বিশেষ কিছু আচরণ বিশেষ কোনো জাতির লোক ক'রে থাকে এমনটি নয়। এখন স্বভাবের বৈচিত্র্য বেশি। ফলে জাতি-বিশেষের জন্য বিশেষ ধর্মগ্রন্থ বা সতর্ককারী পাঠাবারও দরকার এখন নেই। এখন সব জাতিই 'আন্তর্জাতিক'। একথা আল্লাহ স্পষ্টভাবে কোরআনে উল্লেখও করেছেন:
আমি ইচ্ছা করলে প্রতিটি জনপদে একজন সতর্ককারী (নবী) পাঠাতে পারতাম। (সূরা ফোরকান, আয়াত ৫১)
তিনি তা কেন পাঠাচ্ছেন না, কেন যে মুহাম্মদ (সঃ) শেষ নবী, তার প্রতি সুচারুরূপে নির্দেশ করার জন্যই সর্বজ্ঞানী আল্লাহ একথাটা এভাবে বলেছেন।
আসলে আল্লাহ সবকিছু আগে থেকে ঠিক ক'রে রেখেছেন এবং 'যদি এরূপ হয়, তাহলে তার ফল এরূপ হবে' — এই চলতি কর্মফলের বিধানও সেই পূর্বনির্ধারণের একটা বিধি। এই বিধিই কোরআন। এর বাইরে দৃশ্য-অদৃশ্য জগতে কিছু নেই। কোরআনের রহস্য আমি নিজেই জানি খুব কম - যেটুকু জানি তা বর্ণনা করতেও ছাপানো কাগজের দশ হাজার পৃষ্ঠারও বেশি লাগবে। সুতরাং এ ব্যাপারে কথা বাড়াতে চাই না। মুসলমানের আসল হলো পরকাল। এটাকে গৌণ ক'রে দেখলে ইহকাল নিয়ে এরকম লক্ষ লক্ষ প্রশ্নও জাগবে। যদিও তোমার যে-কোনো প্রশ্নেরই জবাব আছে, তবুও সব প্রশ্নের জবাব সবাইকে দেয়াও নিষেধ।
তোমাদের উপাস্যই একমাত্র উপাস্য, সুতরাং যারা পরলোকে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর সত্য-বিমুখ এবং তারা অহংকারী। এ নিঃসন্দেহ যে, আল্লাহ জানেন যা ওরা গোপন করে এবং যা ওরা প্রকাশ করে। তিনি অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা নহল, আয়াত: ২২-২৩)
পরলোক সম্পর্কে ওদের জ্ঞান তো নিঃশেষিত হয়েছে; ওরা তো এ বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করে এবং ওরা অন্ধ। (সূরা নাম্ল, আয়াত : ৬৬)
হে মানুষ! পুনরুত্থান সম্বন্ধে যদি তোমরা সন্দেহপূর্ণ হও, (তাহলে চিন্তা কর) আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর শুক্রবিন্দু থেকে, তারপর রক্তপিণ্ড থেকে তারপর পূর্ণ বা অপূর্ণ আকৃতিবিশিষ্ট মাংসপিণ্ড থেকে। যেন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেই (তোমরা কিভাবে জীবন লাভ করেছ এবং কিভাবে মৃত্যুর পর আবার পুনরুত্থিত হবে)। আমি যা ইচ্ছা করি, তা এক নির্দিষ্টকালের জন্য মাতৃগর্ভে রেখে দিই, তারপর আমি তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি, যেন তোমরা নিজ নিজ যৌবনে উপনীত হতে পার। তোমাদের মধ্যে (শিশু অবস্থায়) কারো কারো মৃত্যু ঘটে এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে রোগগ্রস্ত করা হয়, যার ফলে তারা যা জানত সে সম্বন্ধে তারা ভুলে যায়। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৫)
বস্তুত যারা পরলোকে বিশ্বাস করে না, তারা শান্তি এবং ঘোর বিভ্রান্তিতে আছে। ওরা কি ওদের সামনে ও পেছনে যে আসমান ও জমিন আছে, তার প্রতি লক্ষ্য করে না? আমি ইচ্ছা করলে ওদের সহ ভূমি ধ্বসিয়ে দেব অথবা ওদের ওপর আকাশ খণ্ডের পতন ঘটাবে; আল্লাহর অভিমুখী প্রতিটি দাসের জন্য এতে অবশ্যই নিদর্শন আছে। (সূরা সা-বা, আয়াত: ৮-৯)
... তোমরা এই জগতের ক্ষণিকের দ্রব্য সামগ্রীর দিকে তাকাও, কিন্তু আল্লাহ তাকান পরকালের দিকে... (সূরা আনফাল, আয়াত: ৬৭)
দেখ বন্ধু, আসল সমস্যা হলো সন্দেহ। আর পূর্ণ জ্ঞান অর্জন না করা পর্যন্ত সন্দেহ যেমন ঘুচবে না, তেমনি মাথা নত ক'রে শরীয়ত অনুসারে না চললেও সব জ্ঞান পাওয়া যাবে না। নামাজে দাঁড়ালে মনের মধ্যে গাদা-গাদা প্রশ্নের উদ্ভব হয়। এটাই প্রমাণ করে যে আমাদেরকে জ্ঞানী হতেই হবে। প্রশ্নের জবাব পেতেই হবে। নামাজের মধ্যকার প্রশ্ন যেমন মনের আত্মচেতনার স্বেচ্ছাচারিতার চিত্র তুলে ধরে, তেমনি তা মনকে জ্ঞানের লক্ষ্যেও ধাবিত করে। জ্ঞানার্জনকে প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য আবশ্যক (ফরজ) ক'রে দেয়া হয়েছে। এই আবশ্যকতারও অবশ্য শ্রেণীভেদ আছে। তুমি কোরআন পড়তে শেখনি বললে পরকালে কোনো লাভ হবে না। অন্য দিকে কিছু ত্যাগ স্বীকার করেও তো তা শিখতে পারতে। আবার তোমাকে জগতের সমস্ত জ্ঞান অর্জন করারও দরকার হবে না-সে উদ্দেশ্যে যাদের জন্ম হয়েছে তাদেরকে সেখানে পৌঁছে দেয়া হবেই। জীবনের সবকিছু ত্যাগ ক'রে হলেও তারা সেখানে পৌঁছে যাবে। অনেক দরিদ্র অলি আছেন যাদেরকে তুমি এদেশের প্রধানমন্ত্রীও বানাতে পারবে না। অথচ তাঁদের জ্ঞানের সুফল সব ইমানদাররাও পরকালে এবং ইহকালে পাবে। কোনো অবিচার নেই। আউলিয়াদের হৃদয়কে এমন ক'রে দেয়া হয় যে তাঁরা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্যই বেঁচে থাকেন-আমাদের মঙ্গলের জন্যই নামাজ পড়েন। হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) বলেছিলেন যে তিনি বেঁচে ছিলেন কেবল মুমিনদের স্বার্থে। কাউকে কোনো জ্ঞান বা যোগ্যতা দেয়া হয়েছে-এর মানে এটাই যে সে-জ্ঞান এবং যোগ্যতার সম্পূর্ণ দায়িত্ব তার। তাতে যার যে ভাগ আছে পরকালে তার কাছে তা ঠিকই পৌঁছে যাবে। মনে রেখ, তুমি না বুঝলে কী হবে, এমনও ব্যক্তি আছেন যাদেরকে এই বণ্টনপ্রক্রিয়া সরাসরি চক্ষুসভাবেই দেখানো হয়। একথা হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) নিজেই দ্ব্যর্থহীনভাবে ব'লে গেছেন। অদৃশ্যে অবিশ্বাস হলো কোরআনে অবিশ্বাস। পবিত্র কোরআনের শুরুতেই সূরা বাকারার প্রথম পাঁচ আয়াতের মধ্যেই একথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে এই কোরআন তাদের জন্যেই পথপ্রদর্শক যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে।
যাহোক, চেতনা হলো বাস্তবতার মানসিক প্রতিচ্ছবি। চেতার সাথে আত্মচেতনার দূরত্ব যতটুকু, ব্যক্তি-মনে উক্ত বাস্তবতার বা সত্যের তথা আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাসও ততটুকু। কোরআনে আল্লাহ বলেছেন যে তিনিই পরম বাস্তবতা।
... আল্লাহ তিনিই পরম বাস্তবতা। (সূরা হজ্ব, আয়াত : ৬২)
নামাজের রহস্যময় টাইম-মেশিনের মধ্যে প্রবেশ করা মাত্রই নামাজী এই চেতনা এবং আত্মচেতনার দূরত্বের মধ্যে প'ড়ে যায়। নামাজে মনোযোগ/আত্মচেতনা যত বেশি নিবদ্ধ হয়, এই দূরত্ব তত কমে এবং এভাবে নামাজী পরম বাস্তবতার দিকে এগুতে থাকে।
তার ভাগ্যে মে'রাজ জুটে যায়।
প'ড়েই দ্যাখ না নামাজ, একদিন।
সে বলল-কোটি কোটি লোকই তো পড়ে।
বললাম-সবাইকেই নামাজ ভালোভাবে পড়তে বলা হয়েছে।
সে এবার আগ্রহী হয়ে প্রশ্ন করল-বললে না যে আমরা কোথেকে কোথায় এসেছি?
বললাম-তা তো কোরআন-হদিসেই বলা আছে। আমি কথাগুলো বলেও দিয়েছি।
কিন্তু স্পেস-টাইমেরই যখন কোনো কনক্রিট অর্থ নেই, তখন কোথা থেকে কোথায় এলাম তা স্থান বা সময়ের মাপকাঠি দিয়ে মেপে বললে কি কোনো বিশেষ লাভ হয়?
তার আগ্রহ বেড়েছে দেখে বললাম-হ্যাঁ, আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে, অর্থাৎ অদৃশ্যের বা গয়েবের ভাষায়, এই ভ্রমণ এবং ফেরত ভ্রমণের বিশেষ কিছু দিক বা অর্থ আছে, যার একটা রহস্যময় সত্য আমি তোমাকে বলব। এ এমন এক সত্য যা প্রত্যক্ষ জ্ঞান ছাড়া কেউ অর্জন করতে পারে না, কিন্তু কারো কাছ থেকে শুনে এর প্রকৃত অর্থের কিছুটা বোঝার জন্য বিশেষ আমল না থাকলেও চলে। এরূপ সত্য স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনই করুণা ক'রে তাঁর অনুগত বান্দাদেরকে শেখান-কোনো পুস্তক-পুঁথি প'ড়ে বা বাহ্যিক ইল্ম অর্জন ক'রে এ জানা যায় না, ইসলামী শিক্ষায় বড় পাশ দিলেও না, যদি না হৃদয়টাকে পুরোপুরি খুলে দেয়া হয়। সুতরাং বুঝতেই পারছ কথাটা তোমাকে কতটা গুরুত্বের সাথে শুনতে হবে।
আসলে, স্পেস-টাইমকে আতিক্রম ক'রে বলা যায় যে আমারা সবাই কোনো দূর থেকে দূরে আসিনি, আমরা ...
সে আগ্রহের সাথে তাকিয়ে রইল।
আমরা ভেতর থেকে বাইরে এসেছি।
সে চুপ ক'রে রইল। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ ক'রে ভাবল। তারপর আবারও আগ্রহের সাথে তাকাল।
ব'লে চললাম: আমাদের জন্মের সময়ে আমাদের চেতনা বা Consciousness-এর একটা ধারা থেমে গিয়েছিল এবং একটা ধারা শুরু হয়েছিল। একে তুমি তোমার আমিত্বের দুটো পর্যায় বলতেও পায়। জন্মে যা শুরু হয়েছিল—এই দেহ, মন, কর্ম, শিক্ষা ... মৃত্যুতে তা শেষ হয়ে যাবে। এবং জন্মের সময়ে যা থেমে গিয়েছিল, মৃত্যুর সময়ে তা আবার শুরু হবে। ফলে গোটা জীবনের বাহ্যিকতাকে আমরা ত্যাগ ক'রে যাব—আমাদের সাথে যাবে, অর্থাৎ মৃত্যুর সময়ে যে-পর্যায় শুরু হবে তার সাথে মিশে যাবে, সেই আমল বা কাজের ফল যা আমরা আজীবন ধ'রে করেছি। আসলে তা সাথে যাবে বলাও ঠিক নয়, তা আগেই পৌঁছে যায়। জন্মের সময়ে আমরা ভেতর থেকে বাইরে এসেছিলাম—অর্থাৎ আল্লাহর শ্বাস্বত বৈশিষ্ট্যসমূহের একটা সুষম সমন্বয় এবং একটা অঙ্গীকার যা দেখা ধরা ছোঁয়া যায় না, নিয়ে এসেছিলাম, কারণ সেই বৈশিষ্ট্যগুলোকে আল্লাহ প্রকাশ করেছিলেন—এবং মৃত্যুর সময়ে এই প্রকাশ্য দেহ ফেলে রেখে এমনভাবে এখান থেকে চ'লে যাব ঠিক যেন আবার বইরে থেকে ভেতরে চ'লে যাব এবং, মজার ব্যাপার হলো, তখন থেকে এই 'ভেতরটাই' 'বাহির' ব'লে গণ্য হয়ে সমগ্র নতুন বাহ্যিকতায় রূপান্তরিত হবে।
এখান থেকে কী যাবে? ধরা, ছোঁয়া, আস্বাদন করা যায় এমন কিছুই না। যাবে সেই উদ্দেশ্য (নিয়ত), ভালোবাসা, ক্রোধ, হিংসা, ত্যাগ, ধৈর্য ইত্যাদি বিমূর্ত বা abstract বৈশিষ্ট্য যা আমরা আল্লাহর গুণাবলীর উছিলায় সেগুলির সাথেই কর্মের মাধ্যমে মিশিয়ে দিয়েছি। এটা তোমার কাছে স্পষ্ট হবে মৃত্যুর সময়ে, যদিও তখন আর ছটফট ক'রে কোনো লাভ হবে না।
এখন তোমাদের সামনে থেকে পর্দা সরিয়ে নিয়েছি, আজ তোমরা স্পষ্ট দেখছ। (সূরা কাফ, আয়াত: ২২)
যখন ওদের কারে মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন সে বলে—হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আবার (পৃথিবীতে) পাঠাও, যাতে আমি সৎকাজ করতে পারি, যা আমি আগে করিনি।— না এ হবার নয়। এ তো আর একটা উক্তিমাত্র। ওদের সামনে পর্দা থাকবে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত। (সূরা মু'মিনুন, আয়াত: ৯৯-১০০)
রহস্যের পর্দা ছিড়ে যাবে, ফলে ধরা পড়বে একদিনের জ্ঞানের দারিদ্র্য, কিন্তু ইমানের পর্দা থাকবে চিরকাল, ফলে বেইমানের শতবার জন্ম হলেও সে ইমান বা বিশ্বাস ফিরে পাবে না কোনোদিন।
জন্ম শুরু হয়েছিল অদৃশ্য বৈশিষ্ট্য দ্বারা—তা প্রকাশ পেয়েছিল দৃশ্যজগৎ রূপে; আর মৃত্যুতে প্রকাশ্য জগৎ পরিত্যক্ত হয়ে এখান থেকে অবশিষ্ট এবং অক্ষত থাকবে কিছু অদৃশ্য শক্তি বা পাথেয় যা আল্লাহর গুণাবলীর সাথে মিশে মৃত্যুহীন হয়েছে, এবং সেগুলোর মর্যাদা অনুসারে গ'ড়ে উঠবে নতুন প্রকাশ্য ভূবন। সুতরাং তুমি যদি এখন নামাজ না পড়, ভালো কাজ না কর, দান না কর, ধৈর্য না ধর, তাহলে বাইরে থেকে তুমি কী পাঠালে যা হবে পরবর্তী জীবনের ধারক ও বাহক?
প্রত্যেক মানুষের চিন্তা করা উচিত যে, সে আগামীকালের জন্য আগে/সামনে কী পাঠিয়েছে। (সূরা হাশর, আয়াত: ১৮)
কে আছে যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে; তাহলে তিনি তা তার জন্য বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন, এবং তার জন্য মহাপুরস্কার আছে। (সূরা হাদীদ, আয়াত: ১১)
তোমরা সৎকাজ করলে তা করবে নিজেদের জন্যে এবং মন্দ কাজ করলে তাও করবে নিজেদের জন্য। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ৭)
পরলোক সম্পর্কে ওদের জ্ঞান তো নিঃশেষিত হয়েছে; ওরা তো এ বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করে এবং ওরা অন্ধ। (সূরা নাম্ল, আয়াত: ৬৬)
হে মানুষ! পুনরুত্থান সম্বন্ধে যদি তোমরা সন্দেহপূর্ণ হও, (তাহলে চিন্তা কর) আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর শুক্রবিন্দু থেকে, তারপর রক্তপিণ্ড থেকে, তারপর পূর্ণ বা অপূর্ণ আকৃতিবিশিষ্ট মাংসপিণ্ড থেকে। যেন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেই (তোমরা কিভাবে জীবন লাভ করেছ এবং কিভাবে মৃত্যুর পর আবার পুনরুত্থিত হবে)। আমি যা ইচ্ছা করি, তা এক নির্দিষ্টকালের জন্য মাতৃগর্ভে রেখে দিই, তারপর আমি তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি, যেন তোমরা নিজ নিজ যৌবনে উপনীত হতে পার। তোমাদের মধ্যে (শিশু অবস্থায়) কারো কারো মৃত্যু ঘটে এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে রোগগ্রস্ত করা হয়, যার ফলে তারা যা জানত সে সম্বন্ধে তারা ভুলে যায়। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৫)
এই পার্থিব জীবন তো খেলা-ধুলা ছাড়া আর কিছু নয়। পারলৌকিক জীবনই তো প্রকৃত জীবন। (সূরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৪)
তাহলে এখন থেকে ভেতরটার দিকে নজর দেয়া চাই। নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত-এগুলো হলো ভেতরটাকে মজবুত করার উপায়। এখানে ভোগ-বিলাসিতা যাই করবে, তার কুফল সাথে নিয়ে যেতে হবে অথচ তার উপভোগের শান্তি এখানেই পরিত্যক্ত হবে। আল্লাহ বলেছেন-আল্লাহ জানেন ওরা যা আগে পাঠায় এবং যা পেছনে রেখে যায়। এমন দুর্ভাগ্য তুমি সজ্ঞানে বেছে নেবে? তাহলে পবিত্র কোরআনের বাণী শোনো:
তারা যা কিছু পার্থিব জীবনে ব্যয় করে তার দৃষ্টান্ত হিমশীতল বায়ুর মতো, যা যে-জাতি নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছে তাদের শস্যক্ষেত্রকে আঘাত করে ও বিনষ্ট করে। আল্লাহ তাদের প্রতি কোনো জুলুম করেননি, তারাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে। (সূরা আল্-ইমরান, আয়াত: ১১৭)
... তোমরা এই জগতের ক্ষণিকের দ্রব্য সামগ্রীর দিকে তাকাও, কিন্তু আল্লাহ তাকান পরকালের দিকে ... (সূরা আনফাল, আয়াত: ৬৭)
তোমরা প্রাসাদ নির্মাণ করছ এই ভেবে যে তোমরা চিরস্থায়ী হবে। (সূরা শোয়ারা, আয়াত: ১২৯)
নারী, সন্তান, বাশিকৃত স্বর্ণরৌপ্য আর সুশিক্ষিত অশ্বরাজি, গবাদিপশু এবং ক্ষেতখামারের প্রতি আসক্তি মানুষের নিকট সুন্দর ও লোভনীয় করা হয়েছে-এসব পার্থিব জীবনের ভোগ্যবস্তু। আর আল্লাহ-তাঁর নিকট শ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থল রয়েছে। (সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৪)
হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে। যারা উদাসীন হবে, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্থ। আমি তোমাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি, তোমরা প্রত্যেকে তা থেকে ব্যয় কর-মৃত্যু আসার আগে, নইলে মৃত্যু আসলে সে বলবে-হে प्रतिपालक! আমাকে আরো কিছুকালের জন্য সময় দিলে আমি দান করতাম, এবং সৎশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। কিন্তু নির্ধারিত কাল উপস্থিত হলে আল্লাহ কাউকে সময় দেন না। (সূরা মোনাফেকুন, আয়াত: ৯-১১)
দ্যাখ বন্ধু, আগেই বলেছি যে তোমার আমিত্বের আছে দুটো স্তর। নামাজে তোমার আমিত্বের এই দুটো স্তরের মধ্যে জোড়াতালি লাগানোর কাজ ঘাটে। নামাজ যদি তুমি না পড়, তাহলে, এমনকি এই জীবনে গভীর আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করলেও, মৃত্যুর সময়ে দেখবে যে তুমি ছড়িয়ে ছিটেয়ে গেছ, কিছুই তোমার আয়ত্তে থাকছে না।
তারা যা কিছু পার্থিব জীবনে ব্যয় করে তার দৃষ্টান্ত হিমশীতল বায়ুর মতো, যা যে-জাতি নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছে তাদের শস্যক্ষেত্রকে আঘাত করে ও বিনষ্ট করে। আল্লাহ তাদের প্রতি কোনো জুলুম করেননি, তারাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে। (সূরা আল্-ইমরান, আয়াত: ১১৭)
যেদিন আকাশ মেঘাপুঞ্জসহ বিদীর্ণ হবে এবং ফেরেস্তাগণকে নামিয়ে দেয়া হবে, সেদিনই প্রকৃত কর্তৃত্ব হবে দয়াময়ের এবং সত্য প্রত্যখ্যানকারীদের জন্য সেদিন হবে কঠিন। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ২৫-২৬)
তখন তোমাকে আল্লাহর কাছে ফেরত যেতে হবে। কিন্তু আল্লাহর সান্নিধ্যই তখন হবে তোমার জন্য দোজখ। একই ঘি—মানুষ খেয়ে হজম করে অথচ কুকুরে খেয়ে তা হজম করতে পারে না। আল্লাহর সান্নিধ্যই বেহেস্ত, তাঁর সান্নিধ্যই দোজখ। দোষ তাঁর নয়, তোমার। তুমি এখন একটা মোটা জামা পরেও শীতে কাঁপছ, অথচ সাইবেরিয়া থেকে কোনো লোক এখানে এলে সে খালি গায়েও ঘামবে। তাহলে তুমি দোষ দেবে কাকে? এই আবহাওয়ারূপ বাস্তবতাকে নাকি তোমার দেহকে, যে এই আবহাওয়া থেকে তৃপ্তিটুকু নেয়ার জন্য উপযুক্ত হয়নি?
আল্লাহই পরম বাস্তবতা। পরকালের বাস্তবতা ইহকালের আপেক্ষিক বাস্তবতার মতো অসম্পূর্ণ হবে না। তা হবে পরিপূর্ণ। তাতে কোনো মাত্রাঘাটতি থাকবে না।
এখানকার আপেক্ষিক বাস্তবতায় ডুয়ালিটি বা দ্বৈততা আছে, কিন্তু সেই বাস্তবতায় ডুয়ালিটি ব'লে কিছু থাকবে না, এবং ফলে থাকবে না কোনো আত্মবিরোধ। ফলে সেই বাস্তবতায় প্রবেশ করা মাত্রই সবকিছু দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে—ভালো, মন্দ। ভালোর কৃতিত্ব ভালোর প্রাপ্য, খারাপের দোষ খারাপকেই বহন করতে হবে। কারণ বাস্তবতায় কোনো ঘাটতি নেই।
সেইদিনই আল্লাহর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হবে। তিনিই ওদের বিচার করবেন। (তাঁর কর্তৃত্বের শক্তিতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের আমিত্বের স্বাধীনতার বিলুপ্তি ঘটবে, এবং ফলে সবাই যার যার কাজ অনুযায়ী বিভক্ত হয়ে যাবে।) (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৫৬)
(এবং বলা হবে) হে অপরাধীগণ! তোমরা আজ আলাদা হয়ে যাও। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৫৯)
সত্য যদি ওদের কামনা বাসনার অনুগামী হতো, তাহলে আকাশমণ্ডলী পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। (যারা পৃথিবীতে তাদের কামনা-বাসনাকে প্রাধান্য দিয়েছে, ধর্মের মহাজাগতিক, শ্বাশ্বত বিধান মেনে চলেনি, তাদের কাজ দ্বারা পরকালের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবতায় কোনো ফাটল বা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে না ব'লে তারা নিজেরাই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে—বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে—এমনকি প্রত্যেকে নিজের সাথেই বিরোধিতা করবে, যা কোরআনে বলা হয়েছে।) (সূরা মোমেনুল, আয়াত: ৭১)
হে মানবজাতি, তোমাদের ঔদ্ধত্য তোমাদেরই বিরুদ্ধে যায়। (সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৩)
আল্লাহ কখনও তার বান্দাদের সাথে অন্যায় আচরণ করেন না। (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫১)
তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, তাই আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গেছেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৬৭)
কিন্তু আল্লাহ তাদের কোনো ক্ষতি করেননি; তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে। (সূরা নহল, আয়াত: ৩৩)
তোমরা অবিশ্বাসী হলে—নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন—তিনি তাঁর সেবকগণের অকৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন না। (সূরা যুমার, আয়াত: ৭)
যে সৎ কাজ করে, সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে, এবং কেউ মন্দ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। তোমার প্রতিপালক তাঁর দাস-দাসীদের প্রতি কোনো জুলুম করেন না। (সূরা হা-মীম-আস্ সিজদাহ্, আয়াত: ৪৬)
সেখানে একজন ভালো আমলের ব্যক্তি একটা আঙুর খেয়ে অমৃতের স্বাদ পাবে, অথচ একই আঙুর একজন খারাপ আমলের লোক খেতেই পারবে না—তার গলায় আটকে যাবে, কিংবা সে তা মুখে পুরামাত্রই তা পঁচা-গলা আবর্জনায় রূপান্তরিত হবে। দোষটা আঙুরের নয়, মুখের। ফলত বিভক্ত হয়ে যাবে তাদের আবাসস্থলও। তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তোমার আমিত্ব দুটি মাত্রায় ভাগ হয়ে গেছে বলেই তোমার মানে প্রশ্ন জাগে 'আমি কে?'-অথচ দুই 'আমির' মিলনবিন্দুতে না পৌঁছানো পর্যন্ত তুমি কোনো সঠিক উত্তরও পেতে পার না। নামাজ এই মিলন বিন্দুতে তেমাকে পৌঁছে দেবে। তোমার ভেতরের 'আমি' আল্লাহকে চেনে। তাঁর সাথে মিলতে পারলেই আল্লাহর সাথে মিলনের পথ খুলে যায়। এ কারণে নামাজ হলো মুমিনের মেরাজ। তুমি কি আকাশ ভ্রমণে যেতে চাও না?
তোমার নামাজ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তোমার দুই 'আমি'র মধ্যে দূরত্ব রয়ে যাবে, মনে ডুয়ালিটি বা দ্বৈততা রয়ে যাবে, সন্দেহ রয়ে যাবে-মৃত্যুর সময়ে সে তোমাকে বিকর্ষণ করবে, তখনও তোমার আত্ম-চেতনা তোমার চেতনার সাথে মিলতে পারবে না, এবং তুমি নিজেকেও পবে না আল্লাহকেও পাবে না। মনে রেখ, রসুল (সঃ) বলেছেন:
যে নিজেকে জেনেছে, সে আল্লাকে জেনেছে।
মনে রেখ, দোজখের আগুনে পুড়বে তোমার আত্ম-চেতনা, এবং চেতনাই তার দোজখ। তোমার বেহেস্ত দোজখ তুমিই রচনা ক'রে থাক:
তোমরা অবিশ্বাসী হলে-নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন-তিনি তাঁর সেবকগণের অকৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন না। (সূরা যুমার, আয়াত: ৭)
যে সৎ কাজ করে, সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে, এবং কেউ মন্দ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। তোমার প্রতিপালক তাঁর দাস-দাসীদের প্রতি কোনো জুলুম করেন না। (সূরা হা-মীম-আস্ সিজদাহ্, আয়াত: ৪৬)
তুমি কখনও আল্লাহর বিধানে কোনো পরিবর্তন পাবে না। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৬২)
দয়া করাকে তিনি তাঁর কর্তব্য হিসেবে স্থির করেছেন। কেয়ামতের দিন অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে একত্রিত করবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারাই অবিশ্বাস করবে যারা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলেছে। (সূরা আন'আম, আয়াত: ১২)
যে কেউ খারাপ কাজ করবে তাকে অধোমুখে নিক্ষেপ করা হবে অগ্নিতে, এবং ওদেরকে বলা হবে তোমরা যা করতে তারই প্রতিফল তোমরা ভোগ করছ। (সূরা নাম্ল, আয়াত: ৯০)
তোমরা সৎকাজ করলে তা করবে নিজেদের জন্যে এবং মন্দ কাজ করলে তাও করবে নিজেদের জন্য। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ৭)
আমার শান্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি। আর আমার দয়া-তা তো প্রত্যেক বস্তুতেই প্রাপ্ত। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬)
তোমাদের অমঙ্গল তোমাদেরই। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১৯)
বল-তোমরা আমার প্রতিপালককে না ডাকলে তাঁর কিছু আসে যায় না। (সূরা- ফোরকান, আয়াত: ৭৭)
কিন্তু আল্লাহ তাদের কোনো ক্ষতি করেননি; তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে। (সূরা নহল, আয়াত: ৩৩)
উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরুস্কার ছাড়া আর কী হতে পারে? (সূরা রহমান, আয়াত: ৬০)
আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে আগেই যে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন, তোমরা যদি তাতে বিশ্বাসী হও, তাহলে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে কে সে তোমাদের বাধা দেয়? (সূরা হাদীদ, আয়াত: ৮)
আল্লাহ কখনও তার বান্দাদের সাথে অন্যান্য আচরণ করেন না। (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫১)
যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ১০৮)
তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, তাই আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গেছেন। (সূরা তওবা, আয়াত : ৬৭)
যে অবিশ্বাস করে, অবিশ্বাসের জন্য সেই দায়ী; যারা সৎকাজ করে তারা নিজেদের জন্যই রচনা করে সুখসয্যা। কারণ যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে পুরস্কৃত করেন। (সূরা রুম, আয়াত: ৪৪-৪৫)
তারা অন্যদেরকে এ (কোরআন) থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, এবং নিজেদেরকেও; কিন্তু তারা তো শুধু নিজেদের আত্মাকেই ধ্বংস করে, কিন্তু তারা তা বোঝে না। (সূরা আন'আম, আয়াত: ২৬)
হে মানবজাতি, তোমাদের ঔদ্ধত্য তোমাদেরই বিরুদ্ধে যায়। (সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৩)
এখানে তুমি যে আমিত্ব নিয়ে বড়াই করছ, সীমালঙ্ঘন করছ, সেখানে তাই-ই তোমার যন্ত্রণার কারণ হবে।
নামাজ বেহেস্তের চাবি। তোমার চাবি তোমাকেই দেয়া হয়েছে। তুমি তা হারিয়ে ফেললে কে তোমাকে তা ফেরত দেবে? আল্লাহ তো তোমাকে তা দিয়েই দিয়েছেন। তুমি তাঁর দোষ দাও কেন? তিনিই তো তোমার বেহেস্ত। তিনি তো সেখানেই তোমাকে ডাকছেন : গোটা কোরআনটাই তাঁর উদাত্ত আহ্বান। তিনি তো ঘোষণাই করেছেন-কেউ কি আছে যে আমাকে উত্তম ঋণ দেবে, যার উত্তম প্রতিদান আমি দেব পরকালে?
... তোমরা এই জগতের ক্ষণিকের দ্রব্য সামগ্রীর দিকে তাকাও, কিন্তু আল্লাহ তাকান পরকালের দিকে... (সূরা আনফাল, আয়াত : ৬৭)
প্রত্যেক মানুষের চিন্তা করা উচিত যে, সে আগামীকালের জন্য আগে/সামনে কী পাঠিয়েছে। (সূরা হাশর, আয়াত: ১৮)
কে আছে যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে; তাহলে তিনি তা তার জন্য বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন, এবং তার জন্য মহাপুরস্কার আছে। (সূরা হাদীদ, আয়াত: ১১)
উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরুস্কার ছাড়া আর কী হতে পারে? (সূরা রহমান, আয়াত: ৬০)
নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি দয়া এবং উদারতায় ভরপুর, তবুও অধিকাংশ লোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। (সূরা মু'মিন, আয়াত: ৬১)
মনে রাখাবে, মৃত্যুর সময়ে সর্বপ্রথম তোমার দেখা হবে... কার সাথে? বল তো কার সাথে? কী জানি। তোমার নিজের সাথে!
প্রত্যেকেরই মৃত্যুর সময়ে নিজের সাথে দেখা হয়ে যাবে। মানুষের আজীবনের প্রশ্ন-আমি কে? মৃত্যু তাকে এর জবাব দেবে। কিন্তু জবাবটা যদি অনুকূল না হয় তাহলে তা হবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
আবারও বলছি, তুমি সারাজীবন যে-সব কাজ করেছ, গোপনে বা প্রকাশ্যে, তা তোমার লুকানো সত্তায় লিপিবদ্ধ হয়ে থাকছে। মৃত্যুর সময়ে এই কর্মফলের সাথে তোমার দেখা হবে। কবরে গিয়েও তোমার কর্মফলের সাথে তোমার দেখা হবে। তুমি গভীর অন্ধকারে কী করেছ তা কেউ না জানলেও তুমি নিজে ভালোভাবেই জান। তখন হিসাবটা খুব কঠিন হবে।
প্রত্যেক মানুষের চিন্তা করা উচিত যে, সে আগামীকালের জন্য আগে/সামনে কী পাঠিয়েছে। (সূরা হাশর, আয়াত: ১৮)
তবে তওবা কবুল হলে সবই ক্ষমা, এই শর্তে যে তওবার পর একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা যাবে না।
যে ব্যক্তি তওবা করে ও সৎকাজ করে সে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অভিমুখী হয়। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ৭১)
তারা ক্ষমাপ্রার্থনা (তওবা) করলে তাদের জন্য কল্যাণ হবে, কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে-আল্লাহ তাদের ইহকালে ও পরকালে যন্ত্রণাপ্রদ শাস্তি দেবেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৭৪)
... যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে আমি নিশ্চয়ই তাদের মন্দকাজগুলো মিটিয়ে দেব, এবং তাদের কাজের উত্তম ফল দেব। (সূরা আনকাবুত, আয়াত: ৭)
যারা তাদের ভুলের পুনরাবৃত্তি করে, তারা আগুনের সঙ্গী হবে তারা তাতে অবস্থান করবে (চিরকাল)। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫)
তাছাড়া বিচারদিনে ফেরেস্তাদের দ্বারা লিখিত আমলনামা দেখানো হবে। মৃত্যুর সময়ের অবস্থা যদি সহজ না হয়, তাহলে বিচার দিনে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে দাঁড়ানো তো আরো কঠিন হয়ে যাবে।
আমার সেই বন্ধু আর কোনো প্রতিবাদ না ক'রে না উদ্বিগ্নমনে সেদিনের মতো বিদায় নিলেন।

📘 কোরানিক সেলফ কন্ট্রোল এবং মৃত্যুহীন জীবন > 📄 দুঃখ-কষ্ট রোগ-ব্যাধির কারণ : কোরানিক ব্যাখ্যা

📄 দুঃখ-কষ্ট রোগ-ব্যাধির কারণ : কোরানিক ব্যাখ্যা


কি দার্শনিক, কি বিজ্ঞানী, কি ধার্মিক, কি রোগী, কি ডাক্তার—আমরা সবাই ধ'রে নেই যে জীবন থাকলে দুঃখ-কষ্ট থাকবে; দেহ-মন থাকলে রোগ-ব্যাধি থাকবে। কিন্তু কেন থাকবে?
কেন-র জবাব না জানার কারণে আমরা সবকিছুর ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে আল্লাহকে দোষারোপ করি। এটা খোদাদ্রোহ ছাড়া আর কিছু নয়।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে—তাহলে কি দুঃখকষ্ট তিনি দেন না? সুন্দর প্রশ্ন। সুতরাং সুন্দর জবাব দরকার। অনেকে শুধু প্রশ্নটা ক'রেই হুংকার দিয়ে চ'লে যায়। ভাবখানা এমন যেন তাদের প্রশ্নের ধরণটাই তাদের জবাব এবং ফলে তারা অন্য কোনো জবাবের আশা করে না।
জবাব হলো : যদি এই বিশ্বাস থেকেই থাকে যে দুঃখকষ্ট আল্লাহ দিচ্ছেন, তাহলে তো চোখ বুজে আনন্দের সাথেই মেনে নেয়া উচিত যে এই মুহূর্তে আমার জন্যে এই দুঃখকষ্টই সবচেয়ে মঙ্গলজনক। সেভাবে সবকিছুকে মেনে নিচ্ছেন না কেন?
আসলে আমরা এতই মোনাফেকি চরিত্রের যে সব ভালো কাজের সুনাম আমরা নিজেরা ভোগ ক'রে সব খারাপ কাজের দোষ আল্লাহর ওপর চাপাই কিংবা অকৃতজ্ঞের মতো আচরণ করি :
আমি যখন মানুষকে অনুগ্রহের স্বাদ দিই, তখন ওরা ওতে আনন্দিত হয়। এবং ওদের কৃতকর্মের ফলে ওরা দুর্দশাগ্রস্ত হলেই ওরা হতাশ হয়ে পড়ে। (সূরা রুম, আয়াত : ৩৬)
মানুষের প্রতি দয়া দেখালে সে মুখ ফিরিয়ে নেয়, এবং অহংকারে দূরে সরে যায় এবং তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করলে সে তখন দীর্ঘ প্রার্থনায় রত হয়। বল [হে মুহাম্মদ (সঃ)]—তোমরা ভেবে দেখেছ কি যদি এই কোরাআন আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ হয়ে থাকে এবং এ তোমরা প্রত্যাখ্যান কর, তাহলে যে ব্যক্তি ঘোর বিরুদ্ধাচারণে লিপ্ত আছ তার চেয়ে অধিক বিভ্রান্ত আর কে? আমি ওদের জন্য আমার নির্দশনাবলী বিশ্বজগতে প্রকাশ করব এবং (প্রকাশ করব) ওদের নিজেদের (মনোজগতের) মধ্যেও, ফলে ওদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে এই (কোরআন) সত্য। এ কি যথেষ্ট নয় যে তোমার প্রতিপালক সব বিষয়ে জ্ঞাত? জেনে রাখ, এরা এদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে: জেনে রাখ, আল্লাহ সব কিছুকে ঘিরে আছেন। (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ, আয়াত: ৫১-৫৪)
আল্লাহ বলেছেন যে ভালো-খারাপ কোনোকিছুই তাঁর অনুমতি ছাড়া ঘটে না; কিন্তু তিনি ভালো কাজের আদেশ করেন এবং খারাপ কাজের নিষেধ করেন; কেউ নাছোড় হয়ে খারাপ কাজ করতে চাইলে তিনি অবশেষ তাতে অনুমতি দেন। কোরআন দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করছে যে সব ভালো আল্লাহ থেকে এবং সব খারাপ মানুষ থেকে:
আল্লাহ কখনও তার বান্দাদের সাথে অন্যায় আচরণ করেন না। (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫১)
যে সৎ কাজ করে, সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে, এবং কেউ মন্দ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। তোমার প্রতিপালক তাঁর দাস-দাসীদের প্রতি কোন জুলুম করেন না। (সূরা হা-মীম-আস্ সিজদাহ্, আয়াত: ৪৬)
আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি। আর আমার দয়া-তা তো প্রত্যেক বস্তুতেই প্রাপ্ত। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬)
কিন্তু আল্লাহ তাদের কোনো ক্ষতি করেননি; তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে। (সূরা নহল, আয়াত: ৩৩)
আল্লাহ যদি মানুষের অকল্যাণ ত্বরান্বিত করতেন, যেভাবে তারা তাদের কল্যাণ ত্বরান্বিত করতে চায়, তাহলে তাদের ভাগ্য মীমাংসিত হয়ে যেত (তারা নিজেদের কর্মফল দ্বারাই ধ্বংস হয়ে যেত)। সুতরাং যারা আমার সাক্ষাতের আশা করে না, আমি তাদেরকে নিজ অবাধ্যতায় উদ্‌ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াতে দেই।
তোমাদের অমঙ্গল তোমাদেরই। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১৯)
তোমরা সৎকাজ করলে তা করবে নিজেদের জন্যে এবং মন্দ কাজ করলে তাও করবে নিজেদের জন্য। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ৭)
মানুষের কৃতকর্মের জন্য জলে স্থলে বিপদ ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে ওদেরকে ওদের কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করানো হয়, যেন ওরা পথে ফিরে আসে। (সূরা রুম, আয়াত: ৪১)
কিন্তু সবকিছুর ফল আসে তাঁর কাছ থেকে: প্রকৃতপক্ষে সব কিছুর ক্ষেত্রেই আদেশ আল্লাহর। পূর্ব ও পরের সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩১)
কিন্তু তার দোষ তাঁর নয়। তাঁকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না: (সূরা রুম, আয়াত: ৪)
তিনি যা করেন সে ব্যাপারে তাঁকে প্রশ্ন করা যাবে না, বরং ওদেরকে প্রশ্ন করা হবে। (সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ২৩)
মানুষ যেভাবে কল্যাণ কামনা করে সেইভাবেই অকল্যাণ কামনা করে। মানুষ তার মনে যা আসে তার পরিণাম চিন্তা না ক'রে তার আশু রূপায়ণ কামনা করে। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ১১)
আমি কাউকেই তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপাই না। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৪২)
আল্লাহ তাঁর সকল দাসকে জীবনোপকরণে প্রাচুর্য দিলে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত; কিন্তু তিনি যে পরিমাণ ইচ্ছা সেই পরিমাণ দিয়ে থাকেন। (সূরা শুরা, আয়াত: ২৭)
বুঝাই যাচ্ছে যে আল্লাহ এমন কোনো সুযোগ রাখেননি যাতে মানুষ তাঁকে প্রশ্ন করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের সকল দুঃখের কারণ হলো তার নিজের পরিচয় সম্বন্ধে তার অজ্ঞতা। যে নিজেকে জানেনি, সে তো কষ্ট পাবেই, অসন্তুষ্ট থাকবেই। কারণ সে আল্লাহকে জানার উপযুক্ত হয়নি।
দুঃখ-কষ্ট দুই ধরনের: মানসিক এবং দৈহিক।
মনোকষ্ট, অর্থকষ্ট, দৈহিক কষ্ট সবকিছু থেকেই মানসিক কষ্ট অনুভূত হ'তে পারে। কিন্তু কোরানিক সত্য হলো এই যে মনোকষ্ট ব'লে কিছু নেই; মনের অজ্ঞতা, সংকীর্ণতা, এবং মায়াচ্ছন্নতাই মনের যাবতীয় কষ্টের কারণ। মনোকষ্ট হলো মন সম্বন্ধে মনের ভুল ধারণা। মনোকষ্ট ব'লে বাস্তবতাতে কিছু নেই, তা আছে কেবল মনে। সুতরাং মন ঠিক হয়ে গেলে তার সমস্ত দুঃখ-কষ্টের অবসান ঘটবে।
এই সত্য কোরআনের। এবং এটাই আসল সত্য:
...আমি অবিশ্বাসীদের দৃষ্টিতে তারা যা করছে তা শোভনীয় করেছি। (অর্থাৎ তারা খারাপকে ভালো মনে করছে—এ হলো তাদের মনেরই ধারণামাত্র।) (সূরা আন'আম, আয়াত: ১২২)
আল্লাহ বিশ্বাসীদের মনোরোগ নিরাময় ক'রে দেবেন। (অর্থাৎ তারা যখন সত্যকে জানবে তখন তাদের অসম্পূর্ণ ধারণার বিলুপ্তি ঘটবে।) (সূরা তওবা, আয়াত: ১৪)
আমি তাদের ভোগান্তিকে/দুঃখ-কষ্টকে সমৃদ্ধিতে রূপান্তরিত ক'রে দিয়েছিলাম। (অর্থাৎ দুঃখ-কষ্টের দ্বারা তাদের মনের কালিমা ধুয়ে গিয়েছিল এবং তারা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে মনে এবং আর্থিক দিকে আল্লাহর করুণা লাভ করল।) (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৯৫)
নিশ্চয়ই আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত বিশ্রামের প্রশান্তি পায়। (তখন চিত্ত সকল ভ্রান্তিকে অতিক্রম ক'রে সঠিক ভারসাম্যে স্থিত হয়।) (সূরা রা'দ, আয়াত:)
একথার সত্যতার প্রমাণ কী?
হ্যাঁ, আমরা স্পষ্ট প্রমাণের দিকে যাব।
দেহের কষ্ট বা রোগ-ব্যাধি ইত্যাদির কোরানিক রহস্য হলো: আল্লাহ যখন কাউকে ভালোবাসেন বা কারো ওপর রহমত বর্ষণ করেন বা কাউকে ক্ষমা করেন, তখন তার দেহ রোগাক্রান্ত হয়।
শুনে পাঠকের মনে হতে পারে—এ কি উদ্ভট কথা! হ্যাঁ, এটাই সত্য। এর স্পষ্ট প্রমাণও আমরা দেখব। নিচের আয়াতগুলোর সম্মিলিত মর্ম অনুধাবন করার চেষ্টা করতে হবে।
তিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেককে যথোচিত প্রকৃতি বা পরিমাপ দান করেছেন। (ফলে সবকিছুই তার প্রকৃতি এবং পরিমাপ অনুযায়ী নিজে একটি বিশেষ অবস্থায় থাকতে চায় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বস্তু বা সিস্টেমের সংস্পর্শে একটি বিশেষ ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকতে চায়। এবং একারণে ঐ বস্তু বা সংশ্লিষ্ট যে-কোনো বস্তুর প্রকৃতির বা পরিমাপের ওপর হস্তক্ষেপ করলে গোটা ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটে। এই ব্যাঘাত বা মোচড়কে ভারসাম্যের নিজস্ব স্থিতিশক্তি নস্যাৎ ক'রে দিয়ে বিলুপ্ত ক'রে আবারও ভারসাম্যকে ফিরিয়ে আনতে চায়। কিন্তু সংঘটিত মোচড় বা বিশৃঙ্খলাটুকুর কারণে মূল্য ভারসাম্য থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে নতুন আপাত-ভারসাম্য বা ক্ষণস্থায়ী ভারসাম্য গঠিত হয়। এই দূরত্বই মূল ভারসাম্যের বিকৃতির পরিমাণকে (যেমন কোনো রোগব্যাধি) নির্দেশ করে।) (সূরা ফোরকান, আয়াত: ২)
আল্লাহ কখনও তার বান্দাদের সাথে অন্যায় আচরণ করেন না। (তাঁর আচরণ মানেই তাঁর বিধান। তাঁর বিধান সুনির্ধারিত এবং অপরিবর্তনীয়। ফলে তাঁর মধ্যে বৈজ্ঞানিক এবং গাণিতিক বিশুদ্ধতা ও যান্ত্রিকতা রয়েছে, খামখেয়াল বা স্বেচ্চাচারিতা নেই। মানুষ যা করে, এই বিধান অনুযায়ী তার ফলশ্রুতি তৈরি হয়। এ কারণে মানুষের সব অমঙ্গলের দায়ভার তার নিজের। আল্লাহ কোনো অমঙ্গল সৃষ্টি করেননি—তিনি সৃষ্টি করেছেন বিধান বা নিয়ম—তথা প্রকৃতিজগতের মূল স্বভাবধর্ম; এই স্বভাবধর্ম অনুযায়ী প্রকৃতি মানুষের ক্রিয়ার প্রতি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। পরবর্তী আয়াত দ্রঃ।) (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫১)
তোমাদের অমঙ্গল তোমাদেরই। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১৯)
বড় শাস্তির আগে আমি ওদেরকে অবশ্যই ছোট শাস্তি আস্বাদন করাব, যেন ওরা (আমার দিকে) ফিরে আসে। (এই শাস্তি হলো মানুষেরই কর্মফল—যা মানুষের প্রাপ্য বটে। কিন্তু আল্লাহ করুণা ক'রে মানুষকে তারই কর্মফলের ছোট আঘাতগুলো দ্বারা হুঁশিয়ার ক'রে দেন, যেন সে পথে ফিরে আসে। ব্যাপারটা পুরোপুরি বিজ্ঞানসম্মত—বরং তার সাথে দয়া ও করুণা মিশ্রিত।) (সূরা সিজদাহ, আয়াত: ২১)
আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না। (সীমালঙ্ঘন মানেই বস্তুর প্রকৃতি ও পরিমাপকে লঙ্ঘন করা। যার প্রতি বস্তু তার নিজস্ব প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেই। আল্লাহ কখনোই তাঁর নিয়মের লঙ্ঘনকে উৎসাহিত বা বরদাস্ত করবেন না, কারণ তার জন্য সংশ্লিষ্ট অন্য সবার ক্ষতি হবে। পরবর্তী আয়াতেই এই সত্যের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।) (সূরা শুরা, আয়াত: ৪০)
যদি কেউ আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে, তাহলে এরূপ লোকেরা (নিজেদের এবং অপরের) ক্ষতি ক'রে থাকে। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২২৯)
আমি তোমাদের মধ্যে একজনকে অপরের পরীক্ষাস্বরূপ করেছি। তোমারা ধৈর্যধারণ করবে কি? তোমার প্রতিপালক সবকিছু দেখেন। (মানুষ সীমালঙ্ঘন করলেই—তার শাস্তি হোক বা না হোক-তার দ্বারা সংশ্লিষ্ট অন্যেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু যেহেতু মানুষকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে, এবং ফলে সে অবিবেচকের মতো সীমালঙ্ঘন ক'রে ফেলতে পারে, সেহেতু অন্যদেরকে একটু ধৈর্য ধারণ করতে বলা হয়েছে। এরূপ ধৈর্যধারণকারী তার বিনিময়ে পুরস্কৃত হবে-হয় তার মাধ্যমে সে তার কর্মফল ভোগ করবে, না হয় তার প্রশিক্ষণ হবে, না হয় সে পূণ্য অর্জন করবে। যে পরকালের সনদপত্র পেতে চায় তাকে ইহকালে পরীক্ষা দিতেই হবে।) (সূরা ফোরকান, আয়াত: ২০)
... আমি প্রত্যেক জনপদে অপরাধীদের প্রধানদেরকে সেখানে চক্রান্ত করার অবকাশ দিয়েছি; কিন্তু তারা নিজেদের বিরুদ্ধে ছাড়া চক্রান্ত করে না। কিন্তু তারা তা বুঝতে পারে না। (এই অবকাশের উৎস হলো মানুষের choice এর স্বাধীনতা। ফলে অবকাশ ভোগকারী এবং যারা তার দ্বারা প্রভাবিত হয় তারা সবার জন্যই তা পরীক্ষাস্বরূপ। মানুষের স্বাধীনতাই তার পরীক্ষা-আল্লাহ দেখতে চান কে তা কিছাবে ভোগ করতে চায়। একটা সীমার পর তার কর্মফলই তার কাছে ফিরে এসে তাকে হুঁশিয়ারি দেয় এবং পরে ধ্বংস করে।) (সূরা আন'আম, আয়াত: ১২৩)
সময়ের শপথ। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে। (এই ক্ষতির সাথে সাক্ষাৎ হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। প্রকৃতপক্ষে, এই সময়ই হলো মানুষের কুকর্মের সৃষ্টি। সময়ই তার ক্ষতির প্রমাণ। আল্লাহর বিধানকে লঙ্ঘন করলে সেই বিধান অনুযায়ীই সময় প্রতিকূল হয়ে যায়। সে দোষ সময়ের নয়, মানুষের। সময় বরং মানুষের কুকর্মের সাক্ষী-শুধু তাই নয়, সময়ই তার কর্মের ফলশ্রুতি। এ কারণে রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে সময়কে গাল দেয়া যাবে না।- তা তো আল্লাহর বিধানেরই অনুগামী। পরবর্তী আয়াতটি দ্রঃ।) (সূরা আছর, আয়াত: ১-২)
কিন্তু আল্লাহ তাদের কোনো ক্ষতি করেননি; তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে। (সূরা নহল, আয়াত: ৩৩)
তুমি কখনও আল্লাহর বিধানে কোনো পরিবর্তন পাবে না। (এটাও প্রমাণ করে যে আল্লাহর বিধান বিশুদ্ধভাবে গাণিতিক এবং তিনি মানুষের সাথে অন্যায় আচরণ করেন না। পরবর্তী আয়াত দ্রঃ।) (সূরা আহযাব, আয়াত: ৬২)
যে সৎ কাজ করে, সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে, এবং কেউ মন্দ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। তোমার প্রতিপালক তাঁর দাস-দাসীদের প্রতি কোন জুলুম করেন না। (সূরা হা-মীম-আস্ সিজদাহ্, আয়াত: ৪৬)
আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি। আর আমার দয়া-তা তো প্রত্যেক বস্তুতেই প্রাপ্ত। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬)
মানুষের কৃতকর্মের জন্য জলে স্থলে বিপদ ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে ওদেরকে ওদের কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করানো হয়, যেন ওরা পথে ফিরে আসে। (এই প্রক্রিয়াটা অত্যন্তভাবে গাণিতিক এবং বিজ্ঞানসম্মত। এখানেই ব'লে দেয়া হয়েছে যে মানুষের যাবতীয় রোগ-ব্যাধি বিপর্যয়কে তাঁরই কর্মফল অনুযায়ী আল্লাহ তাঁর পূর্বনির্ধারিত বিধান বা আদেশবলে সৃষ্টি করেছেন। এই আয়াত থেকেই প্রমাণিত হয় যে 'যদি এরূপ ঘটে তাহলে তার ফল হবে এরূপ'-বিজ্ঞানের এই কার্য-কারণ সূত্র বা Cause and Effect Relationship-টা আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং সকল বিজ্ঞান-দর্শনই তাঁর।) (সূরা রুম, আয়াত: ৪১)
সত্য যদি ওদের কামনা বাসনার অনুগামী হতো, তাহলে আকাশমণ্ডলী পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। (কারণ স্বেচ্ছাচারীর মতো আচরণ কখনও বিজ্ঞানসম্মত হতে পারে না; কার্য-কারণ সূত্রের সক্রিয়তার কারণেই তা বিশৃঙ্খল ফলশ্রুতির সৃষ্টি করে। বিজ্ঞানসম্মত বিধানের এটাই দাবি যে তা কেউ লঙ্ঘন করলে অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। একথা সত্য না হলে উক্ত বিধানই হতো অবৈজ্ঞানিক। এই আয়াতও প্রমাণ দিচ্ছে যে সব কার্য-কারণ বিধি এবং বিজ্ঞান তাঁরই। এই আয়াতও প্রমাণ করে যে রোগ-ব্যাধি বিপর্যয় এগুলোর জন্য মানুষই দায়ী।)
আমি যখন মানুষকে অনুগ্রহের স্বাদ দিই, তখন ওরা ওতে আনন্দিত হয়। এবং ওদের কৃতকর্মের ফলে ওরা দুর্দশাগ্রস্ত হলেই ওরা হতাশ হয়ে পড়ে। (অনুগ্রহ আল্লাহর-ফলে ভালো কাজের ফলশ্রুতির কৃতিত্ব মানুষের নয়, আল্লাহর। কারণ এরূপ ফল সৃষ্টি হয় যে বিধান অনুসারে তা আল্লাহরই। এরূপ সুফলদায়ী বিধানকেই আল্লাহ তাঁর করুণা নামে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু খারাপ কাজের দোষ আল্লাহর নয়, মানুষের। খারাপ কাজ সম্পর্কিত বিধানও আল্লাহর-অর্থাৎ 'এরূপ খারাপ কাজ করলে এরূপ খারাপ ফলশ্রুতির সৃষ্টি হবে'-এই বিধানও তাঁর; তবে একথা ব'লে তাঁকে দোষ দেয়া যাবে না যে, 'এরূপ বিধান তো তিনি না রাখলেও পারতেন', কারণ এরূপ বিধানই মানুষের অস্তিত্বের শর্ত। ফলে একথা আবারও প্রমাণিত হচ্ছে যে মানুষের রোগ-ব্যাধি-বিপর্যয়ের কারণগুলো বিজ্ঞানসম্মত, কারণ বিজ্ঞান আল্লারই।)
আল্লাহ যদি মানুষের অকল্যাণ ত্বরান্বিত করতেন, যেভাবে তারা তাদের কল্যাণ ত্বরান্বিত করতে চায়, তাহলে তাদের ভাগ্য মীমাংসিত হয়ে যেত (তারা ধ্বংস হয়ে যেত)। সুতরাং যারা আমার সাক্ষাতের আশা করে না, আমি তাদেরকে নিজ অবাধ্যতায় উদ্‌ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াতে দেই। (এ থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে সব উপায়ে নিজের কল্যাণ কামনা করাও বিজ্ঞানসম্মত নয়। বরং তার মধ্যে অকল্যাণই নিহিত। প্রকৃত কল্যাণ হলো আল্লাহর সার্বিক বিধানকে একত্রে মেনে চলার মধ্যে-কারণ এই বিধানগুলোই অস্তিত্বের নির্মাণ-সূত্র এবং ধারক। আল্লাহ জগৎ সৃষ্টি করেছিলেন শুধু 'কুন্' বা 'হও' বলার মাধ্যমে। আসলে তাঁর এই উচ্চারণ হলো তাঁর বিধানেরই প্রকাশমাত্র। ফলত তাঁর বিধানই বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যে সূত্রগুলোকে আবিষ্কার করা হয়, সেগুলো হলো তাঁর কিছু বিধানমাত্র। আল্লাহ মানুষকে বলেছেন তথ্য-পর্যবেক্ষণ গবেষণা ক'রে তাঁর এই বিধানাবলী সম্বন্ধে জানতে-'তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং লক্ষ্য কর তিনি কিভাবে সৃষ্টি আরম্ভ করেছেন।)
আমি তোমাদের শান্তি কিছুকালের জন্য রহিত করলে তোমরা তো আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। (তার মানে এই নয় যে আল্লাহ কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে শান্তি দেন। তিনি তো বলেছেনই যে তিনি বান্দর সাথে অন্যায় আচরণ করেন না এবং তাঁর বিধানের কোনো পরিবর্তন নেই। আসলে শাস্তি হলো মানুষেরই কৃতকর্মের ফল। মন্দ কাজ করলে প্রকৃতির সংশ্লিষ্ট উপকেন্দ্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যার ফলে সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলার বা শান্তির। এই শাস্তি যদি মানুষের আচরণকে শুধরাতে পারে, তাহলে ভারসাম্য আবারও পুনস্থিত হয়। অর্থাৎ ভারসাম্য পুনস্থিত না হওয়া পর্যন্ত শাস্তির অস্তিত্ব থাকবে-এটাই বিজ্ঞানসম্মত। বরং আল্লাহ যদি এমন বিধান করতেন যে মানুষকে তার কৃতকর্মের ফলে উদ্ভূত শান্তি ভোগ করা লাগত না এবং একই সাথে তার দ্বারা সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা এমনিতেই ভারসাম্যে ফিরে আসত, তাহলে মানুষ শুধু খারাপ কাজ ক'রে যেতেই থাকত, সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে হুঁশিয়ার হতে পারত না, এবং ফলে নেমে আসত বৃহত্তর বিপর্যয়, কিংবা একজনের কর্মফলকে ভোগ করতে হতো অন্যকে-তার প্রতিক্রিয়া নষ্ট করার জন্য, যা হতো অন্যায়, কিংবা তার সমস্ত কর্মফল তারই অজান্তে পরকালে পৌঁছে যেত এবং তা হতো মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। প্রশ্ন উঠতে পারে-বিধান কি এমন হতে পারত না যে খারাপ কাজের কোনো খারাপ ফলই সৃষ্টি হবে না?-এরূপ প্রশ্নই বোকামিপূর্ণ। তা যদি হতো, তাহলে সৃষ্টিতত্ত্বকে আর বিজ্ঞান বলা হতো না, কারণ তখন কার্য-কারণ ব'লে কিছু থাকত না। কার্য-কারণই হলো অস্তিত্বের নির্ণায়ক। মানুষের পরীক্ষা চলছে তারই ভিত্তিতে। তবে আশার কথা এই যে সকল কার্য-কারণকে অতিক্রম করা যাবে পরকালে। আল্লাহ বলেছেন যে সেখানে মানুষকে তাই-ই করতে দেয়া হবে যা তার মন চাইবে। আবারও প্রশ্ন উঠতে পারে-তখন যদি কার্য-কারণ না থাকে, তাহলে সেই বাস্তবতা টিকবে কিভাবে?-সুন্দর প্রশ্ন। আসলে তখন মন বস্তুর অধীন থাকবে না, বস্তুই হবে মনের অধীন। মনই হবে সব কার্য-কারণের উৎস। কারণ সেই মনের ওপর আল্লাহর সম্মতি থাকবে। মনে রাখতে হবে যে আল্লাহই সকল কার্য-কারণের স্রষ্টা। পরকালের বাস্তবতা আল্লাহর আদেশে আমাদেরই আমল দ্বারা সৃষ্ট-৩য়, ১০ম, এবং ১২শ আয়াত দ্রঃ ফলে তা হবে মনের অধীন।- আসল সত্য কথা হলো, দিব্যদৃষ্টিধারীগণ জানেন যে পরকালে মিনটাই হবে বাস্তবতা! ফলে সেখানে মানুষ যা চাইবে তাই পাবে, যা করতে চাইবে, তাই করতে পারবে- কোনো বিরোধিতা। সেখানে কারো কাজ দ্বারা অন্য কেউও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, কারণ সবার মন/আত্মা হবে এক-আল্লাহর তাওহীদ বা ঐক্যে লীন-সে ঐক্যের থাকবে বিভিন্ন স্তর, যার ফলে মানুষের থাকবে শ্রেণীভেদ-কারণ পৃথিবীতে সবাই নিজেকে সমান মাত্রায় আল্লাহর তাওহীদে একাকার ক'রে দেয়নি, নিজের কামনা-বাসনাকেও বিভিন্ন জনে বিভিন্ন মাত্রায় প্রাধান্য দিয়েছে; তবুও সার্বিক ঐক্য থাকবেই, কারণ আল্লাহ এক এবং তাঁর তাওহীদ। অনন্য। এ এক রহস্যময় ব্যাপার, যা সবাইকে বোঝানোও যায় না-শুধু বুদ্ধি দিয়ে এ বোঝা যায় না।) (সূরা দোখান, আয়াত: ১৫)
প্রত্যেক মানুষের চিন্তা করা উচিত যে, সে আগামীকালের জন্য আগে/সামনে কী পাঠিয়েছে। (অর্থাৎ মানুষের সকল আগামীকাল বা ভবিষ্যৎ গঠিত হয় তার বর্তমানের কাজ দ্বারা। এই বিচারে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে, মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যনিয়ন্তা। শুধু তাই নয়, তার ভবিষ্যৎ সময়ও তার বর্তমানের কাজ দ্বারা সৃষ্ট হয়ে তার দিকে ভবিষ্যৎ থেকে বর্তমানের দিকে ছুটে আসে। ভাগ্যের পূর্বনির্ধারণ বলতে যা বুঝায়, তা ভিন্ন জিনিস, যা তার কর্মফলের সাথেই ক্রিয়া করে। ব্যাপারটা সৃষ্টি রহস্যের মধ্যে সবচেয়ে জটিল ব'লে এখানে আলোচ্য নয়।) (সূরা হাশর, আয়াত: ১৮)
পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করার আগেই তা লিপিবদ্ধ করি; আল্লাহর পক্ষে এ অতি সহজ। এ জন্য যে, তোমাদের ওপর যা অতীত হয়েছে (অর্থাৎ যা হারিয়েছে), তার জন্য দুঃখিত হয়ো না, এবং তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তার জন্য হর্ষোৎফুল্ল হয়ো না, আল্লাহ উদ্ধত অহংকারীকে ভালোবাসেন না। (আমাদের জীবনে তাই ঘটে যা একবার লিখিত হয়ে যায়। আর তাই-ই লিখিত হয়ে যায়, যা সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার ভারসাম্যে স্থিত হয়ে যায় বা সংশ্লিষ্ট সীমা লঙ্ ঘনের পর নতুন বিকৃতিতে স্থিত হয়। সাময়িক বা স্থায়ী স্থিতি তথা ভারসাম্য ছাড়া কোনো প্রক্রিয়া কোনো ফল উৎপাদন করে না। আমাদের কর্মকাণ্ড, গতিবিধি, চিন্তা-পরিকল্পনা এসব প্রক্রিয়ামাত্র। এরা তখনই ফল উৎপাদন করে বা তখনই এসব প্রক্রিয়া থেকে কোনো কাজ উৎপাদিত হয় যখন আল্লাহর সৃষ্টি-পরিচালনা-সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক কার্য-কারণ বিধান অনুসারে তাতে কোনো অস্থায়ী বা স্থায়ী ভারসাম্য সৃষ্ট হয়। সুতরাং যা একবার ঘটে গেছে, তা না ঘটে পারত না-আমাদের কর্মের প্রতিফল হিসেবে আল্লাহই তাঁর বিধান দ্বারা তা ঘটিয়েছেন। এজন্য তা যদি কোনো ভালো কিছু হয়ে থাকে, তাহলে অযথা অহংকার করার কিছু নেই-আল্লাহর করুণা ছাড়া তা ঘটত না, তার বিধান অনড় না হলে তার উল্টোটাও ঘটতে পারত; এবং তা যদি দুর্ভাগ্যজনক কিছু হয়, তাহলে দুঃখ করার কিছু নেই, কারণ তা ন্যায্য বিধান অনুযায়ীই ঘটেছে, এবং দুঃখ করা মানে নিজের কর্মফলের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানো এবং বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। আমার বিশ্বাস, কেউ যদি ধর্মের পতে চ'লে শুধু এই আয়াতের আদেশটাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন ক'রে চলতে পারেন, তাহলে তিনি আল্লাহর অলি হয়ে যাবেন। (পরবর্তী আয়াত দ্রঃ।) (সূরা হাদীদ, আয়াত: ২২-২৩)
আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদই পতিত হয় না, এবং যে আল্লাহকে বিশ্বাস করে তিনি তার অন্তরকে সুপথে পরিচালিত করেন। আল্লাহ সব বিষয়ে পুরোপুরি অবহিত। (সূরা তাগাবুন, আয়াত: ১১)
আমি আজ তাদেরকে তাদের ধৈর্যের কারণে এমনভাবে পুরস্কৃত করলাম যে, তারাই সফলকাম হলো। (পূর্ববর্তী ব্যাখ্যার কথা স্মরণ রাখলে সহজেই বুঝা যাবে ধৈর্য কেন দরকার।) (সূরা মু'মিনূন, আয়াত: ১১১)
আল্লাহ যথাযথভাবে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এই উদ্দেশ্যে যে, যেন প্রত্যেক মানুষ তার কর্মানুযায়ী ফল পেতে পারে। (এই আয়াতটি এবং পরবর্তী আয়াতটি থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে আমাদের সব কর্মকাণ্ডকে ধারণ করার এবং তা অনুযায়ী যথাযথ ফল সৃষ্টি করার, অর্থাৎ তার প্রতি সঠিক সময়ে সঠিক সাড়াটি প্রদান করার, সমস্ত যান্ত্রিকতা এবং পাওয়ার-সাপ্লাই আকাশ এবং পৃথিবীতে সুষমভাবে স্থাপিত করা রয়েছে। আর এ কারণেই পৃথিবীতে কার্য-কারণ বিধি কাজ করে, বস্তু তার বৈজ্ঞানিক ধর্ম লঙ্ঘন করে না। কি রহস্যময় আয়াত! মানুষ যেন তার কর্মফল পেতে পারে এই উদ্দেশ্যেই আকাশ-পৃথিবীকে সুষমভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে! বাস্তবে বিজ্ঞানও তো তাই দেখছে! আমরা যাকিছু করি, তাই-ই পরবর্তীতে ফলস্বরূপ আমাদের কাছে ফিরে আসে। এরূপ একটা আয়াত প'ড়ে বা শুনেই কোনো জ্ঞানী ব্যক্তির মুসলমান হয়ে যাওয়া উচিত। কোরআনেই বলা হয়েছে (বারবার। অসংখ্য বার!) যে, কোরআন কেবল জ্ঞানী এবং চিন্তাশীলদের জন্যই।) (সূরা জাসিয়া, আয়াত: ২২)
বল-আসমান ও জমিন থেকে কে তোমাদেরকে জীবিকা সরবরাহ করেন? বল-আল্লাহ। হয় আমরা সৎপথে স্থিত, এবং তোমরা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছ, না হয় তোমরা সৎপথে আছ, এবং আমরা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছি। (সূরা সাবা, আয়াত: ২৪)
আল্লাহ সকলের খোঁজ-খবর রাখেন, এবং তিনি সবকিছু জানেন। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৪৭)
যারা বিশ্বাসী তারা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখুক। (সূরা মাঈদা, আয়াত: ১১)
প্রথমেই আসা যাক দৈহিক পীড়া, দুর্বলতা, এবং যাবতীয় রকমের রোগ-ব্যধির প্রসঙ্গে। আধুনিক জীববিজ্ঞান এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে দেহকে এবং দেহের যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে একটা বিশেষ ধারণার সাহায্যে ব্যাখ্যা করা হয় যার নাম সিস্টেমস্ কনসেপ্‌ট্। এর সাধারণ অর্থটা পুরোপুরি গাণিতিক এবং শ্বাশ্বত। তা হলো গোটা দেহ এমন একটা ব্যবস্থা যার কর্মকাণ্ডের উৎস এবং প্রকাশ এবং প্রক্রিয়া সেই ব্যবস্থার (System) মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং পর্যাপ্ত এবং গোটা ব্যবস্থাটার মধ্যে যতগুলো উপ-ব্যবস্থা (Subsystem) আছে তারা প্রত্যেকে পারস্পরিক ক্রিয়াকাণ্ডের দ্বারা একে-অপরের সাথে জড়িত, যেখানে একটা সব-সিস্টেমেরে প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত কাঁচামাল বা INPUT সংশ্লিষ্ট অন্য একটা সাব-সিস্টেমের প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত উৎপাদ বা ফল বা OUTPUT। এবং এর ফলে গোটা দেহ-ব্যবস্থার সুস্থতা এবং অস্তিত্ব প্রতি-মুহূর্তের প্রয়োজন (INPUT) অনুসারে স্থাপিত ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। এই সার্বিক গতিশীল ভারসাম্যের অবস্থায় প্রত্যেকটা সাব-সিস্টেমেও আলাদ-আলাদা ভারসাম্য ক্রিয়াশীল। ফলে কোনো একটা সাব-সিস্টেমের ভারসাম্য কোনো কারণে বিঘ্নিত হ'লে তা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সাব-সিস্টেমের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে এবং এই বিঘ্ন সংশ্লিষ্ট সাব-সিস্টেমের সীমার মধ্যে থাকলে উক্ত সাব-সিস্টেমের আঞ্চলিক (Local) ক্রিয়াণ্ডে যে অনিয়মের সৃষ্টি হয়, তা একটা রোগ বা ব্যধি নামে গণ্য হয়। এই বিঘ্ন জীবাণুর মাধ্যমে বা অন্য কোনো কারণে হতে পারে। এই বিঘ্ন যদি সংশ্লিষ্ট সাব-সিস্টেমের নিজস্ব সহনশীলতার সীমা কিংবা আঞ্চলিকতাকে অতিক্রম করে, তাহলে তা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সাব-সিস্টেমের ক্রিয়াকাণ্ডকেও প্রভাবিত করে। চিকিৎসা মানে হলো সংশ্লিষ্ট সাব-সিস্টেমে বা সাব-সিস্টটেমগুলোতে আবশ্যক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা। এই সিস্টেমস্ কনসেপ্‌ট্ থেকে পরবর্তীতে আরো বিশুদ্ধ গাণিতিক System ফিল্ড বা 'মরফোজেনেটিক ফিল্ড' এর ধারণাও এসেছে। এসব ধারণা সর্বাধুনিক রোগের জেনেটিকতত্ত্বেও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত এবং প্রযুক্ত হয়েছে।
জেনেটিক রোগতত্ত্বের সূত্রটা সাধারণ কথায় এরূপ সুস্থ ভারসাম্যপূর্ণ দেহের জিনবিন্যাস, বা আরো বিশেষভাবে, DNA বিন্যাস, একটা রেল লাইনের মতো, যার ওপর দিয়ে দেহগাড়ির বগিগুলো মসৃণ গতিতে এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু কোনো কারণে লাইনের স্লিপারে সমস্যা ঘ'টে গেলে বা রেলগুলোর পারস্পরিক সমান্তরলতায় ব্যাঘাত ঘটলে, বগি তখন চলতে গিয়ে হোচট খেয়ে পাশে প'ড়ে যায়। সৃষ্টি হয় ব্যাঘাত বা রোগ-ব্যধির। জেনেটিক চিকিৎসার বা আস্ত্রোপচারের মাধ্যমে লাইনটাকে আবার ঠিক ক'রে দিলে বগিটা আবারও যথাস্থানে ফিরে আসে এবং যথানিয়মে চলতে শুরু করে। এই বিশৃঙ্খলতা মানুষের ভুল আচরণের জন্যই ঘটে থাকে।
সত্য যদি ওদের কামনা বাসনার অনুগামী হতো, তাহলে আকাশমণ্ডলী পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। (সূরা মোমেনুল, আয়াত: ৭১)
আসল কথা হলো এই যে এই দেহের সবকিছুর জন্য একটা নির্দিষ্ট জায়গা আছে, ভারসাম্য আছে। উদাহরণস্বরূপ, একটা বিশেষ বয়সের নারী বা পুরুষের সুস্থ অবস্থায় তার শরীরের সবগুলো সাব-সিস্টেমের সূচক যেমন রক্তসংবহনতন্ত্র, (রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ/সংখ্যা, শুগারের পরিমাণ), রেচনতন্ত্র (প্রশ্রাব-পায়খানার বিভিন্ন অবস্থা, প্রশ্রাবে ইউরিয়ার পরিমাণ ইত্যাদি), পরিপাকতন্ত্র, রক্তের চাপ, দেহের তাপ, দৃষ্টিশক্তির উর্ধ্বসীমা-নিম্মসীমা, কর্মপেরণা ইত্যাদির একেকটা বিশেষ মান থাকে।
এগুলোর সার্বিকতাকে একটা বহুমাত্রিক গ্রিডে বা ম্যাট্রিক্সে ফেলে বলা যায় যে ঐ বিশেষ বয়সের জন্য ঐ বিশেষ লিঙ্গের মানবসন্তানের দেহের ভারসাম্যের চিত্র বা সূত্র হলো ঐ গ্রিড বা ম্যাট্রিক্সটা। এদের যে-কোনো একটা সূচকের মান যদি গ্রহণযোগ্য সীমার বাইরে চ'লে যায়, তাহলে, অন্যান্য সূচকগুলোর মান 'স্বাভাবিক' থাকলেও, একথা বলতে হ'বে যে ব্যক্তির দেহে কমপক্ষে একটা অস্বাভাবিকতা আছে, তা যে কারণেই হোক। এই 'অস্বাভাবিকতাটাই' চিকিৎসা বিজ্ঞানে ব্যাধি নামে পরিচিত। অনাকাঙ্খিত জটিলতা এড়ানোর জন্য আমরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকলাম।
আমরা পাঠককে অবাক ক'রে দিয়ে আবারও ব'লে রাখি: দেহে এরূপ যে-কোনো অস্বাভাবিকতার উপস্থিতিই সেই দেহের ওপর আল্লাহর করুণার সক্রিয়তাকে স্পষ্টভাবে এবং প্রত্যক্ষভাবে নির্দেশ করে। অর্থাৎ, এই অস্বাভাবিকতাই তার রহমত!
কোনো কোনো পাঠক হয়তো এতক্ষণে ক্ষেপে গিয়ে থাকবেন। কিন্তু আপনি যদি কোনো ডাক্তার হন-এবং আমার বিশ্বাস যে আমার প্রিয় পাঠকদের মধ্যে কমপক্ষে একজন জ্ঞানী ডাক্তার রয়েছেন-তাহলে, আমার অনুরোধ, আপনার ক্ষেপে ওঠা একদম উচিত হবে না, কারণ আমাদের পরবর্তী ব্যাখ্যা এবং রায় আপনার বিদ্যার এবং পেশার পক্ষেই যাবে!
আমরা আরেকটু বাড়িয়ে বলতে চাই যে, মৃত্যু বা ধ্বংসের আগ পর্যন্ত দেহে বা দেহের কোনো অংশে যত ধরনের ব্যাধির সৃষ্টি হয়ে থাকে, তার সবই মূলত আল্লাহর তরফ থেকে রহমত বা করুণা। তা স্বয়ং রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন।
তাহলে আমরা এই দেহযন্ত্রের বিভিন্ন অবস্থাকে আরেকটু বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি। লক্ষণীয় যে:
■ দেহের প্রত্যেকটা বয়সের একেকটা সীমা বা Rangeকে একেকটা স্তর হিসেবে বিবেচনা করলে বলা যায় যে, বয়সের এক-একটা স্তরের জন্য (পুরুষ এবং নারীর জন্য আলাদাভাবে) মানবদেহের সার্বিক ভারসাম্য এক-এক রকমের।
■ প্রত্যেকটা সার্বিক ভারসাম্যের অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট সাব-সিস্টেমগুলোর নিজ-নিজ ভারসাম্যগুলোর বা স্বাভাবিক অবস্থাগুলোর (Normal Value) একটা সুনির্দিষ্ট সমন্বয়। এই সমন্বয়কে গ্রিড বা ম্যাট্রিক্স বলা যায়।
■ বয়সের এক-এক স্তরের জন্য দেহের সার্বিক ভারসাম্য বা ম্যাট্রিক্স এক-একরকমের ব'লে শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত দেহের গতিবিধি মূলত একটা পরিবর্তনশীল ভারসাম্যের (Dynamic Equilibrium) চলার পথ—অন্যকথায়, একগুচ্ছ ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থার একটা সারিবদ্ধ সজ্জা।
উদাহরণস্বরূপ, ১-৩ বছর, ৩-৬ বছর, ৬-৯ বছর, ৯-১২ বছর, ১২-২০ বছর, ২০-৩০ বছর ইত্যাদি বয়সের স্তরগুলোর (যা এখানে কাল্পনিক) জন্য একই দেহের সার্বিক ভারসাম্য হবে ভিন্ন ভিন্ন, এবং কোনো বিশেষ দেহের গোটা জীবনধারাকে এই ভারসাম্যগুলোর ধারাটা (Series) দ্বারা বর্ণনা করা যাবে।
এভাবে মানবদেহের গোটা বয়সের জন্য একটা সাধারণ বা গড় বক্ররেখা বা Curveবা চিত্র বা ভারসাম্যপথ পাওয়া যাবে। মজার ব্যাপার হলো, সহস্র বছরের ব্যবধানে বা আবহাওয়ার ব্যবধানে এই চিত্র বিভিন্ন রকমেরও হতে পারে! এই সত্যটা জানলেই বুঝা যায় কেন একেক যুগে একেক ধরনের রোগ-ব্যধির প্রকোপ বেশি দেখা দিত বা দেবে। হাদিসেও বর্ণিত আছে যে শেষ যুগে নতুন নতুন ব্যধি এবং ঔষধের উদ্ভব ঘটবে। ভারসাম্যের এই সচলতার কারণেই ভিন্ন ভিন্ন যুগের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধর্মগ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন:
সত্য এসেছে তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে, সুতরাং তুমি সন্দেহকারীদের অন্তর্গত হয়ো না। (সূরা আলইমরান, আয়াত: ৬০)
তাহলে তুমি কি (হে মুহাম্মদ (সঃ)) তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তার কিছু অংশ বাদ দেবে এবং তোমার বক্ষ সংকুচিত করবে? যেহেতু তারা বলে—কেন তার প্রতি ধনভাণ্ডার অবতীর্ণ হয়নি, অথবা তার সাথে ফেরেস্তা আসেনি? (সূরা হুদ, আয়াত: ১২)
নিশ্চয়ই আমি মুসাকে কেতাব দিয়েছিলাম, অতএব তুমি তার (মূসা (আঃ) এর) কেতাব প্রাপ্তির বিষয়কে সন্দেহ ক'র না। (সূরা সিজদাহ, আয়াত: ২৩)
হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যেন তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)
তোমাদের সকলের সৃষ্টি এবং পুনরুত্থান একটামাত্র প্রাণীর সৃষ্টি এবং পুনরুত্থানেরই অনুরূপ।
সময়ের শপথ। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে। (সূরা আছর, আয়াত: ১-২)
প্রত্যেক যুগের জন্য রয়েছে একটি ধর্মগ্রন্থ (যা আমি অবতীর্ণ করেছি)। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩৮)
প্রত্যেকটা জাতির জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত আছে; যখন তাদের সময়সীমা শেষ হয়ে যায়, তখন তারা তাকে এক ঘণ্টার জন্যও বিলম্ব করাতে পারে না, কিংবা তারা তা ত্বরান্বিতও করতে পারে না। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৩৪)
তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মে প্রতিষ্ঠিত কর। আল্লাহর স্বভাবের অনুসরণ কর, যে-স্বভাব অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর স্বভাবের কোনো পরিবর্তন নেই— এটাই সরল চিরস্থায়ী দ্বীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই (তা) জানে না। বিশুদ্ধ চিত্তে তাঁরই অভিমুখী হও; তাকে ভয় কর, নামাজ কায়েম কর ... (সূরা রুম, আয়াত: ৩০-৩১)
তুমি কখনও আল্লাহর বিধানে কোনো পরিবর্তন পাবে না। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৬২)
যদি কেউ আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে, তাহলে এরূপ লোকেরা (নিজেদের এবং অপরের) ক্ষতি ক'রে থাকে। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২২৯)
পূর্ব ও পরের সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। (সূরা রুম, আয়াত: ৪)
প্রকৃতপক্ষে সব কিছুর ক্ষেত্রেই আদেশ আল্লাহর। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩১)
তিনি আদি, তিনি অন্ত, তিনি ব্যক্ত, তিনি গুপ্ত, এবং তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত। (সূরা হাদীদ, আয়াত: ৩)
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, দেহ-ঘড়ির সূচক বা কাঁটাটি সব বয়সের ক্ষেত্রে যেমন সমান ঘোরে না, তেমনি সব যুগের বা আবহাওয়ার ক্ষেত্রেও সমান ঘোরে না। অর্থাৎ পূর্ণ দেহটাও একটা পূর্ণাঙ্গ সিস্টেম নয়, এটাও একটা সাব-সিস্টেম, যা বাইরের প্রকৃতির সঙ্গে ক্রিয়াশীল ব'লে গোটা প্রকৃতির তাৎক্ষণিক ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। এভাবে কোনো একটা বিশেষ সময়ের জন্য কোনো দেহের চারপাশের ধারণকারী এবং লালনকারী বাস্তবতার ভারসাম্য পাওয়া গেলে এটাও বের করা যায় যে ঐ দেহের ভারসাম্যের সাথে উক্ত ভারসাম্যের পারস্পরিক ক্রিয়ার সৃষ্টি হয় বৃহত্তর একটা ভারসাম্যের, যাকে লক্ষ্য ক'রে শুধু দেহটা নয়, পারিপার্শ্বিকতার ভারসাম্যের সূচক বা গোটা অস্তিত্বের ঘড়ির কাঁটাটাই ঘুরছে। এই সার্বিক ভারসাম্যবিন্দু হলো আলোচ্য সময় বা যুগের জন্য সার্বিক ক্রিয়াকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। একটা কথা জেনে রাখা দরকার, আল্লাহ নিজেই কিন্তু নিজেকে সমস্ত অস্তিত্বের ক্রিয়াকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিহ্নিত করেছেন, এবং সময়ের সাথে তিনি তার কর্মকাণ্ড পরিচলনার ভারসাম্যবিন্দু বদলে দিয়ে নতুন নতুন পরিবর্তনশীল দেন্দ্রস্থল থেকে কাজ করেন একথাও তিনি বলেছেন:
আমি প্রত্যেক ধর্ম সম্প্রদায়ের জন্য ধর্ম পদ্ধতি নির্ধারিত ক'রে দিয়েছি, যা তারা পালন করে; সুতরাং তারা যেন তোমার সাথে এ ব্যাপারে তর্ক না করে। তুমি ওদেরকে তোমার প্রতিপালকের দিকে আহ্বান কর। তুমি সরল পথেই আছ। '(সূরা হজ্ব, আয়াত : ৬৭)
বল-পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং অনুধাবন কর কিভাবে তিনি সৃষ্টি আরম্ভ করেছেন। (সূরা আনকাবুত, আয়াত: ২০)
প্রত্যেকটা জাতির জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত আছে; যখন তাদের সময়সীমা শেষ হয়ে যায়, তখন তারা তাকে এক ঘণ্টার জন্যও বিলম্ব করাতে পারে না, কিংবা তারা তা ত্বরান্বিতও করতে পারে না। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৩৪)
প্রত্যেক যুগের জন্য রয়েছে একটি ধর্মগ্রন্থ (যা আমি অবতীর্ণ করেছি)। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩৮)
নিশ্চয় তোমরা এক স্তর থেকে অন্যস্তরে আরোহণ করবে। (সূরা ইনশিক্বাক, আয়াত: ১৯)
(এ কোরআন) অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়। পূর্ববর্তী কেতাবসমূহে অবশ্যই এর উল্লেখ আছে। (সূরা শুয়ারা, আয়াত: ১৯৫-৯৬)
এবার মনটাকে আরেকটু চাঙ্গা করার জন্য নিচের আয়াতগুলো একবার প'ড়ে নিলে ভালো হবে:
কেয়ামতের ঘোষণা না থাকলে ওদের ফলাসালা তো হয়েই যেত। (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ, আয়াত: ২১)
বড় শাস্তির আগে আমি ওদেরকে অবশ্যই ছোট শাস্তি আস্বাদন করাব, যেন ওরা (আমার দিকে) ফিরে আসে। (সূরা সিজদাহ, আয়াত: ২১)
কারো আয়ু বৃদ্ধি হলে বা হ্রাসপ্রাপ্ত হলে তা তো হয় কেতাব (সংরক্ষিত ফলক) অনুসারে। (সূরা ফাতির, আয়াত: ১১)
পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করার আগেই তা লিপিবদ্ধ করি; আল্লাহর পক্ষে এ অতি সহজ। এ জন্য যে, তোমাদের ওপর যা অতীত হয়েছে (অর্থাৎ যা হারিয়েছে), তার জন্য দুঃখিত হয়ো না, এবং তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তার জন্য হর্ষোৎফুল্ল হয়ো না, আল্লাহ উদ্ধত অহংকারীকে ভালোবাসেন না। (সূরা হাদীদ, আয়াত: ২২-২৩)
আমি কি তোমাদের দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে তখন কেউ সতর্ক হবে চাইলে সতর্ক হতে পারতে না? (সূরা ফাতির, আয়াত: ৩৭)
তুমি কি জান (হে মুহাম্মদ (সঃ))- সম্ভবত কেয়ামত আসন্ন। যারা বিশ্বাস করে না তারাই কামনা করে যে তা ত্বরান্বিত হোক। কিন্তু যারা বিশ্বাসী তারা তাকে ভয় করে এবং জানে যে তা সত্য। (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ, আয়াত: ১৭-১৮)
... তোমাদের জন্য নির্ধারিত দিন আছে, যা তোমরা মুহূর্তকাল বিলম্বিত করতে পারবে না, ত্বরান্বিতও করতে পারবে না। (সূরা সা-বা, আয়াত: ৩০)
আমিই ... লিখে রাখি যা ওরা (মানুষ) আগে পাঠায় এবং যা পেছনে রেখে যায়। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১২)
যদি কেউ আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে, তাহলে এরূপ লোকেরা (নিজেদের এবং অপরের) ক্ষতি ক'রে থাকে। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২২৯)
প্রকৃতপক্ষে সব কিছুর ক্ষেত্রেই আদেশ আল্লাহর। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩১)
কেয়ামতের লক্ষণসমূহ তো এসে পড়েছে। (সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১৮)
আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা শুরা, আয়াত: ৪০)
পূর্ব ও পরের সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। (সূরা রুম, আয়াত: ৪)
শপথ সমুন্নত আকাশের। এবং শপথ উদ্বেলিত সমুদ্রের-তোমার প্রতিপালকের শাস্তি অবশ্যম্ভাবী। তা অনিবার্য। যেদিন আকাশ আন্দোলিত হবে প্রবলভাবে। এবং পর্বতমালা উন্মুলিত হবে। সেই দিন মিথ্যাবাদীদের জন্য দুর্ভোগ। যারা খেলাচ্ছলে অসার কার্যকলাপে লিপ্ত থাকে। (সূরা তৃর, আয়াত: ৫-১১)
তাঁর (আল্লাহর) প্রমাণ বা নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে আকাশ এবং পৃথিবীর সৃজন, এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই জ্ঞানীদের জন্য এর মধ্যে রয়েছে প্রমাণ। (সূরা রুম, আয়াত: ২২)
তোমরা অবিশ্বাসী হলে নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন-তিনি তাঁর সেবকগণের অকৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন না। (সূরা যুমার, আয়াত: ৭)
যে সৎ কাজ করে, সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে, এবং কেউ মন্দ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। তোমার প্রতিপালক তাঁর দাস-দাসীদের প্রতি কোনো জুলুম করেন না। (সূরা হা-মীম-আস্ সিজদাহ্, আয়াত: ৪৬)
তুমি কখনও আল্লাহর বিধানে কোনো পরিবর্তন পাবে না। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৬২)
দয়া করাকে তিনি তাঁর কর্তব্য হিসেবে স্থির করেছেন। কেয়ামতের দিন অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে একত্রিত করবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারাই অবিশ্বাস করবে যারা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলেছে। (সূরা আন'আম, আয়াত: ১২)
যে কেউ খারাপ কাজ করবে তাকে অধোমুখে নিক্ষেপ করা হবে অগ্নিতে, এবং ওদেরকে বলা হবে তোমরা যা করতে তারই প্রতিফল তোমরা ভোগ করছ। (সূরা নাম্ল, আয়াত: ৯০)
তোমরা সৎকাজ করলে তা করবে নিজেদের জন্যে এবং মন্দ কাজ করলে তাও করবে নিজেদের জন্য। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ৭)
আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি। আর আমার দয়া-তা তো প্রত্যেক বস্তুতেই প্রাপ্ত। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬)
তোমাদের অমঙ্গল তোমাদেরই। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১৯)
বল-তোমরা আমার প্রতিপালককে না ডাকলে তাঁর কিছু আসে যায় না। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ৭৭)
কিন্তু আল্লাহ তাদের কোনো ক্ষতি করেননি; তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে। (সূরা নহল, আয়াত: ৩৩)
উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কী হতে পারে? (সূরা রহমান, আয়াত: ৬০)
আল্লাহ যা ইচ্ছা বাতিল করেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন এবং তাঁরই কাছে আছে কেতাবের মূল। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩৯)
এমনকি কোরআনে বলা হয়েছে যে মানবদেহকে এবং এমনকি বিশ্বজগৎটাকেই সৃষ্টি করা হয়েছিল ছয়টি ধাপে ফেলে, বিবর্তনের মাধ্যমে।
হে মানুষ। পুনরুত্থান সম্বন্ধে যদি তোমরা সন্দেহপূর্ণ হও, (তাহলে চিন্তা কর) আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর শুক্রবিন্দু থেকে, তারপর রক্তপিণ্ড থেকে, তারপর পূর্ণ বা অপূর্ণ আকৃতিবিশিষ্ট মাংসপিণ্ড থেকে। যেন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেই (তোমরা কিভাবে জীবন লাভ করেছ এবং কিভাবে মৃত্যুর পর আবার পুনরুত্থিত হবে)। আমি যা ইচ্ছা করি, তা এক নির্দিষ্টকালের জন্য মাতৃগর্ভে রেখে দিই, তারপর আমি তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি, যেন তোমরা নিজ নিজ যৌবনে উপনীত হতে পার। তোমাদের মধ্যে (শিশু অবস্থায়) কারো কারো মৃত্যু ঘটে এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে রোগগ্রস্ত করা হয়, যার ফলে তারা যা জানত সে সম্বন্ধে তারা ভুলে যায়। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৫)
তুমি বল, তোমরা কি তাকে অস্বীকার করবেই—যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দুদিনে, এবং তোমরা তার সমকক্ষ দাঁড় করাতে চাও? তিনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক! তিনি ভূ-পৃষ্ঠে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, এবং পৃথিবীতে রেখেছেন কল্যাণ এবং চারদিনের মধ্যে এতে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। সমানভাবে সকলের জন্য, যারা এর অনুসন্ধান করে। অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন, যা ছিল ধূম্রপুঞ্জ বিশেষ। অনন্তর তিনি ওকে (আকাশকে) এবং পৃথিবীকে বললেন— তোমরা উভয়ে ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় হোক—আমার আদেশ পালনের জন্য প্রস্তুত হও। ওরা বলল আমরা তো আনুগত্যের সাথেই প্রস্তুত আছি। অতঃপর তিনি আকাশমণ্ডলীকে দুদিনে সপ্ত আকাশে পরিণত করলেন; এবং প্রত্যেক আকাশের নিকট তার কর্তব্য ব্যক্ত করলেন এবং তিনি প্রথিবীর নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত এবং সুরক্ষিত করলেন। এসব পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহ কর্তৃক সুবিন্যস্ত। (সূরা হা-মীম-আস্ সিজদাহ, আয়াত: ৯-১২)
এভাবে দেখা যায় যে গোটা সৃষ্টিকুলের একটা অংশের জন্য যেমন রয়েছে একটা সাময়িক (যুগের) কেন্দ্র বা আঞ্চলিক কেন্দ্র, তেমনি একাধিক আঞ্চলিক বা সাময়িক কেন্দ্রেরও রয়েছে বৃহত্তর কেন্দ্র—এরূপ একাধিক বৃহত্তর কেন্দ্রেরও রয়েছে কেন্দ্র। এভাবে সৃষ্টি প্রক্রিয়াকে আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন বৃত্ত আকারে, যেখানে রয়েছে বৃত্ত, তাকে ঘিরে বৃত্ত, তাকে ঘিরে বৃত্ত, তাকে ঘিরে বৃহত্তর বৃত্ত, তাকে ঘিরে ... অসীম পর্যন্ত সময়ের সাথে ধাবমান এই সব বৃত্তের দ্বারা বৃত্তকে মুড়ে দেয়ার প্রক্রিয়া। ফলে বিশেষ কোনো অবস্থার যেমন একটা তাৎক্ষণিক কেন্দ্র রয়েছে, তেমনি বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যাবে যে সেই কেন্দ্রই চূড়ান্ত নয়, সেই ক্ষুদ্র বৃত্ত এমন এক বৃহত্তর বৃত্তের অংশ যার রয়েছে ভিন্ন কেন্দ্র ... ইত্যাদি। তীব্র এবং উদ্ভিদের ফসিলের আকৃতির ক্রমবিবর্তনকে অধ্যয়ন ক'রেও আমরা দেখতে পাই যে প্রতি ক্ষেত্রেই রয়েছে একই জাতীয় আকৃতির (Form) পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন, কোরআনে যার প্রতি লক্ষ্য করতে বলা হয়েছে*:
বল—পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং অনুধাবন কর কিভাবে তিনি সৃষ্টি আরম্ভ করেছেন। (সূরা আনকাবুত, আয়াত : ২০)
নিশ্চয় তোমরা এক স্তর থেকে অন্যস্তরে আরোহন করবে। (সূরা ইনশিক্বাক, আয়াত: ১৯)
কেন্দ্রের এই ধারাবাহিক পরিবর্তনশীলতা এবং লক্ষ্য-চালিত গতিবিধি থেকে কী অনুমান করা যায়? গণিত বলে যে অসীম সংখ্যক কেন্দ্রের এই ধারটা (Series) উৎপন্ন হয়েছে একটা কেন্দ্র থেকে এবং সমাপ্ত হয়েছে সেই একই কেন্দ্রে। এই সার্বিক কেন্দ্রটা দৃশ্য এবং অদৃশ্য, প্রকাশ্য এবং গুপ্ত সব বাস্তবতাকে গ্রাস ক'রে রেখেছে। কিন্তু দৃশ্য বা প্রকাশিত বাস্তবতার স্থান এবং কাল দ্বারা সীমিত ব'লে তার প্রকাশিত কেন্দ্র একটা। কেন্দ্র মানেই হলো সব ক্রিয়াকাণ্ডের উৎস এবং লক্ষ্য। যেমন, পদার্থবিদ্যার একটা সরলতম উদাহরণ নেয়া যাক: একটা সুতোকে আঙুলে বেঁধে তার অপর প্রান্তে একটা আংটি বেঁধে আংটিটাকে যে-কোনো দিকে বৃত্তাকারে ঘুরাতে থাকলে দুটো বলের সৃষ্টি হবে—
একটা কেন্দ্রমুখী বল (Centripetal Force) F1, যা আংটিটাকে কেন্দ্রের দিক বরাবর টানবে, এবং একটা কেন্দ্রবিমুখী বল (Centrifugal Force) F2, যা আংটিটাকে কেন্দ্রের ঠিক উল্টো দিক বরাবর ঠেলবে। এই টানা এবং ঠেলা (Push & Pull) ঘটবে কেন্দ্র বরাবর একই সরলরেখায়— অন্য কথায়, তাদের উভয়ের মিলিতক্রিয়ার লক্ষ্য এবং উৎস হলো একই কেন্দ্র—F2 এর উৎস যে কেন্দ্র, সেই কেন্দ্রই হলো F1 এর লক্ষ্য। উভয় বলের মান সমান এবং বিপরীতমুখী ব'লে বৃত্তটা গঠিত হতে পেরেছে। কিন্তু F2 ভেতর থেকে বাইরে এসেছে ব'লে, তার আত্মচেতনা বহির্মুখী ব'লে, সে তার কেন্দ্রকে খুঁজছে বাইরে কোথাও— তাঁর প্রক্রিয়ার বহির্মুখীতার মায়ার মধ্যে হারিয়ে গেছে কেন্দ্রটা। অথচ তারই যে-ধারা উল্টোদিকে ক্রিয়াশীল, সেই আসল ধারা, F1, সব সময়েই তার কেন্দ্রের মুখোমুখী হয়ে ক্রিয়াশীল থাকে এবং সে তার কেন্দ্রকে চিনতে ভুল করে না।
আমরা আমাদের বহির্মুখী আমিত্বকে যদি যথাযথ আমলের দ্বারা ঠেলে ভেতরমুখী করতে পারতাম তাহলে আমরা আমাদের আমিত্বের এমন এক ধারার সাক্ষাৎ পেতাম যা তার উৎস এবং লক্ষ্যকে, সেই মহাকেন্দ্রকে চেনে।
তাঁরই আদেশে আসমান ও জমিনের স্থিতি (ভারসাম্য)। (সূরা, রুম, আয়াত: ২৫)
কিন্তু আত্মজাহিরী অহংকারী জ্ঞানী একথা জেনেও এই জ্ঞান জীবনের কাজে লাগাতে পারবে না। কারণ তার জন্য দরকার আমিত্বকে ত্যাগ করা; তা করতে পারলে তা ক্ষণস্থায়ী মায়ার বাস্তবতা থেকে মুক্তি পেয়ে পৌঁছে যাবে চিরস্থায়ী শ্বাশ্বত বাস্তবতায়, যেখানে আর জন্ম নেই, মৃত্যু নেই, নেই কোনো দুঃখ-কষ্ট-অবসান-আফসোস-হতাশা।
যাহোক, দৃশ্য বাস্তবতার যে-কেন্দ্র, অদৃশ্য বাস্তবতারও সেই কেন্দ্র। কারণ আল্লাহ এক। তিনি কখনও দুই নন। শুধু পার্থক্য হলো এটাই যে অদৃশ্য পরম বাস্তবতা কেন্দ্রের মুখোমুখী হয়ে আবর্তনশীল এবং দৃশ্যমান বাস্তবতা কেন্দ্রের দিকে পিছু ফিরে তার ছায়ার চারদিকে আবর্তনশীল। কিন্তু আল্লাহই কোরআনে বলেছেন: তিনিই গুপ্ত, তিনিই ব্যক্ত; তিনিই আদি, তিনিই অন্ত।
তিনি আদি, তিনি অন্ত, তিনি ব্যক্ত, তিনি গুপ্ত, এবং তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত। (সূরা হাদীদ, আয়াত: ৩)
আকাশ এবং পৃথিবী উভয়স্থানেই তিনি আল্লাহ। (সূরা আন'আম, আয়াত: ৩)
তবুও তিনি দুই নন, এক। দোষ তাঁর নয়-মায়াচ্ছন্ন চোখের। চোখ যখন বাস্তবতার নির্দেশিত পথে ক্রিয়াশীল না হয়ে ভ্রান্ত পথ বেছে নেয়, তখন তা প্রতি মুহূর্তে ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্রে নিজেকে খুঁজে পায়, যেমনটা দেখা যাচ্ছে নিচের চিত্রে:
কেন্দ্রবিমুখী বল F2 মূলত কেন্দ্র-ভ্রান্ত এবং লক্ষ্যভ্রষ্ট এক বিদ্রোহী খর্বিত আমিত্ব। সে তার অবস্থান বিন্দুর পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত কেন্দ্রের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়। সে তার একত্ব হারিয়ে বহুধাবিভক্ত হয়েছে। এই বিভ্রান্তি শুরু হয়েছিল ইবলিস দ্বারা প্রতারিত হয়ে আদম (আঃ) এবং হাওয়া (আঃ) যখন নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়েছিলেন তখন। ইঞ্জিল শরীফে বর্ণিত আছে যে তাঁরা জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেয়েছিলেন। কোরআনেও বর্ণিত হয়েছে যে ইবলিস তাঁদেরকে জ্ঞান এবং অনন্ত জীবনের লোভ দেখিয়েছিল। এই সূত্র ধ'রে কপটাচারী অহংকারী নাস্তিক এবং আত্মজাহিরকারী লেখক- কবি সম্প্রদায় তাদের জ্ঞানের তীব্রতা সামলাতে না পেরে এর মধ্যে প্রচ্ছন্ন বিদ্রোহের আগুনের সেঁকা খেয়ে দপ্ ক'রে জ্ব'লে উঠে ব'লে বসেন-তাহলে ইবলিসই ভালো; আল্লাহ চাননি যে মানুষ জ্ঞানী হোক, অথচ ইবলিস মানুষকে জ্ঞানের পথটা দেখিয়ে দিয়েছিল। প্রমিথিউস আগুন চুরি ক'রে (এখানে আগুন হলো জ্ঞানের প্রতীক) শাস্তি খেয়েছিল-আমরাও সেই জ্ঞানের পথের পথিক।- এভাবে তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। কিন্তু নির্বোধ ছাড়া আর সবাই একথা বোঝে যে ইবলিস তাদের আল্লাহর মুখোমখি হয়ে থাকা অখণ্ড আত্মচেতনাকে খণ্ডিত ক'রে জড়োদেহমুখী ক'রে দিয়েছিল, যার ফলে তারা আবিষ্কার করতে পারলেন যে তারা মূলত দেহসার দুটো জীব ছিলেন, যাদের পারস্পরিক বন্ধনের উছিলা হিসেবে আল্লাহর করুণা এবং একত্বকে বাদ দিলে বাকি থাকে কেবল নগ্ন দেহভিত্তিক যৌনতা, যা তাঁদের কাজে উন্মুক্ত হয়ে পড়াতে তাঁরা যারপরনাই লজ্জিত হলেন: তাঁরা বুঝতে পারলেন যে তারা খণ্ড আত্মচেতনাকে অবলম্বন ক'রে কেন্দ্রবিমুখী হ'য়ে পড়েছেন। এখন নিজেদেরকে বহির্মুখী অবস্থায় শতধাবিভক্ত ক'রে পাস্পরিক কলহ-বিবাদে জড়িয়ে পড়া ছাড়া তাদের আর কোনো পথ নেই। কি অভিশাপ! নিজেকে খণ্ড খণ্ড ক'রে নিজেরই খণ্ড আমিত্বের পক্ষে রায় দিতে গিয়ে নিজেদেরই বিরুদ্ধে খুন- খরাবি-হিংসা-লালসায় মত্ত হতে হবে:
শয়তান যা নিক্ষেপ করে, তিনি তা পরীক্ষাস্বরূপ করেন-তাদের জন্য যাদের অন্তরে ব্যধি আছে, যারা পাষাণ হৃদয়। সীমালঙ্ঘনকারীরা অশেষ মতভেদে আছে। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৫৩)
অতঃপর আমি বললাম হে আদম! (ইবলিস) তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু; সুতরাং সে যেন কিছুতেই তোমাদেরকে বেহেস্ত থেকে বের ক'রে না দেয়, দিলে তোমরা কষ্ট পাবে। তোমার জন্য এটাই থাকল যে, তুমি বেহেস্তে ক্ষুধার্ত হবে না ও বস্ত্রহীন (বা নগ্ন) হবে না। সেখানে পিপাসার্ত হবে না, এবং রৌদ্র-ক্লিষ্টও হবে না। অতঃপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিল; সে বলল-হে আদম! আমি কি তোমাকে ব'লে দেব অনন্ত জীবন দায়ী বৃক্ষের কথা ও অক্ষয় রাজ্যের কথা? অতঃপর তারা তার ফল খেল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল, এবং তারা উদ্যানের গাছের পাতা দিয়ে নিজেদেরকে আবৃত করতে লাগল। আদম তার প্রতিপালকের অবাধ্য হলো, ফলে সে পথভ্রষ্ট হলো। এরপর তার প্রতিপালক তাকে মনোনীত করলেন, তার প্রতি ক্ষমাপরবশ হলেন এবং তাকে পথ দেখালেন। তিনি বললেন-তোমরা একে অপরের শত্রুরূপে একই সাথে বেহেস্ত থেকে নেমে যাও। (সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১১৭-১২৩)
তখন শয়তান তাদেরকে বেহেস্তের বাগান থেকে নামিয়ে ছাড়ল, এবং তাদেরকে আনন্দময় অবস্থা থেকে বের ক'রে আনল যাতে তারা অবস্থান করছিল। আমি বললাম। “নেমে যাও সবাই, একে-অপরের মধ্যে শত্রুতা নিয়ে। কিছু সময়ের জন্য পৃথিবী হবে তোমাদের আবাসভূমি এবং রুজি-রোজগারের স্থান।" (সূরা বাকারা, আয়াত: ৩৬)
কিন্তু আল্লাহ তাদের কোনো ক্ষতি করেননি; তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে। (সূরা নহল, আয়াত: ৩৩)
তোমাদের অমঙ্গল তোমাদেরই। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১৯)
তোমরা সৎকাজ করলে তা করবে নিজেদের জন্যে এবং মন্দ কাজ করলে তাও করবে নিজেদের জন্য। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ৭)
যে সৎ কাজ করে, সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে, এবং কেউ মন্দ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। তোমার প্রতিপালক তাঁর দাস-দাসীদের প্রতি কোন জুলুম করেন না। (সূরা হা-মীম-আস্ সিজদাহ্, আয়াত: ৪৬)
মানুষের এই স্ববিরোধী আচরণের কারণ হলো আল্লাহর একত্ব এবং শ্বাশ্বত স্বভাবধর্ম সম্বন্ধে তার স্মৃতিলোপ এবং অনীহা। সব মানুষের হৃদয় হওয়া উচিত ছিল একটাই। অথচ মানুষ আজ শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত।
তোমাদের সকলের সৃষ্টি এবং পুনরুত্থান একটামাত্র প্রাণীর সৃষ্টি এবং পুনরুত্থানেরই অনুরূপ।
তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মে প্রতিষ্ঠিত কর। আল্লাহর স্বভাবের অনুসরণ কর, যে- স্বভাব অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর স্বভাবের কোনো পরিবর্তন নেই- এটাই সরল চিরস্থায়ী দ্বীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই (তা) জানে না। বিশুদ্ধ চিত্তে তাঁরই অভিমুখী হও; তাকে ভয় কর, নামাজ কায়েম কর ... (সূরা রুম, আয়াত: ৩০-৩১)
এতকাল অসীম বৈচিত্র্য এবং বহুত্ব ছিল তাঁদের স্বভাবের অংশ, তৃপ্তির ভিত্তি, এবং পূর্ণতার নিদর্শন। কারণ সব বহুত্ব এবং বৈচিত্র একই ঐক্যের বা তাওহীদের সুতোয় হৃদয়ের সাথে বাঁধা ছিল। আজ সেই বৈচিত্র্য ভেতর থেকে বাইরে প্রকাশিত হয়ে পড়ল।
হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যেন তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)
কিন্তু তাতে কোনো সমস্যা হতো না, যদি প্রত্যেক খণ্ড মানবের অমিত্ব বহির্মুখী কাল্পনিক বৃত্তের কেন্দ্রমুখী হয়ে স্বার্থপর এবং অহংকারী হয়ে না উঠত।
তাঁরা তাঁদের ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেন। আল্লাহ তাঁদেরকে ক্ষমা চাওয়ার সঠিক পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়ে নির্দিষ্ট কালের জন্য পৃথিবীতে অবস্থান করার আদেশ দিলেন, যে-মেয়াদের পর তাঁদেরকে এবং তাঁদের সন্তানদেরকে আবারও বাধ্যতামূলকভাবে কেন্দ্রমুখী হতে হবে।
রাব্বানা জ্বলামনা আংফুসানা অইল্লাম্স্তাগফিরলানা অতারহামনা লা-না কুনান্না মিনাল খছিরুন। অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নক্সের ওপর জুলুম করেছি। যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না কর, আমাদের প্রতি দয়া না কর, তাহলে অবশ্যই আমরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যাব।
তাঁদের তথা গোটা মানবজাতির নিয়তি এমনভাবে নির্ধারিত হলো যে, যে-কেউ বহির্মুখী থাকা অবস্থায় তার প্রকৃত কেন্দ্রকে ভুলে না যাবে, সে পরম বাস্তবতায় ফিরে গিয়ে আল্লাহর সাক্ষাতে লজ্জিত হবে না:
ইউনুস রসূলগণের অন্তর্ভুক্ত ছিল। যখন সে পরিপূর্ণ নৌকার দিকে পলায়ন করেছিল, তখন তার ভাগ্য নির্ণয় কর হলো, ফলত সে (সমুদ্রে) নিক্ষিপ্তগণের অন্তর্গত হলো। পরে এক বৃহদাকার মৎস তাকে গিলে ফেলল, তখন সে ধিক্কারযোগ্য। সে যদি আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা না করত, তাহলে তাকে মাছের পেটে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত থাকতে হতো। (সূরা সাফ্ফাত, আয়াত: ১৩৯-১৪৪)
তোমাদের নিটক শাস্তি আসার আগেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের দিকে মুখ ফিরাও এবং তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ কর। শান্তি এসে পড়লে সাহায্য পাবে না। তোমাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের ওপর অতর্কিতভাবে শাস্তি আসার আগেই তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালক যে উত্তম কেতাব অবতীর্ণ করেছেন তার অনুসরণ কর, যেন (পরে) কাউকে বলতে না হয়-হায়! আল্লাহর প্রতি আমার কর্তব্যে আমি তো শৈথিল্য করেছি এবং আমি ঠাট্টবিদ্রূপ করতাম। অথবা কেউ যেন না বলে-আল্লাহ আমাকে পথপ্রদর্শন করলে আমি তো অবশ্যই সংযমীদের অন্তর্গত হতাম। (সূরা যুমার, আয়াত: ৫৪-৫৭)
আমি তোমাদের মধ্যে একজনকে অপরের পরীক্ষাস্বরূপ করেছি। তোমারা ধৈর্যধারণ করবে কি? তোমার প্রতিপালক সবকিছু দেখেন। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ২০)
আমি প্রত্যেক জনপদে অপরাধীদের প্রধানদেরকে সেখানে চক্রান্ত করার অবকাশ দিয়েছি; কিন্তু তারা নিজেদের বিরুদ্ধে ছাড়া চক্রান্ত করে না। কিন্তু তারা তা বুঝতে পারে না। (সূরা আন'আম, আয়াত: ১২৩)
কখন কেয়ামত হবে তা কেবল আল্লাহই জনেন। তিনি ... জানেন যা জরায়ুতে আছে; কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে, এবং কেউ জানে না কোন দেশে তার মৃত্যু ঘটবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ। (সূরা লোকমান, আয়াত: ৩৪)
... আমি অবিশ্বাসীদের দৃষ্টিতে তারা যা করছে তা শোভনীয় করেছি। (সূরা আন'আম, আয়াত: ১২২)
আল্লাহ বিশ্বাসীদের মনোরোগ নিরাময় ক'রে দেবেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ১৪)
আমি তাদের ভোগান্তিকে/দুঃখ-কষ্টকে সমৃদ্ধিতে রূপান্তরিত ক'রে দিয়েছিলাম। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৯৫)
নিশ্চয়ই আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত বিশ্রামের প্রশান্তি পায়। (সূরা রা'দ, আয়াত: )
আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে আগেই যে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন, তোমরা যদি তাতে বিশ্বাসী হও, তাহলে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে কে সে তোমাদের বাধা দেয়? (সূরা হাদীদ, আয়াত: ৮)
আল্লাহ কখনও তার বান্দাদের সাথে অন্যায় আচরণ করেন না। (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫১)
যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ১০৮)
তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, তাই আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গেছেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৬৭)
যে অবিশ্বাস করে, অবিশ্বাসের জন্য সেই দায়ী; যারা সৎকাজ করে তারা নিজেদের জন্যই রচনা করে সুখশয্যা। কারণ যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে পুরস্কৃত করেন। (সূরা রুম, আয়াত: ৪৪-৪৫)
তারা অন্যদেরকে এ (কোরআন) থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, এবং নিজেদেরকেও; কিন্তু তারা তো শুধু নিজেদের আত্মাকেই ধ্বংস করে, কিন্তু তারা তা বোঝে না। (সূরা আন'আম, আয়াত: ২৬)
হে মানবজাতি, তোমাদের ঔদ্ধত্য তোমাদেরই বিরুদ্ধে যায়। (সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৩)
হে মানুষ! নিশ্চয় তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে কঠোর সাধনায় সাধনা কর, তবে তার দর্শন লাভ করবে। (সূরা ইনশিক্বাক, আয়াত: ৬)
যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর শান্তি থেকে সাবধান থাকে, তারাই সফলকাম। (সূরা নূর, আয়াত: ৫২)
যে ব্যক্তি তওবা করে ও সৎকাজ করে সে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অভিমুখী হয়। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ৭১)
যারা আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর শান্তি থেকে সাবধান থাকে তারাই সফলকাম। (সূরা নূর, আয়াত: ৫২)
তোমাদের প্রতিপালক বলেন—তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব; যারা অহংকারে আমার নামে বিমুখ, তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (সূরা মুমিন, আয়াত: ৬০)
তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণে স্মরণ কর। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৪১)
তারা ক্ষমাপ্রার্থনা (তওবা) করলে তাদের জন্য কল্যাণ হবে, কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে-আল্লাহ তাদের ইহকালে ও পরকালে যন্ত্রণাপ্রদ শাস্তি দেবেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৭৪)
কিন্তু যে-কেউ তাঁর কাল্পনিক বহির্মুখী বৃত্তের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ ক'রে ঘুরবে, অর্থাৎ উদ্‌ভ্রান্ত আমিত্বকে এবং উচ্ছৃঙ্খল আশা-আকাঙ্খাকে উপাসক বানিয়ে নেবে, সার্বিক ভারসাম্যের কথা বিবেচনায় আনবে না, সে যখন কেন্দ্রমুখী হবে তখন তার কেন্দ্র প্রকৃত কেন্দ্রকে বিকর্ষণ করবে ব'লে সে নিজেরই আমিত্ব দ্বারা নির্মিত দোজখের আগুনে পুড়তে থাকবে।
আল্লাহ সর্বদাই করূণাময়। তাঁর করুণা তাঁর আক্রোশকেও অতিক্রম ক'রে যায়। তাঁর ভালোবাসাই কারো জন্য বেহেস্ত, কারো জন্য দোজখ। বিড়ালকে ভালোবাসা মানে ইঁদুরের মৃত্যুর কারণ হওয়া; অপরপক্ষে ইঁদুরকে ভালোবাসা মানে বিড়ালের অনাহারে থাকার কারণ হওয়া। তিনি সবাইকে একই কাতারে থাকতে বলেছেন। আমরা কাতারচ্যুত হলে সে দায়-দায়িত্ব আমাদের। তিনি পরকালে তার করুণাই প্রকাশ করবেন। কিন্তু তা তাদের জন্য আক্রোশ হয়ে দেখা দেবে যাদের পেটে ঘি সয় না। সে দোষ আল্লাহর নয়। তিনি সকল দোষ এবং প্রশ্নের উর্দ্ধে:
দয়া করাকে তিনি তাঁর কর্তব্য হিসেবে স্থির করেছেন। কেয়ামতের দিন অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে একত্রিত করবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারাই অবিশ্বাস করবে যারা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলেছে। (অর্থাৎ তিনি সবাইকে একত্রিত করবেন তাঁর দয়ার আকর্ষণ দ্বারা, কিন্তু সেই দয়ার দান গ্রহণ করার উপযুক্ত যে হয়নি, সে নিজেরই সৃষ্ট নরকে নিজে পুড়বে।) (সূরা আন'আম, আয়াত: ১২)
আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি। আর আমার দয়া-তা তো প্রত্যেক বস্তুতেই প্রাপ্ত। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬)
তুমি কখনও আল্লাহর বিধানে কোনো পরিবর্তন পাবে না। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৬২)
আমি কাউকেই তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপাই না। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৪২)
যারা বিশ্বাসী তারা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখুক। (সূরা মাঈদা, আয়াত: ১১)
হে মানবজাতি, তোমাদের ঔদ্ধত্য তোমাদেরই বিরুদ্ধে যায়। (সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৩)
তিনি যা করেন সে ব্যাপারে তাঁকে প্রশ্ন করা যাবে না, বরং ওদেরকে প্রশ্ন করা হবে। (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ২৩)
বুঝাই যাচ্ছে যে আল্লাহ মানুষকে একত্র করবেন তাঁর দয়ার আকর্ষণ দিয়েই, অথচ সেই দয়াই কতক লোকের জন্য শাস্তি স্বরূপ হবে। ধরুন এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু তার ভালোবাসা এবং সরলতার সুযোগ নিয়ে তার উদ্‌ভ্রান্ত স্ত্রী অন্য এক পুরুষের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ক’রে তা চালু রাখতে থাকে। কিন্তু তার স্বামী সব জেনেও না জানার ভান করে এবং তাকে দ্বিগুণ ভালোবাসতে থাকে। এক পর্যায়ে তার স্ত্রী তার ভুল বুঝতে পারে এবং আগের পথে ফিরে যায়। সে তার ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং স্বামীর সাথে স্বাভাবিক হওয়ার জন্য কিছু শাস্তিও মনে মনে কামনা করে। কিন্তু তার স্বামী তাকে শাস্তি দেয়া তো দূরে থাক, আরো বেশি ক'রে ভালোবাসতে থাকে। ফলে লজ্জাহত স্ত্রীলোকটার কাছে স্বামীর এই ভালোবাসাই অসহনীয় শাস্তি ব'লে মনে হতে থাকে। সে তার বিবেকের এবং স্বামীর ভালোবাসার আগুনে জ্বলতে থাকে। প্রায়শ্চিত্ত ছাড়া তার পক্ষে আর স্বাভাবিক হবার কোনো উপায় নেই। ফলে সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
আল্লাহ সবাইকে ভালোবাসেন। তা তিনি কোরআনেও ঘোষণা করেছেন :
আল্লাহ কখনও তার বান্দাদের সাথে অন্যায় আচরণ করেন না। (সূরা আনফাল, আয়াত : ৫১)
আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি। আর আমার দয়া—তা তো প্রত্যেক বস্তুতেই প্রাপ্ত। (সূরা আ'রাফ, আয়াত : ১৫৬)
যেদিন আকাশ মেঘাপুঞ্জসহ বিদীর্ণ হবে এবং ফেরেস্তাগণকে নামিয়ে দেয়া হবে, সেদিনই প্রকৃত কর্তৃত্ব হবে দয়াময়ের এবং সত্য প্রত্যখ্যানকারীদের জন্য সেদিন হবে কঠিন। (সূরা ফোরকান, আয়াত : ২৫-২৬)
শেষোক্ত আয়াতের প্রতি বিশেষ নজর দেয়া চাই। এখান থেকেই বুঝা যাচ্ছে যে তিনি প্রকৃত কর্তৃত্ব ফিরিয়ে নেবেন তাঁর ভালোবাসা এবং দয়ার শক্তি দ্বারা, আক্রোশের নয়, কিন্তু অকৃতজ্ঞ হৃদয় পরকালে তাঁর এই ভালোবাসার বিপরীতে নিজের মধ্যে দোজখের আগুন দেখতে পাবে। তখন যে প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য বারবার মৃত্যু চাইবে, কিন্তু সে সুযোগ আর থাকবে না :
আজ তোমরা একবারের জন্য ধ্বংস কামনা ক'র না, বহুবার ধ্বংস কামনা করতে থাক। (সূরা ফোরকান, আয়াত : ১৪)
কেন্দ্র সর্বদাই আকর্ষণ করে, কখনও বিকর্ষণ করে না। কেন্দ্র সর্বদাই ভালোবাসে, কখনও দূরে ঠেলে না। কিন্তু বহির্মুখী আত্মচেতনা সেই ভালোবাসাকে অস্বীকার করতে করতে নিজের মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে যা পরবর্তীতে কেন্দ্রমুখী হলে দোজখের আগুনের রূপ নেয়। তখন কেন্দ্রের ভালোবাসার তীব্রতা তার কল্পিত কেন্দ্রের আগুনের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়।
দয়া করাকে তিনি তাঁর কর্তব্য হিসেবে স্থির করেছেন। কেয়ামতের দিন অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে একত্রিত করবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারাই অবিশ্বাস করবে যারা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলেছে। (সূরা আন'আম, আয়াত : ১২)
সে আগুনে নিজে পোড়া ছাড়া অন্যকে তার ভাগ দেয়ার কোনো উপায় নেই। আল্লাহ ছাড়া তখন কেউই সহায় হবে না। কোরআনে তাই তো বলা হয়েছে:
তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণে স্মরণ কর। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৪১)
তারা ক্ষমাপ্রার্থনা (তওবা) করলে তাদের জন্য কল্যাণ হবে, কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে-আল্লাহ তাদের ইহকালে ও পরকালে যন্ত্রণাপ্রদ শাস্তি দেবেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৭৪)
তোমাদের প্রতিপালক বলেন- তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব; যারা অহংকারে আমার নামে বিমুখ, তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (সূরা মুমিন, আয়াত: ৬০)
তোমাদের উপাস্যই একমাত্র উপাস্য, সুতরাং যারা পরলোকে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর সত্য-বিমুখ এবং তারা অহংকারী। এ নিঃসন্দেহ যে, আল্লাহ জানেন যা ওরা গোপন করে এবং যা ওরা প্রকাশ করে। তিনি অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা নহল, আয়াত: ২২-২৩)
অর্থাৎ আমাদের স্বেচ্ছাচারী, অহংকারী আত্মচেতনাই দোজখে পুড়বে, চেতনা নয়। চেতনা বা চৈতন্য হলো সার্বিক বাস্তবতার অখণ্ডিত প্রতিচ্ছবি। মনের আদমীয় স্তরে, বেহেস্ত থেকে পতনের আগে, আত্মচেতনা চেতনার সামগ্রিকতাকে স্বীকৃতি দিত-ফলে তখন অস্তিত্বের ধারণকারী ফর্মুলা ছিল একটাই-তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ব। আদম-হাওয়া (আঃ) আল্লাহর একত্বের রজ্জুতে তাঁর সাথে এমনভাবে বাঁধা ছিলেন যে আল্লাহই ছিলেন তাঁদের নিকটতম প্রতিবেশী, যা হাদীসে বলা হয়েছে। কিন্তু তথাকথিত জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেয়ে আদম-হাওয়া (আঃ) সংকীর্ণ আত্মজ্ঞান লাভ করলেন-তাঁরা আর আল্লাহর সাথে লীন হয়ে বা প্রেমপূর্ণভাবে আবদ্ধ হয়ে থাকতে পারলেন না। তাদের খণ্ডিত আত্মচেতনার আলোর পেছনে যে প্রখর আগুন ছিল তা তারা টের পেলেন আল্লাহ-কেন্দ্রিকতা ভুলে যাবার পরেই, আগে নয়। তবে এখনও যে-কেউ আল্লাহ কেন্দ্রিক হয়ে তাঁরই দিকে মুখ ক'রে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছে:
ইন্নি অজ্জাহাতু অজিহালিল্লাজি ফাতারাস্ সামাওয়াতি অয়াল আরদা হানীফাও অমা-আনা মিনাল মুশরিকীন।
সে মুক্তি পেয়েছে-কার কবল থেকে? - নিজের আমিত্বের আগুনের কবল থেকে। আমরা নামাজে দাঁড়িয়েই এই আয়াতটা পড়ি। হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর প্রশ্নাতুর মন যখন সৃষ্টিজগতের পুজোর বাসনা ছেড়ে তাঁর ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর দিকে মুখ ক'রে দাঁড়ালেন, তখন তিনি এই শব্দগুলো উচ্চারণ করেছিলেন।
... আমি ইব্রাহীমকে আসমান ও জমিনের পরিচালনা-ব্যবস্থা দেখাই, যেন সে নিশ্চিত বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। তারপর যখন তার ওপর রাত আচ্ছন্ন হলো, তখন সে নক্ষত্র দেখে বলর, এটাই আমার প্রতিপালক। অতঃপর যখন তা অস্তমিত হলো, তখন সে বলল, যা অস্তমিত হয় আমি তা পছন্দ করি না। অতঃপর যখন সে চন্দ্রকে উদিত হতে দেখল, তখন সে বলল, এটাই আমার প্রতিপালক। যখন সেটাও অস্তমিত হলো, তখন সে বলল, আমাকে আমার প্রতিপালক সৎপথ প্রদর্শন না করলে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হব। অতঃপর যখন সে সূর্যকে উদিত হতে দেখল, তখন বলল, এটাই আমার প্রতিপালক। এটাই সর্ববৃহৎ। যখন তাও অস্তমিত হলো, তখন সে বলল-হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যাকে আল্লাহর সমকক্ষ কর, তা থেকে আমি মুক্ত। নিশ্চয় আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁরই দিকে মুখ স্থাপন করলাম যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। এবং আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই। (সূরা আন'আম, আয়াত: ৭৫-৭৯)
আমরা আমাদের ওপরই জুলুম ক'রে থাকি। এজন্য আল্লাহর মুখোমুখী হয়ে আমাদেরকে বিনীতভাবে দোয়া করতে হয়। হযরত আবু বকর (রাঃ) রসুলুল্লাহ (সঃ) কে অনুরোধ করলেন এমন একটা দোয়া শিখিয়ে দিতে যা তিনি নামাজের মধ্যে পড়তে পারবেন। রসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এই দোয়াটা শিখিয়ে দিয়েছিলেন:
আল্লাহুম্মা ইন্নি জ্বালামু নাক্সি জুম্মান কাছিরাও অলাইয়াগফিরুজ্জুনূবা ইল্লা আনতা ফাগফিরলি মাগফিরাতাম্ মিন্ 'ইন্দিকা অরহামনী ইন্নাকা আন্তাল গাফুরুর রহীম।
অর্থ: হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আমার নক্সের ওপর জুলুম করেছি, বড় ধরনের জুলুম। এবং তুমি ছাড়া ক্ষমা করার কেউ নেই। সুতরাং তোমার পক্ষ থেকে আমাকে ক্ষমা ক'রে দাও। এবং আমার প্রতি দয়া কর। নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।
আমাদের আত্মচেতনা সহ গোটা আমিত্বের ধারক ও বাহককে একত্রে বলা হয় নফস বা Soul বা আত্মা। এর জীবনের উৎস হলো রূহ্। এই নক্সের ওপর জুলুম করা মানেই হলো একে কেন্দ্রবিমুখী ক'রে রাখা, পার্থিব বাহ্যিক ভোগলালসায় মত্ত রাখা।
তাহলে আমরা আবার সেই দেহতত্ত্বে ফিরে যাই। দৃশ্যজগতের সার্বিক ভারসাম্য দ্বারা তার অন্তর্ভুক্ত প্রত্যেকটা ব্যক্তির এবং ব্যবস্থার ভারসাম্য নির্ধারিত। প্রত্যেকটা সাব-সিস্টেমের (যেমন মানুষ, জলবায়ু) রয়েছে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় নিজস্ব চলার পথ। এই গোটা পথটাকেই তার গতিশীলতার ভারসাম্য ব'লে আখ্যায়িত করা যায়। এই ভারসাম্যের অর্থ হলো: কোনো ব্যক্তির নিজস্ব জীবনের পরম উদ্দেশ্য হলো তার নিজস্ব গতিশীলতার ভারসাম্যের পথ ধ'রে চলা। এই পথ ধ'রে চললে তার দেহ-মন-আত্মা ইত্যাদি সার্বিকতার যে সমন্বয় বজায় থাকবে, তার ইহকাল এবং পরকালের জন্য সেটাই সবচেয়ে উত্তম অবস্থা। এর একটু এদিক-ওদিক হলে যে বিচ্যুতি বা অনিয়ম দেখা দেবে তা পূরণ হবে দৈহিক বা মানসিক বা আর্থিক বিপদাপদের আবির্ভাবের মধ্যে দিয়ে, কারণ বিচ্যুতি যদি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম না করে তাহলে ভারসাম্য বিঘ্নিত হয় না, শুধু বিচ্যুতির সাথে সংশ্লিষ্ট একটা উপসর্গের সৃষ্টি হয়ে তার তাৎক্ষণিক খেসারত হয়ে যায়।
উদাহরণস্বরূপ, আপনি এক দিনে ঠান্ডা পানি দিয়ে পাঁচবার গোছল করলেন। সেক্ষেত্রে আপনার জ্বর হতেও পারে। কারণ শরীর থেকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপ বের হয়ে গেছে। জ্বর তো এই তাপের ঘাটতিই পূরণ করছে, নয় কি? তাহলে এক্ষেত্রে জ্বরের কী দোষ? তার যখন আসবার কথা সে তখন এসেছে কিনা এটাই দেখবার বিষয়। জ্বরের মাধ্যমে শরীরে তাপের ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা না থাকলে, অর্থাৎ কোনো ঘাটতিকে পূরণের ব্যবস্থা না থাকলে, স্থায়ী ঘাটতি সৃষ্টি হতে থাকত। এটাই হতো অস্বাভাবিক, উদ্দেশ্যহীনতার লক্ষণ। কিন্তু প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব ভারসাম্যবিন্দু একই সাথে একটা লক্ষ্য এবং একটা উৎস: উৎস এজন্যে যে তা থেকেই ব্যক্তির যাবতীয় আচরণ-ঘাটতির প্রতি সাড়া দেয়া হবে, ফলে তা তার সার্বক্ষণিক শিক্ষক এবং গতিবিধির উৎস, এবং গন্তব্য এ জন্য যে তাকে সেই ভারসাম্যের শর্তকে সর্বদা বজায় রাখার চেষ্ট করতে হবে, নইলে তাকে ঘাটতির কষ্ট পেতে হবে। এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আছে ব'লে আমরা নিশ্চিতভাবে আস্থার সাথে জীবন-যাপন করতে পারি, এই ভেবে যে আমি নিজের প্রতি লক্ষ্য রাখি বা না রাখি, আমার ভারসাম্য আমার দিকে লক্ষ্য রাখছে; আমার কোনো ভুলত্রুটি হয়ে গেলে সে আমাকে রোগ-ব্যাধির মাধ্যমে জানিয়ে দেবে। এজন্য রোগ-ব্যাধিকে হাদিসে দেহের সাদকা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে-তা আচরণের ত্রুটির খেসারত বা সাদকা স্বরূপ।
সঠিক আচরণবিধি থেকে যত ধরনের বিচ্যুতি হয়ে থাকে তাদেরকে নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা যায়:
ভ্রান্তি-যা ব্যক্তি স্বেচ্ছায় করে না
ত্রুটি-যা ব্যক্তি স্বেচ্চায়, সচেতনভাবে করে।
এদের মধ্যে প্রথম বিচ্যুতির ফল পরকালে পৌঁছায় না ব'লে তার সমস্তটুকু ইহজীবনেই ভোগ করতে হয়। দ্বিতীয় ধরনের ভুল মনের কপটতা এবং পাপ-প্রবণতা থেকে উদ্ভূত হয়। তবুও একটা বিশেষ সীমা (যা সংশ্লিষ্ট পাপের জঘন্যতা, তা থেকে উদ্ভূত ক্ষতির পরিমাণ, ক্ষতিগ্রস্ত লোকের সংখ্যা, ক্ষতির প্রকৃতি পাপকারীর অন্যান্য ভালোকাজের প্রকৃতি এবং পরিমাণ, ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীল) অতিক্রম করার আগ পর্যন্ত তা চূড়ান্তভাবে পরকালের খাতায় লেখা হয় না, তার ফলকে ব্যক্তির ওপর ইহকালে বিভিন্ন বিদাপদের মাধ্যমে চাপানো হয়। বিপদ চাপানো মানেই হলো ভারসাম্যকে ঠিক রাখা-ব্যক্তিকে সম্মানের গদি থেকে নামিয়ে দেয়া হয় না, কেবল জরিমানা করা হয় মাত্র। যেমন, হযরত সুফিআন সওরী (রঃ) মারা গেলে আল্লাহ তাঁকে বললেন-তুমি অত কাঁদতে কেন? তিনি জবাব দিলেন-তুমি আমাকে ক্ষমা কর কিনা সেই ভয়ে। আল্লাহ বললেন-লজ্জা করতো না কাঁদতে? তুমি জানতে না যে আমি পরম করুণাময়? তোমার কান্না দেখে আমি তো লেখককে আদেশ ক'রে দিয়েছিলাম তোমার কোনো খারাপ কাজ লিপিবদ্ধ না করতে। কোরআনেও এই অপূর্ব ক্ষমার কথা বলা হয়েছে:
বড় শাস্তির আগে আমি ওদেরকে অবশ্যই ছোট শাস্তি আস্বাদন করাব, যেন ওরা (আমার দিকে) ফিরে আসে। (এটাও এক ধরনের ক্ষমা।) (সূরা সিজদাহ, আয়াত: ২১)
তারা ক্ষমাপ্রার্থনা (তওবা) করলে তাদের জন্য কল্যাণ হবে, কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে-আল্লাহ তাদের ইহকালে ও পরকালে যন্ত্রণাপ্রদ শাস্তি দেবেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৭৪)
অতঃপর আমি বললাম হে আদম! (ইবলিস) তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু; সুতরাং সে যেন কিছুতেই তোমাদেরকে বেহেস্ত থেকে বের ক'রে না দেয়, দিলে তোমরা কষ্ট পাবে। তোমার জন্য এটাই থাকল যে, তুমি বেহেস্তে ক্ষুধার্ত হবে না ও বস্ত্রহীন (বা নগ্ন) হবে না। সেখানে পিপাসার্ত হবে না, এবং রৌদ্র-ক্লিষ্টও হবে না। অতঃপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিল; সে বলল-হে আদম! আমি কি তোমাকে ব'লে দেব অনন্ত জীবন দায়ী বৃক্ষের কথা ও অক্ষয় রাজ্যের কথা? অতঃপর তারা তার ফল খেল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল, এবং তারা উদ্যানের গাছের পাতা দিয়ে নিজেদেরকে আবৃত করতে লাগল। আদম তার প্রতিপালকের অবাধ্য হলো, ফলে সে পথভ্রষ্ট হলো। এরপর তার প্রতিপালক তাকে মনোনীত করলেন, তার প্রতি ক্ষমাপরবশ হলেন এবং তাকে পথ দেখালেন। তিনি বললেন-তোমরা একে অপরের শত্রুরূপে একই সাথে বেহেস্ত থেকে নেমে যাও। (সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১১৭-১২৩)
বল, যারা বিভ্রান্তিতে আছে, দয়াময় তাদেরকে প্রচুর অবকাশ দেবেন। যতক্ষণ না তারা প্রত্যক্ষ করবে যে বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে-তা শাস্তি হোক অথবা কেয়ামত হোক। (সূরা মরিয়ম, আয়াত: ৭৪)
আমি তাদেরকে সময় দিয়ে থাকি। আমার কৌশল অত্যন্ত বলিষ্ঠ। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৮৩)
... আল্লাহ তার কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর যে করুণা বর্ষণ করেছেন তা কখনও পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের মনকে পরিবর্তন না করে ... (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫৩)
যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ১০৮)
যে ব্যক্তি তওবা করে ও সৎকাজ করে সে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অভিমুখী হয়। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ৭১)
আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি। আর আমার দয়া-তা তো প্রত্যেক বস্তুতেই প্রাপ্ত। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬)
কেয়ামতের ঘোষণা না থাকলে ওদের ফলাসালা তো হয়েই যেত। (কিন্তু তিনি তাদের ভুল শোধরাবার সুযোগ দিচ্ছেন।) (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ, আয়াত: ২১)
কারো আয়ু বৃদ্ধি হলে বা হ্রাসপ্রাপ্ত হলে তা তো হয় কেতাব (সংরক্ষিত ফলক) অনুসারে। (এভাবেও তিনি তাঁর করুণা বর্ষণ করেন।) (সূরা ফাতির, আয়াত: ১১)
পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করার আগেই তা লিপিবদ্ধ করি; আল্লাহর পক্ষে এ অতি সহজ। এ জন্য যে, তোমাদের ওপর যা অতীত হয়েছে (অর্থাৎ যা হারিয়েছে), তার জন্য দুঃখিত হয়ো না, এবং তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তার জন্য হর্ষোৎফুল্ল হয়ো না, আল্লাহ উদ্ধত অহংকারীকে ভালোবাসেন না। (সূরা হাদীদ, আয়াত: ২২-২৩)
আমি কি তোমাদের দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে তখন কেউ সতর্ক হবে চাইলে সতর্ক হতে পারতে না? (এই দীর্ঘ জীবনটাই সবচেয়ে বড় করুণা) (সূরা ফাতির, আয়াত: ৩৭)
তুমি [হে মুহাম্মদ (সাঃ)] বল যারা নিজ জীবনের প্রতি জুলুম করেছ, তারা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহর সমস্ত পাপ ক্ষমা ক'রে দেবেন; তিনি নিশ্চয় ক্ষমাশীল, দয়াময়। (সূরা যুমার, আয়াত: ৫৩)
তারা ক্ষমাপ্রার্থনা (তওবা) করলে তাদের জন্য কল্যাণ হবে, কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে-আল্লাহ তাদের ইহকালে ও পরকালে যন্ত্রণাপ্রদ শাস্তি দেবেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৭৪)
...যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে আমি নিশ্চয়ই তাদের মন্দকাজগুলো মিটিয়ে দেব, এবং তাদের কাজের উত্তম ফল দেব। (সূরা আনকাবুত, আয়াত: ৭)
কেউ কোনো সৎকাজ করলে সে তার দশগুণ পাবে এবং কেউ কোনো অসৎ কাজ করলে তাকে শুধু তারই প্রতিফল দেয়া হবে, আর তারা অত্যাচারিত হবে না। (সূরা আন'আম, আয়াত: ১৬০)
কিন্তু ব্যক্তির ঔদ্ধত্য চরমে যেতে থাকলে তার ওপর পার্থিব বিপদাপদ বহুগুণে বর্ধিত ক'রে দেয়া হয়, যেন সে তওবা ক'রে পথে ফিরে আসার সুযোগ পায়:
আমি তোমাদের শান্তি কিছুকালের জন্য রহিত করলে তোমরা তো আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। (সূরা দোখান, আয়াত: ১৫)
মানুষের কৃতকর্মের জন্য জলে স্থলে বিপদ ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে ওদেরকে ওদের কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করানো হয়, যেন ওরা পথে ফিরে আসে। (সূরা রুম, আয়াত: ৪১)
সত্য যদি ওদের কামনা বাসনার অনুগামী হতো, তাহলে আকাশমণ্ডলী পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। (সূরা মোমেনুল, আয়াত: ৭১)
আমি যখন মানুষকে অনুগ্রহের স্বাদ দিই, তখন ওরা ওতে আনন্দিত হয়। এবং ওদের কৃতকর্মের ফলে ওরা দুর্দশাগ্রস্ত হলেই ওরা হতাশ হয়ে পড়ে। (সূরা রুম, আয়াত: ৩৬)
কিন্তু তার পরও যদি ব্যক্তি না বোঝে, কিন্তু সে বিশ্বাসী হয়, তাহলে তাকে আল্লাহ করুণা ক'রে পাশাপাশি বেশি বেশি ভালো কাজ করার সুযোগ ক'রে দিতে পারেন।
কিংবা তিনি যদি মনে করেন যে তাকে মৃত্যু দেবেন বা তার আয়ু বাড়িয়ে দেবেন, তাহলে তাও করতে পারেন।
কারো আয়ু বৃদ্ধি হলে বা হ্রাসপ্রাপ্ত হলে তা তো হয় কেতাব (সংরক্ষিত ফলক) অনুসারে। (সূরা ফাতির, আয়াত: ১১)
প্রকৃতপক্ষে সব কিছুর ক্ষেত্রেই আদেশ আল্লাহর। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩১)
কিন্তু আল্লাহর উদ্দেশ্য থাকে বান্দার পরকালের পথটাকে পিরষ্কার ক'রে রাখা, যদি সে বিশ্বাসী হয়। একটা হাদিসে আছে, আল্লাহ রসুলুল্লাহ (সঃ) কে বলছেন:
আমার কোনো বিশ্বাসী বান্দা যদি পাপ করে তাহলে আমি ইহকালে তাকে রোগ-ব্যাধি অভাব-অনটন ইত্যাদি বিপদাপদ দিয়ে ভ'রে দেই। তাতেও যদি তার পাপ না কাটে, তাহলে তার মৃত্যুর যন্ত্রণা বাড়িয়ে দেই। তাতেও যদি তার পাপ অবশিষ্ট থাকে তাহলে আমি তার কবরের আযাব বাড়িয়ে দেই, যেন তার পরকালের অনন্ত জীবন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
দেখলেন আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের লক্ষ্য কোনদিকে? আমাদের চিন্তা বড়জোর মৃত্যু পর্যন্ত পৌঁছায়, অথচ তাঁর চিন্তা আমাদের পরকাল নিয়ে, যা সচরাচর আমাদের চিন্তায় গাঢ়ত্ব লাভ করতে চায় না, যেহেতু আমরা সবাই বর্তমানটা নিয়েই ব্যস্ত। মানুষ বড়ই অস্থির। তা কোরআনেই বলা হয়েছে। কোরআনে আল্লাহ বলছেন যে, আমাদের মঙ্গল-অমঙ্গল আমাদের অনুভূতির যুক্তিতে ধরা পড়ার নয়।
সত্য যদি ওদের কামনা বাসনার অনুগামী হতো, তাহলে আকাশমণ্ডলী পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। (সূরা মোমেনুল, আয়াত: ৭১)
মানুষ অধিকাংশ ব্যাপারেই বিতর্কপ্রিয়। (সূরা কাহাফ, আয়াত: ৫৪)
তোমরা অনুমান ও নিজেদের স্বভাবের অনুসরণ কর, যদিও তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পথনির্দেশ এসেছে। (সূরা নাজম, আয়াত: ২৩)
আমি কি তোমাকে জানাব কার প্রতি শয়তান অবতীর্ণ হয়? ওরা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটা ঘোর বিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। ওরা কান পেতে থাকে, এবং ওদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। এবং কবিদেরকে অনুসরণ করে তারাই যারা বিভ্রান্ত। তুমি কি দেখ না, ওরা লক্ষ্যহীনভাবে সর্ব বিষয়ে কল্পনা-বিহার ক'রে থাকে। এবং ওরা যা বলে তা করে না। তবে তাদের কথা আলাদা যারা বিশ্বাস করে ও সৎ কাজ করে এবং আল্লাহকে বারবার স্মরণ করে ... (সূরা শুয়ারা, আয়াত: ২২১-২২৭)
তুমি কি দেখো না তাকে যে তার কামনা-বাসনাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তুমি কি মনে কর যে ওদের অধিকাংশ শোনে ও বোঝে? ওরা তো পশুর মতোই, বরং ওরা আরো অধম। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ৪৩-৪৪)
মানুষ যেভাবে কল্যাণ কামনা করে সেইভাবেই অকল্যাণ কামনা করে। মানুষ তার মনে যা আসে তার পরিণাম চিন্তা না ক'রে তার আশু রূপায়ণ কামনা করে। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ১১)
তারাই বিশ্বাসী যারা আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি বিশ্বাস করার পর সন্দেহ পোষণ করে না... (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১৫)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রসুলুল্লাহ (সঃ) কে আরও বলেছেন পূর্ববতী কথাটার ঠিক উল্টো কথাটাও :
কোনো অবিশ্বাসী যখন কোনো ভালো কাজ করে তখন আমি তার পুরস্কারস্বরূপ তাকে সুস্বাস্থ্য, ভোগ-উপভোগের উপকরণ, অঢেল সম্পদ, মান-যশ ইত্যাদি দান করি। কিন্তু তাতেও যদি তার পুণ্য কিছু বাকি রয়ে যায় তাহলে আমি তার মৃত্যুর যন্ত্রণা কমিয়ে দেই। তাতেও যদি তার পুন্য কিছুটা অবশিষ্ট থাকে তাহলে আমি তার কবরের আযাব লাঘব ক'রে দেই, যেন সে পরকালের অনন্ত জীবনে দোজখের আগুনে জ্বলতে পারে।
কি বিস্ময়কর! আসলে এই পদ্ধতিটিই ঢুকানো রয়েছে ভারসাম্যের মধ্যে- ভারসাম্য একটা মজবুত বাক্সের মতো, তাতে আছে কিছু জ্বালানি : আপনি যতটুকু জ্বালানি খারাপ কাজে খরচ করবেন ততটুকুর জায়গা আপনার জন্য দোজখ আকারে সঞ্চিত থাকবে; আর আপনি যতটুকু জ্বালানি পুড়িয়ে ভালো কাজ করবেন, ততটুকু জায়গায় পুন্য সঞ্চিত হবে, যার বিনিময় হলো প্রশান্তি এবং আনন্দ-কিন্তু আপনি যদি আল্লাহকে বা পরকালকে বিশ্বাস না করেন, তাহলে আপনার পুন্যের সবটুকুকে ইহকালে দিয়ে দেয়া হবে; অপরপক্ষে আপনি যদি গভীরভাবে বিশ্বাসী হন, তাহলে আপনার বাক্সটাকে এমনভাবে দুই ভাগে ভাগ করা হবে যেন সব খারাপ কাজের ফল ইহকালের এবং সব ভালো কাজের ফলই পরকালের ভাগে পড়ে। তখন ইহকালে আপনাকে শুধু তাই দেয়া হবে যা না হলে আপনার স্বাভাবিক জীবনধারা ব্যাহত হবে। আল্লাহ কোরআনেই বলেছেন যে, যে-কেউ ইহকাল চায়, তাকে সব প্রাপ্য ইহকালেই দিয়ে দেয়া হয়। এ হলো আল্লাহর করুণা-হয় আমি যা চাচ্ছি তিনি আমাকে তা দিচ্ছেন, না হয় তিনি আমাকে তাই দিচ্ছেন যা পেলে আমি খুশি হব, যা আমার চর্মচক্ষু কখনও দ্যাখেনি, মস্তিষ্ক কখনও কল্পনা করেনি :
কেউই জানে না তার জন্য তার কৃতকর্মের কী নয়ন-প্রীতিকর কী পুরস্কার লুকিয়ে আছে। (সূরা সিজদাহ, আয়াত: ১৭)
তিনি মানুষকে ভালোই বাসেন, মানুষ সেই ভালোবাসাকে দোজখে রূপান্তরিত করে:
আল্লাহ সকলের খোঁজ-খবর রাখেন, এবং তিনি সবকিছু জানেন। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৪৭)
মোট কথা কেউ যা চায় তিনি তাকে তাই দিয়ে থাকেন।
এতক্ষণ আমরা আলোচনা করেছি কর্মফল নিয়ে। দুঃখ-যাতনা অন্য দিক থেকেও আসতে পারে—পরীক্ষা। এই পরীক্ষা শুধু তাদেরই জন্যে যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে বা করে ব’লে প্রচার করে। আল্লাহ কোরআনে স্পষ্টভাবে বলেছেন যে তিনি প্রত্যেক বিশ্বাসীকে তার বিশ্বাসের সমান গুরুত্বের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে চালিত করেন:
মানুষ কি মনে করে যে, শুধু আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে, এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? নিশ্চয়ই আমি তাদের পূর্ববর্তীদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম; আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ ক’রে দেবেন কারা সত্যবাদী ও কারা মিথ্যাবাদী। (সূরা আনকাবুত, আয়াত: ১-৩)
কেন এই পরীক্ষা? সাধারণ মানুষ এর অর্থ বোঝে না। কারণ তারা অধিকাংশ সময়ে খেয়ালই রাখে না যে তাদেরকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু আল্লাহর একনিষ্ঠ ভক্তগণ পরীক্ষার প্রতি সচেতন এবং তারা পরীক্ষাহীন ব্যধিহীন দুর্দশাহীন অবস্থায় কিছুদিন থাকলে কষ্ট পান—ভাবেন, আল্লাহ কি তাদেরকে ভুলে গেলেন? এরূপ ব্যক্তিদেরকে যে-পরীক্ষা করা হয় তা কোনো স্বেচ্ছাচারিতা নয়। ব্যাপারটা অত্যন্ত মজার। আপনি যদি কায়মনোবাক্যে তওবা ক'রে আল্লাহর পথে ফিরে আসেন এবং আপনার হৃদয়ে তার জিকির সদা বলবৎ রাখেন, তাহলে তিনি আপনাকে একের পর এক বিপদের মধ্যে ফেলবেন—শারিরীক ব্যধি, অর্থকষ্ট, প্রিয়জনের বিয়োগ-ব্যথা ইত্যাদি। এটা ঘটে দুটো কারণে: প্রথমত, কেউ বিশুদ্ধ হৃদয়ে তওবা করলে আল্লাহ এতই খুশি হন যে তার জন্য পরকালে বেহেস্ত নসিব ক'রে দেন—ফলে তার পাপকর্মের ফলগুলোকে তার কাছে দ্রুত পেশ করা হয়, যেন সে তা এখানেই নিঃশেষ ক'রে ফেলতে পারে। এই অবস্থায় আল্লাহর ওপর সর্বান্তকরণে নির্ভর করলে সব প্রয়োজন তিনিই পূরণ ক'রে দেন—এমন এমন জায়গা থেকে তিনি বান্দার জন্য রিযিক প্রেরণ করেন যা বান্দা ভাবতেও পারে না। দ্বিতীয়ত, যার মধ্যে যত ওপরে ওঠার কামনা বর্তমান, তার কাছে সিঁড়ির একধাপ শেষ হবার সাথে সাথে পরবর্তী ধাপকে এনে হাজির করা হয়। ফলে বিপদ তার থামতেই চায় না। আমি যে-সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছি, তার পরবর্তী সিঁড়ি যদি তা থেকে খুব বেশি দূরে হয়, তাহলে আমি উপরে উঠব কিভাবে? অন্য কথায়, বিপদ একটা অতিক্রান্ত হলে পরবর্তীটা আসতে যদি খুব বেশি দেরি করে, তাহলে উপরে ওঠাও যে বিলম্বিত হয়ে যাবে। যে-ছাত্র এস.এস.সি. পাশ করেনি, তাকে তো এইচ.এস.সি পরীক্ষায় ডাকা হয় না। যে-ব্যক্তি মাথাটা যতটা নত করে, তাকে তত সুযোগ দেয়া হয়, তত পরীক্ষার মধ্যে ফেলা হয়।
এখন প্রশ্ন হলো—সুযোগ দেয়ার সাথে বিপদাপদের কী সম্পর্ক? হ্যাঁ, এখানেই তো রহস্য। কেউ যখন একটা নির্দিষ্ট ভারসাম্য বিন্দুর সব দাবি সুন্দরভাবে পূরণ করতে পারে তাকে পরবর্তী ভারসাম্যবিন্দুতে, অর্থাৎ আরো উচ্চ মর্যাদার অবস্থানে, দাঁড়াতে সুযোগ ক'রে দেয়া হয়। এই প্রক্রিয়া একেবারে স্বয়ংক্রিয়-আল্লাহ সৃষ্টি-পরিচালন ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজিয়ে রেখেছেন যে কেউ কোনো পরীক্ষায় পাশ করার সাথে সাথে তাকে পরবর্তী শ্রেণীর পরীক্ষার্থী হিসেবে গণ্য ক'রে নেয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী ভারসাম্যে স্থিত হওয়ার জন্য তার রয়েছে অনেক ঘাটতি-আমলের অভাব, ভালো কাজের অভাব, জ্ঞানের অভাব, ধৈর্যের অভাব। অভাব পূরণ না ক'রে যথাযথ প্রশিক্ষণ না নিয়ে, সেখানে পৌঁছানো তার দ্বারা কিভাবে সম্ভব? এজন্য তাকে তার ঘাটতি পূরণ করার জন্য সুযোগ দেয়া হয়-হয় প্রচুর সেলামী বা খেসারত দাও, নইলে বিনা পারিশ্রমিকে কিছু কাজ ক'রে দাও, নইলে বিপদাপদের মুখোমুখী হও এবং ধৈর্য সহকারে আল্লাহকে ডাক। অপেক্ষা করতে শেখাই সবচেয়ে বড় প্রশিক্ষণ। তা- আবশ্যক। যার প্রশিক্ষণ নেই, তাকে পদমর্যাদা দেয়া হবে কিসের ভিত্তিতে?
ব্যাপারটা এরকম : ধরা যাক কাউকে লেফটেন্যানট থেকে সরাসরি মেজর পদে উন্নীত করা হবে; শর্ত তেমন কিছু না, একটাই-প্রার্থীর ওজন হতে হবে মাত্র পঞ্চাশ কেজি। এখন কোনো প্রার্থীকে যদি ঠিক এই ওজন অবস্থায় পাওয়া যায়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই, সে পদটা পেয়ে যাবে। কিন্তু যার ওজন বেশি তাকে ওজন কমাতে হবে। সে যদি তাতে অপারগ হয়, তাহলে তার মাথার ওপর এমন বোঝা চাপানো হয় এবং এমন সময় পর্যন্ত তাকে তা বইতে বাধ্য করা হয় যেন তার ওজন পঞ্চাশ কেজিতে নেমে আসে। এ অবস্থায় তাকে অভাবে অনাহারে রাখার প্রয়োজন হতে পারে। এ হলো করুণাময়ের ভালোবাসা।
ধরুন আপনার একটা দশ বছর বয়সের ছেলে বা ভাই আছে। সে বাইরে খেলাধুলা ক'রে বেড়াতে পছন্দ করে। কিন্তু ছেলেধরা, অপহরণকারী, খারাপ বন্ধুদের সঙ্গ ইত্যাদির ভয়ে আপনি তাকে ঘরে আটকে রাখছেন। এই কারারুদ্ধ হয়ে থাকার কারণে সে অতীষ্ঠ। সে আপনার ওপর ক্ষিপ্ত। তার ধারণা আপনিই তার সব চেয়ে বড় শত্রু এবং আপনি তার জীবনের সুখ চান না। অথচ সে যদি আপনার মাথার মধ্যে ঢুকে আপনার তরফ থেকে চিন্তা করত, তাহলে বুঝত যে তার ওপরে আপনার প্রবল ভালোবাসার কারণেই আপনি তাকে গৃহবন্দী ক'রে রাখছেন।
সে যদি আপনার অনুভূতিটা বুঝত, তাহলে তার ভুল ধারণা তাকে আর কষ্ট দিতে পারত না। বরং সে কৃতজ্ঞ থাকত, আপনার কাছে তার যে কত মূল্য তা বুঝতে পেরে সে বরং আনন্দিতই হতো। এবং ঘরে আটকা পড়ে থাকার কষ্টটুকুকে সে সাধনা হিসেবে নিত।
সুতরাং যাবতীয় বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করতে হবে। পবিত্র কোরআনে এই তাগিদ দেয়া হয়েছে। রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে যে-কোনো রোগ-ভোগের সাথে আল্লাহর রহমত এবং পাপ-ক্ষয় জড়িত।
তারপরও যন্ত্রণা মানুষকে কষ্ট দেবেই। সুতরাং তা থেকে পরিত্রাণের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে, চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে।
তার পরও দুটো উপায়ের কথা ব'লে দেই: এক, যন্ত্রণাকে অগ্রাহ্য করা এবং তাকে ভুলে থাকা এবং দুই, যন্ত্রণার মধ্যে ঢুকে পড়া এবং তাকে উপভোগ করা-এবং মনে-মনে নিজেকে বলা: হে দেহ, হে মন, এটাই তো আমি চাই। সুতরাং সহ্য তোমাকে করতেই হবে। তা যদি তুমি না কর, তাহলে আমি তোমাকে অস্বীকার করি। তবে যন্ত্রণা যখন কোনোভাবেই উপশম হচ্ছে না, তখন তাকে কাজে লাগানোই উত্তম। একজন বিশ্বাসী তার যন্ত্রণাকেও বৃtha যেতে দেন না। তিনি জ্ঞানী এবং উদারমনা হয়ে থাকলে প্রার্থনা করেন: প্রভু গো! যে যন্ত্রণা তুমি আমাকে দিচ্ছ তা আমার প্রাপ্য-তা আমারই মঙ্গলের জন্য, কারণ তা হয় আমার কর্মফল, যার দ্বারা আমার পাপক্ষয় হবে, কিংবা তা তোমার তরফ থেকে আমার ওপর পরীক্ষা, যার বিনিময়ে আমি যোগ্যতা এবং রহমত প্রাপ্ত হব। কিন্তু এই কষ্টের অনুভূতি বৃtha যাক, আমি তা চাই না, প্রভু। সুতরাং হে পরওয়াদেগার! আমার এই যন্ত্রণার সদ্ব্যবহার হোক। সুযোগ হাতছাড়া হোক তা আমি চাই না, প্রভু। হে আল্লাহ, আমার প্রত্যেকটা যন্ত্রণার ওজনের লক্ষগুণ ওজনের সালাম এবং রহমত তুমি রসুল (সঃ) এবং তাঁর পরিবারবর্গের এবং তাঁর সাহাবাকেরামগণের এবং তাঁর রক্তের বংশধর যারা ছিলেন এবং আছেন তাদের এবং সারা পৃথিবীর খাঁটি বুযুর্গ ও মুমিন বান্দাদের কাছে পাঠিয়ে দাও। আমার যন্ত্রণা এবং রোগভোগ সফল হোক।-বিশুদ্ধ এবং প্রেমাপ্লুত হৃদয়ে এই প্রার্থনা করতে পারলে এক রহস্যজনক ঘটনা ঘটবে। কী ঘটবে তা আমি বলব না।
একটা প্রত্যক্ষ প্রামাণ দেই। নামাজে কি আপনি মন স্থির করতে পারেন? না। এমনকি আপনার দেহটাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না-চোখ বিক্ষিপ্ত হয়, কান বাইরের কথা শোনে, নাকের ওপর বিড়বিড় করে, পিঠে পিঁপড়া যেয়ে বেড়ায়, হাই আসে-ঠিক যেগুলোকে প্রশ্রয় দেয়া নিষেধ, সেই উপসর্গগুলোই বেশি ক্ষ্যাপে। দেহ বাগ মানে না-এখন না, একটু পরে নামাজ পড়া যাবে। সারাদিন ক্রিকেট খেলেও ক্লান্তি আসে না, অথচ মাত্র চার রাকাত নামাজ পড়তে সে কি কষ্ট!
এসবের আর্বিভাবই প্রমাণ করে যে নামাজ সত্য!
যাহোক, আল্লাহর পথে যারা পাগলের মতো ছোটেন, তাদের এই সমস্যা আরো বেশি হয়। নামাজে মন যেমন বাগ মানে না, সেই অবস্থা এক পর্যায়ে তাদের মনে সার্বক্ষণিকভাবে বিরাজ করে। সাধক তখন পাগলের মতো হয়ে যায়। বিশেষত যারা গভীর মনোযোগের সাথে নামাজ পড়ে এবং তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে, তাদের এই অবস্থা হয়।
কেন হয় এরূপ? কারণ কোরআনে এবং হাদিসে আছে যে নামাজ দেহ-মনের সমস্ত পাপ এবং ময়লা পরিষ্কার ক'রে দেয়। গভীরভাবে নামাজ পড়লে এক পর্যায়ে গিয়ে নিজের মনের গভীরের ময়লা আত্মচেতনায় চ'লে আসে এবং তা মন থেকে বিলুপ্ত হতে থাকে। মন খালি হতে থাকে। এ অবস্থায় বিভিন্ন কুকথাও মনে আসে। এমতাবস্থায় যতদিন মনটা পরিষ্কার না হয়, ততদিন যতবারই মনের এসব ময়লা উঠে আসে, ততবারই ইস্তেগফার পড়তে হয় (আস্তাগফিরুলালাহা...)- দিনে হাজার বার হলেও।
মনের ময়লার সাথে দেহের ময়লা যখন সাফ হওয়া শুরু হয় তখন চোখ ফেটে রক্ত বের হতে পারে, গলা দিয়ে রক্ত পড়তে পারে, প্রস্রাবের সাথে রক্ত আসতে পারে, কফের সাথে রক্তাক্ত মাংসখণ্ডের মতোও পড়তে পারে, মনটা হাইপার অ্যাকটিভ্ হওয়ার কারণে অ্যাসিডিটি অত্যন্ত বেশি ক্ষেপে যেতে পারে। সুফিয়ান সওরী (রহঃ) আল্লাহর ভয়ে কুঁজো হয়ে গিয়েছিলেন। আল্লাহর ভয়ে তাঁর প্রস্রাবের সাথে কলিজা টুকরো টুকরো হয়ে পড়ত, যা এক ইহুদী ডাক্তার চিকিৎসা করতে এসে সব দেখেশুনে মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন। এরূপ অবস্থায় আল্লাহর স্মরণ নিতে হবে, তাঁকে ভয় করতে হবে, যতটা করা সম্ভব। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন- তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যতটা করা উচিত।
... আল্লাহর দাসদের মধ্যে যারা জ্ঞানী, তারাই তাঁকে ভয় করে; আল্লাহ পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল। (সূরা ফাতির, আয়াত: ২৮)
তারা শয্যাত্যাগ ক'রে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশংকায় ...। (সূরা সিজদাহ্, আয়াত: ১৬)
কিন্তু তার করুণার ব্যাপারে নিরাশ হওয়া যাবে না। অনেকে এরূপ অবস্থায় আত্মহত্যার কথা ভাবে। সাবধান! আল্লাহর করুণাকে যে ছোট ক'রে দ্যাখে সে কাফের। আল্লাহ নিজেই কোরআনে তা বলেছেন। তাছাড়া তিনি বড় পাপীকেও সাহস দিয়েছেন:
তুমি [হে মুহাম্মদ (সাঃ)] বল যারা নিজ জীবনের প্রতি জুলুম করেছ, তারা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহর সমস্ত পাপ ক্ষমা ক'রে দেবেন; তিনি নিশ্চয় ক্ষমাশীল, দয়াময়। (সূরা যুমার, আয়াত: ৫৩)
দয়া করাকে তিনি তাঁর কর্তব্য হিসেবে স্থির করেছেন। কেয়ামতের দিন অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে একত্রিত করবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারাই অবিশ্বাস করবে যারা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলেছে। (সূরা আন'আম, আয়াত: ১২)
তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণে স্মরণ কর। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৪১)
তারা ক্ষমাপ্রার্থনা (তওবা) করলে তাদের জন্য কল্যাণ হবে, কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে-আল্লাহ তাদের ইহকালে ও পরকালে যন্ত্রণাপ্রদ শাস্তি দেবেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৭৪)
তোমাদের প্রতিপালক বলেন-তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব; যারা অহংকারে আমার নামে বিমুখ, তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (সূরা মুমিন, আয়াত: ৬০)
এখানে লক্ষণীয় যে নামজ এমনই একটা আধ্যাত্মিক সাধনা যার সীমানার মধ্যে সাধকের জীবনের এবং অস্তিত্বের সবগুলো দিক যেমন দেহ মন আত্মা ইহকাল পরকাল বাঁধা পড়েছে। উদ্ভ্রান্ত নাস্তিকরা নামাজকে কল্পনার সারবস্তু হিসেবে ব্যাখ্যা ক'রে বলতে চায় যে তা কেবল অদৃশ্যের সাথে জড়িত। কিন্তু আসল সত্যটা তা নয়। যে জ্ঞানী সে নামাজ পড়েই দেখুক। এর মধ্যেই রয়েছে ব্যক্তির গোটা অস্তিত্বের কেন্দ্র-যা দেহ-মনকে দূরে রাখেনি। দেহের রক্ত, সর্দি-কাশি, জৈবিকতা এসব নামাজের বাইরে নয়! নামাজে এর সবই পরিষ্কার হয়। তবে শর্ত একটাই-সঠিক নিয়মে ঠাণ্ডা মাথায় নামাজ পড়তে হবে। আমাদের দেহের অপবিত্রতা দেহেই রয়ে যায়। একটা সীমার পরে তা মনে প্রবেশ করে। মন থেকে তা প্রবেশ করে আত্মায়। এভাবে তা ইহকাল থেকে পৌঁছে যায় পরকালে। কেউ তওবা করলে এবং বেশি-বেশি নামাজ পড়লে ও ভালোকাজ করলে, তার জীবদ্দশাতেই তার পরকাল পরিষ্কার হয়ে যায়। একথা প্রমাণিত এবং প্রমাণযোগ্য। সমস্যা শুধু এখানেই যে আমি যা বলছি তার প্রমাণ রয়েছে আপনার মধ্যে। আপনি তা নিজে না দেখা পর্যন্ত আমার প্রমাণের সত্যতাকে বুঝবেন কিভাবে?
রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে ওজু করার সময়ে পাপ ধুয়ে যায়। নাকে পানি দিয়ে ভালোভাবে নাক ধুলে পাপ ধুয়ে যায়। কী এই পাপ? তা যাই হোক, তার প্রকাশ্য রূপ সরাসরি রক্ত, মাংস, শ্লেষ্মা ইত্যাদির সাথে মিশে থাকে। সুতরাং দেহ, মন, কাজ, বিশ্বাস, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি-সবকিছুর জন্যই ধর্ম।
যাহোক, আমি বলতে চাচ্ছিলাম অন্য কথা। প্রাথমিক সাধনার অবস্থায় দেহ এবং মনকে কন্ট্রোল করার ক্ষমতা কারো থাকে না। এজন্য আল্লাহ করুণা ক'রে রোগ-ব্যাধি দ্বারা দেহকে দুর্বল এবং ক্ষতবিক্ষত ক'রে দেন। মুহুর্মুহু তাকে মৃত্যুর ভয়ে দলিত করতে থাকেন। এই পথে যিনি এগিয়েছেন তিনি জানেন এটা আল্লাহর তরফ থেকে কত বড় করুণা। যে-দেহকে আপনি কন্ট্রোল করতেই পারেন না, তাকে আল্লাহ এমনভাবে কন্ট্রোল ক'রে দেবেন যা আপনি ভাবতেই পারবেন না।

টিকাঃ
* দেখুন এই লেখকের অন্ধকারের বস্ত্রহরণ (১ম খণ্ড)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00