📘 কোরানিক সেলফ কন্ট্রোল এবং মৃত্যুহীন জীবন > 📄 মনের খুঁটি

📄 মনের খুঁটি


যাদের মনে স্রষ্টার অস্তিত্বের ব্যাপারেই প্রশ্ন জাগে, তাদের উচিত বিশ্বাস দৃঢ় করার জন্য সম্ভাব্য এবং আবশ্যকীয় সবকিছু করা। প্রাথমিকভাবে একটা কথা মনে রাখা দরকার, তা হলো : আমি না জানলেও এমন ব্যক্তি ছিলেন এবং আছেন যারা প্রত্যক্ষভাবে বা সরাসরিই জানেন যে আল্লাহ আছেন, তাঁর রসুল (সঃ) সত্য, কোরআন সত্য, আখেরাত সত্য, পুনরুত্থান সত্য, কবরের আযাব সত্য, বেহেস্ত-দোযখ সত্য। তারা প্রত্যক্ষদর্শী এবং দ্বিধাহীন সাক্ষ্যপ্রদানকারী। কালেমায়ে শাহাদাত জানেন নিশ্চয়ই : আশ-শাহদু আল্-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু অশহাদু আন্না মুহাম্মাদান 'আবদুহু অ-রসুলহু।—আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক বা সমকক্ষ নেই, এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহম্মদ (সঃ) তাঁর গোলাম এবং সংবাদবাহক।
সাক্ষ্য কে দেয়? যে প্রত্যক্ষদর্শী সে-ই সাক্ষ্য দেয়। প্রত্যক্ষদর্শী নয় এমন কোনো ব্যক্তিকে আদালতে সাক্ষীর মর্যাদা দেয়া হয় না। হয় কি?
নামাজীদেরও খেয়াল করা উচিত এই কালেমার মধ্যে কী রহস্য লুকিয়ে আছে। আমাদের সবাইকে সাক্ষ্য দিতে বলা হয়েছে। নিশ্চয়ই তাহলে আমাদের মধ্যেই প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন, আছেন, এবং চিরকাল থাকবেন। অবশ্যই তাই। তবে যারা সাধারণ মানুষ, তাদের প্রত্যক্ষদর্শনের অভিজ্ঞতা থাকারও কোনো দরকার নেই। কারণ আমরা এমন এক নবীকে সত্য বলে মেনে নিয়েছি যিনি ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁরই সম্মানে আমাদের সাক্ষ্য সম্মানিত হবে। শুধু তাই নয়, প্রতিটি যুগেই আমাদের মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শী অলি থাকেন। তাঁদেরকেও খুঁজে বের করা চাই। পরকালে আমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে আমরা আমাদের যুগের ইমাম বা নেতাকে খুঁজে নিয়েছিলাম কি না। একথার মানে এই নয় যে আপনাকে কোনো পীরের কাছে ধর্ণা দিতে হবে। তবে একথাও সত্য যে আপনি যদি স্পষ্ট প্রমাণ পেয়ে যান কোনো পীর বা বুযুর্গ ব্যক্তি একজন খাঁটি মুমিন এবং আল্লাহ তাকে করুণা ক'রে আপন রহস্য জানিয়েছেন, তাহলে তার আনুগত্য করতেই হবে, তার হাতকে সবল করতেই হবে, তাকে নেতৃত্ব দানের সুযোগ দিতেই হবে।
প্রতিটি যুগের প্রতিটি নবী রসুলের (আঃ) জন্য নির্দিষ্ট কালেমা ছিল এবং প্রতিটি কালেমাতে দুটো শাহাদাহ বা সাক্ষ্য ছিল-আল্লাহর সত্যতার ও একতত্বের ব্যাপারে, এবং সংশ্লিষ্ট নবীর (সঃ) নবুয়তির সত্যতার ব্যাপারে।
সুতরাং মনে দুর্বলতা থাকলে মনকে বলুন: মন, তোমার চেয়ে উচ্চ-শিক্ষিত, উচ্চ ক্ষমতাধারী ব্যক্তিত্ব অনেক। আছেন যারা সন্দেহমুক্ত বিশ্বাসী। তাহলে তোমার মতো ছারপোকার আবার এই প্রশ্ন করার ধৃষ্টতা কেন? তোমার চেয়েও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা সাক্ষ্য দিচ্ছেন, এ কি তোমার জন্য যথেষ্ট নয়? তাহলে কি স্বয়ং দীনের নবী, মানবসম্রাট হযরত মুহম্মদ (সঃ) মিথ্যে বলেছেন? তাঁর মতো জীবন যদি ধর্মের জন্য ব্যয়িত হতে পারে, আউলিয়াদের মতো রত্নমানবেরা যদি ইসলামের জন্য জীবন বিলিয়ে যেতে পারেন, তাহলে তোমাকেও তা করতে হবে-তুমি আল্লাহকে বিশ্বাস কর বা না কর। মনকে বলুন: মন, তোমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ধার আমি ধারি না। মনকে এভাবে শাসাতে হবে। কারণ তার মধ্য দিয়ে কথা বলে ইবলিসই।
মনের এই অসুখটাকে সারাতে না পারলে মাইন্ড কন্ট্রোল থেকে লাইফ কন্ট্রোলের সুফল পাওয়া যাবে না। তখন তা হবে সাময়িক বিনোদনমূলক ব্যায়ামমাত্র। মানুষের এই কালিমাযুক্ত মনের আদালতে আল্লাহ এবং তাঁর রসুলগণকে ইবলিস রীতিমতো আসামী বানিয়ে ছেড়েছে। তাতে আল্লাহ এবং তাঁর নবীদের কোনো ক্ষতি হয়নি, হবারও কথা নয়। ক্ষতি যত আমাদের। তাই তো পরম করুণাময় নিজের কৃপায় আমাদেরকে সাক্ষী হিসেবে নির্বাচিত ক'রে সঠিক-উপায়ে সাক্ষ্য দেবার আদেশ করেছেন। আর যথাযথভাবে সাক্ষ্য দিতে পারলে তখন আবিষ্কার করা যায় যে, এতদিন ইবলিসই তার কারাগারে আমাদের সবাইকে আসামী বানিয়ে রেখেছিল, এবং স্বয়ং আল্লাহ এবং রসুলগণই সাক্ষ্য দিয়ে আমাদেরকে তা থেকে মুক্ত করেছেন। সুতরাং সত্য সাক্ষ্য দেবার সব ধরণের প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। যখনই সাক্ষ্য গৃহীত হয়ে যাবে, তখন দেখা যাবে যে তা আসলে এসেছিল আল্লাহর তরফ থেকে, এবং আপনি মুক্ত হয়ে যাবেন। আমরা যেন কোনোক্রমেই সত্য গোপনকারী না হই।
এবং সত্যকে মিথ্যা দ্বারা আবৃত ক'র না, কিংবা সত্যকে জেনে তা গোপন ক'র না। (সূরা বাকারা, আয়াত: ৪২)
বিশ্বাস সুদৃঢ় করার একটি অত্যুৎকৃষ্ট উপায় হলো হঠাৎ ক'রে কোনো বড় ধরণের ত্যাগ স্বীকার করা। ধরা যাক আপনি ধূমপান করেন। তাহলে আজই, এখনই, একটা সিগারেট জ্বালিয়ে মাত্র একবার ফুঁকে সেটাকে থুথু মেরে দূরে ছুড়ে ফেলুন এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন: প্রভু গো, আমার নক্স এটাতে শান্তি পেত। আমি শুধু তোমাকে খুশি করার জন্যই আমার নক্সকে এ থেকে বঞ্চিত করতে চাই। এ ত্যাগের বিনিময়ে তুমি আমার ঈমান মজবুত ক'রে দাও।
তোমরা কখনও পুণ্য অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমাদের ভালোবাসার জিনিস আল্লাহর পথে ব্যয় কর, এবং তোমরা যাকিছু ব্যয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে ব্যাপারে বিশেষভাবে জ্ঞাত। (সূরা আল্-ইমরান, আয়াত: ৯২)
প্রার্থনা করুন-প্রভু গো, আমার মনে যত প্রশ্ন জাগে তুমি তার জবাব দিয়ে দাও। প্রভু গো, সেই জবাবই সবচেয়ে উত্তম, যা তার প্রশ্নকে ধ্বংস ক'রে দেয়। তুমি আমাকে এমন জবাব দান কর যা সংশ্লিষ্ট প্রশ্নকে নির্মূল ক'রে দেবে। তুমি আমাকে ইবলিসের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা কর।
আরেকটা কথা মনে রাখতে হবে: প্রতিদিন কমপক্ষে একটা ক'রে আপত্তিকর অভ্যাস ত্যাগ করার জন্য সংকল্পব্ধ হয়ে নফল নামাজে দাঁড়ান। ধরুন আপনার একটা বদভ্যাস আছে পরস্ত্রীর প্রতি বা আপনার স্ত্রী নয় এমন নারীর প্রতি দৃষ্টি দেয়া। নামাজের উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে নামাজ শুরু করার আগে আপনার এই স্বভাবের কথা স্মরণ করুন। তারপর মনকে একনিষ্ঠ ক'রে সারা শরীর শিথিল (relax) ক'রে উদ্দেশ্যকে মনের সামনে রেখে কমপক্ষে সাতবার ইস্তেগফার (তওবা) পড়ুন: আস্তাগফিরুল্লাহাল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়ুল কাইয়ুম অতুবু ইলাই (হ)। আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি ঐ আল্লাহর নিকট যিনি অনাদি ও অনন্ত এবং তারই দিকে ফিরে আসছি এবং তওবা করছি।
আল্লাহ আপনাকে হুঁশিয়ার ক'রে দিয়েছেন: তোমরা নিজেদেরকে নিষ্পাপ মনে ক'র না। (সূরা নাজম, আয়াত: ৩২)
সুতরাং তওবা করতেই হবে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা না-চাওয়াই বড় অপরাধ। নিজেকে অপরাধী মনে না-করাই বড় অপরাধ। একটা চমৎকার জিনিস লক্ষ্য করবেন: যখনই একটা খারাপ কাজ থেকে তওবা করবেন, তখনই ইবলিস মনে সন্দেহ জাগিয়ে দেবে-আল্লাহ কি আসলেই সত্য নাকি যে তার জন্য এই আরামের জিনিস ত্যাগ করতে হবে? এরূপ ভাব জাগা মাত্রই আবার relax ক'রে প'ড়ুন: আমানুবিল্লাহি অমালাইকাতিহি অকুতুবিহি অরুসুলিহি অল্টয়াওমিল্ আখিরি অল্-ক্বাদরি খাইরিহি অশারিরহি মিনাল্লাহি ত'য়ালা অল্বা'সি বা'দাল্ মাওত।
আমি বিশ্বাস স্থাপন করলাম আল্লাহর ওপর, তাঁর ফেরেস্তাসমূহ এবং কেতাব- সমূহের ওপর, রসূলগণের ওপর, শেষ বিচারদিনের ওপর, তকদীরের ভালোমন্দ আল্লাহর কাছ থেকে একথার ওপর এবং মৃত্যুর পরে পুনরুত্থানের ওপর।
তারপর মনে মনে নিজেকে বলুন: সন্দেহের অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে আল্লাহ সত্য, কারণ স্বয়ং আল্লাহ এবং তাঁর রসুল (সঃ)-ই বলেছেন যে সন্দেহ সৃষ্টি করার জন্য ইবলিস অনবরত পেছনে লেগে রয়েছে। সুতরাং ইবলিসের উপস্থিতি আমার কাছে আল্লাহর সত্যতাই প্রমাণ ক'রে দিল।
তাদের হৃদয়ে সন্দেহ আছে, তাই তারা সন্দেহের দোলায় দোলায়িত। (সূরা তওবা, আয়াত: ৪৫)
যাদের অন্তরে বিশ্বাস নেই তাদের প্রার্থনা হলো মনের নিরর্থক অস্থিরতা। (সূরা রা'দ, আয়াত: ১৪)
সত্য এসেছে তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে, সুতরাং তুমি সন্দেহকারীদের অন্তর্গত (সূরা আলইমরান, আয়াত: ৬০) হয়ো না।
বল, যারা বিভ্রান্তিতে আছে, দয়াময় তাদেরকে প্রচুর অবকাশ দেবেন। যতক্ষণ না তারা প্রত্যক্ষ করবে যে বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে-তা শাস্তি হোক অথবা কেয়ামত হোক। (সুতরাং এরূপ অবকাশ আমরা চাই না, চাই বিশ্বাস।) (সূরা মরিয়ম, আয়াত: ৭৪)
আল্লাহ বিশ্বাসীদের মনোরোগ নিরাময় ক'রে দেবেন। (তখন অবিশ্বাসও আর থাকবে না।) (সূরা তওবা, আয়াত: ১৪)
এবার আনন্দে, আশ্বাসে, এবং ভরসায় একটু মুচকি হাসুন। ইবলিসের এমন কোনো যোগ্যতা নেই যে সে আপনাকে হারাতে পারে, যদি আপনি আল্লাহর কথা স্মরণ করেন। শেষোক্ত আয়াতে আমরা সেই আশ্বাস পেয়েছি।
মানুষ কত সৌভাগ্যবান। চিন্তা ক'রে দেখুন তো, যে হৃদয়টাকে খোলা রাখে, ইবলিস তাকে ক্ষতি করতে গিয়ে তার উপকারই করে! পাঠক শুনে অবাক হবেন যে আউলিয়াগণ ইবলিসের কার্যবিধিকে পর্যবেক্ষণ ক'রেই আল্লাহর গূঢ় রহস্য জানতে পারেন।
এবার আবার আরো বেশি শরীরের ভার ছেড়ে দিয়ে relax করুন। এবং নিজেকে মনে মনে বলুন: মন, তোমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ওপর আল্লাহর সত্যতা নির্ভর করে না। আমি হৃদয় খোলা রেখে তাঁরই বাণীর সাহায্যে তওবা করছি। তোমার স্বীকৃতি- অস্বীকৃতির ওপর তাঁর বাণীর কার্যকারিতা নির্ভরশীল নয়। উদ্দেশ্য দৃঢ় রাখলে তাঁর বাণীতে যা ফল হবার তা হবেই।
মনকে এই কথাগুলো বলার পর দেখবেন আপনি অনেক হালকা এবং ঝরঝরে হয়ে গেছেন। আপনার বিশ্বাস অনেক গুণ বেড়ে গেছে। এরপর দুই রাকাত নফল নামাজ প'ড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন এবং আবারও সাতবার ইস্তেগফার পড়ুন।
মনে রাখবেন : মনকে ঘরে ফেরাতে হবে। সে ফিরে না আসা পর্যন্ত আপনি কিভাবে তাকে চিনবেন। কিভাবে জানবেন তার মধ্যে কী রত্নরাজি লুকিয়ে আছে।
এভাবে তওবা করতে থাকলে তওবা আপনার মনের প্রথম স্তরে স্থিত হতে থাকবে। কিন্তু তখন ঘটবে আরেক সমস্যা। ইবলিস আপনার মনের মধ্য দিয়েই মতবাদ ছড়াবে : বুঝলাম আল্লাহ সত্য। কিন্তু তাই ব'লে তাঁকে খুশি করার জন্য সুন্দরের প্রতি তাকানো যাবে না কেন? কী এমন কারণ থাকতে পারে যার জন্য পরস্ত্রীর দিকে তাকানো যাবে না? আল্লাহই তো তাদেরকে বানিয়েছেন। আল্লাহর তৈরি সৌন্দর্যকে এভাবে ঘৃণা করা কি অপরাধ নয়? নিশ্চয়ই এগুলো হুজুরদের বাড়াবাড়ি।
এরূপ প্রশ্ন আরো সূক্ষ্ম। এ মনে এলে মনকে বলুন : আল্লাহ কখনও নারীকে ঘৃণা করতে বলেননি। স্বয়ং রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেন : 'তোমাদের পৃথিবীতে আমার পছন্দনীয় তিনটা জিনিস আছে : সুগন্ধী, নারী এবং প্রার্থনা'। তাছাড়া আমাকে তো নারী থেকে দূরে থাকতে বলা হয়নি। বলা হয়েছে পরনারী থেকে দূরে থাকতে। আমার নফস যতই কষ্ট পাক, আমি এতে আনন্দ পাব। নফস হলো আল্লাহর শত্রু। আমার প্রভুর শত্রুকে আমি সুখে থাকতে দেব, তা কী ক'রে হয়? তাছাড়া আমার স্ত্রী নয় এমন কোনো নারী আমার ধর্মের বোন। তার দিকে না তাকিয়ে নিজের ইজ্জত হেফাজত করার কাজকে তার জন্য সহজ ক'রে দেয়াও ভাই হিসেবে আমার দায়িত্ব। আমি তার প্রতি বেশি আগ্রহ দেখালে সে হয় বিরক্ত হবে কিংবা ইবলিসের কুমন্ত্রণায় হৃদয়ের গভীরে আনন্দিত বোধ করবে কিংবা অহেতুক অহংকারে একটা পুরুষকে 'পেছনে ঘোরানোর' ক্ষমতার দাপট দেখাতে গিয়ে উভয়েরই মানসিক ভারসাম্যের ক্ষতির কারণ হবে। এর যেকোনো ঘটনার ফলই তার এবং আমার জন্য ক্ষতিকর। সুতরাং আমি তাকাবো না।
এভাবে মনকে কিছুক্ষণ বুঝালে ইবলিস দুর্বল হয়ে যাবে। ইবলিসের ক্ষমতা আসে অন্ধকার থেকে। জ্ঞানের আলোর কাছে অন্ধকার টিকে থাকতে পারে না।
কিন্তু এরপর ইবলিস, ধরবে নতুন ফন্দি। সে আপনার মনে ব্যাখ্যার সৃষ্টি করবে : তাকাতে দোষ নেই; উদ্দেশ্য ভালো থাকলে সৌন্দর্যকে উপভোগ করাতে অপরাধের কিছু নেই। আরে ঐ মহিলা তো আমার বোনের মত, আর উনি তো আমার মায়ের বয়সী। আমার মন ঠিক আছে।
সাবধান!
মন নিজেই বলছে যে মন ঠিক আছে।
একবার এক বুযুর্গ কোনো এক প্রসঙ্গে দম্ভভরে তার কয়েক শিস্যের সামনে বললেন: আরে, ইবলিস আমার কাছে আসে না।
খানিক পরে তিনি দুঃখিত হয়ে কাতর সুরে বললেন: কথাটা ইবলিসই আমার মুখ দিয়ে বলেছে।
সুতরাং, প্রিয় পাঠক, অধিকাংশ মনের মধ্যে ইবলিস নিজেই ইবলিস-বিরোধী কথা বলে। উদ্দেশ্য, ছোটখাট ব্যাপারে ব্যক্তিকে ধর্ম শিখিয়ে বড় ব্যাপারে ভয়ংকর অধর্মের গহ্বরে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়া।
এরপরও ইবলিস আসবে—একই কৌশল নিয়ে বারবার কিংবা অভিনব কৌশল নিয়ে। তখন আরো উচ্চতর কৌশলের প্রয়োজন হবে।

📘 কোরানিক সেলফ কন্ট্রোল এবং মৃত্যুহীন জীবন > 📄 ধ্বংসের সৃষ্টি

📄 ধ্বংসের সৃষ্টি


ধ্বংস মানে মৃত্যু। ধ্বংস মানে ব্যাধি। ধ্বংস মানে অস্থিরতা, হতাশা, অবসন্নতা, আস্থাহীনতা, অবিশ্বাস, আত্মবিশ্বাসের অভাব, অনিশ্চয়তা, সন্দেহ, ভয়। জীবনের উপভোগের পথে বাধা সৃষ্টি করার জন্য এদের যে-কোনো একটা বাধাই যথেষ্ট। জীবনের সব সুখ হরণ করার জন্য এদের যে-কোনোটাই সমান শক্তিশালী। এই জাতীয় ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হওয়া মানে মৃত্যু দ্বারাই আক্রান্ত হওয়া। জীবনে এগুলোর উপস্থিতি মনকে মৃত্যুভয়কাতর ক'রে দেয়। মনে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে-তা থেকে সংসারে, তারপর সমাজে, কৃষ্টি-কালচার-সাহিত্যে, রাষ্ট্রকাঠামোতে, অর্থনীতিতে, বিশ্বব্যবস্থায়।
জীবনের সাথেই বেড়ে উঠতে থাকে মৃত্যু। মৃত্যু আসার আগেও বারবার আসে-জ্বরা-ব্যধি-ভয়-হতাশা আকারে। জীবন মরার আগেই বারবার মরে।
একটা মানুষ একটা জীবন্ত লাশ। সে যদি সাথে তার কফিনটা বয়ে নিয়ে বেড়াত, তাহলে তা তার স্মরণে থাকত। কিন্তু সে ভুলে থাকে যে সে প্রতি মুহূর্তে পিছলে পড়ছে। এই ভুলে থাকার জন্যই সে কিছুটা স্বাভাবিকভাবে সংসারকাজ চালিয়ে যায়। কিন্তু তাতে ক্ষতি হয় আরো বেশি। বড় ধরনের ব্যাধি বা শোক বা মৃত্যু যখন দুয়ারে হানা দেয়, তখন সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যায়।
জাগতিক বা সেকুলার-মাইন্ডের লোকেরা পার্থিবতার মধ্যে তাদের সেই অস্থিরতা এবং ভয়কে লুকিয়ে রেখে জীবন-যাপন করে। কিন্তু তাদের সেই বেঁচে থাকা আত্মপ্রবঞ্চনার সামিল।
মৃত্যুকে ভুলে থেকে মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায় না।
জীবনের মধ্যে ডুবে গিয়েও মৃত্যুর আতংক থেকে মুক্ত হওয়া যায় না।
মৃত্যুকে একটা আবশ্যিক প্রাকৃতিক ঘটনা ব'লে মেনে নিয়েও স্বাভাবিক হওয়া যায় না। তথাকথিত নাস্তিকদের নির্ভেজাল চকচকে হাসিমাখা মুখ দেখেই বলা যাবে না যে তারা সুখী। তারা সুখের যে সংজ্ঞাটা জানে, বাস্তবে তার সাক্ষাৎ কোনোদিনও পায়নি। মৃত্যুকে বাদ দিয়ে যে-জীবন, তার প্রতিটি পদে-পদে থাকে বিকৃত, উদ্ভট মেজাজের মৃত্যু।
তাহলে বেঁচে থাকার কি কোনো উপায় নেই?
আছে। বেঁচে তো আছে সবাই। বেঁচে থাকেও। প্রকৃতির নিয়মগুলোর মধ্যে না-মরা পর্যন্ত বেঁচে থাকাও একটা নিয়ম। এই অর্থে বেঁচে আছে সবাই।
তবুও মনের গভীরে চিন্তা করলে বুঝা যায় যে এ হলো জীবিত থাকা। জীবিত থাকা আর বেঁচে থাকা এক কথা নয়। বেঁচে থাকা মানে অন্য কিছু। বেঁচে থাকা মানে জীবিত থেকে জীবনের উদ্দেশ্য সাধন করা। সেই উদ্দেশ্য হাসিল না হওয়া পর্যন্ত একজন ব্যক্তির পক্ষে স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা সম্ভব নয় সে বেঁচে আছে কি না।
প্রকৃত বেঁচে থাকা তাকেই বলে যা বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য অর্জন করেছে। প্রকৃত জীবন সেটাই যা মৃত্যুর গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ নয়।
প্রকৃত জীবন সেটাই যা জীবনেরও গণ্ডিকে অতিক্রম করেছে।
প্রিয় পাঠক! জীবনকে বায়োলজিক্যালি বা জৈবিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে গেলেই দেখা যাবে যে তার শুরুতে জীবন ছিল না—শুধু ছিল জৈবিকতা বা প্রাণ— এবং শেষেও থাকবে মৃত্যু। সুতরাং বেঁচে থাকাই জীবনের উদ্দেশ্য হতে পারে না।
বেঁচে থাকা একটা প্রক্রিয়ামাত্র। একে আমরা শুরু করিনি। আমরা একে সমাপ্ত করারও যোগ্যতা রাখি না। এ কারণে আমরা যদি আমাদের খামখেয়াল অনুসারে বেঁচে থাকি তাহলে জীবন থেকে যা চাই তা পাই না।
তাহলে জীবনটা আসলে কী?
এই একটা প্রশ্নই কোটি কোটি জীবনকে ভারাক্রান্ত ক'রে তুলেছে—যুগে যুগে। ফলে ঘটনা হয়েছে এরূপ যে, জীবনটাকেই মনে হয়েছে জীবনের বোঝাস্বরূপ। এই বোঝা বহন করা বড়ই কষ্টকর। ফলে আমরা চারদিকে দেখি অপমৃত্যু—আত্মহত্যা, ড্রাগ-এডিকশান, ফ্যাশান-নাস্তিকতা, প্রতিমা-পূজা, অগ্নি-পূজা, বৃক্ষ-পূজা, নক্সের পূজা, শব্দ-পূজা (বা উদ্দেশ্যহীন কবিতাপ্রীতি) অস্থিরতা, বিষণ্ণতা, হাহাকার।
তাহলে কি জীবনটার অর্থই ওলটপালট হয়ে গেল না?—পাঠককে হয়তো এই প্রশ্নবাণ এই মুহূর্তে আহত করছে। কিংবা আপনি হয়তো ভাবছেন যে লেখক সাহেব জীবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তাকে অযথা জটিল করে তুলছেন।
কিন্তু প্রিয় পাঠক, ভেবে দেখুন তো, যে-জীবন নিয়ে একটু ওলট-পালট কথা বললেই তা ওলট-পালট হয়ে যায়, তার সার্থকতা এই অর্থে কতটুকু?
আপনার মনে আবারও প্রশ্ন জাগতে পারে—তাহলে কি জীবন মানে অপমৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করা?
না। আমি আগেই বলেছি যে জীবনও জীবনের উদ্দেশ্য নয়। জীবন একটা সাদা কাগজ। তাতে আপনি কী লিখলেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। জীবনীশক্তি বা জীবিতাবস্থা জীবনের একটা বস্তুগত এবং জৈবিক এবং রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যমাত্র। আগে জীবন পরে লক্ষ্য এভাবে বাস্তবতা রচিত নয়। প্রকৃত বাস্তবতা হলো একটা লক্ষ্য। চেতনা যখন দৃশ্য এবং অদৃশ্য অবয়বের প্রকাশ ঘটিয়ে সেই লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হতে থাকে, তখন স্থান-কালের সাথে সেই অবয়বের যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সংঘটিত হয় তাকেই বলে জীবন। সুতরাং বেঁচে থাকা মানে হলো জীবনের সেই প্রক্রিয়া যার কিছু ঘটনা আপনি ঘুমিয়ে থাকলেও ঘটত। এসবকে ঘটিয়ে বা ঘটতে দিয়ে কোনো সার্থকতা অর্জন করা যায় না বা বলা যায় না যে আমি আনন্দিত হয়েছি।
তাহলে এই ঝামেলাটা মানুষের ওপর চাপানো হয়েছিল কেন? কেন আমাকে আমার অনুমতি ছাড়াই জোর ক'রে সৃষ্টি করা হলো এবং তারপর এমন নিয়মের বোঝাও আমার ওপর চাপানো হলো যে আমি যা করতে চাই তা করলে আমি যা পেতে চাই তা পেতে পারি না? কেন?-বিদ্রোহী মন এভাবে প্রশ্ন ক'রে উঠতে চায়। এই প্রশ্ন মনের নিজস্ব। এর জবাব পেতেই হবে। জীবনের একটা প্রধান লক্ষ্য হলো এই প্রশ্নের জবাব খোঁজা এবং জীবনের একটা বিরাট সার্থকতা হলো এর জবাব খুঁজে পাওয়া। অন্য কথায়, জীবনের জন্য কোনো লক্ষ্যই বা কেন দরকার?-এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাওয়াই জীবনের প্রথম লক্ষ্য। মন যখন এটুকু বুঝে ফেলবে তখন দেখা যাবে যে বেঁচে-থাকা একটা সার্থকতার আকাঙ্ক্ষা অর্জন করতে যাচ্ছে।
মানুষকে জীবন দেয়া হয়েছিল কেন?
মৃত্যুকে অতিক্রম করার জন্য।
মানুষকে মৃত্যু কেন দেয়া হয়েছিল?
জীবনের সংকীর্ণ গণ্ডি পার হবার জন্য।
আবারও সেই প্রশ্ন: জীবন কেন দেয়া হয়েছিল? জীবন দেয়া হয়েছিল 'এ জীবন কেন দেয়া হয়েছে?' এই প্রশ্নের জবাব পাবার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।
সে জবাব পাবার পর কী ঘটবে?
মৃত্যু ঘটবে?
তারপর আর কোনো মৃত্যু এসে জীবনকে সংজ্ঞায়িত করবে না। রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেন:
তোমরা মরার আগে মর, তাহলে তোমাদের আর মৃত্যু হবে না।
বেঁচে থেকেই! এবার কি কথাগুলো নিরুদ্দেশ হয়ে যাচ্ছে না?
না। এ জীবনকে কেউ তাঁর নিজের খেয়ালে খেলনার সামগ্রী ক'রে সৃষ্টি করেননি।
আমাদের যেন নজরুলের 'খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে/বিরাট শিশু আনমনে'- মন্তব্যটা শুনে বিভ্রান্তি না লেগে যায় সেজন্য আল্লাহ পরম করুণাময় পবিত্র কোরআনেই স্পষ্ট ক'রে বলে দিয়েছেন যে তিনি মানুষকে ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করেননি:
যারা দাঁড়িয়ে বসে, ও শুয়ে আল্লহকে স্মরণ করে, এবং আসমান ও জমিনের সৃষ্টি বিষয়ে চিন্তা করে যে-হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এ অনর্থক সৃষ্টি করনি ... (সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১৯১)
আমি আসমান ও জমিন এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী কোনো কিছুই অনর্থক সৃষ্টি করিনি; যদিও অবিশ্বাসীদের ধারণা তাই ... (সূরা সাদ, আয়াত: ২৭)
তিনি চান না যে সৃষ্টি-মানুষের মনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করুক:
তবে কি তারা আল্লাহর এমন শরিক করেছে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মতো সৃষ্টি করেছে, যে- কারণে সৃষ্টি ওদের মধ্যে বিভ্রান্তি ঘটিয়েছে?-বল, আল্লাহই সকল বস্তর স্রষ্টা; তিনি এক পরাক্রমশালী। (সূরা রা'দ, আয়াত: ১৬)
আসলে এত জটিলতা কেন আসছে?
কারণ আমরা সমস্ত জটিলতা থেকে মুক্ত হতে চাই।
প্যাঁচ খুলতে গেলে উল্টো প্যাঁচ দিতে হয়।
আমরা ভুল ক'রে ভেবে বসি যে আমরা জীবিত ছিলাম এবং তারপর আমাদেরকে জোর ক'রে মৃত্যুর বোঝা বহন করতে বাধ্য করা হচ্ছে। ব্যাপারটা আদৌ তা নয়।
তথাকথিত 'বৈজ্ঞানিক' মন ভেবে বসে যে জীবন মৃত্যুর দ্বারা সংজ্ঞায়িত, অর্থাৎ জীবনের মতো মৃত্যুও একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু মৃত্যুকে এভাবে কর্তব্য হিসেবে ধরে নিয়ে বেঁচে থেকে কোনো কার্ল মার্কস বা বার্ট্রান্ড রাসেলও কি তৃপ্তি পেয়েছেন? পাননি।
কারণ তারা নিজেদেরকে সঠিক প্রশ্নটাই করতে পারেননি। ফলে জবাব যা পেয়েছেন সব ভুল। তা জীবনের কোনোই কাজে আসেনি। তা দিয়ে অর্থনীতি চাঙ্গা হতে পারে বা বদলে যেতে পারে, দর্শন সমৃদ্ধ হতে পারে বা তার পূর্ববর্তী দারিদ্র্য ধরা পড়তে পারে, বড় বড় খেতাব এবং পুরস্কার এবং যুদ্ধ এবং বিপ্লব এবং সরাইখানা এবং বেশ্যালয় এবং গোরস্থান রচিত হতে পারে, কিন্তু তা পৃথিবীর কোনো মানব সন্তানের জীবনের কোনো কাজে আসেনি।
আসল সত্যটা হলো: জীবনের সৃষ্টি হয়নি, সৃষ্টি হয়েছিল ধ্বংসের। আর সেই ধ্বংসযজ্ঞের ধ্বংসাবশেষের প্রত্নতত্ত্বে আটকে গিয়েছিল জীবন-আল্লাহর চিরশ্বাশ্বত বৈশিষ্ট্যাবলীর এক অপূর্ব সমন্বয়। এই ধ্বংস সৃষ্টি হয়েছিল তখনই যখন আদি পিতা আদম (আঃ) এবং আদি মাতা হাওয়া (আঃ) ইবলিসের প্ররোচণায় সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়েছিলেন। নষ্ট হয়েছিল আল্লাহর সাথে তাঁদের ঐক্য। সৃষ্ট হয়েছিল ক্ষুদ্র অস্তিত্ব, নশ্বর মন। ব্যাঙ তার কুয়োর মধ্যে পড়ে সেখানেই চিরকাল আবদ্ধ থাকার অবস্থা সৃষ্টি ক'রে নিল। এবং সে তখন সাগরকে ভাবতে শিখল তার কুয়োর চেয়েও ক্ষুদ্র আকারে।
যত সমস্যা সৃষ্টি হলো এই ভাবনা থেকেই। ফলে এখন মন তার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে পথ খুঁজে পায় না, তখন সে হয় মৃত্যু খোঁজে না হয় মরতে বাধ্য হয়। এর কোনোটাতেই মুক্তি নেই। এমনকি আদম-হাওয়াকে (আঃ) দোষারোপ করাতেও কোনো মুক্তি বা সদুত্তর লুকিয়ে নেই। এখানে এসে রহস্য আরো ঘনীভূত হয়ে যায়।

📘 কোরানিক সেলফ কন্ট্রোল এবং মৃত্যুহীন জীবন > 📄 মৃত্যুর মধ্যে জীবনের হাতছানি

📄 মৃত্যুর মধ্যে জীবনের হাতছানি


এখন তাহলে মুক্তি কোথায়?
এখন মুক্তি জীবনের মধ্যে নেই, মৃত্যুর মধ্যে। এখন মুক্তি মৃত্যুর মধ্যে নেই, মৃত্যুর কিভাবে সৃষ্টি হলো তার রহস্য জানার মধ্যে।
এখন মুক্তি মৃত্যুর রহস্যের মধ্যে নেই, তাকে অতিক্রম করার মধ্যে। মৃত্যু অতিক্রমের প্রকৃত অর্থ হলো জীবন-মৃত্যু উভয়ের গণ্ডি পার হয়ে সেই শ্বাশ্বত ঘরে ফিরে যাওয়া যার সম্বন্ধে আমরা ভুলে গেছি বিধায় আল্লাহ দয়াপরবশ হয়ে যুগে যুগে নবী-রসুলগণকে (আঃ) পাঠিয়ে বারবার আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে আমরা এখনও জন্মাইনি, এক ধারাবাহিক মৃত্যুর মোহতন্দ্রার মধ্যে অবস্থান করছি। এই রহস্য জানলে অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচা যায়। জীবনের উদ্দেশ্য হলো জীবনের উৎসকে স্মরণ করা। জীবনের উদ্দেশ্য হলো আবার সেই উৎসের কাছে আত্মসমর্পণ ক'রে শ্বাশ্বত ঘরে ফিরে যাওয়া।
আপনি পরকালে বিশ্বাস করেন বা না করেন, পরকাল আপনাকে টেনে নেবেই। আপনি বেহেস্তে যেতে চান বা না চান, বেহেস্ত এবং দোযখের মধ্যে আপনাকে একটা বেছে নিতে হবেই।
আপনি মৃত্যুর নিদ্রায় শায়িত থাকতে চাইলেও মৃত্যুর সময়ে আপনি জেনে আতংকিত হবেন যে আপনার আর কোন মৃত্যু হবে না। বিগত জীবনের কাজ অনুসারে অনন্তকাল ফল ভোগ করতে হবে। তখন কঠোরভাবে বলা হবে: আজ তোমরা একবারের জন্য ধ্বংস কামনা ক'র না, বহুবার ধ্বংস কামনা করতে থাক। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ১৪)
মৃত্যু সম্বন্ধে মানুষের একটা ভুল ধারণা আছে। মানুষ ভ্রান্তিবশত ভেবে বসে যে মৃত্যুর সময়ে মুমূর্ষ ব্যক্তি চোখে অন্ধকার দ্যাখে, যেমন হয়ে থাকে অজ্ঞান হয়ে পড়ার সময়ে।
বরং সত্যটা ঠিক এর উল্টো। মৃত্যুর সময়ে আমাদের চোখে অন্ধকার ঘনিয়ে আসবে না, চোখের অন্ধকার এবং মায়ার ঘোর কেটে যাবে। সেই শ্বাশ্বত জগতের বিশাল রহস্যের দ্বার খুলে যাবে। এই রহস্য দেখেই সবার মনে পড়বে কে তাকে বানিয়েছিলেন, কেনই বা বানিয়েছিলেন, তার ওপর আদৌ কোনো অবিচার করা হয়েছে কিনা। অসার্থক মন তখন আফসোসে ফেটে পড়বে। হা ক'রে তাকিয়ে থাকবে, যা আমরা প্রত্যেক লাশের ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করি। যাদের কৃতকর্ম খারাপ ছিল, তারা আবার ফেরত আসবে চাইবে পৃথিবীতে:
এখন তোমাদের সামনে থেকে পর্দা সরিয়ে নিয়েছি, আজ তোমরা স্পষ্ট দেখছ। (সূরা ক্বাফ, আয়াত: ২২)
যখন ওদের কারে মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন সে বলে—হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আবার (পৃথিবীতে) পাঠাও, যাতে আমি সৎকাজ করতে পারি, যা আমি আগে করিনি।—না এ হবার নয়। এ তো আর একটা উক্তিমাত্র। ওদের সামনে পর্দা থাকবে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত। (সূরা মু'মিনুন, আয়াত: ৯৯-১০০)
তারা দেখবে যে কোরআনের প্রতিশ্রুতি সত্য, কিন্তু তারা আল্লাহকে বা তার রহস্যকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করবে না। এ কোনো বানোয়াট গল্প নয়। মৃত্যুকে অতিক্রম ক'রে যারা আল্লাহ্র অলি হয়েছেন, তাদেরকে সান্নিধ্য দেয়ার আগে আল্লাহ্ করুণা ক'রে এসব রহস্য চাক্ষুসভাবে দেখিয়ে থাকেন।
সুতরাং ভয় পাবার প্রয়োজন আছে। মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য স্বেচ্ছাচারিতাপূর্ণ জীবনের মধ্যে ঢুকে পড়লে কোনো লাভ নেই।
আবার এই সত্যকে জানলে ভয় পাবার বদলে আস্থাই বেড়ে যাবার কথা। আমি যখন জানতেই পারলাম যে আমার মৃত্যুই আমার আমিত্বের পরিসমাপ্তি নয়, আমাকে আল্লাহ্ তাঁরই প্রকাশিত বৈশিষ্ট্যের সম্মানে অনন্তকাল বাঁচিয়ে রাখবেন, তাহলে আর সময় নষ্ট করা কেন, তাহলে মনটাকে তাঁকে কেন দিয়ে দিচ্ছি না যিনি সকল জীবন-মৃত্যু-ধ্বংস-ক্ষয়ের উর্ধ্বে এবং যিনি এগুলোর স্রষ্টা?
মৃত্যুকে ফাঁকি দেয়ার উদ্দেশ্যে মৃত্যুর মধ্যেই লুকিয়ে পড়া যায়। ব্যথা থেকে রক্ষা পাবার জন্য ব্যথার মধ্যে ঢুকে পড়া যায়। যিনি তীর ছুড়ছেন তার কাছে আশ্রয় নিলে তো আর তীর বেঁধার ভয় থাকে না।

📘 কোরানিক সেলফ কন্ট্রোল এবং মৃত্যুহীন জীবন > 📄 কোত্থেকে এলাম, কোথায় এলাম?

📄 কোত্থেকে এলাম, কোথায় এলাম?


এতক্ষণে আমরা কোনো আলোচনা সৃষ্টি করতে পারিনি, শুধু নিজেদের উৎস-সন্ধানের লক্ষ্যে মনটাকে কিছুটা লক্ষ্যমুখী করতে পেরেছি। সুতরাং এখন একটু স্পষ্টতর প্রশ্ন করা যাক।
আমরা কোত্থেকে এসেছি? কোথায় এসেছি?
উন্নাসিক নাস্তিক বলবেন, আমরা প্রকৃতিরই সন্তান। এখানেই আমরা সৃষ্ট হয়েছি। আবার এখানেই আমরা মাটিতে মিশে যাব। ডাস্ট টু ডাস্ট।
আমার এক নাস্তিক বন্ধু একবার আমাকে এই জবাব দিয়েছিল। আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম—তাহলে তুমি এই মাটি, এই ইট, কাঠ, লোহা-লক্কড়, পানি এগুলোর সন্তান? তার মানে তুমি এগুলোর মধ্য থেকে জন্ম নিয়ে কয়েকদিন বুদ্বুদের মতো ভেসে বেড়াচ্ছ এবং তুমি ম'রে যাবে আর এগুলো এখানে থাকবে?
হ্যাঁ, তা তো বটেই—সে নির্ভেজাল জবাব দিল।
তাহলে এই ইট, কাঠ, পাথর এরা তোমার চেয়েও শ্রেষ্ঠ? তুমি এদের মতোও হতে পারলে না। এরা তোমাকে জন্ম দিয়েছে। এরাই তোমাকে মৃত্যু দেবে। এর পর আর কিছু কি নেই?
সে অবাক হবার ভান ক'রে বলল—এরপর আবার কী? এরপর আবার এসব। বড়জোর পুনর্জন্মটা সত্য হতে পারে।
বললাম—এ কি বন্ধু, তুমি তো আবার ধর্মের মধ্যে ঢুকে পড়ছ। পুনর্জন্মবাদ তো হিন্দু ধর্মের এবং বৌদ্ধ ধর্মের কথা।
না—সে বলল—এগুলো ধর্মের ব্যাপার না। এক্ষেত্রে এগুলোই বিজ্ঞানসম্মত, আধুনিক।
এবার আমি হেসে না উঠে পারলাম না। তাকে একটু ভেংচি কেটেই বললাম—আধুনিক? তুমি আধুনিকতার কথা বলছ? অথচ আমি তো নিশ্চিত জ্ঞানে জানি যে ঐ একটা রিক্সার ওপরে ছেঁড়া জামা পরে টুপি-মাথায় এক রিক্সাঅলা ব'সে বিশ্রাম নিচ্ছে, ঐ দ্যাখ, ঐ লোকটাও তোমার চেয়ে ঢের আধুনিক।
সে রাগে গরগর করতে লাগল। কারণ মার্কসবাদী নাস্তিকরা অনেক কিছু সহ্য করলেও এটা সহ্য করতে পারে না যে কেউ তাদেরকে কম-আধুনিক এবং কম-জ্ঞানী বলুক। সে ঠোঁট-মুখ বাঁকিয়ে তার ক্ষোভটা একটু সামলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করল— কিভাবে?
বললাম—কেন, তুমি এই আধুনিক যুগেও, উচ্চশিক্ষিত লোক হয়েও, মনে করছ যে তুমি এই মাটি থেকেই জন্মেছ এবং এখানেই তোমার পরিসমাপ্তি; অথচ আধুনিকতার কল্পনার ফানুস উড়াবার সময় তোমরা হরেক-রঙের ঘটনা দিয়ে গল্প সাজাও, যে সব গল্পের নায়কেরা আসে ভিনগ্রহ থেকে; তোমাদের সায়েন্স ফিকশানের নায়ক-নায়িকারা সময়কেও পার হয়ে চ'লে যায় অতীত থেকে ভবিষ্যতে, ভবিষ্যত থেকে উঠে আসে বর্তমানে। এই যদি হয় আধুনিকতা, তাহলে তো তুমি হেরে গেলে ঐ সামান্য রিক্সাওলার কাছেও। কারণ তার কোনো জ্ঞান-বিজ্ঞান জানা না থাকলেও সে নির্ভেজালভাবে বিশ্বাস করে যে সে এই গ্রহ তো দূরের কথা, এমনকি এই গ্যালাক্সিরও বাসিন্দা নয়! সে এখানে পথভুলে সামান্য ত্রুটির জন্য এসেছিল অসীম দূর থেকে, এবং সে আবার সেখানেই ফেরত যাবে। সে জানে যে শুধু তার দেহটাই তার এখানকার পোশাক। যাবার সময়ে সে ওটাকেই এখানে ফেলে যাবে। কারণ দীর্ঘ আকাশ-ভ্রমণ এবং সময়-ভ্রমণের পথে এই মাটির দেহের পোশাক প'রে থাকা যায় না। সে জানে যে তার এই মাটির পোশাকের মধ্যেও আছে একটা আলোর পোষাক যা শ্বাশ্বত, যা প'রে সে অনন্তভ্রমণে বের হতে পারে। তোমাদের সায়েন্স ফিকশানের নায়ক-নায়িকারা ভিনগ্রহে যেতে হলে নতুন পোশাক প'রে নেয়, অথচ ঐ রিক্সাঅলা জানে যে চিরকালীন আলোর পোশাক তার পরাই আছে। তাহলে কে আধুনিক—তুমি? নাকি ঐ রিক্সাঅলা?
আমার নাস্তিক বন্ধুটা কাচুমাচু করতে লাগল। আমি তার মুখের ওপর বললাম— তোমরা শত-সহস্র বছরের কল্পনা-চিন্তা-তথ্য ব্যবহার ক'রে যে গল্প তৈরি করতে শিখেছ, ঐ রিক্সাঅলা পুরোপুরি নাদান-মূর্খ হয়েও নিজেকেই তার চেয়েও চমৎকার গল্পের নায়ক ভাবে।
আমার নাস্তিক বন্ধুটা চুপসে গেল।
আমি তাকে বললাম— দ্যাখ, আমরা যেখান থেকে এসেছি সেখানেই ফেরত যাব। আমাদের এই আসা-যাওয়াও টামই-মেশিনের চেয়ে আধুনিক কায়দায় ঘটে। রসুল (সঃ) মে'রাজে গিয়ে দেখিয়ে দিলেন যে তিনি সময়কে পার হয়ে তার অতীতে এক সময়হীনতার জগতে গিয়েছিলেন।
দ্যাখ বন্ধু, সময়টাও একটা সৃষ্টিমাত্র।
সুতরাং সময়ের কাঠামোতে বাক্য গঠন ক'রে তা দিয়ে সময়ের স্রষ্টাকে নিয়ে প্রশ্ন করো না।
স্থান বা স্পেসও একটা সৃষ্টিমাত্র।
সুতরাং স্থানিক অবয়ব দ্বারা স্থানের স্রষ্টার বিশালতা মাপতে যেয়ো না।
মৃত্যু একটা সৃষ্টিমাত্র। জীবন কোনো সৃষ্টি নয়। জীবন শ্বাশ্বত। হাদিসে আছে যে পরকালে মৃত্যুকেও এক সময়ে মেরে ফেলা হবে। মৃত্যু এবং জীবন উভয়ই সৃষ্টি- যদি জীবনকে সময়-স্থান-কর্মধারার এই দৃশ্যমান সমষ্টি হিসেবে ধরা হয়, যে কথা সূরা 'মুলক'-এর প্রথমেই এবং আরো অনেক জায়গায় বলা হয়েছে। কিন্তু জীবনেরও যা জীবন, অর্থাৎ প্রাণমূল বা রূহ, তা আল্লাহরই আদেশ, তা শ্বাশ্বত-শুরুহীন, সমাপ্তিহীন। আমরা মৃত্যুবরণ করি ব'লে সেই মৃত্যুর ছকে ফেলে প্রশ্ন গঠন ক'রে আমরা ب'লে বসি-আল্লাহকে কে সৃষ্টি করল?
দ্যাখ বন্ধু, এই প্রশ্নটাকেও আল্লাহ সৃষ্টি করেছেনে-কে এই প্রশ্নটাকেই উল্টো তাঁর ওপর প্রয়োগ করে তা জানার জন্য।
সব কার্য-কারণ যিনি সৃষ্টি করেছেন, তার ওপর কার্য-কারণের সূত্র প্রয়োগ করতে যেয়ো না। হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রাঃ) যথার্থই বলেছিলেন-কার্য-কারণকে অতিক্রম কর, তাহলে কার্য-কারণের স্রষ্টার কাছে পৌঁছে যাবে।
শোনো বন্ধু, তোমাকে একটা মহারহস্যের কথা বলি, যা সব বড় মানের আউলিয়াগণ জানতেন এবং এখনও জানেন। সময়ের রহস্য। বিজ্ঞানীরাও বা দার্শনিকরাও বা কল্পনাবিলাসী সায়েন্স ফিকশানের লেখকরাও কিংবা তাওহীদ জ্ঞানহীন আলেমও আজ পর্যন্ত যা কল্পনা করেননি। তারা মানুষকে সময়ের খাপে বন্দী বন্দুকের গুলির মতো ভাবেন যে-গুলির সময় শেষ, তার চলা শেষ। কিন্তু পবিত্র কোরআনে আল্লাহ্ এ বলেননি। তিনি বলেছেন যে সময় হলো একটা গতির অনুভূতি মাত্র, অনুভূতির ধারবাহিকতার আবশ্যিক একমুখিতামাত্র। মানুষ সৃষ্টির ফর্মুলাটা তিনি এমনভাবেই ক'রেছেন যে মানুষই-অর্থাৎ মানুষের গতিবিধি এবং মন এবং কাজই-তার নিজস্ব সময় সৃষ্টি করে। কথাটা একজন 'আলেমের কাছেও বেখাপ্পা লাগতে পারে। তিনি ভাবতে পারেন-এমন উদ্ভট কথা কোরআনে কোথায় বলা হয়েছে? কিন্তু একথা আমরা প্রমাণ করব ইনশাল্লাহ-এই মুহূর্তে এ ব্যাপারে কিছু ভাববার দরকার নেই; আমার সবটুকু আলোচনা গভীর মনোযোগের সাথে শুনতে হবে। পৃথিবীর সর্বপ্রথম সার্থকতম সময়-বিজ্ঞানী আইনস্টাইন একটা ছোট মজার উদাহরণ দিয়ে এটাই বুঝিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সময় যে একেক জনের কাছে একেক রকমের তা বুঝার জন্য শুধু এটুকু খেয়াল করাই যথেষ্ট তুমি বাথরুমের ভেতরে আছ নাকি বাইরে আছ! এ হলো সময়ের আপেক্ষিকতা। কিন্তু সময় যে মানুষেরই সৃষ্টি তা বিজ্ঞান জানে না।
তিনি চমৎকার বলেছিলেন। বাথরুমের বাইরে থেকে যে-ব্যক্তি ভেতরে যাবার জন্য অপেক্ষা করে, তার এক নিনিট আর যে-ব্যক্তি ভেতর থেকে বাইরে বের হবে তার এক মিনিট সমান নয়। তোমার (মানসিক) ব্যস্ততাই তোমার সময়ানুভূতিকে দীর্ঘ ক'রে দেয়-যাকে বিজ্ঞানে বলে Time Dilution। একজন সাধারণ নামাজীও নামাজের সময়ে এই রহস্যের মুখোমুখি হন, যদিও তিনি সচেতনভাবে জানেন না ব্যাপারটা আসলে কী। যাদের নামাজ সুদৃঢ় হয়নি, তাদের প্রতি রাকাত নামাকের সময়ে মন থাকে সামনে-কখন পরের রাকাতটা আসবে, কখন নামাজটা শেষ হবে, আর ক'রাকাত আছে? নামাজ এক মহারহস্য। এতে প্রবেশ করা মাত্রই আমাদের ব্যস্ত এবং অস্থির আমিত্ব থেকে সময় সৃষ্টি হয়ে তা আমাদের আত্ম-সচেতনতাকে আমাদের সচেতনতা থেকে টেনে লম্বা ক'রে ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু নামাজ যাদের নির্মল হয়েছে, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের কাছে বর্তমান ছাড়া ভবিষ্যত ব'লে কিছু নেই। তাদের সচেতনতা যেখানে, আত্মসচেতনতাও সেখানে। তারা তাদের নামাজে সময়কে অতিক্রম ক'রে যান। তারা এমনকি পরবর্তী নিঃশ্বাসকেও বিশ্বাস করেন না। ফলে তাদের জীবনে থাকে না কোনো ভবিষ্যত পরিকল্পনা। ভবিষ্যতের মিছে মায়া তাদেরকে হাতছানি দিয়ে ডেকে নিতে পারে না। এ এক মহারহস্য! নামাজ। কি বিস্ময়কর উপহার! সাধেই কি আর একে মু'মিনের মে'রাজ বলা হয়েছে?
আরেকটা রহস্যের কথা বলি। টাইম মেশিন। মেশিনটা কাল্পনিক, কারণ তা এখনও তৈরি করা সম্ভব হয়নি (তা সম্ভবও নয়)। কিন্তু ধারণাটা মিথ্যা নয়, কারণ তা কাল্পনিক নয়; তার পেছনে পুরোপুরি গাণিতিক ফর্মুলা আছে। বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারের মধ্যে একটা ঘটেছিল গণিতে যা তোমরা জান না। সাধারণ মানুষ শুধু দ্যাখে বাইরেরটা, ভেতরেরটা নয়। বিশেষ প্রতিভাবান মানুষদের মধ্যেও অধিকাংশ দ্যাখে শুধু সেটাই যার দ্বারা তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিল হবে, যেমন মার্কসবাদীরা। তারা বাকি সত্যগুলো প্রথমত এড়িয়ে যায় এবং পরে স্বভাব তাদের চিন্তাকে এত মারাত্মকভাবে আচ্ছন্ন করে ফ্যালে যে তারা তা আর খুঁজেও পায় না। তারা তখন শুধু দ্যাখে সেই মতবাদই যা তাদের কাজে লাগছে। এবং তারা তাদের মস্তিষ্কের সর্বশক্তি নিয়োগ ক'রে তার পক্ষে বিভিন্ন তথ্য প্রমাণাদি এনে হাজির করার চেষ্টা করে। তোমাদের মতো আঁতেলরা খোঁজ না রাখলেও সত্য কিন্তু সত্যই-তা-ই সব বাস্তবতার ভিত রচনা করে। ১৯৩১ সালে আমেরিকার গণিতবিদ-দার্শনিক কুর্ট গোডেল গাণিতিকভাবে প্রথমে প্রমাণ করেন যে সময়ের অতীতে পৌঁৗঁছানো সম্ভব-যদি বিশেষ শর্তপালনকারী কিছু যান্ত্রিক সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা করা যায়। সেই থেকে সারাবিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল টাইম মেশিন নিয়ে। মানুষের যোগ্যতার চেয়ে তার কল্পনাই আগে চলে। সুতরাং সায়েন্স ফিকশান লেখকরা তা নিয়ে রমরমা ব্যবসা চালানোর সাথে সাথে গোটা পৃথিবীবাসীর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখল চটকদার গল্প-কাহিনীর প্রতি। মানুষ এভাবেই যুগে যুগে সত্য থেকে দূরে থাকার সুযোগ ক'রে নিয়েছে। যাহোক, একদল বিজ্ঞানী অবশ্য এ নিয়ে কাজ করতেই থাকলেন। আজ পর্যন্ত টাইম-মেশিনের যে গাণিতিক ধারণাটা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে তার মূল সূত্রটা সাধারণ কথায় এভাবে বলা যায় : আমি হাজার হাজার মাইল বা লক্ষ লক্ষ মাইল দূরের কোনো স্থানে যেতে চাই। তাহলে আমাকে বিশেষভাবে নির্মিত টাইম-মেশিনটিতে প্রবেশ করতে হবে। আমি সুইচটা অন করার সঙ্গে সঙ্গেই দেখব যে আমার মেশিনটা লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে। কিন্তু কিভাবে? মেশিনটা কিন্তু বায়ু বা শূন্যতা ভেদ ক'রে চলেনি। তা কোনোভাবে গতিশীল হয়নি!
এখানেই তো রহস্য। আমার যাত্রাবিন্দু এবং লক্ষ্যবিন্দুর মাঝামাঝি স্পেস বা শূন্যস্থানটাই সংকুচিত হয়ে গেছে! বিস্ময়কর আইডিয়া। গাণিতিক প্রমাণে এই পদ্ধতিটাই টিকে আছে।
অথচ শুনে আরো বেশি অবাক হবে যে আটশ' বছর আগে গোঁড়া মুসলিম ধার্মিক এবং আউলিয়া হয়রত ইমাম গাজ্জালী (রঃ) তাঁর 'দাকায়েকুল আখবার' বইতে কথাপ্রসঙ্গে কুতুব-আবদালগণ (উচ্চতম পর্যায়ের আউলিয়া) কিভাবে সেকেন্ডের মধ্যে হাজার মাইল পথ অতিক্রম করতেন তা বলতে গিয়ে বলেছেন যে 'তাঁদের জন্য পৃথিবীকে সংকুচিত ক'রে দেয়া হয়'। ফর্মুলায় কি মিলে যায়নি? এবং আরো বিস্ময়কর হলো এই যে, টাইম-মেশিন কখনও তৈরি হবে না, অথচ আবদালগণ চিরকালই এই ফর্মুলায় সেকেন্ডের মধ্যে হাজার মাইল পথ অতিক্রম করবেন।
কিভাবে তাঁরা তা করেন?
নামাজই হলে ইউনিভার্সাল টাইম মেশিন!
একটা কথা কি ভেবে দেখেছ? রসুলুল্লাহ্ (সঃ) আল্লাহ্র আরশে আল্লাহ্র সাথে সাক্ষাৎ ক'রে ফিরে আসার সময়ে মুখটা মলিন ক'রে রইলেন। আল্লাহ্ তাঁকে প্রশ্ন করলেন তিনি কেন মুখ ভার করলেন। ব্যাপারটা রহস্যজনক না? আল্লাহ্-ই হলেন মানবের মূল লক্ষ্য। তাঁকে সান্নিধ্যে পেলে সৃষ্ট-অসৃষ্ট, দৃশ্য-অদৃশ্য সবকিছু পাওয়া হয়ে যায়। দুঃখ কষ্ট, মৃত্যু সব ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যায়। অথচ তিনি মুখ-মোবারক মলিন ক'রে রইলেন? আল্লাহ্র প্রশ্নের জবাবে রসুলুল্লাহ্ (সঃ) জানালেন যে তিনি তাঁকে দেখে ব্যক্তিগতভাবে সার্থক এবং পূর্ণ হয়েছেন, কিন্তু তাঁর উম্মতদের বা অনুসারীদের কী হবে, তারা কিভাবে এই সৌভাগ্য অর্জন করবে, আদৌ তাদের এই সুযোগ হবে কিনা, তা নিয়েই তিনি চিন্তিত।
তখন আল্লাহ্ পরম করুণাময় রসুলুল্লাহ্ (সঃ) এর অনুসারীদেরকেও মেরাজের প্রতিশ্রুতি দিলেন।
তা হলো নামাজ!
কোথায় মেরাজ—সশরীরে আরশ ভ্রমণ, আর কোথায় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সামান্য সময়ের জন্য বিশেষ নিয়মে ওঠাবসা! এভাবে দুটো ভিন্ন জিনিসকে কেনই বা তুলনা করা হলো? জ্ঞানী নাস্তিকদের বুঝা উচিত যে নিশ্চয়ই এর মধ্যে কিছু আছে এবং তাদের উচিৎ নামাজ নিয়ে চেঁচামেচি না ক'রে সরাসরি নামাজ প'ড়ে দেখা। কেন, তোমরা পুজো দেখতে যাও, গীর্জায় প্রার্থনা শুনতে যাও, হোলি দেখতে যাও—কেউ কি কখনও বন্ধুদেরকে বলেছ: চল, নামাজ হচ্ছে, দেখে আসি? না। কারণ, ইবলিস সত্যকে পছন্দ করে না এবং সে তোমাদেরকেও দূরে রাখে।
মনের খামখেয়ালির উপাসনা করা আর সত্যের উপাসনা করা পুরোপুরি দুই মেরুর জিনিস। এমনকি আল্লাহকে খুশি করার জন্যেও ধর্মের মধ্যে ইচ্ছামতো কোনোকিছু ঢুকানো যাবে না!
তোমরা অনুমান ও নিজেদের স্বভাবের অনুসরণ কর, যদিও তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পথনির্দেশ এসেছে। (সূরা নাজম, আয়াত: ২৩)
...খারাপ এবং ভালো কখনও সমান নয়, এমনকি যদিও খারাপের আধিক্য তোমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিতে পারে... (সূরা মাঈদা, আয়াত: ১০০)
তুমি কি দেখো না তাকে যে তার কামনা-বাসনাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে?... তুমি কি মনে কর যে ওদের অধিকাংশ শোনে ও বোঝে? ওরা তো পশুর মতোই, বরং ওরা আরো অধম। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ৪৩-৪৪)
ওরা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিল, তারা ওদের সাহায্য করল না কেন? (সূরা আহক্বাফ, আয়াত: ২৮)
তারপর তাদের পর অসৎ বংশীয়েরা উত্তরাধিকারী হয়েছিল, যারা নামায নষ্ট করেছিল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করেছিল; ফলত তারা অচিরেই শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। (সূরা মরিয়ম, আয়াত ৫৯)
সুতরাং আল্লাহকে খুশি করার জন্যও তাঁর বিধানকে পাল্টানো যাবে না। তাঁর আদেশ পালন করাই তো ইবাদত। আল্লাহ অন্যত্র কোরআনে বলেছেন যে সন্ন্যাসবৃত্তি বা বৈরাগ্যসাধনা তিনি খ্রিস্টানদের জন্য বাতলে দেননি, তারাই তাঁকে খুশি করার জন্য তা নিজেরা উদ্ভাবন করেছিল। আর এটা উদ্ভাবন ছিল বলেই তারা এতে অটল থাকতে পারেনি। ইবলিস আল্লাহকে সিজদা করেছিল কিন্তু আদমকে (আঃ) সিজদা করেনি। সে বুঝতে পারেনি যে আল্লাহর আদেশ পালন করাই ইবাদত।
আমার বন্ধু জানতে চাইল—সময়কে যদি মানুষই সৃষ্টি করে তাহলে নিয়তি সত্য হলো কিভাবে? অর্থাৎ একথা সত্য হয় কিভাবে যে কোনো মানুষের জীবনকাল আগে থেকে নির্ধারিত?
বললাম—জীবনকে কি কোরআন হাদীসে কোথাও ঘন্টা-মাস দ্বারা হিসাব করা হয়েছে? মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি। মানুষের তথা গোটা সৃষ্টিজগতের ফর্মুলার মধ্যে সময়কেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ তা আল্লাহ্রই সৃষ্টি। তুমি আইনস্টাইনকে সত্য ভেবে আবদালগণকে মিথ্যা ভাববে, তা হয় না। তুমি জীবনকে অন্যভাবে কেন মাপতে চাচ্ছ না? ধর তোমার জীবনের মেয়াদ হলো তোমার হার্টবিট—যেমন তুমি বিশ লক্ষ হার্টবিট পর্যন্ত বাঁচবে। এখন এই হার্টবিট পরিমাণ আয়ুকে তুমি যদি সময়ের স্কেলে টেনে লম্বা ক'রে নাও, তাহলে বেশিদিন বাঁচলে—দিনের হিসাবে। ধর তোমার জীবন মেপে দেয়া হয়েছে মোট তওবার সংখ্যা দ্বারা—অর্থাৎ, উদাহরণস্বরূপ, তোমাকে ১০টা কবিরা গোনাহ এবং ১ লক্ষ ছগিরা গোনাহ্ করা পর্যন্ত বাঁচতে দেয়া হবে, যদি তুমি তার মধ্যে তওবা না কর। অন্যথায় তোমাকে তার সমপরিমাণ বা equivalent পরিমাণ অঙ্গচালনা পর্যন্ত—হাত-পা-চোখ ইত্যাদির ব্যবহার পর্যন্ত—বাঁচতে দেয়া হবে। তাহলে এই গোনাহগুলো করতে বা অঙ্গচালনাগুলো করতে তোমার যে শক্তির প্রয়োজন হবে তা নির্ধারিত। এই শক্তিটুকু তুমি ইচ্ছামতো ভালো বা মন্দ যে কোনো কাজে ব্যবহার করতে পার। এটাই তোমার সীমা। আল্লাহ কাউকে তার জন্য নির্ধারিত সীমার বাইরে যেতে দেন না:
কেয়ামতের ঘোষণা না থাকলে ওদের ফয়সালা তো হয়েই যেত। (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ, আয়াত: ২১)
বড় শাস্তির আগে আমি ওদেরকে অবশ্যই ছোট শাস্তি আস্বাদন করাব, যেন ওরা (আমার দিকে) ফিরে আসে। (সূরা সিজদাহ, আয়াত: ২১)
কারো আয়ু বৃদ্ধি হলে বা হ্রাসপ্রাপ্ত হলে তা তো হয় কেতাব (সংরক্ষিত ফলক) অনুসারে। (সূরা ফাতির, আয়াত : ১১)
পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করার আগেই তা লিপিবদ্ধ করি; আল্লাহর পক্ষে এ অতি সহজ। এ জন্য যে, তোমাদের ওপর যা অতীত হয়েছে (অর্থাৎ যা হারিয়েছ), তার জন্য দুঃখিত হয়ো না, এবং তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তার জন্য হর্ষোৎফুল্ল হয়ো না, আল্লাহ উদ্ধত অহংকারীকে ভালোবাসেন না। (সূরা হাদীদ, আয়াত: ২২-২৩)
তুমি কি জান (হে মুহাম্মদ (সঃ)) - সম্ভবত কেয়ামত আসন্ন। যারা বিশ্বাস করে না তারাই কামনা করে যে তা ত্বরান্বিত হোক। কিন্তু যারা বিশ্বাসী তারা তাকে ভয় করে এবং জানে যে তা সত্য। (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ, আয়াত: ১৭-১৮)
... তোমাদের জন্য নির্ধারিত দিন আছে, যা তোমরা মুহূর্তকাল বিলম্বিত করতে পারবে না, ত্বরান্বিতও করতে পারবে না। (সূরা সা-বা, আয়াত: ৩০)
আমিই ... লিখে রাখি যা ওরা (মানুষ) আগে পাঠায় এবং যা পেছনে রেখে যায়। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১২)
কেয়ামতের লক্ষণসমূহ তো এসে পড়েছে। (এখানে কেয়ামতের 'আসন্নতাকে' মাপা হয়েছে লক্ষণ দ্বারা, সময় দ্বারা নয়!) (সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১৮)
আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা শুরা, আয়াত: ৪০)
যদি কেউ আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে, তাহলে এরূপ লোকেরা (নিজেদের এবং অপরের) ক্ষতি ক'রে থাকে। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২২৯)
আমি কি তোমাদের দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে তখন কেউ সতর্ক হবে চাইলে সতর্ক হতে পারতে না? (সূরা ফাতির, আয়াত: ৩৭)
পূর্ব ও পরের সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। (সূরা রুম, আয়াত: ৪)
প্রকৃতপক্ষে সব কিছুর ক্ষেত্রেই আদেশ আল্লাহর। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩১)
আল্লাহ নিজেই বলেছেন যে সম্ভবত কেয়ামত আসন্ন! তাহলে কি তিনি জানেন না কখন তা সংঘটিত হবে? অবশ্যই তিনি তা জানেন। আসলে কেয়ামত কবে হবে তা সময় দ্বারা মেপে হিসাব করা হয়নি; অর্থাৎ এমনটি নয় যে আল্লাহ জোরপূর্বক নির্ধারিত ক'রে রেখেছেন অমুক দিন কেয়ামত হবেই। আদৌ তা নয়। অধিকাংশ আলেমই একথা জানেন না। কেয়ামত সংঘটিত হবে মানুষের আচরণের সীমালঙ্ঘনের কারণেই। আল্লাহ শুধু এরূপ একটা নিয়ম ঠিক ক'রে দিয়েছেন- "মানুষ যখন সীমালঙ্ঘনের একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে পৌঁছাবে তখন মহাবিশ্ব ধ্বংস হবে"- যার ফলে তিনি মানুষের সীমালঙ্ঘনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধাপে তাকে ছোট ছোট বিপর্যয়ের মুখোমুখি ক'রে দেন, যেন সে তওবা করার সুযোগ পায়। মহাবিশ্বের সার্বিক ধ্বংসের প্রতিজ্ঞা রয়েছে বলেই আল্লাহ মানুষের কর্মফলকে তাৎক্ষণিকভাবে তার দিকে ফিরিয়ে দেন না-তাকে সুযোগ দিয়ে থাকেন, আকাশ এবং পৃথিবীকে এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে যে তারা কুকর্মের ফলকে বিশেষ সীমা পর্যন্ত ধারণ ক'রে রেখে বিপর্যয়কে বিলম্বিত করতে পারে। আমরা আরও জানতে পারছি যে মানুষের আয়ুও পরিবর্তিত হয় এবং এরূপ পরিবর্তনও নির্ধারিত বিধি মোতাবেক ঘটে। অন্য কথায়, সকল পরিবর্তন এবং রদবদলকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যও পূর্বনির্ধারিত বিধান রয়েছে। বিধান দ্বারা বিধান নির্ধারিত হয় এবং কোনো বিশেষ বিপর্যয় সংঘটিত হয় তখনই যখন তা লিপিবদ্ধ হয়ে যায়, বা মানুষের আচরণ বিশেষ সীমাকে অতিক্রম ক'রে যায়। ফলে কোনোকিছু ঘটতে দেখলে স্পষ্টতই বুঝতে হবে যে সেক্ষেত্রে একটা সীমালঙ্ঘন ঘটেছিল এবং তার আগে বহুবার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সুযোগও দেয়া হয়েছিল। সর্বদা মনে রাখতে হবে যে সময় হলো সৃষ্টিফর্মুলার একটা উৎপাদ বা output, তা ফর্মুলার অংশ বা input নয় আদৌ। তা যদি হতো, তাহলে আবদালগণ (উচ্চতম পর্যায়ের আউলিয়াগণ) সময়কে অতিক্রম করতে পারতেন না। কেউ, কিংবা কোনো জাতি, তার নিজস্ব সীমা অতিক্রম করলে সে বা সেই জাতি ধ্বংসের মুখে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে, যা তার ফর্মুলাতেই ঢুকানো ছিল। চাবি শেষ হয়ে গেলে ঘড়ি তো থেমে যাবেই। সেক্ষেত্রে তাকে বাইরে থেকে কেউ জোরপূর্বক থামাবে না—চাবিই তাকে থামিয়ে দেবে। একটা মিসাইলকে নিক্ষেপ করার সময়ে নিক্ষেপকারী যন্ত্রটা তাকে ধাক্কা দেয়ার সাথে-সাথে তা যে-শক্তিতে বিস্ফোরিত ও নিক্ষিপ্ত হয় তা নির্ধারিত। কিন্তু মিসাইলটা কত দূরত্ব অতিক্রম করবে তা নির্ভর করবে তাকে কত কোণে (৪৫° কোণে নাকি ৩০° কোণে ...) নিক্ষেপ করা হলো তার ওপর। বলা বাহুল্য, মিসাইলটা সবচেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করবে তাকে ৪৫ ডিগ্রী কোণে শূন্যে নিক্ষেপ করলে। তোমার একটা রেডিও আছে যার ব্যাটারি হলো দুটো। তুমি তাকে সারাক্ষণ চালালে যত দিন ব্যবহার করতে পারবে, মাঝে-মাঝে চালালে তার চেয়ে বেশিদিন ব্যবহার করতে পারবে। জীবনটার ক্ষেত্রেও তাই। জীবনের মোট জীবনীশক্তি পূর্বনির্ধারিত। তুমি সেই শক্তিকে অত্যন্ত ভালো কাজে বা অত্যন্ত খারাপ কাজে বা মিশ্র কাজেও লাগাতে পার। কিন্তু তুমি যদি তা ব্যবহার ক'রে মানুষ খুন করার কাজে লেগে যাও এবং খুব দ্রুত শক্তি ক্ষয় ক'রে ফেল, তাহলে তোমার শক্তি যেদিন শেষ হবার কথা, সেদিন হয় তুমি আত্মহত্যা করবে না হয় খুন হবে না হয় ফাঁসিতে ঝুলবে না হয় কোনো দুর্ঘটনায় তোমার মৃত্যু হবে। শুধু তাই নয়, সীমারও স্তর আছে: ব্যক্তিজীবনের সীমা, জাতীয় জীবনের সীমা ইত্যাদি। কোনো ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করলেও আল্লাহ্ তার জাতীয় সীমার দিকে তাকিয়ে তা বৃদ্ধি করতে পারেন। সক্ষেত্রে 'ব্যক্তি + জাতি' এই সমগ্রের কোনো পরিবর্তন হবে না, সমগ্রের পূর্বনির্ধারণ ঠিকই থাকবে, শুধু একটার ঘাটতি পূরণ করার জন্য অন্যটা ব্যবহৃত হবে। যেমন, তুমি খুব বড় ধরনের খুনী হলে, এবং তোমার জাতিতে যদি এমন জঘন্য পাপী লোকের সংখ্যা বেশি থাকে যাদের খুন হওয়া উচিত, তাহলে আল্লাহ তাদেরকে খুন করার জন্য তোমার মোট আয়ু বাড়িয়েও দিতে পারেন, যদি তুমি তখনও খুনের নেশায় মশগুল থাক এবং তওবা ক'রে ফিরে না আস।
ইউনুস রসূলগণের অন্তর্ভুক্ত ছিল। যখন সে পরিপূর্ণ নৌকার দিকে পলায়ন করেছিল, তখন তার ভাগ্য নির্ণয় কর হলো, ফলত সে (সমুদ্রে) নিক্ষিপ্তগণের অন্তর্গত হলো। পরে এক বৃহদাকার মৎস তাকে গিলে ফেলল, তখন সে ধিষ্কারযোগ্য। সে যদি আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা না করত, তাহলে তাকে মাছের পেটে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত থাকতে হতো। (তাঁর কর্মফল তিনি পেলে তাঁকে কেয়ামত পর্যন্ত মাছের পেটে থাকতে হতো, কারণ আল্লাহ তাঁকে পরকালে শাস্তি দিতে চান না; কিন্তু আল্লাহর পবিত্রনামের মহিমার বদৌলতে তিনি কর্মফল থেকে রেহাই পেলেন।) (সূরা সাফফাত, আয়াত: ১৩৯-১৪৪)
তোমাদের নিটক শাস্তি আসার আগেই তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের দিকে মুখ ফিরাও এবং তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ কর। শাস্তি এসে পড়লে সাহায্য পাবে না। তোমাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের ওপর অতর্কিতভাবে শাস্তি আসার আগেই তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালক যে উত্তম কেতাব অবতীর্ণ করেছেন তার অনুসরণ কর, যেন (পরে) কাউকে বলতে না হয়—হায়! আল্লাহর প্রতি আমার কর্তব্যে আমি তো শৈথিল্য করেছি এবং আমি ঠাট্টবিদ্রূপ করতাম। অথবা কেউ যেন না বলে—আল্লাহ আমাকে পথপ্রদর্শন করলে আমি তো অবশ্যই সংযমীদের অন্তর্গত হতাম। (শাস্তি তখনই আসে যখন তা লিখিত হয়ে যায়। তার আগ পর্যন্ত আমল বা ভালো কাজ দ্বারা তা পাল্টানোও যায়।) (সূরা যুমার, আয়াত: ৫৪-৫৭)
আমি তোমাদের মধ্যে একজনকে অপরের পরীক্ষাস্বরূপ করেছি। তোমারা ধৈর্যধারণ করবে কি? তোমার প্রতিপালক সবকিছু দেখেন। (সবাইকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে ব’লে প্রত্যেককে একটা সীমার মধ্যে অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অনুমতিও দেয়া হয়েছে—পরীক্ষাস্বরূপ। কিন্তু কেউ ধৈর্য ধারণ করলে উক্ত সীমার পর সবকিছু তার পক্ষেই যাবে। আসলে পরীক্ষা হয় ধৈর্যের। এবং ধৈর্য ধারণ করলেই পরীক্ষায় কৃতকার্যতা আসে। এই সীমাগুলোই পূর্বনির্ধারিত, কোনো সময় বা ঘণ্টা-দিন-মাস-বছর নয়। ইউনুস (আঃ) যে ধৈর্য এবং ক্ষমা প্রার্থনার আশ্রয় নিয়েছিলেন, সময়ের স্কেলে তার মূল্য ছিল কেয়ামত পর্যন্ত দীর্ঘ কষ্টভোগ। কিন্তু তাঁর ক্ষমাপ্রার্থনা ও আল্লাহর মহিমা প্রকাশের একাগ্রতা সেই দৈর্ঘ্যকে ছোট ক’রে দিয়েছিল।) (সূরা ফোরকান, আয়াত: ২০)
আমি প্রত্যেক জনপদে অপরাধীদের প্রধানদেরকে সেখানে চক্রান্ত করার অবকাশ দিয়েছি; কিন্তু তারা নিজেদের বিরুদ্ধে ছাড়া চক্রান্ত করে না। কিন্তু তারা তা বুঝতে পারে না। (এই অবকাশই স্বাধীনতা, তওবা করার সুযোগ, এবং সংশ্লিষ্ট নির্যাতিতের ধৈর্য ও সত্যান্বেষীতার পরীক্ষাকে সার্বিকভাবে সুবিধাজনক করার জন্য। একে আল্লাহ সময় দ্বারা মেপে নির্ধারিত করেননি এর প্রকৃতিকে সময়ের স্কেলে মেপে প্রয়োজন অনুসারে প্রসারিত বা সংকুচিত করা হয়—এরূপ সংকোচন-প্রসারণ মূলত পূর্বনির্ধারিত বিধান অনুসারে ফর্মুলাতেই ঢুকানো আছে।) (সূরা আন’আম, আয়াত: ১২৩)
কখন কেয়ামত হবে তা কেবল আল্লাহই জনেন। তিনি... জানেন যা জরায়ুতে আছে; কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে, এবং কেউ জানে না কোন দেশে তার মৃত্যু ঘটবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ। (এখানে ‘কখন’ দ্বারা সময়কে নির্দেশ করা হচ্ছে, কারণ এই সময়টা মাপা রয়েছে কিছু সীমা বা লক্ষণ দ্বারা—বিশেষ বিশেষ আচরণের সীমা অতিক্রম হলে এক-একটি লক্ষণ প্রকাশিত হয়ে পড়বে। কিন্তু মানুষ সার্বিকভাবে তার সীমার ব্যাপারে অজ্ঞ ব’লে কেয়ামতের সময় সম্বন্ধে সে কখনই অনুমান করতে পারবে না। কেয়ামতের সময়ের সাথে গোটা সৃষ্টিকুলের সবগুলো উপ-বাস্তবতার শৃঙ্খলের সবগুলো সীমার সার্বিক মান জড়িত, যা মানুষের পক্ষে হিসাব করা সহজ নয়।) (সূরা লোকমান, আয়াত: ৩৪)
এই রহস্যময় আয়াতগুলো থেকে আমরা আরও জানতে পারছি যে কর্মফলের ওপর ভিত্তি ক’রে ভাগ্য পুনর্নির্ধারিত হয় এবং তা একবার নির্ধারিত হয়ে গেলে তাকে আর রদ করা যায় না, কারণ তার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অনেক সময় দেয়া হয়েছিল। এজন্য আমাদের জীবনে যাকিছু ঘটে তাকে হাসিমুখে মেনে নিয়ে ধৈর্যধারণ করাই আমাদের জন্য উৎকৃষ্টতম পন্থা। ধৈর্যধারণ করলে সেই ধৈর্যের শক্তি কর্মফলের প্রতিকূলতাকে এক পর্যায়ে গিয়ে নির্মূল ক’রে দেয়। সুতরাং মনকে সময়মতো ঘরে ফেরাতে হবে।
ভাগ্যের পরিবর্তন হয়-কিন্তু সামগ্রিকতার মান অপরিবর্তনীয়। এই সার্বিক মান (আয়ু/জাগতিক আয়ু) পর্যন্ত আমাদেরকে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, যে স্বাধীনতার মধ্যে আমাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ সীমার বাইরে আমরা যেতে পারি না। এই সীমার পর সমস্ত কর্তৃত্ব আল্লাহ্ নিয়ে নেবেন-আমাদের লাগামহীন পরীক্ষাধীন স্বাধীনতার সমাপ্তি ঘটবে:
যেদিন আকাশ মেঘাপুঞ্জসহ বিদীর্ণ হবে এবং ফেরেস্তাগণকে নামিয়ে দেয়া হবে, সেদিনই প্রকৃত কর্তৃত্ব হবে দয়াময়ের এবং সত্য প্রত্যখ্যানকারীদের জন্য সেদিন হবে কঠিন। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ২৫-২৬)
তারা কি অপেক্ষা করবে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না আল্লাহ মেঘের আবরণ নিয়ে এসে উপস্থিত হন, এবং ফেরেস্তাদেরকে নিয়ে, এবং সেভাবে বিষয়টা মীমাংসা হয়ে যায়? (সূরা বাকারা, আয়াত: ২১০)
এ হলো আসলে একটা গতিশীল বা ডাইনামিক ভারসাম্য, যার সার্বিকতার কোনো পরিবর্তন নেই, ভেতরকার রদবদল হতে পারে। আমাদের উচিত আল্লাহর নিকট থেকে প্রেরণা লাভ করার জন্য ধৈর্যধারণ ক'রে থাকা। নইলে তিনি সমস্ত স্বাধীনতাকে নিজের কাছে ফেরত নিয়ে তাঁরই কর্তৃত্বকে বহাল করবেন। তখন আর সময় থাকবে না।
এবং আমি শিষ্যদের মনে আমাকে বিশ্বাস করার প্রেরণা সৃষ্টি ক'রে দিলাম ... (সূরা মাঈদা, আয়াত: ১১১)
বন্ধু বলল-তাহলে তো একথা সত্য যে প্রত্যেককে আলাদা-আলাদা ব্যাটারি দেয়া হয়েছে।
সবাইকে সমান দেয়া হয়নি?
তাহলে এটা অবিচার হয়ে গেল না?
না। কারণ প্রত্যেককে সেটুকু শক্তি দেয়া হয়েছে যেটুকু আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে তার জন্য যথেষ্ট-কমও না, বেশিও না। কারো ওপর অবিচার করা হয়নি।
তাহলে ঐ যে রিকসাওয়ালা টুপি মাথায় দিয়ে বসে আছে, ওর ক্ষেত্রে কী বলবে? সে তো লেখাপড়ারও সুযোগ পায়নি, প্রচুর দান-খয়রাত করারও সুযোগ পায়নি। ওর কী হবে?
বললাম, এমনও তো হতে পারে যে তাকে সুযোগ দেয়া হয়েছিল কিন্তু সে তা অকাজে ব্যয় করেছে। হতেও পারে সে ছোটবেলা থেকেই ঠিক পথে আছে। সেক্ষেত্রে সে তার পরীক্ষায় ১০০র মধ্যে ১০০ই পাবে, যদি তাকে যে-শক্তি দেয়া হয়েছে সে তা সঠিক কাজে ব্যয় করে। প্রত্যেকের প্রশ্নপত্র আলাদা-প্রত্যেককে নম্বর দেয়ার পদ্ধতিও আলাদা। আল্লাহ তো বলেছেন যে কাউকে তার সাধ্যের অতীত বোঝা চাপানো হয় না।
আমি কাউকেই তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপাই না। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৪২)
ধনী হলেই বা কী হতো? হিসাব বেড়ে যেত। তুমি কি তাহলে ইহকালেই সব চাও। এটাই তো বিশ্বাসহীনতা। সে গরিব না হলে রিকসা চালাত কে? আল্লাহ নিজেই বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ সৃষ্টি করেছেন:
বল-আমার প্রতিপালক যার প্রতি ইচ্ছা তার জীবিকা বর্ধিত করেন অথবা সীমিত করেন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এ জানে না। (সূরা সা-বা, আয়াত: ৩৬)
আল্লাহ জীবিকার ব্যাপারে তোমাদের কাউকে কারো ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন; যাদের শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে, তারা তাদের অধীনস্থ দাস-দাসীদেরকে নিজেদের জীবিকা থেকে এমন কিছু দেয় না, যাতে ওরা এ বিষয়ে তাদের সমান হয়ে যায়। তাহলে কি ওরা আল্লাহরই অনুগ্রহকে অস্বীকার করে? (সূরা নহল, আয়াত: ৭১)
আমিই ওদের পর্থিব জীবনে ওদের মধ্যে জীবিকা বণ্টন করি, এবং একজনকে অপরের ওপর মর্যাদায় উন্নত করি, যেন (তারা) একে অপরের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে... (সূরা যুখরোফ, আয়াত: ৩২)
আল্লাহ তাঁর সকল দাসকে জীবনোপকরণে প্রাচুর্য দিলে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত; কিন্তু তিনি যে পরিমাণ ইচ্ছা সেই পরিমাণ দিয়ে থাকেন। (সূরা শুরা, আয়াত: ২৭)
কত সুন্দর কথা! দাস-দাসীদেরকে অর্থ দিলে তারাও ধনী হয়ে যাবে এই আকাংকায় যারা দান করা বা উপযুক্ত মজুরি দেয়া থেকে বিরত থাকে, তাদেরকে আল্লাহ যথেচিতভাবে তিরস্কার করেছেন। এরূপ উচিত কথা কমুনিজমও কখনও বলতে পারেনি। কমুনিস্টরা কেবল অপরের অর্থ দেখে হিংসা করে এবং মতবাদ ও 'রক্তলাল' বিপ্লবের দ্বারা তা কেড়ে নিয়ে নেতাদের উদর পূর্ণ করতে চায়। আল্লাহ যার যতটুকু দরকার এবং যার যতটুকু প্রাপ্য এবং যাকে যতটুকু দিলে সমাজে অরাজকতা যথাসম্ভব কম থাকবে তাকে ততটুকুই দিয়ে থাকেন। তিনি সীমার ব্যাপারে সচেতন, যদিও মানুষ স্বভাবতই সীমালঙ্ঘন করতে চায়। আল্লাহর লক্ষ্য তাঁর বান্দাদের কর্মফলকে ইহকালে প্রদান ক'রে তাদের জন্য পরকালকে কণ্টকমুক্ত ক'রে রাখা:
তোমরা এই জগতের ক্ষণিকের দ্রব্য সামগ্রীর দিকে তাকাও, কিন্তু আল্লাহ তাকান পরকালের দিকে... (সূরা আনফাল, আয়াত: ৬৭)
ইহকাল এবং পরকালকে একত্রে বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে আল্লাহ কোনো বিশেষ মুহূর্তে কাউকে যা কিছু দিয়েছেন, সেই মুহূর্তে তার জন্য তাই সর্বোচ্চ মঙ্গলের, তার মন সে-ব্যাপারে যা-ই বলুক না কেন। মানুষের লাগামহীন কামনা অনুসারে জগৎটা চললে তা তার জন্যেই ক্ষতিকর হতো:
মানুষ যেভাবে কল্যাণ কামনা করে সেইভাবেই অকল্যাণ কামনা করে। মানুষ তার মনে যা আসে তার পরিণাম চিন্তা না ক'রে তার আশু রূপায়ণ কামনা করে। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ১১)
তুমি কি দেখো না তাকে যে তার কামনা-বাসনাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে?... তুমি কি মনে কর যে ওদের অধিকাংশ শোনে ও বোঝে? ওরা তো পশুর মতোই, বরং ওরা আরো অধম। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ৪৩-৪৪)
সত্য যদি ওদের কামনা বাসনার অনুগামী হতো, তাহলে আকাশমণ্ডলী পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। (সূরা মোমেনুল, আয়াত: ৭১)
বস্তুতপক্ষে, মানুষকে তার কর্মফল ছাড়া আর কিছুই আস্বাদন করানো হয় না আর চেষ্টা, উদ্দেশ্য, কাজের ধরণ, যোগ্যতা সবই তো কর্মফলের রচয়িতা, নয় কি?:
আমি যখন মানুষকে অনুগ্রহের স্বাদ দিই, তখন ওরা ওতে আনন্দিত হয়। এবং ওদের কৃতকর্মের ফলে ওরা দুর্দশাগ্রস্ত হলেই ওরা হতাশ হয়ে পড়ে। (সূরা রুম, আয়াত ৩৬)
এতকিছুর পরও আল্লাহ সমাজে অর্থব্যয়ের মাধ্যমে অর্থের প্রবাহকে সচল রাখার তাগিদ দিয়েছেন, যেন কর্মফল ভোগ করা সত্ত্বেও পারস্পরিক সহানুভূতির মাধ্যমে সবাই সচ্ছলতা লাভ করতে পারে:
বিত্তবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে, এবং যে অভাবগ্রস্ত, সে আল্লাহ যা দান করেছেন তা থেকে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন তা অপেক্ষা গুরুতর বোঝা তিনি তার ওপর চাপান না। আল্লাহ অভাবের পর সচ্ছলতা দান ক'রে থাকেন। (সূরা তালাক, আয়াত: ৭)
হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে। যারা উদাসীন হবে, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্থ। আমি তোমাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি, তোমরা প্রত্যেকে তা থেকে ব্যয় কর-মৃত্যু আসার আগে, নইলে মৃত্যু আসলে সে বলবে-হে प्रतिपालक! আমাকে আরো কিছুকালের জন্য সময় দিলে আমি দান করতাম, এবং সৎশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। কিন্তু নির্ধারিত কাল উপস্থিত হলে আল্লাহ কাউকে সময় দেন না। (সূরা মোনাফেকুন, আয়াত: ৯-১১)
এর পরও স্বাভাবিকভাবেই সমাজে অর্থনৈতিক শ্রেণীভেদ থাকবে, যার ওপর ভিত্তি ক'রে সৃষ্টি হবে কাজের শ্রেণীভেদ। এতে পৃথিবীর কাজকর্মে সুবিধা হয়। আজ পশ্চিমা বিশ্বে কাজের লোক নেই ব'লে-তারা সবাই ধনী ব'লে-আমাদের মতো গরিব দেশ থেকে তারা শ্রমিক নেয়। তোমার যে ভাইটা একটা ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতা ছিল, সেও তো গত বছর রাজনীতি ছেড়ে ইটালি গেছে। তোমাদের তো পয়সার তেমন অভাব নেই। অথচ তার পরও একজন গরিব যেখানে যেতে পারত সেখানে সে যেতে পেরে তো খুশিই হলো। গরিব না হয়েও সে গরিব সেজেছে। এক্ষেত্রে তুমি কী বলবে? সে চুপ ক'রে রইল।
আমি ب'লে চললাম: আসলে আমাদের প্রত্যেককে অপরের ওপর হস্তক্ষেপ করার স্বাধীনতাও দেয়া হয়েছে—একটা সীমার মধ্যে। এতে উভয় পক্ষেরই পরীক্ষা হয়ে যায়—যে অত্যাচারিত হয় তার এবং যে অত্যাচার করে তারও। কিন্তু অত্যাচারিত যদি ধৈর্য ধারণ করে এবং সহজে পাল্টা অসদ্ব্যবহার না করে, এবং ভালোবাসার পথে অটল থাকে, তাহলে সবকিছুই তার পক্ষে যাবে—হয় অত্যাচারী তওবা ক'রে পথে ফিরে আসবে, না হয় আল্লাহ অন্য কোনো উপায়ে তাকে নিবৃত্ত করবেন, না হয় অত্যাচারিত ব্যক্তির দ্বারাই আল্লাহ তাকে সীমালঙ্ঘনের পর শায়েস্তা করবেন। আমরা স্বাধীনতার সম্মান ভোগ করছি ব'লে এটুকু ধৈর্যের খেসারত আমাদেরকে দিতে হবে, এবং তার বিনিময়ও পাওয়া যবে—ইহকালে ও পরকালে:
এই চরিত্রের অধিকারী কেবল তারাই হয়, যারা ধৈর্যশীল; এই চরিত্রের অধিকারী কেবল তারাই হয়, যারা মহাভাগ্যবান। (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ, আয়াত: ৩৫)
আমি আজ তাদেরকে তাদের ধৈর্যের কারণে এমনভাবে পুরস্কৃত করলাম যে, তারাই সফলাকাম হলো। (সূরা মু'মিমূন, আয়াত: ১১১)
কেউ ধৈর্য ধারণ করলে এবং ক্ষমা ক'রে দিলে তা বীরত্বের কাজ। (সূরা শুরা, আয়াত: ৪৩)
ভালো এবং মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত কর উৎকৃষ্ঠ দ্বারা, ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে, সে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো হয়ে যাবে। এই চরিত্রের অধিকারী কেবল তারাই হয়, যারা ধৈর্যশীল; এই চরিত্রের অধিকারী তারাই হয়, যারা মহাভাগ্যবান। যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তাহলে আল্লাহর স্মরণ নেবে। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী। (সূরা হা-মীম-আস্-সিজদাহ্, আয়াত: ৩৪-৩৬)
যারা বিশ্বাসী তারা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখুক। (সূরা মাঈদা, আয়াত: ১১)
মানুষের শ্রেণীভেদ হলো কাজের শ্রেণীভেদ। ঠিক যেন মিল-কারখানার মতো: সেখানে ভিন্ন ভিন্ন দল ভিন্ন কাজ করে এবং কাউকে খারাপ কাউকে ভালো বলা হয় না। যে জুতোর জিহ্বা বানায় তার কাছ থেকে ফিতার হিসাব নেয়া হয় না; যে-ব্যক্তি জুতোর সোল বানায় তার কাছে রঙ-পালিশের হিসাব চাওয়া হয় না। কাজের শ্রেণীভেদের মধ্যে সামাজিক মর্যাদার স্তরভেদ ছাড়া 'অন্য অর্থে' ভালো-মন্দের স্তরভেদ ব'লে কিছু নেই। ইহকালে তো শ্রেণীভেদ খুব কম, পরকালে শ্রেণী থাকবে আরো অনেক বেশি। সেখানেও তা হবে ইহকালের কাজ অনুসারে, যা প্রত্যেককে মেনে নিতে হবে।
লক্ষ্য কর কিভাবে আমি ওদের একদলকে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে থাকি; পরকাল নিশ্চয়ই মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ ও শ্রেয়ত্বে শ্রেষ্ঠতর। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ২১)
তোমরা তো সাম্যবাদে বিশ্বাসী, শ্রমিকসংগ্রামে বিশ্বাসী। তোমাদের নেতারা কি কোনোদিন শ্রমিক ছিল? বরং তোমাদের নেতাদের এত অহংকার যে তারা নিজেদেরকেই মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান ব'লে দাবি করে।
বন্ধুটি বলল: যেসব শিশু মারা যায় তাদের আয়ু নির্ধারিত ছিল?
হ্যাঁ। হাদিসে তো বলাই হয়েছে যে শিশুরা বেহেস্তে যাবে। শুধু তাই নয়, রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, 'যার দুটো শিশু সন্তান মারা যায়নি, আমি তাকেই আটকুরো বলি,' কারণ তাদের উছিলায় তাদের বাবা-মা বেহেস্তে চ'লে যাবে। এখানেও, প্রকৃত অর্থে, সময় দ্বারা পরিমাপিত আয়ু পূর্বনির্ধারিত নয়। পূর্বনির্ধারিত হলো কিছু শর্ত-যদি এরূপ হয়, তাহলে তার ফল এরূপ হবে, এবং তার পারলৌকিক ফল হবে এরূপ। যেমন, হাদীসে বলা হয়েছে যে যদি কেউ তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হওয়ার আগে ওযু না করে এবং কমপক্ষে বিসমিল্লাহ ব'লে মিলন শুরু না করে, তাহলে ঐ মিলন থেকে যে সন্তান জন্মাবে তার ওপর ইবলিসের প্রভাব দৃঢ় হবে। এই বিধানটাই পূর্বনির্ধারিত। তোমার এইডস থাকলে তোমার সস্থানেরও এইডস হবে-এটাই তো নিয়ম। তখন তোমার সন্তান এইডসে মারা গেলে তুমি কি বলবে যে আল্লাহই তার আয়ুকে ক্ষুদ্র ক'রে পাঠিয়েছিলেন? আসলে আল্লাহ নির্ধারণ ক'রে দিয়েছিলেন তার মোট জীবনীশক্তি-যা ক্ষয় হতে পারত ৫০০ বার জ্বর হবার মাধ্যমে, তা ক্ষয় হয়ে গেল ১ বার এইডস হয়ে। এইডস হলে যা হবার কথা তা হয়েছে কি না সেটাই দেখবার বিষয়। তুমি অপরাধ করবে, অথচ তোমার অর্থ-সম্পদ সন্তান মান-মর্যাদা তার দ্বারা প্রভাবিত হবে না, তা কী ক'রে হয়? তুমি তো সে-সবের কারণেই আল্লাহকে ভুলে থাক, এ কারণে তোমার কর্মফল সে-সবের মধ্যে প্রবেশ ক'রেই তোমার কাছে শান্তি ও পরীক্ষা হয়ে ফিরে আসে। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন যে তিনি মানুষের শান্তি এবং পরীক্ষাকে তার সন্তান-সন্তুতির জীবন-মৃত্যুর মধ্যেও প্রবিষ্ট করেছেন যুগে যুগে। ফেরাউন তৎকালীন ধার্মিকদের কন্যাসন্তানদেরকে বাঁচিয়ে রেখে পুত্রসন্তানদেরকে হত্যা করত। তা কি আল্লাহ করতেন? আল্লাহ নিজে যা করেন, তার জন্য মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে কেন? মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে তার জন্য যা সে আল্লাহর অবকাশের সুযোগ নিয়ে নিজে করে। কোরআনে বলা হয়েছে যে পরকালে শিশুকেও জিজ্ঞাসা করা হবে কারা তাকে হত্যা করেছিল এবং কেন। তোমার সবকিছু আল্লাহর বিধান দ্বারা পরিচালিত—এবং এই বিধানই পূর্বনির্ধারিত, সময়-পরিমাপিত আয়ু নয়। আল্লাহ মানুষের দ্বারাই মানুষকে পরীক্ষা করেন ও শাস্তি দেন। কোরআনে বলা হয়েছে যে ফেরাউন ছিল তার জাতির পরীক্ষাস্বরূপ।
আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে অন্যদল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে বিধ্বস্ত হয়ে যেত খ্রীস্টান-বৈরাগীদের উপাসনাস্থান, গির্জা, ইহুদিদের উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ, যাতে অধিক স্মরণ করা হয় আল্লাহর নাম। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৪০)
তবুও আল্লাহ দয়াময়, করুণাশীল। এ কারণে তিনি তোমার শাস্তির বা পরীক্ষার জন্য সন্তানের 'অকালমৃত্যু'র সুযোগ ক'রে দিলেও সেই সন্তানের প্রতি কোনো অবিচার করবেন না-তাকে তিনি বেহেস্তেই স্থান দেবেন। কারণ তার তো কোনো দোষ ছিল না, সে তার জাতিগত অভিশাপের শিকার। আল্লাহ তার পরীক্ষা, শাস্তি, অভিশাপকে সংশ্লিষ্ট জাতির মধ্যে বিস্তৃত ক'রে দেন। এটা ইহকালের ফলশ্রুতি। জাতি খারাপ হওয়ার কারণে ঐ জাতির কোনো ভালোমানুষকেও সে শাস্তির ভাগ নিতে হবে-কারণ সে নিজে ভালো হওয়া সত্ত্বেও অন্যদেরকে ভালোর পথে আহ্বান করেনি। তবে তার পরকালের বিচার হবে তারই আমলনামা অনুসারে। সে ভালো কাজ করলে বেহেস্তেই যাবে। মানুষের দায়িত্ব এবং অস্তিত্ব সামাজিকভাবে দলীয়-সে একা বাঁচতে পারে না; এ কারণে তার সমাজের যন্ত্রণার ভাগ তাকেও নিতে হবে, যেভাবে সে তার সমাজের সুখের ভাগও পার্থিব নিয়মে পেয়ে থাকে। কিন্তু কোরআনে বিভিন্ন আয়াতে স্পষ্ট ক'রেই বলা হয়েছে যে তা দ্বারা তার পরকাল বিঘ্নিত হবে না। মানুষের কর্ম, শাস্তি, পরীক্ষা, অস্তিত্বের এরূপ 'জাতীয়করণ' মানুষেরই মর্যাদা এবং দায়িত্বের ব্যাপ্তির কারণেই প্রতিষ্ঠিত-প্রতিটি মানুষের মধ্যেই রয়েছে তার গোষ্ঠী/জাতির আর সব মানুষের প্রতিবিম্ব। কারণ তাদের জন্মগত উৎস এক। আর সার্বিক অস্তিত্বের লড়াইয়ের পরীক্ষা পার্থিব নিয়মে গোটা জাতির জন্যই কার্যকর। আল্লাহ রক্তের দ্বারা সম্পর্কিত জাতিকে পরীক্ষার এক-একটি 'একক' হিসেবে বিবেচনা করেন:
প্রত্যেকটা জাতির জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত আছে; যখন তাদের সময়সীমা শেষ হয়ে যায়, তখন তারা তাকে এক ঘণ্টার জন্যও বিলম্ব করাতে পারে না, কিংবা তারা তা ত্বরান্বিতও করতে পারে না। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৩৪)
প্রত্যেক যুগের জন্য রয়েছে একটি ধর্মগ্রন্থ (যা আমি অবতীর্ণ করেছি)। (সূরা রা'দ, আয়াত: ৩৮)
আমি প্রত্যেক ধর্ম সম্প্রদায়ের জন্য ধর্ম পদ্ধতি নির্ধারিত ক'রে দিয়েছি, যা তারা পালন করে; সুতরাং তারা যেন তোমার সাথে এ ব্যাপারে তর্ক না করে। তুমি ওদেরকে তোমার প্রতিপালকের দিকে আহ্বান কর। তুমি সরল পথেই আছ। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৬৭)
তারপর তাদের পর অসৎ বংশীয়েরা উত্তরাধিকারী হয়েছিল, যারা নামায নষ্ট করেছিল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করেছিল; ফলত তারা অচিরেই শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। (সূরা মরিয়ম, আয়াত: ৫৯)
তিনিই 'আদ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছিলেন; এবং সামুদ সম্প্রদায়কেও-কাউকেই তিনি অব্যাহতি দেননি। এবং এদের আগে নূহের সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছিলেন; ওরা ছিল অতিশয় অত্যাচারী, অবাধ্য। তিনিই লূত সম্প্রদায়ের আবাসভূমিকে শূন্যে উত্তোলন ক'রে নিক্ষেপ করেছিলেন। সর্বগ্রাসী শান্তি ওকে আচ্ছন্ন করল।... কেয়ামত আসন্ন। আল্লাহ ছাড়া কেউই তা ঘটাতে সক্ষম নয়। তবে কি তোমরা এ কথায় বিস্ময়বোধ করছ? এবং হাসিঠাট্টা করছ? ক্রন্দন করছ? তোমরা তো উদাসীন। অতএব তোমরা আল্লাহকে সিজদা কর এবং তাঁরই উপাসনা কর। (সূরা নাজম, আয়াত: ৫০-৬২)
ওরা কি পৃথিবীকে ভ্রমণ করে না? করলে দেখত ওদের পূর্ববর্তীদের কী পরিণাম হয়েছিল। পৃথিবীতে তারা ওদের চেয়ে শক্তি এবং কীর্তিতে প্রবলতর ছিল। অতঃপর আল্লাহ তাদের অপরাধের জন্য তাদেরকে শাস্তি দিয়েছিলেন, এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে তাদেরকে রক্ষা করার কেউ ছিল না। (সূরা মুমিন, আয়াত: ২১)
গোটা কোরআন এরূপ আয়াতে ভরপুর। তবে এই যুগে মিলিত হয়েছে বিভিন্ন গোষ্ঠী। মিশ্রিত হয়ে গেছে সব ধরনের রক্ত এবং বৈশিষ্ট্য। ফলে এখন বিশেষ কিছু আচরণ বিশেষ কোনো জাতির লোক ক'রে থাকে এমনটি নয়। এখন স্বভাবের বৈচিত্র্য বেশি। ফলে জাতি-বিশেষের জন্য বিশেষ ধর্মগ্রন্থ বা সতর্ককারী পাঠাবারও দরকার এখন নেই। এখন সব জাতিই 'আন্তর্জাতিক'। একথা আল্লাহ স্পষ্টভাবে কোরআনে উল্লেখও করেছেন:
আমি ইচ্ছা করলে প্রতিটি জনপদে একজন সতর্ককারী (নবী) পাঠাতে পারতাম। (সূরা ফোরকান, আয়াত ৫১)
তিনি তা কেন পাঠাচ্ছেন না, কেন যে মুহাম্মদ (সঃ) শেষ নবী, তার প্রতি সুচারুরূপে নির্দেশ করার জন্যই সর্বজ্ঞানী আল্লাহ একথাটা এভাবে বলেছেন।
আসলে আল্লাহ সবকিছু আগে থেকে ঠিক ক'রে রেখেছেন এবং 'যদি এরূপ হয়, তাহলে তার ফল এরূপ হবে' — এই চলতি কর্মফলের বিধানও সেই পূর্বনির্ধারণের একটা বিধি। এই বিধিই কোরআন। এর বাইরে দৃশ্য-অদৃশ্য জগতে কিছু নেই। কোরআনের রহস্য আমি নিজেই জানি খুব কম - যেটুকু জানি তা বর্ণনা করতেও ছাপানো কাগজের দশ হাজার পৃষ্ঠারও বেশি লাগবে। সুতরাং এ ব্যাপারে কথা বাড়াতে চাই না। মুসলমানের আসল হলো পরকাল। এটাকে গৌণ ক'রে দেখলে ইহকাল নিয়ে এরকম লক্ষ লক্ষ প্রশ্নও জাগবে। যদিও তোমার যে-কোনো প্রশ্নেরই জবাব আছে, তবুও সব প্রশ্নের জবাব সবাইকে দেয়াও নিষেধ।
তোমাদের উপাস্যই একমাত্র উপাস্য, সুতরাং যারা পরলোকে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর সত্য-বিমুখ এবং তারা অহংকারী। এ নিঃসন্দেহ যে, আল্লাহ জানেন যা ওরা গোপন করে এবং যা ওরা প্রকাশ করে। তিনি অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা নহল, আয়াত: ২২-২৩)
পরলোক সম্পর্কে ওদের জ্ঞান তো নিঃশেষিত হয়েছে; ওরা তো এ বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করে এবং ওরা অন্ধ। (সূরা নাম্ল, আয়াত : ৬৬)
হে মানুষ! পুনরুত্থান সম্বন্ধে যদি তোমরা সন্দেহপূর্ণ হও, (তাহলে চিন্তা কর) আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর শুক্রবিন্দু থেকে, তারপর রক্তপিণ্ড থেকে তারপর পূর্ণ বা অপূর্ণ আকৃতিবিশিষ্ট মাংসপিণ্ড থেকে। যেন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেই (তোমরা কিভাবে জীবন লাভ করেছ এবং কিভাবে মৃত্যুর পর আবার পুনরুত্থিত হবে)। আমি যা ইচ্ছা করি, তা এক নির্দিষ্টকালের জন্য মাতৃগর্ভে রেখে দিই, তারপর আমি তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি, যেন তোমরা নিজ নিজ যৌবনে উপনীত হতে পার। তোমাদের মধ্যে (শিশু অবস্থায়) কারো কারো মৃত্যু ঘটে এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে রোগগ্রস্ত করা হয়, যার ফলে তারা যা জানত সে সম্বন্ধে তারা ভুলে যায়। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৫)
বস্তুত যারা পরলোকে বিশ্বাস করে না, তারা শান্তি এবং ঘোর বিভ্রান্তিতে আছে। ওরা কি ওদের সামনে ও পেছনে যে আসমান ও জমিন আছে, তার প্রতি লক্ষ্য করে না? আমি ইচ্ছা করলে ওদের সহ ভূমি ধ্বসিয়ে দেব অথবা ওদের ওপর আকাশ খণ্ডের পতন ঘটাবে; আল্লাহর অভিমুখী প্রতিটি দাসের জন্য এতে অবশ্যই নিদর্শন আছে। (সূরা সা-বা, আয়াত: ৮-৯)
... তোমরা এই জগতের ক্ষণিকের দ্রব্য সামগ্রীর দিকে তাকাও, কিন্তু আল্লাহ তাকান পরকালের দিকে... (সূরা আনফাল, আয়াত: ৬৭)
দেখ বন্ধু, আসল সমস্যা হলো সন্দেহ। আর পূর্ণ জ্ঞান অর্জন না করা পর্যন্ত সন্দেহ যেমন ঘুচবে না, তেমনি মাথা নত ক'রে শরীয়ত অনুসারে না চললেও সব জ্ঞান পাওয়া যাবে না। নামাজে দাঁড়ালে মনের মধ্যে গাদা-গাদা প্রশ্নের উদ্ভব হয়। এটাই প্রমাণ করে যে আমাদেরকে জ্ঞানী হতেই হবে। প্রশ্নের জবাব পেতেই হবে। নামাজের মধ্যকার প্রশ্ন যেমন মনের আত্মচেতনার স্বেচ্ছাচারিতার চিত্র তুলে ধরে, তেমনি তা মনকে জ্ঞানের লক্ষ্যেও ধাবিত করে। জ্ঞানার্জনকে প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য আবশ্যক (ফরজ) ক'রে দেয়া হয়েছে। এই আবশ্যকতারও অবশ্য শ্রেণীভেদ আছে। তুমি কোরআন পড়তে শেখনি বললে পরকালে কোনো লাভ হবে না। অন্য দিকে কিছু ত্যাগ স্বীকার করেও তো তা শিখতে পারতে। আবার তোমাকে জগতের সমস্ত জ্ঞান অর্জন করারও দরকার হবে না-সে উদ্দেশ্যে যাদের জন্ম হয়েছে তাদেরকে সেখানে পৌঁছে দেয়া হবেই। জীবনের সবকিছু ত্যাগ ক'রে হলেও তারা সেখানে পৌঁছে যাবে। অনেক দরিদ্র অলি আছেন যাদেরকে তুমি এদেশের প্রধানমন্ত্রীও বানাতে পারবে না। অথচ তাঁদের জ্ঞানের সুফল সব ইমানদাররাও পরকালে এবং ইহকালে পাবে। কোনো অবিচার নেই। আউলিয়াদের হৃদয়কে এমন ক'রে দেয়া হয় যে তাঁরা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্যই বেঁচে থাকেন-আমাদের মঙ্গলের জন্যই নামাজ পড়েন। হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) বলেছিলেন যে তিনি বেঁচে ছিলেন কেবল মুমিনদের স্বার্থে। কাউকে কোনো জ্ঞান বা যোগ্যতা দেয়া হয়েছে-এর মানে এটাই যে সে-জ্ঞান এবং যোগ্যতার সম্পূর্ণ দায়িত্ব তার। তাতে যার যে ভাগ আছে পরকালে তার কাছে তা ঠিকই পৌঁছে যাবে। মনে রেখ, তুমি না বুঝলে কী হবে, এমনও ব্যক্তি আছেন যাদেরকে এই বণ্টনপ্রক্রিয়া সরাসরি চক্ষুসভাবেই দেখানো হয়। একথা হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) নিজেই দ্ব্যর্থহীনভাবে ব'লে গেছেন। অদৃশ্যে অবিশ্বাস হলো কোরআনে অবিশ্বাস। পবিত্র কোরআনের শুরুতেই সূরা বাকারার প্রথম পাঁচ আয়াতের মধ্যেই একথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে এই কোরআন তাদের জন্যেই পথপ্রদর্শক যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে।
যাহোক, চেতনা হলো বাস্তবতার মানসিক প্রতিচ্ছবি। চেতার সাথে আত্মচেতনার দূরত্ব যতটুকু, ব্যক্তি-মনে উক্ত বাস্তবতার বা সত্যের তথা আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাসও ততটুকু। কোরআনে আল্লাহ বলেছেন যে তিনিই পরম বাস্তবতা।
... আল্লাহ তিনিই পরম বাস্তবতা। (সূরা হজ্ব, আয়াত : ৬২)
নামাজের রহস্যময় টাইম-মেশিনের মধ্যে প্রবেশ করা মাত্রই নামাজী এই চেতনা এবং আত্মচেতনার দূরত্বের মধ্যে প'ড়ে যায়। নামাজে মনোযোগ/আত্মচেতনা যত বেশি নিবদ্ধ হয়, এই দূরত্ব তত কমে এবং এভাবে নামাজী পরম বাস্তবতার দিকে এগুতে থাকে।
তার ভাগ্যে মে'রাজ জুটে যায়।
প'ড়েই দ্যাখ না নামাজ, একদিন।
সে বলল-কোটি কোটি লোকই তো পড়ে।
বললাম-সবাইকেই নামাজ ভালোভাবে পড়তে বলা হয়েছে।
সে এবার আগ্রহী হয়ে প্রশ্ন করল-বললে না যে আমরা কোথেকে কোথায় এসেছি?
বললাম-তা তো কোরআন-হদিসেই বলা আছে। আমি কথাগুলো বলেও দিয়েছি।
কিন্তু স্পেস-টাইমেরই যখন কোনো কনক্রিট অর্থ নেই, তখন কোথা থেকে কোথায় এলাম তা স্থান বা সময়ের মাপকাঠি দিয়ে মেপে বললে কি কোনো বিশেষ লাভ হয়?
তার আগ্রহ বেড়েছে দেখে বললাম-হ্যাঁ, আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে, অর্থাৎ অদৃশ্যের বা গয়েবের ভাষায়, এই ভ্রমণ এবং ফেরত ভ্রমণের বিশেষ কিছু দিক বা অর্থ আছে, যার একটা রহস্যময় সত্য আমি তোমাকে বলব। এ এমন এক সত্য যা প্রত্যক্ষ জ্ঞান ছাড়া কেউ অর্জন করতে পারে না, কিন্তু কারো কাছ থেকে শুনে এর প্রকৃত অর্থের কিছুটা বোঝার জন্য বিশেষ আমল না থাকলেও চলে। এরূপ সত্য স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনই করুণা ক'রে তাঁর অনুগত বান্দাদেরকে শেখান-কোনো পুস্তক-পুঁথি প'ড়ে বা বাহ্যিক ইল্ম অর্জন ক'রে এ জানা যায় না, ইসলামী শিক্ষায় বড় পাশ দিলেও না, যদি না হৃদয়টাকে পুরোপুরি খুলে দেয়া হয়। সুতরাং বুঝতেই পারছ কথাটা তোমাকে কতটা গুরুত্বের সাথে শুনতে হবে।
আসলে, স্পেস-টাইমকে আতিক্রম ক'রে বলা যায় যে আমারা সবাই কোনো দূর থেকে দূরে আসিনি, আমরা ...
সে আগ্রহের সাথে তাকিয়ে রইল।
আমরা ভেতর থেকে বাইরে এসেছি।
সে চুপ ক'রে রইল। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ ক'রে ভাবল। তারপর আবারও আগ্রহের সাথে তাকাল।
ব'লে চললাম: আমাদের জন্মের সময়ে আমাদের চেতনা বা Consciousness-এর একটা ধারা থেমে গিয়েছিল এবং একটা ধারা শুরু হয়েছিল। একে তুমি তোমার আমিত্বের দুটো পর্যায় বলতেও পায়। জন্মে যা শুরু হয়েছিল—এই দেহ, মন, কর্ম, শিক্ষা ... মৃত্যুতে তা শেষ হয়ে যাবে। এবং জন্মের সময়ে যা থেমে গিয়েছিল, মৃত্যুর সময়ে তা আবার শুরু হবে। ফলে গোটা জীবনের বাহ্যিকতাকে আমরা ত্যাগ ক'রে যাব—আমাদের সাথে যাবে, অর্থাৎ মৃত্যুর সময়ে যে-পর্যায় শুরু হবে তার সাথে মিশে যাবে, সেই আমল বা কাজের ফল যা আমরা আজীবন ধ'রে করেছি। আসলে তা সাথে যাবে বলাও ঠিক নয়, তা আগেই পৌঁছে যায়। জন্মের সময়ে আমরা ভেতর থেকে বাইরে এসেছিলাম—অর্থাৎ আল্লাহর শ্বাস্বত বৈশিষ্ট্যসমূহের একটা সুষম সমন্বয় এবং একটা অঙ্গীকার যা দেখা ধরা ছোঁয়া যায় না, নিয়ে এসেছিলাম, কারণ সেই বৈশিষ্ট্যগুলোকে আল্লাহ প্রকাশ করেছিলেন—এবং মৃত্যুর সময়ে এই প্রকাশ্য দেহ ফেলে রেখে এমনভাবে এখান থেকে চ'লে যাব ঠিক যেন আবার বইরে থেকে ভেতরে চ'লে যাব এবং, মজার ব্যাপার হলো, তখন থেকে এই 'ভেতরটাই' 'বাহির' ব'লে গণ্য হয়ে সমগ্র নতুন বাহ্যিকতায় রূপান্তরিত হবে।
এখান থেকে কী যাবে? ধরা, ছোঁয়া, আস্বাদন করা যায় এমন কিছুই না। যাবে সেই উদ্দেশ্য (নিয়ত), ভালোবাসা, ক্রোধ, হিংসা, ত্যাগ, ধৈর্য ইত্যাদি বিমূর্ত বা abstract বৈশিষ্ট্য যা আমরা আল্লাহর গুণাবলীর উছিলায় সেগুলির সাথেই কর্মের মাধ্যমে মিশিয়ে দিয়েছি। এটা তোমার কাছে স্পষ্ট হবে মৃত্যুর সময়ে, যদিও তখন আর ছটফট ক'রে কোনো লাভ হবে না।
এখন তোমাদের সামনে থেকে পর্দা সরিয়ে নিয়েছি, আজ তোমরা স্পষ্ট দেখছ। (সূরা কাফ, আয়াত: ২২)
যখন ওদের কারে মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন সে বলে—হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আবার (পৃথিবীতে) পাঠাও, যাতে আমি সৎকাজ করতে পারি, যা আমি আগে করিনি।— না এ হবার নয়। এ তো আর একটা উক্তিমাত্র। ওদের সামনে পর্দা থাকবে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত। (সূরা মু'মিনুন, আয়াত: ৯৯-১০০)
রহস্যের পর্দা ছিড়ে যাবে, ফলে ধরা পড়বে একদিনের জ্ঞানের দারিদ্র্য, কিন্তু ইমানের পর্দা থাকবে চিরকাল, ফলে বেইমানের শতবার জন্ম হলেও সে ইমান বা বিশ্বাস ফিরে পাবে না কোনোদিন।
জন্ম শুরু হয়েছিল অদৃশ্য বৈশিষ্ট্য দ্বারা—তা প্রকাশ পেয়েছিল দৃশ্যজগৎ রূপে; আর মৃত্যুতে প্রকাশ্য জগৎ পরিত্যক্ত হয়ে এখান থেকে অবশিষ্ট এবং অক্ষত থাকবে কিছু অদৃশ্য শক্তি বা পাথেয় যা আল্লাহর গুণাবলীর সাথে মিশে মৃত্যুহীন হয়েছে, এবং সেগুলোর মর্যাদা অনুসারে গ'ড়ে উঠবে নতুন প্রকাশ্য ভূবন। সুতরাং তুমি যদি এখন নামাজ না পড়, ভালো কাজ না কর, দান না কর, ধৈর্য না ধর, তাহলে বাইরে থেকে তুমি কী পাঠালে যা হবে পরবর্তী জীবনের ধারক ও বাহক?
প্রত্যেক মানুষের চিন্তা করা উচিত যে, সে আগামীকালের জন্য আগে/সামনে কী পাঠিয়েছে। (সূরা হাশর, আয়াত: ১৮)
কে আছে যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে; তাহলে তিনি তা তার জন্য বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন, এবং তার জন্য মহাপুরস্কার আছে। (সূরা হাদীদ, আয়াত: ১১)
তোমরা সৎকাজ করলে তা করবে নিজেদের জন্যে এবং মন্দ কাজ করলে তাও করবে নিজেদের জন্য। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ৭)
পরলোক সম্পর্কে ওদের জ্ঞান তো নিঃশেষিত হয়েছে; ওরা তো এ বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করে এবং ওরা অন্ধ। (সূরা নাম্ল, আয়াত: ৬৬)
হে মানুষ! পুনরুত্থান সম্বন্ধে যদি তোমরা সন্দেহপূর্ণ হও, (তাহলে চিন্তা কর) আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর শুক্রবিন্দু থেকে, তারপর রক্তপিণ্ড থেকে, তারপর পূর্ণ বা অপূর্ণ আকৃতিবিশিষ্ট মাংসপিণ্ড থেকে। যেন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেই (তোমরা কিভাবে জীবন লাভ করেছ এবং কিভাবে মৃত্যুর পর আবার পুনরুত্থিত হবে)। আমি যা ইচ্ছা করি, তা এক নির্দিষ্টকালের জন্য মাতৃগর্ভে রেখে দিই, তারপর আমি তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি, যেন তোমরা নিজ নিজ যৌবনে উপনীত হতে পার। তোমাদের মধ্যে (শিশু অবস্থায়) কারো কারো মৃত্যু ঘটে এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে রোগগ্রস্ত করা হয়, যার ফলে তারা যা জানত সে সম্বন্ধে তারা ভুলে যায়। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৫)
এই পার্থিব জীবন তো খেলা-ধুলা ছাড়া আর কিছু নয়। পারলৌকিক জীবনই তো প্রকৃত জীবন। (সূরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৪)
তাহলে এখন থেকে ভেতরটার দিকে নজর দেয়া চাই। নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত-এগুলো হলো ভেতরটাকে মজবুত করার উপায়। এখানে ভোগ-বিলাসিতা যাই করবে, তার কুফল সাথে নিয়ে যেতে হবে অথচ তার উপভোগের শান্তি এখানেই পরিত্যক্ত হবে। আল্লাহ বলেছেন-আল্লাহ জানেন ওরা যা আগে পাঠায় এবং যা পেছনে রেখে যায়। এমন দুর্ভাগ্য তুমি সজ্ঞানে বেছে নেবে? তাহলে পবিত্র কোরআনের বাণী শোনো:
তারা যা কিছু পার্থিব জীবনে ব্যয় করে তার দৃষ্টান্ত হিমশীতল বায়ুর মতো, যা যে-জাতি নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছে তাদের শস্যক্ষেত্রকে আঘাত করে ও বিনষ্ট করে। আল্লাহ তাদের প্রতি কোনো জুলুম করেননি, তারাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে। (সূরা আল্-ইমরান, আয়াত: ১১৭)
... তোমরা এই জগতের ক্ষণিকের দ্রব্য সামগ্রীর দিকে তাকাও, কিন্তু আল্লাহ তাকান পরকালের দিকে ... (সূরা আনফাল, আয়াত: ৬৭)
তোমরা প্রাসাদ নির্মাণ করছ এই ভেবে যে তোমরা চিরস্থায়ী হবে। (সূরা শোয়ারা, আয়াত: ১২৯)
নারী, সন্তান, বাশিকৃত স্বর্ণরৌপ্য আর সুশিক্ষিত অশ্বরাজি, গবাদিপশু এবং ক্ষেতখামারের প্রতি আসক্তি মানুষের নিকট সুন্দর ও লোভনীয় করা হয়েছে-এসব পার্থিব জীবনের ভোগ্যবস্তু। আর আল্লাহ-তাঁর নিকট শ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থল রয়েছে। (সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৪)
হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে। যারা উদাসীন হবে, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্থ। আমি তোমাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি, তোমরা প্রত্যেকে তা থেকে ব্যয় কর-মৃত্যু আসার আগে, নইলে মৃত্যু আসলে সে বলবে-হে प्रतिपालक! আমাকে আরো কিছুকালের জন্য সময় দিলে আমি দান করতাম, এবং সৎশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। কিন্তু নির্ধারিত কাল উপস্থিত হলে আল্লাহ কাউকে সময় দেন না। (সূরা মোনাফেকুন, আয়াত: ৯-১১)
দ্যাখ বন্ধু, আগেই বলেছি যে তোমার আমিত্বের আছে দুটো স্তর। নামাজে তোমার আমিত্বের এই দুটো স্তরের মধ্যে জোড়াতালি লাগানোর কাজ ঘাটে। নামাজ যদি তুমি না পড়, তাহলে, এমনকি এই জীবনে গভীর আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করলেও, মৃত্যুর সময়ে দেখবে যে তুমি ছড়িয়ে ছিটেয়ে গেছ, কিছুই তোমার আয়ত্তে থাকছে না।
তারা যা কিছু পার্থিব জীবনে ব্যয় করে তার দৃষ্টান্ত হিমশীতল বায়ুর মতো, যা যে-জাতি নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছে তাদের শস্যক্ষেত্রকে আঘাত করে ও বিনষ্ট করে। আল্লাহ তাদের প্রতি কোনো জুলুম করেননি, তারাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে। (সূরা আল্-ইমরান, আয়াত: ১১৭)
যেদিন আকাশ মেঘাপুঞ্জসহ বিদীর্ণ হবে এবং ফেরেস্তাগণকে নামিয়ে দেয়া হবে, সেদিনই প্রকৃত কর্তৃত্ব হবে দয়াময়ের এবং সত্য প্রত্যখ্যানকারীদের জন্য সেদিন হবে কঠিন। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ২৫-২৬)
তখন তোমাকে আল্লাহর কাছে ফেরত যেতে হবে। কিন্তু আল্লাহর সান্নিধ্যই তখন হবে তোমার জন্য দোজখ। একই ঘি—মানুষ খেয়ে হজম করে অথচ কুকুরে খেয়ে তা হজম করতে পারে না। আল্লাহর সান্নিধ্যই বেহেস্ত, তাঁর সান্নিধ্যই দোজখ। দোষ তাঁর নয়, তোমার। তুমি এখন একটা মোটা জামা পরেও শীতে কাঁপছ, অথচ সাইবেরিয়া থেকে কোনো লোক এখানে এলে সে খালি গায়েও ঘামবে। তাহলে তুমি দোষ দেবে কাকে? এই আবহাওয়ারূপ বাস্তবতাকে নাকি তোমার দেহকে, যে এই আবহাওয়া থেকে তৃপ্তিটুকু নেয়ার জন্য উপযুক্ত হয়নি?
আল্লাহই পরম বাস্তবতা। পরকালের বাস্তবতা ইহকালের আপেক্ষিক বাস্তবতার মতো অসম্পূর্ণ হবে না। তা হবে পরিপূর্ণ। তাতে কোনো মাত্রাঘাটতি থাকবে না।
এখানকার আপেক্ষিক বাস্তবতায় ডুয়ালিটি বা দ্বৈততা আছে, কিন্তু সেই বাস্তবতায় ডুয়ালিটি ব'লে কিছু থাকবে না, এবং ফলে থাকবে না কোনো আত্মবিরোধ। ফলে সেই বাস্তবতায় প্রবেশ করা মাত্রই সবকিছু দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে—ভালো, মন্দ। ভালোর কৃতিত্ব ভালোর প্রাপ্য, খারাপের দোষ খারাপকেই বহন করতে হবে। কারণ বাস্তবতায় কোনো ঘাটতি নেই।
সেইদিনই আল্লাহর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হবে। তিনিই ওদের বিচার করবেন। (তাঁর কর্তৃত্বের শক্তিতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের আমিত্বের স্বাধীনতার বিলুপ্তি ঘটবে, এবং ফলে সবাই যার যার কাজ অনুযায়ী বিভক্ত হয়ে যাবে।) (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৫৬)
(এবং বলা হবে) হে অপরাধীগণ! তোমরা আজ আলাদা হয়ে যাও। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৫৯)
সত্য যদি ওদের কামনা বাসনার অনুগামী হতো, তাহলে আকাশমণ্ডলী পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। (যারা পৃথিবীতে তাদের কামনা-বাসনাকে প্রাধান্য দিয়েছে, ধর্মের মহাজাগতিক, শ্বাশ্বত বিধান মেনে চলেনি, তাদের কাজ দ্বারা পরকালের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবতায় কোনো ফাটল বা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে না ব'লে তারা নিজেরাই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে—বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে—এমনকি প্রত্যেকে নিজের সাথেই বিরোধিতা করবে, যা কোরআনে বলা হয়েছে।) (সূরা মোমেনুল, আয়াত: ৭১)
হে মানবজাতি, তোমাদের ঔদ্ধত্য তোমাদেরই বিরুদ্ধে যায়। (সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৩)
আল্লাহ কখনও তার বান্দাদের সাথে অন্যায় আচরণ করেন না। (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫১)
তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, তাই আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গেছেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৬৭)
কিন্তু আল্লাহ তাদের কোনো ক্ষতি করেননি; তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে। (সূরা নহল, আয়াত: ৩৩)
তোমরা অবিশ্বাসী হলে—নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন—তিনি তাঁর সেবকগণের অকৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন না। (সূরা যুমার, আয়াত: ৭)
যে সৎ কাজ করে, সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে, এবং কেউ মন্দ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। তোমার প্রতিপালক তাঁর দাস-দাসীদের প্রতি কোনো জুলুম করেন না। (সূরা হা-মীম-আস্ সিজদাহ্, আয়াত: ৪৬)
সেখানে একজন ভালো আমলের ব্যক্তি একটা আঙুর খেয়ে অমৃতের স্বাদ পাবে, অথচ একই আঙুর একজন খারাপ আমলের লোক খেতেই পারবে না—তার গলায় আটকে যাবে, কিংবা সে তা মুখে পুরামাত্রই তা পঁচা-গলা আবর্জনায় রূপান্তরিত হবে। দোষটা আঙুরের নয়, মুখের। ফলত বিভক্ত হয়ে যাবে তাদের আবাসস্থলও। তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তোমার আমিত্ব দুটি মাত্রায় ভাগ হয়ে গেছে বলেই তোমার মানে প্রশ্ন জাগে 'আমি কে?'-অথচ দুই 'আমির' মিলনবিন্দুতে না পৌঁছানো পর্যন্ত তুমি কোনো সঠিক উত্তরও পেতে পার না। নামাজ এই মিলন বিন্দুতে তেমাকে পৌঁছে দেবে। তোমার ভেতরের 'আমি' আল্লাহকে চেনে। তাঁর সাথে মিলতে পারলেই আল্লাহর সাথে মিলনের পথ খুলে যায়। এ কারণে নামাজ হলো মুমিনের মেরাজ। তুমি কি আকাশ ভ্রমণে যেতে চাও না?
তোমার নামাজ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তোমার দুই 'আমি'র মধ্যে দূরত্ব রয়ে যাবে, মনে ডুয়ালিটি বা দ্বৈততা রয়ে যাবে, সন্দেহ রয়ে যাবে-মৃত্যুর সময়ে সে তোমাকে বিকর্ষণ করবে, তখনও তোমার আত্ম-চেতনা তোমার চেতনার সাথে মিলতে পারবে না, এবং তুমি নিজেকেও পবে না আল্লাহকেও পাবে না। মনে রেখ, রসুল (সঃ) বলেছেন:
যে নিজেকে জেনেছে, সে আল্লাকে জেনেছে।
মনে রেখ, দোজখের আগুনে পুড়বে তোমার আত্ম-চেতনা, এবং চেতনাই তার দোজখ। তোমার বেহেস্ত দোজখ তুমিই রচনা ক'রে থাক:
তোমরা অবিশ্বাসী হলে-নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন-তিনি তাঁর সেবকগণের অকৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন না। (সূরা যুমার, আয়াত: ৭)
যে সৎ কাজ করে, সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে, এবং কেউ মন্দ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। তোমার প্রতিপালক তাঁর দাস-দাসীদের প্রতি কোনো জুলুম করেন না। (সূরা হা-মীম-আস্ সিজদাহ্, আয়াত: ৪৬)
তুমি কখনও আল্লাহর বিধানে কোনো পরিবর্তন পাবে না। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৬২)
দয়া করাকে তিনি তাঁর কর্তব্য হিসেবে স্থির করেছেন। কেয়ামতের দিন অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে একত্রিত করবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারাই অবিশ্বাস করবে যারা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলেছে। (সূরা আন'আম, আয়াত: ১২)
যে কেউ খারাপ কাজ করবে তাকে অধোমুখে নিক্ষেপ করা হবে অগ্নিতে, এবং ওদেরকে বলা হবে তোমরা যা করতে তারই প্রতিফল তোমরা ভোগ করছ। (সূরা নাম্ল, আয়াত: ৯০)
তোমরা সৎকাজ করলে তা করবে নিজেদের জন্যে এবং মন্দ কাজ করলে তাও করবে নিজেদের জন্য। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত: ৭)
আমার শান্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি। আর আমার দয়া-তা তো প্রত্যেক বস্তুতেই প্রাপ্ত। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬)
তোমাদের অমঙ্গল তোমাদেরই। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১৯)
বল-তোমরা আমার প্রতিপালককে না ডাকলে তাঁর কিছু আসে যায় না। (সূরা- ফোরকান, আয়াত: ৭৭)
কিন্তু আল্লাহ তাদের কোনো ক্ষতি করেননি; তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে। (সূরা নহল, আয়াত: ৩৩)
উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরুস্কার ছাড়া আর কী হতে পারে? (সূরা রহমান, আয়াত: ৬০)
আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে আগেই যে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন, তোমরা যদি তাতে বিশ্বাসী হও, তাহলে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে কে সে তোমাদের বাধা দেয়? (সূরা হাদীদ, আয়াত: ৮)
আল্লাহ কখনও তার বান্দাদের সাথে অন্যান্য আচরণ করেন না। (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫১)
যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ১০৮)
তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, তাই আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গেছেন। (সূরা তওবা, আয়াত : ৬৭)
যে অবিশ্বাস করে, অবিশ্বাসের জন্য সেই দায়ী; যারা সৎকাজ করে তারা নিজেদের জন্যই রচনা করে সুখসয্যা। কারণ যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে পুরস্কৃত করেন। (সূরা রুম, আয়াত: ৪৪-৪৫)
তারা অন্যদেরকে এ (কোরআন) থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, এবং নিজেদেরকেও; কিন্তু তারা তো শুধু নিজেদের আত্মাকেই ধ্বংস করে, কিন্তু তারা তা বোঝে না। (সূরা আন'আম, আয়াত: ২৬)
হে মানবজাতি, তোমাদের ঔদ্ধত্য তোমাদেরই বিরুদ্ধে যায়। (সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৩)
এখানে তুমি যে আমিত্ব নিয়ে বড়াই করছ, সীমালঙ্ঘন করছ, সেখানে তাই-ই তোমার যন্ত্রণার কারণ হবে।
নামাজ বেহেস্তের চাবি। তোমার চাবি তোমাকেই দেয়া হয়েছে। তুমি তা হারিয়ে ফেললে কে তোমাকে তা ফেরত দেবে? আল্লাহ তো তোমাকে তা দিয়েই দিয়েছেন। তুমি তাঁর দোষ দাও কেন? তিনিই তো তোমার বেহেস্ত। তিনি তো সেখানেই তোমাকে ডাকছেন : গোটা কোরআনটাই তাঁর উদাত্ত আহ্বান। তিনি তো ঘোষণাই করেছেন-কেউ কি আছে যে আমাকে উত্তম ঋণ দেবে, যার উত্তম প্রতিদান আমি দেব পরকালে?
... তোমরা এই জগতের ক্ষণিকের দ্রব্য সামগ্রীর দিকে তাকাও, কিন্তু আল্লাহ তাকান পরকালের দিকে... (সূরা আনফাল, আয়াত : ৬৭)
প্রত্যেক মানুষের চিন্তা করা উচিত যে, সে আগামীকালের জন্য আগে/সামনে কী পাঠিয়েছে। (সূরা হাশর, আয়াত: ১৮)
কে আছে যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে; তাহলে তিনি তা তার জন্য বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন, এবং তার জন্য মহাপুরস্কার আছে। (সূরা হাদীদ, আয়াত: ১১)
উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরুস্কার ছাড়া আর কী হতে পারে? (সূরা রহমান, আয়াত: ৬০)
নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি দয়া এবং উদারতায় ভরপুর, তবুও অধিকাংশ লোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। (সূরা মু'মিন, আয়াত: ৬১)
মনে রাখাবে, মৃত্যুর সময়ে সর্বপ্রথম তোমার দেখা হবে... কার সাথে? বল তো কার সাথে? কী জানি। তোমার নিজের সাথে!
প্রত্যেকেরই মৃত্যুর সময়ে নিজের সাথে দেখা হয়ে যাবে। মানুষের আজীবনের প্রশ্ন-আমি কে? মৃত্যু তাকে এর জবাব দেবে। কিন্তু জবাবটা যদি অনুকূল না হয় তাহলে তা হবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
আবারও বলছি, তুমি সারাজীবন যে-সব কাজ করেছ, গোপনে বা প্রকাশ্যে, তা তোমার লুকানো সত্তায় লিপিবদ্ধ হয়ে থাকছে। মৃত্যুর সময়ে এই কর্মফলের সাথে তোমার দেখা হবে। কবরে গিয়েও তোমার কর্মফলের সাথে তোমার দেখা হবে। তুমি গভীর অন্ধকারে কী করেছ তা কেউ না জানলেও তুমি নিজে ভালোভাবেই জান। তখন হিসাবটা খুব কঠিন হবে।
প্রত্যেক মানুষের চিন্তা করা উচিত যে, সে আগামীকালের জন্য আগে/সামনে কী পাঠিয়েছে। (সূরা হাশর, আয়াত: ১৮)
তবে তওবা কবুল হলে সবই ক্ষমা, এই শর্তে যে তওবার পর একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা যাবে না।
যে ব্যক্তি তওবা করে ও সৎকাজ করে সে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অভিমুখী হয়। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ৭১)
তারা ক্ষমাপ্রার্থনা (তওবা) করলে তাদের জন্য কল্যাণ হবে, কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে-আল্লাহ তাদের ইহকালে ও পরকালে যন্ত্রণাপ্রদ শাস্তি দেবেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৭৪)
... যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে আমি নিশ্চয়ই তাদের মন্দকাজগুলো মিটিয়ে দেব, এবং তাদের কাজের উত্তম ফল দেব। (সূরা আনকাবুত, আয়াত: ৭)
যারা তাদের ভুলের পুনরাবৃত্তি করে, তারা আগুনের সঙ্গী হবে তারা তাতে অবস্থান করবে (চিরকাল)। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫)
তাছাড়া বিচারদিনে ফেরেস্তাদের দ্বারা লিখিত আমলনামা দেখানো হবে। মৃত্যুর সময়ের অবস্থা যদি সহজ না হয়, তাহলে বিচার দিনে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে দাঁড়ানো তো আরো কঠিন হয়ে যাবে।
আমার সেই বন্ধু আর কোনো প্রতিবাদ না ক'রে না উদ্বিগ্নমনে সেদিনের মতো বিদায় নিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00