📄 প্রশ্নের গর্ভে ইবলিসের সন্তান
সুতরাং, প্রিয় পাঠক, প্রশ্ন করা খারাপ কিছু নয়; সব খারাপ নিহিত প্রশ্নকারীর উদ্দেশ্যের মধ্যে। আল্লাহ আছেন কি না, তিনি কী খান, সন্তান জন্ম দেন কি না- এসব প্রশ্নেও কোনো অপরাধ নেই। কারণ মানব মনের চরিত্র এমনই যে সে এরূপ প্রশ্ন নিজস্ব তৃষ্ণার দ্বারা তাড়িত হয়েই ক'রে ফ্যালে। স্বয়ং আল্লাহই পবিত্র কোরআনে এরূপ প্রশ্ন তুলে তার জবাব দিয়েছেন।
কিন্তু প্রশ্নকারীর উদ্দেশ্য যদি মাতব্বর সাহেবের মতো হয়, তার উদ্দেশ্য যদি জ্ঞানার্জন না হয়, তাহলে তা প্রশ্নকারীর জন্য আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছু নয়। এরূপ প্রশ্নের জন্য অনেক জাতি ধ্বংস হয়েছে, যা কোরআনে বলা হয়েছে:
তোমার পূর্বে কিছু লোক এরূপ প্রশ্ন করেছিল, এবং এ কারণে তারা তাদের বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল। (সূরা মাঈদা, আয়াত: ১০২)
রসুল (সঃ) নিজেই প্রশ্নের গুরুত্ব সম্বন্ধে উৎসাহমূলক হাদিস রেখে গেছেন: জ্ঞান হলো একটি রত্নভাণ্ডার এবং তার চাবি হলো অনুসন্ধান/জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন। -হাদীস
কিন্তু তিনি এও বলেছেন যে মনে আল্লাহ এবং সৃষ্টির সত্যতা সম্বন্ধে প্রশ্ন জাগায় ইবলিস। আসলে আল্লাহ মানুষকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতার সম্মান দিয়েছেন ব'লে তাকে যাচ্ছেতাই প্রশ্ন করার যোগ্যতাও দিয়েছেন।
বল, 'সত্য এসেছে তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে'; যে বিশ্বাস করতে চায়, করুক, এবং যে তা অস্বীকার করতে চায়, করুক। (অর্থাৎ মানুষকে বিশ্বাস বা সন্দেহ করার- তথা সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। এ কারণে কাউকে জোরপূর্বক ধর্ম পালনে বাধ্য করা যাবে না। মানুষের আত্মচেতনার স্বাধীনতাই তার আমিত্ব। এ স্বাধীনতা আল্লাহই দিয়েছেন। কিন্তু মানুষ ভুলে যায় যে এ থেকেই তার প্রশ্নের উৎপত্তি। ফলে সে যে-স্বাধীনতা ভোগ করছে, তাই-ই তাকে ধ্বংস করে।) (সূরা কাহাফ, আয়াত: ২৯)
যার হৃদয়কে আমি আমাকে অবহেলা করার অনুমতি দিয়েছি, সে অধীনতা স্বীকার করবে না। (প্রশ্ন করার স্বাধীনতা মানুষের ঐশ্বরিক প্রাপ্তি। কিন্তু কেউ যদি অহংকারীর মতো শুধু প্রশ্নই করতে থাকে এবং তার জবাবের আশা না ক’রে জমজমাট প্রশ্নের ব্যবসা খুলে ব’সে বাহবা কামাতে চায়, তাহলে আল্লাহ তাকে তাঁকে অস্বীকার করার অনুমতি দেন—অর্থাৎ তার তৃপ্তিকে শুধু প্রশ্নের মধ্যেই ঢুকিয়ে দেন। ফলে সে কখনও প্রশ্ন থেকে বের হতে পারে না। অথচ সে অহংকারীর মতো মনে করে বসে যে তার মনে প্রচুর প্রশ্নের উদয় হচ্ছে—তাহলে নিশ্চয়ই সে জ্ঞানী এবং প্রগতিশীল। কিন্তু আসলে সে ঘোর বিভ্রান্তিতে আছে।) (সূরা কাহাফ, আয়াত: ২৮)
তুমি কি লক্ষ্য কর না যে আমি অবিশ্বাসীদের কাছে শয়তান ছেড়ে রেখেছি—ওদের মন্দ কাজে বিশেষভাবে উৎসাহ দেবার জন্য। সুতরাং ওদের বিষয়ে তাড়াতাড়ি ক’র না, আমি তো গণনা করছি—ওদের জন্য নির্ধারিত কাল। (ইবলিসকে/শয়তানকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে মূলত মানুষকে স্বাধীনতা দেয়ার জন্য—এটাই আল্লাহর কর্মপদ্ধতি। কিন্তু মানুষ যদি শয়তানকে প্রশ্রয় না দেয়, তাহলে সে তার কোনো ক্ষতি করতে পারে না। একথা কোরআনেই বলা হয়েছে।) (সূরা মরিয়ম, আয়াত: ৮৩-৮৪)
তাহলে কি যারা বিশ্বাস করেছে, তাদের প্রত্যয় হয়নি যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে সবাইকে সৎপথে চালিত করতে পারতেন? এবং অবিশ্বাসীরা যা করেছে, তাদের কর্মফলের জন্য তাদের প্রতি নিশ্চয়ই বিপদ উপনীত হবে, অথবা বিপদ তাদের আশেপাশে পতিত হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না। (কি চমৎকার ইঙ্গিত! আল্লাহ নিজেই বলছেন যে তিনি ইচ্ছা করলে সবাইকে সৎপথে পরিচালিত করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন না। কারণ তিনি তাঁর ইচ্ছা দ্বারা জোর ক’রে মানুষের ইচ্ছাকে প্রভাবিত করেন না—তিনি মানুষকে স্বাধীনতার সম্মান দিয়েছেন। অথচ তার পরও মানুষ বোঝে না।) (সূরা রাদ, আয়াত: ৩১)
শেষোক্ত আয়াতটা রহস্যময়। এখানে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা দ্বারা মানুষের মুক্ত-ইচ্ছাকে প্রভাবিত করেন না। মানুষকে স্বাধীনতার সম্মান দেয়া হয়েছে। মানুষের মধ্যে যারা স্বেচ্ছায় তাদের ইচ্ছাকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করে—অর্থাৎ যারা স্বেচ্ছায় আত্মসমপর্ণ করে, তারা আল্লাহর সান্নিধ্যে বেহেস্ত লাভ করে। যারা তাদের আমিত্ব নিয়ে দূরে থাকে, তাদের দূরত্বই তাদের জন্য যন্ত্রণার কারণ হয়। পরবর্তী আয়াতের আলোকে এই আয়াতটিকে বিবেচনা করলে এর প্রকৃত রহস্য বুঝা যাবে।
...কেউ যেন না বলে, আল্লাহ আমাকে পথ দেখালে আমি তো অবশ্যই সংযমীদের অন্তর্গত হতাম। (সূরা যুমার, আয়াত: ৫৭)
কিন্তু স্বয়ং তিনি মানব মনে কেবল ভালো প্রশ্নগুলো জাগিয়ে দেন এবং খারাপ প্রশ্নের সুযোগ ক'রে দেন ইবলিসের কুমন্ত্রণার মাধ্যমে :
তুমি কি লক্ষ্য কর না যে আমি অবিশ্বাসীদের কাছে শয়তান ছেড়ে রেখেছি—ওদের মন্দ কাজে বিশেষভাবে উৎসাহ দেবার জন্য? সুতরাং ওদের বিষয়ে তাড়াতাড়ি ক’র না, আমি তো গণনা করছি—ওদের জন্য নির্ধারিত কাল। (সূরা মরিয়ম, আয়াত: ৮৩-৮৪)
আমি কি তোমাকে জানাব কার প্রতি শয়তান অবতীর্ণ হয়? ওরা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটা ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। ওরা কান পেতে থাকে, এবং ওদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। এবং কবিদেরকে অনুসরণ করে তারাই যারা বিভ্রান্ত। তুমি কি দেখ না, ওরা লক্ষ্যহীনভাবে সর্ব বিষয়ে কল্পনা-বিহার ক'রে থাকে? এবং ওক্স যা বলে তা করে না। তবে তাদের কথা আলাদা যারা বিশ্বাস করে ও সৎ কাজ করে এবং আল্লাহকে বারবার স্মরণ করে ... (সূরা শুয়ারা, আয়াত: ২২১-২২৭)
শয়তান যা নিক্ষেপ করে, তিনি তা পরীক্ষাস্বরূপ করেন-তাদের জন্য যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, যারা পাষাণ হৃদয়। সীমালঙ্ঘনকারীরা অশেষ মতভেদে আছে। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৫৩)
তিনি ইবলিসকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে মানুষের পেছনে ছেড়ে দিয়েছেন। এর জন্য দোষ তাঁর নয়! এ হলো মানুষকে পুরোপুরি স্বাধীন করার পেছনে তাঁর ঐশী মেকানিজম বা কর্মপদ্ধতি। তিনি দেখতে চান কে যথেচ্ছাচারীর মতো তার স্বাধীনতা ভোগ করে আর কে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নিজের ইচ্ছাকে ছেড়ে দেয়। যে দ্বিতীয় পথ বেছে নেয়, সেই কৃতকার্য হবে, কারণ সেই-ই মুসলিম: 'ইসলাম' মানে আত্মসমর্পণ এবং 'মুসলিম' মানে হলো আত্মসমর্পণকারী।
সরলপথের নির্দেশ আল্লাহর দায়িত্ব, এবং তার মধ্যে বক্র কুপথও আছে। (পথ যদি শুধু একটা হতো, তাহলে তা হতো মানুষের স্বাধীনতা খর্ব করার নামান্তর-কারণ তখন মানুষকে বাধ্য হয়েই এক পথে চলতে হতো, তার সামনে কোনো বিকল্প choice থাকত না। মানুষকে বিকল্প সরবরাহ না ক'রে তাকে স্বাধীন ব'লে ঘোষণা করা মানে তো প্রহসনমাত্র। তাই আল্লাহ তাঁর সরল পথের সাথে বক্র পথকেও সংযুক্ত রেখে তাঁর পথকে পূর্ণাঙ্গ করেছেন।) (সূরা নহল, আয়াত: ৯)
অতঃপর ওরা যখন বাঁকা পথ অবলম্বন করল, আল্লাহ ওদের হৃদয় বাঁকা ক'রে দিলেন। (তিনি বাঁকা পথ দিয়েছেন বটে, তবে সে পথে যে চলে তার হৃদয়ও বেঁকে যায়, এবং ফলে সেই বাঁকা পথকেই তার ভালো লাগে। এ কোনো অবিচার নয়, এটাই বিজ্ঞানসম্মত সত্য-যাকে বলে অনুবর্তন বা conditioning: কোনো ব্যক্তির কাজ বা অভিজ্ঞতা বা অভ্যাস তার মনের ওপর ছায়াপাত করে এবং তার ইচ্ছাকে পুনঃপুন সেই কাজেই রত করাতে চায়। পদার্থবিদ্যায় এই সত্যটা নিউটনের গতির প্রথম সূত্র নামে সূত্রবদ্ধ আছে, যা সর্বপ্রথম প্রমাণসহকারে উপস্থাপন করেছিলেন কালজয়ী বিজ্ঞানী নিউটন।) (সূরা সাফ, আয়াত: ৫)
সত্যকে মিথ্যা দ্বারা আবৃত ক'র না, কিংবা সত্যকে জেনে তাকে গোপন ক'র না। (সূরা বাকারা, আয়াত: ৪২)
মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর উপাসনা করে দ্বিধায় সাথে; তার মঙ্গল হলে তাতে তার চিত্ত প্রশান্ত হয় এবং কোনো বিপর্যয় ঘটলে সে তার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। সে ইহলোক ও পরলোকে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এটাই তো সুস্পষ্ট ক্ষতি। (এরূপ লোকের আত্মসমর্পণ পূর্ণাঙ্গ হয়নি। নিজের স্বাধীন ইচ্ছাকে পুরোপুরি আল্লাহর কাছে সমর্পণ না করতে পারলে মুসলমান হওয়া যায় না। অর্ধেক মুসলমান ব'লে কিছু নেই। রসুলল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে যার অন্তরে একটা সরষে দানার মতো ইমানও আছে, সেও বেহেস্তে প্রবেশ করবে-তবে শাস্তিভোগের পর। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে শুধু বেহেস্তে যাবার সুযোগ পেলেও মুসলমান হওয়া যায় না। মুসলিম মানে হলো পূর্ণাঙ্গ মানুষ-সেই মানুষ যিনি তার পরিচয় জেনেছেন।) (সূরা হজ্ব, আয়াত: ১১)
তবে আল্লাহ আছেন কি? কে তাকে সৃষ্টি করেছে? এরূপ প্রশ্ন এমন মৌলবী বা আলেমকেও করা উচিত নয় যিনি এর জবাব দিতে পারবেন না। যিনি আপনাকে এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ দিতে পারবেন, কেবল তাকেই এরূপ প্রশ্ন করুন এবং বিভ্রান্ত হওয়ার হাত থেকে এবং নিরীহ ধার্মিকদেরকে বিব্রত করার মতো ধৃষ্টতা থেকে দূরে থাকুন। কিছু লোক-এমনকি বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো বিখ্যাত গণিতবিদ দার্শনিকও-বলেছেন যে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণও করা যায় না অপ্রমাণও করা যায় না। তাদের যুক্তির ভ্রান্তি তারা ধরতে পারেননি। তাদের স্বভাবই তাদের যুক্তিকে কলুষিত করেছে। স্রষ্টার অস্তিত্ব স্পষ্টভাবে প্রমাণযোগ্য-যুক্তির মাধ্যমে, বিজ্ঞানের মাধ্যমে, গণিতের মাধ্যমে, এবং পরোক্ষভাবে। এমন প্রমাণ যার সত্যতাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, কেবল স্বভাব দ্বারা তাড়িত হয়ে সত্যকে অস্বীকার করা ছাড়া। স্বয়ং ইবলিস বা প্রখ্যাত কাফেরদের মধ্যেও অনেকে আল্লাহর সত্যতা স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছে-তবে তারা তাঁকে মানতে চায়নি। যুক্তিকে মেলাতে না পারা পর্যন্ত মনের অস্থিরতা, অনাস্থা, অসহায়ত্ব থেকেই যাবে। এখানেই ইসলামিক সেল্ফ কন্ট্রোলের আবশ্যকতা। তা মানুষের চেতনা, আত্ম-চেতনা এবং বাস্তবতাকে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সহাবস্থানপূর্ণ ক'রে দেয়।
কেন, নামাজে দাঁড়িয়ে কি চিন্তাকে কন্ট্রোল করতে পারেন? হাজার রাজ্যের চিন্তা কি মগজকে মুহুর্মুহু আক্রমণ করে না? নক্স বা রিপু কি গাদা-গাদা প্রশ্ন নিয়ে এসে মনের মধ্যে ভিড় জমায় না? অথচ মনে রাখবেন যে অনেক নামাজী আছেন যাদের নামাজ থেকে সমস্ত ময়লা আল্লাহ সাফ ক'রে দিয়েছেন। তারা তাদের নামাজে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করেন। তারা প্রত্যক্ষদর্শী। তাদের নামাজই মে'রাজ।
সত্তর বছর ইবাদত করার পরও অনেক মুসল্লি গভীর অন্ধকারে মনের গোপন ঘরে প্রশ্ন করেন: আল্লাহ কি আছেন? সত্যিই আছেন?-অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না? না। এরূপ প্রশ্নই স্বাভাবিক। কিন্তু সত্তর বছর পরেও যার এরূপ প্রশ্ন মনে এসে বেধে, সে হতভাগার জন্য দোয়া করা উচিত।
কেউ বিশ্বাস স্থাপনের পর আল্লাহকে অস্বীকার করলে এবং প্রত্যাখানের জন্য হৃদয় মুক্ত রাখলে তার ওপর আল্লাহর ক্রোধ পতিত হবে এবং তার জন্য মহা শাস্তি আছে...। (সূরা নহর, আয়াত: ১০৬)
মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর উপাসনা করে দ্বিধায় সাথে; তার মঙ্গল হলে তাতে তার চিত্ত প্রশান্ত হয় এবং কোনো বিপর্যয় ঘটলে সে তার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। সে ইহলোক ও পরলোকে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এটাই তো সুস্পষ্ট ক্ষতি। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ১১)
তুমি যদি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথামতো চল, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। তারা কল্পনা ছাড়া অন্য কিছুর অনুসরণ করে না, এবং কেবল অনুমান ক'রে থাকে। (সূরা আন'আম, আয়াত: ১১৬)
তারাই বিশ্বাসী যারা আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি বিশ্বাস করার পর সন্দেহ পোষণ করে না ... (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১৫)
প্রিয় পাঠক। প্রশ্নকে অতিক্রম করা চাই। আর তার জন্য চাই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব জেনে নেয়া। এবং তা করা চাই ইবাদত করতে করতেই। নইলে আপনি বড়জোর একজন দার্শনিক হতে পারবেন, বিশ্বাসী বা আল্লাহর পাগল নয়। মনে রাখবেন, যে-সব দার্শনিক মনকে কেবল এক-গাদা প্রশ্নের তালিকায় পরিণত করেছেন, তারা ভারবাহী গাধার সমতুল্য, যা কোরআনেও বলা হয়েছে।
আবার যুক্তি-প্রমাণ দ্বারা আল্লাহর অস্তিত্বের সত্যতা প্রমাণের তাগিদ স্বয়ং রসুলল্লাহ (সঃ)-ই দিয়েছেন:
কেউ জনগণকে আল্লাহর অস্তিত্ব সম্বন্ধে প্রমাণ দিয়ে বুঝাতে না পারলে সে একজন প্রকৃত ফিকাহশাস্ত্রবিদ (ধর্মশাস্ত্রবিদ) হতে পারে না। -হাদীস
সন্দেহ একটা চমৎকার রহস্যময় জিনিস। তার অস্তিত্বই আল্লাহর সত্যতাকে সুপ্রমাণিত করে। লক্ষ্য করুন, স্বয়ং আল্লাহই কোরআনের মাধ্যমে রসুল (সঃ)-কে ওহীর ব্যাপারে সন্দেহ করা থেকে দূরে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন:
সত্য এসেছে তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে, সুতরাং তুমি (হে মুহাম্মদ (সঃ)) সন্দেহকারীদের অন্তর্গত হয়ো না। (সূরা আলইমরান, আয়াত: ৬০)
তাহলে তুমি কি (হে মুহাম্মদ (সঃ)) তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তার কিছু অংশ বাদ দেবে এবং তোমার বক্ষ সংকুচিত করবে? যেহেতু তারা বলে-কেন তার প্রতি ধনভাণ্ডার অবর্তীর্ণ হয়নি, অথবা তার সাথে ফেরেস্তা আসেনি? (সূরা হুদ, আয়াত: ১২)
নিশ্চয়ই আমি মুসাকে কেতাব দিয়েছিলাম, অতএব তুমি তার (মূসা (আঃ) এর) কেতাব প্রাপ্তির বিষয়কে সন্দেহ ক'র না। (সূরা সিজদাহ, আয়াত: ২৩)
আমি তোমাকে অবিচলিত না রাখলে তুমি তো ওদের দিকে কিছুটা আকৃষ্ট হবার কাছাকাছি গিয়েছিলে। (সূরা বনি-ইসরাইল, আয়াত ৭৪)
ওহী এসেই ওহীকে সন্দেহ না করতে বলছে! স্বয়ং নবীকেই নবুয়তির ব্যাপারে সন্দেহ না করতে বলা হচ্ছে! কারণ কী?
কারণ মানব-মনে প্রতিনিয়ত বিস্মৃতির পর্দা পড়তে থাকে এবং তার চেতনা এবং আত্ম-চেতনার মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি হতে থাকে। সে ভুলে যেতে থাকে তার আসল পরিচয়। এই বিস্মৃতিজাত দ্বিধা বা শূন্যতাই সন্দেহ পদবাচ্য।
তাদের হৃদয়ে সন্দেহ আছে, তাই তারা সন্দেহের দোলায় দোলায়িত। (সূরা তওবা, আয়াত: ৪৫)
আকাশমণ্ডলী এবং পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছাসত্ত্বেও আল্লাহর প্রতি সিজদায় নত হয়, এবং সকালে ও বিকালে তাদের ছায়ারাও। (সূরা রা'দ, আয়াত: ১৫)
এই আয়াত থেকে বুঝা যাচ্ছে যে সৃষ্ট জীবের অনিচ্ছাও আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ। যাদের অন্তরে বিশ্বাস নেই তাদের প্রার্থনা হলো মনের নিরর্থক অস্থিরতা। (সূরা রা'দ, আয়াত: ১৪)
আমি কি তোমাকে জানাব কার প্রতি শয়তান অবতীর্ণ হয়? ওরা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটা ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। ওরা কান পেতে থাকে, এবং ওদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। এবং কবিদেরকে অনুসরণ করে তারাই যারা বিভ্রান্ত। তুমি কি দেখ না, ওরা লক্ষ্যহীনভাবে সর্ব বিষয়ে কল্পনা-বিহার ক'রে থাকে। এবং ওরা যা বলে তা করে না। তবে তাদের কথা আলাদা যারা বিশ্বাস করে ও সৎ কাজ করে এবং আল্লাহকে বারবার স্মরণ করে ... (সূরা শুয়ারা, আয়াত: ২২১-২২৭)
এ কারণে চাকরিতে ছুটি থাকলেও ইবাদতে ছুটি ব'লে কিছু নেই। মানুষকে আত্মসমর্পণ ক'রে যেতে হয় ধারাবাহিকভাবেই। তাতে কোনো ছেদ বা ক্লান্তির অবকাশ নেই। স্বয়ং নবীজী (সঃ)-এর মনেই যদি সন্দেহ জাগতে পারে, তাহলে তা দিয়ে কী প্রমাণিত হয়? প্রমাণিত হয় যে কোরআন সত্য এবং সন্দেহ হলো মানব মনের একটা আবশ্যিক উপাদান, যাকে অতিক্রম করাই জীবনের এবং সকল ইবাদতের উদ্দেশ্য। শয়তানের প্রভাবে আমাদের আত্মচেতনা বারবার আমাদেরই আমিত্বের ওপর এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, বিস্তৃত হবার সুযোগ পায় না। এর থেকে রেহাই পাবার উপায় হলো মনের অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে আল্লাহর ইবাদতে রত করা, যা আমরা পবিত্র কোরআনের আয়াতটা থেকেই দেখতে পাচ্ছি। মনে ইবাদতের অনিচ্ছা জাগাই স্বাভাবিক, কিন্তু তার ওপর প্রভুত্ব বিস্তার করতে হবে, তার দাসত্ব করা যাবে না; মনের খামখেয়ালির অনুসরণ করা যাবে না। মন যদি আল্লাহর আদেশ পালন না করতে চায়, তাহলেও এমন ভাবার দরকার নেই যে আপনি বেইমান হয়ে গেছেন—মনকে নিয়ন্ত্রণ করাই তো প্রকৃত ইবাদত। সে যত বেয়াড়াপনা করবে, তত আপনার মঙ্গল—কারণ তখন আপনি তাকে শাসন করারও বেশি বেশি সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু তার স্বেচ্ছাচারিতাকে অবশ্যই মেনে নেয়া যাবে না:
তুমি কি দেখো না তাকে যে তার কামনা-বাসনাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? ... তুমি কি মনে কর যে ওদের অধিকাংশ শোনে ও বোঝে? ওরা তো পশুর মতোই, বরং ওরা আরো অধম। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ৪৩-৪৪)