📄 প্রশ্নের শূন্যতা
মানুষের মন তার নিজের অজ্ঞতার কারণে ব্যাধিগ্রস্ত। পবিত্র কোরআনে বারবার এই ব্যাধির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে:
যারা নিজেদের আত্মাকে হারিয়ে ফেলেছে তারা বিশ্বাস করতে অস্বীকার করে। (সূরা আনআম, আয়াত: ২০)
তাদের খারাপ কাজ তাদেরকে আনন্দ দেয়। (সূরা তওবা, আয়াত: ৩৭)
... আমি অবিশ্বাসীদের দৃষ্টিতে তারা যা করছে তা শোভনীয় করেছি। (সূরা আন'আম, আয়াত: ১২২)
পাশাপাশি তাতে এই ব্যাধি থেকে চিরমুক্তির আশ্বাসও দেয়া হয়েছে, যা ইহকালেই সম্ভব:
আল্লাহ বিশ্বাসীদের মনোরোগ নিরাময় ক'রে দেবেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ১৪)
আমি তাদের ভোগান্তিকে/দুঃখ-কষ্টকে সমৃদ্ধিতে রূপান্তরিত ক'রে দিয়েছিলাম। (সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৯৫)
নিশ্চয়ই আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত বিশ্রামের প্রশান্তি পায়। (সূরা রা'দ, আয়াত: ২৮)
কিন্তু কী সেই অসুখ? এবং কেনই বা তা মনকে আচ্ছন্ন ক'রে থাকে অহরাত?
কারণ ...
কারণ, মানুষের মন নিজের অজ্ঞতার অন্ধকারেই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে; সে তার আল্লাহ-প্রদত্ত স্বাধীনতাকে স্বেচ্ছাচারীর মতো ব্যবহার ক'রে বাঁকা পথ অবলম্বন করেছে, যার ফলে সে তার উৎসকে ভুলে যাওয়ার কারণে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। হৃদয় তার একটাই-যা দেয়া উচিত সেই হৃদয়ের স্রষ্টাকে, অথচ সে তার কামনা-বাসনার দাসত্ব ক'রে নিজেকে পরিচয়হীন ক'রে ফেলেছে। শয়তানের ধোঁকার পরীক্ষায় সে উত্তীর্ণ হতে না পেরে হয়ে গেছে অন্ধ, অযথা সত্যের বিরুদ্ধে তুলেছে বিতর্ক; ফলে আল্লাহ তাদেরকে ভুলে গেছেন:
আল্লাহ কোনো মানুষের মধ্যে দুটি হৃদয় সৃষ্টি করেন নি। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৪)
যারা নিজেদের আত্মাকে হারিয়ে ফেলেছে তারা বিশ্বাস করতে অস্বীকার করে। (সূরা আনআম, আয়াত: ২০)
কিন্তু আল্লাহ তাদের কোনো ক্ষতি করেননি; তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে। (সূরা নহল, আয়াত: ৩৩)
নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি দয়া এবং উদারতায় ভরপুর, তবুও অধিকাংশ লোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। (সূরা মু'মিন, আয়াত: ৬১)
যার হৃদয়কে আমি আমাকে অবহেলা করার অনুমতি দিয়েছি, সে অধীনতা স্বীকার করবে না। (সূরা কাহাফ, আয়াত: ২৮)
অতঃপর ওরা যখন বাঁকা পথ অবলম্বন করল, আল্লাহ ওদের হৃদয় বাঁকা ক'রে দিলেন। (সূরা সাফ, আয়াত: ৫)
আল্লাহ কখনও তার বান্দাদের সাথে অন্যায় আচরণ করেন না। (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫১)
তুমি কি দেখো না তাকে যে তার কামনা-বাসনাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? ... তুমি কি মনে কর যে ওদের অধিকাংশ শোনে ও বোঝে? ওরা তো পশুর মতোই, বরং ওরা আরো অধম। (সূরা ফোরকান, আয়াত: ৪৩-৪৪)
... শয়তান যা নিক্ষেপ করে, তিনি তা পরীক্ষাস্বরূপ করেন—তাদের জন্য যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, যারা পাষাণ হৃদয়। সীমালঙ্ঘনকারীরা অশেষ মতভেদে আছে। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৫৩)
যারা অন্ধ এবং যারা দেখে, তারা সমান নয়: তারাও সমান নয়, যারা বিশ্বাস করে এবং ভালো কাজ ক'রে, এবং যারা মন্দ কাজ ক'রে। (সূরা মু'মিন, আয়াত: ৫৮)
মানুষ অধিকাংশ ব্যাপারেই বিতর্কপ্রিয়। (সূরা কাহাফ, আয়াত: ৫৪)
মানুষ ভুলে গেছে সে কে।
ধরুন আপনার বাড়ির পাশ্ববর্তী কোনো রাস্তার মোড়ে একজন লোক কোনো কারণে ঘুমিয়ে কিংবা অজ্ঞান হয়ে পড়ল। আপনার পরিচিত কয়েকজন লোক তাকে কাঁধে ক'রে বয়ে নিয়ে এল আপনার কাছে। তারপর আপনি তার চোখে-মুখে পানি ছিটিয়ে বা চিকিৎসা করিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে তার জ্ঞান ফিরিয়ে আনলেন।
সে জেগে উঠেই চারদিকে ফ্যালফ্যাল ক'রে এক নজর দেখে নিয়ে প্রশ্ন করল—আমি কোথায়? কিভাবে এলাম এখানে?
কেন সে নিজেকে নিয়ে এভাবে প্রশ্ন করল?
কারণ তার মনে আছে সে বেহুশ হবার বা ঘুমিয়ে পড়ার সময়ে কোথায় ছিল। কিন্তু ভুলে গেছে আপনার বাড়ি আসা পর্যন্ত সময়ে সে কোন পথ কিভাবে অতিক্রম করেছিল।
ফলে সে যখনই আত্মচেতনায় ফিলে এল, তখনই সে অনুভব করল যে তার স্মৃতির সর্বশেষ বিন্দুটিতে সঞ্চিত রয়েছে সেই স্থানের চিত্র যেখানে সে জ্ঞান হারিয়েছিল। ফলে তার স্মৃতির চিত্রের সাথে তার জেগে ওঠার মুহূর্তের পারিপার্শ্বিকতার চিত্র মিলল না। এই অমিল বা অসামঞ্জস্য তার মস্তিষ্কের আত্মচেতনাকে ধারণকারী স্নায়ুতন্ত্রেও একটা শূন্যতার সাড়া সৃষ্টি করল, যা মস্তিষ্কের ভাষা-নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে পৌঁছে কিছু শব্দকে প্রশ্নের মাত্রায় ফেলে সাজিয়ে সৃষ্টি করল দুটো বাক্য-আমি কোথায়? কিভাবে এলাম?
মানুষের কোথাও থাকা না-থাকা তার অস্তিত্বের (existence) ব্যাপার। আর সে ব্যাপারে তার জানা বা না-জানা হলো তার চেতনার ব্যাপার, যা সমৃদ্ধ হয় আত্ম-চেতনা থেকে লব্ধ তথ্যের দ্বারা। অস্তিত্বের এবং মনের সহাবস্থান এবং ভারসাম্যের শর্ত হলো: এই মুহূর্তের অস্তিত্ব বা বাস্তবতা এই মুহূর্তের চেতনায় এবং আত্মচেতনায় চিত্রিত হতে হবে। কিন্তু কোনো কারণে আত্ম-চেতনায় যদি তথ্যের ঘাটতি পড়ে যায়, তাহলে আত্ম- চেতনা চেতনার বাস্তবতার সাথে নিজেকে মিলাতে গিয়ে উদ্ভূত শূন্যতাটুকু পূরণ করবে প্রশ্ন দিয়ে। ব্যাপারটা পুরোপুরি যান্ত্রিক এবং আবশ্যিক। অস্তিত্বের সবকিছুকেই আত্মচেতনাতেও থাকতে হবে-নইলে আত্ম-চেতনা তার ধর্ম অনুযায়ী প্রশ্ন তুলবে।
আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে যে লোকটাকে আপনার কাছে আনা হলে আপনি পরীক্ষা করার জন্য কোনোভাবে কোনো এক প্রযুক্তি ব্যবহার ক'রে তাকে এমন ইনজেকশান দিয়ে দিলেন যাতে ক'রে তার স্মৃতি থেকে তার বিগত জীবনের সব ঘটনা কিছু সময়ের জন্য পুরোপুরি মুছে গেল। এ অবস্থায় তার কোনো স্মৃতি নেই। ফলে তার জীবনের বিগত বাস্তবতা ব'লে তার ধারণায় কিছু নেই। তখন সে জেগে উঠে আপনাকে কি প্রশ্ন করবে 'আমি কোথায়'?
না। কারণ সে আগে কোথাও ছিল কি-না তাই তো তার জানা নেই। এ অবস্থায় সে কি আপনাকে প্রশ্ন করবে-আমি কিভাবে এখানে এলাম?
না। কারণ কোনোখান থেকে কোনোখানে যাওয়া বলে কোনো ঘটনা ঘটলে তার অর্থ কী দাঁড়ায়, তা সে জানে না।
এখন ভাবুন তো: জ্ঞানী হই বা অজ্ঞ হই, ধনী হই বা গরীব হই, আধুনিক হই বা সেকেলে হই, ভালো হই বা মন্দ হই-জীবনের কোনো এক মুহূর্তের জন্যে হলেও কি এই প্রশ্ন আমাদের প্রত্যেকের মনে উদিত হয়নি-আমি কোথেকে এলাম? কিভাবে এলাম? পৃথিবীর সাথে আমাদের নিবিড় সম্পর্ক আছে এটা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করা সত্ত্বেও কি মাঝে-মধ্যে ভেতরটা আন্দোলিত ক'রে কোনো এক সুদূরের ঝড়ো বাতাস হু-হু করে বয়ে যেতে যেতে এই বোধ এবং শূণ্যতা জাগিয়ে দেয়নি-আমি আসলে এখানকার কেউ নই; এখানে আমার বিচরণ, কিন্তু আমার উৎস এবং গন্তব্য অন্য কোথাও?
কেন এরূপ প্রশ্ন মনে জেগেছে?
আমাদের জন্মই যদি আমাদের স্মৃতির এবং অস্তিত্বের শুরু হতো, তাহলে তো, একটি আগে যেমন দেখেছি, আমাদের মনে কোনো প্রশ্নই জাগত না। তাহলে প্রশ্ন কেন জাগল?
তাহলে কি এটাই অনুমেয় নয় যে আমরা সেই বেহুঁশ হয়ে পড়া লোকটার মতো এমন কিছুটা পথ এবং সময় পার হয়ে এসেছি যা এখন আমরা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে ফেলেছি?
লক্ষ্য করুন: পবিত্র কোরআনে মানুষকে বিভিন্ন শব্দ দ্বারা নির্দেশ করা হয়েছে, যেমন-আদম, নক্স, ইন্সান। সাধারণভাবে মানবজাতিকে এবং প্রতিটি ব্যক্তি-মানুষকে বুঝানো হয়েছে 'ইন্সান' শব্দটি দ্বারা। শুনে অবাক হবার কিছু নেই যে শব্দটির মূল হলো 'নিস্সান', যার অর্থ হলো 'ভুলে যাওয়া', এবং 'ইন্ন্সান্' মানে হলো 'যে ভুলে গেছে'। একথা পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট করেও বলা হয়েছে সে মানুষ ভুলে গেছে আল্লাহর কাছে দেয়া তার সেই প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকারের কথা যা সে জন্মের আগে আল্লাহর কাছে দিয়ে এসেছিল এবং যা সে স্ব স্ব যুগের নবী (আঃ) এর নিকট অবতীর্ণ গ্রন্থ অনুযায়ী স্পষ্টভাবে মেনে নিয়েছিল:
আল্লাহ বিশ্বাসীদের মনোরোগ নিরাময় ক'রে দেবেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ১৪)
আমি তো ইতিপূর্বে আদমের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিলাম, কিন্তু সে ভুলে গিয়েছিল, আমি তাকে দৃঢ়সংকল্প পাইনি। (সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১১৫)
আকাশে রয়েছে তোমাদের জীবনোপকরণের উৎস এবং প্রতিশ্রুতি। আসমান ও জমিনের প্রতিপালকের শপথ, নিশ্চয় এ তোমাদের বাক্যালাপের মতোই সত্য। (সূরা যারিয়াত, আয়াত: ২২)
আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে আগেই যে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন, তোমরা যদি তাতে বিশ্বাসী হও, তাহলে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে কে সে তোমাদের বাধা দেয়? (সূরা হাদীদ, আয়াত: ৮)
হে মানুষ! পুনরুত্থান সম্বন্ধে যদি তোমরা সন্দেহপূর্ণ হও, (তাহলে চিন্তা কর) আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর শুক্রবিন্দু থেকে, তারপর রক্তপিণ্ড থেকে, তারপর পূর্ণ বা অপূর্ণ আকৃতিবিশিষ্ট মাংসপিণ্ড থেকে। যেন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেই (তোমরা কিভাবে জীবন লাভ করেছ এবং কিভাবে মৃত্যুর পর আবার পুনরুত্থিত হবে)। আমি যা ইচ্ছা করি, তা এক নির্দিষ্টকালের জন্য মাতৃগর্ভে রেখে দিই, তারপর আমি তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি, যেন তোমরা নিজ নিজ যৌবনে উপনীত হতে পার। তোমাদের মধ্যে (শিশু অবস্থায়) কারো কারো মৃত্যু ঘটে এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে রোগগ্রস্ত করা হয়, যার ফলে তারা যা জানত সে সম্বন্ধে তারা ভুলে যায়। (সূরা হজ্ব, আয়াত ৫)
📄 শেষ প্রশ্ন
এবার আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়ে একজন তুখোড় সাইকিয়াট্রিস্টের অভিজ্ঞতার সমান্তরাল একটা কাল্পনিক ঘটনার কথা ভাবুন : ধরে নিন যে সেই লোকটা জ্ঞান ফিরে পেয়েই চারদিকে তাকিয়ে এবং নিজেকে এবং অপরকে দেখে এবং ছেনে-ছুঁয়ে একটা ব্যতিক্রমধর্মী প্রশ্ন ক'রে বসল—আমি কে?
প্রশ্নটা সরাসরি আপনার নিজের অন্তরের অন্তস্তলে বিধে যাবে।
তা আপনাকেও সংক্রমিত করবে।
আপনার মধ্যেও প্রতিধ্বনি তুলবে—আমি কে?
উপস্থিত সবাই তখন তার থেকে নিজেদের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে প্রশ্ন করবে—আমি কে?
তখন সবাই লোকটাকে দেখেই প্রশ্ন করবে—আমি কে?
কেউ আর কাউকে প্রশ্ন করবে না—প্রশ্ন করবে কেবল নিজেকে।
কেউ কাউকে আর জবাব দিতে পারবে না। কেবল প্রশ্নের ঘোরে এবং চমৎকারিত্বে মুগ্ধ এবং হতভম্ব হয়ে থাকবে।
সবাই তখন প্রথমে প্রশ্নটার মর্ম উপলব্ধি করার জন্য চাইবে নির্জনতা। কারণ এখন সবার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার নিজেরই প্রশ্নটা। অথচ কেউই জানছে না সে প্রশ্নটা করছে কাকে?
একটা রহস্যময় প্রশ্ন আছে—অথচ ব্যক্তির জানা নেই কে প্রশ্নটা করছে এবং কার কাছেই বা উত্তর চাচ্ছে।
অস্তিত্ব এবং আত্মচেতনার মধ্যবর্তী শূন্যস্থান তখন কেবল একটা নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নবোধক চিহ্নের হাহাকারে ভরা।
সম্পূর্ণ একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন—আমি কে?—অথচ উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিত্বের সন্ধান মিলছে না, পাওয়া যাচ্ছে না কোনো ব্যক্তিকে, এবং কোনো ব্যক্তিবাচক বা subjective জবাব পাওয়া যাচ্ছে না ব'লে প্রশ্নটাই রয়ে যাচ্ছে নৈর্ব্যক্তিক বা objective, বা শ্বাশ্বত। যে প্রশ্ন কোনো বিশেষ ব্যক্তির নয়, সমানভাবে সবারই, তা ব্যক্তিস্পৃষ্ট বা subjective নয়, তা পুরোপুরি নৈর্ব্যক্তিক। কারণ তার যদি কোনো জবাব পাওয়া যায়, তাহলে তা সবার ক্ষেত্রেই সঠিক জবাব। এ কারণে এক্ষেত্রে যে-জবাব পাওয়া যাবে, তা শ্বাশ্বত, সার্বজনীন। কোরআন এই প্রশ্ন সৃষ্টি করে এবং তার জবাব দেয়। ফলে কোরআন শ্বাশ্বত এবং সবার জন্যই। যারা একথা অস্বীকার করে, তারা তো কেবল নিজেদেরই অস্বীকার করে মাত্র, কারণ তারা নিজেদের অঙ্গীকারকে ভঙ্গ করে, ফলে তাদের দুর্দশার জন্য তারাই দায়ী :
📄 প্রশ্নের প্রশ্ন
মন কেন প্রশ্ন সৃষ্টি করে?
কারণ, আমরা আগেই দেখেছি, সে তার অস্তিত্ব এবং সচেতনতার বা আত্মচেতনার মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে চায়।
অন্য কথায়, প্রশ্ন হলো সমগ্রের প্রতি অংশের নিবিড় ইঙ্গিত।
প্রশ্ন হলো শূন্যতা থেকে পূর্ণতার দিকে ছুটে চলার একান্ত তাগিদ।
প্রশ্ন হলো অস্পষ্টতার দ্বারা স্পষ্টতাকে আলিঙ্গনের আকুতি।
পশ্ন হলো গতির অভিমুখিতা।
গতি।
ঝোঁক।
প্রবণতা।
পূর্ণতার আকর্ষণ।
আলোর অমোঘ টান।
অন্ধকার গলি-ঘুঁজিতে বিন্দু বিন্দু ধবধবে আলোর প্রয়োজনীয়তা।
প্রশ্ন হলো ফিরে-পাবার বাসনা।
ঘরে ফেরার আকুলতা।
একজন আত্মদর্শী এবং প্রত্যক্ষভাবে অসীমদর্শী ব্যক্তিত্বকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: জগৎমণ্ডলী সৃষ্টি করা হয়েছিল কেন?
তিনি রহস্যময় প্রশান্তির হাসি হেসে জবাব দিয়েছিলেন—তোমার এই প্রশ্নটাকে সৃষ্টি করার জন্য!
পরম সত্য কথা!
মনে প্রশ্ন না জাগলে মনের তথা সৃষ্টির কোনো সার্থকতা থাকত না। সৃষ্টি ক'রে স্রষ্টা নিজেকে লুকিয়ে রেখেছেন, এই উদ্দেশ্যে যে তাঁর সৃষ্টি তাকে খুঁজুক, খুঁজে পাক, এবং তাঁর বৈশিষ্ট্য এবং মহিমাকে প্রকাশ করুক। একটি হাদিসে এই রহস্য আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন নিজেই রাসুল্লাহ (সঃ) কে বলেছেন:
আমি ছিলাম লুকায়িত সম্পদরাজির মতো। আমি নিজেকে প্রকাশ করতে চাইলাম। তাই সৃষ্টির কাজে হাত দিলাম।
কি চমৎকার! সকল দর্শন এবং দার্শনিকেরই উচিত এই বাণীতে ফিরে আসা। কিভাবে তিনি নিজেকে প্রকাশ করেন? সৃষ্টির মনে তাঁকে পাবার বাসনা সৃষ্টি করার মাধ্যমে। আর এই বাসনার প্রাথমিক বিন্দু হলো প্রশ্ন। এরূপ প্রশ্নকে পবিত্র কোরআনেও করবার উস্কে দেয়া হয়েছে, বিভিন্ন প্রসঙ্গে:
তবে কি ওরা এই বাণীর (কোরআনের) ব্যাপারে চিন্তা করে না? না ওদের নিকট এমন কিছু এসেছে যা ওদের পূর্বপুরুষদের নিকট আসেনি? (সূরা মোমেনুন, আয়াত: ৬৮)
বল-পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং অনুধাবন কর কিভাবে তিনি সৃষ্টি আরম্ভ করেছেন। (সূরা আনকাবুত, আয়াত: ২০)
ওরা কি স্রষ্টা ছাড়াই সৃষ্ট হয়েছে, নাকি ওরা নিজেরাই নিজেদের স্রষ্টা? নাকি ওরা আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছে? (সূরা তুর, আয়াত: ৩৫-৩৬)
তোমরা কি তোমাদের বীর্যপাত সম্বন্ধে ভেবে দেখেছ? তা থেকে কি তোমরা সৃষ্টি কর, না কি আমি সৃষ্টি করি? আমি তোমাদের মৃত্যুকাল স্থির করেছি, এবং আমি অক্ষমও নই।। তোমরা তো প্রাথমিক সৃষ্টি সম্বন্ধে অবগত হয়েছ। তাহলে তোমরা অনুধাবন কর না কেন? তোমরা যে বীজ বপন কর, সে সম্বন্ধে চিন্তা করেছ কি? তোমরাই কি তা অংকুরিত কর, না আমি তা করি? (সূরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৫৮-৬৪)
বল-আসমান ও জমিন থেকে কে তোমাদেরকে জীবিকা সরবরাহ করেন? বল-আল্লাহ। হয় আমরা সৎপথে স্থিত, এবং তোমরা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছ, না হয় তোমরা সৎপথে আছ, এবং আমরা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছি। (দুইটার যে-কোনো একটাই সত্য হতে পারে, উভয়টা নয়। বিস্ময়কর আয়াত!) (সূরা সাবা, আয়াত: ২৪)
রবীঠাকুর এই প্রশ্নের মাহাত্ব বুঝতে পেরেছিলেন, যা তিনি সহজ ভাষায় তুলে ধরেছিলেন এই কবিতাটিতে:
প্রথম দিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল
সত্তার নতুন আবির্ভাবে-
কে তুমি।
মেলেনি উত্তর।
বৎসর বৎসর চ'লে গেল,
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল
পশ্চিম সাগরতীরে
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়-
কে তুমি।
পেল না উত্তর।
কিন্তু তার দুর্ভাগ্য যে তিনি উত্তর পাননি। এমনও হতে পারে যে তিনি 'মেলেনি উত্তর' দ্বারা প্রশ্নের শ্বাশ্বত চরিত্রের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। কিন্তু আল্লাহর অলিগণ পেয়েছেন উত্তর-এবং ফলে তারা যথাযথভাবেই উপলব্ধি করেছেন প্রশ্নের মাহাত্বকে। আর তখনই সব প্রশ্ন তাদের মন থেকে শুকনো পাতার মতো ঝ'রে প'ড়ে গেছে। রেখে গেছে আনন্দবোধ, বিস্ময়বোধ, কৃতজ্ঞতাবোধ, পূর্ণতাবোধ-এবং অসীমের সাথে অনুগত একাত্মতা।
তাহলে দেখা গেল যে মনে প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক। বরং মনে প্রশ্ন না জাগাই অস্বাভাবিক। আমরা প্রশ্নের ভারে জর্জরিত হই, নিজেকে খুঁজি-আর নিজেকে পাবার পরই আল্লাহকে পাওয়া শুরু হয়।
আমি ইব্রাহীমকে আসমান ও জমিনের পরিচালনা-ব্যবস্থা দেখাই, যেন সে নিশ্চিত বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। তারপর যখন তার ওপর রাত আচ্ছন্ন হলো, তখন সে নক্ষত্র দেখে বলল, এটাই আমার প্রতিপালক। অতঃপর যখন তা অস্তমিত হলো, তখন সে বলল, যা অস্তমিত হয় আমি তা পছন্দ করি না। অতঃপর যখন সে চন্দ্রকে উদিত হতে দেখল, তখন সে বলল, এটাই আমার প্রতিপালক। যখন সেটাও অস্তমিত হলো, তখন সে বলল, আমাকে আমার প্রতিপালক সৎপথ প্রদর্শন না করলে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হব। অতঃপর যখন সে সূর্যকে উদিত হতে দেখল, তখন বলল, এটাই আমার প্রতিপালক। এটাই সর্ববৃহৎ। যখন তাও অস্তমিত হলো, তখন সে বলল-হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যাকে আল্লাহর সমকক্ষ কর, তা থেকে আমি মুক্ত। নিশ্চয় আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁরই দিকে মুখ স্থাপন করলাম যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। এবং আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই। (সূরা আন'আম, আয়াত: ৭৫-৭৯)
লক্ষ্য করুন, স্বয়ং একজন নবীকেই বস্তুজগৎ নিয়ে প্রশ্ন করতে করতে অগ্রসর হতে হয়েছিল, যেভাবে অগ্রসর হতে হয় একজন বিজ্ঞানীকে। অথচ অনেক বিজ্ঞানীই বিভ্রান্ত হয়। তাদের ধারণা যে আল্লাহর সাহায্য ছাড়াই তারা জ্ঞানী হয়েছে।
মানুষকে দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করলে সে আমাকে আহ্বান করে; অতঃপর যখন আমি তার প্রতি অনুগ্রহ করি তখন সে বলে-আমি তো এ পেয়েছি আমার জ্ঞানের মাধ্যমে। আসলে এ এক পরীক্ষা, কিন্তু দের অধিকাংশই বোঝে না। ওদের পূর্ববর্তীরাও একথা বলত-কিন্তু তাদের কৃতকর্ম তাদের কোনো কাজে আসেনি। (সূরা যুমার, আয়াত: ৪৯-৫০)
স্বয়ং রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: যে নিজেকে জেনেছে, সে আল্লাহকে জেনেছে।
সুতরাং প্রশ্নের গুরুত্ব উপলব্ধি করা এবং তার জবাবের জন্য আল্লাহ-মুখী হওয়াই তো ইবাদত। আর মানব জীবনের একমাত্র লক্ষ্য এবং সার্থকতাই আল্লাহর ইবাদত করা।
অর্থাৎ প্রশ্নই আসে আল্লাহর কাছ থেকে। অথচ এই প্রশ্নের বাণ দ্বারা আহত হতে না চেয়ে উদ্ভ্রান্ত দাম্ভিক নাস্তিকরা সেই প্রশ্নবাণকে আল্লাহর প্রতিই ছুড়ে মারে। তারা আল্লাহকে প্রশ্নের দূরত্বেই রেখে দেয়। একবার ভেবেও দ্যাখে না যে তিনি প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছেন। ফলত যে-প্রশ্ন দ্বারা সে উপকৃত হতে পারত তার দ্বারা সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
📄 শৈশবের প্রশ্ন এবং যৌবনের উত্তর
গতকালই কোনো এক জায়গায় এক লেখক কোনো এক ব্যক্তির সাথে কথা বলছিলেন জনৈক আরজ আলী মাতব্বরের সম্বন্ধে। তিনি উক্ত মাতব্বর নাম্নী লেখকের ভূয়সী প্রশংসার সাথে সাথে তার বইয়ের বাঁধাই এবং প্রকাশ নিয়ে বিস্ময়েক্তি করছিলেন। তাদের আলাপের মধ্যে একটু ঢুকে পড়তে হলো কেবল একটা প্রশ্ন করার জন্য: আচ্ছা, আরজ আলী মাতব্বরের বইয়ের যে কাটতি এবং গেট-আপ, তা সত্যিই ঈর্ষণীয়; কিন্তু আমাকে একটু বলবেন কি বইগুলো কারা পড়ে?
আমার কথা শুনে সেই লেখক মশাই বললেন, 'কেন? প্রগতিশীল মনের পাঠকেরা।'
তিনি এমন ভাব দেখালেন যেন প্রশ্নটা ক'রে আমি মস্ত বড় বোকামির পরিচয় দিয়ে ফেলেছি। তবুও আমি লাজ-শরমের মাথা খেয়ে নিজের স্বভাবের সাথে বিরোধিতা ক'রেই তার মুখের ওপর ب'লে উঠলাম-কিন্তু কী আছে তার বইতে? উনি তো একজন ভালগার ম্যাটেরিয়ালিস্ট-জ্ঞানের গভীর বিষয়গুলো নিয়ে তিনি কতকগুলো বুনো এবং বেয়াদবসুলভ অগভীর প্রশ্ন করেছেন মাত্র। তার মতো বোকামিপূর্ণ প্রশ্ন করত সেই আড়াই হাজার বছর আগের গ্রীক সফিস্টরা, কিন্তু নি:সন্দেহে তাদের যোগ্যতার সাথে মাতব্বর সাহেবকে তুলনা করাও বোকামি। তিনি ছিলেন এক অশিক্ষিত গেঁয়ে ভূত-তা তার কথা থেকেও টের পাওয়া যায়। তিনি রসিয়ে রসিয়ে দর্শন শিক্ষা এবং তা আলোচনার কথা বলে কৃত্রিমতাপূর্ণ বিনয়ের আড়ালে সে-কি দম্ভ করেছেন; কিন্তু ভাবতেও হাসি পায় যে, যে-মার্কসবাদীরা দর্শনকে তাদের মতবাদের উৎস ব'লে দাবি করে, তারা এই আধুনিক যুগেও মাতব্বরের মতো গণ্ডমূর্খ একটা লোকের অল্প-বিদ্যা ভয়ঙ্করী গোছের বিদ্যা-বুদ্ধিতে দর্শন খুঁজে পেল কিভাবে। আমার ভাবধারার সাথে তার ভাবধারা মিলুক বা না মিলুক, একথা আমি অবশ্যই বলব যে কাল মার্কস একজন বড় মাপের চিন্তাবিদ ছিলেন, কিছুটা পরিমাণে দার্শনিকও; তার অনুসারীদের মধ্যে আরো বড় মাপের দার্শনিক ছিলেন এবং আছেন। তাদের ধ্যান-ধারণাকে ধারণ ক'রে শিক্ষিত নাস্তিকদের পক্ষে মাতব্বরকে দার্শনিক বলা কিভাবে শোভা পায় তা আমি বুঝি না। ধর্মের বিরুদ্ধে কথা بলাই যদি প্রগতিশীলতা এবং ফ্যাশান হয়, তো ভালো কথা; তা দিয়েই ধর্মের সত্যতা প্রমাণিত হয়ে যায়। কিন্তু মাতব্বর নিজে কি দর্শন কাকে বলে বুঝতেন? পৃথিবীর ইতিহাসে কেবল তারাই দার্শনিক হয়েছেন যাদের ছিল মানবজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠতম মেধা। এঁদের পাশাপাশি মাতব্বরকে দার্শনিক বললে কী সেই সব প্রতিভা এবং দর্শনশাস্ত্রকেই অপমান করা হয় না? পৃথিবীর সব দার্শনিকই তার যুগের একজন শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ ছিলেন। গণিতের ভেতরকার abstract রহস্যকে ভালোভাবে জেনেই দর্শন শেখা শুরু করতে হয়। আরজ আলী মাতব্বর কতটুকু গণিত জানতেন?
আমার প্রশ্ন শুনে লেখক মশাই কিছুটা ভড়কে গেলেন। তিনি কিছুটা থেমে আসল কথাটা বললেন: আসলে আরজ আলীর বই আমরা কেউই পড়ি না, ঘরে রাখি মাত্র।
আমরা শুধু জানতে চাই তার আগ্রহ এবং প্রশ্নমুখী চিন্তা সম্বন্ধে। একজন গ্রামের সাধারণ অশিক্ষিত মানুষ কিভাবে নিজের চেষ্টায় শিক্ষিত হয়ে এত গুরুত্বপূর্ণ সব প্রশ্ন করত, এটাই আমাদের কাছে বিস্ময়ের ব্যাপার।
প্রিয় পাঠক, আপনি কি জানেন আরজ আলী মাতব্বর তার বইতে কী জাতীয় প্রশ্ন করেছেন? তিনি অত্যন্ত অল্প জ্ঞানের ওপর ভিত্তি ক'রে তুচ্ছ থেকে মানব জীবনের চূড়ান্ত প্রশ্নগুলো পর্যন্ত বারবার উচ্চারণ করেছেন। তিনি আল্লাহর অস্তিত্ব ও কোরআনের সত্যতা নিয়ে কিছু তুচ্ছ এবং হাস্যকর প্রশ্ন করেছেন। তিনি নিজের প্রশ্নের মাধ্যমেই তার হালকামিকে তুলে ধরেছেন। তিনি যে একটু বাহবা পাবার আশায় কত সচেষ্ট ছিলেন তা তার বই পড়লেই বুঝা যায়।
এ প্রসঙ্গে ছোট্ট একটা গল্প বলি। আমার এক আত্মীয়র একটা ছেলে আছে-নাম শুভ। বয়স-৭/৮। সে তার মাকে একদিন বলল-আচ্ছা মা, আমি তোমাকে বিয়ে করব। তার কথা শুনে তার মা সহ উপস্থিত সবাই তো হেসে খান-খান। তখন বিব্রত হয়ে সে জানতে চাইল-কেন মা, মাকে কি বিয়ে করা যায় না?
শুভ এমন একটা প্রশ্ন করেছে যা শিশুর মনে জাগতেই পারে, এবং জাগেও। এর সাথে যৌনতার কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু কেউ কি শুভকে 'না' ছাড়া অন্য কোনোভাবে তার প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে? প্রশ্নটা কি আদৌ গুরুত্বপূর্ণ? না। কারণ এই শুভই যখন বড় হবে, তখন তার মনে আর এই প্রশ্নটাই জাগবে না। যে প্রশ্ন অজ্ঞতা থেকে আসে, জ্ঞানের আলোর উপস্থিতিতে তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। আমাদের আলোচ্য মাতব্বর সাহেবের সবগুলো প্রশ্নই মনের অপরিপক্কতার ফল। তিনি শুধু মূর্খের মতো প্রশ্নই করেছেন, কারণ তাতে তার অহমিকা তৃপ্তি পেয়েছে, কিন্তু তিনি কোনো প্রশ্নেরই সদুত্তর খোঁজেননি, কারণ সে যোগ্যতাও তার ছিল না এবং জবাবের চেয়ে প্রশ্ন নিয়ে নাড়াচাড়া করার ওপরই তার ব্যবসায়ের সফলতা বেশি নির্ভর করতো।
কয়েকদিন আগে আমার ৭ বছর বয়েসী মেয়ে বিভা তার অন্তঃস্বত্তা মাকে জিজ্ঞেস করল: আচ্ছা মা, আমার ভাইয়াটাতো আর কয়েক মাস পরে পৃথিবীতে আসবে। সে কিভাবে পেট থেকে বের হবে?
অবস্থা বেগতিক দেখে আমিই তাকে চট ক'রে বলে দিলাম-অপারেশনের মাধ্যমে। ডাক্তারই বের করবে।
সে তৎক্ষণাৎ পাল্টা প্রশ্ন করল-কিন্তু ইভানকে তো (তার ছোট ভাই) ডাক্তার আম্মুর পেট কেটে বের করেনি। আম্মুর পেটে তো কোনো দাগ নেই। অথচ আমার অ্যাপেনডিসাইটিসের অপারেশনের দাগটা এখনও আছে।
আমি এবার তাকে বললাম-তুমি আরেকটু বড় হও, তখন বুঝবে। উত্তরটা এত কঠিন যে এখন তা বোঝার যোগ্যতা তোমার হয়নি।
বিভা বড় হলে প্রশ্নটাই আর করবে না। কারণ জবাবটা সেই নিজেই খুঁজে নেবে এবং পাবে।
আরজ আলী মাতব্বর কিছু শিশুসুলভ প্রশ্ন করেছেন। কিন্তু তিনি তার জবাব খোঁজার জন্য বড় হননি, অপেক্ষা করেননি। প্রশ্নের উত্তেজনায় তিনি কাতর ছিলেন। কিন্তু জবাব খোঁজার মতো কসরত করতে তিনি ছিলেন নারাজ। শুধু প্রশ্ন ক'রেই যদি বিখ্যাত হওয়া যায়, তাহলে আর কী চাই? তাহলে আর কষ্ট-সাধনার কী দরকার?