📘 কোরানিক সেলফ কন্ট্রোল এবং মৃত্যুহীন জীবন > 📄 মন এবং মহাবিশ্ব

📄 মন এবং মহাবিশ্ব


মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। তার সৃষ্টির সাথে গোটা দৃশ্য এবং অদৃশ্য, জ্ঞাত এবং (আপাতভাবে) অজ্ঞাত সৃষ্টি জড়িত। যাবতীয় সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হলো মানুষের সেবা করা-প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে। পবিত্র কোরআনেই বলা হয়েছে যে যাবতীয় সৃষ্টিকে মানুষের আজ্ঞাধীন বা উপকারের অধীন ক'রে দেয়া হয়েছে।
আকাশ এবং পৃথিবীর সবকিছুকে আল্লাহ তাঁর তরফ থেকে তোমাদের জন্য অধীন ক'রে দিয়েছেন। লক্ষ্য কর, চিন্তাশীলদের জন্য এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে। (সূরা জাসিয়া, আয়াত: ১৩)
ফলে সৃষ্টির প্রতিও মানুষের একটি দায়িত্ব রয়েছে-তা হলো, সে যেন গোটা দৃশ্য এবং (আপাতভাবে) অদৃশ্য সৃষ্টির সাথে তার দেহ-মনের সমস্ত ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেই জীবন-যাপন করে। আর এই দায়িত্ব পালন করার সর্বপ্রথম এবং মৌলিকতম উপায় হলো তার নিজের মনের ওপর যথাযথ কর্তব্য পালন করা। মানুষের মনের গতিবিধির সাথেই যাবতীয় সৃষ্টির ভারসাম্যকে এমনভাবে বেঁধে দেয়া হয়েছে যেন মন তার নিজের সৃজনশীলতা এবং চেতনা দ্বারা নিজের ওপর যে ক্রিয়া করে, গোটা আসমান এবং জমিনের এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সকল সৃষ্টিই সেই মনের এবং তার ধারকের (দেহের) ওপর সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া প্রেরণ করে। একথা পবিত্র কোরআনেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
আল্লাহ তার কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর যে করুণা বর্ষণ করেছেন তা কখনও পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের মনকে পরিবর্তন না করে ... (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫৩)
যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ১০৮)
তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, তাই আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গেছেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৬৭)
যে অবিশ্বাস করে, অবিশ্বাসের জন্য সেই দায়ী; যারা সৎকাজ করে তারা নিজেদের জন্যই রচনা করে সুখশয্যা। কারণ যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে পুরস্কৃত করেন। (সূরা রুম, আয়াত: ৪৪-৪৫)
তারা অন্যদেরকে এ (কোরআন) থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, এবং নিজেদেরকেও; কিন্তু তারা তো শুধু নিজেদের আত্মাকেই ধ্বংস করে, কিন্তু তারা তা বোঝে না। (সূরা আন'আম, আয়াত: ২৬)
হে মানবজাতি, তোমাদের ঔদ্ধত্য তোমাদেরই বিরুদ্ধে যায়। (সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৩)
আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে আগেই যে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন, তোমরা যদি তাতে বিশ্বাসী হও, তাহলে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে কে সে তোমাদের বাধা দেয়? (সূরা হাদীদ, আয়াত: ৮)
আল্লাহ কখনও তার বান্দাদের সাথে অন্যায় আচরণ করেন না। (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫১)
দেখা যাচ্ছে যে মানুষের ইচ্ছা, অঙ্গীকার, হৃদয়ের পবিত্রতা, আল্লাহমুখিতা, বিশ্বাসের দৃঢ়তা এসবের যাবতীয় মঙ্গল এবং অমঙ্গল তারই দিকে ফেরত যায়। এসব দিয়েই রচিত হয় তার বাস্তবতা। কিন্তু কিভাবে? বাস্তবতার সাথে অদৃশ্য, অপরিমাপযোগ্য এই মানসিকতা ও আচরণবিধির সম্পর্ক কী? নিচের আয়াতগুলো থেকে সেই রহস্য উদ্ঘাটিত হবে:'
মানুষের কৃতকর্মের জন্য জলে স্থলে বিপদ ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে ওদেরকে ওদের কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করানো হয়, যেন ওরা পথে ফিরে আসে। (অর্থাৎ মানুষের কর্মফলই মানুষের কাছে ফিরে আসে। কিন্তু কিভাবে? পরবর্তী আয়াতগুলোতে এর সমাধান রয়েছে।) (সূরা রুম, আয়াত: ৪১)
আল্লাহ যথাযথভাবে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এই উদ্দেশ্যে যে, যেন প্রত্যেক মানুষ তার কর্মানুযায়ী ফল পেতে পারে। (অর্থাৎ আসমান ও জমিনের সৃষ্টিফর্মুলার মধ্যে মানুষের সেই প্রতিশ্রুতিও একটা উপাদান যা প্রত্যেক মানুষ তার জন্মের আগে তার প্রতিপালকের কাছে দিয়েছিল। মানুষের কাজকে সেই প্রতিশ্রুতির সাথে মিলানো হয় এবং সেই অনুসারে কাজ থেকে কর্মফল সৃষ্ট হয়ে মানুষের কাছেই ফিরে আসে। চমৎকার সমীকরণ: যার কর্ম সেই ভোগ করবে-তার সাথে বিন্দুমাত্র অবিচার করা হবে না। পরবর্তী আয়াত দ্রঃ।) (সূরা জাসিয়া, আয়াত: ২২)
আকাশে রয়েছে তোমাদের জীবনোপকরণের উৎস এবং প্রতিশ্রুতি। আসমান ও জমিনের প্রতিপালকের শপথ, নিশ্চয় এ তোমাদের বাক্যালাপের মতোই সত্য। (সূরা যারিয়াত, আয়াত: ২২)
তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং (পরিমাপের জন্য) ভারসাম্য স্থাপিত করেছেন, যেন তোমরা পরিমাপে বৃদ্ধি না কর (ভারসাম্য লঙ্ঘন না কর)। ন্যায্য ওজনের মাপ প্রতিষ্ঠিত কর এবং মাপে কম দিয়ো না। (পরিপূর্ণ ভারসাম্যই আকাশের বিভিন্ন স্তরের বৈশিষ্ট্য। মানুষ খারাপ কাজ করলে এই ভারসাম্য বিঘ্নিত হয় এবং সেই বিশৃঙ্খলা মানুষেরই ভোগান্তির কারণ হয়। আকাশের বিভিন্ন স্তরে মানুষের বিভিন্ন কর্মফল সঞ্চিত থাকে। পরবর্তী আয়াত দ্রঃ।) (সূরা রহমান, আয়াত: ৭-৯)
তুমি বল, তোমরা কি তাঁকে অস্বীকার করবেই-যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দুদিনে, এবং তোমরা তাঁর সমকক্ষ দাঁড় করাতে চাও? তিনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক! তিনি ভূ-পৃষ্ঠে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, এবং পৃথিবীতে রেখেছেন কল্যাণ এবং চারদিনের মধ্যে এতে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। সমানভাবে সকলের জন্য, যারা এর অনুসন্ধান করে। অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন, যা ছিল ধূম্রপুঞ্জ বিশেষ। অনন্তর তিনি ওকে (আকাশকে) এবং পৃথিবীকে বললেন-তোমরা উভয়ে ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় হোক-আমার আদেশ পালনের জন্য প্রস্তুত হও। ওরা বলল, আমরা তো আনুগত্যের সাথেই প্রস্তুত আছি। অতঃপর তিনি আকাশমণ্ডলীকে দুদিনে সপ্ত আকাশে পরিণত করলেন; এবং প্রত্যেক আকাশের নিকট তার কর্তব্য ব্যক্ত করলেন এবং তিনি পৃথিবীর নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত এবং সুরক্ষিত করলেন। এসব পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহ কর্তৃক সুবিন্যস্ত। (সূরা হা-মীম-আস্ সিজদাহ, আয়াত: ৯-১২)
আসমান উপর থেকে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়, এবং ফেরেস্তাগণ তাদের প্রতিপালকের প্রশংসাপূর্ণ পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে, এবং পৃথিবীবাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। (এই রহস্যময় আয়াতে আল্লাহর নামের রহস্য এবং মাহাত্ব বর্ণিত হয়েছে। মানুষের কৃতকর্মের ফলে আকাশে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, আল্লাহর নামের শক্তিতে তা কেটে গিয়ে তাতে আবার ভারসাম্য স্থিত হয়। মূলত গোটা সৃষ্টিজগতের পরিচালনার শক্তি আসে আল্লাহর পবিত্র নামসমূহ থেকে। এজন্য আল্লাহ বলেছেন-তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণে স্মরণ কর। এই আয়াতটা থেকেও একথার সত্যতা প্রমাণিত হয়।) (সূরা শুরা, আয়াত: ৫)
আল্লাহ যথাযথভাবে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, যেন প্রত্যেক মানুষ তার কর্মানুযায়ী ফল পেতে পারে; তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না। (সূরা জাসিয়া, আয়াত: ২২)
আমি আমার ক্ষমতাবলে আকাশ নির্মাণ করেছি, এবং আমি অবশ্যই মহাক্ষমতাশালী। (সূরা যারিয়াত, আয়াত: ৪৭)
...তিনি জানেন-যা কিছু ভূমিতে প্রবেশ করে ও ভূমি থেকে নির্গত হয়, এবং আকাশ থেকে যা বর্ষিত হয়, এবং আকাশে যা কিছু উত্থিত হয়... (এখানে আল্লাহ আকাশ এবং পৃথিবীর মধ্যে যত কর্ম, কর্মফল, শক্তি, বস্তু ইত্যাদির আদান-প্রদান হয়, অর্থাৎ শক্তি শৃঙ্খল, খাদ্য-শৃঙ্খল, কার্বন-শৃঙ্খল ইত্যাদির বৃত্তীয় গতিবিধি যা সংঘটিত হয়, তার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। কোয়ান্টাম ফিজিক্সে যে-সব মহাজাগতিক রশ্মি এবং শক্তি-কণার কথা বলা হয়ে থাকে, যা দূর মহাবিশ্ব থেকে পৃথিবীতে আপতিত হয়, তার সবকিছুর প্রতিই এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে।) (সূরা হাদীদ, আয়াত: ৪)
সত্য যদি ওদের কামনা বাসনার অনুগামী হতো, তাহলে আকাশমণ্ডলী পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। (কারণ মানুষের বিশৃঙ্খল কামনা বাসনা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী কাজকর্ম কোনো সুষম ভারসাম্য সৃষ্টি করতে পারে না। এজন্য জীবন-ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদেরকে সেই নিয়মাবলী অনুসরণ করতে হবে যা দৃশ্য-অদৃশ্য-জ্ঞাত-অজ্ঞাত সব বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোরআনের নিয়মাবলীই সেই সার্বিকভাবে সুষম নিয়মাবলী।) (সূরা মোমেনুল, আয়াত: ৭১)
তিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেককে যথোচিত প্রকৃতি বা পরিমাপ দান করেছেন। (এ কারণে সেই বাস্তবতাই ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তবতা যাতে প্রত্যেক বস্তু এবং ব্যবস্থা তার নিজ নিজ প্রকৃতিতে অটল থাকতে পারে, কোনো বিশৃঙ্খলতার সৃষ্টি না হয়। ফলে বিবর্তনের একেক ধাপের জন্য সার্বিক ভারসাম্য ভিন্ন ভিন্ন হয়: যেহেতু দীর্ঘমেয়াদে বস্তুর প্রকৃতির কিছুটা পরিবর্তন হয়ে থাকে, যা প্রকৃতিতে বিবর্তন ঘটানোর জন্য পূর্বপরিকল্পিত।) (সূরা ফোরকান, আয়াত: ২)
আল্লাহ মানুষকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিলে ভূ-পৃষ্ঠে কোনো জীব-জন্তুকেই রেহাই দিতেন না। (অর্থাৎ মানুষের সৃষ্টি ফর্মুলার সাথে তথা অস্তিত্বের সাথে সকল জীবজন্তুর সৃষ্টি প্রক্রিয়া অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অন্য কথায়, মানুষ হলো গোটা সৃষ্টি জগতের সমন্বয়কারী ফর্মুলা-সবকিছু মানুষের মধ্যেই আছে, যা সাধকগণ প্রত্যক্ষ ক'রে থাকেন। ভারতবর্ষীয় ধর্মগ্রন্থগুলোতেও একথার স্পষ্ট উল্লেখ আছে।) (সূরা ফাতির, আয়াত: ৪৫)
তোমাদের সকলের সৃষ্টি এবং পুনরুত্থান একটামাত্র প্রাণীর সৃষ্টি এবং পুনরুত্থানেরই অনুরূপ। (অর্থাৎ প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যেই রয়েছে গোটা বিশ্ব। হযরত আলী (রাঃ) বলেছিলেন-তোমার মধ্যেই রয়েছে গোটা মহাবিশ্ব।)
যারা দাঁড়িয়ে, ব'সে, ও শুয়ে আল্লহকে স্মরণ করে, এবং আসমান ও জমিনের সৃষ্টি বিষয়ে চিন্তা করে যে-হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এ অনর্থক সৃষ্টি করনি... (সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১৯১)
তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং ভারসাম্য স্থাপন করেছেন, যেন তোমরা ভারসাম্যের সীমা লঙ্ঘন না কর। (সূরা আর-রহমান, আয়াত: ৭-৮)
আয়াতগুলোর মধ্যে যে মহারহস্য লুকিয়ে আছে তা চিন্তাশীল পাঠকমাত্রেরই চোখে পড়বে। এগুলোতে সৃষ্টিরহস্যের এমন কিছু তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে বিজ্ঞান যার এক অংশমাত্র জানতে পেরেছে। আল্লাহর অলিগণ এরূপ সত্য সরাসরি প্রত্যক্ষ ক'রে থাকেন। আমরা আয়াতগুলো থেকে জানতে পারছি যে আমাদের মানসিকতা এবং আচরণ দ্বারা আকাশের গঠন-কাঠামো প্রভাবিত হয়-তার ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এবং ফলে তা আমাদেরই ওপর যথোচিত প্রতিক্রিয়া প্রেরণ করে। আকাশের তথা গোটা মহাবিশ্বের সৃষ্টির এবং ধ্বংসের ফর্মুলার সাথে মানব মন এবং আচরণ অন্তর্ভুক্ত, যে কারণে মানুষ মহাবিশ্ব থেকে তার কর্মের ফল কড়ায়-গণ্ডায় পেয়ে যায়: সে ভালো কাজ করলে আকাশ থেকে উপযুক্ত সময়ে বৃষ্টি হয়, ঋতু পরিবর্তন যথোচিত নিয়মে ঘটে, ফসলের ফলন ভালো হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয় না ... ইত্যাদি; অপরপক্ষে মানুষ খারাপ কাজ করলে জলে-স্থলে বিপদ ছড়িয়ে পড়ে—ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, ভূমিকম্প, জলোচ্ছাস, বন্যা, অতিবৃষ্টি, খরা, দুর্ভিক্ষ, কলেরা, উল্কাবৃষ্টি... ইত্যাদি আকারে মানুষেরই কর্মফল মানুষের কাছে ফিরে আসে! পরিবেশের সামগ্রিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শক্তি শৃঙ্খল, কার্বন-শৃঙ্খল, খাদ্য-শৃঙ্খল ইত্যাদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আধুনিক বিজ্ঞান একথা বলে, যদিও বিজ্ঞান জানে না মানব মনের থেকেই গোটা সৃষ্টিজগতের জ্বালানি সরবরাহ হয়। আমরা আচরণের পরিমাপ লঙ্ঘন করলে আকাশের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়, কারণ আল্লাহ আসমান ও জমিনকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে তারা মানুষের কাছে তার কর্ম অনুযায়ী প্রতিফল পাঠায়। আসমানের সৃষ্টি ফর্মুলার মধ্যে রয়েছে মানুষের প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার যা সে পৃথিবীতে আসার আগে আল্লাহকে দিয়েছিল, ফলে তাতে আমাদের জীবিকার যে উৎস আছে তা আমাদের কর্মকাণ্ড দ্বারা প্রভাবিত হয়—সেই প্রতিশ্রুতি এবং আচরণের গরমিল দ্বারা উক্ত উৎসের ভারসাম্য প্রভাবিত হয়। এই ভারসাম্য রক্ষিত হয় কোরআন দ্বারা নির্দেশিত পথে চললে; খামখেয়ালিপূর্ণভাবে চললে তাতে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। শুধু আসমান নয়, পৃথিবীর যাবতীয় সৃষ্টিকুলও মানব মনের সাথে এমনভাবে সম্পর্কযুক্ত যে মানুষকে ধ্বংস করতে হলে তার সবই ধ্বংস হয়ে যেত। গোটা সৃষ্টির ফর্মুলাতে আল্লাহর নামের শক্তি এবং মানব মন জড়িত—ফলে সৃষ্টিই মানুষের জন্য ফাঁদস্বরূপ, তবে সে আল্লাহকে স্মরণ করলে ফাঁদ তাকে আটকাবে না, বরং তা তার দাসত্ব করবে।
সৃষ্টির সাথে সামগ্রিক ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে মানুষকে যেভাবে জীবন-যাপন করা উচিত সেভাবে জীবন-যাপন করতে পারলেই সে তার জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারে—জীবনের কাছ থেকে তার পাওনাটুকু পূর্ণ সার্থকতার সাথে লুফে নিয়ে এমন অভাবনীয় তৃপ্তি লাভ করতে পারে যা সাধারণ অস্থির মন কল্পনাও করতে পারে না। কিন্তু ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে মানুষকে প্রথমে তার মনকে সঠিক উপায়ে পরিচালিত করতে হয়। মনকে যথাযথভাবে এরূপ নিয়ন্ত্রণে রাখাকেই বলে মনোনিয়ন্ত্রণ। এই কাজকে আপাতভাবে মনের ওপর পরাধীনতা আরোপ করা ব'লেই মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে মনকে প্রকৃতার্থে স্বাধীন এবং দুঃখ-কষ্টহীন করতে হলে প্রথমে তাকে নিজের খামখেয়াপলিপনার কবল থেকে মুক্ত করা চাই। মনের সৃষ্টিরহস্য এমনই যে বন্ধনের মধ্যেই তার মুক্তির ব্যবস্থা ক'রে রাখা হয়েছে, কিন্তু মনের আত্মচেতনা বা স্বাধীনতার কারণে মন প্রাথমিকভাবে বুঝে উঠতে পারে না যে তার প্রকৃত চেতনা এবং শান্তি লুকিয়ে রয়েছে তারই স্বেচ্ছাচারিতার বিরোধিতার মধ্যে। মনের এই স্বেচ্ছাচারিতাই মানুষের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট, ব্যাধি, দৈহিক যন্ত্রণা, অভাব-কষ্টের কারণ। সঠিক প্রজ্ঞা এবং আচরণ দ্বারা মনকে তার প্রকৃত শান্তি এবং সফলতার পথ দেখানোকেই মাইন্ড কন্ট্রোল বলে। এর উচ্চতম স্তরে পৌঁছতে পারলে মৃত্যুকেও অতিক্রম করা যায়। এই স্তরকেই আমরা বলছি সেল্ফ কন্ট্রোল।

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। তার সৃষ্টির সাথে গোটা দৃশ্য এবং অদৃশ্য, জ্ঞাত এবং (আপাতভাবে) অজ্ঞাত সৃষ্টি জড়িত। যাবতীয় সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হলো মানুষের সেবা করা-প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে। পবিত্র কোরআনেই বলা হয়েছে যে যাবতীয় সৃষ্টিকে মানুষের আজ্ঞাধীন বা উপকারের অধীন ক'রে দেয়া হয়েছে।
আকাশ এবং পৃথিবীর সবকিছুকে আল্লাহ তাঁর তরফ থেকে তোমাদের জন্য অধীন ক'রে দিয়েছেন। লক্ষ্য কর, চিন্তাশীলদের জন্য এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে। (সূরা জাসিয়া, আয়াত: ১৩)
ফলে সৃষ্টির প্রতিও মানুষের একটি দায়িত্ব রয়েছে-তা হলো, সে যেন গোটা দৃশ্য এবং (আপাতভাবে) অদৃশ্য সৃষ্টির সাথে তার দেহ-মনের সমস্ত ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেই জীবন-যাপন করে। আর এই দায়িত্ব পালন করার সর্বপ্রথম এবং মৌলিকতম উপায় হলো তার নিজের মনের ওপর যথাযথ কর্তব্য পালন করা। মানুষের মনের গতিবিধির সাথেই যাবতীয় সৃষ্টির ভারসাম্যকে এমনভাবে বেঁধে দেয়া হয়েছে যেন মন তার নিজের সৃজনশীলতা এবং চেতনা দ্বারা নিজের ওপর যে ক্রিয়া করে, গোটা আসমান এবং জমিনের এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সকল সৃষ্টিই সেই মনের এবং তার ধারকের (দেহের) ওপর সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া প্রেরণ করে। একথা পবিত্র কোরআনেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
আল্লাহ তার কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর যে করুণা বর্ষণ করেছেন তা কখনও পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের মনকে পরিবর্তন না করে ... (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫৩)
যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ১০৮)
তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, তাই আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গেছেন। (সূরা তওবা, আয়াত: ৬৭)
যে অবিশ্বাস করে, অবিশ্বাসের জন্য সেই দায়ী; যারা সৎকাজ করে তারা নিজেদের জন্যই রচনা করে সুখশয্যা। কারণ যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে পুরস্কৃত করেন। (সূরা রুম, আয়াত: ৪৪-৪৫)
তারা অন্যদেরকে এ (কোরআন) থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, এবং নিজেদেরকেও; কিন্তু তারা তো শুধু নিজেদের আত্মাকেই ধ্বংস করে, কিন্তু তারা তা বোঝে না। (সূরা আন'আম, আয়াত: ২৬)
হে মানবজাতি, তোমাদের ঔদ্ধত্য তোমাদেরই বিরুদ্ধে যায়। (সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৩)
আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে আগেই যে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন, তোমরা যদি তাতে বিশ্বাসী হও, তাহলে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে কে সে তোমাদের বাধা দেয়? (সূরা হাদীদ, আয়াত: ৮)
আল্লাহ কখনও তার বান্দাদের সাথে অন্যায় আচরণ করেন না। (সূরা আনফাল, আয়াত: ৫১)
দেখা যাচ্ছে যে মানুষের ইচ্ছা, অঙ্গীকার, হৃদয়ের পবিত্রতা, আল্লাহমুখিতা, বিশ্বাসের দৃঢ়তা এসবের যাবতীয় মঙ্গল এবং অমঙ্গল তারই দিকে ফেরত যায়। এসব দিয়েই রচিত হয় তার বাস্তবতা। কিন্তু কিভাবে? বাস্তবতার সাথে অদৃশ্য, অপরিমাপযোগ্য এই মানসিকতা ও আচরণবিধির সম্পর্ক কী? নিচের আয়াতগুলো থেকে সেই রহস্য উদ্ঘাটিত হবে:'
মানুষের কৃতকর্মের জন্য জলে স্থলে বিপদ ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে ওদেরকে ওদের কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করানো হয়, যেন ওরা পথে ফিরে আসে। (অর্থাৎ মানুষের কর্মফলই মানুষের কাছে ফিরে আসে। কিন্তু কিভাবে? পরবর্তী আয়াতগুলোতে এর সমাধান রয়েছে।) (সূরা রুম, আয়াত: ৪১)
আল্লাহ যথাযথভাবে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এই উদ্দেশ্যে যে, যেন প্রত্যেক মানুষ তার কর্মানুযায়ী ফল পেতে পারে। (অর্থাৎ আসমান ও জমিনের সৃষ্টিফর্মুলার মধ্যে মানুষের সেই প্রতিশ্রুতিও একটা উপাদান যা প্রত্যেক মানুষ তার জন্মের আগে তার প্রতিপালকের কাছে দিয়েছিল। মানুষের কাজকে সেই প্রতিশ্রুতির সাথে মিলানো হয় এবং সেই অনুসারে কাজ থেকে কর্মফল সৃষ্ট হয়ে মানুষের কাছেই ফিরে আসে। চমৎকার সমীকরণ: যার কর্ম সেই ভোগ করবে-তার সাথে বিন্দুমাত্র অবিচার করা হবে না। পরবর্তী আয়াত দ্রঃ।) (সূরা জাসিয়া, আয়াত: ২২)
আকাশে রয়েছে তোমাদের জীবনোপকরণের উৎস এবং প্রতিশ্রুতি। আসমান ও জমিনের প্রতিপালকের শপথ, নিশ্চয় এ তোমাদের বাক্যালাপের মতোই সত্য। (সূরা যারিয়াত, আয়াত: ২২)
তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং (পরিমাপের জন্য) ভারসাম্য স্থাপিত করেছেন, যেন তোমরা পরিমাপে বৃদ্ধি না কর (ভারসাম্য লঙ্ঘন না কর)। ন্যায্য ওজনের মাপ প্রতিষ্ঠিত কর এবং মাপে কম দিয়ো না। (পরিপূর্ণ ভারসাম্যই আকাশের বিভিন্ন স্তরের বৈশিষ্ট্য। মানুষ খারাপ কাজ করলে এই ভারসাম্য বিঘ্নিত হয় এবং সেই বিশৃঙ্খলা মানুষেরই ভোগান্তির কারণ হয়। আকাশের বিভিন্ন স্তরে মানুষের বিভিন্ন কর্মফল সঞ্চিত থাকে। পরবর্তী আয়াত দ্রঃ।) (সূরা রহমান, আয়াত: ৭-৯)
তুমি বল, তোমরা কি তাঁকে অস্বীকার করবেই-যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দুদিনে, এবং তোমরা তাঁর সমকক্ষ দাঁড় করাতে চাও? তিনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক! তিনি ভূ-পৃষ্ঠে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, এবং পৃথিবীতে রেখেছেন কল্যাণ এবং চারদিনের মধ্যে এতে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। সমানভাবে সকলের জন্য, যারা এর অনুসন্ধান করে। অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন, যা ছিল ধূম্রপুঞ্জ বিশেষ। অনন্তর তিনি ওকে (আকাশকে) এবং পৃথিবীকে বললেন-তোমরা উভয়ে ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় হোক-আমার আদেশ পালনের জন্য প্রস্তুত হও। ওরা বলল, আমরা তো আনুগত্যের সাথেই প্রস্তুত আছি। অতঃপর তিনি আকাশমণ্ডলীকে দুদিনে সপ্ত আকাশে পরিণত করলেন; এবং প্রত্যেক আকাশের নিকট তার কর্তব্য ব্যক্ত করলেন এবং তিনি পৃথিবীর নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত এবং সুরক্ষিত করলেন। এসব পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহ কর্তৃক সুবিন্যস্ত। (সূরা হা-মীম-আস্ সিজদাহ, আয়াত: ৯-১২)
আসমান উপর থেকে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়, এবং ফেরেস্তাগণ তাদের প্রতিপালকের প্রশংসাপূর্ণ পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে, এবং পৃথিবীবাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। (এই রহস্যময় আয়াতে আল্লাহর নামের রহস্য এবং মাহাত্ব বর্ণিত হয়েছে। মানুষের কৃতকর্মের ফলে আকাশে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, আল্লাহর নামের শক্তিতে তা কেটে গিয়ে তাতে আবার ভারসাম্য স্থিত হয়। মূলত গোটা সৃষ্টিজগতের পরিচালনার শক্তি আসে আল্লাহর পবিত্র নামসমূহ থেকে। এজন্য আল্লাহ বলেছেন-তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণে স্মরণ কর। এই আয়াতটা থেকেও একথার সত্যতা প্রমাণিত হয়।) (সূরা শুরা, আয়াত: ৫)
আল্লাহ যথাযথভাবে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, যেন প্রত্যেক মানুষ তার কর্মানুযায়ী ফল পেতে পারে; তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না। (সূরা জাসিয়া, আয়াত: ২২)
আমি আমার ক্ষমতাবলে আকাশ নির্মাণ করেছি, এবং আমি অবশ্যই মহাক্ষমতাশালী। (সূরা যারিয়াত, আয়াত: ৪৭)
...তিনি জানেন-যা কিছু ভূমিতে প্রবেশ করে ও ভূমি থেকে নির্গত হয়, এবং আকাশ থেকে যা বর্ষিত হয়, এবং আকাশে যা কিছু উত্থিত হয়... (এখানে আল্লাহ আকাশ এবং পৃথিবীর মধ্যে যত কর্ম, কর্মফল, শক্তি, বস্তু ইত্যাদির আদান-প্রদান হয়, অর্থাৎ শক্তি শৃঙ্খল, খাদ্য-শৃঙ্খল, কার্বন-শৃঙ্খল ইত্যাদির বৃত্তীয় গতিবিধি যা সংঘটিত হয়, তার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। কোয়ান্টাম ফিজিক্সে যে-সব মহাজাগতিক রশ্মি এবং শক্তি-কণার কথা বলা হয়ে থাকে, যা দূর মহাবিশ্ব থেকে পৃথিবীতে আপতিত হয়, তার সবকিছুর প্রতিই এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে।) (সূরা হাদীদ, আয়াত: ৪)
সত্য যদি ওদের কামনা বাসনার অনুগামী হতো, তাহলে আকাশমণ্ডলী পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। (কারণ মানুষের বিশৃঙ্খল কামনা বাসনা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী কাজকর্ম কোনো সুষম ভারসাম্য সৃষ্টি করতে পারে না। এজন্য জীবন-ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদেরকে সেই নিয়মাবলী অনুসরণ করতে হবে যা দৃশ্য-অদৃশ্য-জ্ঞাত-অজ্ঞাত সব বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোরআনের নিয়মাবলীই সেই সার্বিকভাবে সুষম নিয়মাবলী।) (সূরা মোমেনুল, আয়াত: ৭১)
তিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেককে যথোচিত প্রকৃতি বা পরিমাপ দান করেছেন। (এ কারণে সেই বাস্তবতাই ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তবতা যাতে প্রত্যেক বস্তু এবং ব্যবস্থা তার নিজ নিজ প্রকৃতিতে অটল থাকতে পারে, কোনো বিশৃঙ্খলতার সৃষ্টি না হয়। ফলে বিবর্তনের একেক ধাপের জন্য সার্বিক ভারসাম্য ভিন্ন ভিন্ন হয়: যেহেতু দীর্ঘমেয়াদে বস্তুর প্রকৃতির কিছুটা পরিবর্তন হয়ে থাকে, যা প্রকৃতিতে বিবর্তন ঘটানোর জন্য পূর্বপরিকল্পিত।) (সূরা ফোরকান, আয়াত: ২)
আল্লাহ মানুষকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিলে ভূ-পৃষ্ঠে কোনো জীব-জন্তুকেই রেহাই দিতেন না। (অর্থাৎ মানুষের সৃষ্টি ফর্মুলার সাথে তথা অস্তিত্বের সাথে সকল জীবজন্তুর সৃষ্টি প্রক্রিয়া অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অন্য কথায়, মানুষ হলো গোটা সৃষ্টি জগতের সমন্বয়কারী ফর্মুলা-সবকিছু মানুষের মধ্যেই আছে, যা সাধকগণ প্রত্যক্ষ ক'রে থাকেন। ভারতবর্ষীয় ধর্মগ্রন্থগুলোতেও একথার স্পষ্ট উল্লেখ আছে।) (সূরা ফাতির, আয়াত: ৪৫)
তোমাদের সকলের সৃষ্টি এবং পুনরুত্থান একটামাত্র প্রাণীর সৃষ্টি এবং পুনরুত্থানেরই অনুরূপ। (অর্থাৎ প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যেই রয়েছে গোটা বিশ্ব। হযরত আলী (রাঃ) বলেছিলেন-তোমার মধ্যেই রয়েছে গোটা মহাবিশ্ব।)
যারা দাঁড়িয়ে, ব'সে, ও শুয়ে আল্লহকে স্মরণ করে, এবং আসমান ও জমিনের সৃষ্টি বিষয়ে চিন্তা করে যে-হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এ অনর্থক সৃষ্টি করনি... (সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১৯১)
তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং ভারসাম্য স্থাপন করেছেন, যেন তোমরা ভারসাম্যের সীমা লঙ্ঘন না কর। (সূরা আর-রহমান, আয়াত: ৭-৮)
আয়াতগুলোর মধ্যে যে মহারহস্য লুকিয়ে আছে তা চিন্তাশীল পাঠকমাত্রেরই চোখে পড়বে। এগুলোতে সৃষ্টিরহস্যের এমন কিছু তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে বিজ্ঞান যার এক অংশমাত্র জানতে পেরেছে। আল্লাহর অলিগণ এরূপ সত্য সরাসরি প্রত্যক্ষ ক'রে থাকেন। আমরা আয়াতগুলো থেকে জানতে পারছি যে আমাদের মানসিকতা এবং আচরণ দ্বারা আকাশের গঠন-কাঠামো প্রভাবিত হয়-তার ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এবং ফলে তা আমাদেরই ওপর যথোচিত প্রতিক্রিয়া প্রেরণ করে। আকাশের তথা গোটা মহাবিশ্বের সৃষ্টির এবং ধ্বংসের ফর্মুলার সাথে মানব মন এবং আচরণ অন্তর্ভুক্ত, যে কারণে মানুষ মহাবিশ্ব থেকে তার কর্মের ফল কড়ায়-গণ্ডায় পেয়ে যায়: সে ভালো কাজ করলে আকাশ থেকে উপযুক্ত সময়ে বৃষ্টি হয়, ঋতু পরিবর্তন যথোচিত নিয়মে ঘটে, ফসলের ফলন ভালো হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয় না ... ইত্যাদি; অপরপক্ষে মানুষ খারাপ কাজ করলে জলে-স্থলে বিপদ ছড়িয়ে পড়ে—ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, ভূমিকম্প, জলোচ্ছাস, বন্যা, অতিবৃষ্টি, খরা, দুর্ভিক্ষ, কলেরা, উল্কাবৃষ্টি... ইত্যাদি আকারে মানুষেরই কর্মফল মানুষের কাছে ফিরে আসে! পরিবেশের সামগ্রিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শক্তি শৃঙ্খল, কার্বন-শৃঙ্খল, খাদ্য-শৃঙ্খল ইত্যাদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আধুনিক বিজ্ঞান একথা বলে, যদিও বিজ্ঞান জানে না মানব মনের থেকেই গোটা সৃষ্টিজগতের জ্বালানি সরবরাহ হয়। আমরা আচরণের পরিমাপ লঙ্ঘন করলে আকাশের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়, কারণ আল্লাহ আসমান ও জমিনকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে তারা মানুষের কাছে তার কর্ম অনুযায়ী প্রতিফল পাঠায়। আসমানের সৃষ্টি ফর্মুলার মধ্যে রয়েছে মানুষের প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার যা সে পৃথিবীতে আসার আগে আল্লাহকে দিয়েছিল, ফলে তাতে আমাদের জীবিকার যে উৎস আছে তা আমাদের কর্মকাণ্ড দ্বারা প্রভাবিত হয়—সেই প্রতিশ্রুতি এবং আচরণের গরমিল দ্বারা উক্ত উৎসের ভারসাম্য প্রভাবিত হয়। এই ভারসাম্য রক্ষিত হয় কোরআন দ্বারা নির্দেশিত পথে চললে; খামখেয়ালিপূর্ণভাবে চললে তাতে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। শুধু আসমান নয়, পৃথিবীর যাবতীয় সৃষ্টিকুলও মানব মনের সাথে এমনভাবে সম্পর্কযুক্ত যে মানুষকে ধ্বংস করতে হলে তার সবই ধ্বংস হয়ে যেত। গোটা সৃষ্টির ফর্মুলাতে আল্লাহর নামের শক্তি এবং মানব মন জড়িত—ফলে সৃষ্টিই মানুষের জন্য ফাঁদস্বরূপ, তবে সে আল্লাহকে স্মরণ করলে ফাঁদ তাকে আটকাবে না, বরং তা তার দাসত্ব করবে।
সৃষ্টির সাথে সামগ্রিক ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে মানুষকে যেভাবে জীবন-যাপন করা উচিত সেভাবে জীবন-যাপন করতে পারলেই সে তার জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারে—জীবনের কাছ থেকে তার পাওনাটুকু পূর্ণ সার্থকতার সাথে লুফে নিয়ে এমন অভাবনীয় তৃপ্তি লাভ করতে পারে যা সাধারণ অস্থির মন কল্পনাও করতে পারে না। কিন্তু ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে মানুষকে প্রথমে তার মনকে সঠিক উপায়ে পরিচালিত করতে হয়। মনকে যথাযথভাবে এরূপ নিয়ন্ত্রণে রাখাকেই বলে মনোনিয়ন্ত্রণ। এই কাজকে আপাতভাবে মনের ওপর পরাধীনতা আরোপ করা ব'লেই মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে মনকে প্রকৃতার্থে স্বাধীন এবং দুঃখ-কষ্টহীন করতে হলে প্রথমে তাকে নিজের খামখেয়াপলিপনার কবল থেকে মুক্ত করা চাই। মনের সৃষ্টিরহস্য এমনই যে বন্ধনের মধ্যেই তার মুক্তির ব্যবস্থা ক'রে রাখা হয়েছে, কিন্তু মনের আত্মচেতনা বা স্বাধীনতার কারণে মন প্রাথমিকভাবে বুঝে উঠতে পারে না যে তার প্রকৃত চেতনা এবং শান্তি লুকিয়ে রয়েছে তারই স্বেচ্ছাচারিতার বিরোধিতার মধ্যে। মনের এই স্বেচ্ছাচারিতাই মানুষের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট, ব্যাধি, দৈহিক যন্ত্রণা, অভাব-কষ্টের কারণ। সঠিক প্রজ্ঞা এবং আচরণ দ্বারা মনকে তার প্রকৃত শান্তি এবং সফলতার পথ দেখানোকেই মাইন্ড কন্ট্রোল বলে। এর উচ্চতম স্তরে পৌঁছতে পারলে মৃত্যুকেও অতিক্রম করা যায়। এই স্তরকেই আমরা বলছি সেল্ফ কন্ট্রোল।

📘 কোরানিক সেলফ কন্ট্রোল এবং মৃত্যুহীন জীবন > 📄 মাইন্ড কন্ট্রোলের নামে বিভ্রান্তিকর কথকতা

📄 মাইন্ড কন্ট্রোলের নামে বিভ্রান্তিকর কথকতা


বলা বাহুল্য, গত কয়েক দশক ধ'রে positive thinking, mind control, mesmerism, hypnotism, self-hypnosis-ইত্যাদি মনস্তাত্ত্বিক কলাকৌশল প্রয়োগ ক'রে বিশেষত পশ্চিমা বিশ্বে যে মানসিক ব্যায়ামের চর্চার হিড়িক চলছে, তা সামান্য কিছু ব্যায়াম এবং ছেলে-ভুলানো তত্ত্বকথা মাত্র। উদভ্রান্ত 'আধুনিক' দুপেয়ে জীবগুলো তাদের মানসিক স্বাধীনতার সীমারেখা চরমভাবে অতিক্রম করেছে ব'লে জীবনের দান তাদের কাছে আধিক্যের অভিশাপের কারণে অধিকাংশ সময়ে জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দেখা দেয়। এই অভিশাপের জ্বালা থেকে সাময়িকভাবে মুক্তি পাবার জন্য তারা সাপ্তাহিক ছুটি-কাটানোর মতো মাঝে মধ্যে জীবনকেই ভুলে থাকতে চায়। আর এরই উপায় হিসেবে তারা ড্রাগ থেকে শুরু ক'রে বিভিন্ন কথা-সর্বস্ব চটকদার মাইন্ড কন্ট্রোলিং একসারসাইজের আশ্রয় নেয়। এতে তারা কখনো-কখনো আত্মচেতনার অপব্যবহার থেকে উদ্ভূত দোজখের আগুন থেকে পালিয়ে গিয়ে ঘুমিয়ে থাকার তৃপ্তিটুকু পেয়ে থাকে বটে, কিন্তু তারা জানে না যে এ হলো কেবল ক্লান্তির পরে বিশ্রামের তৃপ্তিমাত্র। ক্লান্তিকে ভুলে থাকা আর ক্লান্তিকে অতিক্রম করা এক কথা নয়। একথা অনুধাবন করার সময়ও তাদের নেই। সময়ের সাথে তারা দুর্ব্যবহার করেছে ব'লে সময় এবং জীবন তাদেরকে অহরাত্র ফাঁকি দিয়ে চলেছে। তথাকথিত মাইন্ড কন্ট্রোলের নামে তারা এই ফাঁকির মৃত্যু থেকে সাময়িকভাবে বাঁচার আশায় relaxation এর নামে আত্মবিস্মৃতির কবরে কিছুক্ষণের জন্য ঘুমিয়ে থেকে চেতনার বোঝা কমাতে চায়। আত্মচেতনার অপব্যবহার বিশুদ্ধ চেতনার ওপর যে জঞ্জাল এবং যাতনা চাপিয়ে দেয়, তা থেকে বাঁচতে গিয়ে তারা সাময়িক চেতনালোপ বা মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করে, আর এ কারণে বর্তমানে সর্বত্র চলছে মাইন্ড কন্ট্রোলের নামে মাইন্ডকে ভুলে-থাকার দাওয়াই সেবনের হিড়িক।
কিন্তু কেউ নিজেকে ভুলতে পারে না।
আত্ম-চেতনা যখন চেতনার অপব্যবহার করে তখন চেতনাও তার পাল্টা আগুন দিয়ে তার প্রতিশোধ নেয়। ঘুম দিয়ে তা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে থাকা গেলেও নেভানো যায় না।

বলা বাহুল্য, গত কয়েক দশক ধ'রে positive thinking, mind control, mesmerism, hypnotism, self-hypnosis-ইত্যাদি মনস্তাত্ত্বিক কলাকৌশল প্রয়োগ ক'রে বিশেষত পশ্চিমা বিশ্বে যে মানসিক ব্যায়ামের চর্চার হিড়িক চলছে, তা সামান্য কিছু ব্যায়াম এবং ছেলে-ভুলানো তত্ত্বকথা মাত্র। উদভ্রান্ত 'আধুনিক' দুপেয়ে জীবগুলো তাদের মানসিক স্বাধীনতার সীমারেখা চরমভাবে অতিক্রম করেছে ব'লে জীবনের দান তাদের কাছে আধিক্যের অভিশাপের কারণে অধিকাংশ সময়ে জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দেখা দেয়। এই অভিশাপের জ্বালা থেকে সাময়িকভাবে মুক্তি পাবার জন্য তারা সাপ্তাহিক ছুটি-কাটানোর মতো মাঝে মধ্যে জীবনকেই ভুলে থাকতে চায়। আর এরই উপায় হিসেবে তারা ড্রাগ থেকে শুরু ক'রে বিভিন্ন কথা-সর্বস্ব চটকদার মাইন্ড কন্ট্রোলিং একসারসাইজের আশ্রয় নেয়। এতে তারা কখনো-কখনো আত্মচেতনার অপব্যবহার থেকে উদ্ভূত দোজখের আগুন থেকে পালিয়ে গিয়ে ঘুমিয়ে থাকার তৃপ্তিটুকু পেয়ে থাকে বটে, কিন্তু তারা জানে না যে এ হলো কেবল ক্লান্তির পরে বিশ্রামের তৃপ্তিমাত্র। ক্লান্তিকে ভুলে থাকা আর ক্লান্তিকে অতিক্রম করা এক কথা নয়। একথা অনুধাবন করার সময়ও তাদের নেই। সময়ের সাথে তারা দুর্ব্যবহার করেছে ব'লে সময় এবং জীবন তাদেরকে অহরাত্র ফাঁকি দিয়ে চলেছে। তথাকথিত মাইন্ড কন্ট্রোলের নামে তারা এই ফাঁকির মৃত্যু থেকে সাময়িকভাবে বাঁচার আশায় relaxation এর নামে আত্মবিস্মৃতির কবরে কিছুক্ষণের জন্য ঘুমিয়ে থেকে চেতনার বোঝা কমাতে চায়। আত্মচেতনার অপব্যবহার বিশুদ্ধ চেতনার ওপর যে জঞ্জাল এবং যাতনা চাপিয়ে দেয়, তা থেকে বাঁচতে গিয়ে তারা সাময়িক চেতনালোপ বা মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করে, আর এ কারণে বর্তমানে সর্বত্র চলছে মাইন্ড কন্ট্রোলের নামে মাইন্ডকে ভুলে-থাকার দাওয়াই সেবনের হিড়িক।
কিন্তু কেউ নিজেকে ভুলতে পারে না।
আত্ম-চেতনা যখন চেতনার অপব্যবহার করে তখন চেতনাও তার পাল্টা আগুন দিয়ে তার প্রতিশোধ নেয়। ঘুম দিয়ে তা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে থাকা গেলেও নেভানো যায় না।

📘 কোরানিক সেলফ কন্ট্রোল এবং মৃত্যুহীন জীবন > 📄 কোরানিক সেল্ফ কন্ট্রোল এবং এর বিশেষত্ব

📄 কোরানিক সেল্ফ কন্ট্রোল এবং এর বিশেষত্ব


মাইন্ড কন্ট্রোলের সর্বোচ্চ স্তর হলো সেল্ফ কন্ট্রোল, যার প্রকৃত সুফল এবং শক্তি নিহিত রয়েছে পবিত্র কোরআন এবং নবী (সঃ)-এর সুন্নাহতে, যাদেরকে মেলাতে হয় বিশেষ উপায়ে সাধনার মাধ্যমে। আমরা ইতোমধ্যে কিছুটা বুঝেও নিয়েছি কী এর ফলশ্রুতি। এর রূপরেখা এবং পদ্ধতিগুলো কী তা আমরা স্পষ্টভাবে জানব। আমরা প্রমাণ সহকারে জানব যে ইসলামিক মাইন্ড কন্ট্রোল মানে কোনো সাময়িক ব্যায়াম নয়, তা হলো পুরোপুরি লাইফ কন্ট্রোল।
মনোনিয়ন্ত্রণ মানেই জীবন-নিয়ন্ত্রণ।
অর্থাৎ জীবনকে পাওয়া।
অর্থাৎ আলোকপ্রাপ্তি।
সকল দুঃখ-কষ্টকে অতিক্রম করা।
এমনকি শারিরীক যন্ত্রণাকেও অতিক্রম করা।
জীবনের স্বরূপ দর্শন।
নিজেকে ফিরে পাওয়া।
মানব-মনের স্বাভাবজাত স্বর্গসুখে পুনস্থিত হওয়া, যা আমরা আত্ম-চেতনা প্রাপ্তির সাথে সাথেই ভ্রান্তিবশত হারিয়ে ফেলেছি।
ইসলামিক আত্মনিয়ন্ত্রণ মানে মনের যাবতীয় ময়লা থেকে মনকে পরিষ্কার করা।
অন্ধকারের অতল থেকে আলোর জগতে উঠে আসা।
সকল সীমাকে অতিক্রম ক'রে অসীমে উত্তরণ।
অন্তরের দারিদ্র্যমোচন।
ন্যূজ দুর্বলতাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে অনাড়ষ্ট সবলতা অর্জন।
চিরকালীন মুক্তি।
দুশ্চিন্তা, হতাশা, যুগের ক্লান্তি থেকে চিরমুক্তি।
মোহমুক্তি।
তীলে তীলে মৃত্যুকেও অতিক্রম ক'রে যাওয়া।
এর মাধ্যমে জীবনের অভিশাপ থেকে জীবন চিরমুক্তি লাভ করে। ভোগ পরিণত হয় যথার্থ সম্ভোগে। সংযম পরিণত হয় পরম প্রশান্তিতে। দানের মধ্যে আত্মপ্রাপ্তি ঘটে। প্রাপ্তির মধ্যে প্রকৃত সার্থকতা লাভ হয়। ভালোবাসা হয়ে ওঠে আনন্দঘন। বিরহ হয়ে ওঠে প্রেমময়।
এর দ্বারা লাভ হয় পরম স্বাধীনতা।
উচ্ছ্বসিত আনন্দ।
অদম্য আত্মবিশ্বাস।
অনড় আস্থা।
সীমাকে অতিক্রম ক'রে শ্বাশ্বত, অবিনশ্বর অসীমের সাক্ষাৎ।
সকল শৃঙ্খল থেকে চিরমুক্তি।
ইহকাল-পরকালকে একত্রে বেঁধে ফেলে মৃত্যুহীন অসীম চেতনাতে একাকার হয়ে যাওয়া।
না, এ কোনো কবিসুলভ কথার ফুলঝুরি নয়। এটাই হলো পরম বাস্তবতা। যাবতীয় অবাস্তবকে অতিক্রম ক'রে যুগ-যুগের কারাভোগের পর স্মৃতিবিজড়িত আনন্দে নিরুদ্বেগ ঘরে ফেরা। পবিত্র কোরআনো যেমন বলা হয়েছে:
তাদের পূর্ববর্তীগণও কৌশল করেছিল; কিন্তু সব বিষয়ের মূল পরিকল্পনা আল্লাহরই। তিনি প্রত্যেকটা আত্মার কাজের খবর রাখেন; এবং শীঘ্রই অবিশ্বাসীরা জানবে কারা অবশেষে (সূরা রা'দ, আয়াত: ৪২) ঘরে ফেরে।

মাইন্ড কন্ট্রোলের সর্বোচ্চ স্তর হলো সেল্ফ কন্ট্রোল, যার প্রকৃত সুফল এবং শক্তি নিহিত রয়েছে পবিত্র কোরআন এবং নবী (সঃ)-এর সুন্নাহতে, যাদেরকে মেলাতে হয় বিশেষ উপায়ে সাধনার মাধ্যমে। আমরা ইতোমধ্যে কিছুটা বুঝেও নিয়েছি কী এর ফলশ্রুতি। এর রূপরেখা এবং পদ্ধতিগুলো কী তা আমরা স্পষ্টভাবে জানব। আমরা প্রমাণ সহকারে জানব যে ইসলামিক মাইন্ড কন্ট্রোল মানে কোনো সাময়িক ব্যায়াম নয়, তা হলো পুরোপুরি লাইফ কন্ট্রোল।
মনোনিয়ন্ত্রণ মানেই জীবন-নিয়ন্ত্রণ।
অর্থাৎ জীবনকে পাওয়া।
অর্থাৎ আলোকপ্রাপ্তি।
সকল দুঃখ-কষ্টকে অতিক্রম করা।
এমনকি শারিরীক যন্ত্রণাকেও অতিক্রম করা।
জীবনের স্বরূপ দর্শন।
নিজেকে ফিরে পাওয়া।
মানব-মনের স্বাভাবজাত স্বর্গসুখে পুনস্থিত হওয়া, যা আমরা আত্ম-চেতনা প্রাপ্তির সাথে সাথেই ভ্রান্তিবশত হারিয়ে ফেলেছি।
ইসলামিক আত্মনিয়ন্ত্রণ মানে মনের যাবতীয় ময়লা থেকে মনকে পরিষ্কার করা।
অন্ধকারের অতল থেকে আলোর জগতে উঠে আসা।
সকল সীমাকে অতিক্রম ক'রে অসীমে উত্তরণ।
অন্তরের দারিদ্র্যমোচন।
ন্যূজ দুর্বলতাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে অনাড়ষ্ট সবলতা অর্জন।
চিরকালীন মুক্তি।
দুশ্চিন্তা, হতাশা, যুগের ক্লান্তি থেকে চিরমুক্তি।
মোহমুক্তি।
তীলে তীলে মৃত্যুকেও অতিক্রম ক'রে যাওয়া।
এর মাধ্যমে জীবনের অভিশাপ থেকে জীবন চিরমুক্তি লাভ করে। ভোগ পরিণত হয় যথার্থ সম্ভোগে। সংযম পরিণত হয় পরম প্রশান্তিতে। দানের মধ্যে আত্মপ্রাপ্তি ঘটে। প্রাপ্তির মধ্যে প্রকৃত সার্থকতা লাভ হয়। ভালোবাসা হয়ে ওঠে আনন্দঘন। বিরহ হয়ে ওঠে প্রেমময়।
এর দ্বারা লাভ হয় পরম স্বাধীনতা।
উচ্ছ্বসিত আনন্দ।
অদম্য আত্মবিশ্বাস।
অনড় আস্থা।
সীমাকে অতিক্রম ক'রে শ্বাশ্বত, অবিনশ্বর অসীমের সাক্ষাৎ।
সকল শৃঙ্খল থেকে চিরমুক্তি।
ইহকাল-পরকালকে একত্রে বেঁধে ফেলে মৃত্যুহীন অসীম চেতনাতে একাকার হয়ে যাওয়া।
না, এ কোনো কবিসুলভ কথার ফুলঝুরি নয়। এটাই হলো পরম বাস্তবতা। যাবতীয় অবাস্তবকে অতিক্রম ক'রে যুগ-যুগের কারাভোগের পর স্মৃতিবিজড়িত আনন্দে নিরুদ্বেগ ঘরে ফেরা। পবিত্র কোরআনো যেমন বলা হয়েছে:
তাদের পূর্ববর্তীগণও কৌশল করেছিল; কিন্তু সব বিষয়ের মূল পরিকল্পনা আল্লাহরই। তিনি প্রত্যেকটা আত্মার কাজের খবর রাখেন; এবং শীঘ্রই অবিশ্বাসীরা জানবে কারা অবশেষে (সূরা রা'দ, আয়াত: ৪২) ঘরে ফেরে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00