📘 কুরআনের জানা অজানা 📄 কুরআনের উল্লেখযোগ্য বঙ্গানুবাদ

📄 কুরআনের উল্লেখযোগ্য বঙ্গানুবাদ


১. আল কুরআনের বঙ্গানুবাদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন। এটি দক্ষ ওলামায়ে কেরাম ও বাংলা ভাষায় পণ্ডিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বোর্ড-কর্তৃক অনূদিত। সাম্প্রতিককালে এই অনুবাদ নির্ভরযোগ্য বলেই ওলামায়ে কেরাম মনে করেন।
২. আসান তরজমায়ে কুরআন। এটি মুফতি তাকি উসমানী দা. বা. এর উর্দু অনুবাদ থেকে বঙ্গানুবাদকৃত। বঙ্গানুবাদ করেছেন মাওলানা আব্দুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম। এর সাথে ‘তাওযীহুল কুরআন’ নামে মুফতি তাকি উসমানী দা. বা. এর সংক্ষিপ্ত তাফসীরও সংযুক্ত রয়েছে।
৩. তাফসিরে বুরহানুল কুরআন। এটি হযরত মাওলানা মাহমুদ হাসান দা. বা. এর তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন-কর্তৃক অনূদিত। সাথে রয়েছে প্রয়োজনীয় টীকা ও আয়াতের সাথে সম্পর্কিত আহকাম ও ফিকাহ। এই অনুবাদের বৈশিষ্ট্য হল, তা আয়াতের তারকিবের দিকে লক্ষ্য রেখে করা হয়েছে, যাতে তরজমা বুঝতে ছাত্রদের সুবিধা হয়। তরজমায়ে কুরআনের ছাত্রদের জন্য এই অনুবাদ যথেষ্ট উপকারী।

📘 কুরআনের জানা অজানা 📄 সাত হরফ ও সাত কেরাত

📄 সাত হরফ ও সাত কেরাত


বিভিন্ন হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أُنْزِلَ الْقُرْآنُ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ অর্থাৎ কুরআন সাত হরফে অবতীর্ণ হয়েছে। আবার আমরা জানি, কুরআনের সাত কেরাত রয়েছে। অনেকের ধারণা, হাদিসে বর্ণিত সাত হরফ আর আমাদের পরিচিত সাত কেরাতের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এটি একটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা।

আমরা জানি, আরবরা নানান গোত্রে বিভক্ত ছিলো। এই গোত্রগুলোর সবার ভাষা আরবি হলেও তাদের আরবির মধ্যে আবার কিছুটা পার্থক্য ছিলো। কুরআন শরিফ শুধু কুরাইশের ভাষায় হলে অন্যান্য গোত্রের জন্য সেটা কঠিন হয়ে যেতে পারে- এই বিবেচনায় আরও ছয়টি উপভাষায় আলাদা আলাদা রীতি অবতীর্ণ হয়েছিলো। এ ব্যাপারেই أُنْزِلَ الْقُرْآنُ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ এই কথাটি বলা হয়েছে। আর যে কয়টি উপভাষায় কুরআন নাজিল হয়েছে, সেগুলোকে বলা হয় ‘সাত হরফ’। সে সাতটি ভাষা হলো, হেজায়, হুজাইল, হাওয়াযেন, ইয়ামান, তাই, সাকিফ ও বনী তামিমের ভাষা। এই সাত হরফ এখন আর নেই। হযরত উসমান রাযি. এর যুগে সাহাবীরা দেখলেন, প্রাথমিক যুগে নতুন মুসলমানদের জন্য সে ভাষাগুলো জরুরি হলেও তখনকার মুসলমানরা শুধু হেজাজের ভাষাই কুরআন শিখতে সক্ষম। তাই জটিলতা দূর করার স্বার্থে তারা শুধু হেজাজের ভাষাই বহাল রাখেন।¹

সাত কেরাত নামে আমরা যেটা জানি, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। সাত কেরাত হল মূলত আরবি উচ্চারণরীতির বিভিন্ন নিয়ম যথা- মদ করা-না করা, তাশদিদ দেয়া-না, ইজহার-ইদগাম, পুর-বারিক ইত্যাদি থেকে সৃষ্ট বিভিন্ন পাঠপদ্ধতি। সাহাবায়ে কেরাম স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসব পাঠপদ্ধতি শিখেছেন। এগুলো সবাই মুসহাফে উসমানির অন্তর্ভুক্ত। মুসহাফে উসমানিকে এমনভাবেই লেখা হয়েছে, যাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে প্রমাণিত সবগুলো পাঠপদ্ধতি তাতে ধারণযোগ্য হয়।²

ঐসব পাঠপদ্ধতি প্রসিদ্ধ কারী সাহাবা ও তাবেয়ীদের সূত্রে বর্ণিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত হয়েছে, এগুলোকে একেকটি কেরাআত বলা হয়। যেসব কেরাআত নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে এবং বিশেষ প্রসিদ্ধি পেয়েছে, সেগুলোকে ‘মুতাওয়াতিরা’ বা ‘সহিহ’ কেরাআত বলা হয়। পক্ষান্তরে যেসব কেরাআতের সনদ নির্ভরযোগ্য নয়, সেগুলোকে বলা হয় ‘শাঝ’ কেরাআত।⁹² মুতাওয়াতিরা বা সহিহ কেরাআতের সংখ্যা ১০ টি, যার মধ্যে ৭ টি অধিক প্রসিদ্ধ। এছাড়া বাকি কেরাআতগুলো শাঝ। শাঝ কেরাআতসমূহের মধ্যে আবার ৪ টি কেরাআত বিশেষভাবে পরিচিত। এভাবে উল্লেখযোগ্য কেরাআতসংখ্যা মোট ১৪ টি গণ্য করা হয়। (এই ১৪ কেরাআতের পরিচিতি সামনের দুই শিরোনামে আসছে)।

এই কেরাআতগুলোর কোনো বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য ৩ টি শর্ত,
১। উসমানি মুসহাফগুলোর কোনো একটিতে তা ধারণযোগ্য হতে হবে। যদি কোনো বর্ণনা উসমানি মুসহাফের কোনো কপির সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে তা গ্রহণ করা হবে না।
২। আরবি ব্যাকরণ-কর্তৃক সমর্থিত হতে হবে।
৩। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত হতে হবে।⁹³

উল্লেখ্য, মুসহাফে উসমানি লিপিবদ্ধ হওয়ার পর থেকে সকল মুসহাফ ‘রাসমে উসমানী’তে লেখা হলেও সেগুলোতে নির্দিষ্ট কেরাআত অনুযায়ী নুকতা ও হরকত লাগানোর সুযোগ রয়েছে। সেমতে বর্তমানে প্রচলিত মুসহাফগুলোর বেশিরভাগেরই নুকতা ও হরকত হযরত হাফস বিন সুলাইমান রহ. এর কেরাআত অনুযায়ী লাগানো হয়ে থাকে। এই কেরাআতের সনদ এই: হাফস বিন সুলাইমান রহ. > তার উস্তাদ হযরত আসিম বিন আবুল নাজুদ রহ. > তার উস্তাদ আব্ দির রহমান আস-সুলামী রহ. > তার উস্তাদ হযরত আলী রাযি. > তার উস্তাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।⁹⁴

টিকাঃ
১. শরহ সুনানি আবি দাউদ: আব্দুল মুহসিন আববাদ।
২. যেমন, সূরা ফাতেহার ‘মা-লিকি ইয়াওমিদ্দিন’; এখানে মুসহাফে উসমানিতে "ملك" (মা-লিকি) লেখা হয়েছে মীমের পর আলিফ না দিয়ে, শুধু খাড়া যবর দিয়ে। ফলে এটাকে ‘মালিকি’ (মদ ছাড়া)-ও পড়া যায়, যেমনটি কোনো কোনো কেরাআতে রয়েছে।
৯২. দেখুন: মাবাহিস ফী উলূমিল কুরআন, মান্না আল কাত্তান, পৃ: ১৬৩-১৬৭ ও উলূমুল কুরআন, মুফতি তাকি উসমানী, পৃ: ২০২-২০৩।
৯৩. প্রাগুক্ত।
৯৪. তাবাকাতুল কুররা, আল্লামা যাহাবী, পৃ: ১৪২ ও গায়াতুন নিহায়া ফী তাবাকাতিল কুররা, পৃ: ১১২।

📘 কুরআনের জানা অজানা 📄 প্রসিদ্ধ সাত কারীর নাম

📄 প্রসিদ্ধ সাত কারীর নাম


১. নাম: আব্দুল্লাহ বিন কাসীর দারী মক্কী; মৃত্যুসন: ১২০ হি.; রাবীদের নাম: আবুল হাসান বাযযী ও আবু উমর কুনবুল; অঞ্চল: মক্কা।
২. নাম: নাফে বিন আব্দুর রহমান মাদানী; মৃত্যুসন: ১৬৯ হি.; রাবীদের নাম: আবু মূসা ক্বালূন ও আবু সাঈদ ওয়ার্শ; অঞ্চল: মদিনা।
৩. নাম: আব্দুল্লাহ বিন আমের ইয়াহসিবী; মৃত্যুসন: ১১৮ হি.; রাবীদের নাম: আবুল ওয়ালীদ হিশাম ও আবু আমর ইবনে যাকওয়ান; অঞ্চল: শাম।
৪. নাম: আবু আমর ইয়াব্বান বিন 'আলা বসরী; মৃত্যুসন: ১৫৪ হি.; রাবীদের নাম: আবু আমর দূরী ও আবু ওয়াইবা সূসী; অঞ্চল: বসরা।
৫. নাম: হামযা বিন হাবীব যাইয়াত কূফী; মৃত্যুসন: ১৫৬ হি.; রাবীদের নাম: আবু মুহাম্মাদ খাল্লাফ বাযযার ও আবু ঈসা খাল্লাদ; অঞ্চল: কূফা।
৬. নাম: আসিম বিন আবুন নাজুদ্‌ কূফী; মৃত্যুসন: ১২৭/১২৮ হি.; রাবীদের নাম: আবু বকর শুবাহ বিন আইয়াশ কূফী ও হাফস বিন সুলাইমান কূফী; অঞ্চল: কূফা।
৭. নাম: আবুল হাসান আলী বিন হামযা কিসায়ী; মৃত্যুসন: ১৮৯ হি.; রাবীদের নাম: আবুল হারেস লাইস ও আবু আমর দূরী; অঞ্চল: কূফা।

টিকাঃ
⁸⁰. এই রাবীদের থেকেই তাঁদের কেরাত বর্ণিত হয়েছে। তাঁরা রেওয়াত না করলে পরবর্তীেরা সেগুলো শিখতে পারতো না।
৮৯. ইনি কারী আবু আমর বসরীর রাবী।
৯০. উলূমুল কুরআনে কিছু কিছু মুদ্রণাগত মুপ্রমাদ রয়েছে, সেগুলোর জন্য আল-আ‘লাম ও সিয়ারু আ‘লামিন নুবালার সাহায্য নেওয়া হয়েছে।

📘 কুরআনের জানা অজানা 📄 অন্য কারীদের নাম

📄 অন্য কারীদের নাম


১. ইয়াকুব বিন ইসহাক হাজরামি (মৃত্যু: ২০৫ হি.) - বসরা।
২. খালাফ বিন হিশাম বাযযার⁹¹ (মৃত্যু: ২২৩ হি.) - কূফা।
৩. আবু জাফর ইয়াযীদ বিন কা‘কা‘ (মৃত্যু: ১২৭/১৩০ হি.) - মদিনা।
এই তিনজনের কেরাআতকেও মুতাওয়াতির কেরাআত হিসেবে গণ্য করা হয়।

৪. হাসান বসরী (মৃত্যু: ১১০ হি.) - বসরা।
৫. মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান বিন মুহাইসিন (মৃত্যু: ১২৩ হি.) - মক্কা।
৬. ইয়াহইয়া বিন মুবারক ইয়াযীদী (মৃত্যু: ২০২ হি.) - বসরা।
৭. আবুল ফারাজ শানাৰুযী (মৃত্যু: ৩৮৮ হি.) - বাগদাদ।
এই চারজনের কেরাআতকে শাজ কেরাআত বলা হয়। এভাবে মুতাওয়াতির ও শাজ মিলে মোট ১৪ কেরাআত হয়।

টিকাঃ
৯১. ইনি কারী হামযার রাবী।

ফন্ট সাইজ
15px
17px