📄 উসমানি মুসহাফগুলো এখন কোথায়
এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ তথ্য অজানা। বিভিন্ন দেশে যাদুঘরে রক্ষিত কোনো কোনো মুসহাফ 'মুসহাফে উসমানি' হিসেবে প্রসিদ্ধ হলেও অনেকক্ষেত্রেই তার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। তাছাড়া এ মুসহাফগুলোতে এমন কারুকাজ আর নকশা রয়েছে যা মুসহাফে উসমানিতে ছিলো না। তবে শামে যে কপিটি পাঠানো হয়েছিলো সেটার মোটামুটি খোঁজ-খবর পাওয়া যায়। এই মুসহাফটি দিমাশকের জামে উমাবীতে সংরক্ষিত ছিলো। আল্লামা ইবনে কাসীর লিখেছেন, তিনি সেটা নিজে দেখেছেন। ইবনে কাসীরের মতে মুসহাফটি ৫১৮ হিজরীতে তাবারিয়া থেকে জামে উমাবীতে স্থানান্তরিত হয়। ইবনে বতুতাও এই মুসহাফটি দেখেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। হিজরী ১৪ শতকের ১৩০৩ পর্যন্ত কপিটি সেখানেই বিদ্যমান ছিলো। এরপর এটি হারিয়ে যায়। কারও কারও ধারণা, ১৩১০ হিজরীতে জামে উমাবীতে যে অগ্নিকাণ্ড হয়, তাতে এটি পুড়ে যায়। আবার অনেকে মনে করেন, এটি ওখান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে কিছুদিন লেনিনগ্রাদে রুশ সম্রাটের অধীনে ছিলো; তারপর এটি ইংল্যান্ডে চলে যায়।⁶⁹
হযরত উসমান রাযি. নিজের কাছে যে কপিটি রেখেছিলেন এবং যেটি তেলাওয়াতরত অবস্থায় শহীদ হয়েছিলেন, তার ব্যাপারে প্রসিদ্ধ হলো, সেটি তুরস্কের তোপকাপি যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে এবং রক্তমাখা একটি পৃষ্ঠার ছবিও অনেক জায়গায় দেখা যায়। কতটুকু সত্য- আল্লাহই ভালো জানেন।⁷⁰
টিকাঃ
৬৯. জামেউল কুরআন ফী আহদিল খুলাফাইর রাশিদীন, ড. ফাহদ বিন আব্দুর রহমান রুমী।
৭০. মাবাহীস ফী উলূমিল কুরআন: ড. সুব্হী সালেহ।
📄 কুরআনের লিখন-পদ্ধতির স্বাতন্ত্র্য
আমরা খেয়াল করে থাকব, আমাদের মুসহাফের অনেক শব্দ প্রচলিত বানানে লেখা হয়নি। এই বিশেষ লিখন-পদ্ধতি এমনি-এমনি আসেনি। এটি মুসহাফে উসমানির লিখন-পদ্ধতি, যা এখনও পর্যন্ত অনুসৃত হয়ে আসছে। হযরত উসমান রাযি.-কর্তৃক কুরআন সংকলিত হওয়ার সময় সাহাবায়ে কেরামের ঐকমত্যে এই লিখন-পদ্ধতি বা রসম গৃহীত হয়েছে। এই বিশেষ পদ্ধতিকে ‘রসমে উসমানী’ বলা হয়। বিভিন্ন মতানুযায়ী ‘রসমে উসমানী’র ব্যতিক্রম করে সাধারণভাবে প্রচলিত লিখন-পদ্ধতিতে কুরআনে কারীম লেখা বৈধ নয়।⁵¹
সাধারণ লিখন পদ্ধতির ব্যতিক্রম ‘রসমে উসমানী’র কিছু নিয়ম এই:
• বিশেষ জায়গা⁵² থেকে কোনো বর্ণ বিলুপ্ত করা। যেমন:
- সাধারণ নিয়ম: يا أيها الناس — রসম উসমানী: يٰۤاَيُّهَا النَّاسُ
- সাধারণ নিয়ম: الرحمان — রসম উসমানী: اَلرَّحۡمٰنُ
- সাধারণ নিয়ম: باسم الله — রসম উসমানী: بسم الله
- সাধারণ নিয়ম: أنجيনাكم — রসম উসমানী: اَنجَيْنَٰكُمۡ
- সাধারণ নিয়ম: الشياطين — রসম উসমানী: اَلشَّيٰطِيۡনُ
- সাধারণ নিয়ম: إبراهيم — রসম উসমানী: اِبْرٰهِيْمُ
• কোনো জায়গায় অতিরিক্ত বর্ণ বৃদ্ধি করা। যেমন:
- সাধারণ নিয়ম: مئة — রসম উসমানী: مائة
- সাধারণ নিয়ম: بنو إسرائيل — রসম উসমানী: بَنُوٓاْ إِسۡরَٰٓءِيلَ
- সাধারণ নিয়ম: أطعنا الرسول — রসম উসমানী: أَطَعۡনَا الرَّسُولَا۠
- সাধারণ নিয়ম: تفتؤا — রসম উসমানী: تَفۡতَؤُاْ
• এক বর্ণকে অন্য বর্ণে রূপান্তরিত করা। যেমন:
- সাধারণ নিয়ম: الصلاة — রসম উসমানী: اَلصَّলَوٰةُ
- সাধারণ নিয়ম: الزকاة — রসম উসমানী: اَلزَّكٰوةُ
- সাধারণ নিয়ম: يتوفاكم — রসম উসমানী: يَتَوَفَّىٰكُمۡ
- সাধারণ নিয়ম: لعنة الله⁵³ — রসম উসমানী: لَعۡনَتُ ٱللَّهِ
• একাধিক কিরাতের সুযোগ রাখা। অর্থাৎ কোনো শব্দ যদি একাধিক কিরাত প্রমাণিত থাকে, তাহলে মুসহাফে সে শব্দ এমন বানানে লেখা হয়েছে, যাতে সবগুলো কিরাত তাতে ধারণযোগ্য হয়। যেমন:
- রসম উসমানী: ملك — সাধারণ নিয়ম: মালিক — ফলে শব্দটিকে ملك (মদ ছাড়া)-ও পড়া যায়, যেমনটি অন্য কিরাতে রয়েছে।
- রসম উসমানী: يخدعون — সাধারণ নিয়ম: يخাদعون — ফলে শব্দটিকে يَخْدَعُوْন ও পড়া যায়, যেমন অন্য কিরাতে রয়েছে।
- রসম উসমানী: غَيَابَاتِ الجُب — সাধারণ নিয়ম: غিابة الجব — ফলে শব্দটিকে غَيَابَاتِ الجُب (বহুবচন করে)-ও পড়া যায়, যেমন অন্য কিরাতে রয়েছে।
(সূত্র: মানাহিলুল ইরফান, পৃ: ২৭২-২৭৪)
টিকাঃ
৫১. দেখুন: মাবাহিস ফি উলুমিল কুরআন, মান্না আল কাতান, পৃ: ১০১-১৪২।
৫২. বিশেষ জায়গাগুলো বিস্তারিত দেখুন ‘মানাহিলুল ইরফান, পৃ: ২৭২-২৭৩’।
৫৩. কোথাও কোথাও, সর্বত্র নয়।