📘 কুরআনের জানা অজানা 📄 সাহাবীদের মধ্যে যারা হাফেজ ছিলেন

📄 সাহাবীদের মধ্যে যারা হাফেজ ছিলেন


ক. মুহাজিরদের থেকে:
১. হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.
২. হযরত ওমর ফারূক রাযি.
৩. হযরত উসমান গণী রাযি.
৪. হযরত আলী রাযি.
৫. হযরত তালহা রাযি.
৬. হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস রাযি.
৭. হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাযি.
৮. হযরত হুযাইফা রাযি.
৯. হযরত সালেম রাযি. (মাওলা আবি হুযাইফা)
১০. হযরত আবু হুরায়রা রাযি.
১১. হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাযি.
১২. হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযি.
১৩. হযরত আমর বিন আস রাযি.
১৪. হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস রাযি.
১৫. হযরত মুআবিয়া রাযি.
১৬. হযরত আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর রাযি.
১৭. হযরত আব্দুল্লাহ বিন সাবেত রাযি.
১৮. হযরত আয়শা রাযি.
১৯. হযরত হাফসা রাযি.
২০. হযরত উম্মে সালামা রাযি।

খ. আনসারদের থেকে:
১. হযরত উবাই বিন কাব রাযি.
২. হযরত মুআজ বিন জাবাল রাযি.
৩. হযরত যায়েদ বিন সাবেত রাযি.
৪. হযরত আবূদারদা রাযি.
৫. হযরত মুজামা’ বিন জারিয়া রাযি.
৬. হযরত আনাস বিন মালেক রাযি.
৭. হযরত আবূ যায়েদ রাযি. (হযরত আনাস রাযি. এর আত্মীয়)⁶⁶

টিকাঃ
৫৫. অর্থাৎ সম্পূর্ণ কুরআন যাদের মুখস্থ ছিলো।
৬৬. দেখুন: মানাহিলুল ইরফান ১/১৮১।

📘 কুরআনের জানা অজানা 📄 কুরআন সংকলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

📄 কুরআন সংকলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস


* ১২ হিজরী সনে ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক হাফেজ সাহাবী শহীদ হওয়ার পর হযরত ওমর রাযি. এর পরামর্শে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি. বিভিন্নজনের কাছে সংরক্ষিত বিক্ষিপ্ত পান্ডুলিপিগুলো থেকে কুরআন শরিফ এক জায়গায় সংকলিত করার সিদ্ধান্ত নেন।

* এই সংকলনের দায়িত্ব দেওয়া হয় হযরত যায়েদ বিন সাবেত রাযি. কে। তিনি ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে কারও কাছে বিভিন্ন ধাতুতে লিখিত, কারও মুখস্থ- সব সূত্র থেকে সংগ্রহ করে কুরআনে কারীমের একটি সংকলন প্রস্তুত করেন। এক্ষেত্রে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। সাক্ষী-সবুদেরও বাধ্যবাধকতা রাখা হয়।

* হযরত আবূ বকর রাযি. এর আমলে সংকলিত কুরআনের কপিতে আয়াত ও সুরাগুলোকে ক্রমানুসারে বিন্যস্ত করা হয়েছিলো। তবে তাতে أَحْرُفٌ سَبْعَةٌ বা আরবের যে কয়টি গোত্রের ভাষায় কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিলো, তার সবগুলোই বহাল রাখা হয়েছিলো। এই সংকলিত কপিটির বিশুদ্ধতা ও গ্রহণযোগ্যতার উপর সাহাবায়ে কেরাম একমত হয়েছিলেন।

* হযরত আবূ বকর রাযি. এর সংকলিত কপি ছাড়াও অনেক সাহাবীর কাছে নিজস্ব কিছু কপি ছিলো। সেগুলোর বিন্যাসেও কিছু পার্থক্য ছিলো।

* হযরত আবূ বকর রাযি. এর সংকলিত কপিটি ওফাত পর্যন্ত তাঁর কাছেই ছিলো। তাঁর ওফাতের পর এটি হযরত ওমর রাযি. এর কাছে যায়। তাঁর ইন্তেক্বাল হলে এটি যায় তাঁরই কন্যা হযরত হাফসা রাযি. এর কাছে। পরবর্তীতে হযরত উসমান রাযি. কুরআন সংকলনের ইচ্ছা করলে হযরত হাফসা রাযি. থেকে এই কপিটি চেয়ে নেন এবং প্রয়োজন পূরণ হওয়ার পর আবার ফেরত দেন। মৃত্যু পর্যন্ত এটি তাঁর কাছেই ছিলো। মারওয়ান বিন হাকাম একবার চেয়ে পাঠালেও তিনি দেননি। তাঁর ইন্তেক্বালের পরপরই মারওয়ান হযরত হাফসা রাযি. এর ভাই হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাযি. এর কাছে আবার সেটা চেয়ে পাঠান। এবার কপিটি তাঁর হস্তগত হলো। কিন্তু কপিটি পাওয়ার পর মারওয়ান সেটি টুকরা টুকরা করে ফেলেন। কারণ হিসেবে বলেন, ‘এই কপি মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।’ বিভ্রান্তির আশঙ্কার কারণ হলো, সেটিতে একাধিক রীতি (سبعة أحرف) উল্লেখ ছিলো, যা হযরত উসমান রাযি. এর কপিতে বাদ দেয়া হয়েছিলো।

* দ্বিতীয় দফায় কুরআন সংকলনের কাজ শুরু করেন হযরত উসমান রাযি.। তখন ইসলাম দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলো; আর কোনো কোনো সাহাবীর ভিন্ন ভিন্ন মুসহাফ⁶⁷ থাকায় একেক অঞ্চলে একেক রীতির তেলাওয়াত চলতে লাগলো। তাই অভিন্ন একটি মুসহাফ প্রবর্তন করা জরুরি হয়ে পড়েছিলো। এই প্রয়োজনে থেকেই ২৪ হিজরী সনে হযরত উসমান রাযি. অভিন্ন মুসহাফ প্রচলনের উদ্যোগ নেন।

* হযরত উসমান রাযি. এই কাজের দায়িত্ব দেন চারজন সাহাবীকে। ১. হযরত যায়েদ বিন সাবেত রাযি. ২. হযরত আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর রাযি. ৩. হযরত সাঈদ বিন আস রাযি. ৪. হযরত আব্দুর রহমান বিন হারেস রাযি.। তাঁদের কাজ ছিলো, হযরত আবু বকর রাযি. এর যুগে প্রস্তুতকৃত মুসহাফ থেকে অনুলিপি করে নতুন মুসহাফ তৈরি করা এবং সেখানে যে একাধিক রীতি (سبعة أحرف) উল্লেখ ছিলো সেগুলো পরিহার করে শুধু কুরায়েশের (হেজাযের) রীতিতে উল্লেখ করা। সবগুলো রীতি উল্লেখ করলে সাধারণ মুসলমানদের জন্য জটিলতা তৈরি হতে পারে এই আশঙ্কা থেকে এমন পদক্ষেপ নেয়া হয়।

* এভাবে চূড়ান্ত মুসহাফ তৈরি হওয়ার পর তাকে আরও চার কপি করে মোট পাঁচ কপি করা হয়। এক কপি হযরত উসমান রাযি. নিজের কাছে রাখেন। আরেকটি সাধারণ মদিনাবাসীর জন্য দিয়ে দেন। আর বাকি তিনটি কুফা, বসরা ও শা'বে পাঠিয়ে সবাইকে এই মুসহাফ অনুসরণের নির্দেশ দেন। এবং এই মুসহাফ ছাড়া যার কাছে যত মুসহাফ ছিলো সব পুড়িয়ে দেয়ার আদেশ দেন। ফলে পুরো মুসলিম জাহানে অভিন্ন মুসহাফ প্রবর্তিত হয়।⁶⁸

টিকাঃ
৬৭. কুরআনের কপিকে মুসহাফ বলা হয়।
৬৮. কেউ কেউ বলেন, মোট আট কপি ছিলো। মক্কা, ইয়ামান ও বাহরাইনেও একটি করে কপি পাঠানো হয়েছিলো।

📘 কুরআনের জানা অজানা 📄 উসমানি মুসহাফগুলো এখন কোথায়

📄 উসমানি মুসহাফগুলো এখন কোথায়


এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ তথ্য অজানা। বিভিন্ন দেশে যাদুঘরে রক্ষিত কোনো কোনো মুসহাফ 'মুসহাফে উসমানি' হিসেবে প্রসিদ্ধ হলেও অনেকক্ষেত্রেই তার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। তাছাড়া এ মুসহাফগুলোতে এমন কারুকাজ আর নকশা রয়েছে যা মুসহাফে উসমানিতে ছিলো না। তবে শামে যে কপিটি পাঠানো হয়েছিলো সেটার মোটামুটি খোঁজ-খবর পাওয়া যায়। এই মুসহাফটি দিমাশকের জামে উমাবীতে সংরক্ষিত ছিলো। আল্লামা ইবনে কাসীর লিখেছেন, তিনি সেটা নিজে দেখেছেন। ইবনে কাসীরের মতে মুসহাফটি ৫১৮ হিজরীতে তাবারিয়া থেকে জামে উমাবীতে স্থানান্তরিত হয়। ইবনে বতুতাও এই মুসহাফটি দেখেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। হিজরী ১৪ শতকের ১৩০৩ পর্যন্ত কপিটি সেখানেই বিদ্যমান ছিলো। এরপর এটি হারিয়ে যায়। কারও কারও ধারণা, ১৩১০ হিজরীতে জামে উমাবীতে যে অগ্নিকাণ্ড হয়, তাতে এটি পুড়ে যায়। আবার অনেকে মনে করেন, এটি ওখান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে কিছুদিন লেনিনগ্রাদে রুশ সম্রাটের অধীনে ছিলো; তারপর এটি ইংল্যান্ডে চলে যায়।⁶⁹

হযরত উসমান রাযি. নিজের কাছে যে কপিটি রেখেছিলেন এবং যেটি তেলাওয়াতরত অবস্থায় শহীদ হয়েছিলেন, তার ব্যাপারে প্রসিদ্ধ হলো, সেটি তুরস্কের তোপকাপি যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে এবং রক্তমাখা একটি পৃষ্ঠার ছবিও অনেক জায়গায় দেখা যায়। কতটুকু সত্য- আল্লাহই ভালো জানেন।⁷⁰

টিকাঃ
৬৯. জামেউল কুরআন ফী আহদিল খুলাফাইর রাশিদীন, ড. ফাহদ বিন আব্দুর রহমান রুমী।
৭০. মাবাহীস ফী উলূমিল কুরআন: ড. সুব্‌হী সালেহ।

📘 কুরআনের জানা অজানা 📄 কুরআনের লিখন-পদ্ধতির স্বাতন্ত্র্য

📄 কুরআনের লিখন-পদ্ধতির স্বাতন্ত্র্য


আমরা খেয়াল করে থাকব, আমাদের মুসহাফের অনেক শব্দ প্রচলিত বানানে লেখা হয়নি। এই বিশেষ লিখন-পদ্ধতি এমনি-এমনি আসেনি। এটি মুসহাফে উসমানির লিখন-পদ্ধতি, যা এখনও পর্যন্ত অনুসৃত হয়ে আসছে। হযরত উসমান রাযি.-কর্তৃক কুরআন সংকলিত হওয়ার সময় সাহাবায়ে কেরামের ঐকমত্যে এই লিখন-পদ্ধতি বা রসম গৃহীত হয়েছে। এই বিশেষ পদ্ধতিকে ‘রসমে উসমানী’ বলা হয়। বিভিন্ন মতানুযায়ী ‘রসমে উসমানী’র ব্যতিক্রম করে সাধারণভাবে প্রচলিত লিখন-পদ্ধতিতে কুরআনে কারীম লেখা বৈধ নয়।⁵¹

সাধারণ লিখন পদ্ধতির ব্যতিক্রম ‘রসমে উসমানী’র কিছু নিয়ম এই:
• বিশেষ জায়গা⁵² থেকে কোনো বর্ণ বিলুপ্ত করা। যেমন:
- সাধারণ নিয়ম: يا أيها الناس — রসম উসমানী: يٰۤاَيُّهَا النَّاسُ
- সাধারণ নিয়ম: الرحمان — রসম উসমানী: اَلرَّحۡمٰنُ
- সাধারণ নিয়ম: باسم الله — রসম উসমানী: بسم الله
- সাধারণ নিয়ম: أنجيনাكم — রসম উসমানী: اَنجَيْنَٰكُمۡ
- সাধারণ নিয়ম: الشياطين — রসম উসমানী: اَلشَّيٰطِيۡনُ
- সাধারণ নিয়ম: إبراهيم — রসম উসমানী: اِبْرٰهِيْمُ

• কোনো জায়গায় অতিরিক্ত বর্ণ বৃদ্ধি করা। যেমন:
- সাধারণ নিয়ম: مئة — রসম উসমানী: مائة
- সাধারণ নিয়ম: بنو إسرائيل — রসম উসমানী: بَنُوٓاْ إِسۡরَٰٓءِيلَ
- সাধারণ নিয়ম: أطعنا الرسول — রসম উসমানী: أَطَعۡনَا الرَّسُولَا۠
- সাধারণ নিয়ম: تفتؤا — রসম উসমানী: تَفۡতَؤُاْ

• এক বর্ণকে অন্য বর্ণে রূপান্তরিত করা। যেমন:
- সাধারণ নিয়ম: الصلاة — রসম উসমানী: اَلصَّলَوٰةُ
- সাধারণ নিয়ম: الزকاة — রসম উসমানী: اَلزَّكٰوةُ
- সাধারণ নিয়ম: يتوفاكم — রসম উসমানী: يَتَوَفَّىٰكُمۡ
- সাধারণ নিয়ম: لعنة الله⁵³ — রসম উসমানী: لَعۡনَتُ ٱللَّهِ

• একাধিক কিরাতের সুযোগ রাখা। অর্থাৎ কোনো শব্দ যদি একাধিক কিরাত প্রমাণিত থাকে, তাহলে মুসহাফে সে শব্দ এমন বানানে লেখা হয়েছে, যাতে সবগুলো কিরাত তাতে ধারণযোগ্য হয়। যেমন:
- রসম উসমানী: ملك — সাধারণ নিয়ম: মালিক — ফলে শব্দটিকে ملك (মদ ছাড়া)-ও পড়া যায়, যেমনটি অন্য কিরাতে রয়েছে।
- রসম উসমানী: يخدعون — সাধারণ নিয়ম: يخাদعون — ফলে শব্দটিকে يَخْدَعُوْন ও পড়া যায়, যেমন অন্য কিরাতে রয়েছে।
- রসম উসমানী: غَيَابَاتِ الجُب — সাধারণ নিয়ম: غিابة الجব — ফলে শব্দটিকে غَيَابَاتِ الجُب (বহুবচন করে)-ও পড়া যায়, যেমন অন্য কিরাতে রয়েছে।

(সূত্র: মানাহিলুল ইরফান, পৃ: ২৭২-২৭৪)

টিকাঃ
৫১. দেখুন: মাবাহিস ফি উলুমিল কুরআন, মান্না আল কাতান, পৃ: ১০১-১৪২।
৫২. বিশেষ জায়গাগুলো বিস্তারিত দেখুন ‘মানাহিলুল ইরফান, পৃ: ২৭২-২৭৩’।
৫৩. কোথাও কোথাও, সর্বত্র নয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px