📄 মুহকাম ও মুতাশাবিহ
সূরা আলে ইমরানের ৭ নং আয়াতে এরশাদ হয়েছে, هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ অর্থাৎ ‘তিনিই আল্লাহ, যিনি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন, যার কিছু আয়াত মুহকাম, যার উপর কিতাবের মূল ভিত্তি এবং অপর কিছু আয়াত মুতাশাবিহ।...'
এ আয়াত থেকে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, পবিত্র কুরআনে দুই ধরনের আয়াত রয়েছে। এক প্রকারের নাম মুহকাম ও অপরটির নাম মুতাশাবিহ। মুফতি তাকি উসমানী দা. বা. তাফসিরে তাওযীহুল কুরআনে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, ‘জগতে এমন বহু বিষয় আছে যা মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির ঊর্ধ্বে। এমনিভাবে আল্লাহ তা‘আলার অস্তিত্ব ও তার একত্ব তো এমন এক সত্য, যা প্রতিটি মানুষ নিজ জ্ঞান-বুদ্ধি দ্বারা উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু তার সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কিত বিস্তারিত জ্ঞান মানুষের সীমিত বুদ্ধি দ্বারা আহরণ করা সম্ভব নয়। কেননা তা এর বহু ঊর্ধ্বের বিষয়। কুরআন মাজিদে যেখানে আল্লাহ তা‘আলার সে সকল গুণের উল্লেখ করেছে, সেখানে তা দ্বারা তার অপার শক্তি ও মহাপ্রজ্ঞাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কোনও লোক যদি সে সকল গুণের হাকিকত ও সত্তাসারের দার্শনিক অনুসন্ধানে লিপ্ত হয়, তবে তার হয়রানি ও গোমরাহি ছাড়া আর কিছুই অর্জিত হবে না। কেননা সে তার সীমিত জ্ঞান-বুদ্ধি দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার অসীম গুণাবলীর রহস্য আয়ত্ত করতে চাচ্ছে, যা তার উপলব্ধির বহু ঊর্ধ্বে।
উদাহরণত, কোরআন মাজিদ কয়েক জায়গায় ইরশাদ করেছে- আল্লাহ তা‘আলার একটি আরশ আছে এবং তিনি সেই আরশে ‘মুসতাওয়া’ (সমাसीन) হয়েছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আরশ কেমন? আর তাতে তার সমাসীন হওয়ার ধারা কী বোঝানো হয়েছে? এসব এমন প্রশ্ন যার উত্তর মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির বাইরের জিনিস। তাছাড়া মানবজীবনের কোনও কর্মীয় মাসআলা এর উপর নির্ভরশীলও নয়। এ জাতীয় বিষয় যেসব আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, তাকে ‘মুতাশাবিহ’ আয়াত বলে। এমনিভাবে বিভিন্ন সূরার শুরুতে যে পৃথক পৃথক হরফ নাযিল করা হয়েছে (যেমন এ সুরারই শুরুতে আছে ‘আলিফ-লাম-মীম’) যাকে ‘আল-হরুফুল মুকাত্বায়াত’ বলা হয়, তাও ‘মুতাশাবিহাত’-এর অন্তর্ভুক্ত। মুতাশাবিহাত সম্পর্কে কুরআন মাজিদ এই আয়াতে নির্দেশনা দিয়েছে যে, এর তত্ত্ব-তালাশের পেছনে না পড়ে বরং মোটামুটি ভাবে এর প্রতি ঈমান আনতে হবে আর এর প্রকৃত মর্ম কী, তা আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতে হবে।
এর বিপরীতে কুরআন মাজিদের অন্যান্য যে আয়াতসমূহ আছে, তার মর্ম সুস্পষ্ট। প্রকৃতপক্ষে সে সকল আয়াতই মানুষের সামনে কর্মগত পথ-নির্দেশ করে। এ রকম আয়াতকে ‘মুহকাম’ আয়াত বলে।⁷⁹ একজন মুমিনের কর্তব্য বিশেষভাবে এ জাতীয় আয়াতে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা।⁸⁰
কয়েকটি মুতাশাবিহ এই, ‘الرحمن على العرش استوى’ (আল্লাহ আরশে সমাসীন হয়েছেন)⁸¹, ‘يد الله فوق أيديهم’ (আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর)⁸⁰, ‘وَجَاءَ رَبُّكَ’ (আর আপনার রব এসেছেন)⁸³।
মুতাশাবিহের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পছন্দনীয় পদ্ধতি হল, মুতাশাবিহকে তার মতোই রেখে দেওয়া, নিজ থেকে কোনো ব্যাখ্যা করতে না যাওয়া। যেমন, যেসব আয়াতে আল্লাহ তায়ালার ‘য়াদ’ (হাত)-এর কথা বলা হয়েছে, সেখানে আমরা বলব- আয়াতে যেহেতু তাঁর হাতের কথা আছে, আমরা তা বিশ্বাস করি। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার হাত কেমন, তা আমরা জানি না। এক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার হাতকে মানুষের হাতের সাথে তুলনা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি হাতকে আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতা বা শক্তির অর্থে নেওয়ারও প্রয়োজন নেই।⁸²
টিকাঃ
৭৯ উল্লেখ্য, কখনও কখনও ‘মুহকাম’ দ্বারা মানুষ হুজুরি- এমন আয়াতকেও বোঝানো হয়।
৯৮ তাফসিরের তাফহিমুল কুরআন, সুরা আলে ইমরান, আয়াত ৭ (অনুবাদক: মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম)।
৮০ সুরা তোয়াহা, ৫।
৮১ সুরা ফাতহ, ১০।
৮৩ সুরা ফাজর, ২২।
৮২ বিস্তারিত জানতে দেখুন: তাফসির ইবনুল কুরআন সুরা আলে ইমরানের ৭ নং আয়াতের তাফসিরের সাথে সংযুক্ত হযরত থানভী রহ. এর রিসালা: ‘রিসালাতুলুত তাওয়াহ্হুজ বিমা তাওয়াফ্ফাকা বিও-তাশাহ্হুজ’।
📄 নাসেখ-মানসুখ
'নসখ'-এর আভিধানিক অর্থ অপসারণ করা। পরিভাষায় নসখ হচ্ছে, কোনো শরয়ী হুকুমকে অপর শরয়ী হুকুম দ্বারা বিলুপ্ত করা। অনেক সময় আল্লাহ তায়ালা এক সময়ের অবস্থা বিবেচনায় কোনো শরয়ী হুকুম দেন, পরে আরেক সময় নিজ প্রজ্ঞা অনুযায়ী ওই হুকুমটিকে রহিত করে নতুন হুকুম দেন। এই কাজটিকে নসখ বলে। যে পুরনো হুকুমটিকে রহিত করা হয়, তাকে মানসুখ বলে আর নতুন হুকুমটিকে নাসেখ বলে।⁸⁰
মুতাকাদ্দিমীন বা প্রথমদিকের মুফাসসিরগণ নসখকে অত্যন্ত ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করতেন। তারা কোনো ব্যাপক হুকুমকে সীমিত করা (تخصيص العام) বা উন্মুক্ত হুকুমকে শর্তযুক্ত করা (تقييد المطلق)-কেও নসখ বলতেন। নসখের অর্থের এই ব্যাপকতার কারণে তাদের মতে মানসুখ আয়াতের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। কিন্তু মুতাআখখিরীন বা পরবর্তী মুফাসসিরদের মতে নসখ বলা হয় কোনো হুকুমকে সম্পূর্ণরূপে রহিত করাকে। তাদের সংজ্ঞা অনুযায়ী মানসুখ আয়াতের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকটি।
আল্লামা সুয়ূতী রহ. আল-ইতকানে মানসুখ আয়াতের সংখ্যা মাত্র উনিশটি⁸⁴ গণ্য করেছেন। এরপর শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী রহ. আল-ফাওযুল কাবিরে আলোচনা করে দেখিয়েছেন, সে উনিশটির মধ্যে মাত্র পাঁচটি আয়াত ছাড়া বাকিগুলোতে নসখ ছাড়া অন্য ব্যাখ্যাও সম্ভব। অর্থাৎ, শাহ ওয়ালীউল্লাহ মানসুখ আয়াতের সংখ্যা মাত্র পাঁচে নামিয়ে আনলেন।
এ বিষয়ে আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য হল, দারুল উলূম দেওবন্দের মজলিসে ওরার সাবেক রোকন মাওলানা আব্দুস সামাদ রাহমানী একটি কিতাব লিখেছেন, যার নাম দিয়েছেন 'কুরআনে মুহকাম'। কিতাবটিতে তিনি দাবি করেছেন, কুরআনে কারীমের সব আয়াতই মুহকাম তথা মানসুখ নয়। তিনি শাহ ওয়ালীউল্লাহ রহ. এর স্থিরীকৃত পাঁচ আয়াতেও নসখ ছাড়া ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রয়োগ করেছেন। 'কুরআনে মুহকাম' কিতাবটি ১৯৮৬ সালে দেওবন্দের মজলিসে মাআরিফুল কুরআন থেকে ছাপা হয়েছে। তার শুরুতে হযরত মাওলানা ক্বারী তাইয়িব রহ. এর অভিমতও রয়েছে। উদ্দেশ্য, মানসুখ আয়াতের সংখ্যা কমানোর এইসব প্রচেষ্টার অর্থ এই নয় যে, নসখ কোনো দূষণীয় বিষয়। বরং এগুলো কুরআনে কারীমকে নিয়ে ওলামায়ে কেরামের অব্যাহত গবেষণার অংশ। তারা শুধু দেখাতে চেয়েছেন, মানসুখ আয়াতগুলোতে এমন ব্যাখ্যাও সম্ভব, যার ফলে নসখের প্রয়োজন পড়ে না।
টিকাঃ
৮০ উলূমুল কুরআন, মুফতি তাকি উসমানী, পৃ: ১৫১।
৮৪ তবে সুয়ূতী রহ. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. এর মত অনুযায়ী আরেকটি নসখের কথা উল্লেখ করেছেন, সেটা সহ হিসেব করলে সংখ্যা হয় বিশ।
📄 কুরআনে কারীমের সুরার প্রকারভেদ
আয়াত-সংখ্যার দিক থেকে পবিত্র কুরআনের সুরাগুলো চার প্রকারে বিভক্ত:
১. আস-সাবউত তিওয়াল অর্থাৎ দীর্ঘতম সাতটি সুরা। এই সাত সুরা দৈর্ঘ্যের দিক থেকে সবচেয়ে বড়। সুরাগুলো এই, ১। বাকারা ২। আলে ইমরান ৩। নিসা ৪। মায়েদা ৫। আনআম ৬। আরাফ ৭। আনফাল ও তাওবা⁸¹।
২. মিউন বা শতকসমূহ। এই সুরাগুলো দৈর্ঘ্যের দিক থেকে দ্বিতীয় স্তরের। এগুলোর আয়াত-সংখ্যা ১০০ এর বেশি বা তার কাছাকাছি।
৩. মাসানী বা অধিক পঠিত সুরাসমূহ। আয়াতসংখ্যার দিক থেকে এগুলো ‘মিউন’-এর পরবর্তী স্তরে। এই সুরাগুলোর নাম মাসানী (অধিক পঠিত) হওয়ার কারণ, আস-সাবউত তিওয়াল ও মিউনের তুলনায় এগুলো বেশি পড়া হয়ে থাকে।
৪. মুফাসসাল বা অধিক বিভক্ত সুরাসমূহের অংশ। এ অংশ সুরা হুজুরাত থেকে কুরআনের শেষ পর্যন্ত। মুফাসসালের সুরাগুলো তিন ভাগে বিভক্ত:
* তিওয়ালে মুফাসসাল বা মুফাসসালের বড় সুরাসমূহ। এই প্রকার সুরা হুজুরাত থেকে সুরা বুরুজ পর্যন্ত।
* আওসাতে মুফাসসাল বা মুফাসসালের মাঝারি সুরাসমূহ। এই প্রকার সুরা তারেক থেকে সুরা লাম ইয়াকুন পর্যন্ত।
* কিসারে মুফাসসাল বা মুফাসসালের ছোট সুরাসমূহ। এই প্রকার সুরা যিলযাল থেকে সুরা নাস পর্যন্ত।⁸²
এই অংশের নাম মুফাসসাল (অধিক বিভক্ত) রাখার কারণ, এই অংশ ছোট ছোট বহুসংখ্যক সুরায় বিভক্ত।⁴⁷
টিকাঃ
৮১ আনফাল ও তাওবার মাঝখানে যেহেতু বিসমিল্লাহ আনা হয়নি, তাই এই দুটি সুরাকে এক সুরাও ধরা হয়ে থাকে।
৮২ মুফাসসালের প্রকারভেদের শুরু ও শেষ সীমা নিয়ে কিছু মতভেদ আছে।
৪৭ দেখুন: মাওয়ারিস ফি উলুমিল কুরআন, মান্না আল কাতান, পৃ: ১০৬-১০৯।
📄 নবীদের নামে যে সুরাগুলোর নাম
১. সূরা ইউনুস
২. সূরা হুদ
৩. সূরা ইউসুফ
৪. সূরা ইবরাহিম
৫. সূরা মুহাম্মদ
৬. সূরা নূহ