📄 ওহী নাজিলের বিভিন্ন পদ্ধতি
১. মানুষের আকার গ্রহণ না করে স্বরূপে ফেরেশতা উপস্থিত হন। তারপর ধ্বনি ব্যবহার করে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্বলবের উপর ওহী করা হয়।
২. ফেরেশতা মানুষের আকার ধরে উপস্থিত হন।
৩. ফেরেশতা অন্তরে কোনো কথা ঢেলে দেন।
৪. ফেরেশতা স্বপ্নে উপস্থিত হয়ে কথা বলেন।
৫. আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং কথা বলেন; জাগ্রত অবস্থায় বা স্বপ্নে।¹¹
হযরত আয়শা রাযি. থেকে বর্ণিত, হযরত হারেস বিন হিশাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'ইয়া রাসুলুল্লাহ, আপনার কাছে কীভাবে ওহী আসে?' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'কখনও তা আমার কাছে আসে ঘণ্টাধ্বনির মতো- আর এটাই সবচেয়ে কঠিন- অতঃপর ধ্বনি কেটে যায়, তার আগেই আমি সে ওহী আয়ত্ত করে ফেলি। আবার কখনও ফেরেশতা আমার কাছে আসে মানুষের রূপ ধরে। সে আমার সাথে কথা বলে আর আমি তার কথা আয়ত্ত করি।'¹²
এখানে ওহীর দুটি পদ্ধতির বিবরণ পাওয়া গেছে। মূলত এই দুই পদ্ধতির ওহীই পবিত্র কুরআনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এক হাদিসে 'নাফাস ফির রাও' বা ফেরেশতা-কর্তৃক অন্তরে কথা ঢেলে দেয়ার যে বর্ণনা রয়েছে, তা মূলত ভিন্ন কোনো পদ্ধতি নয়, ঘণ্টাধ্বনি-পদ্ধতিরই অংশ।¹³
এমনিভাবে স্বপ্নেও কুরআনের কোনো আয়াত নাজিল হয়নি। অবশ্য হযরত আনাস রাযি. এর একটি বর্ণনায় এমন ধারণা হতে পারে। বর্ণনাটি হল, একবার হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের সাথে বসেছিলেন। হঠাৎ তিনি নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়লেন; তারপর মুচকি হাসতে হাসতে মাথা তুললেন। সাহাবায়ে কেরাম হাসির কারণ জানতে চাইলে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এইমাত্র আমার উপর একটি সূরা নাজিল হয়েছে...। এরপর তিনি সূরা কাউসার পড়ে শোনান।⁹⁴ এই বর্ণনার ব্যাখ্যা হল, এখানে যে নিদ্রার কথা বলা হয়েছে, তা মূলত নিদ্রা নয়, বরং ওহী নাজিলের সময় কখনও কখনও হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে অচেতন অবস্থা হতো, তা-ই বোঝানো হয়েছে। এছাড়া সূরা কাউসার মক্কী সূরা, অথচ হযরত আনাস রাযি. আনসারী সাহাবী। তাই এমনও হতে পারে- এটি সূরা কাউসারের মূল নাজিল হওয়ার ঘটনা নয়, বরং পূর্বে নাজিলকৃত সূরার পুনরাবৃত্তি। অনেক ওহী-ই একাধিকবার নাজিল হয়েছে।⁹⁵
পবিত্র কুরআনের সূরা শূরার ৫১ নং আয়াতে ওহীর বিভিন্ন পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَن يُكَلِّمَهُ اللَّهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِن وَرَاءِ حিجابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ مَا يَشَاءُ إِنَّهُ عَلِيٌّ حَكِيمٌ
‘কোনো মানুষের এ ক্ষমতা নেই যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন (সামনা সামনি), তবে ওহীর মাধ্যমে (বলতে পারেন) অথবা কোনো পর্দার আড়াল থেকে কিংবা তিনি কোনো বার্তাবাহী (ফেরেস্তা) পাঠিয়ে দেবেন, যে তাঁর নির্দেশে তিনি যা চান সেই ওহীর বার্তা পৌঁছে দেবে। নিশ্চয়ই তিনি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, হেকমতওর ও মালিক।’⁹⁶
পবিত্র কুরআনে ওহীর যে পদ্ধতিগুলো ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলো এই আয়াতে বর্ণিত তৃতীয় পদ্ধতি বা ফেরেশতা প্রেরণ- এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে। কারণ, ঘটনাবলি বা ফেরেশতার মানুষরূপে আসা- উভয় প্রকারের ওহী-ই ফেরেশতার মাধ্যমে হতো।⁹⁷
টিকাঃ
১১. আন্-ইতকান, পৃষ্ঠা: ১২৭-১২৮।
১২. সহীহ বুখারী, হাদিস: ২।
১৩. عَنْ أَبِي أُمَامَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: إِنَّ رُوحَ الْقُدُسِ نَفَثَ فِي رُوعِي أَنَّ نَفْسًا لَنْ تَمُوتَ حَتَّى تَسْتَكْمِلَ أَجَلَهَا وَتَسْتَوْعِبَ رِزْقَهَا، فَأَجْمِلُوا فِي الطَّلَبِ، وَلَا يَحْمِلَنَّ أَحَدَكُمْ اسْتِبْطَاءُ الرِّزْقِ أَنْ يَطْلُبَهُ بِمَعْصِيَةِ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُنَالُ مَا عِنْدَهُ إِلَّا بِطَاعَتِهِ. أَخْرَجَهُ أَبُو نُعَيْمٍ فِي الْحِلْيَةِ فِي تَرْجَمَةِ أَحْمَدَ بْنِ أَبِي الْحَوَارِيِّ।
১৪. তালিফিয়্যাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলফাজয়াল কুরআনিল কারিম, আব্দুস সালাম মাভিজী, পৃষ্ঠা: ৬৩।
৯৪. সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪০০।
৯৫. তা’আকিবিয়ি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলফাযাল কুরআনিল কারিম, আদুস সালাম মাজিদী, পৃষ্ঠা: ১০৬।
৯৬. সূরা শূরা ৫১ (অনুবাদ: মাওলানা আবুল বাশার সাইফুল ইসলাম)।
৯৭. মাবাহিস ফী উলূমিল কুরআন, মান্না আল কাতান, পৃষ্ঠা: ৩৭।
📄 ওহীর ভাষা
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ (سورة إبراهيم)
'আমি যখনই কোনো রাসূল পাঠিয়েছি, তাকে তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, যাতে সে তাদের সামনে সত্যকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারে।' (সূরা ইবরাহীম: ৪)
وَكَذَلِكَ أَنزَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا (سورة طه)
'এভাবেই আমি এ ওহীকে এক আরবী কুরআনরূপে নাযিল করেছি।' (সূরা ত্বাহা: ১১৩)
فَإِنَّমَا يَسَّرْنَاهُ بِلِسَانِكَ لِتُبَشِّرَ بِهِ الْمُتَّقِينَ وَتُنذِرَ بِهِ قَوْمًا لُّدًّا (سورة مريم)
'সুতরাং (হে নবী!) আমি এ কুরআনকে তোমার ভাষায় সহজ করে দিয়েছি, যাতে তুমি এর মাধ্যমে মুত্তাক্বীদেরকে সুসংবাদ দাও এবং এর মাধ্যমেই সেইসব লোককে সতর্ক কর, যারা জেদের বশবর্তীও বিতণ্ডায় লেগে থাকে।' (সূরা মারইয়াম: ৯৭)
📄 কুরআন কি আসলেই ‘কুরআন’
'Knowledge Quiz Of Islam' এর তথ্যমতে দুনিয়াজুড়ে প্রতিদিন চারশত কোটিেরও বেশি বার পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করা হয়। পুরো চব্বিশ ঘণ্টার এমন কোনো মুহূর্ত পার হয় না যখন কুরআন কারীম তেলাওয়াত করা হয় না। কুরআনের নাম ‘কুরআন’ রাখার যৌক্তিকতা এখানেই বুঝে আসে।¹¹
টিকাঃ
১১. কুরআনী মালুমাত, আব্দুল মান্নান কাসেমী, পৃষ্ঠা: ১৬।
📄 এক নজরে কুরআনে কারীম
সংক্ষেপে বলতে গেলে, কুরআনে কারীম আল্লাহ তায়ালার সর্বশেষ বাণী, যা শেষ নবীর উপর ধীরে ধীরে সুদীর্ঘ তেইশ বছরকাল সময় নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। এই কিতাব হেফাজতের দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালা নিজের হাতে রেখেছেন। কুরআনের প্রতিটি কথা অকাট্য সত্য, অত্যন্ত মূল্যবান তার প্রতিটি শিক্ষা। এই কিতাব সম্পূর্ণরূপে বাতিলের প্রভাবমুক্ত, যাবতীয় সন্দেহ-সংশয় হতে পবিত্র। পবিত্র কুরআনকে তারতীলের সাথে তেলাওয়াত করলে জগতের সকল সুর-ছন্দ লজ্জায় মুখ লুকায়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস এই কুরআনেরই ভাষ্যকার। কুরআন এবং হাদিস দুটোই সাহাবায়ে কেরামের মতো পুণ্যাত্মা ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে। মানবজাতির যাবতীয় কল্যাণ, সফলতা ও সৌভাগ্য হেফাযতের এই দুই ধারনাবরার উপরই নির্ভরশীল।