📘 কুরআনের জানা অজানা 📄 পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোর বর্তমান রূপ

📄 পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোর বর্তমান রূপ


সুহফে ইবরাহীম বা হযরত ইবরাহীম আ. এর উপর অবতীর্ণ আসমানি কিতাবের বর্তমানে কোনো হদিস পাওয়া যায় না। তবে ২০০৬ সালে সৌদি আরবের কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ফালেহ শাবিদ আল-আজমী-র একটি কিতাব প্রকাশিত হয়েছে, যার নাম ‘সুহফ ইবরাহীম: জুরূহুল বারাহিমিয়্যাতি মিন খিলালি নুসুসি ফিন্দা’। বইটিতে ড. আজমী দেখাতে চেয়েছেন, হিন্দুদের বেদের সাথে ইবরাহীম আ. এর সহিফাসমূহের যোগসূত্র রয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, হিন্দুদের দেবতা ‘ব্রহ্মা (যার আরবি রূপ ‘ব্রমহা’)’ আর সরস্বতীর নাম মূলত ইবরাহীম আ. ও তার স্ত্রী সারার নাম থেকে এসেছে। আল্লাহই ভালো জানেন।

তবে বর্তমানে তাওরাত, যাবুর ও ইঞ্জিলের নামে প্রচলিত আসমানি কিতাব রয়েছে। এখনকার বাইবেল শরিফ বনি ইসরাঈলীদের সকল ধর্মীয় কিতাবের সমন্বিত রূপ। তাওরাত, যাবুর ও ইঞ্জিল- এই তিনটি কিতাব তাই বাইবেলে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাইবেলকে আরবিতে ‘আল-কিতাবুল মুকাদ্দাস’ বলা হয়। বাইবেল প্রধান দুইভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগকে ইংরেজিতে ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’ (Old Testament), বাংলায় ‘পুরাতন নিয়ম’ ও আরবিতে ‘العهد القديم’ বলা হয়। আর দ্বিতীয় ভাগকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘নিউ টেস্টামেন্ট’ (New Testament), বাংলায় ‘নতুন নিয়ম’ ও আরবিতে ‘العهد الجديد’ ।

বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি পবিত্র বাইবেল এবং কিতাবুল মোকাদ্দস নামে পূর্ণ বাইবেলের ও ইঞ্জিল শরিফ নামে শুধু নতুন নিয়মের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেছে। বাইবেলের পুরাতন নিয়মে মোট ৩৯ টি পুস্তক রয়েছে, যার মধ্যে প্রথম পাঁচটি পুস্তককে তওরাত বলে দাবি করা হয়। সে পাঁচ পুস্তকের নাম এই: ১. আদি পুস্তক, ইংরেজি: Genesis, আরবি: سفر التكوين ২. যাত্রা পুস্তক, ইংরেজি: Exodus, আরবি: سفر الخروج ৩. লেবীয় পুস্তক, ইংরেজি: Leviticus, আরবি: سفرالأخبار ৪. গণনা পুস্তক, ইংরেজি: Numbers, আরবি: سفر العدد ৫. দ্বিতীয় বিবরণ, ইংরেজি: Deuteronomy, আরবি: سفر الاستثناء। বাংলা কিতাবুল মোকাদ্দসে বলা হয়েছে, এই পাঁচ পুস্তক হযরত মূসা আ.-কর্তৃক রচিত।⁶ সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, এটি সরাসরি আল্লাহ তায়ালার নাজিলকৃত তওরাত নয়। হ্যাঁ, মূল তাওরাতের বিভিন্ন বিষয় তাতে থাকা অসম্ভব নয়। ওদিকে এ পুস্তকগুলোর লেখক হযরত মূসা আ. হওয়াটাও প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, পঞ্চম পুস্তক ‘দ্বিতীয় বিবরণ’-এ হযরত মূসা আ. এর ইন্তেকাল ও কবরের কথাও রয়েছে, যা হযরত মূসা আ. এর নিজের লেখা সম্ভব নয়।

পুরাতন নিয়মের ১৯ নম্বর পুস্তককে যবুর বলা হয়ে থাকে। তার নাম বাংলায় ‘গীত সংহিতা বা জাবুর শরিফ’, ইংরেজিতে ‘Psalms’ ও আরবিতে ‘سفر الزبور/سفر المزامير’ । ‘জাবুর শরিফে’ ১৫০ টি কাওয়ালী রয়েছে, যার মধ্যে ৭০ টির মতো কাওয়ালীর লেখক হযরত দাউদ আ. বলে দাবি করা হয়। এছাড়া হযরত আসাফ, হযরত সোলায়মান ও অন্যান্য দুয়েকজনের অল্পকিছু কাওয়ালী রয়েছে। তবে ৪৪ টি কাওয়ালীর লেখকের নাম অজানা।⁷

তাওরাত ও যবুর ছাড়া পুরাতন নিয়মে আরও যেসব পুস্তক রয়েছে, সেগুলোর কয়েকটিকে বিভিন্ন নবীর লেখা বলে দাবি করা হয়, এছাড়া বাকিগুলোর লেখক অজ্ঞাত। পুরাতন নিয়ম ইহুদি ও খৃষ্টান সবার কাছেই স্বীকৃত। ইহুদিরা পুরাতন নিয়মকে ‘তানাক’ বলে থাকে। তানাক তাদের অন্যতম পবিত্রগ্রন্থ।⁸

বাইবেলের নতুন নিয়মে ২৭ টি গ্রন্থ পুস্তক রয়েছে, যার প্রথম চারটি ঈসা আ. এর চার শিষ্যের লেখা পৃথক চারটি ইঞ্জিল বলে পরিচিত। এগুলো সেই শিষ্যদের নামে অভিহিত হয়। যথা: ১। মথি ২। মার্ক ৩। লুক ৪। যোহন/ইউহান। এই চার গ্রন্থকে বাংলায় সুসমাচার, ইংরেজিতে Gospel ও আরবিতে 'ইঞ্জিল' বলা হয়। উল্লেখ্য, এই ইঞ্জিলগুলো মূলত ঈসা আ. এর জীবনী ও বাণীসংকলন, যা অনেকটা মুসলমানদের হাদিসশাস্ত্রের মতো। তাই এগুলো যে আল্লাহ তায়ালার নাযিলকৃত আসমানি কিতাব নয়, তা স্পষ্ট। প্রকৃত ইঞ্জিলের এখন আর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি এই চারটি ইঞ্জিলের লেখক কে- তা নিয়েও যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে।

উক্ত চার ইঞ্জিল ছাড়াও আরও কিছু ইঞ্জিল রয়েছে, যেগুলোকে খ্রিষ্টানসমাজ স্বীকৃতি দেয় না। তার মধ্যে বার্ণাবাসের ইঞ্জিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ইঞ্জিলের অনেক বিষয়ের সঙ্গে কুরআনে কারীমের বক্তব্যের মিল রয়েছে। যেমন, এই বাইবেলে ঈসা আ. এর ক্রুশবিদ্ধ হওয়াকে অস্বীকার করা হয়েছে। তাছাড়া তাতে স্পষ্টভাবে নাম নিয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। এসব কারণে খ্রিষ্টানরা এই বাইবেলকে স্বীকার তো দূরের কথা, তার প্রচারও হতে দেয় না। অথচ এই ইঞ্জিলের নির্ভরযোগ্যতা অন্যান্য ইঞ্জিলের চেয়ে কম নয়। এটির গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে খ্রিষ্টানরা যেসব প্রশ্ন উত্থাপন করে, সেগুলো অন্যান্য ইঞ্জিলের ক্ষেত্রেও করা যায়। সুতরাং অন্যান্য ইঞ্জিলকে মেনে নেয়ার পর এই ইঞ্জিলকে অস্বীকার করা যুক্তিযুক্ত নয়।

বাইবেলের বিকৃতি: পুরাতন নিয়ম বা নতুন নিয়ম- পুরো বাইবেলেই যে অসংখ্য বিকৃতি, হেরফের বা ভুল-ভ্রান্তি রয়েছে, তা এখন প্রমাণিত সত্য। নিরপেক্ষ বিচারে কেউই তা অস্বীকার করতে পারে না। অনেক ইহুদি-খ্রিষ্টান লেখকও বাইবেলের বিকৃতির কথা স্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন, মুফতি তাকি উসমানী দা. বা.-রচিত ‘বাইবেল সে কুরআন তক’ ও মাওলানা আব্দুল মতিন-রচিত ‘বাইবেল বিকৃতি: তথ্য ও প্রমাণ’।

টিকাঃ
* কেহ কেহ আরবি নাম ‘العهد العتيق’ বলেছেন, তবে ‘العهد القدিম’ নামই বেশি প্রচলিত।
⁶ বাইবেল বিকৃতি: তথ্য ও প্রমাণ: মাওলানা আব্দুল মজিদ, পৃ: ২১।
⁷ প্রাগুক্ত, পৃ: ২১-২২।
⁸ উইকিপিডিয়া: আল-কিতাবুল মুকাদ্দাস (আরবি)।
৭ বিস্তারিত জানতে দেখুন: ঈসাইয়াত কেয়া হায়, মুফতি তাকি উসমানী (অনুবাদ, খ্রিষ্টধর্মের স্বরূপ, মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম)।
৮ বাইবেল সে কুরআন তক, ১/৩১৩-৩২০ (সংস্করণ: মাকতাবা দারুল উলূম করাচি, ২০১৩ ইং)। উল্লেখ্য, ‘বাইবেল সে কুরআন তক’ কিতাবটি মাওলানা রহমতুল্লাহ কিরানবী রহ. রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইযহারুল হক’-এর শরাহ বা ব্যাখ্যাগ্রন্থ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px