📘 কুরআনে আকা আখিরাতের ছবি > 📄 জাহান্নাম

📄 জাহান্নাম


কিয়ামত সংঘটিত হবার পর হাশরের ময়দানে বিভিন্ন অবস্থায় মানুষ উপস্থিত হবে। মীযান বা দাঁড়িপাল্লা বানিয়ে নেক ও পাপের হিসাব ঠিক হবার পর আমলনামা যারা বাম হাতে বা পেছন থেকে পাবে তারা চূড়ান্ত ফায়সালায় জাহান্নামে রওয়ানা হবে। পুলসিরাত পার হয়ে যারা জান্নাতে যেতে পারবে না তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। এটাই তাদের স্থায়ী নিবাস। এ নিবাস তথা জাহান্নামের ভয়াবহ দুর্ভাগ্যের জীবন সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআনে যে ছবি এঁকেছেন তা কুরআনের ভাষায়ই শুনুন: সূরা আল হাক্কার ২৫-৩৭ আয়াতে আল্লাহ এর ছবি এভাবে এঁকেছেন:
وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتُبَهُ بِشِمَالِهِ فَيَقُولُ يُلَيْتَنِي لَمْ أُوْتَ كِتَبِيَهُ وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهُ يَلَيْتَهَا كَانَتِ الْقَاضِيَةُ مَا أَغْنَى عَنِّي مَالِيَهُ ۚ هَلَكَ عَنِّي سَلْطَنِيَهُ خُذُوهُ فَغُلُّوهُ ثُمَّ الجَحِيمَ صَلُّوهُ ثُمَّ فِي سِلْسِلَة ذَرْعُهَا سَبْعُوْنَ ذِرَاعًا فَاسْلُكُوْهُهُ إِنَّهُ كَانَ لَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ فَلَيْسَ لَهُ الْيَوْمَ هُهُنَا حَمِيمٌ وَلَا طَعَامُ إِلَّا مِنْ غَسْلِينَهُ لا يَأْكُلُهُ إِلَّا الْخَاطِئُونَ
"আর যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে, সে বলে উঠবে হায়! আমার আমলনামা আমাকে যদি দেয়া না হতো। আর আমার হিসাব কি তা যদি আমি না-ই জানতাম! হায়, আমার মৃত্যুই যদি চূড়ান্ত হতো! আজ আমার ধন-সম্পদ আমার কোনো কাজে আসলো না। আমার সব ক্ষমতা আধিপত্য প্রভুত্ব নিঃশেষ হয়ে গেছে। তখন নির্দেশ দেয়া হবে: ধরো লোকটিকে, তার গলায় ফাঁস লাগিয়ে দাও, অতপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করো। এরপর তাকে সত্তর হাতের দীর্ঘ শিকলে বেঁধে দাও। সে লোকটি না মহান আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান এনেছে, আর না সে মিসকীনকে খাবার খাওয়ানোর উৎসাহ দান করতো। এ কারণে আজ এখানে তার সহানুভূতিশীল সহমর্মী বন্ধু কেউ নেই। আর না আছে ক্ষত-নিঃসৃত রস ছাড়া তার কোনো খাদ্য- নিতান্ত অপরাধী লোক ছাড়া যা আর কেউই খায় না।"
সূরা ইবরাহীমের ২১ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন এভাবে:
وَبَرَزُوا لِلَّهِ جَمِيعًا فَقَالَ الضَّعَفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا إِنَّا كُنَّا لَكُمْ تَبَعًا فَهَلْ أَنْتُمْ مُّغْنُونَ عَنَّا مِنْ عَذَابِ اللهِ مِنْ شَيْءٍ ، قَالُوا لَوْ هَدْنَا اللَّهُ لَهَدَيْنِكُمْ ، سَوَاءٌ عَلَيْنَا أَجَزِعْنَا أَمْ صَبَرْنَا مَا لَنَا مِنْ مَّحِيْصِ
"আর এ লোকেরা যখন একত্রিত হয়ে আল্লাহর সামনে উন্মোচিত হবে, তখন এদের মধ্যে যারা পৃথিবীতে দুর্বল ছিল তারা যারা বড়লোক বনেছিল তাদেরকে বলবে: দুনিয়ায় আমরা তোমাদের অধীন ছিলাম, এখন তোমরা আল্লাহর আযাব থেকে আমাদেরকে বাঁচাবার জন্যও কিছু করতে পারো? তারা জবাব দিলো: আল্লাহ যদি আমাদেরকেই মুক্তির কোনো পথ দেখাতেন তাহলে আমরা অবশ্যই তোমাদেরও দেখাতাম। এখন আহাজারী করি কি ধৈর্য অবলম্বন করি উভয়ই আমাদের জন্য সমান। আমাদের রক্ষা ও মুক্তি লাভের কোনো উপায়ই নেই।"
সূরা ইবরাহীমের ২২ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَقَالَ الشَّيْطَنُ لَمَّا قُضِيَ الْأَمْرُ إِنَّ اللهَ وَعَدَكُمْ وَعْدَ الْحَقِّ وَوَعَدْتُكُمْ فَأَخْلَفْتُكُمْ ، وَمَا كَانَ لِي عَلَيْكُمْ مِّنْ سُلْطن إلا أَنْ دَعَوْتُكُمْ فَسْتَجَبْتُمْ لِي فَلَا تَلُومُونِي وَلُوْمُوا أَنْفُسَكُمْ مَا أَنَا بِمُصْرِخِكُمْ وَمَا أَنْتُمْ بِمُصْرِخِيَّ ، إِنِّي كَفَرْتُ bِمَا أَشْرَكْتُمُونِ مِنْ قَبْلُ إِنَّ الظَّلِمِينَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ .
"আর হাশরের দিনের চূড়ান্ত ফায়সালা হয়ে যাবার পর শয়তান বলবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তোমাদের প্রতি আল্লাহ যেসব ওয়াদা করেছিলেন তা সবই সত্য ছিল। আর আমি যত ওয়াদাই করেছিলাম তার মধ্যে কোনো একটিও পালন করিনি। তোমাদের ওপর আমার তো কোনো জোর ছিল না। আমি এটা ছাড়া আর তো কিছু করিনি—শুধু এটাই করেছি যে, তোমাদেরকে আমার পথে চলার জন্য আহ্বান করেছি। আর তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছো। এখন আমাকে দোষ দিও না—তিরস্কার করো না, নিজেকেই নিজে তিরস্কৃত করো। এখানে না আমি তোমাদের ফরিয়াদ শুনতে পারি, না তোমরা আমার
ফরিয়াদ শুনতে পারো। ইতিপূর্বে তোমরা যে আমাকে খোদায়ীর ব্যাপারে শরীক বানিয়ে নিয়েছিলে, আমি তার দায়িত্ব থেকে মুক্ত। এরূপ যালেমদের জন্য তো কঠিন পীড়াদায়ক শাস্তি নিশ্চিত।" সূরা আল হুমাযাহ ৬-৯ আয়াতে:
نَارُ اللَّهِ الْمُوْقَدَةُ الَّتِي تَطَّلِعُ عَلَى الْأَفْئِدَةِ إِنَّهَا عَلَيْهِمْ مُؤْصَدَةٌ هُ فِي عَمَدٍ مُّمَدَّدَةٍ نَّ "আল্লাহর আগুন, প্রচণ্ডভাবে উত্তপ্ত-উৎক্ষিপ্ত যা অন্তর পর্যন্ত পৌঁছবে। তা তাদের ওপর ঢেকে বন্ধ করে দেয়া হবে। এমতাবস্থায় যে, তারা উঁচু উঁচু স্তম্ভে পরিবেষ্টিত হবে।"
সেখানে মুত্যুর মৃত্যু হবে
পরকালীন জীবনের আর শেষ নেই। মৃত্যু নেই। মৃত্যুরই মৃত্যু হয়ে যাবে। সেখানে মৃত্যু আর কাউকে স্পর্শ করবে না। জাহান্নামীদের দুর্ভোগ ও কঠিন শাস্তির কারণে তারা দুর্বিসহ আযাব আর আযাবই ভোগ করতে থাকবে। জাহান্নামীরা নড়েচড়ে যেনো হালকাভাব অনুভব করতে না পারে, এজন্য তাদেরকে আগুনের লম্বা খুটিতে বেঁধে দেয়া হবে।
সূরা ত্বা-হার ৭৪ আয়াতে এ ছবিই আঁকা হয়েছে এভাবে:
إِنَّهُ مَنْ يَأْتِ رَبَّهُ مُجْرِمًا فَإِنَّ لَهُ جَهَنَّمَ ، لَا يَمُوْتُ فِيهَا وَلَا يَحْيَى .
"প্রকৃত কথা এই যে, যে লোক অপরাধী হয়ে নিজের আল্লাহর সামনে হাযির হবে তার জন্য জাহান্নাম, যেখানে সে না জীবিত থাকবে না মরবে।"
সূরা ইবরাহীমের ১৭ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
وَيَأْتِيهِ الْمَوْتُ مِنْ كُلِّ مَكَانٍ وَمَا هُوَ بِمَيِّت "চার দিক থেকে তাকে মৃত্যু যন্ত্রণা বেষ্টন করে নেবে। কিন্তু মৃত্যু ঘটবে না।"
রুক্ষ্ম স্বভাবের ফেরেশতা নিয়োজিত থাকবে
জাহান্নামের ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। সেখানে নিয়োজিত থাকবে রুক্ষ্ম স্বভাব ও পাষাণ হৃদয়ের ফেরেশতাগণ।
সূরা তাহরীমের ৬ আয়াতে এর ছবি এঁকেছেন এভাবে:
وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَئِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لا يَعْصُوْنَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ .
"তার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। যেখানে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয় ও কঠোর স্বভাবের ফেরেশতাগণ। তারা আল্লাহর নির্দেশকে অমান্য করে না। যা করতে আদেশ করা হয় তাই করে।"
সূরা আল বাকারার ২৪ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ أُعِدَّتْ لِلْكَفِرِينَ )
"তবে সেই আগুনকে তোমরা ভয় করো যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যা সত্যদ্রোহী লোকদের জন্য নির্দিষ্ট ও প্রস্তুত করা হয়েছে।"
জাহান্নামের আগুন নিভবে না
জাহান্নামীদের জন্য জাহান্নামের আগুন কখনো নিভে যাবে না। সূরা বনী ইসরাঈলের ৯৭ আয়াতে একথাটি এভাবে বলা হয়েছে:
مَا وَلَهُمْ جَهَنَّمُ ، كُلَّمَا خَبَتْ زِدْنَهُمْ سَعِيرًا
"তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। যখনই আগুন নিভে যাবার উপক্রম হবে তখনই আমি তাদের সে আগুনকে প্রজ্জ্বলিত করে দেবো।"
জাহান্নামীরা দলে দলে জাহান্নামে প্রবেশ করবে
জাহান্নামে জাহান্নামীরা দলে দলে প্রবেশ করবে। তাদের এ দলে দলে জাহান্নামে প্রবেশ করার চিত্র আল্লাহ সূরা আয যুমারের ৭১ আয়াতে এভাবে এঁকেছেন:
حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا فُتِحَتْ أَبْوَابُهَا وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِنْكُمْ يَتْلُوْنَ عَلَيْكُمْ آيَتِ رَبِّكُمْ وَيُنْذِرُونَكُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هَذَا ، قَالُوا بَلَى وَلَكِنْ حَقَّتْ كَلِمَةُ الْعَذَابِ عَلَى الْكُفِرِينَ )
"তারা যখন সেখানে পৌঁছবে, তখন তার দুয়ারগুলো খোলা হবে এবং তার কর্মচারীরা তাদেরকে বলবে: তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য থেকে এমন রাসূল কি এসেছিল না। যারা তোমাদেরকে তোমাদের
রবের আয়াতসমূহ শুনিয়েছে এবং তোমাদেরকে একথা বলে ভয়প্রদর্শন করেছে যে, এ দিনটি একদিন তোমাদেরকে অবশ্যই দেখতে হবে? তারা জবাবে বলবে: হ্যাঁ এসেছিলো! কিন্তু আযাব হওয়ার ফায়সালা কাফেরদের ভাগ্যলিপি হয়ে গেছে।"
সূরা আল বাকারার ২০৬ আয়াতে বলা হয়েছে:
فَحَسْبُهُ جَهَنَّمُ ، وَلَبِئْسَ الْمِهَادُه
"অতএব জাহান্নামই তার জন্য যথেষ্ট। আর তা নিশ্চয়ই নিকৃষ্ট আশ্রয়।"
জাহান্নাম রাগে ফেটে পড়বে
জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার পর জাহান্নামের আগুন রাগে ফেটে পড়বে। একথাটিই আল্লাহ সূরা আল মুলকের ৭-৮ আয়াতে এভাবে আল্লাহ বলেছেন:
إِذَا الْقُوْا فِيهَا سَمِعُوا لَهَا شَهِيقًا وَهِيَ تَفُورُهُ تَكَادُ تَمَيَّزُ مِنَ الْغَيْظِ
"জাহান্নামীরা যখন জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে তখন তারা এর উৎক্ষিপ্ততার গর্জন শুনতে পাবে। রাগে ক্রোধে যেনো জাহান্নাম ফেটে পড়ার উপক্রম।"
চামড়া ঝলসে যাবে
জাহান্নামে আগুনের তাপে জাহান্নামীদের গায়ের চামড়া পুড়ে ঝলসে যাবে। সূরা আল মাআরিজের ১৫-১৬ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
إِنَّهَا لَظَّى نَزَّاعَةً لِّلشَّوى
"নিসন্দেহে তা প্রজ্জ্বলিত আগুন। যা চামড়াকে ঝলসে দেবে।"
সূরা আন নিসার ৫৬ আয়াতে বলা হয়েছে:
نُصْلِيْهِمْ نَارًا ، كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُمْ بَدَّلْنَهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا لِيَذُوقُوا الْعَذَابَ
"নিসন্দেহে আমরা তাদেরকে আগুনে নিক্ষেপ করবো। যখন তাদের চামড়া গলে যাবে তখন তদস্থলে অন্য চামড়া সৃষ্টি করে দিবো, যেন তারা আযাবের স্বাদ পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে।"
ফুটন্ত পানি খেতে দেয়া হবে
জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামে ফুটন্ত পানি খেতে দেয়া হবে। এ পানি পেটের নাড়ীভুড়িকে গলিয়ে দেবে।
সূরা মুহাম্মাদের ১৫ আয়াতে আল্লাহ এ ছবি এঁকেছেন এভাবে:
وَسُقُوْا مَاءً حَمِيمًا فَقَطَّعَ أَمْعَاءَ هُمْ - "তাদেরকে এমন ফুটন্ত পানি পান করানো হবে, যা তাদের নাড়ীভুড়িকে গলিয়ে দেবে।"
সূরা আল আনআমের ৭০ আয়াতে আছে:
لَهُمْ شَرَابٌ مِّنْ حَمِيمٍ وَعَذَابٌ أَلِيمٌ "তাদেরকে ফুটন্ত গরম পানি পান করার জন্য ও পীড়নকারী আযাব ভোগ করার জন্য দেয়া হবে।"
সূরা আল ওয়াকেআর ৫২-৫৩ আয়াতে আছে:
لَاكِلُوْنَ مِنْ شَجَرٍ مِّنْ زَقَوْمٍ ، فَمَالِئُونَ مِنْهَا الْبُطُونَ *
"তোমরা যাক্কুম বৃক্ষের খাদ্য অবশ্যই খাবে। তার দ্বারাই তোমরা পেট ভর্তি করবে।”
মুখাবয়ব দগ্ধীভূত হয়ে যাবে
জাহান্নামীদের মুখাবয়ব দগ্ধীভূত হয়ে যাবে। সূরা আল কাহফের ২৯ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
وَإِنْ يَسْتَغِيثُوا يُغَاثُوا بِمَاءٍ كَالْمُهْلِ يَشْوِي الْوُجُوهَ بِئْسَ الشَّرَابُ . وَسَاءَتْ مُرْتَفَقًا "তারা যদি পানি চায় তাহলে এমন পানি তাদেরকে পরিবেশন করা হবে যা তেলের তেলচিটের মতো হবে এবং তাদের মুখাবয়ব ভাজা ভাজা করে দিবে! এটা অত্যন্ত নিকৃষ্ট পানি, আর অতিশয় খারাপ আশ্রয়স্থল।"
পুঁজ মিশানো পানীয় গলায় আটকে যাবে
জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামে পুঁজ মিশানো পানি খেতে দেয়া হবে। আল্লাহ সূরা ইবরাহীমের ১৬-১৭ আয়াতে বলেছেন:
وَيُسْقَى مِنْ مَاءٍ صَدِيدٍ ل يَتَجَرَّعُهُ وَلَا يَكَادُ يُسِيعُهُ
"তাদেরকে পুঁজ মিশানো পানি পান করতে দেয়া হবে। সে তা কষ্ট করে গলধঃকরণ করতে চেষ্টা করবে। আর খুব কমই গলধঃকরণ করতে পারবে।"
কাঁটাযুক্ত ঘাস তাদের খাবার হবে
জাহান্নামবাসীদের খাবার হবে কাঁটাযুক্ত ঘাস। সূরা আল গাশিয়ায় ৬- ৭ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
لَيْسَ لَهُمْ طَعَامٌ إِلَّا مِنْ ضَرِيْعِ لَا يُسْمِنُ وَلَا يُغْنِي مِنْ جُوْعِ "খাবার হিসাবে তারা কাঁটাওয়ালা শুষ্ক ঘাস ছাড়া আর কিছুই পাবে না। এ ঘাস শরীরের পুষ্টি সাধন করাতো দূরের কথা ক্ষুধাও নিবারণ করতে পারবে না।।"
জাহান্নামে আগুনের পোশাক হবে
জাহান্নামের বাসিন্দাদের পোশাক হবে আগুনের। সূরা আল হজ্জের ১৯-২০ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
فَالَّذِيْنَ كَفَرُوا قُطِعَتْ لَهُمْ ثِيَابٌ مِّنْ نَّارٍ ، يُصَبُّ مِنْ فَوْقِ رُءُ وَسِهِمُ الْحَمِيمُ يُصْهَرُ بِهِ مَا فِي بُطُونِهِمْ وَالْجُلُودُهُ "তাদের মধ্যে যারা কুফুরী করেছে তাদের জন্য আগুনের পোশাক কেটে তৈরি করা হয়েছে। তাদের মাথার উপর ফুটন্ত পানি ঢালা হবে। যার ফলে তাদের চামড়াই শুধু নয় পেটের মধ্যেকার সবকিছুও গলে যাবে।"
তাদের গলায় কণ্ঠবেড়ী থাকবে
জাহান্নামীদের গলায় কণ্ঠবেড়ী বা শিকল পরানো থাকবে। এ শিকল ধরে টেনে হিছড়ে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে। সূরা আল মু'মিনের ৭১- ৭২ আয়াতে বলা হয়েছে:
إِذِ الْأَغْلُلُ فِي أَعْنَاقِهِمْ وَالسَّلَسِلُ ، يُسْحَبُوْنَهُ فِي الْحَمِيمِ ، ثُمَّ فِي النَّارِ يُسْجَرُونَ
"যখন তাদের গলায় শৃংখল পড়বে এবং তাতে ধরে তাদেরকে টগবগ করে ফুটতে থাকা গরম পানির দিকে টানা হবে এবং পরে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে।"
সুতরাং জাহান্নাম হলো বিভিন্ন ধরনের দলন, পীড়ন ও অসহায় যাতনা-বেদনার বেদনা বিধুর করুণ স্থান।
জাহান্নামীরা আফসোস করবে
ফেরেশতাগণ জাহান্নামীদেরকে যখন এক হাতে চুলের মুঠি ও অন্য হাতে পা ধরে উঠিয়ে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে নিয়ে যাবে। জাহান্নামের দারোয়ানগণ জিজ্ঞেস করবে, তোমাদের কাছে কি কোনো সুসংবাদ দানকারী আসেনি? জবাবে কাফিররা বলবে, হ্যাঁ এসেছিলো। কিন্তু আমরা তাদের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছি। তাদের মিথ্যা মনে করেছি। এ সময় তারা আফসোস করবে আর বলবে। সূরা মুলকের ১০ আয়াতে এ বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন :
لَوْكُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحُبِ السَّعِيرِه .
"হায়! আমরা যদি শুনতাম ও অনুধাবন করতাম তাহলে আমরা আজ ঐ দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের উপযুক্ত লোকদের মধ্যে গণ্য হতাম না।"
সূরা আল আনআমের ২৭ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَلَوْ تَرَى إِذْ وَقِفُوا عَلَى النَّارِ فَقَالُوا يُلَيْتَنَا نُرَدُّ وَلَا نُكَذِّبَ بِأَيْتِ رَبِّنَا وَنَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ "হায়! সেই সময়ের অবস্থা যদি তুমি দেখতে পারতে, যখন তাদেরকে জাহান্নামের কিনারায় দাঁড় করানো হবে তখন তারা বলবে: হায়! আমরা যদি দুনিয়ায় আবার ফিরে যেতে পারতাম এবং সেখানে আল্লাহর নিদর্শনসমূহ প্রত্যাখ্যান না কুরতাম ও ঈমানদার লোকদের মধ্যে শামিল হতাম!"
জাহান্নামীরা দুনিয়ায় ফিরে আসতে চাইবে
সূরা আল মু'মিনের ১১ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
قَالُوا رَبَّنَا آمَتَّنَا اثْنَتَيْنِ وَأَحْيَيْتَنَا اثْنَتَيْنِ فَاعْتَرَفْنَا بِذُنُوبِنَا فَهَلْ إِلَى خُرُوجٍ مِّنْ سَبِيلِ .
"তারা বলবে: হে আমাদের রব! তুমি নিশ্চয়ই আমাদেরকে দুবার মৃত্যু ও দুবার জীবনদান করেছো। এখন আমরা আমাদের অপরাধ- সমূহ স্বীকার করে নিচ্ছি। এখন এখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ আছে কি?"
জবাবে সূরা আল ফাতিরের ৩৭ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
وَهُمْ يَصْطَرِخُونَ فِيْهَا ، رَبَّنَا أَخْرِجْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا غَيْرَ الَّذِي كُنَّا نَعْمَلُ ، أَوَلَمْ نُعَمِّرْ كُمْ مَّا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَنْ تَذَكَّرَ وَجَاءَ كُمُ النَّذِيرُ ، فَذُوقُوا فَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ نَّصِيْرِهِ
"সেখানে তারা চীৎকার করে বলবে: হে আমাদের রব! আমাদেরকে এখান থেকে বের করে নাও- যেন আমরা নেক আমল করি, সে আমল থেকে ভিন্নতর যেমন পূর্বে করছিলাম। (তাদেরকে জবাব দেয়া হবে) আমরা কি তোমাদেরকে এমন বয়স দান করিনি যাতে কেউ শিক্ষাগ্রহণ করতে চাইলে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারতো? আর তোমাদের নিকট সতর্ককারীও এসেছিল। এখন স্বাদ গ্রহণ করো। এখানে যালেমদের কোনো সাহায্যকারী নেই।"
সবকিছু বিনিময় করেও তারা বাঁচতে চাইবে
স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন সহ দুনিয়ার সবকিছুর বিনিময় দিয়ে হলেও সেদিন জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চাইবে। কিন্তু তা হবে না। সূরা আল মাআরিজের ১১-১৪ আয়াতে একথাই বলা হয়েছে:
يَوَدُّ الْمُجْرِمُ لَوْ يَفْتَدِى مِنْ عَذَابِ يَوْمِئِذٍ بِبَنِيْهِ وَصَاحِبَتِهِ وَأَخِيهِ وَفَصِيلَتِهِ الَّتِي تُنْوِيْهِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا لَا ثُمَّ يُنْجِيهِ
"অপরাধী লোক চাইবে, সেদিনের আযাব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নিজের সন্তান, স্ত্রী, ভাই, তাকে আশ্রয়দানকারী নিকটবর্তী পরিবারকে এবং ভূ-পৃষ্ঠের সমস্ত লোককে বিনিময়ে দিয়ে দিতে, যেন এ উপায়টি তাকে নিষ্কৃতি দিতে পারে।"
সূরা আল মু'মিনূনের ১০১ আয়াতে বলা হয়েছে:
فَلَا أَنْسَابَ بَيْنَهُمْ يَوْمَئِذٍ وَلَا يَتَسَاءَلُوْنَ )
"তখন তাদের মধ্যে আর কোনো আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না। এমন কি পরস্পর দেখা হলেও কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করবে না।"
একদল আর একদলকে দোষারোপ করবে
জাহান্নামের লোকেরা তাদের দুর্গতির জন্য একদল আরেক দলকে দোষ দেবে। বলবে, তোমাদের জন্য আজ আমাদের এ দুর্গতি। সূরা আল আরাফের ৩৮ আয়াতে এ ছবি এঁকেছেন এভাবে:
كُلَّمَا دَخَلَتْ أُمَّةٌ لَعَنَتْ أُخْتَهَا ، حَتَّى إِذَا ادَّارَكُوا فِيْهَا جَمِيعًا ، قَالَتْ أُخْرَهُمْ لأَوَّلَهُمْ رَبَّنَا هَؤُلَاءِ أَضَلُّونَا فَأْتِهِمْ عَذَابًا ضِعْفًا مِّنْ النَّارِ قَالَ لِكُلِّ ضِعْفٌ وَلَكِنْ لا تَعْلَمُوْنَ )
"প্রত্যেকটি লোক যখন জাহান্নামে দাখিল হবে তখন নিজেদের পূর্বগামী লোকদের উপর লানত করতে করতে প্রবেশ করবে। এভাবে সব লোকই যখন তথায় একত্রিত হবে তখন প্রত্যেক পরবর্তী দল তার পূর্ববর্তী দল সম্পর্কে বলবে: হে আমাদের রব! এ লোকেরাই আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। কাজেই এদেরকে দ্বিগুণ আযাব দাও। উত্তরে বলা হবে, প্রত্যেকেরই জন্য দ্বিগুণ আযাব রয়েছে; কিন্তু তোমরা জান না।"
এ আয়াতের শেষাংশে প্রত্যেকের জন্য দুইগুণ আযাবের উল্লেখ আছে। এর তাৎপর্য হলো, ভুল পথে চলার অপরাধীরা নিজে তো অপরাধ করেই। আবার-অন্যদেরকেও এ পথে চলার জন্য উৎসাহিত করে। প্রত্যেকটি অপরাধের কাজই দৃশ্যতঃ চাকচিক্যময় ও লাভজনক। তাই লোকজন সেই দিকে চলে যায়। তাদেরকে দেখে পরের লোকগুলোও অপরাধী হয়ে উঠে। অপরাধের প্রসার ধারাবাহিকভাবে এরূপ চলতে থাকে। পরের লোকেরা আগের লোকজনকে অনুকরণ করে চলতে থাকে। প্রত্যেক দলকেই তাই আল্লাহ দুইগুণ শান্তি দেয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ তারা যেমন একদিকে আগের দলের অনুগামী অনুসারী তদ্রূপ তারা পরের লোকদের পূর্বসূরী।
সূরা আল বাকারার ২৫৭ আয়াতে তাদের এ পরিচয় দিয়ে আল্লাহ বলেছেন:
اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُمْ مِّنَ الظُّلُمَتِ إِلَى النُّوْرِ ، وَالَّذِينَ كَفَرُوا
أَوَلِيْتُهُمُ الطَّاغُوتُ : يُخْرِجُونَهُمْ مِّنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَتِ أُولَئِكَ أَصْحَبُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَلِدُونَ ০
"যারা ঈমানদার, তাদের সাহায্যকারী ও পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন আল্লাহ; তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোকের দিকে বের করে আনেন। আর যারা কুফরী অবলম্বন করে, তাদের পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে 'তাগূত'; তা তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যায়। এরা জাহান্নামে যাবার লোক, সেখানে তারা চিরদিন থাকবে।"
অনুসারীরা অগ্রগামীদের শাস্তি দাবী করবে
যাদের কথা শুনে জাহান্নামীদের এ দুরবস্থা দুর্গতি। তাদের বিরুদ্ধে তারা আল্লাহর কাছে নালিশ করবে।
সূরা আল আহযাবের ৬৭-৬৮ আয়াতে একথা এভাবে বলা হয়েছে:
وَقَالُوا رَبَّنَا إِنَّا أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَاءَنَا فَأَضَلُّونَا السَّبِيْلا رَبَّنَا أَتِهِمْ ضِعْفَيْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْهُمْ لَعْنًا كَبِيرًا ০
"আর বলবেঃ হে আমাদের রব! আমরা আমাদের সরদার ও নেতৃবৃন্দের আনুগত্য করেছি, আর তারা আমাদেরকে হেদায়াতের পথ থেকে গোমরাহ করে রেখেছে। হে রব! তাদেরকে দ্বিগুণ আযাব দাও এবং তাদের ওপর শক্ত অভিশাপ বর্ষণ করো।"
সূরা হা-মীম আস সাজদাহর ২৯ আয়াতে বলা হয়েছে:
رَبَّنَا آرِنَا الَّذِينَ أَضَلَّنَا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ نَجْعَلْهُمَا تَحْتَ أَقْدَامِنَا لِيَكُونَا مِنَ الْأَسْفَلِينَ ০
"হে আমাদের রব! আমাদেরকে একটু দেখিয়ে দিন সে জ্বিন ও মানুষগুলোকে, যারা আমাদেরকে গোমরাহ করেছিলো। আমরা তাদেরকে পায়ের তলায় রেখে নিষ্পেষিত করবো, যেন এরা ভালোমতো অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়।”
সূরা আল বাকারার ১৬৬-১৬৭ আয়াতে বলা হয়েছে:
إِذْ تَبَرَّ الَّذِينَ اتَّبِعُوا مِنَ الَّذِينَ اتَّبِعُوا وَرَأَوُا الْعَذَابَ وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ
الْأَسْبَابُ ، وَقَالَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا لَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَنَتَبَرَّأَ مِنْهُمْ كَمَا تَبَرَّءُ وا مِنَّا كَذَلِكَ يُرِيهِمُ اللَّهُ أَعْمَالَهُمْ حَسَرَات عَلَيْهِمْ ، وَمَا هُمْ بِخْرِجِينَ مِنَ النَّارِ
"আল্লাহ যখন শান্তি দিবেন তখন এরূপ অবস্থা দেখা দিবে যে, দুনিয়াতে যেসব নেতা ও প্রধান ব্যক্তির অনুসরণ করা হতো তারা নিজ নিজ অনুসরণকারীদের সাথে সকল সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা ঘোষণা করবে, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা অবশ্যই শাস্তি পাবে এবং তাদের সকল উপায়-উপাদানের সম্পর্ক ও কার্যকারণ ধারা ছিন্ন হয়ে যাবে। আর দুনিয়ায় যারা তাদের অনুসরণ করতো তারা বলবে: হায়! আমাদেরকে আবার যদি সুযোগ দেয়া হতো, তাহলে আজ এরা যেমন আমাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজেদের দায়িত্বহীন থাকার কথা প্রকাশ করছে আমরাও তাদের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে দেখিয়ে দিতাম। আল্লাহ অবশ্যই তাদের সকল কাজ-যাকিছু তারা দুনিয়াতে করছে-তাদের সামনে এমনভাবে উপস্থিত করবেন যে, তারা শুধু লজ্জিত হবে ও দুঃখ প্রকাশ করবে। কিন্তু জাহান্নামের গর্ভ থেকে বের হবার কোনো পথই তারা খুঁজে পাবে না।"
জাহান্নামীদের লক্ষ করে শয়তান যা বলবে
দুনিয়ায় শয়তানসহ যারা জাহান্নামীদেরকে বিপথে চালিয়েছে তাদের ওপর সব দোষ চাপিয়ে তারা আজ বিপদের দিনে আল্লাহর করুণা চাইবে। কিন্তু শয়তান নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা চালাবে। সূরা ইবরাহীমের ২২ আয়াতে আছে:
وَقَالَ الشَّيْطَنُ لَمَّا قُضِيَ الْأَمْرُ إِنَّ اللَّهَ وَعَدَكُمْ وَعْدَ الْحَقِّ وَوَعَدْتُكُمْ فَأَخْلَفْتُكُمْ ، وَمَا كَانَ لِي عَلَيْكُمْ مِّنْ سُلْطَنٍ إِلَّا أَنْ دَعَوْتُكُمْ فَسْتَجَبْتُمْ لي ، فَلَا تَلُومُونِي وَلُوْمُوا أَنْفُسَكُمْ ، مَا أَنَا بِمُصْرِخِكُمْ وَمَا أَنْتُمْ بِمُصْرِخِي إِنِّي كَفَرْتُ بِمَا أَشْرَكْتُمُونِ مِنْ قَبْلُ إِنَّ الظَّلِمِينَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
"আর হাশরের দিনের চূড়ান্ত ফায়সালা হয়ে যাবার পর শয়তান বলবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তোমাদের প্রতি আল্লাহ যেসব ওয়াদা করেছিলেন তা সবই সত্য ছিল। আর আমি যত ওয়াদাই করেছিলাম তার মধ্যে কোনো একটিও পালন করিনি। তোমাদের ওপর আমার তো কোনো জোর ছিল না। আমি এটা ছাড়া আর তো কিছু করিনি-শুধু এটাই করেছি যে, তোমাদেরকে আমার পথে চলার জন্য আহ্বান করেছি। আর তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছো। এখন আমাকে দোষ দিও না-তিরস্কার করো না, নিজেকেই নিজে তিরস্কৃত করো। এখানে না আমি তোমাদের ফরিয়াদ শুনতে পারি, না তোমরা আমার ফরিয়াদ শুনতে পারো। ইতিপূর্বে তোমরা যে আমাকে খোদায়ীর ব্যাপারে শরীক বানিয়ে নিয়েছিলে, আমি তার দায়িত্ব থেকে মুক্ত। এরূপ যালেমদের জন্য তো কঠিন পীড়াদায়ক শাস্তি নিশ্চিত।"
সেদিন সবর করা, না করা সমান
সেদিন কারো পক্ষে কিছু করা সম্ভব হবে না। সূরা আত তূরের ১৩-১৬ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
يَوْمَ يُدَعُوْنَ إِلَى نَارِ جَهَنَّمَ دَعَالٌ هَذِهِ النَّارُ الَّتِي كُنْتُمْ بِهَا تُكَذِّبُونَ أَفَسِحْرٌ هذَا أَمْ أَنْتُمْ لَا تُبْصِرُونَةً إِصْلَوْهَا فَاصْبِرُوا أَوْلَا تَصْبِرُوا سَوَاء عَلَيْكُمْ ، إِنَّمَا تُجْزَوْنَ مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ
“যেদিন তাদেরকে ধাক্কা মেরে মেরে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন তাদেরকে বলা হবে যে, এটা সেই আগুন যাকে তোমরা অসত্য ও ভিত্তিহীন মনে করছিলে। এখন বলো এটা কি যাদু, নাকি তোমাদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানটুকুও নেই? এখন যাও তার ভিতরে ভষ্ম হতে থাকো, তোমরা তা সহ্য করতে পারো, আর না পারো, তোমাদের জন্য সবই সমান। তোমাদেরকে সেই রকম প্রতিফল-ই দেয়া হচ্ছে যেমন তোমরা আমল করছিলে!"
সূরা আল হাদীদের ১৫ আয়াতে বলা হয়েছে:
فَالْيَوْمَ لا يُؤْخَذُ مِنْكُمْ فِدْيَةٌ وَلَا مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا ، مَأْوَكُمُ النَّارُ هِيَ مَوْلَكُمْ ، وَبِئْسَ الْمَصِيرُه "কাজেই আজ না তোমাদের নিকট থেকে কোনো বিনিময় কবুল করা হবে, আর না সেই লোকদের থেকে যারা প্রকাশ্যভাবে কুফরী করেছিল।
তোমাদের ঠিকানা, চূড়ান্ত আশ্রয় জাহান্নাম। সেই জাহান্নামই তোমাদের খবরাখবর গ্রহণকারী এবং অতিশয় নিকৃষ্ট পরিণতি।”
প্রকৃত ব্যাপার হলো, সেদিন আর কিছু করার থাকবে না। যা করার ছিলো তা দুনিয়ায় ছিলো। দুনিয়ার জীবন পার হয়ে গেলে আখিরাতের জীবনে পা দিলে আর নিজ ইখতিয়ারের কিছু থাকবে না। সাহায্যকারীও পাবে না। দুনিয়ার জীবনের অপরাধের জন্য যা শাস্তি নির্দিষ্ট আছে, তা ভোগ করতেই হবে।
জাহান্নামের রক্ষীদের কাছে আবেদন
জাহান্নামের লোকেরা কঠিন শাস্তি ভোগ করতে করতে অতিষ্ট হয়ে জাহান্নামের রক্ষীদেরকে অনুনয় বিনয় করবে। তাদের এ অনুনয়ের কথা আল্লাহ সূরা আল মু'মিনের ৪৯ আয়াতে এভাবে বলে দিয়েছেনঃ
رَبَّكُمْ يُخَفِّفْ عَنَّا يَوْمًا مِّنَ الْعَذَابِ ادْعُوا
"তোমাদের আল্লাহর কাছে দোয়া করো, তিনি যেন আমাদের এ আযাব মাত্র একটি দিন হ্রাস করে দেন।" প্রতি উত্তরে রক্ষী দল বলবে:
فَادْعُوا ، وَمَا دُعُوَاء الْكَفِرِينَ إِلَّا فِي ضَلَلٍ
"তোমরা অনুনয় বিনয় করতে পারো। কিন্তু কাফেরদের জন্য সবই আজ বিফল।"-সূরা মুমিন: ৫০
এরপর জাহান্নামবাসীরা অনুরোধ করবে:
يَا مَالِكُ لِيُقْضِ عَلَيْنَا رَبُّكَ
"হে মালিক! তুমি আমাদের জন্য তোমার রবের কাছে ফরিয়াদ করো। তিনি যেনো আমাদের মৃত্যু দিয়ে দেন।"-সূরা যুখরুফ: ৭৭
রক্ষী ফেরেশতা বলবে:
إِنَّكُمْ مَا كِثُوْنَ ......
"তোমাদেরকে এখানেই সবসময় থাকতে হবে। অর্থাৎ তোমাদের আর মৃত্যু নেই।"-সূরা যুখরুফ: ৭৭
জাহান্নামবাসীর শেষ আরাধনা
জাহান্নামের রক্ষীদের কাছে অনুনয় বিনয় করে কিছু না পেয়ে তারা সরাসরি পরাক্রমশালী আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাবে।
সূরা মু'মিনূনের ১০৬ আয়াতে আছে:
رَبَّنَا غَلَبَتْ عَلَيْنَا شَقْوَتُنَا وَكُنَّا قَوْمًا ضَالَّيْنَ
"তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদেরকে গ্রাস করে ফেলেছিল। আমরা বাস্তবিকই গোমরাহ লোক ছিলাম।"
এদের এ ফরিয়াদ শোনা হবে না। এ ফরিয়াদের জবাবে বরং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। আর তারা সেখানে যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকবে।
জাহান্নামের প্রকারভেদ
পাপীর পাপের মাত্রা অনুসারে জাহান্নামের বিভিন্ন শাস্তির জায়গায় জাহান্নমীদেরকে রাখা হবে। জাহান্নামের এ স্তরবিন্যাস সাত প্রকার। সূরা আল হিজরের ৪৪ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
لَهَا سَبْعَةُ أَبْوَابٍ ، لِكُلِّ بَابٍ مِّنْهُمْ جُزْءٌ مَقْسُومٌ .
"জাহান্নামের সাতটি স্তর আছে। প্রত্যেকটি স্তর ভিন্ন ভিন্ন দলের জন্য ভাগ করা আছে।"
এ স্তরগুলো সাত ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
(১) হাবিয়া (২) জাহীম (৩) সাকার (৪) লাযা (৫) সাঈর (৬) হুতামাহ (৭) জাহান্নাম।
কাফির, মুশরিক, ব্যভিচারী, সুদখোর, ঘুষখোর ইত্যাদি ধরনের পাপীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন রকমের শাস্তি রয়েছে। পাপ অনুযায়ী শাস্তি হবে জাহান্নামে আযাবের মাত্রা।
জান্নাতীদেরকে জাহান্নাম ও জাহান্নামীদেরকে জান্নাত দেখানো হবে
বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন। জান্নাতীদেরকে জান্নাতে যাবার আগে বদ আমল করলে জাহান্নামে তার যে স্থান হতো তা তাকে দেখানো হবে। জাহান্নামের অবস্থা দেখে সে এর থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করবে।
আর জাহান্নামে নিক্ষেপ করার আগে জাহান্নামীদেরকে জান্নাত দেখানো হবে। নেক আমল করলে জান্নাতে তার যে স্থান হতো তা তাকে দেখানো হবে। এতে সে খুব দুঃখিত ও অনুতপ্ত হবে।
আরাফ
জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানের একটি জায়গার নাম আ'রাফ। হাশরের ময়দানের হিসাব নিকাশের পর যেসব মানুষের আমলনামা নেক, বদ সমান
হবে তারা তখনও জান্নাত বা জাহান্নামে যেতে পারবে না। জান্নাত জাহান্নামের মাঝখানের অস্থায়ীভাবে এ আ'রাফ নামক জায়গায় থাকবে। আ'রাফগামীরা সেথায় থেকে জান্নাত ও জাহান্নামবাসীদেরকে দেখতে পাবে। তাদের সাথে কথাবার্তা বলবে। পরে অবশ্য আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জান্নাতে যাবার অনুমতি দেবেন।
যাদের কাছে আল্লাহর দীন গ্রহণের দাওয়াত দিতে কোনো নবী বা রাসূল পৌঁছেননি, যারা দুনিয়ায় পাগল ছিলো, তারাও আ'রাফে থাকবে। 'আ'রাফ' সম্পর্কে আল্লাহ সূরা আল আ'রাফে বলেছেন:
وَبَيْنَهُمَا حِجَابٌ ، وَعَلَى الْأَعْرَافِ رِجَالٌ يَعْرِفُوْنَ كُلًّا بِسِيْمُهُمْ ، وَنَادَوْا أَصْحَبَ الْجَنَّةِ أَنْ سَلِّمْ عَلَيْكُمْ لَمْ يَدْخُلُوهَا وَهُمْ يَطْمَعُوْنَ وَإِذَا صُرِفَتْ أَبْصَارُهُمْ تِلْقَاءَ أَصْحَب النَّارِ قَالُوا رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا مَعَ الظَّلِمِينَ وَنَادَى أَصْحَبُ الْأَعْرَافِ رِجَالاً يَعْرِفُونَهُمْ بِسِيْمَهُمْ قَالُوْا مَا أَغْنِي عَنْكُمْ جَمْعُكُمْ وَمَا كُنْتُمْ تَسْتَكْبِرُونَ .
"এ উভয় শ্রেণীর লোকদের মাঝখানে একটি পার্থক্যকারী পর্দা হবে, তার উচ্চ পর্যায়ে থাকবে অপর কিছু লোক। এরা প্রত্যেককে তার চিহ্ন দ্বারা চিনতে পারবে। জান্নাতবাসীদের ডেকে এরা বলবে: তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। এরা জান্নাতে প্রবেশ নেই বটে, কিন্তু তারা তার জন্য আকাঙ্ক্ষী। এরা জান্নাতে প্রবেশ করেনি বটে, কিন্তু তারা তার জন্য আকাঙ্ক্ষী। পরে জাহান্নামের প্রতি যখন তাদের চোখ পড়বে, তখন বলবে: হে আল্লাহ! আমাদেরকে এ যালেম লোকদের মধ্যে শামিল করো না। অতপর এ আ'রাফের লোকেরা জাহান্নামের কয়েকজন বড় বড় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোককে তাদের চিহ্ন দ্বারা চিনে নিয়ে ডেকে বলবে: দেখলে তো, আজ না তোমাদের বাহিনী কোনো কাজে আসলো, আর না সেসব সাজ-সরঞ্জাম যাকে তোমরা খুব বড় বলে মনে করছিলে।" -সূরা আল আ'রাফ: ৪৬-৪৮
আল্লাহ আমাদেরকে জাহান্নামের ভয়াবহ আযাব থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতের বাগানে প্রবেশ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00