📘 কুরআনে আকা আখিরাতের ছবি > 📄 আদালত

📄 আদালত


আমলনামা
হাশরের ময়দানে মীযান কায়েম করে মানুষের নেক আমল ও বদ আমলের পরিমাপের পর আল্লাহ তাআলা প্রত্যেকের হাতে তার পরিমাপ করা আমলনামা দিয়ে দেবেন। কুরআনের ভাষায় এ আমলনামাকেই কিতাব বলা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা হাশরের ময়দানের এ সোপানের ছবি সূরা আল জাসীয়ার ২৮-২৯ আয়াতে এভাবে এঁকেছেন:
كُلُّ أُمَّةٍ تُدْعَى إِلَى كِتَبِهَا الْيَوْمَ تُجْزَوْنَ مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ هُذَا كِتَبُنَا يَنْطِقُ عَلَيْكُمْ بِالْحَقِّ إِنَّا كُنَّا نَسْتَنْسِخُ مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ
"প্রত্যেক দলকেই ডেকে বলা হবে, এসো ও নিজ নিজ আমলনামা দেখে নাও। তাদেরকে বলা হবে, আজ তোমাদেরকে সেইসব আমলের বদলা দেয়া হবে যা তোমরা করছিলে। এটা আমাদের তৈরি করা আমলনামা। এটা তোমাদের ব্যাপারে সঠিক ও নির্ভুল সাক্ষ দিচ্ছে। তোমরা যাকিছু করছিলে, আমরা তা লিখে রেখেছিলাম।"
সূরা আল মুজাদালার ৬ আয়াতে এর ছবি আল্লাহ এঁকেছেন এভাবে:
يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ اللهُ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُهُمْ بِمَا عَمِلُوا أَحْصُهُ اللَّهُ وَنَسُوهُ . وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ
"সেদিন হবে, যখন আল্লাহ তাআলা এদের সকলকে পুনরায় জীবিত করে উঠাবেন এবং তারা যাকিছু করে এসেছে তা তাদেরকে জানিয়ে দিবেন। তারা তো ভুলে গেছে, কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের যাবতীয় কৃতকর্ম হিসাব করে সংরক্ষিত করে রেখেছেন। আর আল্লাহ প্রত্যেকটি জিনিসের ব্যাপারে সাক্ষী।"
সূরা যিলযালের ৬-৮ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
يَوْمَئِذٍ يَصْدُرُ النَّاسُ أَشْتَاتًا لا لَيُرَوْا أَعْمَالَهُمْ فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ
“সেদিন লোকেরা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ফিরে আসবে, যেন তাদের আমল তাদেরকে দেখানো যায়। কেউ যদি দুনিয়ায় অণু-পরমাণু পরিমাণ সৎকাজ করে হাশরের ময়দানে তা সে দেখতে পাবে। অপর পক্ষে কেউ যদি দুনিয়ায় অণু-পরমাণু পরিমাণ বদ কাজ করে তাও সে সেখানে দেখতে পাবে।”
সূরা বনী ইসরাঈলের ১৩-১৪ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ القِيمَةِ كِتبًا يَلْقَهُ مَنْشُورًا اقْرَأْ كِتَبَكَ ، كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا .
“আর কিয়ামতের দিন আমরা একটি লিপিকা তার জন্য প্রকাশ করবো যাকে সে উন্মুক্ত গ্রন্থ হিসেবে পাবে। পড়ো নিজের আমলনামা, আজ নিজের হিসাব ঠিক করার জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট।”
সূরা আল ইনশিকাকের ৭-১২ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتْبَهُ بِيَمِينِهِ فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يُسِيرًا وَيَنْقَلِبُ إِلَى أَهْلِهِ مَسْرُورًا * وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتُبَهُ وَرَاءَ ظَهْرِهِ ، فَسَوْفَ يَدْعُوا تُبُوْراهُ وَيَصْلَى سَعِيرًا
“অতপর যার আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে, তার হিসাব সহজভাবে গ্রহণ করা হবে। এবং সে তার আপনজনের দিকে সানন্দচিত্তে ফিরে যাবে। আর যে ব্যক্তির আমলনামা তার পিছন দিক থেকে দেয়া হবে, সে মৃত্যুকে ডাকবে ও জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিপতিত হবে।”
সূরা আল হাক্কার ১৯-২৪ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
. فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتُبَهُ بِيَمِينِهِ لا فَيَقُولُ هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَبِيَهُ ، إِنِّي ظَنَنْتُ أَنِّي مُلْقٍ حِسَابِيَهُ ، فَهُوَ فِي عِيْشَةٍ رَاضِيَةٍ فِي جَنَّةٍ عَالِيَةٍ قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ ، كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا بِمَا أَسْلَفْتُمْ فِي الْأَيَّامِ الْخَالِيَةِ
“সে সময় অর্থাৎ হাশরের দিন যার আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, দেখ দেখ, পড় আমার আমলনামা। আমি মনে
করেছিলাম যে, আমার হিসাব অবশ্যই পাওয়া যাবে। ফলে তারা বাঞ্ছিত সুখ সম্ভোগে লিপ্ত থাকবে। উচ্চতম স্থানের জান্নাতে। যার ফলসমূহের গুচ্ছ ঝুলে থাকবে। এ লোকদেরকে বলা হবে, স্বাদ নিয়ে খাও, পান করো, তোমাদের সেইসব আমলের বিনিময়ে যা তোমরা অতীত দিনসমূহে করেছো।”
মীযানে নেক পাপের পরিমাপের পর যার ওযনের ফল—আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে তার ব্যাপারে কড়াকড়ি করা হবে না। সে হাসি খুশী মনে আমলনামা নিয়ে স্বজনদের কাছে ফিরে যাবে। আর যার আমলনামা তার পেছন দিয়ে দেয়া হবে সে জাহান্নামের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হবে।
আমলনামা হাতে পাবার এ ছবি আল্লাহ পাক সূরা আল হাক্কার ১৯-২০ আয়াতে এভাবে এঁকেছেন:
فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتٰبَهُ بِيَمِينِهِ فَيَقُولُ هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتٰبِيَهُ إِنِّي ظَنَنْتُ أَنِّي مُلْقٍ حِسَابِيَة
"সে সময় অর্থাৎ হাশরের দিন যার আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, দেখ দেখ, পড় আমার আমলনামা। আমি মনে করেছিলাম যে, আমার হিসাব অবশ্যই পাওয়া যাবে।”
সূরা আল কাহফ্ফের ৪৯ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
وَوُضِعَ الْكِتٰبُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يُوَيْلَتَنَا مَالِ هَذَا الْكِتٰبِ لَا يُغَادِرُ صَغِيْرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصٰهَا ، وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا ، وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا .
"আর তখন আমলনামা সামনে রেখে দেয়া হবে। তখন তোমরা দেখবে যে, অপরাধী লোকেরা নিজেদের কিতাবে লিখিত সব বিষয় সম্পর্কে খুবই ভয় পাচ্ছে। আর বলছে: হায়রে দুভার্গ্য এটা কেমন কিতাব যে, আমাদের ছোট বড় কোনো কাজই এমন থেকে যায়নি যা এতে লিপিবদ্ধ করা হয়নি! তারা যে যা করেছিল তা সবই নিজের সামনে উপস্থিত পাবে, আর তোমার আল্লাহ কারো প্রতি এক বিন্দু যুলুম করবেন না।”
শাফাআত
আমলনামা হাতে আসার পর কোনো কোনো মু'মিন নেক আমলের জন্য আটকে গেলে জান্নাতে প্রবেশের ফায়সালা না পেলে আল্লাহর হুকুমে আল্লাহর কিছু নেক বান্দা তাদের জন্য সুপারিশ করতে পারবেন। এ সুপারিশে ঈমানদারগণই উপকৃত হবেন। এখানে স্মরণ রাখতে হবে হাশরের ময়দানে সুপারিশের যোগ্য হবেন মু'মিনরা। কাফির মুশরিকদের জন্য কোনো সুপারিশ নেই।
আল্লাহর রাসূল বলেছেন, কিয়ামতের দিন তিনদল লোক শাফাআত করতে পারবেন: (১) নবী-রাসূলগণ (২) আলেমগণ, (৩) শহীদগণ।
তবে শাফাআত বা সুপারিশ করা খুবই কঠিন ব্যাপার। আল্লাহ তাআলা সূরা আল বাকারার ২৫৫ আয়াতে এ চিত্র এঁকেছেন এভাবে:
مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ .
"কে এমন আছে যে, তাঁর দরবারে তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করতে পারে?"
সূরা ত্বা-হার ১০৯ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
يَوْمَئِذٍ لا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ إِلَّا مَنْ آذَنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِي لَهُ قَوْلاً
"সেদিন শাফাআত কার্যকর হবে না, অবশ্য স্বয়ং রহমান কাউকে তার অনুমতি দিলে এবং তার কথা শুনতে পসন্দ করলে অন্য কথা।"
সূরা আল মু'মিনের ১৮ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
مَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ حَمِيمٍ وَلَا شَفِيعٍ يُطَاعُ
"যালেমদের কেউ দরদী বন্ধু হবে না, না এমন কোনো শাফাআতকারী, যার কথা মেনে নেয়া হবে।"
সূরা আনআমের ৯৪ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
وَمَا نَرَى مَعَكُمْ شُفَعَاءَ كُمُ الَّذِينَ زَعَمْتُمْ أَنَّهُمْ فِيْكُمْ شُرَكَؤُوا ، لَقَدْ تَقَطَّعَ بَيْنَكُمْ وَضَلَّ عَنْكُمْ مَّا كُنْتُمْ تَزْعُمُونَ
"এখন আমরা তোমাদের সাথে তোমাদের সেই শাফাআতকারীদেরকেও তো দেখি না, যাদের সম্পর্কে তোমরা মনে করছিলে যে, তোমাদের
কার্যোদ্ধারের ব্যাপারে তাদেরও অংশ রয়েছে। তোমাদের পারস্পরিক সকল সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তোমরা যা ধারণা করতে তা সবই আজ তোমাদের নিকট থেকে বিলীন হয়ে গেছে।"
সূরা আন নাজমের ২৬ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَنْ يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَرْضَى .
"তাদের শাফাআত কোনো কাজেই আসতে পারে না যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা এমন কোনো ব্যক্তির পক্ষে তার অনুমতি দিবেন, যার জন্য তিনি কোনো আবেদন শুনতে ইচ্ছা করবেন এবং তা পসন্দ করবেন।"
পুলসিরাত
আল কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, আখিরাতে হাশরের ময়দানের চারদিকে জাহান্নামকে দিয়ে ঘিরে দেয়া হবে। হাশরের ময়দান হতে জান্নাত পর্যন্ত দীর্ঘ সেতু বা পুলসিরাত স্থাপন করা হবে। এ পুলসিরাত হবে চুলের চেয়ে চিকন তরবারীর চেয়ে ধারালো। সকলকেই এ পুলসিরাত পার হয়ে জান্নাতে পৌঁছতে হবে।
সূরা মারইয়ামের ৭১ আয়াতে এ বিষয়টিকে এভাবে চিত্রিত করেছেন:
وَإِنْ مِّنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا ، كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَّقْضِيًّا .
"তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে, জাহান্নামের ওপর উপস্থিত হবে না। এটাতো একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকৃত কথা। একে পুরা করা তোমার আল্লাহর দায়িত্ব।”
নেক আমলকারী যারা ডান হাতে আমলনামা পাবে তারা সহজেই চোখের পলকে পুলসিরাত পার হয়ে জান্নাতে চলে যাবে। আর বদ আমলকারীরা বাম হাতে বা পেছনের দিক দিয়ে আমলনামা পাবে। তারা পুলসিরাত পার হতে পারবে না। হাত-পা কেটে তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। সেদিন ঈমানের নূর ছাড়া আর কোনো নূর থাকবে না।
সূরা আল হাদীদের ১২-১৩ আয়াতে বলা হয়েছে:
يَوْمَ تَرَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ يَسْعَى نُورُهُمْ بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِمْ شربكُمُ الْيَوْمَ جَنَّتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَرُ خَلِدِينَ فِيهَا ، ذَلِكَ هُوَ
الْفَوْزُ الْعَظِيمُ يَوْمَ يَقُولُ الْمُنْفِقُونَ وَالْمُنْفِقتُ لِلَّذِينَ آمَنُوا انْظُرُونَا نَقْتَبِسْ مِنْ نُّوْرِكُمْ قِيلَ ارْجِعُوا وَرَاءَكُمْ فَالْتَمِسُوا نُورًا ، فَضُرِبَ بَيْنَهُمْ بِسُورٍ لَّهُ بَابٌ ، بَاطِنُهُ فِيْهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُهُ مِنْ قِبَلِهِ الْعَذَابُ .
"সেদিন যখন তোমরা মু'মিন পুরুষ ও স্ত্রীলোকদেরকে দেখবে যে, তাদের আলো তাদের সামনে সামনে এবং তাদের ডান দিকে দৌড়াতে থাকে। আজ সুসংবাদ রয়েছে তোমাদের জন্য। জান্নাতসমূহ হবে যেসবের নিম্নদেশে ঝরণাধারাসমূহ প্রবহমান হয়ে থাকবে, যাতে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই হলো বড় সাফল্য। সেদিন মুনাফিক পুরুষ ও স্ত্রীলোকদের অবস্থা এই হবে যে, তারা মু'মিন লোকদেরকে বলবে: আমাদের দিকেও একটু দেখ, যেন আমরা তোমাদের আলো থেকে কিছুটা উপকার লাভ করতে পারি। কিন্তু তাদেরকে বলা হবে: পিছনে সরে যাও, অন্য কোথাও থেকে নিজেদের জন্য নূর সন্ধান করে নাও। অতপর তাদের মাঝে একটি প্রাচীরের আড়াল দাঁড় করিয়ে দেয়া হবে, যাতে একটা দুয়ার থাকবে। সেই দুয়ারের ভিতরে রহমত থাকবে এবং বাইরে থাকবে আযাব।"

📘 কুরআনে আকা আখিরাতের ছবি > 📄 জান্নাত

📄 জান্নাত


'জান্নাত' শব্দটি আল্লাহ তাআলার ব্যবহৃত একটি শব্দ বা পরিভাষা।
জান্নাত বলতে এমন জায়গাকে বুঝায় যা অনুপম সুখ-শান্তি ও ভোগ বিলাসের জায়গা, যার পরিপূর্ণ বর্ণনা দেয়া কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এ জায়গাটি আখিরাতের জগতে আল্লাহ পাক দুনিয়ায় তাঁর অনুগত নির্দেশিত পথে চলার লোকদের জন্য তৈরি করে রেখেছেন।
হাশরের ময়দানে আদালতের হিসাব-নিকাশ চূড়ান্ত হয়ে যাবার পর যারা তাদের আমলনামা ডান হাতে পাবে তারা চোখের পলকে পুলসিরাত পার হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এ জান্নাত মু'মিনদের স্থায়ী নিবাস। এ স্থায়ী নিবাস তথা জান্নাতে তারা হাসি-খুশী, আনন্দ আহলাদে থাকবে।
জান্নাতের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ সূরা আল বাকারার ২৫ আয়াতে বলেছেন:
وَبَشِّرِ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ أَنَّ لَهُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ ، كُلَّمَا رُزِقُوا مِنْهَا مِنْ ثَمَرَةٍ رِزْقًا ، قَالُوا هَذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِنْ قَبْلُ ، وَأَتُوا بِهِ مُتَشَابِهَا ، وَلَهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُّطَهَّرَةٌ ، وَهُمْ فِيهَا خَلِدُونَ )
"এবং হে নবী! যারা এ কিতাবের প্রতি ঈমান আনে এবং নিজেদের কাজকর্ম সংশোধন করে নেয়, তাদের এ সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য এমন সব বাগিচা নির্দিষ্ট রয়েছে, যেগুলোর নিম্নদেশ থেকে ঝরণাধারা প্রবাহিত থাকবে। এসব বাগীচার ফল বাহ্যত দেখতে পৃথিবীর ফল-সমূহের মতোই হবে। যখনই কোনো ফল তাদের খেতে দেয়া হবে, তখনই তারা বলে উঠবে: এ ধরনের ফলই ইতিপূর্বে পৃথিবীতে আমাদেরকে দেয়া হতো। তাদের জন্য তথায় পবিত্রা স্ত্রী হবে এবং তারা সেখানে চিরদিন থাকবে।"
সূরা আলে ইমরানের ১৫ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خَلِدِينَ فِيهَا وَأَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ ، وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِةُ
"যারা তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করবে তাদের জন্য আল্লাহর নিকট বাগ-বাগিচা রয়েছে। যার পাদদেশ থেকে ঝরণাধারা প্রবাহিত হয়। সেখানে তারা চিরন্তন জীবন লাভ করবে, পবিত্র রমণীগণ তাদের সাথী হবে। আল্লাহর সন্তোষ লাভ করে তারা ধন্য হবে। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাঁর বান্দাদের ওপর গভীর দৃষ্টি রাখেন।"
সূরা আলে ইমরানের ১৩৩ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَوتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ
"সেই পথে তীব্র গতিতে চলো যা তোমাদের আল্লাহর ক্ষমা এবং আকাশ ও পৃথিবীর সমান প্রশস্ত জান্নাতের দিকে চলে গেছে। যা সেই আল্লাহভীরু লোকদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।"
সূরা আলে ইমরানের ১৩৬ আয়াতে আছে:
أولَئِكَ جَزَاؤُهُمْ مَّغْفِرَةً مِّنْ رَّبِّهِمْ وَجَنَّتُ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَرُ خَلِدِينَ فِيهَا ، وَنِعْمَ أَجْرُ الْعُمِلِينَ هُ
"এ ধরনের লোকদের প্রতিফল তাদের আল্লাহর কাছে নির্দিষ্ট রয়েছে। তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন এবং এমন বাগানে তাদেরকে প্রবেশ করাবেন যার তলদেশ দিয়ে ঝরণাধারা প্রবাহিত হয় এবং সেখানে তারা চিরদিন থাকবে। নেক কাজ যারা করে তাদের জন্য কত সুন্দর প্রতিফলই না রয়েছে।"
সূরা আলে ইমরানের ১৯৮ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
لكِنِ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهِمْ لَهُمْ جَنَّتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خَلِدِينَ فِيهَا نُزُلًا مِّنْ عِنْدِ اللَّهِ ، وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ لِلْأَبْرَارِه
"পক্ষান্তরে যারা আল্লাহকে ভয় করে জীবনযাপন করে তাদের জন্য এমন বাগিচা নির্দিষ্ট রয়েছে যার নিম্নদেশ থেকে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হচ্ছে; সেখানে তারা চিরদিন থাকবে। আল্লাহর নিকট থেকে মেহমানদারীর এটাই সরঞ্জাম তাদেরই জন্য, আর আল্লাহর কাছে যাকিছু আছে নেক লোকদের পক্ষে তাই উত্তম জিনিস।"
সূরা আন নিসার ১৩ আয়াতে তিনি বলেছেন:
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خَلِدِينَ فِيهَا ، وَذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ .
“যে লোক আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে তাকে আল্লাহ এমন বাগিচায় দাখিল করাবেন যার নিম্নদেশ থেকে ঝরণাধারা প্রবাহিত হতে থাকবে এবং এ বাগিচায় সে চিরদিন বসবাস করবে। আর এটাই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে বিরাট সাফল্য।"
সূরা আন নিসার ৫৭ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ سَنُدْخِلُهُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ، لَهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ : وَنُدْخِلُهُمْ ظِلا ظليلاه
"আর যারা আমার আয়াত মেনে নিয়েছে এবং নেক কাজ করেছে তাদেরকে আমরা এমন বাগিচায় প্রবেশ করাবো, যার তলদেশে ঝর্ণাধারা প্রবহমান থাকবে। সেখানে তারা চিরদিন থাকবে। সেখানে পবিত্রা রমণী পাবে এবং তাদেরকে আমি ঘন ছায়ার আশ্রয় দান করবো।"
সূরা আন নিসার ১২২ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ سَنُدْخِلُهُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ، وَعْدَ اللَّهِ حَقًّا ، وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلاً
"পক্ষান্তরে যারা ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে, তাদেরকে আমরা এমন বাগিচায় স্থান দান করবো যার তলদেশে ঝরণাধারা প্রবহমান হবে এবং তারা তথায় চিরদিন অবস্থান করবে। বস্তুত এটা আল্লাহর সত্য প্রতিশ্রুতি এবং আল্লাহ অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী আর কে হতে পারে?"
আল্লাহ সূরা আল মায়েদার ১২ আয়াতে বলেছেন:
وَلَأُدْخِلَنَّكُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ ، فَمَنْ كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ مِنْكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيْلِ
"তাদেরকে এমনসব বাগিচায় বসবাস করাবো যার তলদেশ থেকে ঝরণাধারাসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে। কিন্তু তারপর তোমাদের মধ্য থেকে যারা কুফরীর পথ অবলম্বন করেছে তারা সত্য-সঠিক পথ হারিয়ে ফেলেছে।"
সূরা আত তাওবার ২১-২২ আয়াতে বলেছেন:
يُبَشِّرُهُمْ رَبُّهُمْ بِرَحْمَةٍ مِّنْهُ وَرِضْوَانٍ وَجَنَّتٍ لَّهُمْ فِيهَا نَعِيمٌ مُّقِيمٌ خُلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ .
"তাদের রব তাদেরকে নিজের রহমত ও সন্তোষ এবং এমন জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছেন, যেখানে তাদের জন্য চিরস্থায়ী সুখের সামগ্রী সুবিন্যস্ত রয়েছে।"
সূরা আত তাওবার ৮৯ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
"আল্লাহ তাদের জন্য এমন উদ্যান রচনা করে রেখেছেন যার তলদেশ থেকে নদ-নদী সতত প্রবহমান। এখানে তারা চিরদিন থাকবে। আর এটা বস্তুতই বিরাট সাফল্য।"
সূরা ইউনুসের ৯-১০ আয়াতে বলা হয়েছে:
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ يَهْدِيهِمْ رَبُّهُمْ بِإِيْمَانِهِمْ ، تَجْرِي مِنْ تَحْتِهِمُ الْأَنْهُرُ فِي جَنَّتِ النَّعِيمِ دَعْوهُمْ فِيهَا سُبْحْنَكَ اللَّهُمَّ وَتَحِيَّتُهُمْ فِيهَا سَلْمٌ ، وَاخِرُ دَعْوهُمْ أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ :
"আর এটা সত্য যে, যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করতে মশগুল রয়েছে। তাদেরকে তাদের আল্লাহ তাদের ঈমানের কারণে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন। নিয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাতে, তাদের তলদেশ দিয়ে নদ-নদী প্রবহমান হবে। সেখানে তাদের ধ্বনি হবে এই: পবিত্র তুমি হে আল্লাহ! তাদের দোআ হবে শান্তি বর্ষিত হোক। আর তাদের সকল কথার সমাপ্তি হবে একথা: সমস্ত তা'রীফ-প্রশংসা রব্বুল আলামীন আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট।"
সূরা আর রা'দের ২৩-২৪ আয়াতে তিনি বলেছেন:
جَنَّتُ عَدْنٍ يَدْخُلُوْنَهَا وَمَنْ صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّتِهِمْ وَالْمَلَئِكَةُ يَدْخُلُوْنَ عَلَيْهِمْ مِّنْ كُلِّ بَابٍ ، سَلَامٌ عَلَيْكُمْ بِمَا صَبَرْتُمْ فَنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِهِ
"এমন বাগ-বাগিচা, যা তাদের জন্য চিরদিনের বসবাসের জায়গা হবে। তারা নিজেরাও তাতে প্রবেশ করবে, আর তাদের বাপ-দাদা, তাদের স্ত্রী এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে যারা নেক ও সৎ তারাও তাদের সাথে সেখানে যাবে। ফেরেশতাগণ চারদিক থেকে তাদের সম্বর্ধনার জন্য আসবে। এবং তাদের বলবে : তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক তোমরা দুনিয়ায় যেভাবে ধৈর্য অবলম্বন করেছিলে, তার দরুন আজ তোমরা এর অধিকারী হয়েছো। কাজেই কতোই না উত্তম পরকালের এ ঘর।"
সূরা আর রা'দের ৩৫ আয়াতে বলেছেন:
مَثَلُ الْجَنَّةِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُوْنَ ، تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ ، أَكُلُهَا دَائِمُ وَظِلُّهَا ، تِلْكَ عُقْبَى الَّذِينَ اتَّقَوْا وَ وَعُقْبَى الْكَفِرِيْنَ النَّارُهُ
"আল্লাহভীরু লোকদের জন্য যে জান্নাতের ওয়াদা করা হয়েছে তার পরিচয় এই যে, তার তলদেশ থেকে নদ-নদী প্রবাহিত হচ্ছে! তার ফল ফলাদি চিরন্তনের এবং তার ছায়া অবিনশ্বর। এটা মুত্তাকী লোকদের পরিণাম। আর সত্য অমান্যকারীদের পরিণতি এই যে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন।"
সূরা আন নাহলের ৩১ আয়াতে বলেছেন:
جَنَّتُ عَدْنٍ يَدْخُلُوْنَهَا تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ لَهُمْ فِيهَا مَا يَشَاءُوْنَ . كَذَلِكَ يَجْزِي اللَّهُ الْمُتَّقِينَ
"চিরদিন অবস্থানের সব বাগ-বাগিচা, তাতে তারা প্রবেশ করবে। নীচ দিয়ে নদ-নদী প্রবাহিত হবে। আর সবকিছু সেখানে ঠিক তাদের মনোবাঞ্ছা অনুযায়ীই সংঘটিত হবে। এ প্রতিফল দেন আল্লাহ মুত্তাকী লোকদেরকে।"
সূরা আল কাহফের ৩১ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
أُولَئِكَ لَهُمْ جَنَّتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهِمُ الْأَنْهُرُ يُحَلَّوْنَ فِيْهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِنْ ذَهَبٍ وَيَلْبَسُونَ ثِيَابًا خُضْرًا مِّنْ سُنْدُسٍ وَاسْتَبْرَقٍ مُتَّكِئِينَ فِيهَا عَلَى الْأَرَائِكَ ، نِعْمَ الثَّوَابُ ، وَحَسَنَتْ مُرْتَفَقًا "তাদের জন্য চির সবুজ চির শ্যামল জান্নাত রয়েছে যার নিম্নদেশ থেকে ঝরণাধারা সদা প্রবহমান থাকবে। সেখানে তাদেরকে স্বর্ণের কংকন দ্বারা অলংকৃত করা হবে। সূক্ষ্ম ও গাঢ় রেশমের সবুজ পোশাক তারা পরিধান করবে। এবং উচ্চ মসনদের ওপর তারা ঠেস লাগিয়ে বসবে। আর এটা অতি উত্তম কর্মফল ও উঁচুদরের অবস্থিতির স্থান।"
সূরা মারইয়ামের ৬২ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
لا يَسْمَعُوْنَ فِيْهَا لَغْوًا إِلَّا سَلَمًا ، وَلَهُمْ رِزْقُهُمْ فِيهَا بُكْرَةً وَعَشِيًّا .
"সেখানে তারা কোনো বেহুদা কথা শুনবে না। যাকিছু শুনবে ঠিকই শুনবে। আর তাদের রিষ্ক তারা নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যা লাভ করতে থাকবে।"
সূরা আল হজ্জের ১৪ ও ২৩ আয়াতে বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ يُدْخِلُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُه "যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে আল্লাহ তাদেরকে নিসন্দেহে এমন জান্নাতে দাখিল করবেন যার নীচে ঝরণাধারা প্রবহমান থাকবে। আল্লাহ তাই করেন যা তিনি ইচ্ছা করেন।"
إِنَّ اللَّهَ يُدْخِلُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ جَنَّتِ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِنْ ذَهَبٍ وَلُؤْلُؤًا ، وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرُهُ "যেসব লোক ঈমান এনেছে এবং যারা নেক আমল করেছে তাদেরকে আল্লাহ এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যে সবের নীচে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হবে যেখানে তাদেরকে সোনার কংকন ও মতির মালা দ্বারা ভূষিত করা হবে। আর তাদের পোশাক হবে রেশমের।"
সূরা আল ফুরকানের ১০ আয়াতে আছেঃ
تَبْرَكَ الَّذِي إِنْ شَاءَ جَعَلَ لَكَ خَيْرًا مِنْ ذَلِكَ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهرُ ، وَيَجْعَلْ لَّكَ قُصُورًا
"বরকতওয়ালা তিনি যিনি চাইলে তাদের প্রস্তাবিত জিনিসগুলোর অপেক্ষাও অধিক কল্যাণময় জিনিস তোমাকে দিতে পারেন। অসংখ্য বাগ-বাগিচাও দিতে পারেন, যার নীচে দিয়ে ঝরণাধারা প্রবাহিত হয়, আর দিতে পারেন, তোমাকে বড় বড় প্রাসাদ।"
সূরা আল ফুরকানের ৭৫ আয়াতে বলেছেন:
وَيُلَقَّوْنَ فِيْهَا تَحِيَّةً وَسَلْمًا .
"সাদর সম্ভাষণ ও শুভ সম্বোধন সহকারে তাদের সম্বর্ধনা হবে।"
সূরা আল ফাতিরের ৩৩-৩৫ আয়াতে বলেছেন:
جَنَّتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِنْ ذَهَبٍ وَلُؤْلُؤًا : وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرٌ وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَذْهَبَ عَنَّا الْحَزَنَ ، إِنَّ رَبَّنَا لَغَفُورٌ شَكُورٌ مِّنِ الَّذِي أَحَلَّنَا دَارَ الْمُقَامَةِ مِنْ فَضْلِهِ : لَا يَمَسُّنَا فِيهَا نَصَبٌ وَلَا يَمَسُّنَا فِيهَا لُغُوْب
"চিরকালীন জান্নাতে-যাতে এরা প্রবেশ করবে সেখানে তাদেরকে স্বর্ণের কংকন এবং মণি-মুক্তায় সজ্জিত করা হবে। সেখানে তাদের পোশাক হবে রেশমের। আর তারা বলবে: শোকর সেই আল্লাহর, যিনি আমাদের দুশ্চিন্তা দূর করে দিয়েছেন। আমাদের রব নিশ্চিতই ক্ষমাদানকারী এবং গুণগ্রাহী। যিনি আমাদেরকে নিজের অনুগ্রহে চিরন্তন বসবাসের জায়গায় এনে দিয়েছেন। এখন এখানে আমাদের না কোনো কষ্ট হচ্ছে, আর না ক্লান্তি লাগছে।”
সূরা ইয়াসীনের ৫৫-৫৮ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
إِنَّ أَصْحَبَ الْجَنَّةِ الْيَوْمَ فِي شُغُلٍ فَكِهُونَ هُمْ وَأَزْوَاجُهُمْ فِي ظُلْلٍ على الأَرَائِكِ مُتَّكِنُونَ لَهُمْ فِيهَا فَاكِهَةٌ وَلَهُمْ مَّا يَدْعُوْنَهُ سَلَّمَ قَف قَوْلاً مِّنْ رَّبِّ رَّحِيمٍ
"আজ জান্নাতী লোকেরা মজা গ্রহণের কাজে মশগুল হয়ে রয়েছে। তারা এবং তাদের স্ত্রীরা ঘন সন্নিবেশিত ছায়ার মধ্যে আসনসমূহের ওপর ঠেস লাগিয়ে রয়েছে। সব রকমের সুস্বাদু খাদ্য ও পানীয় তাদের জন্য সেখানে মওজুদ রয়েছে। তারা যাকিছুই চাইবে, তাই তাদের জন্য রয়েছে। দয়াময় আল্লাহর তরফ থেকে তাদেরকে সালাম বলা হয়েছে।"
সূরা আস সাফফাতের ৪১-৫০ আয়াতে তিনি বলেছেন:
أُولَئِكَ لَهُمْ رِزْقٌ مَّعْلُومٌ ، فَوَاكِهُ ، وَهُمْ مُّكْرَمُوْنَ فِي جَنَّتِ النَّعِيمِ عَلَى سُرُرٍ مُّتَقْبِلِيْنَ يُطَافُ عَلَيْهِمْ بِكَأْسٍ مَّنْ مِعِينَهُ بَيْضَاءَ لَذَّةٍ للشَّرِبِينَ الآفِيْهَا غَوْلٌ وَلَاهُمْ عَنْهَا يُنْزَفُوْنَ وَعِنْدَهُمْ قُصِرْتُ الطَّرْفِ عِيْنَهُ كَأَنَّهُنَّ بَيْضٌ مَكْنُونٌ فَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ يُتَسَاءَلُونَ
"তাদের জন্য জানা-বুঝা রিস্ক রয়েছে, সর্বপ্রকার সুস্বাদু দ্রব্যাদি এবং নেয়ামতে ভরা জান্নাত-যাতে তারা সম্মান সহকারে বসবাস করবে। আসনে মুখোমুখি আসীন হবে। শরাবের ঝরণাসমূহ হতে পানপাত্র পূর্ণ করে তাদের মধ্যে ঘুরানো হবে। তা উজ্জ্বল পানীয় পানকারীদের জন্য সুপেয় সুস্বাদু। না তাদের দেহে তার দরুন কোনো ক্ষতি হবে, না তাদের জ্ঞান বুদ্ধি নষ্ট হয়ে যাবে। তাদের নিকট দৃষ্টি সংরক্ষণকারী, সুন্দর চক্ষু বিশিষ্ট নারীগণ হবে। এমন স্বচ্ছ, যেমন ডিমের খোসার নীচে লুকানো ঝিল্লি। পরে তারা পরস্পরের দিকে মুখ ফিরিয়ে একে অপরের অবস্থা জিজ্ঞেস করবে।"
সূরা আস সোয়াদের ৫১-৫৪ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
مُتَّكِئِينَ فِيهَا يَدْعُوْنَ فِيْهَا بِفَاكِهَةٍ كَثِيرَةٍ وَشَرَابٍ وَعِنْدَهُمْ قُصِرْتُ الطَّرْفِ أَتْرَابُ هَذَا مَا تُوعَدُونَ لِيَوْمِ الْحِسَابِهِ إِنَّ هَذَا لَرِزْقُنَا مَالَهُ مِنْ نَّفَادِهُ
"তাতে তারা হেলান দিয়ে আসীন হয়ে থাকবে। প্রচুর ফল ও পানীয় চেয়ে পাঠাবে। আর তাদের নিকট লজ্জাবনত সমবয়স্কা স্ত্রী থাকবে। এসব জিনিস এমন যা হিসাবের দিন দান করার জন্য তোমাদের
নিকট ওয়াদা করা যাচ্ছে। এটা আমাদের দেয়া রিস্ক, এটা কখনই ফুরিয়ে যাবে না।"
সূরা আয যুমারের ২০ আয়াতে বলেছেন:
لَكِنِ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ لَهُمْ غُرَفٌ مِّنْ فَوْقِهَا غُرَفٌ مَّبْنِيَّةٌ لَا تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ وَعْدَ اللَّهِ لَا يُخْلِفُ اللَّهُ الْمِيعَادَه
"অবশ্য যারা নিজেদের আল্লাহকে ভয় করে চলে, তাদের জন্য উচ্চ ইমারত রয়েছে মনযিলের পর মনযিল বানানো, যেগুলোর নীচে ঝর্ণাধারা প্রবহমান হয়ে থাকবে। এটা আল্লাহর ওয়াদা। আল্লাহ কখনো নিজের করা ওয়াদার খেলাফ কাজ করেন না।"
সূরা আয যুখরূফের ৭১ আয়াতে বলেছেন:
يُطَافُ عَلَيْهِمْ بِصِحَافٍ مِنْ ذَهَبٍ وَأَكْوَابٍ وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيْهِ الْأَنْفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ وَأَنْتُمْ فِيهَا خَلِدُونَ
"তাদের সামনে সোনার থালা ও পানপাত্র আবর্তিত হবে, মন ভুলানো ও চোখের আস্বাদের জিনিসসমূহ সেখানে বর্তমান থাকবে। তাদেরকে বলা হবে: এখন তোমরা চিরদিন এখানেই থাকবে।"
সূরা আয যুখরূফের ৭৩ আয়াতে বলেছেন:
لَكُمْ فِيهَا فَاكِهَةٌ كَثِيرَةٌ مِّنْهَا تَأْكُلُونَ
"তোমাদের জন্য এখানে বিপুল ফল-ফলাদি রয়েছে, যা তোমরা খাবে।"
সূরা আদ দুখানের ৫১-৫৬ আয়াতে বলা হয়েছে:
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامِ أَمِينِ فِي جَنَّتَ وَعُيُونٍ يَلْبَسُونَ مِنْ سُنْدُسٍ وَاسْتَبْرَقٍ مُتَقْبِلِينَهُ كَذَلِكَ وَزَوَّجْنُهُمْ بِحُورٍ عَيْنٍ يَدْعُوْنَ فِيْهَا بِكُلِّ فَاكِهَةٍ أَمِنِيْنَهُ لاَ يَذُوقُوْنَ فِيهَا الْمَوْتَ إِلَّا الْمَوْتَةَ الْأُولَى وَوَقَهُمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ
"আল্লাহভীরু লোকেরা নিরাপদ স্থানে হবে, বাগ-বাগিচা ও ঝর্ণাধারার মধ্যে, পাতলা রেশমী ও মোটা রেশমী পোশাক পরিহিত, সামনা-সামনি
আসীন। এটাই হবে তাদের জাঁকজমক। আর আমরা সুন্দরী রূপসী ও হরিণ নয়না নারীদেরকে তাদের স্ত্রী বানিয়ে দিবো। সেখানে তারা পূর্ণ নিশ্চিন্ততায় সর্বপ্রকারের স্বাদপূর্ণ জিনিসসমূহ পেতে চাইবে। সেখানে মৃত্যুর স্বাদ তারা কখনই আস্বাদন করবে না। দুনিয়ায় একবার যে মৃত্যু তাদের হয়ে গেছে, তা হয়ে গেছে। তাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করবেন।"
সূরা মুহাম্মাদের ১৫ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
مَثَلُ الْجَنَّةِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُوْنَ ، فِيهَا أَنْهَرٌ مِّنْ مَّاءٍ غَيْرِ أَسِنٍ ، وَأَنْهُرُ مِنْ لَّبَن لَّمْ يَتَغَيَّرْ طَعْمُهُ ، وَأَنْهُرٌ مِّنْ خَمْرٍ لَذَّةٍ لِلشَّرِبِينَ ، وَأَنْهُرٌ مِّنْ عَسَلٍ مُصَفَّى ، وَلَهُمْ فِيهَا مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَمَغْفِرَةٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ ، كَمَنْ هُوَ خَالِدٌ فِي النَّارِ وَسُقُوْا مَاءً جَمِيمًا فَقَطَّعَ أَمْعَاءَ هُمْ
"মুত্তাকী লোকদের জন্য যে জান্নাতের ওয়াদা করা হয়েছিল, তার পরিচয়তো এই যে, তাতে ঝরণাধারা প্রবহমান হয়ে থাকবে স্বচ্ছ সুমিষ্ট পানির। ঝরণাধারা প্রবহমান থাকবে এমন দুধের যা কখনও বিস্বাদ হবে না। ঝরণাধারা প্রবহমান থাকবে এমন পানীয়ের যা পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুপেয় হবে। ঝরণাধারা প্রবহমান হবে স্বচ্ছ পরিচ্ছন্ন মধুর। সেখানে তাদের জন্য সর্বপ্রকারের ফল থাকবে এবং তাদের আল্লাহর কাছ থেকে থাকবে ক্ষমা। সেই লোকদের মতো হতে পারে যারা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে এবং তাদেরকে এমন উত্তপ্ত পানি পান করানো হবে যা তাদের অন্ত্র পর্যন্ত কেটে দিবে।”
সূরা আত তূরের ১৭-২৭ আয়াতে বলেছেন:
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّتِ وَنَعِيمِ فَكِهِينَ بِمَا آتَهُمْ رَبُّهُمْ ، وَوَقَهُمْ رَبُّهُمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ مُتَّكِئِينَ عَلَى سُرُرٍ مَّصْفُوفَةٍ ، وَزَوَّجْنُهُمْ بِحُورٍ عِيْنٍ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيْمَانِ الْحَقْنَابِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنُهُمْ مِّنْ عَمَلِهِمْ مِّنْ شَيْءٍ ط كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينَ وَأَمْدَدْنُهُمْ بِفَاكِهَةٍ وَلَحْمٍ مِّمَّا يَشْتَهُونَ
يَتَنَازَعُونَ فِيهَا كَأْسًا لا لغو فِيْهَا وَلَا تَأْثِيمٌ وَيَطُوفُ عَلَيْمْ غِلْمَانٌ لَّهُمْ كَأَنَّهُمْ لُؤْلُؤُ مَكْنُونٌ وَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ يَتَسَاءَ لُوْنَ قَالُوا إِنَّا كُنَّا قَبْلُ فِى أَهْلِنَا مُشْفِقِينَ فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقْنَا عَذَابَ السموم .
"মুত্তাকী লোকেরা সেখানে বাগানসমূহে ও নিয়ামত-সম্ভারের মধ্যে অবস্থিত হবে, মজা নিতে ও স্বাদ আস্বাদন করতে থাকবে সেইসব জিনিস থেকে যা তাদের আল্লাহ তাদেরকে দিবেন। আর তাদের আল্লাহ তাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করবেন। তাদেরকে বলা হবে খাও ও পান করো স্বাদ ও মজা সহকারে, তোমাদের সেইসব কাজের প্রতিফলরূপে যা তোমরা করেছিলে। তারা সামনাসামনি বসানো আসনসমূহে ঠেস লাগিয়ে বসবে। আর আমরা সুলোচনা হুরদেরকে তাদের সাথে বিবাহ দিবো। যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তানরাও ঈমানের কোনো এক মাত্রায় তাদের পদাংক অনুসরণ করেছে; তাদের সেই সন্তানদেরকেও আমরা জান্নাতে তাদের সাথে একত্রিত করবো, আর তাদের আমলে কোনো হ্রাস করবো না। প্রত্যেক ব্যক্তি স্বীয় উপার্জনের বিনিময়ে গচ্ছিত রাখা আছে। আমরা তাদেরকে সর্বপ্রকারের ফল ও গোশত-যে জিনিসই তাদের মন চাইবে-খুব বেশী বেশী দিয়ে যেতে থাকবো। তারা পানপাত্র পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এগিয়ে এগিয়ে গ্রহণ করতে থাকবে। সেখানে কোনোরূপ হল্লা কোলাহল বা চরিত্রহীন হতে পারবে না। আর তাদের সেবাযত্নে সেইসব বালক দৌড়াদৌড়িতে নিযুক্ত থাকবে যারা কেবলমাত্র তাদের জন্যই হবে। এরা এমন সুন্দর সুশ্রী, যেমন লুকিয়ে রাখা মুক্তা। এরা পারস্পরিকভাবে একে অপরের কাছে দুনিয়ায় অতিবাহিত হয়ে যাওয়া অবস্থা জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তারা বলবে যে, আমরা এর পূর্বে নিজেদের ঘরের লোকদের মধ্যে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় জীবনযাপন করছিলাম, শেষে আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করলেন এবং আমাদেরকে ঝলসিয়ে দেয়া বাতাসের আযাব হতে রক্ষা করলেন।"
সূরা আল কামারের ৫৪-৫৫ আয়াতে বলা হয়েছে-
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّتٍ وَنَهَرِهُ فِي مَقْعَدِ صِدْقٍ عِنْدَ مَلَيْكَ مُّقْتَدِرٍ
"আল্লাহর নাফরমানী থেকে বিরত থাকা লোকেরা নিশ্চিতরূপেই বাগানসমূহ ও ঝরণাসমূহের মধ্যে হবে; প্রকৃত সম্মান মর্যাদার স্থানে, মহাশক্তির সম্রাটের নিকট।"
সূরা আর রহমানের ৪৬-৫৮ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন- (বেজোড় আয়াত ছাড়া)
وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَنِ ذَوَاتَا أَفْنَانٍ إِنَّ فِيْهِمَا عَيْنِ تَجْرِينِ فِيهِمَا مِنْ كُلِّ فَاكِهَةٍ زَوْجُنِ مُتَّكِسْنَ عَلَى فُرُشٍ بَطَائِنُهَا مِنْ اسْتَبْرَقٍ وَجَنَا الْجَنَّتَيْنِ دَانِ فِيهِنَّ قَصِرْتُ الطَّرْفِ لَمْ يَطْمِتُهُنَّ إِنْسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ كَأَنَّهُنَّ الْيَاقُوتُ وَالْمَرْجَانُ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبْنُ
"আর আল্লাহর সামনে পেশ হবার ভয় পোষণ করে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই দুখানি বাগান রয়েছে। সবুজ সতেজ ডাল-পালায় ভরপুর। দুটি বাগানে দুই ধারা সদা প্রবহমান। উভয় বাগানে প্রত্যেকটি ফলের দুটি রকম হবে। জান্নাতী লোকেরা এমন শয্যার উপর ঠেস লাগিয়ে বসে থাকবে যার আস্তরণ মোটা রেশমের তৈরি হবে। আর বাগানের ডালপালা ফলের ভারে ঝুঁকে পড়া থাকবে। এ নিয়ামতের মধ্যে লজ্জাবনত নয়না ললনারাও থাকবে-তাদেরকে এ জান্নাতী লোকদের পূর্বে কোনো মানুষ বা জিন স্পর্শও করেনি। তারা এমনই সুন্দরী রূপসী যেমন হীরা ও মুক্তা। অতএব তোমরা তোমাদের আল্লাহর কোন্ কোন্ নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?"
সূরা আর রাহমানের ৬২-৭৬ আয়াতে বলেছেন (বেজোড় আয়াত ছাড়া)
وَمِنْ دُونِهِمَا جَنَّتْنِ مُنْهَا مَتْنِ فِيهِمَا عَيْنِ نَضَاخَتْنِ فِيهِمَا فَاكِهَةٌ وَنَخْلُ ورُمَّانَ : فِيهِنَّ خَيْرَتٌ حِسَانٌ حُورٌ مَقْصُورَت فِي الْخِيَامِ لَمْ يَطْمِثْهُنَّ انْسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ مُتَّكِئِينَ عَلَى رَفْرَفٍ خُضْرٍ وَعَبْقَرِي حِسَانٍ *
"আর সেই দুটি বাগান ছাড়াও আরও দুটি বাগান হবে। ঘন সন্নিবেশিত সবুজ-শ্যামল সতেজ বাগান। দুটি বাগানে দুই ধারা ঝরণার মতো উৎক্ষিপ্তমান। তাতে বিপুল পরিমাণ ফল, খেজুর ও ডালিম থাকবে। এসব নিয়ামতের মধ্যেই থাকবে সচ্চরিত্রবান ও সুদর্শনা স্ত্রীগণ। তাঁবুসমূহের মধ্যে সুরক্ষিত হুরগণও হবে। এ জান্নাতী লোকদের পূর্বে কেউ কোনো
মানুষ বা জিন তাদেরকে স্পর্শও করেনি। এ জান্নাতবাসী লোকগণ সবুজ গালিচা এবং সুন্দর ও অমূল্য চাদরের উপর ঠেস লাগিয়ে বসবে।”
সূরা ওয়াকেয়ার ১৫-২৬ আয়াতে বলেছেন-
عَلَى سُرُرٍ مَّوْضُونَةٍ مُتَّكِئِينَ عَلَيْهَا مُتَقْبِلِينَ يَطُوفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُّخَلَّدُونَ ، بِأَكْوَابٍ وَآبَارِيقَ ، وَكَأْسٍ مِّنْ مَّعِينٍ هُ لا يُصَدَّعُوْنَ عَنْهَا وَلَا يُنْزِفُونَهُ وَفَاكِهَةٍ مِّمَّا يَتَخَيَّرُونَهُ وَلَحْمٍ طَيْرٍ مِّمَّا يَشْتَهُونَهُ وَحُورٌ عيْنُهُ كَامْثَالِ اللُّؤْلُؤِ الْمَكْنُونِ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ لَا يَسْمَعُونَ فِيهَا لَغْوًا وَلَا تَأْثِيْمَاهُ إِلَّا قِيلًا سَلْمًا سَلَمًا
"মণিমুক্তা খচিত আসনসমূহের ওপর হেলান দিয়ে মুখোমুখি হয়ে বসবে। তাদের মজলিসে চিরকিশোররা বহমান ঝরণার সুরায় ভরা পানপাত্র ও হাতলধারী সুরাপাত্র, হাতলবিহীন সুরা পাত্র নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকবে। তা পান করায় তাদের মাথা ঘুরবে না, তাদের বিবেক-বুদ্ধিও লোপ পাবে না। আর তারা তাদের সামনে রকমারী সুস্বাদু ফল পেশ করবে। যেন যেটা পসন্দ সেটাই তুলে নিতে পারে। এটা ছাড়া পাখির গোশতও সামনে রাখবে, যেটির গোশত ইচ্ছা হবে নিতে পারবে। আর তাদের জন্য সুনয়না হুরগণও থাকবে। তারা সুশ্রী-সুন্দরী হবে—লুকিয়ে রাখা মুক্তার মতো। এসব কিছুই সেসব আমলের শুভ প্রতিফল স্বরূপ তারা পাবে, যা তারা দুনিয়ার জীবনে করছিলো। সেখানে তারা কোনো বাজে কথা ও পাপের বুলি শুনতে পাবে না। যে কথাবার্তাই হবে, তা ঠিক ঠিক ও যথাযথ কথা হবে।"
সূরা ওয়াকেয়ার ২৮-৩৭ আয়াতে বলেছেন:
فِي سِدْرٍ مَخْضُودٍ وَطَلْحٍ مَنْضُودِ وَظِلَّ مَمْدُودِ وَمَاء مَّسْكُوبٍ وَفَاكِهَةٍ كَثِيرَةٍ َلا مَقْطُوعَةٍ وَلَا مَمْنُوعَةٍ ، وَفُرُشٍ مَّرْفُوعَةٍ إِنَّا أَنْشَأْنُهُنَّ إِنْشَاءُ هُ فَجَعَلْنَهُنَّ أَبْكَارًاهُ عُرُبًا أَتْرَابًا هُ
"তারা কাঁটাহীন কুল বৃক্ষসমূহ, থরে থরে সাজানো কলাসমূহ, বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্যাপী ছায়া, সর্বদা প্রবহমান পানি, শেষহীন অবারিত ও বপুল পরিমাণে পাওয়া যাবে এমন ফল, এবং উচ্চ আসন কেন্দ্রসমূহে অবস্থিত
হবে। তাদের স্ত্রীগণকে আমরা বিশেষভাবে সম্পূর্ণ নতুন করে সৃষ্টি করবো এবং তাদেরকে কুমারী বানিয়ে দিবো। নিজেদের স্বামীদের প্রতি আসক্ত এবং বয়সে সমকক্ষ।"
সূরা আল হাদীদের ২১ আয়াতে বলেছেন:
سَابِقُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا كَعَرْضِ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أُعِدَّتْ لِلَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ
"দৌড়াও ও একে অপর থেকে অগ্রসর হয়ে মেতে চেষ্টা করো, তোমাদের আল্লাহর ক্ষমা এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিশালতা ও বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর ন্যায়, যা প্রস্তুত করা হয়েছে সেই লোকদের জন্য যারা আল্লাহ এবং তাঁর রসূলগণের প্রতি ঈমান এনেছে। এটা একান্তভাবে আল্লাহর অনুগ্রহ বিশেষ। এটা তিনি যাকে চান দান করেন। আর আল্লাহই বড়ই অনুগ্রহশীল।"
সূরা আল হাক্কার ২২-২৪ আয়াতে বলেছেন:
فِي جَنَّةٍ عَالِيَةٍ ( قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا بِمَا أَسْلَفْتُمْ فِي الْأَيَّامِ الْخَالِيَةِ ..
"উচ্চতম স্থানের জান্নাতে, যার ফলসমূহের গুচ্ছ ঝুলে থাকবে। স্বাদ নিয়ে নিয়ে খাও, পান করো- তোমাদের সেইসব আমলের বিনিময়ে যা তোমরা অতীত দিনসমূহে করেছো।"
সূরা আদ দাহরের ৫-৬ আয়াতে বলেছেন:
إِنَّ الْأَبْرَارَ يَشْرَبُونَ مِنْ كَأْسٍ كَانَ مِزَاجُهَا كَافُورًا عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللَّهِ يُفَجِّرُونَهَا تَفْجِيرًا
"নেক্কার লোকেরা জান্নাতে শরাবের এমনসব পাত্র পান করবে যার সাথে কপূর সংমিশ্রণ হবে। এটা একটি প্রবহমান ঝরণা হবে, যার পানির সাথে আল্লাহর বান্দারা শরাব পান করবে এবং যেখানে ইচ্ছা অতি সহজেই তার শাখা-প্রশাখা বের করে নিবে।"
সূরা আদ দাহরের ১২-২১ আয়াতে বলেছেন:
وَجَزْلُهُمْ بِمَا صَبَرُوا جَنَّةً وَحَرِيرًا مُّتَّكِئِينَ فِيهَا عَلَى الْأَرَائِكِ ، لَا يَرَوْنَ فِيهَا شَمْسًا وَلَا زَمْهَرِيرًا وَدَانِيَةً عَلَيْهِمْ ظِلْلُهَا وَذُلِّلَتْ قُطُوْفُهَا تَدْلِيلاً وَيُطَافُ عَلَيْهِمْ بِانِيَةٍ مِنْ فِضَّةٍ وَأَكْوَابٍ كَانَتْ قَوَارِيرَاهُ قَوَارِيرًا مِنْ فِضَّةٍ قَدَّرُوهَا تَقْدِيرًا وَيُسْقَوْنَ فِيهَا كَأْسًا كَانَ مِزَاجُهَا زَنْجَبِيلاً ، عَيْنًا فِيْهَا تُسمى سَلْسَبِيْلاً وَيَطُوفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُخَلَّدُونَ إِذَا رَأَيْتَهُمْ حَسِبْتَهُمْ لُؤْلُؤًا مَّنْثُورًا وَإِذَا رَأَيْتَ ثُمَّ رَأَيْتَ نَعِيمًا وَمُلْكًا كَبِيرًا عَلَيْهُمْ ثِيَابُ سُنْدُsٍ خضر واسْتَبْرَقٌ ، وَحُلُّوا أَسَاوِرَ مِنْ فِضَّةٍ ، وَسَقْهُمْ رَبُّهُمْ شَرَابًا طَهُورًا
"আর তাদের ধৈর্য-সহিষ্ণুতার বিনিময়ে তাদেরকে জান্নাত ও রেশমী পোশাক দান করবেন। তথায় তারা উচ্চ আসনসমূহে ঠেশ দিয়ে বসবে। তারাদেরকে না সূর্য তাপ জ্বালাতন করবে, না শীতের প্রকোপ। জান্নাতের ছায়া তাদের উপর অবনত হয়ে থাকবে এবং তার ফলসমূহ সর্বদা তাদের আয়ত্তাধীন থাকবে (তারা ইচ্ছামত তা পাড়তে পারবে।) তাদের সামনে রৌপ্য নির্মিত পাত্র ও কাঁচের পেয়ালা আবর্তিত করানো হবে। সেই কাঁচ যা রৌপ্য জাতীয় হবে এবং সেগুলোকে (জান্নাতের ব্যবস্থাপকরা) পরিমাণ মতো ভর্তি করে রাখবে। তাদেরকে তথায় এমন সূরাপাত্র পান করানো হবে যাতে খুঁটের সংমিশ্রণ থাকবে। এটা হবে জান্নাতের একটি নির্ঝরণী, একে 'সালসাবীল' বলা হয়। তাদের সেবাকাজে এমন সব বালক ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকবে যারা চিরকালই বালক থাকবে। তোমরা তাদেরকে দেখলে মনে করবে, এরা যেন মুক্তা—ছড়িয়ে দেয়া। তথায় যেদিকেই তুমি দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে, শুধু নিয়ামত আর নিয়ামত এবং একটি বিরাট সাম্রাজ্যের সাজ-সরঞ্জাম তুমি দেখতে পাবে। তাদের উপর সূক্ষ্ম রেশমের সবুজ পোশাক, কিংখাব ও মখমলের কাপড় থাকবে। তাদেরকে রৌপ্যের কংকন পরানো হবে এবং তাদেরকে আল্লাহ পবিত্র পরিচ্ছন্ন শরাব পান করাবেন।"
সূরা আল মুরসালাতের ৪১-৪২ আয়াতে বলেছেন:
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي ظِلَلٍ وَعُيُونَهُ وَفَوَاكِهَ مِمَّا يَشْتَهُونَ :
"মুত্তাকী লোকেরা আজ ছায়া ও প্রস্রবনে অবস্থান করছে। তারা যে ফলই চাইবে তাই তাদের সামনে উপস্থিত।”
সূরা আন নাবার ৩২-৩৫ আয়াতে বলেছেন:
حَدَائِقَ وَأَعْنَابًا وَكَوَاعِبَ أَتْرَابًا وَكَأْسًا دِهَاقًا لَا يَسْمَعُونَ فِيهَا لَغْوًا وَلَا كِذَّبًا
"বাগ-বাগিচা, আঙুর, ও নবোদ্ভিন্ন সমবয়স্কা মেয়েরা, এবং উচ্ছ্বসিত পানপাত্র। সেখানে তারা কোনোরূপ অপ্রয়োজনীয়, তাৎপর্যহীন ও মিথ্যা কথা শুনবে না।
সূরা আল মুতাফফিফিনের ২২-২৮ আয়াতে বলেছেন:
إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ عَلَى الْأَرَائِكِ يَنْظُرُونَ تَعْرِفُ فِي وُجُوهِهِمْ نَضْرَةَ النَّعِيمِ يُسْقَوْنَ مِنْ رَّحِيقٍ مَّخْتُومٍ خِتَمُهُ مِسْكُ ، وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ وَمِزَاجُهُ مِنْ تَسْنِيمٍ عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا الْمُقَرَّبُونَ
"নিসন্দেহে নেক লোকেরা অফুরন্ত নিয়ামতের মধ্যে হবে। উচ্চ আসনের ওপর আসীন হয়ে দৃশ্যাবলী দর্শন করতে থাকবে। তাদের মুখাবয়বে তোমরা স্বাচ্ছন্দের ঔজ্জল্য অবলোকন করবে। তাদেরকে উত্তম-উৎকৃষ্ট মুখবন্ধ শরাব পান করানো হবে। তার ওপর মিল্ক এর সিল লাগানো থাকবে। যেসব লোক অন্যান্যদের ওপর প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে চায় তারা যেন এ জিনিস লাভের জন্য প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে চেষ্টা করে। সেই শরাবে তাসনীম মিশ্রিত হবে। এটা একটি ঝর্ণা, তার পানির সাথে নিকটবর্তী লোকেরা শরাব পান করবে।"
সূরা আল গাশিয়া ১০-১৬ আয়াতে বলেছেন:
فِي جَنَّةٍ عَالِيَةٍ لَا تَسْمَعُ فِيهَا لَاغِيَةً فِيهَا عَيْنٌ جَارِيَةٌ فِيهَا سُرُرٌ مَرْفُوعَةٌ وَأَكْوَابٌ مَوْضُوعَةٌ وَنَمَارِقُ مَصْفُوفَةٌ وَزَرَابِيُّ مَبْثُوثَةٌ .
"উন্নত উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন জান্নাতে অবস্থান করবে। কোনো বাজে কথা সেখানে শুনবে না। তথায় ঝরণাধারা প্রবহমান হবে; তাতে উচ্চ
আসনসমূহ থাকবে; পানপাত্রসমূহ সুসজ্জিত হবে; ঠেশ বালিশসমূহ সারিবদ্ধ থাকবে এবং মূল্যবান সুকোমল শয্যা বিছানো থাকবে।"
আট শ্রেণীর জান্নাত
নেক আমলের পার্থক্যে মু'মিনের মর্যাদার যে পার্থক্য হবে সেই হিসাবে জান্নাতেরও স্তর বিন্যাস হবে। সেই স্তর হিসাবে জান্নাতের নাম নিম্নরূপ :
(১) জান্নাতুল ফিরদাউস (২) জান্নাতুন নায়ীম (৩) জান্নাতুল মাওয়া (৪) জান্নাতুল আদন (৫) জান্নাতু দারুস সালাম (৬) জান্নাতু দারুল খুলদ (৭) জান্নাতু দারুল মাকাম (৮) জান্নাতুল ইল্লিয়্যূন।

📘 কুরআনে আকা আখিরাতের ছবি > 📄 জাহান্নাম

📄 জাহান্নাম


কিয়ামত সংঘটিত হবার পর হাশরের ময়দানে বিভিন্ন অবস্থায় মানুষ উপস্থিত হবে। মীযান বা দাঁড়িপাল্লা বানিয়ে নেক ও পাপের হিসাব ঠিক হবার পর আমলনামা যারা বাম হাতে বা পেছন থেকে পাবে তারা চূড়ান্ত ফায়সালায় জাহান্নামে রওয়ানা হবে। পুলসিরাত পার হয়ে যারা জান্নাতে যেতে পারবে না তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। এটাই তাদের স্থায়ী নিবাস। এ নিবাস তথা জাহান্নামের ভয়াবহ দুর্ভাগ্যের জীবন সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআনে যে ছবি এঁকেছেন তা কুরআনের ভাষায়ই শুনুন: সূরা আল হাক্কার ২৫-৩৭ আয়াতে আল্লাহ এর ছবি এভাবে এঁকেছেন:
وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتُبَهُ بِشِمَالِهِ فَيَقُولُ يُلَيْتَنِي لَمْ أُوْتَ كِتَبِيَهُ وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهُ يَلَيْتَهَا كَانَتِ الْقَاضِيَةُ مَا أَغْنَى عَنِّي مَالِيَهُ ۚ هَلَكَ عَنِّي سَلْطَنِيَهُ خُذُوهُ فَغُلُّوهُ ثُمَّ الجَحِيمَ صَلُّوهُ ثُمَّ فِي سِلْسِلَة ذَرْعُهَا سَبْعُوْنَ ذِرَاعًا فَاسْلُكُوْهُهُ إِنَّهُ كَانَ لَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ فَلَيْسَ لَهُ الْيَوْمَ هُهُنَا حَمِيمٌ وَلَا طَعَامُ إِلَّا مِنْ غَسْلِينَهُ لا يَأْكُلُهُ إِلَّا الْخَاطِئُونَ
"আর যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে, সে বলে উঠবে হায়! আমার আমলনামা আমাকে যদি দেয়া না হতো। আর আমার হিসাব কি তা যদি আমি না-ই জানতাম! হায়, আমার মৃত্যুই যদি চূড়ান্ত হতো! আজ আমার ধন-সম্পদ আমার কোনো কাজে আসলো না। আমার সব ক্ষমতা আধিপত্য প্রভুত্ব নিঃশেষ হয়ে গেছে। তখন নির্দেশ দেয়া হবে: ধরো লোকটিকে, তার গলায় ফাঁস লাগিয়ে দাও, অতপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করো। এরপর তাকে সত্তর হাতের দীর্ঘ শিকলে বেঁধে দাও। সে লোকটি না মহান আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান এনেছে, আর না সে মিসকীনকে খাবার খাওয়ানোর উৎসাহ দান করতো। এ কারণে আজ এখানে তার সহানুভূতিশীল সহমর্মী বন্ধু কেউ নেই। আর না আছে ক্ষত-নিঃসৃত রস ছাড়া তার কোনো খাদ্য- নিতান্ত অপরাধী লোক ছাড়া যা আর কেউই খায় না।"
সূরা ইবরাহীমের ২১ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন এভাবে:
وَبَرَزُوا لِلَّهِ جَمِيعًا فَقَالَ الضَّعَفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا إِنَّا كُنَّا لَكُمْ تَبَعًا فَهَلْ أَنْتُمْ مُّغْنُونَ عَنَّا مِنْ عَذَابِ اللهِ مِنْ شَيْءٍ ، قَالُوا لَوْ هَدْنَا اللَّهُ لَهَدَيْنِكُمْ ، سَوَاءٌ عَلَيْنَا أَجَزِعْنَا أَمْ صَبَرْنَا مَا لَنَا مِنْ مَّحِيْصِ
"আর এ লোকেরা যখন একত্রিত হয়ে আল্লাহর সামনে উন্মোচিত হবে, তখন এদের মধ্যে যারা পৃথিবীতে দুর্বল ছিল তারা যারা বড়লোক বনেছিল তাদেরকে বলবে: দুনিয়ায় আমরা তোমাদের অধীন ছিলাম, এখন তোমরা আল্লাহর আযাব থেকে আমাদেরকে বাঁচাবার জন্যও কিছু করতে পারো? তারা জবাব দিলো: আল্লাহ যদি আমাদেরকেই মুক্তির কোনো পথ দেখাতেন তাহলে আমরা অবশ্যই তোমাদেরও দেখাতাম। এখন আহাজারী করি কি ধৈর্য অবলম্বন করি উভয়ই আমাদের জন্য সমান। আমাদের রক্ষা ও মুক্তি লাভের কোনো উপায়ই নেই।"
সূরা ইবরাহীমের ২২ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَقَالَ الشَّيْطَنُ لَمَّا قُضِيَ الْأَمْرُ إِنَّ اللهَ وَعَدَكُمْ وَعْدَ الْحَقِّ وَوَعَدْتُكُمْ فَأَخْلَفْتُكُمْ ، وَمَا كَانَ لِي عَلَيْكُمْ مِّنْ سُلْطن إلا أَنْ دَعَوْتُكُمْ فَسْتَجَبْتُمْ لِي فَلَا تَلُومُونِي وَلُوْمُوا أَنْفُسَكُمْ مَا أَنَا بِمُصْرِخِكُمْ وَمَا أَنْتُمْ بِمُصْرِخِيَّ ، إِنِّي كَفَرْتُ bِمَا أَشْرَكْتُمُونِ مِنْ قَبْلُ إِنَّ الظَّلِمِينَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ .
"আর হাশরের দিনের চূড়ান্ত ফায়সালা হয়ে যাবার পর শয়তান বলবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তোমাদের প্রতি আল্লাহ যেসব ওয়াদা করেছিলেন তা সবই সত্য ছিল। আর আমি যত ওয়াদাই করেছিলাম তার মধ্যে কোনো একটিও পালন করিনি। তোমাদের ওপর আমার তো কোনো জোর ছিল না। আমি এটা ছাড়া আর তো কিছু করিনি—শুধু এটাই করেছি যে, তোমাদেরকে আমার পথে চলার জন্য আহ্বান করেছি। আর তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছো। এখন আমাকে দোষ দিও না—তিরস্কার করো না, নিজেকেই নিজে তিরস্কৃত করো। এখানে না আমি তোমাদের ফরিয়াদ শুনতে পারি, না তোমরা আমার
ফরিয়াদ শুনতে পারো। ইতিপূর্বে তোমরা যে আমাকে খোদায়ীর ব্যাপারে শরীক বানিয়ে নিয়েছিলে, আমি তার দায়িত্ব থেকে মুক্ত। এরূপ যালেমদের জন্য তো কঠিন পীড়াদায়ক শাস্তি নিশ্চিত।" সূরা আল হুমাযাহ ৬-৯ আয়াতে:
نَارُ اللَّهِ الْمُوْقَدَةُ الَّتِي تَطَّلِعُ عَلَى الْأَفْئِدَةِ إِنَّهَا عَلَيْهِمْ مُؤْصَدَةٌ هُ فِي عَمَدٍ مُّمَدَّدَةٍ نَّ "আল্লাহর আগুন, প্রচণ্ডভাবে উত্তপ্ত-উৎক্ষিপ্ত যা অন্তর পর্যন্ত পৌঁছবে। তা তাদের ওপর ঢেকে বন্ধ করে দেয়া হবে। এমতাবস্থায় যে, তারা উঁচু উঁচু স্তম্ভে পরিবেষ্টিত হবে।"
সেখানে মুত্যুর মৃত্যু হবে
পরকালীন জীবনের আর শেষ নেই। মৃত্যু নেই। মৃত্যুরই মৃত্যু হয়ে যাবে। সেখানে মৃত্যু আর কাউকে স্পর্শ করবে না। জাহান্নামীদের দুর্ভোগ ও কঠিন শাস্তির কারণে তারা দুর্বিসহ আযাব আর আযাবই ভোগ করতে থাকবে। জাহান্নামীরা নড়েচড়ে যেনো হালকাভাব অনুভব করতে না পারে, এজন্য তাদেরকে আগুনের লম্বা খুটিতে বেঁধে দেয়া হবে।
সূরা ত্বা-হার ৭৪ আয়াতে এ ছবিই আঁকা হয়েছে এভাবে:
إِنَّهُ مَنْ يَأْتِ رَبَّهُ مُجْرِمًا فَإِنَّ لَهُ جَهَنَّمَ ، لَا يَمُوْتُ فِيهَا وَلَا يَحْيَى .
"প্রকৃত কথা এই যে, যে লোক অপরাধী হয়ে নিজের আল্লাহর সামনে হাযির হবে তার জন্য জাহান্নাম, যেখানে সে না জীবিত থাকবে না মরবে।"
সূরা ইবরাহীমের ১৭ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
وَيَأْتِيهِ الْمَوْتُ مِنْ كُلِّ مَكَانٍ وَمَا هُوَ بِمَيِّت "চার দিক থেকে তাকে মৃত্যু যন্ত্রণা বেষ্টন করে নেবে। কিন্তু মৃত্যু ঘটবে না।"
রুক্ষ্ম স্বভাবের ফেরেশতা নিয়োজিত থাকবে
জাহান্নামের ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। সেখানে নিয়োজিত থাকবে রুক্ষ্ম স্বভাব ও পাষাণ হৃদয়ের ফেরেশতাগণ।
সূরা তাহরীমের ৬ আয়াতে এর ছবি এঁকেছেন এভাবে:
وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَئِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لا يَعْصُوْنَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ .
"তার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। যেখানে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয় ও কঠোর স্বভাবের ফেরেশতাগণ। তারা আল্লাহর নির্দেশকে অমান্য করে না। যা করতে আদেশ করা হয় তাই করে।"
সূরা আল বাকারার ২৪ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ أُعِدَّتْ لِلْكَفِرِينَ )
"তবে সেই আগুনকে তোমরা ভয় করো যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যা সত্যদ্রোহী লোকদের জন্য নির্দিষ্ট ও প্রস্তুত করা হয়েছে।"
জাহান্নামের আগুন নিভবে না
জাহান্নামীদের জন্য জাহান্নামের আগুন কখনো নিভে যাবে না। সূরা বনী ইসরাঈলের ৯৭ আয়াতে একথাটি এভাবে বলা হয়েছে:
مَا وَلَهُمْ جَهَنَّمُ ، كُلَّمَا خَبَتْ زِدْنَهُمْ سَعِيرًا
"তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। যখনই আগুন নিভে যাবার উপক্রম হবে তখনই আমি তাদের সে আগুনকে প্রজ্জ্বলিত করে দেবো।"
জাহান্নামীরা দলে দলে জাহান্নামে প্রবেশ করবে
জাহান্নামে জাহান্নামীরা দলে দলে প্রবেশ করবে। তাদের এ দলে দলে জাহান্নামে প্রবেশ করার চিত্র আল্লাহ সূরা আয যুমারের ৭১ আয়াতে এভাবে এঁকেছেন:
حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا فُتِحَتْ أَبْوَابُهَا وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِنْكُمْ يَتْلُوْنَ عَلَيْكُمْ آيَتِ رَبِّكُمْ وَيُنْذِرُونَكُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هَذَا ، قَالُوا بَلَى وَلَكِنْ حَقَّتْ كَلِمَةُ الْعَذَابِ عَلَى الْكُفِرِينَ )
"তারা যখন সেখানে পৌঁছবে, তখন তার দুয়ারগুলো খোলা হবে এবং তার কর্মচারীরা তাদেরকে বলবে: তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য থেকে এমন রাসূল কি এসেছিল না। যারা তোমাদেরকে তোমাদের
রবের আয়াতসমূহ শুনিয়েছে এবং তোমাদেরকে একথা বলে ভয়প্রদর্শন করেছে যে, এ দিনটি একদিন তোমাদেরকে অবশ্যই দেখতে হবে? তারা জবাবে বলবে: হ্যাঁ এসেছিলো! কিন্তু আযাব হওয়ার ফায়সালা কাফেরদের ভাগ্যলিপি হয়ে গেছে।"
সূরা আল বাকারার ২০৬ আয়াতে বলা হয়েছে:
فَحَسْبُهُ جَهَنَّمُ ، وَلَبِئْسَ الْمِهَادُه
"অতএব জাহান্নামই তার জন্য যথেষ্ট। আর তা নিশ্চয়ই নিকৃষ্ট আশ্রয়।"
জাহান্নাম রাগে ফেটে পড়বে
জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার পর জাহান্নামের আগুন রাগে ফেটে পড়বে। একথাটিই আল্লাহ সূরা আল মুলকের ৭-৮ আয়াতে এভাবে আল্লাহ বলেছেন:
إِذَا الْقُوْا فِيهَا سَمِعُوا لَهَا شَهِيقًا وَهِيَ تَفُورُهُ تَكَادُ تَمَيَّزُ مِنَ الْغَيْظِ
"জাহান্নামীরা যখন জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে তখন তারা এর উৎক্ষিপ্ততার গর্জন শুনতে পাবে। রাগে ক্রোধে যেনো জাহান্নাম ফেটে পড়ার উপক্রম।"
চামড়া ঝলসে যাবে
জাহান্নামে আগুনের তাপে জাহান্নামীদের গায়ের চামড়া পুড়ে ঝলসে যাবে। সূরা আল মাআরিজের ১৫-১৬ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
إِنَّهَا لَظَّى نَزَّاعَةً لِّلشَّوى
"নিসন্দেহে তা প্রজ্জ্বলিত আগুন। যা চামড়াকে ঝলসে দেবে।"
সূরা আন নিসার ৫৬ আয়াতে বলা হয়েছে:
نُصْلِيْهِمْ نَارًا ، كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُمْ بَدَّلْنَهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا لِيَذُوقُوا الْعَذَابَ
"নিসন্দেহে আমরা তাদেরকে আগুনে নিক্ষেপ করবো। যখন তাদের চামড়া গলে যাবে তখন তদস্থলে অন্য চামড়া সৃষ্টি করে দিবো, যেন তারা আযাবের স্বাদ পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে।"
ফুটন্ত পানি খেতে দেয়া হবে
জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামে ফুটন্ত পানি খেতে দেয়া হবে। এ পানি পেটের নাড়ীভুড়িকে গলিয়ে দেবে।
সূরা মুহাম্মাদের ১৫ আয়াতে আল্লাহ এ ছবি এঁকেছেন এভাবে:
وَسُقُوْا مَاءً حَمِيمًا فَقَطَّعَ أَمْعَاءَ هُمْ - "তাদেরকে এমন ফুটন্ত পানি পান করানো হবে, যা তাদের নাড়ীভুড়িকে গলিয়ে দেবে।"
সূরা আল আনআমের ৭০ আয়াতে আছে:
لَهُمْ شَرَابٌ مِّنْ حَمِيمٍ وَعَذَابٌ أَلِيمٌ "তাদেরকে ফুটন্ত গরম পানি পান করার জন্য ও পীড়নকারী আযাব ভোগ করার জন্য দেয়া হবে।"
সূরা আল ওয়াকেআর ৫২-৫৩ আয়াতে আছে:
لَاكِلُوْنَ مِنْ شَجَرٍ مِّنْ زَقَوْمٍ ، فَمَالِئُونَ مِنْهَا الْبُطُونَ *
"তোমরা যাক্কুম বৃক্ষের খাদ্য অবশ্যই খাবে। তার দ্বারাই তোমরা পেট ভর্তি করবে।”
মুখাবয়ব দগ্ধীভূত হয়ে যাবে
জাহান্নামীদের মুখাবয়ব দগ্ধীভূত হয়ে যাবে। সূরা আল কাহফের ২৯ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
وَإِنْ يَسْتَغِيثُوا يُغَاثُوا بِمَاءٍ كَالْمُهْلِ يَشْوِي الْوُجُوهَ بِئْسَ الشَّرَابُ . وَسَاءَتْ مُرْتَفَقًا "তারা যদি পানি চায় তাহলে এমন পানি তাদেরকে পরিবেশন করা হবে যা তেলের তেলচিটের মতো হবে এবং তাদের মুখাবয়ব ভাজা ভাজা করে দিবে! এটা অত্যন্ত নিকৃষ্ট পানি, আর অতিশয় খারাপ আশ্রয়স্থল।"
পুঁজ মিশানো পানীয় গলায় আটকে যাবে
জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামে পুঁজ মিশানো পানি খেতে দেয়া হবে। আল্লাহ সূরা ইবরাহীমের ১৬-১৭ আয়াতে বলেছেন:
وَيُسْقَى مِنْ مَاءٍ صَدِيدٍ ل يَتَجَرَّعُهُ وَلَا يَكَادُ يُسِيعُهُ
"তাদেরকে পুঁজ মিশানো পানি পান করতে দেয়া হবে। সে তা কষ্ট করে গলধঃকরণ করতে চেষ্টা করবে। আর খুব কমই গলধঃকরণ করতে পারবে।"
কাঁটাযুক্ত ঘাস তাদের খাবার হবে
জাহান্নামবাসীদের খাবার হবে কাঁটাযুক্ত ঘাস। সূরা আল গাশিয়ায় ৬- ৭ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
لَيْسَ لَهُمْ طَعَامٌ إِلَّا مِنْ ضَرِيْعِ لَا يُسْمِنُ وَلَا يُغْنِي مِنْ جُوْعِ "খাবার হিসাবে তারা কাঁটাওয়ালা শুষ্ক ঘাস ছাড়া আর কিছুই পাবে না। এ ঘাস শরীরের পুষ্টি সাধন করাতো দূরের কথা ক্ষুধাও নিবারণ করতে পারবে না।।"
জাহান্নামে আগুনের পোশাক হবে
জাহান্নামের বাসিন্দাদের পোশাক হবে আগুনের। সূরা আল হজ্জের ১৯-২০ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
فَالَّذِيْنَ كَفَرُوا قُطِعَتْ لَهُمْ ثِيَابٌ مِّنْ نَّارٍ ، يُصَبُّ مِنْ فَوْقِ رُءُ وَسِهِمُ الْحَمِيمُ يُصْهَرُ بِهِ مَا فِي بُطُونِهِمْ وَالْجُلُودُهُ "তাদের মধ্যে যারা কুফুরী করেছে তাদের জন্য আগুনের পোশাক কেটে তৈরি করা হয়েছে। তাদের মাথার উপর ফুটন্ত পানি ঢালা হবে। যার ফলে তাদের চামড়াই শুধু নয় পেটের মধ্যেকার সবকিছুও গলে যাবে।"
তাদের গলায় কণ্ঠবেড়ী থাকবে
জাহান্নামীদের গলায় কণ্ঠবেড়ী বা শিকল পরানো থাকবে। এ শিকল ধরে টেনে হিছড়ে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে। সূরা আল মু'মিনের ৭১- ৭২ আয়াতে বলা হয়েছে:
إِذِ الْأَغْلُلُ فِي أَعْنَاقِهِمْ وَالسَّلَسِلُ ، يُسْحَبُوْنَهُ فِي الْحَمِيمِ ، ثُمَّ فِي النَّارِ يُسْجَرُونَ
"যখন তাদের গলায় শৃংখল পড়বে এবং তাতে ধরে তাদেরকে টগবগ করে ফুটতে থাকা গরম পানির দিকে টানা হবে এবং পরে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে।"
সুতরাং জাহান্নাম হলো বিভিন্ন ধরনের দলন, পীড়ন ও অসহায় যাতনা-বেদনার বেদনা বিধুর করুণ স্থান।
জাহান্নামীরা আফসোস করবে
ফেরেশতাগণ জাহান্নামীদেরকে যখন এক হাতে চুলের মুঠি ও অন্য হাতে পা ধরে উঠিয়ে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে নিয়ে যাবে। জাহান্নামের দারোয়ানগণ জিজ্ঞেস করবে, তোমাদের কাছে কি কোনো সুসংবাদ দানকারী আসেনি? জবাবে কাফিররা বলবে, হ্যাঁ এসেছিলো। কিন্তু আমরা তাদের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছি। তাদের মিথ্যা মনে করেছি। এ সময় তারা আফসোস করবে আর বলবে। সূরা মুলকের ১০ আয়াতে এ বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন :
لَوْكُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحُبِ السَّعِيرِه .
"হায়! আমরা যদি শুনতাম ও অনুধাবন করতাম তাহলে আমরা আজ ঐ দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের উপযুক্ত লোকদের মধ্যে গণ্য হতাম না।"
সূরা আল আনআমের ২৭ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَلَوْ تَرَى إِذْ وَقِفُوا عَلَى النَّارِ فَقَالُوا يُلَيْتَنَا نُرَدُّ وَلَا نُكَذِّبَ بِأَيْتِ رَبِّنَا وَنَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ "হায়! সেই সময়ের অবস্থা যদি তুমি দেখতে পারতে, যখন তাদেরকে জাহান্নামের কিনারায় দাঁড় করানো হবে তখন তারা বলবে: হায়! আমরা যদি দুনিয়ায় আবার ফিরে যেতে পারতাম এবং সেখানে আল্লাহর নিদর্শনসমূহ প্রত্যাখ্যান না কুরতাম ও ঈমানদার লোকদের মধ্যে শামিল হতাম!"
জাহান্নামীরা দুনিয়ায় ফিরে আসতে চাইবে
সূরা আল মু'মিনের ১১ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
قَالُوا رَبَّنَا آمَتَّنَا اثْنَتَيْنِ وَأَحْيَيْتَنَا اثْنَتَيْنِ فَاعْتَرَفْنَا بِذُنُوبِنَا فَهَلْ إِلَى خُرُوجٍ مِّنْ سَبِيلِ .
"তারা বলবে: হে আমাদের রব! তুমি নিশ্চয়ই আমাদেরকে দুবার মৃত্যু ও দুবার জীবনদান করেছো। এখন আমরা আমাদের অপরাধ- সমূহ স্বীকার করে নিচ্ছি। এখন এখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ আছে কি?"
জবাবে সূরা আল ফাতিরের ৩৭ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
وَهُمْ يَصْطَرِخُونَ فِيْهَا ، رَبَّنَا أَخْرِجْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا غَيْرَ الَّذِي كُنَّا نَعْمَلُ ، أَوَلَمْ نُعَمِّرْ كُمْ مَّا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَنْ تَذَكَّرَ وَجَاءَ كُمُ النَّذِيرُ ، فَذُوقُوا فَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ نَّصِيْرِهِ
"সেখানে তারা চীৎকার করে বলবে: হে আমাদের রব! আমাদেরকে এখান থেকে বের করে নাও- যেন আমরা নেক আমল করি, সে আমল থেকে ভিন্নতর যেমন পূর্বে করছিলাম। (তাদেরকে জবাব দেয়া হবে) আমরা কি তোমাদেরকে এমন বয়স দান করিনি যাতে কেউ শিক্ষাগ্রহণ করতে চাইলে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারতো? আর তোমাদের নিকট সতর্ককারীও এসেছিল। এখন স্বাদ গ্রহণ করো। এখানে যালেমদের কোনো সাহায্যকারী নেই।"
সবকিছু বিনিময় করেও তারা বাঁচতে চাইবে
স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন সহ দুনিয়ার সবকিছুর বিনিময় দিয়ে হলেও সেদিন জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চাইবে। কিন্তু তা হবে না। সূরা আল মাআরিজের ১১-১৪ আয়াতে একথাই বলা হয়েছে:
يَوَدُّ الْمُجْرِمُ لَوْ يَفْتَدِى مِنْ عَذَابِ يَوْمِئِذٍ بِبَنِيْهِ وَصَاحِبَتِهِ وَأَخِيهِ وَفَصِيلَتِهِ الَّتِي تُنْوِيْهِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا لَا ثُمَّ يُنْجِيهِ
"অপরাধী লোক চাইবে, সেদিনের আযাব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নিজের সন্তান, স্ত্রী, ভাই, তাকে আশ্রয়দানকারী নিকটবর্তী পরিবারকে এবং ভূ-পৃষ্ঠের সমস্ত লোককে বিনিময়ে দিয়ে দিতে, যেন এ উপায়টি তাকে নিষ্কৃতি দিতে পারে।"
সূরা আল মু'মিনূনের ১০১ আয়াতে বলা হয়েছে:
فَلَا أَنْسَابَ بَيْنَهُمْ يَوْمَئِذٍ وَلَا يَتَسَاءَلُوْنَ )
"তখন তাদের মধ্যে আর কোনো আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না। এমন কি পরস্পর দেখা হলেও কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করবে না।"
একদল আর একদলকে দোষারোপ করবে
জাহান্নামের লোকেরা তাদের দুর্গতির জন্য একদল আরেক দলকে দোষ দেবে। বলবে, তোমাদের জন্য আজ আমাদের এ দুর্গতি। সূরা আল আরাফের ৩৮ আয়াতে এ ছবি এঁকেছেন এভাবে:
كُلَّمَا دَخَلَتْ أُمَّةٌ لَعَنَتْ أُخْتَهَا ، حَتَّى إِذَا ادَّارَكُوا فِيْهَا جَمِيعًا ، قَالَتْ أُخْرَهُمْ لأَوَّلَهُمْ رَبَّنَا هَؤُلَاءِ أَضَلُّونَا فَأْتِهِمْ عَذَابًا ضِعْفًا مِّنْ النَّارِ قَالَ لِكُلِّ ضِعْفٌ وَلَكِنْ لا تَعْلَمُوْنَ )
"প্রত্যেকটি লোক যখন জাহান্নামে দাখিল হবে তখন নিজেদের পূর্বগামী লোকদের উপর লানত করতে করতে প্রবেশ করবে। এভাবে সব লোকই যখন তথায় একত্রিত হবে তখন প্রত্যেক পরবর্তী দল তার পূর্ববর্তী দল সম্পর্কে বলবে: হে আমাদের রব! এ লোকেরাই আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। কাজেই এদেরকে দ্বিগুণ আযাব দাও। উত্তরে বলা হবে, প্রত্যেকেরই জন্য দ্বিগুণ আযাব রয়েছে; কিন্তু তোমরা জান না।"
এ আয়াতের শেষাংশে প্রত্যেকের জন্য দুইগুণ আযাবের উল্লেখ আছে। এর তাৎপর্য হলো, ভুল পথে চলার অপরাধীরা নিজে তো অপরাধ করেই। আবার-অন্যদেরকেও এ পথে চলার জন্য উৎসাহিত করে। প্রত্যেকটি অপরাধের কাজই দৃশ্যতঃ চাকচিক্যময় ও লাভজনক। তাই লোকজন সেই দিকে চলে যায়। তাদেরকে দেখে পরের লোকগুলোও অপরাধী হয়ে উঠে। অপরাধের প্রসার ধারাবাহিকভাবে এরূপ চলতে থাকে। পরের লোকেরা আগের লোকজনকে অনুকরণ করে চলতে থাকে। প্রত্যেক দলকেই তাই আল্লাহ দুইগুণ শান্তি দেয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ তারা যেমন একদিকে আগের দলের অনুগামী অনুসারী তদ্রূপ তারা পরের লোকদের পূর্বসূরী।
সূরা আল বাকারার ২৫৭ আয়াতে তাদের এ পরিচয় দিয়ে আল্লাহ বলেছেন:
اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُمْ مِّنَ الظُّلُمَتِ إِلَى النُّوْرِ ، وَالَّذِينَ كَفَرُوا
أَوَلِيْتُهُمُ الطَّاغُوتُ : يُخْرِجُونَهُمْ مِّنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَتِ أُولَئِكَ أَصْحَبُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَلِدُونَ ০
"যারা ঈমানদার, তাদের সাহায্যকারী ও পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন আল্লাহ; তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোকের দিকে বের করে আনেন। আর যারা কুফরী অবলম্বন করে, তাদের পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে 'তাগূত'; তা তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যায়। এরা জাহান্নামে যাবার লোক, সেখানে তারা চিরদিন থাকবে।"
অনুসারীরা অগ্রগামীদের শাস্তি দাবী করবে
যাদের কথা শুনে জাহান্নামীদের এ দুরবস্থা দুর্গতি। তাদের বিরুদ্ধে তারা আল্লাহর কাছে নালিশ করবে।
সূরা আল আহযাবের ৬৭-৬৮ আয়াতে একথা এভাবে বলা হয়েছে:
وَقَالُوا رَبَّنَا إِنَّا أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَاءَنَا فَأَضَلُّونَا السَّبِيْلا رَبَّنَا أَتِهِمْ ضِعْفَيْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْهُمْ لَعْنًا كَبِيرًا ০
"আর বলবেঃ হে আমাদের রব! আমরা আমাদের সরদার ও নেতৃবৃন্দের আনুগত্য করেছি, আর তারা আমাদেরকে হেদায়াতের পথ থেকে গোমরাহ করে রেখেছে। হে রব! তাদেরকে দ্বিগুণ আযাব দাও এবং তাদের ওপর শক্ত অভিশাপ বর্ষণ করো।"
সূরা হা-মীম আস সাজদাহর ২৯ আয়াতে বলা হয়েছে:
رَبَّنَا آرِنَا الَّذِينَ أَضَلَّنَا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ نَجْعَلْهُمَا تَحْتَ أَقْدَامِنَا لِيَكُونَا مِنَ الْأَسْفَلِينَ ০
"হে আমাদের রব! আমাদেরকে একটু দেখিয়ে দিন সে জ্বিন ও মানুষগুলোকে, যারা আমাদেরকে গোমরাহ করেছিলো। আমরা তাদেরকে পায়ের তলায় রেখে নিষ্পেষিত করবো, যেন এরা ভালোমতো অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়।”
সূরা আল বাকারার ১৬৬-১৬৭ আয়াতে বলা হয়েছে:
إِذْ تَبَرَّ الَّذِينَ اتَّبِعُوا مِنَ الَّذِينَ اتَّبِعُوا وَرَأَوُا الْعَذَابَ وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ
الْأَسْبَابُ ، وَقَالَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا لَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَنَتَبَرَّأَ مِنْهُمْ كَمَا تَبَرَّءُ وا مِنَّا كَذَلِكَ يُرِيهِمُ اللَّهُ أَعْمَالَهُمْ حَسَرَات عَلَيْهِمْ ، وَمَا هُمْ بِخْرِجِينَ مِنَ النَّارِ
"আল্লাহ যখন শান্তি দিবেন তখন এরূপ অবস্থা দেখা দিবে যে, দুনিয়াতে যেসব নেতা ও প্রধান ব্যক্তির অনুসরণ করা হতো তারা নিজ নিজ অনুসরণকারীদের সাথে সকল সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা ঘোষণা করবে, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা অবশ্যই শাস্তি পাবে এবং তাদের সকল উপায়-উপাদানের সম্পর্ক ও কার্যকারণ ধারা ছিন্ন হয়ে যাবে। আর দুনিয়ায় যারা তাদের অনুসরণ করতো তারা বলবে: হায়! আমাদেরকে আবার যদি সুযোগ দেয়া হতো, তাহলে আজ এরা যেমন আমাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজেদের দায়িত্বহীন থাকার কথা প্রকাশ করছে আমরাও তাদের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে দেখিয়ে দিতাম। আল্লাহ অবশ্যই তাদের সকল কাজ-যাকিছু তারা দুনিয়াতে করছে-তাদের সামনে এমনভাবে উপস্থিত করবেন যে, তারা শুধু লজ্জিত হবে ও দুঃখ প্রকাশ করবে। কিন্তু জাহান্নামের গর্ভ থেকে বের হবার কোনো পথই তারা খুঁজে পাবে না।"
জাহান্নামীদের লক্ষ করে শয়তান যা বলবে
দুনিয়ায় শয়তানসহ যারা জাহান্নামীদেরকে বিপথে চালিয়েছে তাদের ওপর সব দোষ চাপিয়ে তারা আজ বিপদের দিনে আল্লাহর করুণা চাইবে। কিন্তু শয়তান নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা চালাবে। সূরা ইবরাহীমের ২২ আয়াতে আছে:
وَقَالَ الشَّيْطَنُ لَمَّا قُضِيَ الْأَمْرُ إِنَّ اللَّهَ وَعَدَكُمْ وَعْدَ الْحَقِّ وَوَعَدْتُكُمْ فَأَخْلَفْتُكُمْ ، وَمَا كَانَ لِي عَلَيْكُمْ مِّنْ سُلْطَنٍ إِلَّا أَنْ دَعَوْتُكُمْ فَسْتَجَبْتُمْ لي ، فَلَا تَلُومُونِي وَلُوْمُوا أَنْفُسَكُمْ ، مَا أَنَا بِمُصْرِخِكُمْ وَمَا أَنْتُمْ بِمُصْرِخِي إِنِّي كَفَرْتُ بِمَا أَشْرَكْتُمُونِ مِنْ قَبْلُ إِنَّ الظَّلِمِينَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
"আর হাশরের দিনের চূড়ান্ত ফায়সালা হয়ে যাবার পর শয়তান বলবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তোমাদের প্রতি আল্লাহ যেসব ওয়াদা করেছিলেন তা সবই সত্য ছিল। আর আমি যত ওয়াদাই করেছিলাম তার মধ্যে কোনো একটিও পালন করিনি। তোমাদের ওপর আমার তো কোনো জোর ছিল না। আমি এটা ছাড়া আর তো কিছু করিনি-শুধু এটাই করেছি যে, তোমাদেরকে আমার পথে চলার জন্য আহ্বান করেছি। আর তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছো। এখন আমাকে দোষ দিও না-তিরস্কার করো না, নিজেকেই নিজে তিরস্কৃত করো। এখানে না আমি তোমাদের ফরিয়াদ শুনতে পারি, না তোমরা আমার ফরিয়াদ শুনতে পারো। ইতিপূর্বে তোমরা যে আমাকে খোদায়ীর ব্যাপারে শরীক বানিয়ে নিয়েছিলে, আমি তার দায়িত্ব থেকে মুক্ত। এরূপ যালেমদের জন্য তো কঠিন পীড়াদায়ক শাস্তি নিশ্চিত।"
সেদিন সবর করা, না করা সমান
সেদিন কারো পক্ষে কিছু করা সম্ভব হবে না। সূরা আত তূরের ১৩-১৬ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
يَوْمَ يُدَعُوْنَ إِلَى نَارِ جَهَنَّمَ دَعَالٌ هَذِهِ النَّارُ الَّتِي كُنْتُمْ بِهَا تُكَذِّبُونَ أَفَسِحْرٌ هذَا أَمْ أَنْتُمْ لَا تُبْصِرُونَةً إِصْلَوْهَا فَاصْبِرُوا أَوْلَا تَصْبِرُوا سَوَاء عَلَيْكُمْ ، إِنَّمَا تُجْزَوْنَ مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ
“যেদিন তাদেরকে ধাক্কা মেরে মেরে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন তাদেরকে বলা হবে যে, এটা সেই আগুন যাকে তোমরা অসত্য ও ভিত্তিহীন মনে করছিলে। এখন বলো এটা কি যাদু, নাকি তোমাদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানটুকুও নেই? এখন যাও তার ভিতরে ভষ্ম হতে থাকো, তোমরা তা সহ্য করতে পারো, আর না পারো, তোমাদের জন্য সবই সমান। তোমাদেরকে সেই রকম প্রতিফল-ই দেয়া হচ্ছে যেমন তোমরা আমল করছিলে!"
সূরা আল হাদীদের ১৫ আয়াতে বলা হয়েছে:
فَالْيَوْمَ لا يُؤْخَذُ مِنْكُمْ فِدْيَةٌ وَلَا مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا ، مَأْوَكُمُ النَّارُ هِيَ مَوْلَكُمْ ، وَبِئْسَ الْمَصِيرُه "কাজেই আজ না তোমাদের নিকট থেকে কোনো বিনিময় কবুল করা হবে, আর না সেই লোকদের থেকে যারা প্রকাশ্যভাবে কুফরী করেছিল।
তোমাদের ঠিকানা, চূড়ান্ত আশ্রয় জাহান্নাম। সেই জাহান্নামই তোমাদের খবরাখবর গ্রহণকারী এবং অতিশয় নিকৃষ্ট পরিণতি।”
প্রকৃত ব্যাপার হলো, সেদিন আর কিছু করার থাকবে না। যা করার ছিলো তা দুনিয়ায় ছিলো। দুনিয়ার জীবন পার হয়ে গেলে আখিরাতের জীবনে পা দিলে আর নিজ ইখতিয়ারের কিছু থাকবে না। সাহায্যকারীও পাবে না। দুনিয়ার জীবনের অপরাধের জন্য যা শাস্তি নির্দিষ্ট আছে, তা ভোগ করতেই হবে।
জাহান্নামের রক্ষীদের কাছে আবেদন
জাহান্নামের লোকেরা কঠিন শাস্তি ভোগ করতে করতে অতিষ্ট হয়ে জাহান্নামের রক্ষীদেরকে অনুনয় বিনয় করবে। তাদের এ অনুনয়ের কথা আল্লাহ সূরা আল মু'মিনের ৪৯ আয়াতে এভাবে বলে দিয়েছেনঃ
رَبَّكُمْ يُخَفِّفْ عَنَّا يَوْمًا مِّنَ الْعَذَابِ ادْعُوا
"তোমাদের আল্লাহর কাছে দোয়া করো, তিনি যেন আমাদের এ আযাব মাত্র একটি দিন হ্রাস করে দেন।" প্রতি উত্তরে রক্ষী দল বলবে:
فَادْعُوا ، وَمَا دُعُوَاء الْكَفِرِينَ إِلَّا فِي ضَلَلٍ
"তোমরা অনুনয় বিনয় করতে পারো। কিন্তু কাফেরদের জন্য সবই আজ বিফল।"-সূরা মুমিন: ৫০
এরপর জাহান্নামবাসীরা অনুরোধ করবে:
يَا مَالِكُ لِيُقْضِ عَلَيْنَا رَبُّكَ
"হে মালিক! তুমি আমাদের জন্য তোমার রবের কাছে ফরিয়াদ করো। তিনি যেনো আমাদের মৃত্যু দিয়ে দেন।"-সূরা যুখরুফ: ৭৭
রক্ষী ফেরেশতা বলবে:
إِنَّكُمْ مَا كِثُوْنَ ......
"তোমাদেরকে এখানেই সবসময় থাকতে হবে। অর্থাৎ তোমাদের আর মৃত্যু নেই।"-সূরা যুখরুফ: ৭৭
জাহান্নামবাসীর শেষ আরাধনা
জাহান্নামের রক্ষীদের কাছে অনুনয় বিনয় করে কিছু না পেয়ে তারা সরাসরি পরাক্রমশালী আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাবে।
সূরা মু'মিনূনের ১০৬ আয়াতে আছে:
رَبَّنَا غَلَبَتْ عَلَيْنَا شَقْوَتُنَا وَكُنَّا قَوْمًا ضَالَّيْنَ
"তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদেরকে গ্রাস করে ফেলেছিল। আমরা বাস্তবিকই গোমরাহ লোক ছিলাম।"
এদের এ ফরিয়াদ শোনা হবে না। এ ফরিয়াদের জবাবে বরং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। আর তারা সেখানে যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকবে।
জাহান্নামের প্রকারভেদ
পাপীর পাপের মাত্রা অনুসারে জাহান্নামের বিভিন্ন শাস্তির জায়গায় জাহান্নমীদেরকে রাখা হবে। জাহান্নামের এ স্তরবিন্যাস সাত প্রকার। সূরা আল হিজরের ৪৪ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
لَهَا سَبْعَةُ أَبْوَابٍ ، لِكُلِّ بَابٍ مِّنْهُمْ جُزْءٌ مَقْسُومٌ .
"জাহান্নামের সাতটি স্তর আছে। প্রত্যেকটি স্তর ভিন্ন ভিন্ন দলের জন্য ভাগ করা আছে।"
এ স্তরগুলো সাত ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
(১) হাবিয়া (২) জাহীম (৩) সাকার (৪) লাযা (৫) সাঈর (৬) হুতামাহ (৭) জাহান্নাম।
কাফির, মুশরিক, ব্যভিচারী, সুদখোর, ঘুষখোর ইত্যাদি ধরনের পাপীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন রকমের শাস্তি রয়েছে। পাপ অনুযায়ী শাস্তি হবে জাহান্নামে আযাবের মাত্রা।
জান্নাতীদেরকে জাহান্নাম ও জাহান্নামীদেরকে জান্নাত দেখানো হবে
বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন। জান্নাতীদেরকে জান্নাতে যাবার আগে বদ আমল করলে জাহান্নামে তার যে স্থান হতো তা তাকে দেখানো হবে। জাহান্নামের অবস্থা দেখে সে এর থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করবে।
আর জাহান্নামে নিক্ষেপ করার আগে জাহান্নামীদেরকে জান্নাত দেখানো হবে। নেক আমল করলে জান্নাতে তার যে স্থান হতো তা তাকে দেখানো হবে। এতে সে খুব দুঃখিত ও অনুতপ্ত হবে।
আরাফ
জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানের একটি জায়গার নাম আ'রাফ। হাশরের ময়দানের হিসাব নিকাশের পর যেসব মানুষের আমলনামা নেক, বদ সমান
হবে তারা তখনও জান্নাত বা জাহান্নামে যেতে পারবে না। জান্নাত জাহান্নামের মাঝখানের অস্থায়ীভাবে এ আ'রাফ নামক জায়গায় থাকবে। আ'রাফগামীরা সেথায় থেকে জান্নাত ও জাহান্নামবাসীদেরকে দেখতে পাবে। তাদের সাথে কথাবার্তা বলবে। পরে অবশ্য আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জান্নাতে যাবার অনুমতি দেবেন।
যাদের কাছে আল্লাহর দীন গ্রহণের দাওয়াত দিতে কোনো নবী বা রাসূল পৌঁছেননি, যারা দুনিয়ায় পাগল ছিলো, তারাও আ'রাফে থাকবে। 'আ'রাফ' সম্পর্কে আল্লাহ সূরা আল আ'রাফে বলেছেন:
وَبَيْنَهُمَا حِجَابٌ ، وَعَلَى الْأَعْرَافِ رِجَالٌ يَعْرِفُوْنَ كُلًّا بِسِيْمُهُمْ ، وَنَادَوْا أَصْحَبَ الْجَنَّةِ أَنْ سَلِّمْ عَلَيْكُمْ لَمْ يَدْخُلُوهَا وَهُمْ يَطْمَعُوْنَ وَإِذَا صُرِفَتْ أَبْصَارُهُمْ تِلْقَاءَ أَصْحَب النَّارِ قَالُوا رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا مَعَ الظَّلِمِينَ وَنَادَى أَصْحَبُ الْأَعْرَافِ رِجَالاً يَعْرِفُونَهُمْ بِسِيْمَهُمْ قَالُوْا مَا أَغْنِي عَنْكُمْ جَمْعُكُمْ وَمَا كُنْتُمْ تَسْتَكْبِرُونَ .
"এ উভয় শ্রেণীর লোকদের মাঝখানে একটি পার্থক্যকারী পর্দা হবে, তার উচ্চ পর্যায়ে থাকবে অপর কিছু লোক। এরা প্রত্যেককে তার চিহ্ন দ্বারা চিনতে পারবে। জান্নাতবাসীদের ডেকে এরা বলবে: তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। এরা জান্নাতে প্রবেশ নেই বটে, কিন্তু তারা তার জন্য আকাঙ্ক্ষী। এরা জান্নাতে প্রবেশ করেনি বটে, কিন্তু তারা তার জন্য আকাঙ্ক্ষী। পরে জাহান্নামের প্রতি যখন তাদের চোখ পড়বে, তখন বলবে: হে আল্লাহ! আমাদেরকে এ যালেম লোকদের মধ্যে শামিল করো না। অতপর এ আ'রাফের লোকেরা জাহান্নামের কয়েকজন বড় বড় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোককে তাদের চিহ্ন দ্বারা চিনে নিয়ে ডেকে বলবে: দেখলে তো, আজ না তোমাদের বাহিনী কোনো কাজে আসলো, আর না সেসব সাজ-সরঞ্জাম যাকে তোমরা খুব বড় বলে মনে করছিলে।" -সূরা আল আ'রাফ: ৪৬-৪৮
আল্লাহ আমাদেরকে জাহান্নামের ভয়াবহ আযাব থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতের বাগানে প্রবেশ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00