📘 কুরআনে আকা আখিরাতের ছবি > 📄 হাশরের ময়দানে ভাগ্যবান লোকগণ

📄 হাশরের ময়দানে ভাগ্যবান লোকগণ


রাগ সম্বোরণকারীর হাশর
তিরমিযী ও আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল সঃ বলেছেন, যে ব্যক্তি রাগ হয়ে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারতো। কিন্তু তা না করে সে রাগ হজম করেছে, হাশরের দিন আল্লাহ এ লোককে সকলের সামনে ডেকে এনে তাকে যে কোনো হুরকে গ্রহণ করার অধিকার দেবেন।
হারামাইনে মৃত্যুবরণকারীর হাশর
বায়হাকীতে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি মদীনায় থেকে সেখানকার দুঃখ-কষ্টে ধৈর্যধারণ করেছে, হাশরের দিন আমি তার জন্য সাক্ষ দেবো ও সুপারিশ করবো। আর যে ব্যক্তি মক্কা মদীনার হারাম এলাকায় মৃত্যুবরণ করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে নিরাপদ ব্যক্তির সাথে হাশর করাবেন।
হজ্জ পালনকালে মৃত্যুবরণ
বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, এক লোক আল্লাহর রাসূলের সাথে হজ্জের সময় আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ সে সওয়ারী থেকে পড়ে ঘাড় ভেঙে মৃত্যুবরণ করলো। রাসূলুল্লাহ স. তাকে বরই পাতার গরম করা পানি দিয়ে গোসল দিতে ও ইহরামের কাপড় দিয়ে কাফন দিতে বললেন এবং মাথা ঢাকতে নিষেধ করলেন। কারণ এ লোক হাশরের মাঠে তালবিয়া অর্থাৎ লাব্বাইকা ...... বলতে বলতে উঠে আসবে।
শহীদগণ
বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় আঘাত পেয়ে মৃত্যুবরণ করে। আর কে আল্লাহর রাস্তায় আঘাত পেয়ে মৃত্যুবরণ করলো তা আল্লাহ ভালো জানেন। হাশরের ময়দানে সে ব্যক্তি উক্ত আঘাত থেকে রক্ত প্রবাহিত অবস্থায় উঠে আসবে। রক্ত হবে গাঢ় রক্তীম বর্ণের। আর সুগন্ধ হবে মেশকের মতো।
অন্ধকারে মসজিদে যাওয়া
তিরমিযীতে হযরত আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল বলেছেন, অন্ধকারে মসজিদে গমনকারী ব্যক্তিদেরকে শুনিয়ে দাও, হাশরের দিন পরিপূর্ণ নূর দিয়ে তাদেরকে উঠিয়ে আনা হবে।
আযানের মর্যাদা
মুসলিমে হযরত মুআবিয়া রা. হতে বর্ণিত। রাসূল স. বলেছেন, হাশরের ময়দানে আযান দাতার গর্দান সবচেয়ে বেশী লম্বা হবে। -মুসলিম
আল্লাহর জন্য ভালোবাসা
আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, যারা শুধু আল্লাহর জন্য পরস্পরকে ভালোবাসে হাশরের ময়দানে তাদের জন্য নূরের মিম্বর থাকবে। নবী ও শহীদগণ তাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হবে। তারা নূরের মিম্বারে বসা থাকবে। আর নবী শহীদগণ অন্যের জন্য সুপারিশে নিয়োজিত থাকবেন। -মেশকাত
আরশের ছায়া লাভকারীগণ
হযরত আবু হুরাইরা রাঃ হতে বর্ণিত। রাসূল স. বলেছেন, হাশরের মাঠে সাত ধরনের লোককে আল্লাহ তাআলা আরশের ছায়ায় জায়গা দেবেন। সেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কারো ছায়া থাকবে না।
তারা হলেন:
১. মুসলমানদের ন্যায়বিচারক বাদশা।
২. যে ব্যক্তি নিজের যৌবন কালকে আল্লাহর পথে কাটিয়েছে।
৩. যে ব্যক্তির মন মসজিদে পড়ে থাকে। মসজিদে নামায পড়ে আসার পর আবার মসজিদে যাবার জন্য মন আনচান করতে থাকে।
৪. আল্লাহর জন্যই যারা পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসে। আবার আল্লাহর জন্যই পরস্পর পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়।
৫. যে নির্জনে নিভৃতে আল্লাহকে স্মরণ করে অশ্রু বর্ষণ করে।
৬. যাকে কোনো সুন্দরী রূপসী কুলীন মহিলা অশ্লীল আহ্বান জানায়। আর সে আল্লাহর ভয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে।
৭. যে ব্যক্তি ডান হাতে দান করলে তার বাম হাতও তা জানে না।-বুখারী ও মুসলিম

📘 কুরআনে আকা আখিরাতের ছবি > 📄 মহাবিচারের দিন

📄 মহাবিচারের দিন


মহাবিচারের দিন কি হবে
হাশরের ময়দানে মানুষ বিচিত্র অবস্থায় উত্থিত হয়ে আসার পর কতো দিন এভাবে থাকবে তা শুধু আল্লাহরই জানা। ওসব অবস্থার কথা আর কারো জানা নেই। আল্লাহর পরিকল্পনা অনুযায়ী হাশরের ময়দানের সব কাজ সমাধার পর আল্লাহ মানুষের পরকালীন জীবনে স্থায়ী জান্নাত বা জাহান্নামে পাঠাবার জন্য আদালত কায়েম করে বিচার করবেন। এটাই মহাবিচারের দিন। এ বিচার দুনিয়ার কোনো বিচার-ফায়সালার পদ্ধতির সাথে তুলনীয় নয়। একমাত্র বিচারক থাকবেন আল্লাহ রব্বুল আলামীন। সেখানে কারো কোনো মামলা উপস্থাপন করার পক্ষ থাকবে না। কারো পক্ষ সমর্থনের জন্য, কারো সাফাই গাইবার জন্য কোনো উকিল মুক্তার ব্যারিস্টার থাকবে না।
মানুষের দুনিয়ায় করা আমলগুলো আগেই মুনকার নাকীর ভিডিও রেকর্ড করে রেখেছিলেন। এ অবস্থার ছবি আল্লাহ তাআলা সূরা ক্বাফ-এর ১৮ আয়াতে এভাবে বলেছেন: "مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ اِلَّا لَدَيْهِ رَقِيْبٌ عَتِيْدٌ " “এমন কোনো শব্দ তার মুখ থেকে বের হয় না যা সংরক্ষিত করার জন্য একজন সদা প্রস্তুত রক্ষক উপস্থিত থাকে না।” সেই আমলনামা ডিসপ্লে করে দেয়া হবে। তাছাড়া হাত-পা, চোখ, কানসহ সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাক্ষ দিতে থাকবে। মানুষ শুধু অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে। নবী-রাসূলগণ তাঁদের উম্মতদের জীবনের কার্যক্রমের সাক্ষ দেবে। কারো ওপর এক বিন্দুও বেইনসাফী করা হবে না। আল্লাহর সকল ওয়াদা অঙ্গীকার পূরণ করা হবে। একজনের অপরাধের জন্য আরেকজনকে দায়ী করা হবে না। সেখানে কেউ কারো কাজে আসবে না। সকলকে একই সাথে এক জায়াগায় হাযির করা হবে। সূরা আলে ইমরানের ৩০ আয়াতে আল্লাহ পাক এ ছবিটি এভাবে এঁকেছেন:
يَوْمَ تَجِدُ كُلُّ نَفْسٍ مَّا عَمِلَتْ مِنْ خَيْرٍ مُحْضَرًا ، وَمَا عَمِلَتْ مِنْ سُوءٍ تَوَدُّ لَوْ أَنَّ بَيْنَهَا وَبَيْنَهُ آمَدًا بَعِيْدًا ، وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ ، وَاللَّهُ رَءُوفٌ بِالْعِبَادِ
“সেদিন নিশ্চয়ই আসবে, যখন প্রত্যেকটি ব্যক্তিই নিজের কৃতকর্মের ফল পাবে, সে ভাল কাজই করুক, আর মন্দই করুক। সেদিন প্রত্যেকেই এ কামনা করবে যে, এ দিনটি যদি তার নিকট হতে বহুদূরে থাকতো, তবে কতই না ভালো হতো। আল্লাহ তোমাকে তাঁর নিজের সম্পর্কে ভয় দেখাচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকামী।”
সূরা আল ইনফিতারের ১৫-১৯ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন :
يُصْلَوْنَهَا يَوْمَ الدِّينِ وَمَا هُمْ عَنْهَا بِغَائِبِينَ وَمَا أَدْرَكَ مَا يَوْمُ الدِّينِ ، ثُمَّ مَا أَدْرَكَ مَا يَوْمُ الدِّينِ يَوْمَ لَا تَمْلِكُ نَفْسٍ لِنَفْسٍ شَيْئًا ، وَالْأَمْرُ يَوْمَئِذٍ لِلَّهِ
“বিচারের দিন সেখানে তারা প্রবেশ করবে এবং তা থেকে কক্ষণই অনুপস্থিত থাকতে পারবে না। আর তুমি কি জানো, সেই বিচারের দিনটি কি ? হ্যাঁ, তুমি কি জানো, সেই বিচারের দিনটি কি ? এটা সেদিন যখন কারো জন্য কিছু করার সাধ্য কারো হবে না। সেদিন ফায়সালার চূড়ান্ত ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর ইখতিয়ারেই হবে।”
কারো পক্ষে কোনো কিছু করার কোনো শক্তি থাকবে না। সূরা আত তারিকের ৯-১০ আয়াতে এ চিত্রটি আল্লাহ পাক এভাবে তুলে ধরেছেন :
يَوْمَ تُبْلَى السَّرَائِرُ فَمَا لَهُ مِنْ قُوَّةٍ وَلَا نَاصِرِ
“যেদিন গোপন অজানা তত্ত্বসমূহ যাচাই-বাছাই করা হবে, তখন মানুষের নিকট না নিজের কোনো শক্তি থাকবে, না কোনো সাহায্যকারী তার জন্য আসবে।"
সেদিন খাটি বিচার হবে
সেদিন কৌশল করে, বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে ও তীক্ষ্ণ যুক্তিতর্ক দিয়ে বিচারের রায় কোনো দিকে নিয়ে যেতে পারবে না। এ ছবি আল্লাহ সূরা আয যুমারের ৬৮-৬৯ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে :
ونُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَوتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللهُ ، ثُمَّ نُفِخَ فِيْهِ أُخْرَى فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنْظُرُونَ وَأَشْرَقَتِ الْأَرْضُ
بِنُورِ رَبِّهَا وَوُضِعَ الْكِتٰبُ وَجَائَ بِالنَّبِيِّنَ وَالشُّهَدَاءِ وَقُضِيَ بَيْنَهُمْ بِالْحَقِّ وَهُمْ لَا يُظْلَمُوْنَ .
"আর সেদিন শিঙায় ফুঁক দেয়া হবে। আর তারা সবাই মরে যাবে, যারা আকাশজগত ও যমীনে আছে, সে লোকদের ছাড়া যাদেরকে আল্লাহ জীবন্ত রাখতে চান। পরে আর একবার শিঙায় ফুঁক দেয়া হবে এবং সহসা সকলেই উঠে দেখতে শুরু করবে পৃথিবী তার আল্লাহর নূরে ঝলমল করে উঠবে। আমলনামা সামনে এনে রাখা হবে। নবী-রাসূল ও সকল সাক্ষীদেরকে উপস্থিত করা হবে। লোকদের মধ্যে যথাযথভাবে সত্য সহকারে ফায়সালা করে দেয়া হবে এবং তাদের ওপর কোনো যুলম করা হবে না।"
সূরা আল মু'মিনের ১৭ আয়াতে বলা হয়েছে:
الْيَوْمَ تُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ ، لَا ظُلْمَ الْيَوْمَ ، إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ .
"আজ প্রত্যেকটি প্রাণীকেই তার উপার্জনের প্রতিফল দেয়া হবে। আজ কারো ওপর যুলম করা হবে না। আর হিসাব গ্রহণে আল্লাহ খুব ক্ষীপ্র।"
সূরা আল কাহফ্ফের ৪৯ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَوُضِعَ الْكِتَبُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يُوَيْلَتَنَا مَالِ هُذَا الْكِتٰبِ لَا يُغَادِرُ صَغِيْرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصُهَا ، وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا ، وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا .
"আর তখন আমলনামা সামনে রেখে দেয়া হবে। তখন তোমরা দেখবে যে, অপরাধী লোকেরা নিজেদের কিতাবে লিখিত সব বিষয় সম্পর্কে খুবই ভয় পাচ্ছে। আর বলছে: হায়রে দুভার্গ্য এটা কেমন কিতাব যে, আমাদের ছোট বড় কোনো কাজই এমন থেকে যায়নি যা এতে লিপিবদ্ধ করা হয়নি! তারা যে যা করেছিল তা সবই নিজের সামনে উপস্থিত পাবে, আর তোমার আল্লাহ কারো প্রতি এক বিন্দু যুলুম করবেন না।"
সূরা আল মায়েদার ৩৬-৩৭ আয়াতে বলা হয়েছেঃ
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ أَنَّ لَهُمْ مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا وَمِثْلَهُ مَعَهُ لِيَفْتَدُوا بِهِ مِنْ عَذَابِ يَوْمِ الْقِيِّمَةِ مَا تُقْبِلَ مِنْهُمْ ، وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ يُرِيدُونَ أَنْ يَخْرُجُوا مِنَ النَّارِ وَمَا هُمْ بِخُرِجِينَ مِنْهَا ، وَلَهُمْ عَذَابٌ مُّقِيمٌ .
"ভালোরূপে জেনে নাও, যারা কুফরী নীতি অবলম্বন করেছে, সমগ্র দুনিয়ার ধন-সম্পদও যদি তাদের করায়ত্ত হয় এবং এর সাথে আরো অতো পরিমাণ একত্র করে দেয়া হয়, আর তারা যদি তা বন্ধক দিয়ে কিয়ামতের দিনের আযাব থেকে রক্ষা পেতে চায়, তবুও তা তাদের নিকট থেকে কবুল করা হবে না। তারা তীব্র যন্ত্রণাদায়ক আযাব ভোগ করতে বাধ্য হবে। জাহান্নামের অগ্নি-গহ্বর থেকে বের হয়ে যেতে চাইবে তারা; কিন্তু তা থেকে তারা বের হতে পারবে না; তাদের জন্য স্থায়ী আযাব নির্দিষ্ট করা আছে।"
সূরা আল মায়েদার ১১৯ আয়াতে বলা হয়েছে:
قَالَ اللَّهُ هَذَا يَوْمُ يَنْفَعُ الصَّدِقِينَ صِدْقُهُمْ ، لَهُمْ جَنَّتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَرُ خَلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ، رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ، ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
"তখন আল্লাহ বলবেন: আজ সেই দিন যেদিন সত্যপন্থীদেরকে তাদের সত্যবাদিতা কল্যাণদান করবে। তাদের জন্য এমন দালান সজ্জিত হবে যার নিম্নদেশ থেকে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত। এখানে তারা চিরদিন থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন, আর তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হবে, বস্তুত এটাই বিশাল সাফল্য।"
সূরা আল আনআমের ২৭ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى النَّارِ فَقَالُوا يُلَيْتَنَا نُرَدُّ وَلَا نُكَذِّبَ بِأَيْتِ رَبِّنَا وَنَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ .
"হায়! সেই সময়ের অবস্থা যদি তুমি দেখতে পারতে, যখন তাদেরকে জাহান্নামের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দেয়া হবে তখন তারা বলবে: হায়। আমরা যদি দুনিয়ায় আবার ফিরে যেতে পারতাম এবং সেখানে আল্লাহর
নিদর্শনসমূহ প্রত্যাখ্যান না করতাম ও ঈমানদার লোকদের মধ্যে শামিল হতাম!"
সূরা আল আনআমের ২৮ আয়াতে বলা হয়েছে:
بَلْ بَدَا لَهُمْ مَّا كَانُوا يُخْفُونَ مِنْ قَبْلُ ، وَلَوْ رُدُّوا لَعَادُوا لِمَا نُهُوا عَنْهُ وَإِنَّهُمْ لَكَذِبُونَ .
"মূলত একথা তারা শুধু এজন্যই বলবে যে, যে সত্যকে তারা আগে ঢেকে ও গোপন করে রেখেছিলো সে সময় তা উন্মুক্ত হয়ে তাদের সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়বে। তাদেরকে আগের জীবনের দিকেও যদি ফিরিয়ে দেয়া হয় তাহলেও তারা সেসব কাজই করতো যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। তারা তো বড়ই মিথ্যাবাদী।"
সূরা আল আনআমের ৩০ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى رَبِّهِمْ ، قَالَ الَيْسَ هَذَا بِالْحَقِّ ، قَالُوا بَلَى وَرَبِّنَا ، قَالَ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُونَ
"হায়! তোমরা যদি সেই দৃশ্য দেখতে পারো, যখন এদেরকে তাদের আল্লাহর সামনে দাঁড় করানো হবে তখন তাদের আল্লাহ তাদের জিজ্ঞেস করবেন: এটা কি সত্য নয়? তারা বলবে, হ্যাঁ, হে আমাদের আল্লাহ! এটা প্রকৃত সত্য। তখন আল্লাহ বলবেন: তাহলে এখন তোমরা প্রকৃত সত্যকে অস্বীকার ও অমান্য করার ফলস্বরূপ শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করো।"
সূরা আল আনআমের ৭০ আয়াতে বলা হয়েছে:
لَيْسَ لَهَا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيٌّ وَلَا شَفِيعٌ ، وَإِنْ تَعْدِلْ كُلَّ عَدْلٍ لايُؤْخَذْ مِنْهَا ، أُولَئِكَ الَّذِينَ أَبْسِلُوا بِمَا كَسَبُوا لَهُمْ شَرَابٌ مِّنْ حَمِيمٍ وَعَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْفُرُونَ
"আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করার জন্য কোনো বন্ধু, সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী হবে না। আর যদি সম্ভাব্য সকল জিনিস বন্ধক দিয়ে নিষ্কৃতি পেতে চায় তাহলেও তা তার নিকট থেকে কবুল করা হবে না। কেননা এসব লোক তো নিজেদের কর্মফলের কারণেই ধরা পড়ে যাবে।
সত্যকে অস্বীকার করার পরিণামে তাদেরকে ফুটন্ত গরম পানি পান করার জন্য এ পীড়নকারী আযাব ভোগ করতে দেয়া হবে।"
মহাবিচারের দিন দু ব্যাপারে হিসাব নেয়া হবে। একটি হিসাব নেয়া হবে আল্লাহর হকের ব্যাপারে। আর একটি হিসাব নেয়া হবে বান্দার হকের ব্যাপারে। দুনিয়ার কিছুদিনের জীবন চলার পথে আল্লাহ যেসব নিয়ম-কানুন ও বিধি-বিধান বেঁধে দিয়েছিলেন আসমানি কিতাব পাঠিয়ে নবী-রাসূলদের মাধ্যমে সেসব নিয়ম-কানুন ও বিধি-বিধানগুলো সূচারুভাবে মেনে চলাই ছিলো বান্দাহর দায়িত্ব কর্তব্য, এগুলোই আল্লাহর হক। আল্লাহর হকের ব্যাপারে আল্লাহ দুই রকম দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করবেন। তিনি ইচ্ছা করলে তাঁর হক অনাদায়ীদেরকে শাস্তিও দিতে পারেন। আবার ইচ্ছা করলে মাফও করে দিতে পারেন।
আর বান্দাহর হক হলো— বান্দাহর কাছে বান্দাহর দেনা-পাওনা, আচার-আচরণ, বান্দাহর প্রতি বান্দাহর কিছু আল্লাহর প্রদত্ত দায়িত্ব কর্তব্য পালন করা। বান্দাহর হকের ব্যাপারে কোনো বান্দাহ তা পালন করে না চললে এ অপরাধ আল্লাহ মাফ করবেন না। যতোক্ষণ পর্যন্ত যার হক নষ্ট হয়েছে সে তা মাফ না করবে।
সেদিন কেউ কারো কাজে আসবে না
মহাবিচারের দিন হবে খুবই কঠিন ও সংকটময় মুহূর্ত। নিজের হিসাব নিয়েই নিজে ব্যস্ত। কারো দিকে কারো নজর দেয়ার সুযোগ হবে না। একথাটিই আল্লাহ তাআলা সূরা আল বাকারার ৪৮ আয়াতে অনুপম ভঙ্গিতে প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন:
وَاتَّقُوا يَوْمًا لَا تَجْزِى نَفْسٌ عَنْ نَفْسٍ شَيْئًا وَلَا يُقْبَلُ مِنْهَا شَفَاعَةً وَلَا يُؤْخَذُ مِنْهَا عَدْلٌ وَلَا هُمْ يُنْصَرُونَ .
"ভয় করো সেদিনকে, যেদিন কেউ কারো কোনো কাজে আসবে না। কারো সম্পর্কে কোনো সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না, কোনো কিছুর বিনিময়ে কাউকেও ছেড়ে দেয়া হবে না এবং পাপীদের কোনো দিক থেকেই সাহায্য করা হবে না।"
বিপথে পরিচালনাকারী নেতার অস্বীকৃতি
দুনিয়ায় যারা মানুষদেরকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে বিপথে চালিয়েছে, নেতৃত্ব দিয়েছে তারাও ওইদিন দায় মাথায় নিবে না। এ চিত্রটি কুরআনে
আল্লাহ এভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি সূরা ইবরাহীমের ২১ আয়াতে এভাবে বলেছেন:
وَبَرَزُوا لِلَّهِ جَمِيعًا فَقَالَ الضَّعَفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا إِنَّا كُنَّا لَكُمْ تَبَعًا فَهَلْ أَنْتُمْ مُغْنُونَ عَنَّا مِنْ عَذَابِ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ ، قَالُوْا لَوْ هَدْنَا اللَّهُ لَهَدَيْنَكُمْ ، سَوَاءٌ عَلَيْنَا أَجَزِعْنَا أَمْ صَبَرْنَا مَا لَنَا مِنْ مَّحِيْصِ
"আর এ লোকেরা যখন একত্রিত হয়ে আল্লাহর সামনে উন্মোচিত হবে, তখন এদের মধ্যে যারা পৃথিবীতে দুর্বল ছিল তারা যারা বড়লোক বনেছিল তাদেরকে বলবে: দুনিয়ায় আমরা তোমাদের অধীন ছিলাম, এখন তোমরা আল্লাহর আযাব থেকে আমাদেরকে বাঁচাবার জন্যও কি কিছু করতে পারো? তারা জবাব দিবে: আল্লাহ যদি আমাদেরকেই মুক্তির কোনো পথ দেখাতেন তাহলে আমরা অবশ্যই তোমাদেরও দেখাতাম। এখন আহাজারী করি কি ধৈর্য অবলম্বন করি উভয়ই আমাদের জন্য সমান। আমাদের রক্ষা ও মুক্তিলাভের কোনো উপায়ই নেই।"
সূরা আল আনআমের ৯৪ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
وَمَا نَرَى مَعَكُمْ شُفَعَاءَ كُمُ الَّذِينَ زَعَمْتُمْ أَنَّهُمْ فِيكُمْ شُرَكُوا لَقَدْ تَقَطَّعَ بَيْنَكُمْ وَضَلَّ عَنْكُمْ مَّا كُنْتُمْ تَزْعُمُونَ .
"এখন আমরা তোমাদের সাথে তোমাদের সেই শাফায়াতকারীদেরকেও তো দেখি না, যাদের সম্পর্কে তোমরা মনে করছিলে যে, তোমাদের কার্যোদ্ধারের ব্যাপারে তাদেরও অংশ রয়েছে। তোমাদের পারস্পরিক সকল সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তোমরা যা ধারণা করতে তা সবই আজ তোমাদের নিকট থেকে বিলীন হয়ে গেছে।"
সূরা আল আনআমের ১২৮ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
يُمَعْشَرَ الْجِنِّ قَدِ اسْتَكْثَرْتُمْ مِّنَ الْإِنْسِ وَقَالَ أَوْلِيَؤُهُمْ مِّنَ الْإِنْسِ رَبَّنَا اسْتَمْتَعَ بَعْضُنَا بِبَعْضٍ وَبَلَغْنَا أَجَلَنَا الَّذِي أَجَلْتَ لَنَا ، قَالَ النَّارُ مَثْلُكُمْ خُلِدِينَ فِيهَا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ ، إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ
“হে জিন সমাজ! তোমরা তো মানব সমাজের ওপর খুব বাড়াবাড়ি করলে। মানুষের মধ্যে যারা তাদের বন্ধু ছিল তারা নিবেদন করবে: হে পরোয়ারদিগার! আমরা পরস্পরের দ্বারা খুব ফায়দা লুটেছি এবং এখন আমরা সে অবস্থায় এসে উপস্থিত হয়েছি যা তুমি আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছিলে। আল্লাহ বললেন: আচ্ছা, এখন তোমাদের চূড়ান্ত পরিণাম জাহান্নাম। এখানে তোমরা চিরদিন থাকবে। এটা হতে রক্ষা পাবে কেবল তারাই যাদেরকে আল্লাহ রক্ষা করতে চাইবেন। তোমাদের রব নিসন্দেহে সর্বজ্ঞ ও বিজ্ঞ।”
সূরা আল আরাফের ৮-৯ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
وَالْوَزْنُ يَوْمَئِذْنِ الْحَقُّ فَمَنْ تَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ، وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ بِمَا كَانُوا بِايْتِنَا يَظْلِمُونَ
“আর ওযন সেদিন নিশ্চিতই সত্য সঠিক হবে। যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই কল্যাণ লাভ করবে। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারা নিজেরাই নিজেদেরকে মহাক্ষতির সম্মুখীন করবে। কেননা তারা আমাদের আয়াতের সাথে যালেমদের ন্যায় আচরণ করছিলো।”
সূরা ইবরাহিমের ২২ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
وَقَالَ الشَّيْطَنُ لَمَّا قُضِيَ الْأَمْرُ إِنَّ اللَّهَ وَعَدَكُمْ وَعْدَ الْحَقِّ وَوَعَدْتُكُمْ فَأَخْلَفْتُكُمْ ، وَمَا كَانَ لِي عَلَيْكُمْ مِّنْ سُلْطَنٍ إِلَّا أَنْ دَعَوْتُكُمْ فَسْتَجَبْتُمْ لِي ، فَلَا تَلُومُونِي وَلُوْمُوا أَنْفُسَكُم مَا أَنَا بِمُصْرِخِكُمْ وَمَا أَنْتُمْ مِصْرِحَى إِنِّي كَفَرْتُ بِمَا أَشْرَكْتُمُونِ مِنْ قَبْلُ إِنَّ الظَّلِمِينَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
“আর যখন চূড়ান্ত ফায়সালা করে দেয়া হবে তখন শয়তান বলবে, এতে কোনোই সন্দেহ নেই যে, তোমাদের প্রতি আল্লাহ যেসব ওয়াদা করেছিলেন তা সবই সত্য ছিল। আর আমি যত ওয়াদাই করেছিলাম তার মধ্যে কোনো একটিও পুরা করিনি। তোমাদের ওপর আমার তো কোনো জোর ছিল না। আমি এটা ছাড়া আর তো কিছু করিনি—শুধু
এটাই করেছি যে, তোমাদেরকে আমার পথে চলার জন্য আহ্বান করেছি। আর তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছো। এখন আমাকে দোষ দিও না-তিরস্কার করো না, নিজেকেই নিজে তিরস্কৃত করো। এখানে না আমি তোমাদের ফরিয়াদ শুনতে পারি, না তোমরা আমার ফরিয়াদ শুনতে পারো। ইতিপূর্বে তোমরা যে আমাকে খোদায়ীর ব্যাপারে শরীক বানিয়ে নিয়েছিলে, আমি তার দায়িত্ব থেকে মুক্ত। এরূপ যালেমদের জন্য তো কঠিন পীড়াদায়ক শাস্তি নিশ্চিত।”
সূরা ইউনুসের ২৮-২৯ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন :
يَوْمَ نَحْشُرُهُمْ جَمِيعًا ثُمَّ نَقُولُ لِلَّذِينَ أَشْرَكُوا مَكَانَكُمْ أَنْتُمْ وَشَرَكَاؤُكُمْ : فَزَيَّلْنَا بَيْنَهُمْ وَقَالَ شُرَكَاؤُهُمْ مَّا كُنْتُمْ إِيَّانَا تَعْबुدُونَهُ فَكَفَى بِاللَّهِ شَهِيدًا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ إِنْ كُنَّا عَنْ عِبَادَتِكُمْ لَغْفِلِينَ )
“যেদিন আমরা এ সকলকে একত্রে (আমার বিচারালয়ে) উপস্থিত করবো তখন যারা দুনিয়ায় শিরক করেছে তাদের আমরা বলবো : থাম, তোমরা ও তোমাদের বানানো শরীক মাবুদেরা সকলেই। অতপর আমরা তাদের পারস্পরিক অপরিচিতির আবরণ তুলে ফেলবো। তখন তাদের শরীক মাবুদেরা বলবে: তোমরা তো আমাদের ইবাদাত করতে না। আমাদের ও তোমাদের মাঝে আল্লাহর সাক্ষই যথেষ্ট, আমরা তোমাদের এ ইবাদাত সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনবহিত ছিলাম।”
হিসাব ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করবে
ভয়াবহ এ দিনেও কিছু ভাগ্যবান লোক হিসাব নিকাশ ছাড়াই আত্মতৃপ্তির সাথে জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি পাবে। আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন:
يُحْشَرُ النَّاسُ فِي سَعِيدٍ وَاحِدٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُنَادِ مُنَادٍ فَيَقُولُ أَيْنَ الَّذِينَ كَانَتْ تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ فَيَقُومُونَ وَهُمْ قَلِيلٌ فَيَدْخُلُونَ الْجَنَّتَ بِغَيْرِ حِسَابٍ ثُمَّ يُؤْمَرُ سَائِرُ النَّاسِ إِلَى الْحِسَابِ
"হাশরের দিন মানুষকে একত্রিত করে উঠানো হবে। অতপর একজন আহ্বানকারী চিৎকার করে আহ্বান জানাবে, তারা কোথায়? যাদের
পিঠ বিছানায় লাগতো না। এ আহ্বান শুনে কিছু লোক দাঁড়িয়ে যাবে। অবশ্য তাদের সংখ্যা হবে খুবই কম। তারপর তারা হিসাব ছাড়া জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি পাবে। তারপর নির্দেশ দেয়া হবে অন্যদের হিসাব গ্রহণের।"-বায়হাকী

📘 কুরআনে আকা আখিরাতের ছবি > 📄 মীযান

📄 মীযান


আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, পরকালের জীবনের শুরু মানুষের মৃত্যু দিয়েই। আল্লাহর পরিকল্পনা অনুযায়ী দুনিয়ার জীবন শেষ হলেই তিনি ইসরাফীলের শিঙার ফুঁকের মাধ্যমে গোটা পৃথিবী ও এর মধ্যে যা কিছু আছে সবকিছু লণ্ডভণ্ড ও তছনছ করে দেবেন। যারা দুনিয়ার সৃষ্টির শুরুতে ছিলেন তারা তো মৃত্যুবরণ করেছেন হাজার হাজার বছর আগে। আর যারা কিয়ামতের সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকবে তারা কিয়ামতের দিন মরে যাবে। এবার শুরু হবে কিয়ামতের মাধ্যমে মানুষের পরকালের জীবনের আল্লাহর করে রাখা স্তরের পর স্তর অতিক্রম করার পালা।
ইসরাফীলের তৃতীয় শিঙা ফুঁকার মাধ্যমে মানুষ স্ব স্ব স্থান থেকে উঠে আসবে। সে সময়টার নামই হাশর। সব মানুষ তার দুনিয়ার জীবনের আমল অনুযায়ী এক এক অবস্থায় এক একজন উঠে আসবে আল্লাহর ব্যবস্থাপনায় করে রাখা হাশরের ময়দানে। পূর্বে এর ওপর আলোচনা করা হয়েছে।
এবার শুরু হবে মানুষের দুনিয়ার জীবনে করে আসা আমলের পরিমাপের জন্য মীযান অতিক্রম করার পালা। মীযান অর্থ হলো দাঁড়ি-পাল্লী। মানুষের নেক কাজ ও পাপ কাজ আল্লাহ তার সামনেই পরিমাপ করে দেখাবেন। মানুষ যেনো বুঝে আজ তার ওপর কোনো যুলুম ও অন্যায় করা হচ্ছে না। যা সে করেছে আজ তাই সে পাচ্ছে। মানুষের নেক ও বদ কাজের পরিমাপ হচ্ছে তা বুঝার জন্য মিযান শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। পরিমাপের ধরন কি হবে তা আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। আমরা দুনিয়ার জীবনে দাঁড়িপাল্লার মাধ্যমে জিনিস-পত্র পরিমাপ করি। অন্যান্য অনেক জিনিসের মাধ্যমে বিভিন্ন জিনিস মাপি। কাজেই পরকালে পরিমাপ হবে এটা বুঝাবার জন্য আল্লাহ মীযান শব্দ কুরআনেও ব্যবহার করেছেন। সূরা আল আম্বিয়ার ৪৭ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيمَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا ، وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ آتَيْنَا بِهَا ، وَكَفَى بِنَا حَسِبِيْنَ
"আমি সঠিক ও নির্ভুল ওযন করার জন্য কিয়ামতের দিন পাল্লা সংস্থাপন করবো। ফলে কোনো লোকের ওপরই এক কণা পরিমাণ
যুলুম করা হবে না। একবিন্দু পরিমাণ কৃতকর্মও সেদিন আমি সামনে নিয়ে আসবো। আর হিসাব সম্পন্ন করার জন্য আমিই যথেষ্ট।”
সূরা লুকমানের ১৬ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
إِنَّهَا إِنْ تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ فَتَكُنْ فِي صَخْرَةٍ أَوْ فِي السَّمَوتِ أَوْ فِي الْأَرْضِ يَأْتِ بِهَا اللَّهُ ، إِنَّ اللَّهَ لَطِيفٌ خَبِيْرُهُ
“কোনো বস্তু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় এরপর তা যদি পাথরের মধ্যে কিংবা আকাশ বা ভূগর্ভেও থাকে আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী ও সবজান্তা।”
সূরা আল আ'রাফের ৮-৯ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
وَالْوَزْنُ يَوْمَئِدْنِ الْحَقُّ فَمَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ بِمَا كَانُوا بِآيَتِنَا يَظْلِمُونَ
“আর ওযন সেদিন নিশ্চিতই সত্য সঠিক হবে। যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই কল্যাণ লাভ করবে। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারা নিজেরাই নিজেদেরকে মহাক্ষতির সম্মুখীন করবে। কেননা তারা আমাদের আয়াতের সাথে যালেমদের ন্যায় আচরণ করছিলো।"
সূরা আল কারিআর ৬-১১ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
فَأَمَّا مَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَهُوَ فِي عِيْشَةٍ رَاضِيَةٍ ، وَأَمَّا مَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ ، فَأُمُّهُ هَاوِيَةٌ ، وَمَا أَدْرَاكَ مَاهِيَهُ نَارٌ حَمِيَةً
"অতপর যার পাল্লা ভারী হবে সে পসন্দ মতো সুখে থাকবে। আর যার পাল্লা হালকা হবে, গভীর গহ্বরই হবে তার আশ্রয়স্থল। তুমি কি জান তা কি জিনিস? জ্বলন্ত আগুন!”
সূরা যিলযালের ৭-৮ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ 8
"কেউ যদি দুনিয়ায় অণু-পরমাণু পরিমাণ সৎকাজ করে হাশরের ময়দানে তা সে দেখতে পাবে। অপর পক্ষে কেউ যদি দুনিয়ায় অণু- পরমাণু পরিমাণ বদ কাজ করে তাও সে সেখানে দেখতে পাবে।" সূরা আন নাহলের ১১১ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
يَوْمَ تَأْتِي كُلُّ نَفْسٍ تُجَادِلَ عَنْ نَّفْسِهَا وَتُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَّا عَمِلَتْ وَهُمْ لا يُظْلَمُونَ .
"এসব কিছুরই ফায়সালা সেদিন হবে যে দিন প্রত্যেক ব্যক্তি কেবল নিজের বাঁচার চিন্তায় লেগে থাকবে এবং প্রত্যেককেই তার কৃতকর্মের বদলা পুরোপুরি দেয়া হবে। আর কারো ওপর এক বিন্দু পরিমাণও যুলুম হতে পারবে না।”
আততারগীব ওয়াততারহীবে উদ্ধৃত হয়েছে: হযরত আনাস রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, কিয়ামতের দিন মীযানের কাছে একজন ফেরেশতাকে নিয়োগ দেয়া হবে। নিজ নিজ আমলের পরিমাপের জন্য মানুষ এ মীযানের কাছে আসবে। এখানে আসার পরই তাকে পাল্লার মাঝ খানে দাঁড় করানো হবে। পরিমাপে তার নেক আমলের পরিমাণ বেশী হলে ফেরেশতারা চিৎকার দিয়ে ঘোষণা করবে অমুক লোক আজ হতে চিরদিনের জন্য ভাগ্যবান হিসাবে চিহ্নিত হলো। আর কোনো দিন সে দুর্দশাগ্রস্ত হবে না। তার এ উচ্চ স্বরের ঘোষণা সমস্ত সৃষ্টি শুনতে পাবে। আর পরিমাপে তার আমলের পরিমাণ কম হলে একজন ফেরেশতা বিকট শব্দে চিৎকার দিয়ে বলবে। অমুক ব্যক্তি চিরদিনের জন্য বিফল ও ব্যর্থ হয়ে গেলো। সে আর কোনো সময় ভাগ্যবান হবে না। এ চিৎকার ধ্বনীও সমস্ত সৃষ্টি শুনতে পাবে।
হাশরের ময়দানে এভাবে মীযান কায়েম করে আল্লাহ তাআলা মানুষের নেক আমল ও বদ আমলের পরিমাপ তাদেরকে দেখিয়ে দেবেন। কারো পক্ষেই সেদিন আল্লাহর এ সূক্ষ্ম ব্যবস্থার ব্যাপারে কিছু বলার ও করার থাকবে না। অসহায়ের মতো মানুষ শুধু পরকালের জন্য করে রাখা সোপানের পর সোপানের দিকে এগুতে এগুতে চূড়ান্ত ফল জান্নাত ভোগ করার দিকে এগিয়ে যাবে।

📘 কুরআনে আকা আখিরাতের ছবি > 📄 আদালত

📄 আদালত


আমলনামা
হাশরের ময়দানে মীযান কায়েম করে মানুষের নেক আমল ও বদ আমলের পরিমাপের পর আল্লাহ তাআলা প্রত্যেকের হাতে তার পরিমাপ করা আমলনামা দিয়ে দেবেন। কুরআনের ভাষায় এ আমলনামাকেই কিতাব বলা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা হাশরের ময়দানের এ সোপানের ছবি সূরা আল জাসীয়ার ২৮-২৯ আয়াতে এভাবে এঁকেছেন:
كُلُّ أُمَّةٍ تُدْعَى إِلَى كِتَبِهَا الْيَوْمَ تُجْزَوْنَ مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ هُذَا كِتَبُنَا يَنْطِقُ عَلَيْكُمْ بِالْحَقِّ إِنَّا كُنَّا نَسْتَنْسِخُ مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ
"প্রত্যেক দলকেই ডেকে বলা হবে, এসো ও নিজ নিজ আমলনামা দেখে নাও। তাদেরকে বলা হবে, আজ তোমাদেরকে সেইসব আমলের বদলা দেয়া হবে যা তোমরা করছিলে। এটা আমাদের তৈরি করা আমলনামা। এটা তোমাদের ব্যাপারে সঠিক ও নির্ভুল সাক্ষ দিচ্ছে। তোমরা যাকিছু করছিলে, আমরা তা লিখে রেখেছিলাম।"
সূরা আল মুজাদালার ৬ আয়াতে এর ছবি আল্লাহ এঁকেছেন এভাবে:
يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ اللهُ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُهُمْ بِمَا عَمِلُوا أَحْصُهُ اللَّهُ وَنَسُوهُ . وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ
"সেদিন হবে, যখন আল্লাহ তাআলা এদের সকলকে পুনরায় জীবিত করে উঠাবেন এবং তারা যাকিছু করে এসেছে তা তাদেরকে জানিয়ে দিবেন। তারা তো ভুলে গেছে, কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের যাবতীয় কৃতকর্ম হিসাব করে সংরক্ষিত করে রেখেছেন। আর আল্লাহ প্রত্যেকটি জিনিসের ব্যাপারে সাক্ষী।"
সূরা যিলযালের ৬-৮ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
يَوْمَئِذٍ يَصْدُرُ النَّاسُ أَشْتَاتًا لا لَيُرَوْا أَعْمَالَهُمْ فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ
“সেদিন লোকেরা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ফিরে আসবে, যেন তাদের আমল তাদেরকে দেখানো যায়। কেউ যদি দুনিয়ায় অণু-পরমাণু পরিমাণ সৎকাজ করে হাশরের ময়দানে তা সে দেখতে পাবে। অপর পক্ষে কেউ যদি দুনিয়ায় অণু-পরমাণু পরিমাণ বদ কাজ করে তাও সে সেখানে দেখতে পাবে।”
সূরা বনী ইসরাঈলের ১৩-১৪ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ القِيمَةِ كِتبًا يَلْقَهُ مَنْشُورًا اقْرَأْ كِتَبَكَ ، كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا .
“আর কিয়ামতের দিন আমরা একটি লিপিকা তার জন্য প্রকাশ করবো যাকে সে উন্মুক্ত গ্রন্থ হিসেবে পাবে। পড়ো নিজের আমলনামা, আজ নিজের হিসাব ঠিক করার জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট।”
সূরা আল ইনশিকাকের ৭-১২ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتْبَهُ بِيَمِينِهِ فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يُسِيرًا وَيَنْقَلِبُ إِلَى أَهْلِهِ مَسْرُورًا * وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتُبَهُ وَرَاءَ ظَهْرِهِ ، فَسَوْفَ يَدْعُوا تُبُوْراهُ وَيَصْلَى سَعِيرًا
“অতপর যার আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে, তার হিসাব সহজভাবে গ্রহণ করা হবে। এবং সে তার আপনজনের দিকে সানন্দচিত্তে ফিরে যাবে। আর যে ব্যক্তির আমলনামা তার পিছন দিক থেকে দেয়া হবে, সে মৃত্যুকে ডাকবে ও জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিপতিত হবে।”
সূরা আল হাক্কার ১৯-২৪ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
. فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتُبَهُ بِيَمِينِهِ لا فَيَقُولُ هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَبِيَهُ ، إِنِّي ظَنَنْتُ أَنِّي مُلْقٍ حِسَابِيَهُ ، فَهُوَ فِي عِيْشَةٍ رَاضِيَةٍ فِي جَنَّةٍ عَالِيَةٍ قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ ، كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا بِمَا أَسْلَفْتُمْ فِي الْأَيَّامِ الْخَالِيَةِ
“সে সময় অর্থাৎ হাশরের দিন যার আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, দেখ দেখ, পড় আমার আমলনামা। আমি মনে
করেছিলাম যে, আমার হিসাব অবশ্যই পাওয়া যাবে। ফলে তারা বাঞ্ছিত সুখ সম্ভোগে লিপ্ত থাকবে। উচ্চতম স্থানের জান্নাতে। যার ফলসমূহের গুচ্ছ ঝুলে থাকবে। এ লোকদেরকে বলা হবে, স্বাদ নিয়ে খাও, পান করো, তোমাদের সেইসব আমলের বিনিময়ে যা তোমরা অতীত দিনসমূহে করেছো।”
মীযানে নেক পাপের পরিমাপের পর যার ওযনের ফল—আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে তার ব্যাপারে কড়াকড়ি করা হবে না। সে হাসি খুশী মনে আমলনামা নিয়ে স্বজনদের কাছে ফিরে যাবে। আর যার আমলনামা তার পেছন দিয়ে দেয়া হবে সে জাহান্নামের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হবে।
আমলনামা হাতে পাবার এ ছবি আল্লাহ পাক সূরা আল হাক্কার ১৯-২০ আয়াতে এভাবে এঁকেছেন:
فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتٰبَهُ بِيَمِينِهِ فَيَقُولُ هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتٰبِيَهُ إِنِّي ظَنَنْتُ أَنِّي مُلْقٍ حِسَابِيَة
"সে সময় অর্থাৎ হাশরের দিন যার আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, দেখ দেখ, পড় আমার আমলনামা। আমি মনে করেছিলাম যে, আমার হিসাব অবশ্যই পাওয়া যাবে।”
সূরা আল কাহফ্ফের ৪৯ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
وَوُضِعَ الْكِتٰبُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يُوَيْلَتَنَا مَالِ هَذَا الْكِتٰبِ لَا يُغَادِرُ صَغِيْرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصٰهَا ، وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا ، وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا .
"আর তখন আমলনামা সামনে রেখে দেয়া হবে। তখন তোমরা দেখবে যে, অপরাধী লোকেরা নিজেদের কিতাবে লিখিত সব বিষয় সম্পর্কে খুবই ভয় পাচ্ছে। আর বলছে: হায়রে দুভার্গ্য এটা কেমন কিতাব যে, আমাদের ছোট বড় কোনো কাজই এমন থেকে যায়নি যা এতে লিপিবদ্ধ করা হয়নি! তারা যে যা করেছিল তা সবই নিজের সামনে উপস্থিত পাবে, আর তোমার আল্লাহ কারো প্রতি এক বিন্দু যুলুম করবেন না।”
শাফাআত
আমলনামা হাতে আসার পর কোনো কোনো মু'মিন নেক আমলের জন্য আটকে গেলে জান্নাতে প্রবেশের ফায়সালা না পেলে আল্লাহর হুকুমে আল্লাহর কিছু নেক বান্দা তাদের জন্য সুপারিশ করতে পারবেন। এ সুপারিশে ঈমানদারগণই উপকৃত হবেন। এখানে স্মরণ রাখতে হবে হাশরের ময়দানে সুপারিশের যোগ্য হবেন মু'মিনরা। কাফির মুশরিকদের জন্য কোনো সুপারিশ নেই।
আল্লাহর রাসূল বলেছেন, কিয়ামতের দিন তিনদল লোক শাফাআত করতে পারবেন: (১) নবী-রাসূলগণ (২) আলেমগণ, (৩) শহীদগণ।
তবে শাফাআত বা সুপারিশ করা খুবই কঠিন ব্যাপার। আল্লাহ তাআলা সূরা আল বাকারার ২৫৫ আয়াতে এ চিত্র এঁকেছেন এভাবে:
مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ .
"কে এমন আছে যে, তাঁর দরবারে তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করতে পারে?"
সূরা ত্বা-হার ১০৯ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
يَوْمَئِذٍ لا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ إِلَّا مَنْ آذَنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِي لَهُ قَوْلاً
"সেদিন শাফাআত কার্যকর হবে না, অবশ্য স্বয়ং রহমান কাউকে তার অনুমতি দিলে এবং তার কথা শুনতে পসন্দ করলে অন্য কথা।"
সূরা আল মু'মিনের ১৮ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
مَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ حَمِيمٍ وَلَا شَفِيعٍ يُطَاعُ
"যালেমদের কেউ দরদী বন্ধু হবে না, না এমন কোনো শাফাআতকারী, যার কথা মেনে নেয়া হবে।"
সূরা আনআমের ৯৪ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
وَمَا نَرَى مَعَكُمْ شُفَعَاءَ كُمُ الَّذِينَ زَعَمْتُمْ أَنَّهُمْ فِيْكُمْ شُرَكَؤُوا ، لَقَدْ تَقَطَّعَ بَيْنَكُمْ وَضَلَّ عَنْكُمْ مَّا كُنْتُمْ تَزْعُمُونَ
"এখন আমরা তোমাদের সাথে তোমাদের সেই শাফাআতকারীদেরকেও তো দেখি না, যাদের সম্পর্কে তোমরা মনে করছিলে যে, তোমাদের
কার্যোদ্ধারের ব্যাপারে তাদেরও অংশ রয়েছে। তোমাদের পারস্পরিক সকল সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তোমরা যা ধারণা করতে তা সবই আজ তোমাদের নিকট থেকে বিলীন হয়ে গেছে।"
সূরা আন নাজমের ২৬ আয়াতে এঁকেছেন এভাবে:
لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَنْ يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَرْضَى .
"তাদের শাফাআত কোনো কাজেই আসতে পারে না যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা এমন কোনো ব্যক্তির পক্ষে তার অনুমতি দিবেন, যার জন্য তিনি কোনো আবেদন শুনতে ইচ্ছা করবেন এবং তা পসন্দ করবেন।"
পুলসিরাত
আল কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, আখিরাতে হাশরের ময়দানের চারদিকে জাহান্নামকে দিয়ে ঘিরে দেয়া হবে। হাশরের ময়দান হতে জান্নাত পর্যন্ত দীর্ঘ সেতু বা পুলসিরাত স্থাপন করা হবে। এ পুলসিরাত হবে চুলের চেয়ে চিকন তরবারীর চেয়ে ধারালো। সকলকেই এ পুলসিরাত পার হয়ে জান্নাতে পৌঁছতে হবে।
সূরা মারইয়ামের ৭১ আয়াতে এ বিষয়টিকে এভাবে চিত্রিত করেছেন:
وَإِنْ مِّنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا ، كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَّقْضِيًّا .
"তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে, জাহান্নামের ওপর উপস্থিত হবে না। এটাতো একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকৃত কথা। একে পুরা করা তোমার আল্লাহর দায়িত্ব।”
নেক আমলকারী যারা ডান হাতে আমলনামা পাবে তারা সহজেই চোখের পলকে পুলসিরাত পার হয়ে জান্নাতে চলে যাবে। আর বদ আমলকারীরা বাম হাতে বা পেছনের দিক দিয়ে আমলনামা পাবে। তারা পুলসিরাত পার হতে পারবে না। হাত-পা কেটে তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। সেদিন ঈমানের নূর ছাড়া আর কোনো নূর থাকবে না।
সূরা আল হাদীদের ১২-১৩ আয়াতে বলা হয়েছে:
يَوْمَ تَرَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ يَسْعَى نُورُهُمْ بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِمْ شربكُمُ الْيَوْمَ جَنَّتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَرُ خَلِدِينَ فِيهَا ، ذَلِكَ هُوَ
الْفَوْزُ الْعَظِيمُ يَوْمَ يَقُولُ الْمُنْفِقُونَ وَالْمُنْفِقتُ لِلَّذِينَ آمَنُوا انْظُرُونَا نَقْتَبِسْ مِنْ نُّوْرِكُمْ قِيلَ ارْجِعُوا وَرَاءَكُمْ فَالْتَمِسُوا نُورًا ، فَضُرِبَ بَيْنَهُمْ بِسُورٍ لَّهُ بَابٌ ، بَاطِنُهُ فِيْهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُهُ مِنْ قِبَلِهِ الْعَذَابُ .
"সেদিন যখন তোমরা মু'মিন পুরুষ ও স্ত্রীলোকদেরকে দেখবে যে, তাদের আলো তাদের সামনে সামনে এবং তাদের ডান দিকে দৌড়াতে থাকে। আজ সুসংবাদ রয়েছে তোমাদের জন্য। জান্নাতসমূহ হবে যেসবের নিম্নদেশে ঝরণাধারাসমূহ প্রবহমান হয়ে থাকবে, যাতে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই হলো বড় সাফল্য। সেদিন মুনাফিক পুরুষ ও স্ত্রীলোকদের অবস্থা এই হবে যে, তারা মু'মিন লোকদেরকে বলবে: আমাদের দিকেও একটু দেখ, যেন আমরা তোমাদের আলো থেকে কিছুটা উপকার লাভ করতে পারি। কিন্তু তাদেরকে বলা হবে: পিছনে সরে যাও, অন্য কোথাও থেকে নিজেদের জন্য নূর সন্ধান করে নাও। অতপর তাদের মাঝে একটি প্রাচীরের আড়াল দাঁড় করিয়ে দেয়া হবে, যাতে একটা দুয়ার থাকবে। সেই দুয়ারের ভিতরে রহমত থাকবে এবং বাইরে থাকবে আযাব।"

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00