📄 কেয়ামতের দৃশ্যের প্রাকৃতিক অবস্থা
কিয়ামত সংঘটিত হবার দিনের প্রাকৃতিক অবস্থার বর্ণনা করে কুরআনে ৩২ জায়গায় বলা হয়েছে।
সূরা আল কাহফ্ফের ৪৭ আয়াতে বলা হয়েছে:
يَوْمَ نُسَيِّرُ الْجِبَالَ وَتَرَى الْأَرْضَ بَارِزَةً ، وَحَشَرْتُهُمْ فَلَمْ نُغَادِرُ مِنْهُمْ أَحَدًا
"মূলত চিন্তা ও ভাবনা তো সেদিনের হওয়া আবশ্যক, যখন আমরা পাহাড়-পবর্তগুলোকে চালিত করবো। তখন তুমি যমীনকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ দেখতে পাবে। আর আমরা সমস্ত মানুষকে এমনভাবে ঘিরে একত্রিত করবো যে, (আগের ও পরের) কেউই বাকী থাকবে না।"
সূরা ত্বা-হার ১০৫-১০৭ আয়াতে বলা হয়েছে:.
وَيَسْتَلُونَكَ عَنِ الْجِبَالِ فَقُلْ يَنْسِفُهَا رَبِّي نَسْفَا فَيَذَرُهَا قَاعًا صَفْصَفَاهُ لأَتَرَى فِيْهَا عِوَجًا وَلَا أَمْتَاهُ
"এ লোকেরা তোমার নিকট জিজ্ঞেস করে যে, সেদিন এ পাহাড় কোথায় বিলীন হয়ে যাবে? বলো, আমার রব এগুলোকে ধূলিকণায় পরিণত করে উড়িয়ে দিবেন। আর যমীনকে এমন সমতল রুক্ষ্ম-ধূসর ময়দানে পরিণত করবেন যে, তুমি তাতে কোনো উঁচু-নীচু এবং সংকোচন দেখতে পাবে না।"
সূরা আল আম্বিয়ার ১০৪ আয়াতে বলা হয়েছে:
يَوْمَ نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَيِّ السَّجِلِ لِلْكُتُبِ ، كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ . وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَعِلَيْنَ
"সেদিন, যেদিন আমরা আসমানকে তাবিজের পৃষ্ঠাগুলোর মতো ভাঁজ করে রাখবো। যেভাবে সর্বপ্রথম আমরা সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম। অনুরূপভাবে আমরা তার পুনরাবৃত্তি করবো। এটা একটি ওয়াদাবিশেষ যা পূরণ করার দায়িত্ব আমাদের। আর এ কাজ আমাদের অবশ্যই করতে হবে।"
সূরা আল হজ্জের ২ আয়াতে বলা হয়েছে :
يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكْرَى وَمَا هُمْ بِسُكْرَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدُه
"যেদিন তোমরা তাকে দেখবে সেদিন অবস্থা এই হবে যে, প্রত্যেক স্তন্যদানকারিণী নিজের দুগ্ধপোষ্য সন্তান থেকে গাফেল হয়ে যাবে। গর্ভবতী নারীর গর্ভ খসে পড়বে এবং লোকদেরকে তোমরা উদভ্রান্ত দেখতে পাবে। অথচ তারা নেশাগ্রস্ত হবে না। বরং আল্লাহর আযাবই এতদূর সাংঘাতিক হবে!" সূরা আল ফুরকানের ২৫ আয়াতে বলা হয়েছে :
وَيَوْمَ تَشَقَّقُ السَّمَاءُ بِالْغَمَامِ وَنُزِّلَ الْمَلَئِكَةُ تَنْزِيلاً
"আকাশজগত দীর্ণ করে এক মেঘপিণ্ড সেদিন আত্মপ্রকাশ করবে, আর ক্রমাগতভাবে ফেরেশতা নাযিল করা হবে।"
সূরা আন নামলের ৮৭-৮৮ আয়াতে বলা হয়েছে :
وَيَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّورِ فَفَزِعَ مَنْ فِي السَّمَوتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللهُ ، وَكُلُّ أَتَوْهُ دُخرِينَ ، وَتَرَى الْجِبَالَ تَحْسَبُهَا جَامِدَةً وَهِيَ تَمُرُّ مَرَّ السَّحَابِ صُنْعُ اللهِ الَّذِي أَتْقَنَ كُلَّ شَيْءٍ ، إِنَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَفْعَلُوْنَ
"আর সেদিন কি হবে যেদিন শিঙায় ফুঁক দেয়া হবে এবং ভীত কম্পিত হয়ে পড়বে সেসব যাকিছু আসমান ও যমীনে রয়েছে—তাদের ছাড়া যাদেরকে আল্লাহ এ ভীষণ অবস্থায় বাঁচাতে চাইবেন এবং যখন সবাই কান চেপে তাঁর সমীপে হাযির হয়ে যাবে! আজ তুমি পাহাড় মনে করছো যে, তা বুঝি খুব দৃঢ়মূল হয়ে আছে; কিন্তু তখন এটা মেঘমালার মতোই উড়তে থাকবে! এটা হবে আল্লাহর কুদরতের বিস্ময়কর কীর্তি, যিনি প্রত্যেকটি জিনিসকেই সুষ্ঠুভাবে মযবুত করে বানিয়েছেন। তোমরা কি করেছো তা তিনি খুব ভালোভাবেই জানেন।"
সূরা ইয়াসিনের ৫১-৫৩ আয়াতে বলা হয়েছে :
وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَإِذَاهُمْ مِّنَ الْأَجْدَاثِ إِلَى رَبِّهِمْ يَنْسِلُوْنَ قَالُوا
يُوَيْلَنَا مَنْ بَعَثَنَا مِنْ مَّرْقَدِنَا هَذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمَنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُونَ إِنْ كَانَتْ إِلا صَيْحَةً وَاحِدَةً فَإِذَا هُمْ جَمِيعُ لَّدَيْنَا مُحْضَرُونَ
“পরে এক শিঙায় ফুঁক দেয়া হবে। আর সহসা তারা নিজেদের আল্লাহর সমীপে উপস্থিত হবার জন্য নিজেদের কবরসমূহ থেকে বের হয়ে পড়বে। ভীত শংকিত হয়ে বলবে: 'হায়রে! আমাদেরকে কে আমাদের শয়নস্থল থেকে উঠিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলো? এটা সেই জিনিস, দয়াময় আল্লাহ যার ওয়াদা করেছিলেন। আর নবী-রাসূলগণের কথা তো সত্যিই ছিল। একটি মাত্র প্রচণ্ড শব্দ হবে, আর সকলকেই আমাদের সামনে উপস্থিত করে দেয়া হবে।”
সূরা আয যুমারের ৬৭-৬৯ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَمَا قَدَرُوا اللهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيمَةِ وَالسَّمَوتُ مطويتُ بِيَمَيْنِهِ ، سُبْحْنَهُ وَتَعْلَى عَمَّا يُشْرِكُونَ ، وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَوتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلا مَنْ شَاءَ اللَّهُ ، ثُمَّ نُفِخَ فِيْهِ أُخْرَى فَإِذَا هُمْ قِيَامَ يَنْظُرُونَ وَأَشْرَقَتِ الْأَرْضُ بِنُورِ رَبِّهَا وَوُضِعَ الْكُتُبُ وَجَائَ بِالنَّبِيِّنَ وَالشُّهَدَاءِ وَقُضِيَ بَيْنَهُمْ بِالْحَقِّ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
"এ লোকেরা তো আল্লাহর কোনো কদরই করলো না; তাদের কদর করা যতখানি উচিত। (তাঁর পূর্ণমাত্রার কুদরতের অবস্থা তো এই যে,) কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী তাঁর মুষ্ঠির মধ্যে হবে এবং আকাশজগত তাঁর ডান হাতের মধ্যে পেঁচানো অবস্থায় থাকবে। এ লোকেরা যে শিরক করে তা থেকে তিনি পবিত্র ও ঊর্ধে। আর সেদিন শিঙায় ফুঁক দেয়া হবে। আর তারা সবাই মরে পড়ে যাবে, যারা আকাশজগত ও যমীনে আছে, সেই লোকদের ছাড়া যাদেরকে আল্লাহ জীবন্ত রাখতে চান। পরে আর একবার শিঙায় ফুঁক দেয়া হবে এবং সহসা সকলেই উঠে দেখতে শুরু করবে। পৃথিবী তার আল্লাহর নূরে ঝলমল করে উঠবে। আমলনামা সামনে এনে রাখা হবে। নবী-রাসূল ও সকল সাক্ষীদেরকে উপস্থিত করা হবে। লোকদের মধ্যে যথাযথভাবে সত্য সহকারে ফায়সালা করে দেয়া হবে এবং তাদের ওপর কোনো যুলুম করা হবে না।" -সূরা আয যুমার: ৬৭-৬৯
সূরা আদ দুখানের ১০-১১ আয়াতে বলা হয়েছে:
فَارْتَقِبْ يَوْمَ تَأْتِي السَّمَاءُ بِدُخَانٍ مُّبِيْنٍ يَغْشَى النَّاسَ ، هَذَا عَذَابٌ أَلِيمٌ
"আচ্ছা, তোমরা অপেক্ষা করো সেই দিনের যখন আকাশজগত সুস্পষ্ট ধোঁয়া নিয়ে আসবে এবং তা লোকদের ওপর আচ্ছন্ন হয়ে যাবে। এটা হলো পীড়াদায়ক আযাব।"
সূরা ক্বাফ-এর ৪৪ আয়াতে বলা হয়েছে:
يَوْمَ تَشَقَّقُ الْأَرْضُ عَنْهُمْ سِرَاعًا ، ذَلِكَ حَشْرٌ عَلَيْنَا يَسِيرُه "পৃথিবী দীর্ণ-বিদীর্ণ হবে, আর লোকেরা তার ভিতর থেকে বের হয়ে দ্রুততার সাথে পালিয়ে যেতে থাকবে। এ একত্রিতকরণ আমাদের জন্য খুবই সহজ।"
সূরা আত তূরের ৯-১০ আয়াতে বলা হয়েছে:
يَوْمَ تَمُورُ السَّمَاءُ مَوْرًا وَتَسِيْرُ الْجِبَالُ سَيْرًا هُ "তা সেদিন সংঘটিত হবে যখন আকাশজগত খুব মারাত্মকভাবে থরথর করে কাঁপবে। আর পর্বতসমূহ উড়ে বেড়াবে।”
সূরা আল কামারের ৬-৮ আয়াতে বলা হয়েছে:
فَتَوَلَّ عَنْهُمْ ، يَوْمَ يَدْعُ الدَّاعِ إِلَى شَيْءٍ نُّكُرٍ خُشَعًا أَبْصَارُهُمْ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَجْدَاثِ كَأَنَّهُمْ جَرَادُ مُنْتَشِرُهُ مُهْطِعِينَ إِلَى الدَّاعِ ، يَقُولُ الْكُفِرُونَ هَذَا يَوْمٌ عَسِرُه
"অতএব হে নবী! এদের থেকে লক্ষ ফিরিয়ে নাও যেদিন আহ্বানকারী এক কঠিন দুঃসহ জিনিসের দিকে আহ্বান জানাবে, সেদিন লোকেরা শংকাগ্রস্ত, কুণ্ঠিত চোখে নিজেদের কবরসমূহ থেকে এমনভাবে বের হবে, মনে হবে তারা যেন বিক্ষিপ্ত পঙ্গপাল। তারা আহ্বানকারীর দিকে দৌড়িয়ে যেতে থাকবে। আর এ অমান্যকারীরাই (যারা দুনিয়ায় তার সত্যতা মেনে নিতে অস্বীকার করতো) তখন বলবে: এ দিনটিতো বড়ই কঠিন কষ্টময়।”
সূরা আর রাহমানের ৩৫ আয়াতে বলা হয়েছেঃ
يُرْسَلُ عَلَيْكُمَا شُوَاظٌ مِّنْ نَّارٍ ، وَنُحَاسُ فَلَا تَنْتَصِرْنِ
"(পালিয়ে যেতে চেষ্টা করলে) তোমাদের উপর আগুনের শিখা ও ধোঁয়া ছেড়ে দেয়া হবে, তোমরা যার মুকাবিলা করতে পারবে না।"
সূরা আর রাহমানের ৩৭ আয়াতে বলা হয়েছে:
فَإِذَا انْشَقَّتِ السَّمَاءُ فَكَانَتْ وَرْدَةً كَالدِّهَانِ
“(অতপর কি হবে তখন) যখন নভোজগত দীর্ণ-বিদীর্ণ হয়ে যাবে ও লাল চামড়ার মতো রক্তবর্ণ ধারণ করবে?”
সূরা আল ওয়াকেয়ার ৩-৬ আয়াতে বলা হয়েছে:
خَافِضَةٌ رَّافِعَةٌ هُ إِذَا رُجَّتِ الْأَرْضُ رَجَّاهُ وَيُسَّتِ الْجِبَالُ بَسَّاهُ فَكَانَتْ هَبَاءُ مُنْبَنَّاهُ
"তা হবে উঁচু-নিচুকারী মহাপ্রলয়। পৃথিবীটা তখন হঠাৎ করে নেড়ে কাঁপিয়ে দেয়া হবে। আর পাহাড় এমনভাবে বিন্দু বিন্দু করে দেয়া হবে যে, তা বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত হয়ে যাবে।”
সূরা হাক্কার ১৪ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَحُمِلَتِ الْأَرْضِ وَالْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةً وَاحِدَةً مِّ
“এবং ভূতল ও পর্বতরাশিকে ওপরে তুলে একই আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়া হবে।”
সূরা আল হাক্কার ১৬ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَانْشَقَّتِ السَّمَاءُ فَهِيَ يَوْمَئِذٍ وَاهِيَةٌ .
"সেদিন আকাশ দীর্ণ-বিদীর্ণ হবে এবং তার বাঁধন শিথিল হয়ে পড়বে।"
সূরা মাআরিজর ৮-৯ আয়াতে বলা হয়েছে:
يَوْمَ تَكُوْنُ السَّمَاءُ كَالْمُهْلِ وَتَكُوْنُ الْجِبَالُ كَالْعِهْنِ
"(সেই আযাব হবে সেদিন) যেদিন আকাশজগত বিগলিত রৌপ্যের মতো হয়ে যাবে। আর পর্বতগুলো রংবেরংয়ের ধুনা পশমের মত হয়ে যাবে।"
সূরা আল মুযাম্মিলের ১৪ আয়াতে বলা হয়েছে:
يَوْمَ تَرْجُفُ الْأَرْضُ وَالْجِبَالُ وَكَانَتِ الْجِبَالُ كَثِيْبًا مَّهِيلاً “এটা হবে সেদিন যখন পৃথিবী ও পর্বত কেঁপে উঠবে। আর পর্বতসমূহের অবস্থা এমন হবে যেন বালুকাস্তূপ, যা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ছে।”
সূরা আল মুযাম্মিলের ১৮ আয়াতে বলা হয়েছে:
السَّمَاءُ مُنْفَطِرُ بِهِ ، كَانَ وَعْدُهُ مَفْعُولاً .
"যার কঠোরতায় আকাশ দীর্ণ-বিদীর্ণ হয়ে যেতে থাকবে? আল্লাহর ওয়াদা তো পূর্ণ হবে অবশ্যই।"
সূরা আল কিয়ামাহর ৮-৯ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَخَسَفَ الْقَمَرُهُ وَجُمِعَ الشَّمْسُ وَالْقَمَرُهُ "এবং চাঁদ আলোহীন হয়ে যাবে এবং চাঁদ ও সূর্য মিলে একাকার করে দেয়া হবে।"
সূরা আল মুরসালাতের ৮-১০ আয়াতে বলা হয়েছে:
فَإِذَا النُّجُومُ طُمِسَتْ وَإِذَا السَّمَاءُ فُرِجَتْ هُ وَإِذَا الْجِبَالُ نُسِفَتْ 6 "পরে যখন নক্ষত্রমালা ম্লান হয়ে যাবে, আকাশ বিদীর্ণ করা হবে, পাহাড় ধুনে ফেলা হবে।"
সূরা আন নাবার ১৮-২০ আয়াতে বলা হয়েছে:
يَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّوْرِ فَتَأْتُونَ أَفْوَاجًالٌ وَفُتِحَتِ السَّمَاءُ فَكَانَتْ أَبْوَابًا ، وَسَيِّرَتِ الْجِبَالُ فَكَانَتْ سَرَابًا "সেদিন শিঙায় ফুঁক দেয়া হবে; তখন তোমরা দলে দলে বের হয়ে আসবে। আর আকাশজগত উন্মুক্ত করে দেয়া হবে—ফলে তা কেবল দুয়ার আর দুয়ার হয়ে দাঁড়াবে। পাহাড় চালিয়ে দেয়া হবে। পরিণামে তা কেবল মরীচিকায় পরিণত হবে।"
সূরা আন নাযিআতের ১৩-১৪ আয়াতে বলা হয়েছে:
فَإِنَّمَا هِيَ زَجْرَةٌ وَاحِدَةٌ فَإِذَا هُمْ بِالسَّاهِرَةِ :
"অথচ এটাতো এতটুকু মাত্র কাজ যে, একটি প্রবল আকারের হুমকি পড়বে এবং সহসাই এরা উন্মুক্ত ময়দানে উপস্থিত হয়ে পড়বে।"
সূরা আত তাকবীরের ১-৭ আয়াতে বলা হয়েছে:
إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ ، وَإِذَا النُّجُومُ انْكَدَرَتْهُ وَإِذَا الْجِبَالُ سَيِّرَتْهُ وَإِذَا الْعِشَارُ عُمِلَتْهُ وَإِذَا الْوُحُوشِ حُشِرَتْ * وَإِذَا الْبِحَارُ سُجِرَتْ وَإِذَا النُّفُوسُ زُوجَتْ هُ
"যখন সূর্য গুটিয়ে দেয়া হবে। যখন তারকাসমূহ ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে। যখন পর্বতসমূহ চলমান করে দেয়া হবে। যখন দশ মাসের গর্ভবতী উষ্ট্রীগুলোকে তার নিজের অবস্থায় ছেড়ে দেয়া হবে। আর যখন সব জন্তু-জানোয়ার চারদিক থেকে গুটিয়ে একত্রিত করা হবে। এবং সমুদ্র যখন উত্তেজিত করা হবে। আর যখন প্রাণীগুলোকে (শরীরের সাথে) জুড়ে দেয়া হবে।"
সূরা আত তাকবীরের ১১-১৩ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَإِذَا السَّمَاءُ كُشِطَتْ وَإِذَا الْجَحِيمُ سُعَرَتْ ، وَإِذَا الْجِنَّةُ أَزْلِفَتْهُ
"যখন আকাশজগতের অন্তরাল দূরীভূত হবে, যখন জাহান্নাম প্রজ্জলিত হবে, আর যখন জান্নাত নিকটে আনা হবে।"
সূরা আল ইনফিতারের ১-৪ আয়াতে বলা হয়েছে:
إِذا السَّمَاءُ انْفَطَرَتْهُ وَإِذَا الْكَوَاكِبُ انْتَثَرَتْ وَإِذَا الْبِحَارُ فُجَرَتْ ، وَإِذَا الْقُبُورُ بُعْثِرَتْ
"যখন আকাশজগত চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে, যখন তারকাসমূহ বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে, যখন সমুদ্রসমূহ দীর্ণ-বিদীর্ণ করা হবে, আর যখন কবরসমূহ খুলে দেয়া হবে।"
সূরা আল ইনশিকাকের ১-৫ আয়াতে বলা হয়েছে:
إِذَا السَّمَاءُ انْشَقَّتْ ، وَأَذِنَتْ لِرَبِّهَا وَحُقَّتْ * وَإِذَا الْأَرْضُ مُدَّتْ ، وَالْقَتْ مَا فِيهَا وَتَخَلَّتْهُ وَأَذِنَتْ لِرَبِّهَا وَحُقَّتْ 8
"যখন আসমান দীর্ণ হবে, এবং স্বীয় আল্লাহর নির্দেশ পালন করবে, আর তার জন্য এটাই যথার্থ (যে নিজের আল্লাহর নির্দেশ মানবে), যমীন সম্প্রসারিত করা হবে, এবং তার গর্ভে যাকিছু আছে তা সব বাইরে নিক্ষেপ করে শূন্য হয়ে যাবে। এটা করে তার আল্লাহর নির্দেশ পালন করবে, আর এটাই তার জন্য বাঞ্ছনীয় (যে তা পালন করে)।"
সূরা আল ফজরের ২১-২৩ আয়াতে বলা হয়েছে:
كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّاهُ وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا وَجَأَى . يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنْسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذِّكْرَى *
"কখনো নয়, পৃথিবী যখন ক্রমাগত কুটিয়ে কুটিয়ে বালুকাময় বানিয়ে দেয়া হবে এবং তোমার আল্লাহ আত্মপ্রকাশ করবেন- এমতাবস্থায় যে, ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান হবে ও জাহান্নাম সেদিন সর্বসমক্ষে উপস্থিত করা হবে। সেদিন মানুষ চেতনা লাভ করবে। কিন্তু তখন তার বোধশক্তি জাগ্রত হওয়ায় কি লাভ হবে।"
সূরা যিলযালের ১-২ আয়াতে বলা হয়েছে:
إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا * وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا هُ
"পৃথিবী যখন ভীষণভাবে দুলিয়ে দেয়া হবে। এবং যমীন নিজের মধ্যকার সমস্ত বোঝা বাইরে নিক্ষেপ করবে।"
সূরা আল কারিআর ৪-৫ আয়াতে বলা হয়েছে:
يَوْمَ يَكُونُ النَّاسُ كَالْفَرَاشِ الْمَبْثُوثِ * وَتَكُوْنُ الْجِبَالُ كَالْعِهْنِ الْمَنْفُوشِ
"সেদিন যখন মানুষ, বিক্ষিপ্ত পোকার ন্যায় এবং পাহাড় রং-বেরং-এর ধুনা পশমের মতো হবে।"
কুরআনে কারীমের এ ৩২ জায়গায় কিয়ামতের দিনের প্রাকৃতিক অবস্থা কি হবে তার হৃদয় বিদারক ছবি আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন এঁকে দিয়েছেন।
কিয়ামত
কবরের নিঃসঙ্গ জীবন কাটাবার পর আল্লাহর পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁর নির্দিষ্ট করা সময়ে এ নশ্বর দুনিয়া লয়-প্রলয় হয়ে যাবে। বিলীন হয়ে যাবে এ
দুনিয়ার সবকিছু। এ দিনকেই কুরআনে 'কিয়ামাত' 'সাআত' 'ইয়াওমুল মাওউদ' বলে অভিহিত করা হয়েছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের পর মানুষের জীবনাবসান হলো মৃত্যু। আর নির্দিষ্ট সময় শেষ হয়ে যাবার পর দুনিয়ার ধ্বংসকে কিয়ামত বলা হয়।
কুরআন হাদীসের বর্ণনানুযায়ী আল্লাহ এ দুনিয়া তার মেয়াদ শেষে বিলীন করে দেয়ার জন্য তার মনোনীত ফেরেশতা হযরত ইসরাফিল আ.-কে নির্দেশ দিবেন। শিঙায় ফুঁকা তিন ভাগে হবে বলে হাদীসে উল্লেখ হয়েছে।-বুখারী
হঠাৎ করেই এ শিঙা ফুঁকা আরম্ভ হবে, এ ফুঁক দিয়ে সকলকে ভীতসন্ত্রস্ত করে কাঁপিয়ে তুলা হবে। এ ফুঁককে বলা হয় "নাফ্খাতুল ফাযাআ" কম্পন সৃষ্টকারী ফুঁক।
এ সম্বন্ধে আল্লাহ পাক সূরা আন নাহলের ৭৭ আয়াতে বলেন:
وَمَا أَمْرُ السَّاعَةِ إِلَّا كَلَمْحِ الْبَصَرِ أَوْ هُوَ أَقْرَبُ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
"কিয়ামত তথা মহাপ্রলয় কায়েম হওয়ার ব্যাপারে- কিছুমাত্র বিলম্ব হবে না। শুধু এতোটুকু সময় মাত্র লাগবে। যে সময়ের মধ্যে চোখের পলক পড়ে, অথবা তার চেয়েও কম সময়ে। মূলকথা হলো আল্লাহ সবকিছুই করতে পারেন।"
শিঙায় ফুঁক দিয়ে এ দুনিয়া ও এর সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দেয়া হবে। এ বর্ণনা সূরা আয যুমারের ৬৮ আয়াতেও আল্লাহ এভাবে বলেছেন:
وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَوتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ -
"আর (আল্লাহর হুকুমে) সেদিন শিঙায় ফুঁক দেয়া হবে। সাথে সাথে আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবকিছুই মরে পড়ে থাকবে। তারা ছাড়া, যাদেরকে আল্লাহ জীবিত রাখতে চাইবেন।"
আর বাকী থাকবেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। তিনি সূরা আর রহমানের ২৭ আয়াতে এ সম্পর্কে বলেছেন:
وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُوا الْجَلْلِ وَالْإِكْرَامِ .
"আর বাকী থাকবে তোমার মহীয়ান গরিয়ান রবের সত্তা।"
ভয়াবহ দিন
এ শিঙার ফুঁকে দুনিয়া প্রলয়কাণ্ড তথা কিয়ামত সংঘটিত হবার ভয়াবহ বিবরণ আল্লাহ পাক তাঁর কিতাব আল কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছেন। সূরা আল হজ্জের ১-২ আয়াত পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবার একটা সংক্ষিপ্ত অথচ পরিপূর্ণ বিবরণ দেয়া হয়েছে।
يَأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسِ سُكْرَى وَمَا هُمْ بِسُكْرَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدُه
"হে লোকেরা! তোমরা তোমাদের রবের গযব হতে আত্মরক্ষা করো। কারণ কিয়ামতের দিনের কম্পন বড়ো ভয়াবহ ব্যাপার! যে দিন তোমরা এই কম্পন দেখবে, সে দিনের ভয়াবহতার অবস্থা এমন হবে যে, সেদিন প্রত্যেক দুধ দানকারিণী মা তার দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে দুধ দিতে ভুলে যাবে। গর্ভবতী নারীর গর্ভ খসে পড়বে এবং লোকদেরকে তোমরা উদভ্রান্ত দেখতে পাবে। অথচ তারা নেশাগ্রস্ত হবে না। বরং আল্লাহর আযাবই হবে বড়ো ভয়াবহ।" কিয়ামতের দিনের ভয়াবহতা সম্পর্কে সূরা ত্বা-হার ১০৫ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْجِبَالِ فَقُلْ يَنْسِفُهَا رَبِّي نَسْفًا
"এ লোকেরা তোমার নিকট প্রশ্ন করে যে, সেদিন এ পাহাড় কোথায় বিলীন হয়ে যাবে? বলো, আমার রব এগুলোকে ধূলিকণায় পরিণত করে উড়িয়ে দিবেন।" সূরা আল মুয্যাম্মিলের ১৭-১৮ আয়াতে বলা হয়েছে:
فَكَيْفَ تَتَّقُوْنَ إِنْ كَفَرْتُمْ يَوْمًا يَجْعَلُ الْوِلْدَانَ شَيْبَانِ نِ السَّمَاءُ مُنْفَطِرُ بهِ ، كَانَ وَعْدُهُ مَفْعُولاً
"তোমরাও যদি মেনে নিতে অস্বীকার করো, তাহলে সেদিন কেমন করে রক্ষা পাবে যে দিনটি বালকদেরকে বৃদ্ধ বানিয়ে দিবে। এবং যার
কঠোরতায় আকাশ দীর্ণ-বিদীর্ণ হয়ে যেতে থাকবে? আল্লাহর ওয়াদা তো পূর্ণ হবে অবশ্যই।”
সূরা আল মাআরিজের ৯ আয়াতে বলা হয়েছে :
وَتَكُونُ الْجِبَالُ كَالْعِهْنِ الْمَنْفُوسُ .
"আর পাহাড় পর্বতগুলো রং বেরংয়ের ধূনা পশমের মতো মনে হবে।" সূরা আল কারিয়ার ১-৫ আয়াতে বলা হয়েছে :
الْقَارِعَةُ مَا الْقَارِعَةُ ، وَمَا أَدْرَكَ مَا الْقَارِعَةُ يَوْمَ يَكُونُ النَّاسُ كَالْفَرَاشِ الْمَبْثُوثِ "ভয়াবহ দুর্ঘটনা। কি সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা? তুমি কি জান সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা কি? সেদিন যখন মানুষ বিক্ষিপ্ত পোকার ন্যায় এবং পাহাড় রং-বেরং-এর ধূনা পশমের মতো হবে।"
সূরা ইবরাহীমের ৪৮-৫১ আয়াতে বলা হয়েছে :
يَوْمَ تُبَدِّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَوتِ وَبَرَزُوا لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ وَتَرَى الْمُجْرِمِينَ يَوْمَئِذٍ مُّقَرَّنِينَ فِي الْأَصْفَادِهِ سَرَابِيلُهُمْ مِّنْ قَطِرَانِ وتَغْشَى وُجُوهَهُمُ النَّارُ لِيَجْزِيَ اللهُ كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ ، إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ "তাদেরকে সেদিনের ভয় দেখাও। যেদিন যমীন আসমানকে বদল করে অন্য রকম করে দেয়া হবে। এবং সবকিছু মহাপরাক্রমশালী এক আল্লাহর সামনে হাযির হবে। সেদিন তুমি পাপীদেরকে দেখবে শৃংখলে হাত-পা শক্ত করে বাঁধা রয়েছে। আলকাতরার পোশাক পরে থাকবে। আর আগুনের লেলীহান শিখা তাদের চেহারার ওপর ছড়িয়ে পড়তে থাকবে। এটা এজন্য হবে যে, আল্লাহ প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের বদলা দেবেন। আল্লাহ দ্রুত হিসাব সম্পন্নকারী।"
সূরা কাফ-এর ২২-২৪ আয়াতে বলা হয়েছে :
لَقَدْ كُنْتَ فِي غَفْلَةٍ مِّنْ هُذَا فَكَشَفْنَا عَنْكَ غِطَاءَكَ فَبَصَرُكَ الْيَوْمَ حَدِيدٌ وَقَالَ قَرِيْنَهُ هُذَا مَا لَدَى عَتِيْدُه
"সেদিন আল্লাহ প্রত্যেক অবিশ্বাসীকে বলবেন, এদিনের প্রতি তুমি অবহেলায় জীবন কাটিয়েছো। আজ তোমাদের চোখের পর্দা আমি সরিয়ে দিয়েছি যা তুমি বিশ্বাস করতে চাওনি। অন্তরের চোখ দিয়ে তুমি দেখতে চাওনি। আজ তা দেখে নাও। এ সত্য দেখার জন্য আজ আমি তোমার দৃষ্টি প্রখর করে দিয়েছি। তার সঙ্গী নিবেদন করলো এই সেই লোক যে আমার নিকট সোপর্দ করা ছিল, উপস্থিত হয়েছে।”
প্রলয়ংকারী কিয়ামতের ভয়াবহতার কথা কুরআনে কারীমের অনেক সূরায় স্পষ্টভাবে বিধৃত হয়েছে। যেসব কথা শুনলে অন্তরাত্তা কেঁপে উঠে। এভাবে কিয়ামাত সংঘটিত হয়ে দুনিয়া ও এর ভিতর যা কিছু থাকবে সব ধ্বংস করে দেয়া হবে।
দ্বিতীয় শিঙা
প্রথম শিঙা ফুঁকার পরে দ্বিতীয় শিঙায় ফুঁক দেয়া হবে। এ ফুঁককে বলা হয় 'নাফখাতুস সাআঙ্ক'। এটা হবে আগেরটার চেয়েও আরো বেশী ভয়ংকর। এ ধ্বনীর সাথে সাথে সব ধ্বংস হয়ে যাবে।
প্রথম শিঙা ফুঁকার পর আবার শিঙায় ফুঁক দেয়া হবে। একথা কুরআনে সূরা আয যুমারের ৬৮ আয়াতের শেষে বলা হয়েছে:
ثُمَّ نُفِخَ فِيْهِ أُخْرَى فَإِذَا هُمْ قِيَامٍ يَنْظُرُونَ .
"তারপর আর একবার শিঙায় ফুঁক দেয়া হবে। সাথে সাথে সকলেই উঠে দাঁড়িয়ে তাকাতে শুরু করবে।"
তৃতীয় শিঙা
এ তৃতীয় শিঙাকে বলা হয় 'নাফখাতুল কিয়াম লিববাব্ব'। এটাই হলো পুনরুত্থান বা পুনর্জীবন। এতে সকলকে উঠে দাঁড়াতে হবে। অবিশ্বাসী কাফের মুশরিক, নাস্তিক, মুরতাদরা এ পুনর্জীবনকে বিশ্বাস করতে চায় না। তাদের কাছে হাড়-মাংস সব পঁচে-গলে নিঃশেষ হয়ে যাবার পর তা আবার জন্ম নেয়া অসম্ভব। এ কাজটাও আল্লাহর জন্য কতো সহজ তা কুরআনে আঁকা চিত্র হতে শুনুন। মৃত্যুর পর দ্বিতীয়বারের জীবন এবং দুনিয়ায় কৃত করা ছোট, বড়ো, খোপন ও প্রকাশ্য সব কাজ কিভাবে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হবে তা সূরা যিলযালের প্রথম আয়াত থেকে শুরু করে শুনুন:
إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَاءَ وَقَالَ الْإِنْسَانُ مَا لَهَانَ يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا
“পৃথিবীকে যখন ভীষণভাবে আন্দোলিত করা হবে অর্থাৎ কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে এবং যমীন নিজের ভিতরের সব বোঝা বাইরে নিক্ষেপ করে দেবে এবং মানুষ বলবে এর কি হয়েছে? সেদিন যমীন নিজের উপরে ঘটিত সব অবস্থা বলে দেবে।”-সূরা যিলযাল: ১-৪
এবার নতুন করে সৃষ্টি করার বিষয়ে সূরা কাফ-এর ১৫ আয়াতে বলা হয়েছে:
أَفَعَيِيْنَا بِالْخَلْقِ الْأَوَّلِ ، بَلْ هُمْ فِي لَبْسٍ مِّنْ خَلْقٍ جَدِيدِ "আমরা কি প্রথমবারের সৃষ্টিকার্যে অসমর্থ ছিলাম? অথচ একটি নবতর সৃষ্টিকার্য সম্পর্কে এ লোকেরা সংশয়ে পড়ে আছে।”
সূরা আল আম্বিয়ায় ১০৪ আয়াতে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথেই আল্লাহ বলেছেন:
يَوْمَ نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَيِّ السِّجِلِ لِلْكُتُبِ كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ ، وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فُعِلَيْنَ "সেদিন আমি আসমানকে তাবীজের পৃষ্ঠার মতো ভাঁজ করে রাখবো। আমার প্রথম সৃষ্টির সূচনা যেভাবে করেছিলাম। ঠিক এভাবে আমি পুনরাবৃত্তি করবো। এটা একটা ওয়াদা বিশেষ, যা পূরণ করার দায়িত্ব আমার। একাজ আমাকে অবশ্য করতে হবে।"
সূরা আল কিয়ামাহর ৩৪ আয়াতে আছে:
أَوْلَى لَكَ فَأَوْلَى - "এরূপ আচরণ তোমার জন্যই উপযুক্ত এবং তোমাকেই শোভা পায়।"
সূরা হূদের ১০৩ আয়াতে:
ذَلِكَ يَوْمٌ مَّجْمُوعٌ ، لَهُ النَّاسُ وَذَلِكَ يَوْمٌ مَّشْهُودٌ .
"তা এমন একটি দিন হবে, যখন সব মানুষই একত্রিত হবে। তারপর সেদিন যাকিছুই হবে, তা সকলের চোখের সামনেই অনুষ্ঠিত হবে।"
সূরা আল মাআরিজের ৮ আয়াতে বলা হয়েছে:
يَوْمَ تَكُوْنُ السَّمَاءُ كَالْمُهْلِ .
"সেদিন আকাশসমূহ হবে বিগলিত তামার মতো।"
সূরা আর রাহমানের ৩৭ আয়াতে বলা হয়েছে:
فَإِذَا انْشَقَّتِ السَّمَاءُ فَكَانَتْ وَرْدَةً كَاذِهَانِ 6
"তখন কেমন হবে, যখন আকাশসমূহ দীর্ণ-বিদীর্ণ হয়ে যাবে এবং তা রক্তিম বর্ণ ধারণ করবে।"
সূরা আল ওয়াকিয়ার ৪৯-৫০ আয়াতে বলা হয়েছে:
قُلْ إِنَّ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ * لَمَجْمُوعُونَ إِلَى مِيْقَاتِ يَوْمٍ مَّعْلُومٍ
“(হে নবী!) এ লোকদেরকে বলো: নিশ্চয়ই নিসন্দেহে আগের ও পরের সকলকে একদিন অবশ্যই একত্রিত করা হবে, তার সময় নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে।"
📄 হাশর
হাশরের দৃশ্য
শেষবারের শিঙায় ফুঁক দেবার পর যে যে জায়গায় মানুষ কবরস্থ হয়েছে অথবা কিয়ামতের দিনের শিঙা ফুঁকার পর ধ্বংস হয়ে পড়েছিলো সেখান থেকে সকলেই উত্থিত হবে। কিভাবে উত্থিত হবে আর জড়ো হবে এক জায়গায় তার অনুপম বর্ণনা আল্লাহ্ পাক কুরআনে পাকে এঁকে এঁকে এর ছবি দেখিয়ে দিয়েছেন। এ এক জায়গায় একত্রিত হবার নামই হাশর। যে জায়গায় জমা হবে সেটা হাশরের ময়দান।
সূরা ইয়াসিনের ৫১ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَإِذَاهُمْ مِّنَ الْأَجْدَاثِ إِلَى رَبِّهِمْ يَنْسِلُونَ 0 "পরে শিঙায় ফুঁক দেয়া হবে। আর সহসা তারা নিজেদের আল্লাহর সমীপে উপস্থিত হবার জন্য নিজেদের কবর থেকে বের হয়ে পড়বে।"
হাশরের দিন গোটা ভূপৃষ্ঠকে সমতল ভূমি করে দেয়া হবে। সূরা ত্ব-হা ১০৫-১০৭ আয়াতে একথাই বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন:
وَيَسْتَلُونَكَ عَنِ الْجِبَالِ فَقُلْ يَنْسِفُهَا رَبِّي نَسْفَانٌ فَيَذَرُهَا قَاعًا صَفْصَفَاهُ الأَتَرَى فِيْهَا عِوَجًا وَلَا أَمْتَاهُ "এই লোকেরা তোমার নিকট জিজ্ঞেস করে যে, সেদিন এই পাহাড় কোথায় বিলীন হয়ে যাবে? বলো, আমার আল্লাহ্ এগুলোকে ধূলিকণায় পরিণত করে উড়িয়ে দিবেন। আর যমীনকে এমনভাবে সমতল রুক্ষ ধূসর ময়দানে রূপান্তরিত করা হবে। তুমি এতে কোনো উঁচু-নীচু ও সংকোচন দেখতে পাবে না।"
সূরা ইবরাহীমের ৪৮ আয়াতে বলা হয়েছে:
يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَوتُ وَبَرَزُوا لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ 0 "যখন যমীন ও আকাশকে পরিবর্তন করে দেয়া হবে। সবকিছু পরম পরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে উন্মোচিত ও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।"
এখানে বলা হয়েছে গোটা ভূপৃষ্ঠের নদী-নালা, সাগর-মহাসাগর ভরাট করে পাহাড় পর্বতগুলোকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ধূলায় পরিণত করা হবে। বন
জঙ্গল অপসারিত হয়ে গোটা ভূপৃষ্ঠ সমতল ভূমিতে পরিণত হবে। এটাই হাশরের মাঠ। সূরা আল কাহফ্ফের ৪৭ আয়াতে হাশরের দিনের কথা বর্ণনা করে বলা হয়েছে এভাবে:
وَيَوْمَ نُسَيِّرُ الْجِبَالَ وَتَرَى الْأَرْضَ بَارِزَةً ، وَحَشَرْنَهُمْ فَلَمْ تُغَادِرُ مِنْهُمْ أَحَدًا
"যখন আমরা পাহাড়-পর্বতগুলোকে চালিয়ে দেবো। তোমরা তখন জমীনকে পরিপূর্ণ উলঙ্গ দেখতে পাবে। আর আমরা সকল মানুষকে এমনভাবে ঘিরে এনে এক জায়গায় জমা করবো যে, তাদের আগের বা পরের কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।"
ভূগর্ভ সব বের করে দেবে
হাশরের দিন তৃতীয় শিঙায় ফুঁক দেয়ার সাথে সাথে ভূগর্ভ তার পেটের সবকিছু বের করে দেবে।
সূরা আল যিলযালের ২-৩ আয়াতে বলা হয়েছে:
وَاخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا وَقَالَ الْإِنْسَانُ مَا لَهَا :
"যমীন নিজের ভিতরের সব বোঝা বাইরে নিক্ষেপ করে দেবে এবং মানুষ বলবে, এর কি হয়েছে?"-সূরা যিলযাল: ১-৪
সূরা আল হজ্জের ৭ আয়াতে বলা হয়েছে:
وأَنَّ السَّاعَةَ أُتِيَةٌ لأَرَيْبَ فِيهَا * وَأَنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ مَنْ فِي الْقُبُورِ
"কিয়ামতের মুহূর্তটি অবশ্যই আসবে, এতে কোনো প্রকার সন্দেহের অবকাশ নেই। আর আল্লাহ সে লোকদেরকে অবশ্যই উঠাবেন যারা কবরে অন্তর্হিত হয়েছে।"
সূরা আল আদিয়াতে ৯-১০ আয়াতে বলা হয়েছে:
أَفَلَا يَعْلَمُ إِذَا بُعْثِرَ مَا فِي الْقُبُورِه وَحُصِلَ مَا فِي الصُّدُورِه
"তাহলে সে কি সেই সময়কে জানে না, যখন কবরে যাকিছু আছে তা বের করে দেয়া হবে এবং বুকে যাকিছু আছে তা বাইরে এনে তার যাচাই-বাচাই করা হবে?"
সূরা আল কামারের ৬-৭ আয়াতে বলা হয়েছে:
فَتَوَلَّ عَنْهُمْ ، يَوْمَ يَدْعُ الدَّاعِ إِلَى شَيْءٍ نُّكْرٍ خُشَعًا أَبْصَارُهُمْ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَجْدَاثِ كَأَنَّهُمْ جَرَادٌ مُّنْتَشِرُهُ
"অতএব হে নবী! এদের থেকে লক্ষ ফিরিয়ে নাও। যেদিন আহ্বানকারী এক কঠিন দুঃসহ জিনিসের দিকে আহ্বান জানাবে, সেদিন লোকেরা শংকাগ্রস্ত, কুণ্ঠিত চোখে নিজেদের কবরসমূহ হতে এমনভাবে বের হবে, মনে হবে তারা যেন বিক্ষিপ্ত পঙ্গপাল।”
হাশরের ময়দানে সকল মানুষ একত্রিত হবে। এ মর্মে আল্লাহ সূরা হুদের ১০৩ আয়াতে বলেছেন:
ذلِكَ يَوْمٌ مَّجْمُوعٌ لَّهُ النَّاسُ وَذَلِكَ يَوْمٌ مَّشْهُود
“এটা এমন একদিন। যেদিন সকল মানুষ একত্রিত হবে। সেদিন যাকিছু হবে তা সকলের চোখের সামনেই অনুষ্ঠিত হবে।”
সূরা আল ওয়াকিয়ার ৪৯-৫০ আয়াতে আল্লাহ হাশরের ময়দানে একত্রিত হবার কথা এভাবে বলেন:
قُلْ إِنَّ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ لَمَجْمُوعُونَ إِلَى مِيْقَاتِ يَوْمٍ مَّعْلُومٍ
"বলো হে নবী! আগের ও পরের সব মানুষকে একদিন অবশ্যই একত্রিত করা হবে, তার সময় নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে।”
হাশরের দিন আল্লাহর পাকড়াও থেকে কেউ বেঁচে থাকতে পারবে না। সূরা আর রহমানের ৩৩ আয়াতে আল্লাহ বলেন:
يُمَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ إِنِ اسْتَطَعْتُمْ أَنْ تَنْفُذُوا مِنْ أَقْطَارِ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ فَانْفُذُوا ، لَا تَنْفُذُونَ إِلَّا بِسُلْطَنٍ
“হে মানুষ ও জিনের দলেরা তোমরা আকাশ ও পৃথিবীর সীমালংঘন করে যদি পালিয়ে যেতে সক্ষমও হও তবে পালিয়ে দেখ-না, পালিয়ে যেতে পারবে না। সেজন্য তো বেশি শক্তি সামর্থের প্রয়োজন।"
আহ্বানকারীর আহ্বানে সবাইকে সাড়া দিতে হবে
হাশরের দিন সকলকেই আহবানকারীর আহবানে অর্থাৎ ইসরাফিলের শিঙায় ফুঁক দেয়ার সাথে সাথে হাশরের ময়দানে গিয়ে উপস্থিত হতে হবে। আল্লাহ এ সম্পর্কে আল কুরআনে সূরা ত্বা-হার ১০৮ আয়াতে বলেছেন:
يَوْمَئِذٍ يَتَّبِعُوْنَ الدَّاعِيَ لَا عِوَجَ لَهُ ، وَخَشَعَتِ الْأَصْوَاتُ لِلرَّحْمَنِ فَلَا تَسْمَعُ إِلَّا هَمْسًا
"সেদিন সব লোক ঘোষণাকারীর ডাকে সোজা চলে আসবে। দয়াময় আল্লাহর ভয়ে সব আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে যাবে। অতএব মৃদ গুঞ্জন ছাড়া তুমি কিছুই শুনতে পাবে না।"
সূরা আল মাআরিজের ৪৩ আয়াて বর্ণনা করা হয়েছে:
يَوْمَ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَجْدَاثِ سِرَاعًا كَأَنَّهُمْ إِلَى نُصُبٍ يُؤْفِضُونَ )
"এরা নিজেদের কবর থেকে নির্গত হয়ে এমনভাবে দৌড়িয়ে যেতে শুরু করবে, যেন নিজেদের দেবতাদের স্থানসমূহের দিকে দৌড়াচ্ছে।”
সেদিন সব ক্ষমতার মালিক হবেন আল্লাহ
হাশরের দিন সর্বময় ক্ষমতার মালিক হবেন একমাত্র আল্লাহ। সেদিনের ক্ষমতার মালিকানা সম্পর্কে আল্লাহ সূরা আল মু'মিনের ১৬ আয়াতে স্পষ্ট ভাবে বলেছেন:
يَوْمَ هُمْ بَارِزُونَ ، لَا يَخْفَى عَلَى اللهِ مِنْهُمْ شَيْءٌ لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ . لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ
"সেদিন যখন সকল মানুষ আবরণ শূন্য হবে। আল্লাহর কাছে তাদের গোপন করার কিছু থাকবে না। সেদিন ডেকে জিজ্ঞেস করা হবে, আজ রাজত্ব কার? সমগ্র সৃষ্টি লোক বলে উঠবে একক প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহর।"
সেদিন দুনিয়ার সব মেকী রাজা-বাদশাহদের রাজত্ব ও বাদশাহী শেষ হয়ে যাবে। শুধু একমাত্র আল্লাহর বাদশাহী কায়েম হবে। যিনি প্রকৃতই গোটা সৃষ্টি জগতের বাদশাহ। সূরা আল ফুরকানের ২৬ আয়াতে একথাটাই আল্লাহ বলেছেন:
الْمُلْكُ يَوْمَئِذٍ نِ الْحَقُّ لِلرَّحْمَنِ -
"সেদিন প্রকৃত বাদশাহী হবে রহমানের।"
আল্লাহর রাসূল বলেছেন, আল্লাহ এক হাতে আসমান এবং আর এক হাতে যমীনকে মুঠো করে ধরে বলবেন, আমি বাদশাহ, আমি পরাক্রমশালী। আজ বিশ্বের রাজা-বাদশাহরা কোথায়? কোথায় আজ প্রতাপ-প্রতি-পত্তিশালীরা? দাম্ভিক অহংকারীদের দল আজ কোথায়?
হাশরের ময়দানে অণু-পরমাণু পরিমাণ আমলও হাযির করা হবে
মানুষের দুনিয়ার জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আমলও হাশরের ময়দানে হাযির করা হবে। আল্লাহ এ ব্যাপারে সূরা লুকমানের ১৬ আয়াতে বলেছেন:
يُبْنَى إِنَّهَا إِنْ تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ فَتَكُنْ فِي صَخْرَةٍ أَوْ فِي السَّمَوتِ أَوْ فِي الْأَرْضِ يَأْتِ بِهَا اللَّهُ ، إِنَّ اللَّهَ لَطِيفٌ خَبِيْرُهُ "হে বৎস! কোনো জিনিস যদি সরিষার দানার মতো ছোট হয়, আবার তা পাথরের মধ্যে অথবা আকাশে কিংবা মাটির নীচে থাকে। তবে তাও আল্লাহ হাযির করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী ও সবজান্তা।”
প্রতিটি ক্ষুদ্র নেক ও বদ আমলের ফল হাশরের দিন দেয়া হবে
মানুষের দুনিয়ায় করা কণা পরিমাণ নেক কাজেরও বিনিময় হাশরের ময়দানে দেয়া হবে। সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্ম নেক কাজের ফল পাওয়া থেকে কোনো মানুষকে বঞ্চিত রাখা হবে না। অপরদিকে সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্ম বদ আমল বা খারাপ কাজের শাস্তিও তাকে ভোগ করতে হবে। আল্লাহ সূরা যিলযালের ৭ ও ৮ আয়াতে একথাটিই অতি সুন্দর ও মনোরম ভঙ্গিতে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ ، وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ .
"কেউ যদি দুনিয়ায় অণু-পরমাণু পরিমাণ সৎকাজও করে থাকে হাশরের ময়দানে তা সে দেখতে পাবে। অপর পক্ষে কেউ যদি দুনিয়ায় অণু- পরমাণু পরিমাণ বদ কাজ করে থাকে তাও সে সেখানে দেখতে পাবে।"
যার হিসাব তাকেই দিতে হবে
হাশরের দিন আল্লাহর দরবারে যার হিসাব তাকেই দিতে হবে। কেউ কারো হিসাবের জন্য দায়ী হবে না। আল্লাহ তাআলা কুরআন পাকে সূরা আন নাহলের ১১১ আয়াতে একথাটাই বলেছেন:
يَوْمَ تَأْتِي كُلُّ نَفْسٍ تُجَادِلُ عَنْ نَّفْسِهَا وَتُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَّا عَمِلَتْ وَهُمْ لا يُظْلَمُونَ "(এসব কিছুরই ফায়সালা সেদিন হবে) যে দিন প্রত্যেক ব্যক্তি কেবল নিজের বাঁচার চিন্তায় লেগে থাকবে এবং প্রত্যেককেই তার কৃতকর্মের বদলা পুরোপুরি দেয়া হবে। আর কারো ওপর এক বিন্দু পরিমাণও যুলুম হতে পারবে না।"
সূরা বনী ইসরাঈলের ১৩-১৪ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
وَكُلَّ إِنْسَانِ الزَمْنَهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ ، وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيمَةِ كِتَابًا يَلْقَهُ مَنْشُورًا.
"মূলকথা হলো, সেদিন প্রত্যেকেই নিজের হিসাব কিতাব দেবার জন্য নিজেই যথেষ্ট হবে। কারো সাহায্য নিয়ে হিসাব দেয়া লাগবে না। আর এ হিসাব দিতে গিয়ে না কেউ কারো থেকে সাহায্য পাবে আর না কারো সম্পর্কে কাউকে জিজ্ঞেস করা হবে।" প্রত্যেককে একা একা আল্লাহর কাছে হাযির হতে হবে
সারিবদ্ধ বা দলবদ্ধ হয়ে কেউ আল্লাহর দরবারে দাবী আদায়ের জন্য যেতে পারবে না। আল্লাহর কাছে প্রত্যেককেই আলাদা আলাদা ও একা একা হাযির হতে হবে। এ বিষয়ে আল্লাহ পাক সূরা আল আনআমের ৯৪ আয়াতে বলেছেন:
وَلَقَدْ جِئْتُمُوْنَا فَرَادَى كَمَا خَلَقْنَكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَتَرَكْتُمْ مَّا خَوَّلْنَكُمْ وَرَاءَ ظُهُورِكُمْ : ج "নাও, এখন তোমরা ঠিক তেমনিভাবে একাকীই আমাদের সামনে হাযির হয়েছো, যেমন আমরা তোমাদেরকে প্রথমবার একাকী সৃষ্টি করেছিলাম। তোমাদেরকে আমরা দুনিয়ায় যা কিছু দিয়েছিলাম, তা সবই তোমরা পিছনে রেখে এসেছো।" মাটি সবকিছু উগলে দেবে
তৃতীয় শিঙায় ফুঁক দেয়ার সাথে সাথে সকলের থাকার স্ব স্ব স্থান কবর ইত্যাদি তাদেরকে হাশরের ময়দানে হাযির হবার জন্য নিক্ষেপ করবে। সূরা যিলযালের ১-৫ আয়াতে এ ছবিটি সুন্দরভাবে আল্লাহ পাক দেখিয়ে দিয়েছেন।
إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا ، وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا ، وَقَالَ الْإِنْسَانُ مَالَهَا ، يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا بِأَنَّ رَبَّكَ أَوْحَى لَهَا .
"পৃথিবী যখন ভীষণভাবে দুলিয়ে দেয়া হবে এবং যমীন নিজের মধ্যকার সব বোঝা বাইরে নিক্ষেপ করবে, এবং মানুষ বলে উঠবে, তার কি
হয়েছে? সেদিন তা নিজের ওপরে ঘটিত সমস্ত অবস্থা বলে দিবে। কেননা, তোমার আল্লাহ্ তাকে এরূপ করার নির্দেশ দিয়ে থাকবেন।"
সে দিনের অসহায়ত্ব
হাশরের দিন মানুষ কতো অসহায় হবে তার বিবরণ দেয়া কঠিন। সেদিন কেউ কারো দিকে তাকাবে না। নিজের জীবন বাঁচাবার জন্যই সকলে ব্যস্ত থাকবে। সূরা আল আবাসার ৩৩-৩৭ আয়াতে হাশরের ময়দানের এ চিত্রটি আল্লাহ্ এভাবে তুলে ধরেছেন:
فَإِذَا جَاءَتِ الصَّاخَّةُ ، يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيْهِ ، وَأُمِّهِ وَآبِيْهِ ، وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيْهِ ، لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ .
"সর্বশেষ যখন সেই কান বধিরকারী ধ্বনি উচ্চারিত হবে, সেদিন মানুষ নিজের ভাই, নিজের মা, নিজের পিতা এবং স্ত্রী ও সন্তানাদি থেকে পালাবে। তাদের মধ্যে প্রত্যেক ব্যক্তির উপর সেদিন এমন সময় এসে পড়বে যে, নিজের ছাড়া আর কারো প্রতি লক্ষ রাখার মত অবস্থা থাকবে না।"
মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাক্ষ দেবে
হাশরের ময়দানে আল্লাহ্ তাআলার সামনে মানুষের নিজের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ দেবে। সূরা হা-মীম সাজদার ১৯-২১ আয়াতে সাক্ষী দেবার ছবিটি এভাবে তুলে ধরেছেন:
وَيَوْمَ يُحْشَرُ أَعْدَاءُ اللَّهِ إِلَى النَّارِ فَهُمْ يُوزَعُونَ ، حَتَّى إِذَا مَا جَاءُوهَا شَهِدَ عَلَيْهِمْ سَمْعُهُمْ وَأَبْصَارُهُمْ وَجُلُودُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ، وَقَالُوا لِجُلُودِهِمْ لِمَ شَهِدْتُمْ عَلَيْنَا ، قَالُوا أَنْطَقَنَا اللَّهُ الَّذِي أَنْطَقَ كُلَّ شَيْءٍ وَهُوَ خَلَقَكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ .
"সে সময়ের কথা একটু খেয়াল করো, যখন আল্লাহ্র এ দুশমনগণকে জাহান্নামের দিকে যাবার জন্য পরিবেষ্টিত করা হবে। তাদের পূর্ববর্তীদেরকে পরবর্তীদের আগমন পর্যন্ত আটক করে রাখা হবে। পরে সকলেই যখন সেখানে উপস্থিত হবে, তখন তাদের কান, চোখ ও দেহের
চামড়া সাক্ষ দেবে, তারা দুনিয়ায় কি কি কাজ করেছিলো। তারা তাদের দেহের চামড়াকে বলবে : তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে কেন সাক্ষ দিলে? তারা জবাবে বলবে : আমাদের সেই আল্লাহই কথা বলার শক্তি দিয়েছেন, যিনি সব জিনিসকেই বাকশক্তি-সম্পন্ন বানিয়ে দিয়েছেন। তিনিই তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং এখন তাঁরই দিকে তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।"
নবীরা পাপীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ দেবে
সূরা আন নিসার ৪১ আয়াতে বলা হয়েছে:
فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٌ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا .
"তারপরে চিন্তা করো যে, আমি যখন প্রত্যেক উম্মতের মধ্য থেকে একজন করে সাক্ষী হাযির করবো এবং এসব বিষয় সম্পর্কে সাক্ষী হিসেবে পেশ করবে তখন তারা কি করবে।"
হাশরের দিন মানুষ দু' দলে বিভক্ত হবে
হাশরের দিন মানুষ দু' দলে ভাগ হয়ে যাবে। একদলে থাকবে কিছু বদলোক তারা হবে হতভাগ্য। আর অন্যদলে থাকবে কিছু নেক লোক, তারা হবেন সৌভাগ্যবান। সূরা হুদের ১০৫-১০৮ আয়াতে আল্লাহ এ দুই দলের কথা উল্লেখ করেছেন:
يَوْمَ يَأْتِ لَا تَكَلَّمُ نَفْسٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ ، فَمِنْهُمْ شَقِيٌّ وَسَعِيدٌ فَأَمَّا الَّذِينَ شَقُوْا فَفِي النَّارِ لَهُمْ فِيهَا زَفِيْرٌ وَشَهِيقٌ خَلِدِينَ فِيهَا مَا دَامَتِ السَّمَوتُ وَالْأَرْضِ إِلَّا مَا شَاءَ رَبُّكَ ، إِنَّ رَبَّكَ فَعَالٌ لِّمَا يُرِيدُهُ وَأَمَّا الَّذِينَ سُعِدُوا فَفِي الْجَنَّةِ خُلِدِينَ فِيهَا مَا دَامَتِ السَّمَوتُ وَالْأَرْضُ إِلَّا مَا شَاءَ رَبُّكَ ، عَطَاءٌ غَيْرَ مَجْذُونِ
"ওই দিনটি অর্থাৎ হাশরের দিনে যখন কারো পক্ষে কোনো কথা বলা সম্ভব হবে না। তবে আল্লাহর নিকট থেকে অনুমতি নিয়ে কিছু বললে অন্য কথা। অনন্তর এদিন কিছু লোক হবে হতভাগ্য, আর কিছু লোক হবে সৌভাগ্যবান। যারা হতভাগ্য হবে তারা জাহান্নামে যাবে। তারা হাঁপাতে থাকবে ও আর্তচীৎকার করতে থাকবে। আর এ অবস্থায়ই তারা'
চিরদিন পড়ে থাকবে যতদিন যমীন ও আসমান বর্তমান আছে। অবশ্য তোমার আল্লাহ অন্য রকম কিছু চাইলে স্বতন্ত্র কথা। কোনোই সন্দেহ নেই যে, তোমার আল্লাহর ইখতিয়ার রয়েছে, তিনি যা ইচ্ছা তাই করার অধিকার রাখেন। আর যারা সৌভাগ্যবান হবে তারা জান্নাতে যাবে এবং সেখানেই চিরদিন থাকবে, যতদিন পর্যন্ত যমীন ও আসমান বর্তমান। তোমার আল্লাহ অন্য রকম কিছু করতে চাইলে অন্য কথা। তারা এমন প্রতিদান লাভ করবে যার ধারাবাহিকতা কখনই ছিন্ন হবে না।"
আসমান যমীন বলতে এখানে আখিরাতের আসমান যমীনকে বুঝানো হয়েছে। যা কখনো ধ্বংস হবে না। একথা বলে সেখানকার অবস্থানের স্থায়িত্ব বুঝানোই উদ্দেশ্য। তোমার রব চাইলে স্বতন্ত্র কথা। অর্থাৎ কোনো কাজ করেই আল্লাহ অক্ষম হয়ে পড়বেন না। সব সময়ই তিনি সকল জিনিসের ওপরই পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি যখন যা চান তা বিনা বাধায় ও বিনা কায়-ক্লেশে সমাধান করতে পারেন।
হাশরের দিন দু রকম চেহারা দেখা যাবে
হাশরের ময়দানে দু রকম চেহারা নিয়ে মানুষেরা উঠে আসবে। একদল হাস্যোজ্জ্বল। আর একদল কালিমা লিপ্ত। তাদের কথা আল্লাহ আবাসার ৩৮-৪২ আয়াて এভাবে বলেছেন :
وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ مُّسْفِرَةٌ ضَاحِكَةٌ مُسْتَبْشِرَةٌ وَوُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ عَلَيْهَا غَبَرَةٌ هُ تَرْهَقُهَا قَتَرَةٌ أُولَئِكَ هُمُ الْكَفَرَةُ الْفَجَرَةُ .
"সেদিন কিছু লোকের চেহারা ঝকঝক করতে থাকবে। হাসি খুশীতে ভরা ও সন্তুষ্ট স্বাচ্ছন্দ হবে। আবার কতিপয় লোকের মুখাবয়ব ধূলিমলিন হবে, অন্ধকারে চেহারা আচ্ছন্ন থাকবে।"
যখন আমলনামা হাতে দেয়া হবে
হাশরের দিন যখন তাদের হাতে আমলনামা দেয়া হবে। তাদেরকে ভীতসন্ত্রস্ত দেখা যাবে। আল্লাহ এ দৃশ্যটির কথা সূরা আল কাহফের ৪৯ আয়াতে এভাবে বলেছেন :
وَوُضِعَ الْكِتَبُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يُوَيْلَتَنَا مَالِ
هٰذَا الْكِتٰبُ لَا يُغَادِرُ صَغِيْرَةً وَلَا كَبِيْرَةً إِلَّا أَحْصٰهَا ، وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا ، وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا.
"আর যখন আমলনামা সামনে রেখে দেয়া হবে। তখন তোমরা দেখবে যে, অপরাধী লোকেরা নিজেদের কিতাবে লিখিত সব বিষয় সম্পর্কে খুবই ভয় পাচ্ছে। আর বলছে, হায়রে দুর্ভাগ্য। এটা কেমন কিতাব যে, আমাদের ছোট বড় কোনো কাজই এমন থেকে যায়নি যা এতে লিপিবদ্ধ করা হয়নি। তারা যে যা করেছিল তা সবই নিজের সামনে উপস্থিত পাবে, আর তোমার আল্লাহ কারো প্রতি একবিন্দু যুলুম করবেন না।"
ডান হাতে পাওয়া আমলনামা
ডান হাতে যারা আমলনামা পাবেন তাদের চিত্র আল্লাহপাক সূরা আল হাক্কার ১৯-২০ আয়াতে এভাবে বলেছেন:
فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كَتَبَهُ بِيَمِينِهِ ، فَيَقُولُ هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتٰبِيَهُ إِنِّي ظَنَنْتُ أَنِّي مُلْقٍ حِسَابِيَهُ
"সে সময় অর্থাৎ হাশরের দিন যার আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, দেখ দেখ, পড় আমার আমলনামা। আমি মনে করেছিলাম যে, আমার হিসাব অবশ্যই পাওয়া যাবে।"
বাম হাতে পাওয়া আমলনামা
বাম হাতে যারা তাদের আমলনামা পাবে তারা কি বলবে ও তাদের অবস্থা কেমন হবে তার চিত্র আল্লাহ পাক সূরা আল হাক্কার ২৫-৩৭ আয়াতে এঁকে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন:
وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كَتَبَهُ بِشِمَالِهِ ، فَيَقُولُ يُلَيْتَنِي لَمْ أُوْتَ كِتٰبِيَهُ ۚ وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهُ : يُلَيْتَهَا كَانَتِ الْقَاضِيَةَ ، مَا أَغْنَى عَنِّي مَالِيَهُ ۚ ۚ هَلَكَ عَنِّي سُلْطٰنِيَهُ خُذُوهُ فَغُلُّوهُ ۚ ثُمَّ الْجَحِيمَ صَلُّوهُ ۚ ثُمَّ فِي سِلْسِلَةٍ ذَرْعُهَا سَبْعُونَ ذِرَاعًا فَاسْلُكُوْهُ ۚ إِنَّهُ كَانَ لَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَلَا يَحُضُّ
عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ فَلَيْسَ لَهُ الْيَوْمَ هُهُنَا حَمِيمٌهُ وَلَا طَعَامُ إِلَّا مِنْ غسلين لا يَأْكُلُهُ إِلَّا الْخَاطِئُونَ .
"আর যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে, সে বলে উঠবে হায়! আমার আমলনামা আমাকে যদি দেয়া না হতো। আর আমার হিসাব কি তা যদি আমি না-ই জানতাম! হায়, আমার মৃত্যুই যদি চূড়ান্ত হতো! আজ আমার ধন-সম্পদ আমার কোনো কাজে আসলো না। আমার সব ক্ষমতা আধিপত্য প্রভুত্ব নিঃশেষ হয়ে গেছে। তখন নির্দেশ দেয়া হবে: ধরো লোকটিকে, তার গলায় ফাঁস লাগিয়ে দাও, অতপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করো। এরপর তাকে সত্তর হাতের দীর্ঘ শিকলে বেঁধে দাও। সে লোকটি না মহান আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান এনেছে, আর না সে মিসকীনকে খাবার খাওয়ানোয় উৎসাহ দান করতো। এ কারণে আজ এখানে তার সহানুভূতিশীল সহমর্মী বন্ধু কেউ-নেই। আর না আছে ক্ষত-নিঃসৃত রস ছাড়া তার কোনো খাদ্য- নিতান্ত অপরাধী লোক ছাড়া যা আর কেউই খায় না।"
হাশরের ময়দানে ভণ্ড প্রতারকদের অসহায়ত্ব
হাশরের ময়দানে পাপী ভণ্ড প্রতারকরা কেমন অসহায় হয়ে পড়বে তারও চিত্র সূরা ইবরাহীমের ২১ আয়াতে আঁকা হয়েছে। অথচ তারা প্রতারণা করে নিজেদেরকে বুদ্ধিমান ও চালাক মনে করতো। আল্লাহ বলেন:
وَبَرَزُوا لِلَّهِ جَمِيعًا فَقَالَ الضُّعَفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا إِنَّا كُنَّا لَكُمْ تَبَعًا فَهَلْ أَنْتُمْ مُّغْنُونَ عَنَّا مِنْ عَذَابِ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ ، قَالُوا لَوْ هَدْنَا اللَّهُ لَهَدَيْنَكُمْ ، سَوَاءٌ عَلَيْنَا أَجَزِعْنَا أَمْ صَبَرْنَا مَا لَنَا مِنْ مَّحِيْصٍ
"আর এ লোকেরা যখন একত্রিত হয়ে আল্লাহর সামনে উম্মোচিত হবে, তখন এদের মধ্যে যারা পৃথিবীতে দুর্বল ছিল তারা যারা বড়লোক বনেছিল তাদেরকে বলবে: দুনিয়ায় আমরা তোমাদের অধীন ছিলাম, এখন তোমরা আল্লাহর আযাব থেকে আমাদেরকে বাঁচাবার জন্যও কিছু করতে পারো? তারা জবাব দিবে: আল্লাহ যদি আমাদেরকেই মুক্তির কোনো পথ দেখাতেন তাহলে আমরা অবশ্যই তোমাদেরও দেখাতাম।
এখন আহাজারী করি কি ধৈর্য অবলম্বন করি উভয়ই আমাদের জন্য সমান। আমাদের রক্ষা ও মুক্তি লাভের কোনো উপায়ই নেই।”
হাশরের দিন শয়তানের অবস্থা
হাশরের ময়দানে সবকিছুর ফায়সালা হয়ে যাবার পর শয়তান অসহায় হয়ে যাবে। শয়তানের এ অসহায়ত্বের চিত্র আল্লাহ সূরা ইবরাহীমের ২২ আয়াতে চিত্রিত করে বলেছেন:
وَقَالَ الشَّيْطَنُ لَمَّا قُضِيَ الْأَمْرُ إِنَّ اللهَ وَعَدَكُمْ وَعْدَ الْحَقِّ وَوَعَدْتُكُمْ فَأَخْلَفْتُكُمْ ، وَمَا كَانَ لِي عَلَيْكُمْ مِّنْ سَلْطَنٍ إِلَّا أَنْ دَعَوْتُكُمْ فَسْتَجَبْتُمْ لي فَلَا تَلُومُونِي وَلُوْمُوا أَنْفُسَكُمْ مَا أَنَا بِمُصْرِخِكُمْ وَمَا أَنْتُمْ بِمُصْرِحَى إِنِّي كَفَرْتُ بِمَا أَشْرَكْتُمُونِ مِنْ قَبْلُ إِنَّ الظَّلِمِينَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
"আর হাশরের দিনের চূড়ান্ত ফায়সালা হয়ে যাবার পর শয়তান বলবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তোমাদের প্রতি আল্লাহ যেসব ওয়াদা করেছিলেন তা সবই সত্য ছিল। আর আমি যত ওয়াদাই করেছিলাম তার মধ্যে কোনো একটিও পালন করিনি। তোমাদের ওপর আমার তো কোনো জোর ছিল না। আমি এটা ছাড়া আর তো কিছু করিনি—শুধু এটাই করেছি যে, তোমাদেরকে আমার পথে চলার জন্য আহ্বান করেছি। আর তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছো। এখন আমাকে দোষ দিও না—তিরস্কার করো না, নিজেকেই নিজে তিরস্কৃত করো, এখানে না আমি তোমাদের ফরিয়াদ শুনতে পারি, না তোমরা আমার ফরিয়াদ শুনতে পারো। ইতিপূর্বে তোমরা যে আমাকে খোদায়ীর ব্যাপারে শরীক বানিয়ে নিয়েছিলে, আমি তার দায়িত্ব থেকে মুক্ত। এরূপ যালেমদের জন্য তো কঠিন পীড়াদায়ক শাস্তি নিশ্চিত।"
📄 হাশরের ময়দানের আরো কিছু ভয়াবহ অবস্থা
কবর থেকে মানুষের উঠে আসা
তিরমিযীতে আছে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন: আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, শেষ শিঙা ফুঁকার পর সবার আগে যমীন বিদীর্ণ করে আমাকে উঠানো হবে। তারপর আবু বকর ও ওমর উঠে আসবে। তারপর আমি জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে যাবো। তাদেরকেও আমার সাথে একত্রিত করা হবে। এরপর মক্কাবাসীদেরকেও আমার সাথে একত্র করা হবে। অতপর আমি হারামাঈনবাসীদের মাঝে হাশরের ময়দানে একত্রিত হবো।
যারা কবরে আছে তারা তো শিঙার আওয়াজ শুনেই কবর হতে বেরিয়ে আসবে। যাদেরকে আগুনে জ্বালানো হয়েছে অথবা সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে কিংবা জঙ্গলে হিংস্র জন্তু খেয়ে ফেলেছে তারাও আপন আপন জায়গা হতে দেহপ্রাপ্ত হয়ে হাশরের ময়দানে এসে একত্রিত হবে।
হাশরের ময়দানে মানুষ উলঙ্গ ও খতনা বিহীন হওয়া
বুখারী ও মুসলিমে আছে: হযরত আয়েশা রা. বলেছেন, আমি আল্লাহর রাসূলকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, হাশরের দিন মানুষকে খোলা পায়ে ও খতনা বিহীন অবস্থায় সমবেত করা হবে। একথা শুনে আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! নারী পুরুষ সকলেই কি উলঙ্গ হয়ে উঠবে? একে অপরকে দেখতে পাবে? এটাতো খুবই শরমের কথা। একথা শুনে আল্লাহর রাসূল সা. বলেন, হে আয়েশা! হাশরের দিন এতো কঠিন ও ভয়াবহ হবে, মানুষ এতো ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠবে যে, তখন কারো দিকে কারো তাকাবার খেয়ালই থাকবে না।
আর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন। তোমাদেরকে হাশরের দিন অবশ্যই খালি পায়ে, নগ্ন দেহে ও খতনা বিহীন অবস্থায় একত্রিত করা হবে। তারপর তিনি কালামে পাকের সূরা আল আম্বিয়ার ১০৪ আয়াতটি তেলাওয়াত করেন। আল্লাহ বলেন:
كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ، وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَعِلَيْنَ
"আমি যেভাবে তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছি ঠিক সেভাবে দ্বিতীয়বারও সৃষ্টি করবো। এটা আমার মজবুত ওয়াদা। আর এই কাজ আমি করবোই।"
বুখারী ও মুসলিম শরীফে আছে। আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, অতপর কিয়ামতের দিন সবার আগে হযরত ইবরাহীম আ.-কে পোশাক পরানো হবে। এর কারণ হিসাবে উলামায়ে কিরাম বলেন, যেহেতু তিনিই সর্বপ্রথম কাপড় পরিধান করেছেন অথবা তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করার সময় নগ্ন করে নিক্ষেপ করা হয়েছিলো। তাই আগে তাঁকে পোশাক পরিধান করানো হবে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, সবার আগে যাকে কাপড় পরানো হবে, তিনি হযরত ইবরাহীম আ.। আল্লাহ বলবেন, আমার বন্ধুকে কাপড় পরাও। তারপর জান্নাত হতে দুটি মসৃণ নরম ও সাদা রঙের কাপড় তাঁকে পরাবার জন্য আনা হবে। তারপর আমাকে পরানো হবে।
কবর হতে উঠে হাশরের মাঠে যাওয়া
তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, হাশরের দিন তিন প্রকার মানুষকে একত্রিত করা হবে। (১) পায়ে চলা দল, (২) সওয়ার হওয়া দল, (৩) চেহারার উপর ভর করে চলার দল। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! চেহারার ওপর ভর করে তারা কিভাবে চলবে, জবাবে আল্লাহর রাসূল বললেন, যে পবিত্র সত্তা তাদেরকে পায়ে ভর করে চালিয়েছেন তিনি তাদেরকে চেহারার উপর ভর করে চালাবার ক্ষমতাও রাখেন। তারপর তিনি বলেন, জেনে রেখো, চেহারার উপর ভর করে এমনভাবে চলবে, যেমন যমীনের উঁচু নিচু জায়গা এবং কাঁটা থেকেও নিজেকে রক্ষা করতো। এটা হবে কাফেরদের অবস্থা। কারণ দুনিয়ায় তারা তাদের চেহারা আল্লাহর সামনে নত করেনি। গর্ব ও অহংকারে মাথানত করে আল্লাহকে সাজদা করতে অস্বীকার করেছে। এখন তার বদলা নিয়ে সে মাথাকে নত করে মাটির সাথে মিশিয়ে হাটাবেন। এটা আল্লাহর জন্য অসম্ভব কিছু না।
কাফেরদেরকে বোবা, বধির ও অন্ধ করে উঠানো হবে
হাশরের ময়দানে আল্লাহ কাফেরদেরকে বোবা, বধির ও অন্ধ করে উঠাবেন। সূরা বনী ইসরাঈলের ৯৭ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
وَنَحْشُرُهُمْ يَوْمَ الْقِيمَةِ عَلَى وُجُوهِهِمْ عُمْيًا وَبُكْمًا وَصُمَّا
"আমি তাদেরকে হাশরের মায়দানে অন্ধ, বোবা ও বধির বানিয়ে চেহারার ওপর ভর করে বিচরণ করাবো।"
সূরা ত্বা-হার ১২৪-১২৭ আয়াতে একথাটাই আল্লাহ এভাবে বলেছেন:
وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيمَةِ أعْمَى قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَى وَقَدْ كُنْتُ بَصِيْرًا قَالَ كَذَلِكَ أَتَتْكَ ايَتُنَا فَنَسِيْتَهَا ، وَكَذَلِكَ الْيَوْمَ تُنْسَى وَكَذَلِكَ نَجْزِي مَنْ أَسْرَفَ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِايَتِ رَبِّهِ ، وَلَعَذَابُ الْآخِرَةِ أَشَدُّ وَأَبْقَى .
"আর যে আমার স্মরণ হতে মুখ ফিরিয়ে নিবে, তার জন্য দুনিয়ায় হবে সংকীর্ণ জীবন, আর কিয়ামতের দিন আমরা তাকে অন্ধ করে উঠাবো সে বলবে, হে আল্লাহ! দুনিয়ায় তো আমি চক্ষুষ্মান ছিলাম, এখানে কেন আমাকে অন্ধ করে তুললে? আল্লাহ তাআলা বলবেন, হ্যাঁ, এমনিভাবেই তো আমার আয়াতগুলো যখন তোমার নিকট এসেছিলো তুমি তখন তা ভুলে গিয়েছিলে! ঠিক সেই রকমই আজ তোমাকেও ভুলে যাওয়া হচ্ছে। এভাবেই আমরা সীমালংঘনকারী এবং আল্লাহর আয়াত অমান্যকারী লোকদেরকে দুনিয়ায় ফল দান করে থাকি। আর পরকালের আযাব অধিক কঠোর ও স্থায়ী।"
এ দুনিয়ায় যারা আল্লাহর দীন থেকে মুখ ফিরিয়ে রয়েছে, তাঁর আয়াতগুলোকে গ্রহণ করার পরিবর্তে প্রতাখ্যান করেছে ও অবহেলার চোখে দেখেছে। তাদের চোখের জ্যোতি, কান ও বাকশক্তি ছিনিয়ে নেয়া হবে। হাশরের মাঠে তারা প্রথম দিকে বোবা, বধির ও অন্ধ হয়ে উঠবে। পরে তাদের চোখ, কান ও মুখ হাশরের ভয়াবহ অবস্থা দেখার জন্য খুলে দেয়া হবে। যাতে হিসাব-নিকাশের সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়। -মাআলিমুত তানযীল
হাশরের ময়দানে কাফেররা নীল চক্ষু নিয়ে উঠবে
সূরা ত্বা-হার ১০২ আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন:
يَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّورِ وَنَحْشُرُ الْمُجْرِمِينَ يَوْمَئِذٍ زُرْقَانَ
"যে দিন শিঙায় ফুঁক দেয়া হবে সেদিন আমরা অপরাধী লোকদেরকে এমন অবস্থায় একত্রিত করবো যে, আতংকের কারণে তাদের চোখ নীল বর্ণ হয়ে যাবে।”
দুনিয়ায় তাদের থাকার হিসাব
হাশরের ময়দানে একত্রিত হবার পর পরস্পর তারা বলাবলি করবে— তারা দুনিয়াতে কতোদিন বসবাস করলো। আবার তারা নিজেরাই বলবে, মাত্র দশদিন দুনিয়ায় ছিলাম। একথাটাই সূরা ত্বা-হার ১০৩ আয়াতে আল্লাহ বলে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন:
يَتَخَافَتُوْنَ بَيْنَهُمْ إِنْ لَبِثْتُمْ إِلَّا عَشْرًا
"তারা পরস্পর চুপে চুপে বলবে যে, দুনিয়ায় বড় জোর মোটে দশটি দিনই হয়তো কাটিয়ে দিয়েছো।"
সূরা ত্বা-হারই ১০৪ আয়াতে আবার বলা হয়েছে:
نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَقُولُونَ إِذْ يَقُولُ أَمْثَلُهُمْ طَرِيقَةً إِنْ لَبِثْتُمْ إِلَّا يَوْمًا 8
"আমরা ভালো করেই জানি তারা কি কথা বলবে। (আমরা একথাও জানি যে), তখন তাদের মধ্যে যে লোক সর্বাধিক সতর্ক অনুমান করতে পারবে, সে বলবে যে, না তোমাদের দুনিয়ার জীবন শুধু একদিনের জীবন ছিলো।"
পরকালের দীর্ঘ জীবন ও হাশরের ময়দানের ভয়াবহ দৃশ্য দেখে দুনিয়া ও কবরের অবস্থান তাদের কাছে খুবই কম সময় বলে মনে হবে। কারো কাছে মনে হবে মাত্র দশদিন থেকে এসেছে। এদের মধ্যে বেশী সচেতন বুদ্ধি-বিবেকসম্পন্ন লোক বলবে, দশদিন কোথায়? মাত্র একদিন বলো। এ লোকটি দুনিয়ার সামান্য সময়ের অবস্থান আর আখিরাতের চিরস্থায়িত্বকে অন্যদের তুলনায় বেশী বুঝতে পেরেছে। তাই তাকে বুদ্ধিমান ও বিবেক- সম্পন্ন বলা হয়েছে। সূরা আন নাযিআতের ৪৬ আয়াতে আল্লাহ একথাটি বলেছেন। তিনি বলেছেন:
كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا عَشِيَّةً أَوْ ضُحْهَا
"যে দিন এ লোকেরা হাশরের দিনকে দেখতে পাবে তখন তারা মনে করবে এ দুনিয়ায় অথবা মৃত অবস্থায় শুধু একদিনের বিকেল কিংবা সকাল বেলাই তারা অবস্থান করেছে মাত্র।"
তখন দুনিয়ায় নবী রাসূলদের মুখে কিয়ামতের কথা শুনলে বলতো, তোমাদের কথায় যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে সে ওয়াদা কবে পূরণ হবে? কিয়ামত কখন আসবে? কিন্তু তখন অতর্কিত কিয়ামত এসে পড়ার পর তাদের কাছে মনে হবে যেনো কিয়ামত বেশ দ্রুত এসে গেছে।
সূরা আর রূমের ৫৫ আয়াতে একথাটিই স্পষ্ট করে আল্লাহ বলেছেন:
وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ يُقْسِمُ الْمُجْرِمُونَ : مَا لَبِثُوا غَيْرَ سَاعَةٍ ، كَذَلِكَ كَانُوا يُؤْفَكُونَ
"যে দিন কিয়ামত হবে, তখন অপরাধী লোকেরা শপথ করে বলবে যে, আমরা অল্প সময়ের বেশী অবস্থান করিনি। এমনিভাবেই তারা দুনিয়ার জীবনে ধোঁকা খাচ্ছিলো।"
কিয়ামত ও হাশরের ময়দানের বিভীষিকাময় অবস্থা দেখার পর দুঃখ করে তারা বলবে, দুনিয়া ও কবরের জীবন তো খুবই দ্রুত শেষ হয়ে গেলো। যদি দুনিয়ায় আরো কিছুটা সময় পেতাম কিছু প্রস্তুতি নিয়ে আসতে পারতাম। হঠাৎ বিপদ এসে গেলো। এ লোকেরা দুনিয়ার ভোগ বিলাস ও আরাম আয়েশের দীর্ঘ সময়ের কথা সব ভুলে যাবে। দুনিয়ার জীবনকে ভোগ বিলাসে কাটানো সহায় সম্পদ প্রতাপ প্রতিপত্তিতে দীর্ঘ সময় কাটাবার পর এ সময় সামান্য বলে অভিহিত করবে। তাদের এসব কথাকে আল্লাহ সূরা আর রূমের ৫৫ আয়াতে বলেন:
وَيَوْمَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ يُقْسِمُ الْمُجْرِمُونَ : مَا لَبِثُوا غَيْرَ سَاعَةٍ ، كَذَلِكَ كَانُوا يُؤْفَكُونَ
"আর যখন সেই সময়টি এসে পড়বে, তখন অপরাধী লোকেরা শপথ করে বলবে যে, আমরা অল্প সময়ের বেশী অবস্থান করিনি। এমনিভাবে তারা দুনিয়াতেও উল্টাপাল্টা কথা বলতো।"
অর্থাৎ আজে বাজে ধারণা পোষণ করতো। দুনিয়াতে যেমনি সত্যকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করেনি। আজো তেমনি সত্য বলছে না।
তারপর আল্লাহ তাআলা সূরা আর রূমের ৫৬ আয়াতে বলেন:
وَقَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمِ وَالْإِيمَانَ لَقَدْ لَبِثْتُمْ فِي كِتَبِ اللَّهِ إِلَى يَوْمِ الْبَعْثِ وَ فَهُذَا يَوْمُ الْبَعْثِ وَلَكِنَّكُمْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ .
"কিন্তু যাদেরকে জ্ঞান ও ঈমান দেয়া হয়েছে, তারা বলবে যে, আল্লাহর লিখনতো তোমরা পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত পড়ে রয়েছো। এটাতো সেই হাশর কিন্তু তোমরা জানতে না।"
তাদের এসব ক্ষণস্থায়িত্বের কথা শুনে জ্ঞানী ও ঈমানদারগণ তাদের প্রতিবাদ করে বলবে, তোমরা মিথ্যা বলছো। অল্প সময় থাকার কথা একেবারেই মিথ্যা। তোমরা আল্লাহর দেয়া নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দুনিয়ায় ও কবরে অবস্থান করেছো। এক মুহূর্তও কম সময় কাটাওনি। প্রত্যেকেই জীবনকাল শেষ করে বারযাখের দীর্ঘ সময় কাটিয়ে এখন হাশরের মাঠে এসে হাযির হয়েছো। এ দিনের অনিবার্যতার কথা তোমাদেরকে শুনানো হয়েছিলো বিশ্বাস তো করোনি। বরং উল্টো তাদের নির্যাতন করেছো, মিথ্যাবাদী বলেছো, এখন দেখে নাও যা তোমরা বিশ্বাস করতে না। তখন বিশ্বাস করলে আজ প্রস্তুতি নিয়ে এখানে আসতে পারতে।
হাশরের মাঠে বিভিন্ন অপরাধীদের দুরবস্থা
হাশরের মাঠে প্রত্যেকে আমল অনুযায়ী ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে উঠবে।
হাত পাতা লোকদের দূরবস্থা
বুখারী ও মুসলিমে আছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, মানুষ অন্যের কাছে হাত পেতে চাইতে চাইতে খুব নিচু স্তরে পৌঁছে যায়। হাশরের ময়দানে তার চেহারায় গোশতের সামান্য টুকরাও বাকী থাকবে না।
বার বার মানুষের কাছে হাত বাড়িয়ে ভিক্ষা করার জন্য হাশরের ময়দানে তাকে মুখে গোশতবিহীন অবস্থায় উঠানো হবে।
তবে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করা যেমন খারাপ কাজ, ভিক্ষুককে অপমান ও লাঞ্ছনা দিয়ে বঞ্চিত করাও তেমনি খারাপ কাজ। উভয়ের কাজের পরিণতিই হাশরের ময়দানে হাদীসে বর্ণিত অবস্থার মতো হবে।
স্ত্রীদের মধ্যে অবিচারকারীর হাশর
দুনিয়ায় যার দু'জন স্ত্রী ছিলো। সে তাদের মধ্যে সুবিচার করেনি। হাশরের মাঠে সে তার শরীরের একপাশ পড়ে থাকা অবস্থায় হাযির হবে।-মিশকাত
কুরআন ভুলে যাওয়া লোকের হাশর
মিশকাত শরীফে আছে, হযরত সা'দ ইবনে উবাদাহ রা. বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি কুরআন মুখস্থ করে তা অলসতা অবহেলার জন্য ভুলে যায়, সে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত অবস্থায় হাশরের মাঠে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে।
বেনামাযীর হাশর
আহমাদ দারেমীতে আছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. একটি হাদীসে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত নামায আদায় করবে না নামায তার জন্য নূর হবে না। দলীলও হবে না নাজাতেরও উপায় হবে না। ফেরাউন, কারুন, হামান ও উবাই ইবনে খালফের সাথে সে হাশরের ময়দানে উঠবে।
রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন, হাশরের দিন বেনামাযীর জন্য কোনো আলো থাকবে না। দলিল হবে না। নাজাতেরও কোনো উপায় থাকবে না। বরং সেদিন ফেরাউন, নমরূদ, হামান ও উবাই ইবনে খালফের সাথে তার হাশর নশর হবে।
হন্তা ও নিহতের হাশর
তিরমিযি ও নাসাঈতে হযরত আবু হুরাইরাহ রা. হতে বর্ণিত। একটি হাদীসে আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, যে লোক কোনো মু'মিনকে হত্যা করার জন্য সামান্য কথা বলেও সাহায্য করে, হাশরের ময়দানে সে দু চোখের মাঝে 'আল্লাহর রহমত বঞ্চিত' লেখা নিয়ে উঠবে।
চুক্তি ও ওয়াদা ভঙ্গকারীর হাশর
মুসলিম শরীফে আছে, হযরত সাঈদ রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, প্রত্যেক চুক্তি ও ওয়াদা ভঙ্গকারীর কাছে একটি পতাকা থাকবে। এ পাতাকা তার গুহ্যদ্বারে লাগানো থাকবে।
মিশকাত শরীফে আর একটি হাদীস বর্ণিত আছে। আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, যার বিশ্বাসঘাতকতা যত বড় হবে তার পতাকা ততো উঁচু হবে। তারপর তিনি বলেন, হুশিয়ার! যে লোক মানুষের শাসক হয়েছে, তার চাইতে বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা আর কারো হতে পারে না। তার বিশ্বাসঘাতকতায় গোটা জাতি বিপদগ্রস্থ হয়ে পড়ে।
যাকাত অনাদায়ীর হাশর
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি দুনিয়ার ধন-সম্পদের যাকাত আদায় করবে না, হাশরের দিন তার এ সম্পদ 'টাক পড়া সাপে' পরিণত হবে। এর চোখের ওপর দুটি বিন্দু থাকবে, সাপে তাকে দংশন করতে থাকবে। সোনা রূপার যাকাত আদায় না করলে তাকে হাশরের মাঠে সেই সোনা
রূপা গরম করে সেক দেয়া হবে। তারপর আল্লাহর রাসূল স. তেলাওয়াত করলেন। সূরা আলে ইমরানের ১৮০ আয়াত:
وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُوْنَ بِمَا آتَهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَّهُمْ ، بَلْ هُوَ شَرٌّ لَّهُمْ ، سَيُطَوَّقُوْنَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيمَةِ ، وَلِلَّهِ مِيْرَاثُ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ ، وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
"যেসব লোককে আল্লাহ অনুগ্রহ দানে ধন্য করেছেন এবং তা সত্ত্বেও তারা কৃপণতা করে তারা যেন মনে না করে যে, এ কৃপণতা তাদের পক্ষে ভাল। না, বরং এটা তাদের পক্ষে খুবই খারাপ। তারা কৃপণতা করে যাকিছু সঞ্চয় করছে কিয়ামতের দিন তাই তাদের গলার রশি হয়ে দাঁড়াবে। আকাশ ও পৃথিবীর উত্তরাধিকার আল্লাহরই জন্য; আর তোমরা যাকিছু করছো, আল্লাহ তা ভালো করেই জানেন।"
গৃহপালিত পশুর যাকাত আদায় না করলে তাকে হাশরের ময়দানে ওইসব পশুর শিং দিয়ে গুতানো হবে। পায়ের খুর দিয়ে মাড়িয়ে দলিত, মথিত করা হবে।
দুমুখো মানুষের হাশর
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুমুখো নীতি সম্পন্ন মানুষ হাশরের দিন মুখে আগুন নিয়ে উঠবে।
মনগড়া স্বপ্ন বর্ণনাকারীর হাশর
মিশকাত শরীফে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে লোক মনগড়া স্বপ্ন বর্ণনা করবে, হাশরের দিন তাকে দুটো যবের বীজের মধ্যে গিট লাগাতে বলা হবে। কিন্তু সে তা লাগাতে পারবে না। এজন্য তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে।
হাশরের মাঠে ঘামের বিপদ
হাশরের মাঠে পাপী মানুষেরা বেশী কষ্ট পাবে। অনবরত ঘাম ঝরবে তাদের শরীর বয়ে। আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, হাশরের দিন সূর্য মাথার ওপরে মাত্র এক মাইল দূরে থাকবে। পাপীরা তাদের আমল অনুযায়ী ঘামে নিমজ্জিত হতে থাকবে। ঘাম কারো পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত, কারো হাঁটু
পর্যন্ত, কারো লুঙ্গী পরার জায়গায়, কারো পা হতে মুখ পর্যন্ত হবে। পাপী লোকের ঘাম লাগামের মতো মুখে ঢুকে থাকবে।
এক হাদীসে উল্লেখ হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হাশরের ময়দানে মানুষ মাত্রাতিরিক্ত ঘামের কারণে বলতে থাকবে, হে আল্লাহ! ঘামের এ মহাবিপদ থেকে পরিত্রাণ দিয়ে আমাদেরকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দাও। তা আমাদের কাছে বরং এ কষ্টের চেয়ে আসান হবে। অথচ জাহান্নামের আযাব এর চেয়ে ভয়াবহ তা তারা জানে। শুধু ঘামের আযাব থেকে বাঁচার জন্য এ তারা ফরিয়াদ জানাবে।
কু-শাসক বৃন্দের হাশর
দারেমীতে আছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো লোক দশজন মানুষের আমীর বা নেতা হলেও হাশরের দিন তাকে হাত পা বাঁধা অবস্থায় উঠানো হবে। তারপর সে তার অধীন লোকদের প্রতি সুবিচার করে থাকলে এ সুবিচার তাকে রেহাই দেবে। আর সুবিচার না করে যুলুম করে থাকলে এ যুলুম তাকে ধ্বংস করে দেবে।
মিশকাতের এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, প্রত্যেক শাসককেই কিয়ামতের দিন ফেরেশতারা তার ঘাড় ধরে রাখবে ও আল্লাহর দিকে মাথা উঠিয়ে তার নির্দেশের অপেক্ষা করবে। তার যুলুমের কারণে আল্লাহ তাকে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিলে ফেরেশতা তাকে এমন ভূগর্ভের গর্তে নিক্ষেপ করবে, যার তলায় পৌঁছতে ৪০ বছর সময় লেগে যাবে।
অহংকারীর হাশর
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুনিয়ার অহমিকা অহংকার দেখিয়ে চলাচলকারীদেরকে হাশরের দিন মর্যাদাহানীকর পোশাক পরিয়ে আল্লাহ হাশরের ময়দানে উঠাবেন।
সাক্ষ গোপনকারীর হাশর
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সত্যের সাক্ষ দেয়ার জন্য আল্লাহ দুনিয়ায় নির্দেশ দিয়েছিলেন। যে লোক এ সত্যের সাক্ষ না দিয়ে তা গোপন করেছে। হাশরের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরায়ে উঠানো হবে।-আহমাদ ও তিরমিযি
আড়ি পেতে শ্রবণকারীর হাশর
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে লোক দু ব্যক্তির আলাপ আলোচনা শুনার জন্য আড়ি পেতে থাকবে, যা সে অন্যকে শুনাতে চায় না। হাশরের ময়দানে তার কানে গলানো শিশা ঢেলে ঢেলে উঠানো হবে।-মেশকাত
পরের জায়গা দখলকারীর হাশর
বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রাসূল বলেছেন, যে লোক যুলুম করে কারো ভাগ দখল করবে, হাশরের দিন তাকে মাটির সপ্তম স্তর পর্যন্ত গাড়া হবে। আরো এক বর্ণনায় আছে। আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, যে লোক অন্যায়ভাবে কারো জায়গা আত্মসাত করবে, হাশরের দিন তাকে যমীনের সপ্তম স্তরের শেষ পর্যন্ত খনন করাতে বাধ্য করবেন। বিচার শেষ হবার আগ পর্যন্ত তার গলায় সাত স্তর যমীন লটকিয়ে দেয়া হবে।
ইলম গোপনকারীর হাশর
আহমদ ও তিরমিজিতে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, কাউকে জানার জন্য কোনো বিষয় সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করলে সে তা না বলে গোপন করলে হাশরের দিন তার মুখে আগুনের লাগামপরানো হবে।
📄 হাশরের ময়দানে ভাগ্যবান লোকগণ
রাগ সম্বোরণকারীর হাশর
তিরমিযী ও আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল সঃ বলেছেন, যে ব্যক্তি রাগ হয়ে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারতো। কিন্তু তা না করে সে রাগ হজম করেছে, হাশরের দিন আল্লাহ এ লোককে সকলের সামনে ডেকে এনে তাকে যে কোনো হুরকে গ্রহণ করার অধিকার দেবেন।
হারামাইনে মৃত্যুবরণকারীর হাশর
বায়হাকীতে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি মদীনায় থেকে সেখানকার দুঃখ-কষ্টে ধৈর্যধারণ করেছে, হাশরের দিন আমি তার জন্য সাক্ষ দেবো ও সুপারিশ করবো। আর যে ব্যক্তি মক্কা মদীনার হারাম এলাকায় মৃত্যুবরণ করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে নিরাপদ ব্যক্তির সাথে হাশর করাবেন।
হজ্জ পালনকালে মৃত্যুবরণ
বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, এক লোক আল্লাহর রাসূলের সাথে হজ্জের সময় আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ সে সওয়ারী থেকে পড়ে ঘাড় ভেঙে মৃত্যুবরণ করলো। রাসূলুল্লাহ স. তাকে বরই পাতার গরম করা পানি দিয়ে গোসল দিতে ও ইহরামের কাপড় দিয়ে কাফন দিতে বললেন এবং মাথা ঢাকতে নিষেধ করলেন। কারণ এ লোক হাশরের মাঠে তালবিয়া অর্থাৎ লাব্বাইকা ...... বলতে বলতে উঠে আসবে।
শহীদগণ
বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় আঘাত পেয়ে মৃত্যুবরণ করে। আর কে আল্লাহর রাস্তায় আঘাত পেয়ে মৃত্যুবরণ করলো তা আল্লাহ ভালো জানেন। হাশরের ময়দানে সে ব্যক্তি উক্ত আঘাত থেকে রক্ত প্রবাহিত অবস্থায় উঠে আসবে। রক্ত হবে গাঢ় রক্তীম বর্ণের। আর সুগন্ধ হবে মেশকের মতো।
অন্ধকারে মসজিদে যাওয়া
তিরমিযীতে হযরত আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল বলেছেন, অন্ধকারে মসজিদে গমনকারী ব্যক্তিদেরকে শুনিয়ে দাও, হাশরের দিন পরিপূর্ণ নূর দিয়ে তাদেরকে উঠিয়ে আনা হবে।
আযানের মর্যাদা
মুসলিমে হযরত মুআবিয়া রা. হতে বর্ণিত। রাসূল স. বলেছেন, হাশরের ময়দানে আযান দাতার গর্দান সবচেয়ে বেশী লম্বা হবে। -মুসলিম
আল্লাহর জন্য ভালোবাসা
আল্লাহর রাসূল স. বলেছেন, যারা শুধু আল্লাহর জন্য পরস্পরকে ভালোবাসে হাশরের ময়দানে তাদের জন্য নূরের মিম্বর থাকবে। নবী ও শহীদগণ তাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হবে। তারা নূরের মিম্বারে বসা থাকবে। আর নবী শহীদগণ অন্যের জন্য সুপারিশে নিয়োজিত থাকবেন। -মেশকাত
আরশের ছায়া লাভকারীগণ
হযরত আবু হুরাইরা রাঃ হতে বর্ণিত। রাসূল স. বলেছেন, হাশরের মাঠে সাত ধরনের লোককে আল্লাহ তাআলা আরশের ছায়ায় জায়গা দেবেন। সেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কারো ছায়া থাকবে না।
তারা হলেন:
১. মুসলমানদের ন্যায়বিচারক বাদশা।
২. যে ব্যক্তি নিজের যৌবন কালকে আল্লাহর পথে কাটিয়েছে।
৩. যে ব্যক্তির মন মসজিদে পড়ে থাকে। মসজিদে নামায পড়ে আসার পর আবার মসজিদে যাবার জন্য মন আনচান করতে থাকে।
৪. আল্লাহর জন্যই যারা পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসে। আবার আল্লাহর জন্যই পরস্পর পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়।
৫. যে নির্জনে নিভৃতে আল্লাহকে স্মরণ করে অশ্রু বর্ষণ করে।
৬. যাকে কোনো সুন্দরী রূপসী কুলীন মহিলা অশ্লীল আহ্বান জানায়। আর সে আল্লাহর ভয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে।
৭. যে ব্যক্তি ডান হাতে দান করলে তার বাম হাতও তা জানে না।-বুখারী ও মুসলিম