📘 কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিকোণে স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা > 📄 তা'বীরের বিভিন্ন প্রকার

📄 তা'বীরের বিভিন্ন প্রকার


তাবীর মানে স্বপ্ন ব্যাখ্যা করা। যার মাধ্যমে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা হয় তার বিবেচনায় কয়েক প্রকার হয়ে থাকে।
ইমাম বগভী রহ. বলেন: ব্যাখ্যা করার দিক দিয়ে স্বপ্ন কয়েক প্রকার হতে পারে।
প্রথমত: আল-কুরআনের আয়াত দিয়ে স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান করা।
দ্বিতীয়ত: হাদীসে রাসূল দিয়ে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা।
তৃতীয়ত: মানুষে মাঝে প্রচলিত বিভিন্ন প্রসিদ্ধ উক্তি দিয়ে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা।
চতুর্থত: কখনো বিপরীত অর্থ-গ্রহণনীতির আলোকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিকোণে স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা > 📄 কুরআনের আয়াত দিয়ে স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার কয়েকটি দৃষ্টান্ত

📄 কুরআনের আয়াত দিয়ে স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার কয়েকটি দৃষ্টান্ত


স্বপ্নে রশি দেখার অর্থ হলো, ওয়াদা, অঙ্গীকার, প্রতিশ্রুতি। এ ব্যাখ্যাটি আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا) [ال عمران: ١٠٣]
“তোমরা আল্লাহ তা'আলার রশিকে শক্তভাবে ধারণ করো”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩]
স্বপ্নে নৌকা বা জাহাজ দেখার ব্যাখ্যা হল মুক্তি পাওয়া। এ অর্থটি আল-কুরআনের এ আয়াত থেকে নেওয়া হয়েছে।
فَأَنجَيْنَهُ وَأَصْحَابَ السَّفِينَةِ وَجَعَلْنَهَا ءَايَةَ لِلْعَالَمِينَ ﴾ [العنكبوت: ١٥]
“আমরা তাকে উদ্ধার করেছি এবং উদ্ধার করেছি জাহাজের আরোহীদের”। [সূরা আল-'আনকাবূত, আয়াত: ১৫]
স্বপ্নে কাঠ দেখার ব্যাখ্যা হলো, মুনাফেকী বা কপটতা। এ ব্যাখ্যাটি আল-কুরআনের এ আয়াত থেকে নেওয়া হয়েছে, যেখানে আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেছেন,
كَأَنَّهُمْ خُشُبٌ مُسَنَّدَةٌ ﴾ [المنافقون: ٤]
“যেন তারা দেওয়ালে ঠেস দেওয়া কাঠের মতই”। [সূরা আল-মুনাফিকূন, আয়াত: ৪]
পাথর স্বপ্ন দেখলে তার ব্যাখ্যা হবে অন্তরের কঠোরতা ও পাষণ্ডতা। এ ব্যাখ্যাটি আল-কুরআনের এ আয়াত থেকে গ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُم مِّنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً ﴾ [البقرة: ٧٤]
“অতঃপর তোমাদের অন্তরগুলো কঠিন হয়ে গেল, যেন তা পাথরের মতো কিংবা তার চেয়েও শক্ত”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৭৪]
যদি স্বপ্নে রোগ-ব্যধি দেখা হয়, তাহলে তার ব্যাখ্যা হবে মুনাফিক। কারণ, আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেছেন,
فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ ﴾ [البقرة: ١٠]
“তাদের অন্তরে রয়েছে ব্যধি”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১০]
যদি স্বপ্নে গোশত খেতে দেখে তাহলে তার অর্থ হতে পারে গীবত বা পরনিন্দা। কেননা গীবত সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا ﴾ [الحجرات: ١٢]
“তোমাদের কেউ কি পছন্দ করবে তার মৃত ভাইয়ের গোশত খাবে?” [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৩]
এই যে ব্যাখ্যার কথাগুলো বলা হলো, এগুলো যে এমন হতেই হবে তা জরুরি নয়। আবার সকলের ব্যাপারে ব্যাখ্যা একটিই হবে, তাও ঠিক নয়। একজন রোগীর স্বপ্ন আর সুস্থ মানুষের স্বপ্নের ব্যাখ্যা এক রকম হবে না। যদিও স্বপ্ন এক রকম হয়। তেমনি একজন মুক্ত মানুষ ও একজন বন্দী মানুষের স্বপ্নের ব্যাখ্যা এক রকম হবে না। স্বপ্নের ব্যাখ্যায় যেমন স্বপ্ন দ্রষ্টার অবস্থা লক্ষ্য করা হবে তেমনি স্বপ্নে যা দেখেছে তার অবস্থাও দেখতে হবে। যেমন কেউ স্বপ্নে দড়ি বা রশি দেখল। একজন স্বপ্নে দেখল সে একটি মজবুত রশি পেয়েছে। যা ছেঁড়া যাচ্ছে না। আরেকজন দেখল, সে একটা রশি ধরেছে কিন্তু তা ছিল নরম। দুটো স্বপ্নের ব্যাখ্যার মধ্যে বিশাল পার্থক্য হবে।
এক ব্যক্তি ইমাম মুহাম্মাদ ইবন সীরীন রহ.র কাছে বলল, আমি স্বপ্ন দেখলাম যে আমি আযান দিচ্ছি। তিনি বললেন, এর ব্যাখ্যা হল, তুমি হজ করবে। আরেক ব্যক্তি এসে বলল, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি আযান দিচ্ছি। তিনি বললেন, এর অর্থ হল, চুরির অপরাধে তোমার হাত কাটা যাবে।
লোকেরা জিজ্ঞেস করল, আপনি একই স্বপ্নের দু'ধরনের ব্যাখ্যা করলেন? তিনি বললেন, প্রথম লোকটি নেক আমল প্রিয়। সে ভালো কাজ করে থাকে। সে জন্য তার স্বপ্নের ব্যাখ্যা নেক আমল হতে পারে। আমি আল-কুরআনের আয়াত-
وَأَذِن فِي النَّاسِ بِالْحَقِّ ﴾ [الحج: ٢٧]
“তুমি মানুষের মাঝে হজের জন্য আযান তথা এলান দাও”। [সূরা আল-হজ, আয়াত: ২৭]
আর দ্বিতীয় ব্যক্তি হচ্ছে পাপাচারী। তাই তার স্বপ্নের ব্যাখ্যা পাপের শাস্তিই মানায়। তাই আমি আল-কুরআনের আয়াত-
ثُمَّ أَذَّنَ مُؤَذِّنُ أَيَّتُهَا الْعِيرُ إِنَّكُمْ لَسَرِقُونَ ﴾ [يوسف: ٧٠]
“অতঃপর এক মুয়াজ্জিন (ঘোষণাকারী) আযান (ঘোষণা) দিল, হে কাফেলা! তোমরা তো চোর”। [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৭০]

📘 কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিকোণে স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা > 📄 হাদীস দিয়ে স্বপ্ন ব্যাখ্যার কয়েকটি দৃষ্টান্ত

📄 হাদীস দিয়ে স্বপ্ন ব্যাখ্যার কয়েকটি দৃষ্টান্ত


স্বপ্নে কাক দেখার ব্যাখ্যা হলো, পাপাচারী পুরুষ। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাকের নাম রেখেছেন ফাসেক মানে, পাপী।
তেমনি ইঁদুর স্বপ্নে দেখার ব্যাখ্যা হল, پاپاচারী নারী। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইঁদুরের নাম রেখেছেন ফাসেকা। মানে پاپاচারী মহিলা।
স্বপ্নে পাঁজর বা পাঁজরের হাড় দেখলে এর ব্যাখ্যা হবে, নারী। কারণ, নারীকে পাঁজরের হাড় দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে হাদীসে এসেছে।
এমনিভাবে কাঁচের পানপাত্র স্বপ্ন দেখার ব্যাখ্যা হলো, নারী। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁচের পানপাত্রকে নারীর রূপক অর্থে ব্যবহার করেছেন। যেমন, তিনি বলেছেন,
رُوَيْدَكَ يَا أَنْجَشَةُ، لَا تَكْسِرِ القَوَارِيرَ»
“হে আনজাশা! আরে আস্তে চল, নয়তো কাঁচের পান-পাত্রগুলো ভেঙ্গে যাবে”।²²
এখানে কাঁচের পান-পাত্র বলতে তিনি সফরসঙ্গী মেয়েদের বুঝিয়েছেন। মানে তাড়াতাড়ি হাঁটলে মেয়েরা পেছনে পড়ে যাবে। তাই তাদের জন্য তিনি ধীরে ধীরে পথ চলতে বললেন।

টিকাঃ
²² সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬২১১

📘 কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিকোণে স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা > 📄 বিপরীত অর্থ-গ্রহণনীতিতে স্বপ্ন ব্যাখ্যার দৃষ্টান্ত

📄 বিপরীত অর্থ-গ্রহণনীতিতে স্বপ্ন ব্যাখ্যার দৃষ্টান্ত


কোনো ব্যক্তি স্বপ্নে ভীতিকর কিছু দেখল বা ভয় পেল। তার অবস্থার বিবেচনায় এর ব্যাখ্যা হতে পারে শান্তি ও নিরাপত্তা। যেমন, আল্লাহর তা'আলার বাণী:
وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنَا ﴾ [النور: ٥٥]
“তিনি তাদের ভয়-ভীতিকে শান্তি ও নিরাপত্তায় পরিবর্তন করে দেবেন”। [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৫৫]
এমনিভাবে স্বপ্নে কান্না দেখলে এর ব্যাখ্যা হতে পারে আনন্দ। স্বপ্নে হাসতে দেখলে এর ব্যাখ্যা হতে পারে দুঃখ-কষ্ট। এ বিপরীত অর্থ-গ্রহণনীতি স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার রহস্য হল, স্বপ্নের দায়িত্বশীল ফিরিশতা যখন স্বপ্নে ইঙ্গিত প্রদান করে তখন সে বিষয়টি উল্টো করে দেখায়। কারণ, নিদ্রা আর জাগ্রত অবস্থা একটা আরেকটার বিপরীত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00