📘 কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিকোণে স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা > 📄 কে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেবে?

📄 কে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেবে?


এমন ব্যক্তিই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়ার অধিকার রাখে, যিনি কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও স্বপ্ন ব্যাখ্যার মূলনীতি সম্পর্কে ওয়াকেফহাল। সাথে সাথে তাকে মানব-দরদী ও সকলের প্রতি কল্যাণকামী মনোভাবের অধিকারী হতে হবে। তাই তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
) إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ رُؤْيَا فَلَا يُحَدِّثْ بِهَا إِلَّا نَاصِحًا أَوْ عَالِمًا
“তোমাদের কেউ স্বপ্ন দেখলে তা যেন আলেম কিংবা কল্যাণকামী ব্যতীত কারো কাছে তা বর্ণনা না করে”।¹⁶
শাইখ আব্দুর রহমান আস সাদী রহ. বলতেন, স্বপ্নের ব্যাখ্যা একটি শরঈ বিদ্যা। এটা শিক্ষা করা, শিক্ষা দেওয়া ও চর্চার করলে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে প্রতিদান পাওয়া যাবে। আর স্বপ্নের ব্যাখ্যা ফাতওয়ার মর্যাদা রাখে।
তাইতো দেখি ইউসুফ আলাইহিস সালাম স্বপ্নের ব্যাখ্যাকে ফাতওয়া বলে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন তিনি তার জেল সঙ্গী দুজনকে তাদের জানতে চাওয়া স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানিয়ে বলেছিলেন:
قُضِيَ الْأَمْرُ الَّذِي فِيهِ تَسْتَفْتِيَانِ ﴾ [يوسف: ٤١]
“তোমরা দু'জনে যে বিষয়ে ফাতওয়া চেয়েছিলে তার ফয়সালা হয়ে গেছে”। [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৪১]

টিকাঃ
¹⁶ হাকেম, মুসতাদরাক, হাদীস নং ৮১৭৭। শাইখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিকোণে স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা > 📄 স্বপ্নের ব্যাখ্যা যেভাবে করা হয় তা-ই সংঘটিত হয়

📄 স্বপ্নের ব্যাখ্যা যেভাবে করা হয় তা-ই সংঘটিত হয়


হাদীসে এসেছে: আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الرُّؤْيَا تَقَعُ عَلَى مَا تُعَبَّرُ ، وَمَثَلُ ذَلِكَ مَثَلُ رَجُلٍ رَفَعَ رِجْلَهُ فَهُوَ يَنْتَظِرُ مَتَى يَضَعُهَا، فَإِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ رؤْيَا فَلَا يُحَدِّثْ بِهَا إِلَّا نَاصِحًا أَوْ عَالِمًا»
“স্বপ্নের যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয় সেভাবে তা বাস্তবায়িত হয়। যখন তোমাদের কেউ স্বপ্ন দেখবে তখন আলেম অথবা কল্যাণকামী ব্যতীত কারো কাছে তা বর্ণনা করবে না”।¹⁷
আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবন মাজাহ আবু রাযীন আল-উকাইলী থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
الرُّؤْيَا عَلَى رِجْلِ طَائِرٍ، مَا لَمْ تُعْبَرْ، فَإِذَا عُبِرَتْ وَقَعَتْ .
“স্বপ্ন হলো, উড়ন্ত পায়ের মতো। (যা ভালো ও খারাপ উভয়ের সম্ভাবনা রাখে) যতক্ষণ না তার ব্যাখ্যা করা হয়। যখন একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয় তখন তা বাস্তবায়িত হয়”।¹⁸
হাদীসে আরো এসেছে: আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كَانَتِ امْرَأَةٌ مِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ لَهَا زَوْجُ تَاجِرُ يَخْتَلِفُ، فَكَانَتْ تَرَى رُؤْيَا كُلَّمَا غَابَ عَنْهَا زَوْجُهَا، وَقَلَّمَا يَغِيبُ إِلَّا تَرَكَهَا حَامِلًا ، فَتَأْتِي رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَتَقُولُ: إِنَّ زَوْجِي خَرَجَ تَاجِرًا ، فَتَرَكَنِي حَامِلًا، فَرَأَيْتُ فِيمَا يَرَى النَّائِمُ أَنَّ سَارِيَةَ بَيْتِي انْكَسَرَتْ، وَأَنِّي وَلَدْتُ غُلَامًا أَعْوَرَ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: خَيْرُ، يَرْجِعُ زَوْجُكِ عَلَيْكِ إِنْ شَاءَ اللهُ تَعَالَى صَالِحًا، وَتَلِدِينَ غُلَامًا بَرًّا فَكَانَتْ تَرَاهَا مَرَّتَيْنِ، أَوْ ثَلَاثًا كُلُّ ذَلِكَ، تَأْتِي رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَيَقُولُ: ذَلِكَ لَهَا، فَيَرْجِعُ زَوْجُهَا، وَتَلِدُ غُلَامًا، فَجَاءَتْ يَوْمًا كَمَا كَانَتْ تَأْتِيهِ، وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غَائِبٌ، وَقَدْ رَأَتْ تِلْكَ الرُّؤْيَا، فَقُلْتُ لَهَا: عَمَّ تَسْأَلِينَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَا أَمَةَ اللَّهِ؟ فَقَالَتْ: رُؤْيَا كُنْتُ أُرَاهَا، فَآتِي رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَسْأَلُهُ عَنْهَا؟ فَيَقُولُ: خَيْرًا ، فَيَكُونُ كَمَا قَالَ: فَقُلْتُ: فَأَخْبِرِينِي مَا هِيَ؟ قَالَتْ: حَتَّى يَأْتِيَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّmَ فَأَعْرِضَهَا عَلَيْهِ، كَمَا كُنْتُ أَعْرِضُ، فَوَاللَّهِ مَا تَرَكْتُهَا حَتَّى أَخْبَرَتْنِي، فَقُلْتُ: وَاللَّهِ لَئِنْ صَدَقَتْ رُؤْيَاكِ لَيَمُوتَنَّ زَوْجُكِ، وَتَلِدِينَ غُلَامًا فَاجِرًا، فَقَعَدَتْ تَبْكِي وَقَالَتْ: مَا لِي حِينَ عَرَضْتُ عَلَيْكِ رُؤْيَايَ، فَدَخَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهِيَ تَبْكِي، فَقَالَ لَهَا: مَا لَهَا يَا عَائِشَةُ؟ فَأَخْبَرْتُهُ الْخَبَرَ، وَمَا تَأَوَّلْتُ لَهَا ، [ ص: 1382] فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ يَا عَائِشَةُ إِذَا عَبَرْتُمْ لِلْمُسْلِمِ الرُّؤْيَا فَاعْبُرُوهَا عَلَى الْخَيْرِ، فَإِنَّ الرُّؤْيَا تَكُونُ عَلَى مَا يَعْبُرُهَا صَاحِبُهَا ، فَمَاتَ، وَاللَّهِ زَوْجُهَا، وَلَا أَرَاهَا إِلَّا وَلَدَتْ غُلَامًا فَاجِرًا»
“মদীনার অধিবাসী এক মহিলার স্বামী ছিল ব্যবসায়ী। ব্যবসায়িক কাজে বিভিন্ন দেশে আসা যাওয়া করত সে। যখনই তার স্বামী বিদেশে যেত তখনই সে নারী স্বপ্ন দেখত। আর তার স্বামী সর্বদা তাকে গর্ভবতী রেখে যেত। একদিন সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল, আমার স্বামী সফরে গেছে। আমি গর্ভবতী। আমি স্বপ্ন দেখলাম, আমার ঘরের চৌকাঠ ভেঙ্গে গেছে। আর আমি একটি এক চোখ কানা সন্তান প্রসব করেছি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ভালো স্বপ্ন দেখেছো। ইনশাআল্লাহ তোমার স্বামী তোমার কাছে সহীহ-সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসবে আর তুমি একটি সুস্থ-সুন্দর সন্তান প্রসব করবে।
এভাবে সে দুবার বা তিনবার স্বপ্ন দেখেছে। আর প্রতিবারই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসেছে। তিনি প্রতিবার এরকম ব্যাখ্যাই দিয়েছেন। আর প্রতিবার সে রকমই বাস্তবায়িত হয়েছে।
একদিন মহিলা আগের মতই আসল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন অনুপস্থিত ছিলেন। সে স্বপ্ন দেখেই এসেছে। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর বান্দী! তুমি রাসুলুল্লাহর নিকট কী জিজ্ঞেস করবে? সে বলল, আমি একটি স্বপ্ন প্রায়ই দেখি। অতপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসি। তিনি সুন্দর ব্যাখ্যা দেন। সেটাই বাস্তবে পরিণত হয়।
আমি বললাম, তুমি আমাকে বল, কী স্বপ্ন দেখেছো? সে বলল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসুক, তারপর বলব। আমি তাকে বারবার অনুরোধ করতে লাগলাম স্বপ্নটি বলার জন্য- যেমনটি আমার অভ্যাস। অবশেষে সে আমাকে স্বপ্নের কথা বলতে বাধ্য হল। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! তোমার স্বপ্ন যদি সত্যি হয়, তাহলে তোমার স্বামী মারা যাবে। আর তুমি একটি অপূর্ণাঙ্গ বা অসুস্থ ছেলে প্রসব করবে।
তখন মহিলাটি বসে কাঁদতে লাগল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে বললেন: হে আয়েশা! এর কী হয়েছে? আমি পুরো ঘটনা ও স্বপ্ন সম্পর্কে আমার দেওয়া ব্যাখ্যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানালাম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: হে আয়েশা, এটা কী করলে? যখন কোনো মুসলমানের স্বপ্নের ব্যাখ্যা করবে তখন সুন্দর ও কল্যাণকর ব্যাখ্যা দেবে। মনে রাখবে স্বপ্নের যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, বাস্তবে তাই সংঘটিত হয়। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আল্লাহ তা'আলার কী ইচ্ছা জানি না। মহিলাটির স্বামী মারা গেল আর দেখলাম সে একটি অসুস্থ অপূর্ণাঙ্গ ছেলে প্রসব করল”।¹⁹

হাদীস থেকে শিক্ষা ও জ্ঞাতব্য:
এক. স্বপ্ন বর্ণনা করার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। যাকে তাকে স্বপ্নের কথা বলা উচিত নয়।
দুই. সর্বদা আলেম, শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছে স্বপ্নের কথা বলবে। যে শুভাকাঙ্ক্ষী নয় তার কাছে কোনো ধরনের স্বপ্নের কথা বলবে না।
তিন. স্বপ্ন একটি উড়ন্ত পায়ের মতো। এ কথার অর্থ হল শূন্যে ঝুলিয়ে রাখা পা যেমন যে কোনো সময় মাটিতে রাখা যায় আবার নীচে আগুন থাকলেও তাতে রাখা যায়। স্বপ্ন এমনই, এর ব্যাখ্যা ভালো করা যায় আবার খারাপও করা যায়। যে ব্যাখ্যাই করা হোক, সেটিই সংঘটিত হবে।
চার. মদীনার এই মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে আসতেন। স্বপ্নটি বাহ্যিক দৃষ্টিতে খারাপ হলেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভালো ও সুন্দর ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন। তাই স্বপ্ন দ্রষ্টার পরিচিতদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে ভালো আলেম তার কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া উচিত।
পাঁচ. প্রশ্ন হতে পারে, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কেন এ ধরনের ব্যাখ্যা দিলেন? এর উত্তর হলো:
(ক) এ মহিলার স্বপ্নের ব্যাখ্যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে করেছেন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তা জানতেন না। তাই তিনি নিজের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন।
(খ) আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা স্বপ্নের বাহ্যিক দিক সামনে রেখে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ঘরের চৌকাঠ দ্বারা স্বামী বুঝেছেন। আর এক চোখ অন্ধ সন্তান দ্বারা অপূর্ণাঙ্গ সন্তান বুঝেছেন।
(গ) স্বপ্নের খারাপ বা অশুভ ব্যাখ্যা করা অনুচিত। স্বপ্ন ব্যাখ্যার এ মূলনীতির কথা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা আগে থেকে জানতেন না। এ ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জানিয়েছেন। ফলে তিনি বিষয়টি জানতে পেরেছেন।
(ঘ) এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা এভাবে করা যেত, যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করতেন। তাহল ঘরের চৌকাঠ ভেঙ্গে যাওয়ার অর্থ হলো, ঘর প্রশস্ত হবে। প্রাচুর্য ও সচ্ছলতা আসবে। আর এক চোখ কানা সন্তানের অর্থ হল, সন্তানটি তার চোখ দিয়ে শুধু ভালো বিষয় দেখবে। এটা হলো দূরবর্তী ব্যাখ্যা। আর আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা করেছেন নিকটবর্তী ব্যাখ্যা।
ছয়. যার কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে, তিনি যদি জানেন, এর ব্যাখ্যা খারাপ তবে তিনি তা বলবেন না। যথাসম্ভব ভালো ব্যাখ্যা করে দেবেন। নয়তো চুপ থাকবেন। অথবা বলবেন, আল্লাহ ভালো জানেন।
সায়ীদ ইবন মানসূর বর্ণনা করেন, আতা রহ. সব সময় বলতেন: স্বপ্নের ব্যাখ্যা যা দেওয়া হয়, সেটাই সংঘটিত হয়।²⁰
প্রশ্ন হতে পারে তাহলে তাকদীরের ব্যাপারটা কী হবে? উত্তর সোজা। তাকদীরে এভাবেই লেখা আছে যে, অমুক ব্যক্তি এভাবে ব্যাখ্যা করবে। আর তাই সংঘটিত হবে। কিন্তু আমাদের কর্তব্য হবে, কখনো খারাপ বা অশুভ ব্যাখ্যা না দেওয়া। তাকদীরে কী আছে আমরা তা জানি না। এ জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কোনো মানুষের কাছে স্বপ্নের কথা বলতে নিষেধ করেছেন। স্বপ্নের কথা শুধু তাকে বলা যাবে যে আলেম, বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী ও কল্যাণকামী। এ ছাড়া অন্য কারো কাছে নয়।

আরেকটি ঘটনা:
এক মহিলা একটি দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে ইমাম ইবন সীরীন রহ.র শিক্ষার মজলিসে আসল। তিনি ইমামের ছাত্রদের কাছে জিজ্ঞেস করলেন, ইমাম সাহেব কোথায়? ইমাম সাহেবের একজন বোকা ছাত্র বলল, আপনি তার কাছে কেন এসেছেন?
মহিলাটি বলল, আমি এ ছেলেটির ব্যাপারে একটি স্বপ্ন দেখেছি, তার ব্যাখ্যা জানার জন্য এসেছি। ছাত্রটি বলল, কী স্বপ্ন দেখেছেন? মহিলাটি বলল, আমি দেখেছি আমার এ ছেলেটি সাগর থেকে পানি পান করছে।
ছাত্রটি তাড়াতাড়ি ব্যাখ্যা দিল, বলল, তাহলে তো সে পেট ফুলে মারা যাবে। তৎক্ষণাৎ শিশুটির পেট ফুলে উঠল। আর চিৎকার করে মারা গেল। মহিলাটি কাঁদা শুরু করল। এরই মধ্যে ইমাম সাহেব এসে পড়লেন। ঘটনা শুনে তিনি বললেন: যদি তুমি স্বপ্নের ব্যাখ্যা না করে ছেড়ে দিতে তাহলে ছেলেটি এ দেশের সবচেয়ে বড় আলেম ও বিদ্বান হত।
সাগরের অর্থ শুধু পানের অযোগ্য নোনা পানিই নয়। সাগরের ব্যাখ্যা হল, মনি-মুক্তা, হীরা, প্রবাল। কাজেই যিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা করবেন তিনি সব সময় ইতিবাচক ও কল্যাণকর ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবেন।²¹

টিকাঃ
¹⁷ হাকেম, মুসতাদরাক, হাদীস নং ৮১৭৭। শাইখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
¹⁸ ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩৯১৪; আবূ দাউদ, হাদীস নং ৫০২০
¹⁹ দারামী, ইবন হাজার রহ. হাদীসটিকে হাসান বলে অভিহিত করেছেন।
²⁰ ফাতহুল বারী
²¹ আল কাওয়ায়েদুল হুসনা ফী তাবীলির রুইয়া: শাইখ আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ আস সাদহান

📘 কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিকোণে স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা > 📄 তা'বীরের বিভিন্ন প্রকার

📄 তা'বীরের বিভিন্ন প্রকার


তাবীর মানে স্বপ্ন ব্যাখ্যা করা। যার মাধ্যমে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা হয় তার বিবেচনায় কয়েক প্রকার হয়ে থাকে।
ইমাম বগভী রহ. বলেন: ব্যাখ্যা করার দিক দিয়ে স্বপ্ন কয়েক প্রকার হতে পারে।
প্রথমত: আল-কুরআনের আয়াত দিয়ে স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান করা।
দ্বিতীয়ত: হাদীসে রাসূল দিয়ে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা।
তৃতীয়ত: মানুষে মাঝে প্রচলিত বিভিন্ন প্রসিদ্ধ উক্তি দিয়ে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা।
চতুর্থত: কখনো বিপরীত অর্থ-গ্রহণনীতির আলোকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা।

📘 কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিকোণে স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা > 📄 কুরআনের আয়াত দিয়ে স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার কয়েকটি দৃষ্টান্ত

📄 কুরআনের আয়াত দিয়ে স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার কয়েকটি দৃষ্টান্ত


স্বপ্নে রশি দেখার অর্থ হলো, ওয়াদা, অঙ্গীকার, প্রতিশ্রুতি। এ ব্যাখ্যাটি আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا) [ال عمران: ١٠٣]
“তোমরা আল্লাহ তা'আলার রশিকে শক্তভাবে ধারণ করো”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩]
স্বপ্নে নৌকা বা জাহাজ দেখার ব্যাখ্যা হল মুক্তি পাওয়া। এ অর্থটি আল-কুরআনের এ আয়াত থেকে নেওয়া হয়েছে।
فَأَنجَيْنَهُ وَأَصْحَابَ السَّفِينَةِ وَجَعَلْنَهَا ءَايَةَ لِلْعَالَمِينَ ﴾ [العنكبوت: ١٥]
“আমরা তাকে উদ্ধার করেছি এবং উদ্ধার করেছি জাহাজের আরোহীদের”। [সূরা আল-'আনকাবূত, আয়াত: ১৫]
স্বপ্নে কাঠ দেখার ব্যাখ্যা হলো, মুনাফেকী বা কপটতা। এ ব্যাখ্যাটি আল-কুরআনের এ আয়াত থেকে নেওয়া হয়েছে, যেখানে আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেছেন,
كَأَنَّهُمْ خُشُبٌ مُسَنَّدَةٌ ﴾ [المنافقون: ٤]
“যেন তারা দেওয়ালে ঠেস দেওয়া কাঠের মতই”। [সূরা আল-মুনাফিকূন, আয়াত: ৪]
পাথর স্বপ্ন দেখলে তার ব্যাখ্যা হবে অন্তরের কঠোরতা ও পাষণ্ডতা। এ ব্যাখ্যাটি আল-কুরআনের এ আয়াত থেকে গ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُم مِّنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً ﴾ [البقرة: ٧٤]
“অতঃপর তোমাদের অন্তরগুলো কঠিন হয়ে গেল, যেন তা পাথরের মতো কিংবা তার চেয়েও শক্ত”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৭৪]
যদি স্বপ্নে রোগ-ব্যধি দেখা হয়, তাহলে তার ব্যাখ্যা হবে মুনাফিক। কারণ, আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেছেন,
فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ ﴾ [البقرة: ١٠]
“তাদের অন্তরে রয়েছে ব্যধি”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১০]
যদি স্বপ্নে গোশত খেতে দেখে তাহলে তার অর্থ হতে পারে গীবত বা পরনিন্দা। কেননা গীবত সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا ﴾ [الحجرات: ١٢]
“তোমাদের কেউ কি পছন্দ করবে তার মৃত ভাইয়ের গোশত খাবে?” [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৩]
এই যে ব্যাখ্যার কথাগুলো বলা হলো, এগুলো যে এমন হতেই হবে তা জরুরি নয়। আবার সকলের ব্যাপারে ব্যাখ্যা একটিই হবে, তাও ঠিক নয়। একজন রোগীর স্বপ্ন আর সুস্থ মানুষের স্বপ্নের ব্যাখ্যা এক রকম হবে না। যদিও স্বপ্ন এক রকম হয়। তেমনি একজন মুক্ত মানুষ ও একজন বন্দী মানুষের স্বপ্নের ব্যাখ্যা এক রকম হবে না। স্বপ্নের ব্যাখ্যায় যেমন স্বপ্ন দ্রষ্টার অবস্থা লক্ষ্য করা হবে তেমনি স্বপ্নে যা দেখেছে তার অবস্থাও দেখতে হবে। যেমন কেউ স্বপ্নে দড়ি বা রশি দেখল। একজন স্বপ্নে দেখল সে একটি মজবুত রশি পেয়েছে। যা ছেঁড়া যাচ্ছে না। আরেকজন দেখল, সে একটা রশি ধরেছে কিন্তু তা ছিল নরম। দুটো স্বপ্নের ব্যাখ্যার মধ্যে বিশাল পার্থক্য হবে।
এক ব্যক্তি ইমাম মুহাম্মাদ ইবন সীরীন রহ.র কাছে বলল, আমি স্বপ্ন দেখলাম যে আমি আযান দিচ্ছি। তিনি বললেন, এর ব্যাখ্যা হল, তুমি হজ করবে। আরেক ব্যক্তি এসে বলল, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি আযান দিচ্ছি। তিনি বললেন, এর অর্থ হল, চুরির অপরাধে তোমার হাত কাটা যাবে।
লোকেরা জিজ্ঞেস করল, আপনি একই স্বপ্নের দু'ধরনের ব্যাখ্যা করলেন? তিনি বললেন, প্রথম লোকটি নেক আমল প্রিয়। সে ভালো কাজ করে থাকে। সে জন্য তার স্বপ্নের ব্যাখ্যা নেক আমল হতে পারে। আমি আল-কুরআনের আয়াত-
وَأَذِن فِي النَّاسِ بِالْحَقِّ ﴾ [الحج: ٢٧]
“তুমি মানুষের মাঝে হজের জন্য আযান তথা এলান দাও”। [সূরা আল-হজ, আয়াত: ২৭]
আর দ্বিতীয় ব্যক্তি হচ্ছে পাপাচারী। তাই তার স্বপ্নের ব্যাখ্যা পাপের শাস্তিই মানায়। তাই আমি আল-কুরআনের আয়াত-
ثُمَّ أَذَّنَ مُؤَذِّنُ أَيَّتُهَا الْعِيرُ إِنَّكُمْ لَسَرِقُونَ ﴾ [يوسف: ٧٠]
“অতঃপর এক মুয়াজ্জিন (ঘোষণাকারী) আযান (ঘোষণা) দিল, হে কাফেলা! তোমরা তো চোর”। [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৭০]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00