📄 কয়েকটি ভালো স্বপ্নের উদাহরণ
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِذْ يُرِيكَهُمُ اللَّهُ فِي مَنَامِكَ قَلِيلًا وَلَوْ أَرَنكَهُمْ كَثِيرًا لَّفَشِلْتُمْ وَلَتَنَازَعْتُمْ فِي الْأَمْرِ وَلَكِنَّ اللَّهَ سَلَّمَ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ ﴾ [الأنفال: ٤٣]
“যখন আল্লাহ তোমাকে স্বপ্নের মধ্যে তাদেরকে স্বল্প সংখ্যায় দেখিয়েছিলেন। আর তোমাকে যদি তিনি তাদেরকে বেশি সংখ্যায় দেখাতেন, তাহলে অবশ্যই তোমরা সাহসহারা হয়ে পড়তে এবং বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক করতে। কিন্তু আল্লাহ নিরাপত্তা দিয়েছেন। নিশ্চয় অন্তরে যা আছে তিনি সেসব বিষয়ে অবগত”। [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৪৩]
বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে বিজয় লাভের সুন্দর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তাকে শত্রু বাহিনীর সংখ্যা অনেক কম করে দেখিয়েছেন। বেশি করে দেখালে তিনি হয়ত ভয় পেয়ে যেতেন। তাই এটি একটি ভালো স্বপ্ন। এভাবে আল্লাহ তা'আলা স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁর নবী ও রাসূলদের কাছে অহী প্রেরণ করতেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
لَقَدْ صَدَقَ اللَّهُ رَسُولَهُ الرُّمْيَا بِالْحَقِّ لَتَدْخُلُنَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ إِن شَاءَ اللَّهُ عَامِنِينَ مُحَلِّقِينَ رُءُوسَكُمْ وَمُقَصِّرِينَ لَا تَخَافُونَ فَعَلِمَ مَا لَمْ تَعْلَمُواْ فَجَعَلَ مِن دُونِ ذَلِكَ فَتْحًا قَرِيبًا ﴾ [الفتح: ٢٧]
“অবশ্যই আল্লাহ তাঁর রাসূলকে স্বপ্নটি যথাযথভাবে সত্যে পরিণত করে দিয়েছেন। তোমরা ইনশাআল্লাহ নিরাপদে তোমাদের মাথা মুণ্ডন করে এবং চুল ছেঁটে নির্ভয়ে মসজিদুল হারামে অবশ্যই প্রবেশ করবে।
অতঃপর আল্লাহ জেনেছেন যা তোমরা জানতে না। সুতরাং এ ছাড়াও তিনি দিলেন এক নিকটবর্তী বিজয়”। [সূরা আল-ফাতাহ, আয়াত: ২৭]
আয়াত থেকে আমরা জানতে পারলাম, আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে মক্কা জয় করার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। আর সে স্বপ্ন আল্লাহ তা'আলাই বাস্তবায়ন করেছিলেন।
এমনিভাবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আল-কুরআনে মিশরের বাদশাহর স্বপ্ন বর্ণনা করেছেন। সে স্বপ্নের সুন্দর ব্যাখ্যা করেছিলেন নবী ইউসুফ আলাইহিস সালাম। বিষয়টি আল-কুরআনের সূরা ইউসুফের ৪৩ আয়াত থেকে ৫৫ আয়াত পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। এর আগে সূরার ৩৬ আয়াত থেকে ৪২ আয়াত পর্যন্ত ইউসুফ আলাইহিস সালামের জেল জীবনের দু'জন সাথীর স্বপ্ন ও ইউসুফ আলাইহিস সালাম কর্তৃক তার ব্যাখ্যা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের একটি বিষয় তা আল-কুরআনে নবী ইউসুফের ভাষায় বলা হয়েছে এভাবে:
رَبِّ قَدْ عَاتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِن تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ فَاطِرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنتَ وَلِي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ )) [يوسف: ١٠١]
“হে আমার রব, আপনি আমাকে রাজত্ব দান করেছেন এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিখিয়েছেন। হে আসমানসমূহ ও জমিনের স্রষ্টা! দুনিয়া ও আখিরাতে আপনিই আমার অভিভাবক, আমাকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দিন এবং নেককারদের সাথে আমাকে যুক্ত করুন”। [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ১০১]
এমনিভাবে সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবন যায়েদ ইবন আব্দে রাব্বিহী ও উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুমা স্বপ্নে আযান দেখেছিলেন। আর তাদের স্বপ্নে দেখা আযানকেই সালাতের বর্তমান আযান ও ইকামত হিসেবে আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাদের সুন্দর স্বপ্নগুলো এভাবেই ইসলামের নিদর্শন হিসেবে বাস্তবে রূপ লাভ করেছে অনন্তকালের জন্য।
আমাদের আরো মনে রাখতে হবে যে, ভালো ও সুন্দর স্বপ্নগুলো কখনো হুবহু বাস্তবরূপে দেখা যায় আবার কখনো রূপকভাবে ভিন্ন আকৃতিতে। যেমন, আযান দেওয়ার পদ্ধতি সংক্রান্ত স্বপ্ন হুবহু দেখানো হয়েছে। অপরদিকে ইউসুফ আলাইহিস সালামের স্বপ্নগুলো ভিন্ন আকৃতিতে রূপকভাবে দেখানো হয়েছে।
📄 স্বপ্ন দেখলে যা করতে হবে
যদি কেউ ভালো স্বপ্ন দেখে তাহলে তাকে তিনটি কাজ করতে হবে:
এক. আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা স্বরূপ আলহামদুলিল্লাহ বলতে হবে।
দুই. এটা অন্যকে সুসংবাদ হিসেবে জানাবে।
তিন. স্বপ্ন সম্পর্কে এমন ব্যক্তিদেরকে জানাবে যারা তাকে ভালোবাসে।
হাদীসে এসেছে: আবু সায়ীদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন,
إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ رُؤْيَا يُحِبُّهَا، فَإِنَّمَا هِيَ مِنَ اللَّهِ، فَلْيَحْمَدِ اللَّهَ عَلَيْهَا وَلْيُحَدِّثْ بِهَا، وَإِذَا رَأَى غَيْرَ ذَلِكَ مِمَّا يَكْرَهُ، فَإِنَّمَا هِيَ مِنَ الشَّيْطَانِ، فَلْيَسْتَعِذْ مِنْ شَرِّهَا، وَلَا يَذْكُرْهَا لِأَحَدٍ، فَإِنَّهَا لَا تَضُرُّهُ».
“যখন তোমাদের কেউ এমন স্বপ্ন দেখে যা তার ভালো লাগে, তাহলে সে বুঝে নেবে এটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে। তখন সে এ স্বপ্নের জন্য আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করবে আর অন্যকে এ ব্যাপারে জানাবে। আর যদি অন্য স্বপ্ন দেখে যা সে পছন্দ করে না, তাহলে বুঝে নেবে এটা শয়তানের পক্ষ থেকে। তখন সে এ স্বপ্নের ক্ষতি থেকে আল্লাহ তা'আলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে। (আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম বলবে) এবং কাউকে এ স্বপ্নের কথা বলবে না। মনে রাখবে এ স্বপ্ন তাকে ক্ষতি করবে না”।¹³
স্বপ্ন ভালো হলে তা শুভাকাঙ্ক্ষী ব্যতীত অন্য কারো কাছে বলা ঠিক নয়। এ কারণে ইয়াকুব 'আলাইহিস সালাম তাঁর ছেলে ইউসুফ 'আলাইহিস সালামকে বলেছিলেন:
قَالَ يَبْنَى لَا تَقْصُصْ رُعْيَاكَ عَلَى إِخْوَتِكَ ﴾ [يوسف: ٥]
“হে আমার বৎস! তোমার স্বপ্নের কথা তোমার ভাইদের কাছে বলো না”। [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৫]
টিকাঃ
¹³ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৮৫
📄 খারাপ স্বপ্ন দেখলে কী করবে?
হাদীসে এসেছে, আবু কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللهِ، فَإِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مَا يُحِبُّ، فَلَا يُحَدِّثْ بِهَا إِلَّا مَنْ يُحِبُّ، وَإِنْ رَأَى مَا يَكْرَهُ فَلْيَتْفُلْ عَنْ يَسَارِهِ ثَلَاثًا وَلْيَتَعَوَّذْ بِاللَّهِ مِنْ شَرِّ الشَّيْطَانِ وَشَرِّهَا، وَلَا يُحَدِّثْ بِهَا أَحَدًا فَإِنَّهَا لَنْ تَضُرَّهُ
“ভালো ও সুন্দর স্বপ্ন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে হয়ে থাকে আর খারাপ স্বপ্ন হয় শয়তানের পক্ষ থেকে। যদি কেউ ভালো স্বপ্ন দেখে, তাহলে তা শুধু তাকেই বলবে, যে তাকে ভালোবাসে। অন্য কাউকে বলবে না। আর কেউ যদি স্বপ্নে খারাপ কিছু দেখে, তা হলে শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবে। (আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম বলবে) এবং বাম দিকে তিনবার থুথু নিক্ষেপ করবে। আর কারো কাছে স্বপ্নের কথা বলবে না। মনে রাখবে, এ স্বপ্ন তার কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না”।¹⁴
খারাপ স্বপ্ন দেখলে যা করতে হবে:
এক. এই খারাপ স্বপ্নের ক্ষতি ও অনিষ্ট থেকে আল্লাহ তা'আলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে। এভাবে সকল প্রকার ক্ষতি থেকে আল্লাহ তা'আলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত।
দুই. শয়তানের অনিষ্ট ও কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে এবং এর জন্য আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম পড়তে হবে। কারণ, খারাপ স্বপ্ন শয়তানের কুপ্রভাবে হয়ে থাকে।
তিন. বাঁ দিকে তিনবার থুথু নিক্ষেপ করতে হবে। এটা করতে হবে শয়তানের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ ও তার চক্রান্ত-কে অপমান করার জন্য।
চার. যে কাতে ঘুমিয়ে খারাপ স্বপ্ন দেখেছে তা পরিবর্তন করে অন্য কাতে শুতে হবে। অবস্থাকে বদলে দেওয়ার ইঙ্গিতস্বরূপ এটা করা হয়ে থাকে।
পাঁচ. খারাপ স্বপ্ন দেখলে কারো কাছে বলবে না। আর নিজেও এর ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করবে না। কারণ, হাদীসে এসেছে: জাবের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ رَأَيْتُ فِي الْمَنَامِ كَأَنَّ رَأْسِي قُطِعَ، قَالَ: فَضَحِكَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَالَ: «إِذَا لَعِبَ الشَّيْطَانُ بِأَحَدِكُمْ فِي مَنَامِهِ، فَلَا يُحَدِّثْ بِهِ النَّاسَ»
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক ব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমার মাথা কেটে ফেলা হয়েছে।
এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে ফেললেন। আর বললেন: ঘুমের মধ্যে শয়তান তোমাদের কারো সাথে যদি দুষ্টুমি করে, তবে তা মানুষের কাছে বলবে না”।¹⁵
হাদীস থেকে আমরা জানতে পারলাম:
এক. সাহাবীগণ কোনো স্বপ্ন দেখলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তার ব্যাখ্যা জানতে চাইতেন। তারা এভাবে কোনো স্বপ্নকে অযথা মনে না করে এর গুরুত্ব দিতেন।
দুই. খারাপ স্বপ্ন দেখলে তা কাউকে বলতে নেই।
তিন. খারাপ ও নেতিবাচক স্বপ্ন শয়তানের একটি কুমন্ত্রণা।
টিকাঃ
¹⁴ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬১
¹⁵ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬৮
📄 কে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেবে?
এমন ব্যক্তিই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়ার অধিকার রাখে, যিনি কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও স্বপ্ন ব্যাখ্যার মূলনীতি সম্পর্কে ওয়াকেফহাল। সাথে সাথে তাকে মানব-দরদী ও সকলের প্রতি কল্যাণকামী মনোভাবের অধিকারী হতে হবে। তাই তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
) إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ رُؤْيَا فَلَا يُحَدِّثْ بِهَا إِلَّا نَاصِحًا أَوْ عَالِمًا
“তোমাদের কেউ স্বপ্ন দেখলে তা যেন আলেম কিংবা কল্যাণকামী ব্যতীত কারো কাছে তা বর্ণনা না করে”।¹⁶
শাইখ আব্দুর রহমান আস সাদী রহ. বলতেন, স্বপ্নের ব্যাখ্যা একটি শরঈ বিদ্যা। এটা শিক্ষা করা, শিক্ষা দেওয়া ও চর্চার করলে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে প্রতিদান পাওয়া যাবে। আর স্বপ্নের ব্যাখ্যা ফাতওয়ার মর্যাদা রাখে।
তাইতো দেখি ইউসুফ আলাইহিস সালাম স্বপ্নের ব্যাখ্যাকে ফাতওয়া বলে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন তিনি তার জেল সঙ্গী দুজনকে তাদের জানতে চাওয়া স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানিয়ে বলেছিলেন:
قُضِيَ الْأَمْرُ الَّذِي فِيهِ تَسْتَفْتِيَانِ ﴾ [يوسف: ٤١]
“তোমরা দু'জনে যে বিষয়ে ফাতওয়া চেয়েছিলে তার ফয়সালা হয়ে গেছে”। [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৪১]
টিকাঃ
¹⁶ হাকেম, মুসতাদরাক, হাদীস নং ৮১৭৭। শাইখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।