📄 আরবি বর্ণের ইতিহাস
আরবি অক্ষরের আদি ইতিহাস বেশ ধোঁয়াশাপূর্ণ। তাই প্রাচ্যবিদরা যে এ নিয়ে সুরচিত তত্ত্ব আনবে, তাতে অবাক হওয়ার কী আছে! দুঃখের বিষয় হলো বর্ণমালা পর্যালোচনায় এগুলোর সিংহভাগ ভুল প্রমাণিত হয়। আরবি বর্ণের বিকাশ-সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্রে গুয়েন্ডলার উল্লেখ করেন, ফোনেশীয় বর্ণমালা থেকে যত বর্ণমালা উৎপন্ন হয়েছে, তার মাঝে আরবি সর্বাধিক বিচ্ছিন্ন। গাঠনিক বিন্যাসের
পরিবর্তন থেকে তিনি ধারণা করেন, নাবাতীয় বা সিরিয়াক বর্ণমালা হয়ে আরবি বর্ণমালা এসেছে।
১৮৬৫ সালে থিওডর নোয়েলডেক বলেন, আরবি কুফীয় বর্ণমালার বিকাশ নাবাতীয় বর্ণমালা থেকে। এরপর এম এ লেভি, দি ভোগ, কারাবাসেক এবং এউটিংসহ অনেকেই গলা মেলান এর সাথে। কিন্তু অর্ধ-শতাব্দী পর এ ঐকমত্য চূর্ণ করে দেয় স্টার্কির তত্ত্ব।
স্টার্কি আরবিকে সিরিয়াক বর্ণমালা থেকে আগত বলে রায় দেন।[১] আবার খালিল নামির তত্ত্ব অনুযায়ী, পূর্বীয় আরবি বর্ণমালার যাত্রা হিজায থেকে শুরু হয়ে ক্রমবিবর্তিত হতে থাকে। হিরাহসহ বাকি কোনো অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত নয়।[২] অথচ তৃতীয় এ তথ্যটিকে গুয়েন্ডলার কেন এড়িয়ে গেলেন, তা পাঠকের ওপরেই ছেড়ে দিলাম।
নবিজির সময় আরবের মুসলিমদের নিজস্ব কোনো লেখার পদ্ধতি ছিল না বলে অনেক মিশনারি প্রাচ্যবিদ মত দিয়েছেন। অধ্যাপক মিঙ্গানার ভাষায়—
'আরবির প্রারম্ভিক বিকাশকাল নিয়ে এতটাই অন্ধকারে আছি, মক্কা ও মদিনায় এর নিজস্ব কোনো বর্ণমালা ছিল কি না-তা-ও নিশ্চিতভাবে বলা অসম্ভব। সেসময় উত্তর দুই অঞ্চলে কোনো লিখনপদ্ধতি থাকলেও তা নিশ্চয় এস্ট্রেঞ্জেলো (সিরিয়াক) বা হিব্রু অক্ষরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কিছু হয়ে থাকবে।'[৩]
নাবিয়া অ্যাবটও এতে সমর্থন জানিয়েছেন—
"আরবি ভাষায় লিখিত খ্রিষ্টীয় পাণ্ডুলিপির ওপর করা একটি গবেষণা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। একদম প্রাথমিক পাণ্ডুলিপিগুলোর মাঝে এস্ট্রেঞ্জেলোর প্রভাব বিদ্যমান। বর্গাকার একটি কাঠামো আছে বর্ণগুলোতে। যদিও পরোক্ষভাবে নেস্টোরীয় লিপির ছাপও আছে। অন্যান্য কিছু পাণ্ডুলিপিতে দেখা যায় জ্যাকবীয় রৈখিকতা। এছাড়া এ সকল খ্রিষ্টীয় পাণ্ডুলিপির সাথে সাম্প্রতিক কালের কুফীয়
কুরআনের মধ্যে তুলনা করলে বর্ণমালার সামঞ্জস্য স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।' [১]
কিন্তু বাস্তবতা আসলে ভিন্ন। এই অ্যাবটের মতেই, 'একদম শুরুর দিকের খ্রিষ্টীয় আরবি পাণ্ডুলিপি ৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে (রচিত)।' [২] অর্থাৎ হিজরি ২৬৪ অব্দ। অথচ আওয়াদ এর চেয়েও পুরোনো পাণ্ডুলিপির কথা উল্লেখ করেছেন; যা কিনা ২৫৩ হিজরিতে রচিত।[৩] তাই সবচেয়ে পুরোনো খ্রিষ্টীয় পাণ্ডুলিপির রচনাকাল হলো তৃতীয় শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে। আর আক্ষরিক অর্থেই এ সময়ে শত শত কুরআনের পাণ্ডুলিপি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। সেখান থেকে দু-একটি সিরিয়াকের উদাহরণ তুলে এনে সবকিছুই সেখান থেকে উৎপন্ন হওয়ার দাবি নিতান্তই অবৈজ্ঞানিক। বিজ্ঞানের কোনো কাতারেই একে ফেলা যায় না।
যে সিরিয়াকের কথা বলা হচ্ছে, তার সাথে তখনকার সাধারণ আরবির কোনো সামঞ্জস্য নেই। সিরিয়াক ছিল কৌণিক এবং সামনের দিকে হেলানো। আর আরবি ছিল অতির্যক এবং বাঁকানো। তাই প্রথম শতাব্দীর কুরআন এবং অন্যান্য আরবি লিপি ছেড়ে অ্যাবট কেন অন্য দিকে গেলেন, তা নিয়ে জিজ্ঞাসু মনে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। অথচ গ্রন্থাগারের তাকে এগুলো বিপুল পরিমাণে বিদ্যমান।
সিরিয়াক প্রসঙ্গ তাই এ পর্যন্তই। এরপর নাবাতীয়কে আরবি পালিওগ্রাফির উৎস হিসেবে দাবি করা হয়। ড. জুমার মতে, 'নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষকদের গবেষণার দ্বারা নাবাতীয় থেকে লিখিত আরবির সূত্রপাত প্রমাণিত হয়েছে।' নিজের মতের পক্ষে অ্যাবট, উইলফিনসনের মতো বিশ্লেষকদের অসংখ্য উদ্ধৃতি উপস্থাপন করেছেন।[৪]
অ্যাবট ইসলাম পরবর্তী এবং পূর্ববর্তী পুরোনো পাথরের খোদাই, মুদ্রা এবং পাণ্ডুলিপি পাশাপাশি রেখে পুরোটাকে নাবাতীয়ের সাথে তুলনা করেছেন। তার মতে, 'ইসলামের শুরুর দিকে যে বর্ণমালা ছিল, তা প্রাক-ইসলামি আরবিরই একটি ক্রমধারা; যা কিনা সরাসরি আরামীয় নাবাতীয় থেকে এসেছে।' [৫]
টিকাঃ
১. Beatrice Gruendler, The Development of the Arabic Script, Scholars Press, Atlanta, Georgia, 1993, p. 1. Starcky’s arguments have been refuted in detail (ibid, p. 2).
২. Nabir Abbott, The Rise of the North Arabic Script and its Kur’anic Development, with A full Description of the Kuran Manuscripts in the Oriental Institute, The University of Chicago Press, Chicago, 1938, p. 6, footnote 36.
৩. Mingana. Transmission of the Kuran’, The Moslem World, vol. 7 (1917), p. 412.
৪. Nabia Abbott, The Rise of the North Arabic Script, p. 20.
৫. ibid, p. 20.
৬. কে. আওয়াদ, আকদামুল মাখতৃতাতিল আরাবিয়্যা ফি মাকতাবাতিল আলাম, বাগদাদ, ১৯৮২, পৃষ্ঠা : ৬৫
৭. ইবরাহিম জুমা, দিরাসাতুন ফি তাতাউয়িরিল কিতাবাতিল কুফিইয়া, ১৯৬৯, পৃষ্ঠা : ১৭
৮. Nabia Abbott, The Rise of the North Arabic Script, p. 16.
📄 আরবি পালীয়গ্রাফির ইতিহাস ভূমিকা
আলোচনায় হঠাৎ পালিওগ্রাফি এবং অর্থোগ্রাফি প্রবেশ করায় অনুসন্ধিৎসু পাঠকের মনে হয়তো এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন জাগতে পারে। তবে উত্তর দেওয়ার আগে পালিওগ্রাফির পরিচয় তুলে ধরলে ব্যাপারটি আরও সহজ হবে।
পালিওগ্রাফি বলতে মূলত প্রাচীন পান্ডুলিপি গবেষণাকে বোঝায়। যেমন: বর্ণের গঠন বা ফোঁটার ব্যবহার প্রভৃতি। অর্থোগ্রাফি আবার অন্য জিনিস। এটি বানানরীতি-সংক্রান্ত গবেষণা। আরবি পালিওগ্রাফির উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ-সংক্রান্ত অনেক ভুলভাল তত্ত্ব প্রচলিত আছে। এসব তত্ত্বের প্রভাব বেশ ব্যাপক। যেনতেন বিষয় হলে এ বইয়ে সেগুলো স্থান দিতাম না। কিন্তু কোনোটার দাবি অনুযায়ী নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে আরবির কোনো নিজস্ব বর্ণমালা ছিল না (মিঙ্গানা)। কোনোটায় আয়াত পাঠের তারতম্যের কারণ হিসেবে বলা হয় সেসময়কার ত্রুটিপূর্ণ পালিওগ্রাফি (গোল্ডজিহার)। আবার কুফীয় লিপিতে লিখিত সকল কুরআনের অনুলিপি নাকি প্রথম শতাব্দীতে নয়; বরং দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শতাব্দীতে রচিত (গুয়েন্ডলার)। পবিত্র গ্রন্থের ওপর কালিমা লেপন দূর করতে এগুলোর জবাব দেওয়া জরুরি।
📄 অধ্যায় শেষে
খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকের মধ্যভাগ থেকে শুরু করে আরবের শিলালিপিগুলোতে সুসজ্জিত আরবির সমাহার দেখা যায়। আর প্রাচীন আরবি থেকেই নাবাতীয় আরবির খোরাক মেলে, যার মূল প্রোথিত রয়েছে অ্যারামাইকপূর্ব ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও ইসমাইল আলাইহিস সালামের যুগে। অন্য সকল ভাষার মতো আরবি পালিওগ্রাফি এবং অর্থোগ্রাফিও প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গেছে। ইসলামি শাসনের বিস্তৃতির সাথে আরবি লিপিগুলোও হয়েছে বৈচিত্র্যময়। হিজাযি, প্যাঁচানো, কুফীয় ইত্যাদি সকল লিপির মাঝেই আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। তবে এগুলো কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না কিংবা একটির ওপর অন্যটির প্রাধান্যও ছিল না। এ অধ্যায়ে প্রথম শতাব্দীর একাধিক কুফীয় শিলালিপির উদাহরণ পেশ করা হয়েছে। অতএব তা শুধু দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যে সীমাবদ্ধ প্রসঙ্গে যেসব তত্ত্ব রয়েছে, তা এখন অকার্যকর।
টিকাঃ
১. খলিফা আব্দুল মালিক ৭৭ হিজরিতে এই মুদ্রার প্রচলনের দ্বারা পুরো মুসলিমবিশ্বকে একত্র করেন। (Stephen Album, A Checklist of Islamic Coins, 2nd edition, 1998, p. 5) এ-সকল স্বর্ণ, রৌপ্য এবং তাম্র মুদ্রায় কুরআনি বালী, প্রচলনের সাল কুফীয় লিপিতে খোদাই করা থাকত। টাকশালের নামও উল্লেখ করা থাকত বুলা ও তামার ক্ষেত্রে। ১৩২ হিজরিতে উমাইয়্যা খিলাফতের পতনের পরেও এই রীতি চালু থাকে। ('Islamic Coins-The Turath Collection Part I', Spink, London, 25 May 1999, Sale No. 133)