📄 শেষ কথা
ইসলাম প্রসঙ্গে লেখার আগে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর দূত কি না, সেই সিদ্ধান্তে আসা আবশ্যক। তাকে প্রকৃত রাসুল ও শ্রেষ্ঠ নবি বলে জ্ঞান করা আলিম সমাজের কাছে রয়েছে ঐশী বাণী এবং হাদিসের সুবিশাল সংগ্রহ। স্বাভাবিকভাবেই তাদের গবেষণাগুলোর মধ্যে অজস্র মিল পরিলক্ষিত হয়। ইসলামের একদম মৌলিক বিষয়গুলোর ব্যাপারে তারা সবাই একই কাতারে। পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির কারণে যেসব ছোট-খাটো মতবৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়-তা পুরোপুরি স্বাভাবিক একটি বিষয়। পক্ষান্তরে, এর বিপরীত চিন্তার অনুসারীদের কাছে অবশ্যই মুহাম্মাদ একজন মিথ্যুক বা মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষ। এই দৃষ্টিকোণই অমুসলিম পণ্ডিতগোষ্ঠীর চেষ্টা ও কর্মের লক্ষ্য আগে থেকে ঠিক করে দেয়। মুহাম্মাদকে অসাধু বা কুরআনকে ভুল প্রমাণ করার উদ্দেশ্য না থাকলে তো তারা মুসলিমই হয়ে যেত।
ইসলামের ব্যাপারে পশ্চিমা গবেষণাগুলো নিছক পক্ষপাতিত্বের গণ্ডি অতিক্রম করে মূলত একটি ইসলামবিরোধী অন্ধবিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। এর দৃষ্টিভঙ্গির শেকড় সেই আদি পরম্পরা থেকেই শুরু: ধর্মীয় বিদ্বেষ, ক্রুসেডের ইতিহাস, মুসলিম-ভূমিতে উপনিবেশ স্থাপন এবং মুসলিমদের সংস্কৃতি, বিশ্বাস এবং ইতিহাসের প্রতি প্রকাশ্য তাচ্ছিল্যপূর্ণ ঔপনিবেশিক দম্ভ-দর্পণে এর জন্ম। এর সাথে সাম্প্রতিককালের লক্ষ্যগুলোও যুক্ত হয়েছে: সেক্যুলারিজমের পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্বব্যাপী ইহুদি-আত্মীকরণ ঘটানো এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের ন্যায্যতা নিশ্চিত করা।
পূর্বপুরুষদের লেজ ধরে নতুনদের অনেক রকম আক্রমণ জারি থাকতে পারে। যেমন-কুরআনকে একটি সংঘবদ্ধ মানব-রচনা হিসেবে দেখানোর পাঁয়তারা করা। ঠিক তাদের পূর্ববর্তীরা যেভাবে 'মোহামেডান' শব্দটি ব্যবহার করেছে। শুনে মনে হয়
যেন মুসলিমরা মুহাম্মাদ নামের কোনো সোনার মূর্তির সামনে মাথা ঠেকাত।
ইমাম ইবনু সিরিনের বিখ্যাত বাণীটি আজ সব থেকে বেশি প্রযোজ্য-
নিশ্চয় এই ইলম হলো দ্বীন। কাজেই কার কাছ থেকে তোমরা দ্বীন গ্রহণ করছ, তা যাচাই করে নাও।
অর্থাৎ কুরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ, ইতিহাস প্রভৃতি সকল ইসলাম-সংক্রান্ত বিষয়ে শুধু একজন দ্বীনধারণকারী লেখকের গবেষণার প্রতিই আমরা নজর দেব। এরপর যোগ্যতা অনুযায়ী সেগুলো গ্রহণ বা নাকচ করা হবে। কিন্তু এই দলের বাইরে থাকা যেসব লোক আন্তরিকতার মুখোশের আড়ালে নিজেদের আসল উদ্দেশ্য লুকিয়ে রেখেছে, তাদের জন্য কেবল প্রত্যাখ্যানই আপ্যায়ন। তারা ইসলামের কর্তৃত্ব বহন করে নাগি এবং তাদের দাবিসমূহেরও কোনো বৈধতা নেই।
ক্লিনটনের অভিশংসন বিচারকার্য চলাকালীন কোনো টেনিস খেলোয়াড় বা মঞ্চনাটক সমালোচকের রায় জানতে চাওয়া হয়েছিল বলে মনে পড়ে না। আমেরিকার সংবিধানের কপি সবার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু বিধিবিধান-সংক্রান্ত আলোচনা ন্যায়সঙ্গতভাবেই শুধু আইনবিদ এবং সাংবিধানিক আইনের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অন্য দেশের আইনের অধ্যাপকরা পর্যন্ত এখানে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে না। কারণ তা আমেরিকার একান্ত অভ্যন্তরীণ বিষয়। দুঃখজনকভাবে, ইসলামের ক্ষেত্রে এই নীতি মোটেও অবলম্বন করা হয় না।
টিকাঃ
১. সহিহ মুসলিম-এর ভূমিকা, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৪
২. ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহী অমুসলিমদেরও উচিত হবে মুসলিম রচনাকর্মের মাধ্যমে পাঠযাত্রা আরম্ভ করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা সমাজতন্ত্র পড়তে গেলে আগে অবশ্যই জরুরি ইশতাহারগুলো জানতে হয়। এতে করে তারা মূল বিষয় সম্পর্কে আগে পরিষ্কার ধারণা লাভ করে। অন্তত সমাজতন্ত্রের ওপর সমালোচনামূলক প্রবন্ধগুলো পাঠের আগে এগুলো জানা অপরিহার্য। বাইবেলীয়-বিদ্যা অধ্যয়নের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কাজেই ইসলামিক স্টাডিজের শিক্ষার্থী হিসেবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা গবেষণার ওপর নির্ভর করার অর্থ হলো- মুসলিমদের বুনিয়াদি উৎসগুলো অগ্রাহ্য করে পশ্চিমা রিভিশনিষ্ট বা সংশোধনবাদী শিক্ষা লাভ করা। পুরো ব্যাপারটা খুব একটা যৌক্তিক প্রতিপন্ন হয় না।
৩. ৯০-এর দশকে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকালীন ইবনু সিরিনের উপদেশটি আবার নতুনভাবে অনুধাবন করেছিলাম। রিলিজাস স্টাডিজের প্রধান ছিলেন অধ্যাপক এল, ইউডোভিচ। একাধারে তিনি ছিলেন আরবি এবং ফিকহের ওপর ভালো দখল রাখা একজন ইহুদি বিশেষজ্ঞ। কাছের সহকর্মী হিসেবে তিনি একদিন মজা করে আমাকে বলেছিলেন, 'আরবি আর ফিকহ জানি। আমি তো তাহলে শাইখ হয়ে গেলাম।' ব্যাপারটি আমাকে বেশ চিন্তায় ফেলে দেয়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে, ভবিষ্যতে অমুসলিমদের কাছ থেকে ফতোয়া জানতে চাচ্ছে মুসলিমরা। এর কিছুদিন পরেই ঘাঁটতে ঘাঁটতে আবার এই অমূল্য উপদেশটি সামনে এসে দাঁড়ায়। সেই থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে তা স্মরণ রেখেছি।