📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 উপনিবেশবাদ এবং মুসলিমদের মনোবল হ্রাস

📄 উপনিবেশবাদ এবং মুসলিমদের মনোবল হ্রাস


পশ্চিমা উদ্দেশ্য বুঝতে চাইলে সবার আগে ১৯৪৮ সালকে ঘিরে একটি সীমারেখা টানতে হবে। এর আগ পর্যন্ত তারা কুরআনকে বাইবেলের নকল, হাদিসকে অশুদ্ধ, নবিকে মিথ্যা এবং ইসলামি শরিয়তকে বিভিন্ন সভ্যতা থেকে ধার করা মিশ্র নীতি হিসেবে তুলে ধরতে বহু কাঠ-খড় পুড়িয়েছে। অর্থাৎ মুসলিমদের মনোবল ভাঙা এবং উপনিবেশিক শক্তির পক্ষে এক ঝাঁক প্রভুভক্ত প্রজা তৈরি করা ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এর জন্য তারা ইসলামের রাজকীয় ইতিহাস বা গর্বিত মুসলিম পরিচয়কে আগে বিনষ্ট করেছে। বিশেষত, মুসলিম শাসকগোষ্ঠী ছিল তাদের এই ফন্দির প্রধান শিকার।
উপনিবেশবাদের দ্বারা উসমানি খিলাফতসহ প্রায় সকল মুসলিম ভূখণ্ডের পতন ঘটানো হয়। এভাবে জনমানুষের বৈষয়িক জীবনে আঘাত হানার মোক্ষম সুযোগ এসে গেল। মুসলিম আলিমগণ পড়ে যায় কঠিন রাজনৈতিক চাপের মুখে। ইসলামি শিক্ষালাভের জন্য বরাদ্দকৃত অধিকাংশ বৃত্তি ও অনুদান বন্ধ বা জব্দ করা হয়। এগুলো ছিল মুসলিমদের বিদ্যাচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন।[১] ইসলামি আইন উঠিয়ে দেওয়া হয়। ঔপনিবেশিকদের ভাষা ও লিপি বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। এমন আইনের ফলে রাতারাতি পুরো জাতি হয়ে পড়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মূর্খ।
এদিকে আলিমগণ ইউরোপীয়দের ভাষায় দক্ষ না হওয়ায় আরও কোণঠাসা হয়ে যান। তাদের প্রত্যুত্তরগুলো শুধু নিজেদের ভাষাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ায় খুব একটা মনোযোগ পায়নি। তবে তাদের সাথে বিতর্ক করার প্রতি প্রাচ্যবাদের আসলে কোনো আগ্রহই ছিল না। তাই সমালোচনাগুলো খুব একটা গুরুত্বের সাথে নেয়েনি তারা। কারণ প্রাচ্যবাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমা শিক্ষায় দীক্ষিত নতুন গজিয়ে ওঠা মুসলিম অভিজাত শ্রেণির ওপর প্রভাব বিস্তার করা।[২] এ উদ্দেশ্যে তারা প্রশাসনিক শক্তির মাধ্যমে ঔপনিবেশিক সম্পদ ও জনবল ব্যবহার করে।[৩] কুরআন মেনে চলা যে খুব একটা কার্যকরী নয়, এই সেক্যুলার মন্ত্রে উক্ত এলিট শ্রেণিকে দীক্ষিত করা হয়। ফলে মুসলিম জাতির বর্তমান ও ভবিষ্যতের যেকোনো প্রকার রাজনৈতিক শক্তি অর্জনের আলাপ তাদের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সব ধরনের দোষে দুষ্ট এবং কুরআনকে নকলবাজির আখড়া 'প্রমাণে' গাইগার, টিসডাল-সহ অনেকেই অবদান রাখেন। এরপর তাদের নজর নিবদ্ধ হয় রাসুলের সুন্নাতের ওপর। নিজের যুগের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন প্রাচ্যবিদ গোল্ডজিহার (১৮৫০-১৯২১) সেটি ধ্বংস করার 'গৌরব' অর্জন করেন। অধ্যাপক হামফ্রেসের মতে গোল্ডজিহারের Muhammedanishce Studien বইয়ে সফলভাবে 'দেখানো হয়েছে যে, গ্রহণযোগ্য বিপুল সংখ্যক হাদিস আসলে হিজরি দ্বিতীয়-তৃতীয় (ইংরেজি অষ্টম ও নবম) শতাব্দীতে জালকৃত। এমনকি মুসলিমদের যাচাই করা অনেক শুদ্ধ হাদিস সমগ্রও এর অন্তর্ভুক্ত। তাই যে সূক্ষ্ম ইসনাদ পদ্ধতির ধোঁয়া তুলে তারা আত্মপক্ষ সমর্থন করত, তা পুরোপুরি বানোয়াট।[৪]
এই কৃত্রিম উপনীত সিদ্ধান্তকে জোসেফ শাস্ত আরও সামনে এগিয়ে নেন। তার কাছে ইসনাদ হলো দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যভাগের আব্বাসীয় বিপ্লবের অবশিষ্ট চিহ্ন। ইসনাদ যতবেশি শুদ্ধ হবে, জাল হওয়ার সম্ভাবনা ততো বাড়বে। এই তত্ত্ব এতটা পূজনীয় পর্যায়ে চলে যায় যে, তার রচিত Origins of Muhammadan Jurisprudence প্রাচ্যবিদদের ধর্মগ্রন্থে পরিণত হয়। কোনো যুক্তিই যেন এটিকে খণ্ডন করতে পারবে না। গিবের ধারণা অনুযায়ী এটি 'ইসলামি আইন ও সভ্যতা সংশ্লিষ্ট সকল প্রকার ভবিষ্যৎ গবেষণার ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হবে। অন্তত পশ্চিমে সেভাবেই দেখা হবে একে।[৫] হামফ্রেস আরও বলেছেন, 'শাখকে আমরা সঠিক বলে ধরে নিতে পারি।'[৬] শাখতের বিরুদ্ধে ক্রিটিকাল স্টাডিকে একেবারে বাধা না দিলেও বেশ নিয়মতান্ত্রিকভাবে উপেক্ষা করা হয়।[৭] প্রয়াত আমিন মাসরি পিএইচডি থিসিসের বিষয় হিসেবে গ্রন্থটির ক্রিটিকাল স্টাডি করতে চাইলে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তার আবেদন প্রত্যাখান করে। ক্যামব্রিজেও এর কোনো ব্যতিক্রম হয়নি।[৮] অধ্যাপক এন.জে. কুলসন একেবারে কোমল হাতে শাস্ত্রের থিসিসের কিছু দুর্বলতা চিহ্নিত করেন। তবে পরে মন্তব্য করেন, বৃহত্তর দৃষ্টিকোণে সেগুলো অবশ্য অখণ্ডনীয়। এর কিছুকাল পরেই তিনি অক্সফোর্ড ছেড়ে চলে যান।
শাস্তের উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে ওয়ান্সব্রো মন্তব্য করেছেন, 'একদম অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মুসলিমদের বিধানশাস্ত্র মোটেই কুরআন থেকে প্রাপ্ত উপাদান থেকে গঠিত হয়নি।' তাই ইসলামের ইতিহাসের সূচনালগ্নে কুরআনের মর্যাদাকে ওয়ান্সব্রো আরও কোণঠাসা হিসেবে উপস্থাপন করেন। মুসলিমদের বৈষয়িক জীবন থেকে পারলে কুরআনকে প্রায় উঠিয়েই দিয়েছিলেন তিনি। অন্তত যে ব্যতিক্রমগুলোর কথা তিনি বলেছেন, সেগুলো তো অবশ্যই কুরআনের অস্তিত্বের প্রমাণ, তাই না? কিন্তু সেটাও হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন-
'উল্লিখিত ব্যতিক্রমগুলো... প্রাথমিক যুগে কুরআনের অস্তিত্বের পক্ষে প্রমাণ নয়।'[৯]
কুরআনের ব্যাপারে এমন ঢালাও বিবৃতির পেছনে ওয়ান্সব্রো নিশ্চয় কোনো কোনো যুগান্তকারী সূত্র উপস্থাপন করেছেন? আজ্ঞে না। পাদটীকায় শুধু লিখেছেন : Strack, H., Introduction to the Talmud and Midrash.[১০] কুরআন সম্পর্কে এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পক্ষে এই তার উপস্থাপিত তথ্যসূত্রের অবস্থা। ব্যাপারটি তাহলে এমন দাঁড়াল, তালমুদ ও মিদরাশের ব্যাপারে যেসব তথ্য সঠিক, কুরআনের ব্যাপারেও তা আরও বেশি সঠিক হবে। তালমুদ ও মিদরাশ যেহেতু ইহুদি ইতিহাসের প্রথম যুগে ছিলই না, তাই কুরআনও মুসলিম ইতিহাসের শুরুর দিকে থাকার কথা নয়।

টিকাঃ
১. এই ধারা আজও চলমান।
২. কুরআনের অলঙ্ঘনীয়তায় আঘাত হানার প্রচেষ্টায় দুঃখজনক হলেও প্রাচ্যবিদরা কিছুটা সফলতা লাভ করেছিল। তুরস্কের সেক্যুলার এলিট মহল তার উদাহরণ। এমনকি রাষ্ট্রপতি ডেমিরেল মিডিয়ার সামনে দুটি সাংঘর্ষিক মন্তব্যও করে বসেন। (দৈনিক আর-রিয়াদ, সংখ্যা ২৭.৮.১৪২০ হিজরি/৫.১১.১৯৯৯) তার মতে, আধুনিক ইসলামের সাথে সেক্যুলারকরণের কোনো সংঘর্ষ নেই। এর পাশাপাশি তিনি কুরআনের প্রায় ৩৩০টি আয়াতকে 'এখন আর পালনের উপযুক্ত নয়' এবং সেগুলো বাতিল করা জরুরি বলে অভিহিত করেন। ৭৬ বয়েসি এই রাষ্ট্রপতি এরপর জনগণ এবং সাংবাদিক মহলের কাছ থেকে প্রাপ্য রোষানলের মুখোমুখি হন। তার 'ধর্মীয় সংস্কার' সাধনের প্রস্তাব তুরস্কের হাই কোর্ট ফর ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স থেকে প্রত্যাখ্যান করা হয়।
৩. উদাহরণ হিসেবে ১৮০৫ সালের Asiatic Annual Register-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধের কথা বলা যায়। জে. গিলক্রিস্টের এই নিবন্ধটির শিরোনাম, 'Observation on the policy of forming an oriental establishment, for the purpose of furnishing a regular supply of properly qualified diplomatic agents, interpreters, &c., for facilitating and improving the direct intercourse between Great Britain and the nations of Asia, in imitation of a similar institution in France. (See W.H. Behn, Index Islamicus: 1665-1905, Adiyok, Millersville PA, 1989, p. 1) অর্থাৎ 'প্রাচ্যীয় অনুশাসন নির্মাণে গৃহীত নীতিমালা পর্যবেক্ষণ: মূল লক্ষ্য যোগ্য কূটনীতিক প্রতিনিধি ও দোভাষী মহলের নিয়মিত জোগান চলমান রাখা যাতে গ্রেট ব্রিটেন এবং এশীয়দের মাঝে প্রত্যক্ষ সংযোগ উন্নত এবং সহজতর হয়...।'
৪. R.S. Humphreys, Islamic History, p. 83.
৫. H.A.R. Gibb, Journal of Comparative Legislation and International Law, 3rd series, vol. 34, parts 3-4 (1951), p. 114.
৬. হামফ্রেস হলেন স্যান্টা বারবারায় অবস্থিত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজের কিং আব্দুল আজিজ অধ্যাপক। উল্লিখিত উদ্ধৃতি পেতে তার Islamic History গ্রন্থের ৮৪ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য। এছাড়াও দ্রষ্টব্য 1. Esposito, Islam: the Straight Path, Expanded edition, Oxford Univ. Press, New York, 1991, pp. 81-82.
৭. যেমন M.M. al-A'zami, On Schacht's Origins of Muhammaddan Jurisprudence, John Wiley, 1985.
৮. মুস্তাফা আস-সিবায়ি, আস-সুন্নাহ ওয়া মাকানাতুহা, কায়রো, ১৯৬১, পৃষ্ঠা: ২৭
৯. Wansbrough, Quranic Studies, p. 44.
১০. Strack, H., Introduction to the Talmud and Midrash.

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 ইহুদি-সমস্যা, ইতিহাস ঢাকা এবং মিথ্যাচার

📄 ইহুদি-সমস্যা, ইতিহাস ঢাকা এবং মিথ্যাচার


১৯৪৮ পরবর্তী সময়ে প্রাচ্যবাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে নতুন আরেকটি বিষয় যুক্ত হয়েছে। তা হলো ইসরাইলের সীমানা রক্ষা এবং ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা। তবে এটি নিয়ে আলোচনার আগে 'ইহুদি-সমস্যা' নিয়ে পরিষ্কার হওয়া জরুরি। প্রেমময় ঈশ্বরকে বরণের দাবি করা জাতির (খ্রিষ্টান) একটি কুকীর্তির নাম স্প্যানিশ ইনকুইজিশন।[১] চরম বর্বরতায় স্পেন থেকে মুসলিমদের 'সাফ' করে ফেলা হয়। তার সাথে যুক্ত হয় ইহুদিদের উৎখাত। বাস্তুহারা এই ইহুদিদের কিছু অংশ উসমানি খিলাফত শাসিত তুরস্কে আশ্রয় নেয়। বাকি অংশ ইউরোপের বিভিন্নাংশে থিতু হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের। যেমন—ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে জার্মান অঞ্চলে বসবাসরত ইহুদিরা আইনত মানুষ হিসেবেই স্বীকৃত ছিল না। তারা ছিল রাজার ব্যক্তিগত সম্পত্তি।
দাসদের মতো ইহুদিরা অনুমতি ছাড়া এক এলাকা থেকে অন্যত্র যেতে পারত না। বিয়ে বা একের অধিক সন্তানগ্রহণের জন্যও অনুমতি নিতে হতো তাদের। তথাপি তাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বরাতে ইহুদিদের বাণিজ্যের সুবিধার্থে জার্মানিতে বসবাসের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসাহিত করা হতো।[২]
ইহুদি-সমস্যার প্রতিক্রিয়ায় জার্মানরা ছিল দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এক খ্রিষ্টান-জাতি। ‘স্বাধীন হওয়ার (অযোগ্য) পুরো একটা জাতি নিয়ে এখন আমরা কী করব?’—এই ছিল তাদের চিন্তা।[৩] তাই অনেকেই বিভিন্ন তত্ত্ব হাজির করেছেন। তবে কার্ল মার্ক্সের তত্ত্ব বাকি সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় থেকে সরে আসাটাকেই ইহুদিদের মুক্তির কার্যকরী পন্থা হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। এই তত্ত্ব বহাল রেখেই তিনি ইহুদিদের অধিকার নিশ্চিত করতে একটি পিটিশনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।[৪] ডেনিস ফিশম্যান লিখেছেন—
“...সবকিছু বিবেচনায় বলা যায় যে, ইহুদিধর্ম থেকে মানবজাতির মুক্তিই হলো ইহুদিদের নিজেদের মুক্তির নামান্তর।”—মানে ‘ইহুদি’ হিসেবে যখন আর ইহুদিদের অস্তিত্ব থাকবে না, তখনই কেবল তারা মুক্ত হতে পারে। মার্ক্সের বক্তব্য বোধহয় এমনটাই দাঁড়াল।[৫]
‘ইহুদি’ শব্দটিকে দুটি অর্থে নেওয়া যেতে পারে। প্রথমটি জাতি হিসেবে এবং দ্বিতীয়টি ধর্মের অনুসারী হিসেবে। মার্ক্সের মতে উভয়টির বন্দিদশা থেকেই তাদের মুক্ত করা লাগবে। তার সবচেয়ে মোক্ষম পন্থা হলো সকল জাতিকে তাদের জাতীয়তা, বস্তুগত সম্পত্তি, এবং ধর্মীয় পরিচয় থেকে বঞ্চিত করা। কার্যকারিতার দিক থেকে সমাজতন্ত্র ব্যাপকভাবে ব্যর্থ হলেও জাত ও ধর্ম পরিচয় মিটিয়ে সবাইকে একই জায়গায় নিয়ে আসার চিন্তা আজকের যুগেও বেশ সরব। স্যার ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী এই ধারণাটি স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন। ইহুদি- বিদ্বেষের উৎস প্রসঙ্গে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়। শিমন পেরেস তখন বলেন, প্রশ্নটি বিগত দুইশত বছর পর্যন্ত ইহুদিদের তাড়িয়ে ফিরছে এবং ভিন্ন দুটি উপসংহার সৃষ্টি হয়েছে।
একটি উপসংহার হলো- 'গোটা পৃথিবী ভ্রান্তিতে রয়েছে, তাই তাদেরকে অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে।' আরেকটি উত্তর- 'আমরা ভুলের ভিতর আছি, তাই অবশ্যই নিজেদেরকে পালটাতে হবে।' যেমন-ইহুদিরা যারা কমিউনিজমের পথে হেঁটেছে, তারা ঘৃণায় আচ্ছাদিত বিশ্বকে পালটে দিয়েছে। জাতীয়তাহীন, শ্রেণিহীন, ধর্মহীন একটি বিশ্ব গড়ে তোলা যাক। সেখানে এমন কোনো ঈশ্বর থাকবে না, যে অপরকে ঘৃণা করতে শেখায়।[৬]
একইরকম মন্ত্র পল সার্তেও প্রচার করে গেছেন। অস্তিত্ববাদী (Existentialist)[৭] এই লেখক মাতৃকুলের দিক থেকে ছিলেন ইহুদি। তার মতে, জীবনের কেন্দ্রীয় সমস্যা সমাধানে ধর্মকে হটিয়ে সেই স্থান দখল করবে যুক্তি। ধর্ম টিকিয়ে রাখা মানে ইহুদিদের ওপর অবিরত অত্যাচারও টিকিয়ে রাখা। তাই ধর্মের নির্মূল মানে ইহুদি- বিদ্বেষেরও সমাধান।[৮]
Great Confrontations in Jewish History[৯] নামের একটি পুস্তিকা পাঠকালে 'Modernity and Judaism' শীর্ষক একটি সেমিনারের উল্লেখ পেলাম। সেখানে বক্তব্য উপস্থাপন করেন ড. হার্টজবার্গ। তিনি ছিলেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক এবং একজন ধর্মগুরু বা র‍্যাবাই।[১০] নিজেদের ধর্মের ব্যাপারে প্রসিদ্ধ ইহুদি চিন্তাবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করেছেন; কিন্তু সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন মার্ক্স এবং ফ্রয়েডের চিন্তা-ভাবনার ওপর। তার মতে, Die Judenfrage গ্রন্থে যুবক মার্ক্স ইহুদিদের প্রোটো-ক্যাপিটালিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করছেন। ইহুদিরা অর্থব্যবস্থা ও গোটা অর্থনৈতিক কাঠামো কর্তৃক সৃষ্ট অসংখ্য আপদের শিকার। অর্থনৈতিক এবং শ্রেণি বিভাজনের অবসান ঘটানোই ইহুদি-সমস্যার সমাধান। এজন্য ইহুদিদের পাশাপাশি খ্রিষ্টানদেরও গতানুগতিক পুঁজিবাদী রীতি থেকে বাইরে নিয়ে আসতে হবে। এই গেল মার্ক্স। এদিকে সিগমন্ড ফ্রয়েড ধর্মকে দেখতেন একটি আবেশ বা ঘোর হিসেবে। এমন এক ঘোর যেখানে কর্তৃত্বের অনুসরণের প্রতি রয়েছে শিশুসুলভ আনুগত্য। তাই মানসিক সুস্থতা এবং পরিপূর্ণতার জন্য প্রতিটি মানুষকে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া জরুরি।[১১]
ঐতিহাসিক প্রচলন ছুঁড়ে ফেলার এসব বিদ্রোহীসুলভ চেতনার ঢেউ শুধু মার্ক্স আর ফ্রয়েডের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইহুদি-সমস্যা সমাধানের এই চিন্তা 'বাহিরে'র অনেকেই গ্রহণ করে নেয়। কেন? হার্টজবার্গের মতে এটি একটি স্বাধীনতার আহ্বান। মধ্যযুগের ইউরোপীয় অতীতের প্রতিটি উপাদান থেকে ইহুদিরা মুক্ত হওয়ার মাধ্যমে তারা নতুন করে সবকিছু শুরু করতে পারবে। অ-ইহুদিদের সাথে সমানে সমান হয়ে যেতে পারবে তারা। এটিকে তিনি ইহুদীয় আধুনিকতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ইউরোপের অতীত আগে থেকেই খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস ও উপকথায় ঠাসা। পশ্চিমা সভ্যতায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্য এই অতীতের কবর রচনা করা জরুরি ছিল। যাতে করে ছাই হয়ে যাওয়া ইতিহাস-পরবর্তী সকলেই নতুন যুগের কমরেড হিসেবে একত্রে কাজ করে।[১২]
হার্টজবার্গের দৃষ্টিতে, সংস্কারবাদী এই ইহুদির সাথে হালজামানার গর্বিত জায়নপন্থী জাতীয়তাবাদীর মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। তারা একে অপরের বিরোধী হলেও উভয়েই একই জিনিসের জন্য পাল্লা দিচ্ছে। উনিশ শতকের Reform Jew[১৩] বা সংস্কারপন্থী ইহুদিদের কাছে ধর্ম ছিল নিজেদের সম-অধিকার নিশ্চিত করার অন্তরায়। আবার বর্তমান ইহুদিবাদ বা জায়নিজমও ধর্মকে একত্রীকরণ শক্তি হিসেবে যথেষ্ট মনে করে না।
কিছু ধর্মীয়বিরোধ বাদ দিলে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকসহ অধিকাংশ ইহুদিবাদীই সেক্যুলার মতবাদধারী। যারা শুরুতেই এটি ধরে নেয়, ইহুদিধর্ম তাদের ঐকাক্য করার ভিত্তি হারিয়েছে। তাই টিকে থাকার জন্য তাদের অবশ্যই অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করতে হবে... ঈশ্বরের নামের পবিত্রতা রক্ষায় প্রাণ বিসর্জন দেওয়া এখন আর সবচেয়ে বড় ধর্মবিধান নয়; বরং বাসভূমি পুনর্গঠনে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার মাঝেই তা নিহিত।[১৪]
পেরেস, হার্টজবার্গ, সার্ভে, মার্ক্স, ফ্রয়েড এবং সমমনারা বলতে চাইছেন— ইহুদি চিন্তাশীল মহল এখন এমন এক বৈশ্বিক সমাজ চায়, যেখানে ঈশ্বর, ধর্ম এবং ইতিহাসের কোনো স্থান নেই। অথচ তা ফিলিস্তিনের ওপর তাদের ইয়াহওয়েহ[১৫] প্রদত্ত অধিকারের ঠিক বিপরীতমুখী দাবি।[১৬] বৃহত্তর এক সমাজে তাদের কাঙ্ক্ষিত অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হলে অতীত মুছে ফেলা জরুরি। সেই পরিকল্পনার অংশ হলো ঘষে-মেজে নতুন আরেকটি মিথ্যা ইতিহাস সাজানো। আর তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ওয়েলহাউসেনের মতো বাকিরা ওল্ড টেস্টামেন্টের শুদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কাজ শুরু করে। এরপর পালা আসে নিউ টেস্টামেন্টের। সবশেষে কুরআনকেও তারা একই পথে ঘায়েল করার চেষ্টা চালায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অসহনীয় দিনগুলোতে গোটা মানবজাতির মতো ইহুদিরাও করুণ পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে গিয়েছে। যুদ্ধজয়ী মিত্রশক্তি সমবেদনা জানিয়ে ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাদের একটি 'স্বদেশ' দান করার সিদ্ধান্ত নেয়; কিন্তু উদার হস্তে দান করতে চাওয়া সেই বাসভূমিটি কোনো পক্ষেরই ছিল না। ফলে সেখানকার প্রকৃত অধিবাসীরাই এক সময় নির্বাসিত শরণার্থী হয়ে পড়ে, যারা সংখ্যায় ছিল লক্ষ লক্ষ। ততদিনে ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্মকে সেক্যুলার ধাঁচে তৈরি করার চেষ্টা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ধর্ম তখন তাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি নামমাত্র অংশ; কিন্তু মুসলিমদের চিন্তা থেকে স্রষ্টা, ধর্ম এবং ইতিহাস মুছে ফেলাটা এক কঠিনতম যুদ্ধে পরিণত হয়। সেক্যুলারিজম মুসলিমদেরকে বহুলাংশে গ্রাস করলেও ইসরাইলকে তারা কোনোক্রমেই মেনে নিতে পারেনি। এই সমস্যা দূর করতে হলে ইহুদি ও ফিলিস্তিন সংশিষ্ট ইসলামি সূত্রগুলোকে মিথ্যা প্রমাণ করা জরুরি হয়ে পড়ে।[১৭] নিউ টেস্টামেন্টের মতো কুরআনের ভিতর তাদের সংজ্ঞা মতো অ্যান্টি-সেমিটিক যত আয়াত আছে তা নির্মূল করা প্রয়োজন।[১৮]
কিন্তু মুসলিমরা যতদিন কুরআনকে আল্লাহর অপরিবর্তনীয় বাণী আকারে আঁকড়ে থাকবে, ততদিন এই সাফাই সাধন সম্ভব নয়। তাই এই কুরআন যে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়কার কুরআন নয়, সেটা 'প্রমাণ' করার দায়িত্ব নেন ওয়ান্সব্রো। কুরআনুল কারিমকে তিনি দুইশ বছর পর্যন্ত ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রচেষ্টার সমন্বিত রূপ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চালান।[১৯] হামফ্রেসের ভাষ্যমতে—
'ওয়ান্সব্রো মূলত দুটি বিষয় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন :
> হাদিসের পাশাপাশি খোদ কুরআন দুইশ বছরের ধর্মীয় মতবিরোধের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে। এরপর কাল্পনিক একটা প্রাচীন আরবি সময়-কাল উদ্ভাবন করে সেইসময়কার রচনা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইসলামি ধর্মমত, এমনকি মুহাম্মাদ নামক চরিত্রটিও ইহুদি র‍্যাবাই আদর্শকে ভিত্তি ধরে কল্পিত হয়েছে।'[২০]
এর সাথে আমরা ইয়েহুদা নেভো এবং জে. কোরেনের গ্রন্থগুলোর কথা উল্লেখ করতে পারি। তারা ইসলামি স্টাডিজের ওপর নিজেদের রিভিশনিস্ট পদ্ধতি প্রয়োগ করে পিলে চমকানো সব ফলাফল হাজির করেছেন। জর্ডান এবং আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের বর্ণনা দিয়ে তারা বলেন-খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীতে স্থানীয় কোনো আরব সংস্কৃতির আলামত পাওয়া যায় না। যদিও হেলেনিস্টিক, নাবাতীয়, রোমান এবং বাইজেন্টাইনদের হস্তনির্মিত বিভিন্ন বস্তু উদঘাটিত হয়েছে ঠিকই।
'মুসলিম উৎসগুলোতে বর্ণিত হলেও ষষ্ঠ বা সপ্তম শতাব্দীর জাহিলি পৌত্তলিক স্থান বা মূর্তিপূজার কোনো কেন্দ্র হিজাযে (পশ্চিম আরব) কিংবা নিরীক্ষিত অঞ্চলের কোথাও পাওয়া যায়নি... এছাড়া কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে মদিনা, খাইবার বা ওয়াদিল-কুরাতে ইহুদি বসতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। দুটি ব্যাপারই মুসলিম উৎস থেকে পাওয়া প্রাক-ইসলামি হিজাযের জনবসতি সংক্রান্ত বর্ণনার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।'[২১]
কোরেন এবং নেভোর দাবি অনুযায়ী, মধ্য নেগেভে (দক্ষিণ ফিলিস্তিন) পৌত্তলিক নিদর্শন পাওয়া যায়, যে তথ্যটি মুসলিম সূত্রে উপেক্ষিত হয়েছে। আব্বাসীয় খিলাফতের (খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগ) আগ পর্যন্ত সেখানে পৌত্তলিকতার চর্চা হতো। মাটির নিচে পাওয়া উপাসনালয়গুলো থেকে নাকি এটি বোঝা যায়। মানে ইসলামের প্রথম দেড়শ বছর পর্যন্ত নেগেভের একটি বড় অংশ পৌত্তলিক পরিচয় টিকিয়ে রেখেছিল। এসব মঠ-মন্দির এবং আশেপাশের প্রাকৃতিক বিবরণের সাথে মুসলিম উৎস থেকে প্রাপ্ত হিজাযি পৌত্তলিক স্থানগুলোর বর্ণনা অনেকটাই মিলে যায় (তাদের মতে)।
'কাজেই মুসলিম সূত্রে বর্ণিত পৌত্তলিক উপাসনালয়গুলো যে জাহিলি হিজাযে ছিল না, তা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে বোঝা যায়; বরং মধ্য নেগেভের মঠ-মন্দিরগুলোর সঙ্গে বহুলাংশে মিলে যায় সেসব বর্ণনা। আব্বাসিরা ক্ষমতায় আসার আগপর্যন্ত সেগুলো ছিল। তাই হিজাযের জাহিলি অঞ্চলের পৌত্তলিকতা-সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো মূলত পরবর্তী কোনো কাল এবং ভিন্ন একটি স্থানের বিবরণ হওয়ার ভালোরকম সম্ভাবনা আছে।[২২]
কোরেন ও নেভোর বক্তব্য মেনে নিলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে হিজাযে কোনো ইহুদি বসতির প্রমাণ থাকে না। ফলে কুরআনের ইহুদি সংক্রান্ত সকল বর্ণনাকে বাতিল ঘোষণা করতে হবে। কারণ সেগুলো রাসুলের 'লিখিত' নয় বলে প্রকাশ পায়। তাহলে নিশ্চয় মুসলিমরা তা পরবর্তী সময়ে সংযুক্ত করে কুরআন হিসেবে চালিয়ে দিয়েছে। কাজেই কুরআনকে তার প্রকৃত রূপে ফিরিয়ে আনতে হলে এসব অ্যান্টি-সেমিটিক এবং জাল আয়াতগুলো (তাদের দাবিমতে) হঠিয়ে দেওয়া জরুরি। কুরআন এবং হাদিসে বর্ণিত প্রাক-ইসলামি পৌত্তলিকতার বর্ণনাকে ভুল এবং তা দক্ষিণ ফিলিস্তিনের কোনো এক সংস্কৃতি হিসেবে মেনে নিলে পরোক্ষভাবে মুহাম্মাদ নামক চরিত্রটির অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আর এভাবে কোরেন আর নেভোর বক্তব্য ওয়ান্সব্রোর তত্ত্বের পক্ষে মিলিয়ে দেওয়া যায়। ফলে জাতিগত পরিচয় এবং ঐতিহাসিক গোড়াপত্তনের বানোয়াট ভিত্তি প্রদানের জন্য মুসলিমদের ইহুদিধর্মের প্রতি ঋণী করা সম্ভব। আর এর দ্বারা তথাকথিত ইহুদিজাতি-বিরোধী সকল আয়াত বাতিল করার পথ আরও প্রশস্ত হয়।

টিকাঃ
১. স্পেনের ক্যাথলিক শক্তিকে রক্ষা করার জন্য 'Spanish inquisition'-এর সূত্রপাত হয়। এর ফলে ১৫শ থেকে ১৭শ শতাব্দীতে মুসলিম ও ইহুদিরা নির্মম নির্যাতন ভোগ করে।- অনুবাদক
২. Dennis Fischman, Political Discourse in Exile : Karl Marx and the Jewish Question, The University of Massachusetts Press, 1991, p. 26.
৩. ibid, p. 28.
৪. ibid, pp. 7, 15.
৫. ibid, p. 13.
৬. Talking with David Frost: Shimon Peres. Aired in US on Public Broadcasting System (PBS), 29 March 1996. Transcript #53, p. 5.
৭. অস্তিত্ববাদ বা Existentialism এর মূল কথা হলো, 'নির্লিপ্ত ও প্রতিকূল বিশ্বে মানুষ এক অনন্য নিঃসঙ্গ প্রাণী, যে নিজ কর্মের জন্য দায়ী এবং নিজ নিয়তি নির্ধারণের ব্যাপারে স্বাধীন।' (Accessible Dictionary)-অনুবাদক
৮. M. Qutb, al-Mustashriqun wa al-Islam, Maktabat Wahba, Cairo, 1999, p. 309. এই ধারণাটির উৎস সাত্রের বই Anti-Semite and Jew (English translation), Schocken Books Inc., NY, 1995.
৯. এটি ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রকাশিত কিছু বক্তৃতার সংকলন। সম্পাদনা করেছেন স্ট্যানলি এম. ওয়েগনার এবং অ্যালেন ডি. ব্রেক।
১০. তিনি নিউ জার্সির টেম্পল ইম্যানুয়েলের র্যাবাই। এর পাশাপাশি তিনি রটগার্স, প্রিন্সটন এবং জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেছেন।
১১. Wagner and Breck (eds.), Great Confrontations in Jewish History, pp. 127-8.
১২. ibid, pp. 128-9.
১৩. Reform Judaism বা ইহুদিধর্মের সংস্কার সাধন হলো এমন আন্দোলন-যা প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস, আইন এবং রীতির অনেক কিছুই সংশোধন বা প্রত্যাখান করে। এর উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক সমাজ, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির সাথে ইহুদি ধর্মকে খাপ খাওয়ানো। অর্থোডক্স বা শাস্ত্রীয় ইহুদি ধর্মের সাথে এটি বিরোধপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে। ধর্মগ্রন্থের নির্ধারণ করা আইন-কানুন ও রীতি-নীতিকে অনুসরণ করার অলঙ্ঘনীয় নিয়মকে তারা মান্য করে না। (Britannica); অর্থাৎ Reformed Jew হলো এমন ইহুদি যে ধর্মীয় উপাসনার পদ্ধতি ইহুদি ধর্ম থেকে গ্রহণ করলেও বৈষয়িক জীবনে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রচলিত ধর্মবিধি ও রীতি-নীতিকে সংশোধন বা প্রত্যাখান করে থাকে। (Dictionary.com)-অনুবাদক
১৪. Wagner and Breck (eds.), Great Confrontations in Jewish History, p. 131.
১৫. ইহুদিদের কিতাবে উল্লেখিত ঈশ্বরের সব থেকে পবিত্র ও প্রধান নাম।-সম্পাদক
১৬. কারণ হার্টজবার্গের ভাষ্য মতে জায়নবাদীদের অধিকাংশ এখন ইহুদিধর্মকে ঐক্যশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে না। তারা এখন 'বাসভূমি পুনর্গঠন' করার সেক্যুলার মন্ত্রের প্রতি ঝুঁকেছে।
১৭. ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের পর রেভারেন্ড অধ্যাপক গিয়োম 'প্রমাণ' দেখান—মুসলিমদের মাসজিদুল আকসা মূলত মক্কার সীমান্তবর্তী এলাকার একটি ছোট গ্রামে অবস্থিত। জেরুজালেম থেকে কতই না দূরে! (A. Guillaume, 'Where was al-Masjid al-Aqsa', al-Andalus, Madrid, 1953, pp. 323-336.)
১৮. Holy Bible, Contemporary English Version, American Bible Society, New York, 1995; Joseph Blenkinsopp "The Contemporary English Version: Inaccurate Translation Tries to Soften Anti-Judaic Sentiment', Bible Review, vol. xii, no. 6, Oct. 1996, p. 42. In the same issue: Barclay Newman, 'CEV's Chief Translator: We Were Faithful to the Intention of the Text', ibid, p. 43. প্রবন্ধগুলোতে যতটুকু বলা হয়েছে, এসব পরিবর্তন তার চেয়েও অনেক ব্যাপক। উদাহরণ হিসেবে এই বইয়ের অধ্যায় ১৭.৭ দ্রষ্টব্য।
১৯. অধ্যাপক নরম্যান ক্যালডার একই পথের অনুসরণ করেন। শুধু কুরআন নয়; বরং তৎকালীন সকল ইসলামি রচনাকর্ম মুসলিম-সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টায় রচিত হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার তত্ত্বানুসারে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে ইমাম মালিকের মুয়াত্তা, সাহনুনের আল-মুদাওয়ানা, শাফিয়ির আল-উন্ম, আবু ইউসুফের আল-খারাজ-এর মতো বিখ্যাত কিতাবসমূহ কোনো একক লেখকের রচনা নয়। (Norman Calder, Studies in Early Muslim Jurisprudence, Oxford Univ. Press, 1993)
২০. R.S. Humphreys, Islamic History, p. 84.
২১. J. Koren and Y.D. Nevo, 'Methodological Approaches to Islamic Studies'. Der Islam, Band 68, Heft 1, 1991, p. 101.
২২. ibid, p. 102.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00