📄 আধুনিক গবেষণায় নিরপেক্ষতা
এডওয়ার্ড সাইদ Covering Islam নামক সুগভীর ও অসাধারণ গ্রন্থে রাজনীতি ও মিডিয়া-বিধৌত ইসলাম-বিরোধী চেতনার মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছেন। এই চেতনার দ্বারা আচ্ছাদিত করে রাখা হয়েছে পশ্চিমা জনসাধারণকে। ইসলাম সম্পর্কে নিজেদের বিকারগ্রস্ত চিন্তা সবার সামনে মেলে রেখেছে তারা। পশ্চিমা সভ্যতার প্রতি অত্যাসন্ন হুমকি হিসেবে ইসলামকে এমনভাবে চিত্রায়ণ করা হয়েছে যে-অন্য কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের পক্ষে এককভাবে এতটা ভয়ঙ্কর হওয়া রীতিমতো অসম্ভব।[১] তাই যেকোনো সামাজিক-রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বিষয় পশ্চিমের মনমতো না হলেই দোষ হয়ে যায় ইসলামের। এই ধর্ম সম্পর্কে খুব বেশি না জানলেও এর প্রতি বেশি অনুকূল হওয়ার মতো তেমন কিছু নেই বলে তারা রাজনৈতিকভাবে একতাবদ্ধ।[২] ইসলামকে খ্রিষ্টানরা হুমকি হিসেবে দেখে আসার ঐতিহাসিক প্রবণতাকে এডওয়ার্ড সাইদ এমন বৈরিতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তারা ইসলামকে তাদের ক্ষমতার প্রতি হুমকি এবং শত্রু হিসেবে গণ্য করত। মধ্যযুগে এটিকে, 'একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন, ঈশ্বর-বিরোধী শয়তানি ধর্ম হিসেবে মনে করা হতো। মুসলিমরা যে মুহাম্মাদকে ঈশ্বর নয়; বরং নবি হিসেবে মানে-এটা তাদের কাছে ধর্তব্যই নয়। খ্রিষ্টানরা শুধু এটুকুই বুঝত-তিনি একজন মিথ্যা নবি, মতবিভেদ সৃষ্টিকারী... শয়তানের দোসর।'[৩]
খ্রিষ্টান অধ্যুষিত ইউরোপ যখন মুসলিম শাসনামলে সমৃদ্ধি লাভ করে, তখনও তাদের ভয় এবং ঘৃণার ফেনা দূর হয়নি। 'মোহামেডানিজম' তাদের কাছে এমন এক শঙ্কার নাম, যা তারা কখনোই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। ভারত, চীন, ও অন্যান্য প্রাচ্যীয় সংস্কৃতিকে একবার বশে এনে ফেলার পর সেগুলো আর ইউরোপীয় প্রশাসন ও ধর্মবিদদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে থাকেনি। শুধু ইসলামই নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। অবাধ্য-রকমের স্বাধীনতা দেখিয়ে পশ্চিমের আনুগত্য অস্বীকার করে চলে।[৪] দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে এডওয়ার্ড সাইদ দেখিয়েছেন, আমেরিকা বা ইউরোপীয় ইতিহাসে ইসলাম 'নিয়ে সকল ভাবনা ও আলোচনা হয়েছে তাদের নিজস্ব (পশ্চিমা) আবেগ, সংস্কার-সংস্কৃতি, এবং রাজনৈতিক স্বার্থের কাঠামোতে।'[৫] পিটার দ্য ভেনারেবল, বার্থেলেমি ডি হার্বালো এবং পূর্বেকার অন্যান্য লেখকরা নিঃ সন্দেহে ইসলাম নামক প্রতিপক্ষকে গালমন্দ করায় ব্যস্ত খ্রিষ্টান তার্কিকদের কাতারে পড়ে যান।
চলতি যুগে আবার নতুন এক ধারণা জন্মেছে। তারা মনে করে, আধুনিকতাবাদের (Modernism) প্রভাবে প্রাচ্যবাদের বিগত পক্ষপাতদুষ্টতা দূর হয়ে গেছে। একজন কেমিস্ট এই যুগে আর অ্যালকেমি দ্বারা অনুপ্রাণিত নয়, সে এখন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পদার্থের গঠন বিশ্লেষণ করে। বর্তমান যুগে প্রাচ্যবিদরাও বুঝি সেরকম কিছু একটা করছে বলে মানুষের ধারণা।
সিলভাস্টার ডি স্যাসি, এডওয়ার্ড লেন, আর্নেস্ট রেনান, হ্যামিল্টন গিব এবং লুইস ম্যাসিগননের মতো বিশেষজ্ঞগণ কি তাহলে জ্ঞানবান এবং বস্তুনিষ্ঠ ছিলেন না? বিংশ শতাব্দীর আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ব এবং ইতিহাসে দক্ষ অধ্যাপকমহল প্রিন্সটন, শিকাগো, হার্ভার্ডের মতো জায়গায় মধ্যপ্রাচ্য এবং ইসলাম বিষয়ে পাঠদান করেন। তারা তো পক্ষপাতহীন এবং বিশেষ গোষ্ঠীর ওকালতি-বিমুখ হওয়ার কথা, তাই না? এর উত্তর হলো—না।[৬]
ইসলাম সম্পর্কিত সকল গবেষণাই আজ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও চাপের প্রতি খেয়াল রেখে সম্পাদন করা হয়। প্রবন্ধ-নিবন্ধ, সমীক্ষা-পর্যালোচনা থেকে শুরু করে রচিত গ্রন্থগুলো রাজনৈতিক কদর বজায় রাখতে সদা সোচ্চার। যদিও এগুলোর রচয়িতারা 'বৈজ্ঞানিক পক্ষপাতহীনতা'-এর বয়ান তোলে। শব্দদ্বয়ের এহেন অপব্যবহারের আড়ালে তাদের মূল উদ্দেশ্য ঢাকা পড়ে যায়। এর পাশাপাশি নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পদবির জোর তো আছেই।[৭]
টিকাঃ
১. Edward Said, Covering Islam, Pantheon Books, New York, 1981, p. xii.
২. ibid. p. xv.
৩. ibid, pp. 4-5
৪. ibid. p. 5
৫. ibid. p. 23
৬. ibid. p. 23
৭. ibid. p. xvii. 23.