📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 প্রতারক প্রাচ্যতাত্ত্বিক অগ্রদূত

📄 প্রতারক প্রাচ্যতাত্ত্বিক অগ্রদূত


প্রাচ্যবাদে ফেরা যাক। Origins of Muhammadan Jurisprudence গ্রন্থে শান্ত লিখেছেন,
“বিগত প্রজন্মের ইসলামিক স্টাডিজের গুরুদের প্রতি আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। এই গ্রন্থে সুক হারগ্রোনয়ের নাম খুব একটা নেওয়া হয়নি; কিন্তু আজ মুহাম্মাদি বিধানের[১] (Muhammedan Law) প্রকৃতি যদি আমরা বুঝে থাকি, তাহলে সেটি তার অবদান।”[২]
কিন্তু কে এই সুক হারগ্রোনয়ে? তিনি একজন প্রাচ্যবিদ, যার লক্ষ্য ছিল ইন্দোনেশিয়ার সাধারণ মুসলিমদের ফাঁদে ফেলা। তারা যাতে ওলন্দাজদের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন মেনে নেয়, সেজন্য তিনি হাঁক ছাড়লেন—
“ইসলাম শান্তির ধর্ম... আর শরিয়ত মোতাবেক সকল মুসলিমের দায়িত্ব হলো শাসকের (ওলন্দাজদের) আদেশ মান্য করা। অবাধ্য হওয়া যাবে না, সহিংস হওয়া চলবে না।”[৩]
এরপর তার এই গীত আরও মানুষের কানে পৌঁছানোর জন্য তিনি মক্কায় যান। নিজ উদ্দেশ্য থেকে একচুলও না সরে সেখানে তিনি নিজেকে মুসলিম দাবি করেন এবং গণমানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা চালান। এডওয়ার্ড সাইদ একে অভিহিত করেছেন 'ঔপনিবেশিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক অভিযান' হিসেবে। তিনি আরও বলেছেন-
...বহুল পূজিত ওলন্দাজ প্রাচ্যবিদ ক্রিস্টিয়ান সুক হারগ্রোনয়ে সুমাত্রার অ্যাতসেনিজ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নির্মম ডাচ যুদ্ধ উসকে দেওয়ার জন্য মুসলিমদের কাছ থেকে অর্জিত আস্থার সদ্ব্যবহার করেন।[৪]
অথচ এতকিছুর পরেও পশ্চিমাদের কাছে তিনি ইসলামি আইন গবেষণার একজন পথিকৃৎ। ঘটনা একেবারেই পরিষ্কার। ইহুদিধর্মের প্রতি বিরূপ মনোভাব রাখার অভিযোগ এনে বিশেষজ্ঞদের পদচ্যুত, বাতিল এবং অস্বীকার করা হয়। অথচ স্ট্রাগনেলের বিশ্বাসের বিরোধিতা করা ইহুদিরাই আবার মুসলিমদের সংস্কৃতি এবং স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে ইসরায়েলের গোঁড়ামির ব্যাপারে উদাসীন। হারগ্রোনয়ে-সহ ঔপনিবেশিকদের আরও অনেক দালাল ও যাজকগোষ্ঠীর গোঁড়ামি এর চেয়েও প্রকট। আর তা কেবল কথায় না; বরং প্রতারণা এবং প্রত্যক্ষ সামরিক শক্তি প্রয়োগে প্রতীয়মান। অথচ কতটা সহজে তারা তা উপেক্ষা করে যায়। এদিকে পশ্চিমা মহলে 'প্রাচ্যবাদের অগ্রদূত' হিসেবে তাদের অবস্থান অক্ষতই রয়ে যায়।

টিকাঃ
১. Muhammadan law বলতে এখানে মূলত ইসলামি বিধান বোঝাচ্ছে। প্রাচ্যবিদরা অনেক ক্ষেত্রে Muhammadan, Mohamedan ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে বোঝাতে চান যে-ইসলাম আসলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বানানো কোনো ধর্ম। অথচ ইসলামকে 'মুহাম্মাদি' বা 'মোহামেডান' হিসেবে অভিহিত করা অন্যায়। কারণ অ্যাকাডেমিকভাবে অধ্যয়ন করলে জানা যায়-ইসলামের কোনো বিধানই তিনি নিজে আনার দাবি করেননি; বরং তিনি ছিলেন আল্লাহর সর্বশেষ বার্তাবাহক; যিনি সনাতন একত্ববাদের বাণী আল্লাহর নির্দেশে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। প্রধান ধর্মগুলোর মধ্যে মূলত ইসলাম বাদে আর কোনোটিকেই এর প্রবক্তা, জাতি কিংবা সূচনাস্থানের নাম ছাড়া উল্লেখ করা যায় না। এর একটি মৌলিক কারণ হলো, সেগুলোর বিকৃত হয়ে যাওয়া ধর্মগ্রন্থে ধর্মের নামই নেই। এগুলো সবই মানবসৃষ্ট। সেখান থেকেই শাস্ত্র-এর মতো প্রাচ্যবিদরা হয়তো খ্রিস্টের খ্রিস্টধর্মের মতো ইসলামকেও মুহাম্মাদি/ মোহামেডান ইত্যাদি নামে ডেকে নিজেদের মতো নাম-ঠিকানাহীন অবস্থানে নামাতে চান। অথচ তাদের জন্য একটি আয়াতই যথেষ্ট, “নিশ্চয় আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন হলো ইসলাম। বস্তুত যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছিল, তারা জ্ঞান লাভের পরও একে অন্যের ওপর প্রাধান্যলাভের জন্য মতভেদ সৃষ্টি করেছে।” (সুরা আলি-ইমরান, আয়াত: ১৯)—অনুবাদক
২. Joseph Schacht, The Origins of Muhammadan Jurisprudence, 2nd edition, Oxford Univ. Press, 1959, Preface.
৩. ইসমাইল আল-উসমানি, মাসিক আল-মিশকাত, ওয়াইদা, মরক্কো, সংখ্যা ৮, ১৪১৯ হিজরি, পৃষ্ঠা: ২৮-৯
৪. Edward Said, Covering Islam, Pantheon Books, New York, 1981

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00