📄 ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলি নিগ্রহ
স্কটল্যান্ডের স্টার্লিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মবিদ্যার অধ্যাপক কিথ হুইটলামের একটি গবেষণাপত্র বাইবেল বিশেষজ্ঞ মহলে ব্যাপক বিতর্কের সূত্রপাত ঘটায়। কারণ তাতে দাবি করা হয়েছে-বাইবেলের বিশেষজ্ঞ, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং বিশেষত তাদের মধ্যকার জায়োনিস্ট বা ইহুদিবাদীরা নিজেদের মতো করে ইহুদীদের ইতিহাস সাজিয়েছেন। এ কাজ করতে গিয়ে ইসরায়েলিদেরও বহু পূর্বেকার অধিবাসী অর্থাৎ প্রাচীন ফিলিস্তিনিদের ইতিহাস অস্বীকার করেছেন তারা। [১] ১৯৪৮ সাল[২] থেকে ইসরায়েলি গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল কেবল এই ভূমির ওপর প্রাচীন ইসরায়েলের একচ্ছত্র অধিকারের পক্ষে স্তুতি গাওয়া এবং এই এলাকার অন্য সব ইতিহাস-সংস্কৃতিকে অবমূল্যায়ন ও উৎপাটন করা।[৩] যেমন বাইবেল পণ্ডিতরা ফিলিস্তিনিদের বর্তমান বাসভূম থেকে বঞ্চিত করার জন্য তাদের আদি ইতিহাস অস্বীকার করে। হুইটলাম এই কথাই বলেছেন-
ফিলিস্তিনিদের বর্তমান কিংবা অতীত অস্তিত্বকে অস্বীকার করার জন্য বুদ্ধিগত, অর্থনৈতিক এবং সামরিক শক্তি মিলে যে জটিল নকশা বুনছে, তার কিছু ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে বাইবেলীয় গবেষণা (Biblical studies)।[৪]
তার বিরোধিতা করে হার্শেল শ্যাংকস সেই অঞ্চলের বিভিন্ন অ-ইসরাইলি সংস্কৃতির বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন, যেগুলো সম্প্রতি বিশেষজ্ঞ মহলের মনোযোগ পাচ্ছে। যেমন : ফিলিস্তিনি (Philistine), এদোমি, মোয়াবি, আরামি, হুরিয়ানি এবং কেনানি সংস্কৃতি। হুইটলামের বিরুদ্ধে তিনি ইতিহাস নিয়ে রাজনীতি করার অভিযোগ তোলেন। শেষে বলেন, জায়োনবাদী বিশেষজ্ঞরা নিজেদের অতীত অবস্থান থেকে সরে এসে বস্তুনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে, কিন্তু হুইটলাম তেমনটি (বস্তুনিষ্ঠ) নন।[৫]
পুরো পর্যালোচনায় হার্শেল শ্যাংকস একটি বারের জন্যও ইসলামি ইতিহাস বা তৎসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে বিশেষজ্ঞ-মনোযোগের কথা উল্লেখ করেননি। পাঠ শেষে আমি তাই যারপরনাই বিস্মিত হয়েছি। এটিই কি সেই ‘জটিল নকশা’র অংশ নয়, যার কথা হুইটলাম বলেছেন? এর মাধ্যমেই কি ফিলিস্তিনিদের প্রাপ্য অধিকার এবং ঠিকানা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে না? ফিলিস্তিনিদের আত্মপরিচয় অঙ্গাঙ্গীভাবে মিশে আছে কোন সংস্কৃতির সাথে—কেনানি, নাকি মুসলিম? কেন এই বিষয়টিকে আগা-গোড়া উপেক্ষা করা হলো? শেষে এসে শ্যাংকস ফিলিস্তিনিদের আদি আচার-সংস্কৃতির প্রতি একমত হলেও তাদের বাসভূমের ইতিহাসের সাথে ধর্মের প্রাপ্য স্বীকৃতি দিতে নারাজ। শুধুই প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ১৪০০ বছরের মুসলিম সংস্কৃতিকে পশ্চিমা এবং ইসরােলি পণ্ডিতরা কেবল আবর্জনা হিসেবে দেখেন, যেগুলো পরিষ্কার করে তবেই তাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছতে হবে।
টিকাঃ
১. H. Shanks, ‘Scholar Claims Palestinian History is Suppressed in Favor of Israelites’, Biblical Archaeology Review, March/April 96, vol. 22, no. 2, p. 54. ‘হুইটলামের অভিসন্দর্ভ এতই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয় যে, সেটা সোসাইটি অব বিবলিক্যাল লিটারেচার, আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব রিলিজান, এবং আমেরিকান স্কুলস অব ওরিয়েন্টাল রিসার্চের যৌথ অর্থায়নে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থাপন করা হয়।’ (ibid, p. 54.)
২. ১৯৪৮ সালে অবৈধভাবে ইহুদিবাদী ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।—অনুবাদক
৩. ibid, p. 56.
৪. ibid, p. 56, quoting Keith Whitelam.
৫. ibid, p. 69.
📄 প্রতারক প্রাচ্যতাত্ত্বিক অগ্রদূত
প্রাচ্যবাদে ফেরা যাক। Origins of Muhammadan Jurisprudence গ্রন্থে শান্ত লিখেছেন,
“বিগত প্রজন্মের ইসলামিক স্টাডিজের গুরুদের প্রতি আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। এই গ্রন্থে সুক হারগ্রোনয়ের নাম খুব একটা নেওয়া হয়নি; কিন্তু আজ মুহাম্মাদি বিধানের[১] (Muhammedan Law) প্রকৃতি যদি আমরা বুঝে থাকি, তাহলে সেটি তার অবদান।”[২]
কিন্তু কে এই সুক হারগ্রোনয়ে? তিনি একজন প্রাচ্যবিদ, যার লক্ষ্য ছিল ইন্দোনেশিয়ার সাধারণ মুসলিমদের ফাঁদে ফেলা। তারা যাতে ওলন্দাজদের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন মেনে নেয়, সেজন্য তিনি হাঁক ছাড়লেন—
“ইসলাম শান্তির ধর্ম... আর শরিয়ত মোতাবেক সকল মুসলিমের দায়িত্ব হলো শাসকের (ওলন্দাজদের) আদেশ মান্য করা। অবাধ্য হওয়া যাবে না, সহিংস হওয়া চলবে না।”[৩]
এরপর তার এই গীত আরও মানুষের কানে পৌঁছানোর জন্য তিনি মক্কায় যান। নিজ উদ্দেশ্য থেকে একচুলও না সরে সেখানে তিনি নিজেকে মুসলিম দাবি করেন এবং গণমানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা চালান। এডওয়ার্ড সাইদ একে অভিহিত করেছেন 'ঔপনিবেশিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক অভিযান' হিসেবে। তিনি আরও বলেছেন-
...বহুল পূজিত ওলন্দাজ প্রাচ্যবিদ ক্রিস্টিয়ান সুক হারগ্রোনয়ে সুমাত্রার অ্যাতসেনিজ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নির্মম ডাচ যুদ্ধ উসকে দেওয়ার জন্য মুসলিমদের কাছ থেকে অর্জিত আস্থার সদ্ব্যবহার করেন।[৪]
অথচ এতকিছুর পরেও পশ্চিমাদের কাছে তিনি ইসলামি আইন গবেষণার একজন পথিকৃৎ। ঘটনা একেবারেই পরিষ্কার। ইহুদিধর্মের প্রতি বিরূপ মনোভাব রাখার অভিযোগ এনে বিশেষজ্ঞদের পদচ্যুত, বাতিল এবং অস্বীকার করা হয়। অথচ স্ট্রাগনেলের বিশ্বাসের বিরোধিতা করা ইহুদিরাই আবার মুসলিমদের সংস্কৃতি এবং স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে ইসরায়েলের গোঁড়ামির ব্যাপারে উদাসীন। হারগ্রোনয়ে-সহ ঔপনিবেশিকদের আরও অনেক দালাল ও যাজকগোষ্ঠীর গোঁড়ামি এর চেয়েও প্রকট। আর তা কেবল কথায় না; বরং প্রতারণা এবং প্রত্যক্ষ সামরিক শক্তি প্রয়োগে প্রতীয়মান। অথচ কতটা সহজে তারা তা উপেক্ষা করে যায়। এদিকে পশ্চিমা মহলে 'প্রাচ্যবাদের অগ্রদূত' হিসেবে তাদের অবস্থান অক্ষতই রয়ে যায়।
টিকাঃ
১. Muhammadan law বলতে এখানে মূলত ইসলামি বিধান বোঝাচ্ছে। প্রাচ্যবিদরা অনেক ক্ষেত্রে Muhammadan, Mohamedan ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে বোঝাতে চান যে-ইসলাম আসলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বানানো কোনো ধর্ম। অথচ ইসলামকে 'মুহাম্মাদি' বা 'মোহামেডান' হিসেবে অভিহিত করা অন্যায়। কারণ অ্যাকাডেমিকভাবে অধ্যয়ন করলে জানা যায়-ইসলামের কোনো বিধানই তিনি নিজে আনার দাবি করেননি; বরং তিনি ছিলেন আল্লাহর সর্বশেষ বার্তাবাহক; যিনি সনাতন একত্ববাদের বাণী আল্লাহর নির্দেশে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। প্রধান ধর্মগুলোর মধ্যে মূলত ইসলাম বাদে আর কোনোটিকেই এর প্রবক্তা, জাতি কিংবা সূচনাস্থানের নাম ছাড়া উল্লেখ করা যায় না। এর একটি মৌলিক কারণ হলো, সেগুলোর বিকৃত হয়ে যাওয়া ধর্মগ্রন্থে ধর্মের নামই নেই। এগুলো সবই মানবসৃষ্ট। সেখান থেকেই শাস্ত্র-এর মতো প্রাচ্যবিদরা হয়তো খ্রিস্টের খ্রিস্টধর্মের মতো ইসলামকেও মুহাম্মাদি/ মোহামেডান ইত্যাদি নামে ডেকে নিজেদের মতো নাম-ঠিকানাহীন অবস্থানে নামাতে চান। অথচ তাদের জন্য একটি আয়াতই যথেষ্ট, “নিশ্চয় আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন হলো ইসলাম। বস্তুত যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছিল, তারা জ্ঞান লাভের পরও একে অন্যের ওপর প্রাধান্যলাভের জন্য মতভেদ সৃষ্টি করেছে।” (সুরা আলি-ইমরান, আয়াত: ১৯)—অনুবাদক
২. Joseph Schacht, The Origins of Muhammadan Jurisprudence, 2nd edition, Oxford Univ. Press, 1959, Preface.
৩. ইসমাইল আল-উসমানি, মাসিক আল-মিশকাত, ওয়াইদা, মরক্কো, সংখ্যা ৮, ১৪১৯ হিজরি, পৃষ্ঠা: ২৮-৯
৪. Edward Said, Covering Islam, Pantheon Books, New York, 1981