📄 কোনো অ্যান্টি-সেমিটিক গ্রন্থের যথার্থতা
অ্যাসিরিওলজির[১] একজন প্রবক্তা এবং খ্রিষ্টান পন্ডিত ফ্রেডরিখ ডিলিৎশ ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রথিতযশা বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি নিজেও আংশিক ইহুদি বংশোদ্ভূত।[২] কিন্তু ওল্ড টেস্টামেন্ট সম্পর্কে তার মতামত খুব একটা প্রীতিকর নয়:
ওল্ড টেস্টামেন্ট হলো বিভ্রান্তির কারখানা। বিশ্বাসের অযোগ্য, অনির্ভরযোগ্য চরিত্র ও বর্ণনা; মিথ্যা চিত্রায়ণ, ভ্রান্তিযুক্ত সম্পাদনা, সংস্করণ, পরিবর্তন, স্থানবিনিময়, এবং অ্যানাক্রোনিজমের[৩] জগাখিচুড়ি বলা চলে একে। এছাড়া পরস্পর সাংঘর্ষিক বিবরণ, অনৈতিহাসিক আবিষ্কার এবং লোককথা তো আছেই। এককথায়, ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত প্রবঞ্চনা, স্ববিরোধী এবং অতিবিপজ্জনক একটি গ্রন্থ। তাই তা ব্যবহারের সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন।[৪]
তার বিপক্ষে লাগাতার ইহুদিবিদ্বেষের তকমা লাগানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি বরাবরই নাকচ করে গেছেন।
'কিন্তু তার কিছু মন্তব্য (যেখানে তিনি ইহুদিদের "জার্মানদের জন্য ভয়ানক বিপদ" বলেছেন) বিবেচনা করলে আনিত অভিযোগ যথাযোগ্য মনে হয়।'[৫]
ওল্ড টেস্টামেন্টের ওপর ডিলিৎশের রচিত গ্রন্থ Die Grosse Tauschung-এর ব্যাপারে জন ব্রাইট লিখেছেন—
এই গ্রন্থের মতো ওল্ড টেস্টামেন্টকে এভাবে আক্রোশপূর্ণভাবে অসম্মান করার উদাহরণ খুব একটা নেই। এটি আসলেই খুব বাজে একটি বই ('অসুস্থ' বললেও ভুল হবে না)।[৬]
ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রকাশ্য বিরোধিতা এবং খ্রিষ্টধর্মকে এর থেকে পৃথক করার তাঁর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন ডিলিৎশ। ফলে তার লিখিত গ্রন্থ এখন বাতিল। ইহুদিবিদ্বেষের মতো তকমা তার মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
টিকাঃ
১. অ্যাসিরিওলজি হলো প্রাচীন অ্যাসিরীয় ভাষা, ইতিহাস এবং পুরাকীর্তির অধ্যয়ন।--অনুবাদক
২. John Bright, The Authority of the Old Testament, Abingdon Press, Nashville, 1967, pp. 65-66.
৩. ভুল কালক্রম নির্ধারণ।—অনুবাদক
৪. ibid., p. 66, quoting Friedrich Delitzsch, Die Grosse Tauschung (1920).
৫. ibid., p. 67, footnote 21.
৬. ibid. p. 65.
📄 ইহুদিদের বিষয়বস্তু নিয়ে ইহুদিধর্ম-বিরোধী (Anti-Judaic) বিশেষজ্ঞ কি নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারেন?
হার্ভার্ডের অধ্যাপক জন স্ট্রাগনেল ১৯৮৭ সালে ডেড সি স্ক্রোল সম্পাদনা পর্ষদের প্রধান সম্পাদকের পদে আসীন হন; কিন্তু তিন বছর পরেই বেশ ঘটা করে অপসারণ করা হয় তাকে। সমস্যার শুরুটা হয় ইসরায়েলি সাংবাদিক আভি কাৎজমানকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারকে ঘিরে (Ha'aretz, 9 Nov, 1990)। ম্যানিক ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হয়ে তিনি সেখানে ইহুদিধর্ম-বিরোধী কিছু চিন্তা ব্যক্ত করেন। যেমন: ইহুদিদের ধর্মকে তিনি 'ভয়াবহ' এবং প্রাথমিকভাবে বর্ণবাদী হিসেবে অভিহিত করেছেন। এছাড়াও বলেছেন, ইহুদি-সমস্যার সেরা সমাধান হলো—গণহারে খ্রিষ্টধর্মগ্রহণ। যদিও মন্তব্যগুলোর উদ্দেশ্য ইহুদি-বিদ্বেষ ছড়ানো নয় বলে সাক্ষাৎকারগ্রহণের শুরুতে উল্লেখ করেন তিনি; কিন্তু কাৎজমান সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে খোলাখুলি এর সমালোচনা করলেন। স্ট্রাগনেল এতে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, 'জনাব কাৎজমান হয়তো উদ্বিগ্ন এ ভেবে যে, খ্রিষ্টান গবেষণা বোধহয় ইহুদিদের স্ক্রোলগুলোর ব্যাপারে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবে না... এসব টেক্সট নিয়ে ইহুদি বিশেষজ্ঞরা কেন কাজ করছে না দেখে শিফম্যানের (নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের) মতো লোকেরা যখন হা-হুতাশ করেন, তখন অবাক না হয়ে পারি না।' [১]
এই প্রবন্ধের পর তাকে পদচ্যুত করা হয়। অনেক বছর পরেও আরোপিত ইহুদিজাতি-বিদ্বেষের (anti-semitism) অভিযোগ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। এর বদলে ইহুদিধর্ম-বিরোধী (anti-Judaist) হিসেবে পরিচয় দেন নিজেকে। অর্থাৎ ইহুদি ব্যক্তি বা জনগণের বিরুদ্ধে নয়; বরং শুধু ইহুদিধর্মের বিরুদ্ধে তার অবস্থান।
'ইহুদিধর্মকে পছন্দ করা না করা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আসলে খ্রিষ্টানদের ধর্মের আরও ভালো চাই আমি। আমি চাই যিশুর রাজত্ব আরও গৌরবান্বিত হোক। বিশ মিলিয়ন ইহুদি যদি সেই দলে যোগ দান করে, তাহলে তা সহজেই হয়ে যায়।[২] খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস টিকিয়ে রাখার জন্য ডেড সি স্ক্রোলগুলোর ধর্মতাত্ত্বিক গুরুত্ব নিশ্চয় অধ্যাপক স্ট্রাগনেল জানতেন। না হলে প্রধান সম্পাদক হওয়া যেত না। তার পদচ্যুতি কোনোভাবেই তার অযোগ্যতার কারণে হয়নি। কিংবা তার তত্ত্বাবধানে থাকা পান্ডুলিপিগুলোর প্রতি অবিশ্বাস বা অসম্মানের কারণেও না। তার মতে, ইহুদিরা আসলে একজন যিশুপ্রেমী গবেষককে ইহুদি-নথি গবেষণার জন্য যথেষ্ট নিরপেক্ষ বলে মানতে পারছিল না। তাই তার যোগ্যতা পুরোপুরি উপেক্ষা করে শুধু ধর্মীয় বৈপরীত্যের কারণে তাকে বাদ দেওয়া হয়।
টিকাঃ
১. H. Shanks, ‘Ousted Chief Scroll Editor Makes His Case: An Interview with John Strugnell', Biblical Archaeology Review, July/Aug. 94, vol. 20, no. 4, pp. 41-42.
২. ibid, p. 43. তার একটা উল্লেখযোগ্য দাবি হলো 'প্যারিসের কার্ডিনাল আর্চবিশপ একজন ইহুদি। তিনি তার অ-ইহুদি আর্চডাইওসিসের সাথে দারুণ মানিয়ে চলছেন।' (p. 43)
📄 ইহুদি-বিশেষজ্ঞ হলেই কি যেকোনো ইহুদি-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে গবেষণা করা যায়?
এ-পর্যন্ত আমরা দুটি ঘটনা দেখেছি, যেখানে ইহুদি-বিদ্বেষের অভিযোগ তুলে যোগ্যতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের ইহুদিদের বিষয়াবলি নিয়ে গবেষণা করা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে; কিন্তু এবার খোদ ইহুদি বিশেষজ্ঞদের অবস্থা সম্পর্কে জানা যাক। স্পর্শকাতর বিষয়গুলো ক্ষেত্রে অনুসন্ধান চালানোর জন্য তাদের কি যোগ্যতাসম্পন্ন মনে করা হয়?
১৯৪৭ সাল থেকে ডেড সি স্ক্রোলগুলো আবিষ্কার হওয়া শুরু হয়। প্রধান সম্পাদনা দল ১৯৫০ সালের শেষভাগে পুরো টেক্সটের প্রতিলিপিকরণ (পূর্ণ নির্ঘণ্টসহ) সম্পন্ন করলেও সেগুলো গোপন থাকে। এমনকি এর অস্তিত্ব সম্পর্কেও জানত না কেউ। চল্লিশ বছর লাগিয়ে তারা টেক্সটের মাত্র ২০ শতাংশ প্রকাশ করে। ২৫ বছর পর Biblical Archaeology Review-এর সম্পাদক হার্শেল শ্যাংকস Israel Antiquities Department (IAD) এর কাছে নির্ঘণ্ট চেয়ে চাপ সৃষ্টি করেন; কিন্তু এ-ব্যাপারে কিছুই জানেন না বলে তাকে অবগত করেন সেখানকার পরিচালক।[১] পরে অ্যাকাডেমিক মহল থেকে একটি প্রতিরূপ সংস্করণের জন্য চাপ প্রদান করা হয়। তথাপি স্ক্রোল সম্পাদকরা তাদের একরোখা নীতি অব্যাহত রাখেন, যাতে অনুসন্ধানের ওপর তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকে।[২]
লাগাতার সমালোচনার ফলে IAD-এর পরিচালক জেনারেল আমির দ্রোরি ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে গড়িমসি করে একটি প্রেস রিলিজ প্রকাশ করেন। ক্রোলের ছবিগুলো সীমিত পরিসরে উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয় তাতে।[৩]
যে কারও জন্য টেক্সট উন্মুক্ত করে দিলে এর 'প্রকৃত ব্যাখ্যা' হুমকির মুখে পড়ার সম্ভাবনা থেকে যায় বলে জেনারেল দ্রোরি ঘোষণা করেন... পূর্বেও অপ্রকাশিত টেক্সটের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য এই জোটের মরণপণ চেষ্টা ছিল দেখার মতো। তাদের জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন করার দুঃসাহস করলে কঠিন রকমের তাচ্ছিল্য জোটার ব্যাপারটিও চোখে বাজে।[৪]
পর্ষদের একজন জ্যেষ্ঠ সম্পাদক, নটর ডেম ইউনিভার্সিটির ইউজিন উলরিখ বলেন, 'সেস্ক্রালের সম্পাদনা নিয়ে মূলত দেরি নয়; বরং অযথা তাড়াহুড়ো করে ক্ষতি করা হয়েছে।'[৫] কোনো গড়পড়তা অধ্যাপক এই সম্পাদনা পর্ষদের কাজকে মূল্যায়ন করার যোগ্য নন বলে দাবি করেন তিনি। অর্থাৎ বরাবরের মতো শুধু তাদের নির্ধারিত সম্পাদক এবং তাদের ছাত্ররাই এর যোগ্য বলে তারা বিশ্বাসী।
Scientific American ম্যাগাজিনকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে (প্রধান সম্পাদক) বলেছেন, অপ্রকাশিত স্ক্রোলগুলো নিরীক্ষা করে দেখার জন্য অক্সফোর্ডের শিক্ষক গেজা ভারমেস 'যোগ্য' নন। কারণ তিনি এরকম ভারী কাজ আগে করেননি।
উল্লেখ করা জরুরি, ডেড সি ক্রোলের ওপর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করে ভারমেস ভালোরকমের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। বহুল ব্যবহৃত পেঙ্গুইন সংস্করণ The Dead Sea Scrolls in English এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে এটির তৃতীয় সংস্করণ বাজারে চলমান। Scientific American-এর হয়ে সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী তাই অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন: 'একজন অক্সফোর্ডের অধ্যাপক অযোগ্য?' আমরাও একইরকম বিস্মিত।[৬]
অবিশ্বাস তৈরি হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ প্রকৃত প্রশ্ন যোগ্যতা নিয়ে নয়। উদ্দেশ্য আসলে ‘প্রকৃত ব্যাখ্যা’র দড়িটা নিজেদের হাতে রাখা। পরিকল্পনা অনুযায়ী তাই অ্যাকাডেমিকদের দূরে রাখা আবশ্যক। তারা ইহুদী-অইহুদী নির্বিশেষে সকল প্রকার গবেষণাকে অস্বীকার এবং অবজ্ঞা করে গেছে এক বিশেষ উদ্দেশ্যে। পক্ষপাতিত্বের এর চেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ আর কী হতে পারে? [৭]
ইহুদীদের স্পর্শকাতর বিষয়বস্তু ও গবেষণাকর্ম থেকে বিপরীত মতাদর্শধারী গবেষকদের বাদ দেওয়ার (জীবিতদের শারীরিকভাবে, মৃতদের অ্যাকাডেমিকভাবে) তিনটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো মাত্র। শুধু যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপ ও আমেরিকাতেই এরকম উদাহরণ আছে আরও ডজন ডজন। গবেষণার বিষয়বস্তুর ওপর তাদের প্রসিদ্ধি কিংবা দক্ষতা কোনোকিছুই এক্ষেত্রে দেখা হয়নি। শুধু বিশ্বাসের অমিলের ভিত্তিতেই তাদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। একই দৃষ্টিভঙ্গি মুসলিমদের ক্ষেত্রে কতটুকু খাটানো হয়েছে?
টিকাঃ
১. Hershel Shanks, 'Scholars, Scrolls, Secrets and "Crimes", New York Times, ? September 1991, appeared as figure 18 in Eisenman and Robinson. A Facsimile Edition of the Dead Sea Scrolls, Publisher's Forward, First printing, 1991, p. xli. উল্লেখ্য, দ্বিতীয় (এবং সম্ভবত পরবর্তী সকল) প্রকাশে এগুলো সব বাদ দেওয়া হয়েছে।
২. A Facsimile Edition of the Dead Sea Scrolls, Publisher's Forward, p. xxi.
৩. ibid, p. xii.
৪. ibid, p. xiii.
৫. ibid, p. xiv.
৬. ibid, p. xiv.
৭. পূর্ববর্তী সকল উদ্ধৃতি গ্রন্থটির প্রথম প্রকাশ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে; কিন্তু দ্বিতীয় প্রকাশ থেকে সেগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৯১ সালে The Biblical Archaeological Society সফলতার সাথে A Facsimile Edition of the Dead Sea Scrolls প্রকাশ করে। ফলে বেশ প্রশংসার পাশাপাশি স্ক্রোল সম্পাদকদের বিরোধিতার মুখোমুখিও হতে হয়। দ্বিতীয় প্রকাশে হার্শেল শ্যাংকসের ৩৬ পৃষ্ঠার মূল মুখবন্ধ কমে মাত্র ২ পৃষ্ঠায় পরিণত হওয়া দেখে আমি কেবল হতবিহ্বল হয়ে যাই। বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে কোনো প্রকার সংগত নোটও যুক্ত করা হয়নি।