📄 প্রথম শতাব্দীতে পরিপূর্ণ সংকলনের অস্তিত্বের পক্ষে সানআ খণ্ডাংশই কি একমাত্র প্রমাণ?
পুইনের মূল বক্তব্য দুটি পরস্পর গ্রন্থিত। কুরআন সংকলন তৃতীয় শতাব্দীতে সম্পূর্ণ হওয়ার মত খারিজ করে তিনি প্রথম শতাব্দীর মত প্রতিষ্ঠা করেন; কিন্তু শুধু 'প্রথম শতাব্দী' বাদে আর কিছু উল্লেখ না করার ফলে বিষয়টি একটি বিশাল অনির্দিষ্ট সময়পরিসরের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
প্রাচ্যবিদদের সবাই কিন্তু কুরআনকে তৃতীয় শতাব্দীতে সংকলিত বলেন না। রেভারেন্ড মিংগানার মতোই অনেকের মতে তা প্রথম শতাব্দীতে সংকলিত। মুইরের মতো বহু প্রাচ্যবিদ বর্তমান মুসহাফকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়কার পাঠ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেছেন। আবার হাজ্জাজকে (মৃত্যু: ৯৫ হিজরি) অনেক পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ কুরআনের চূড়ান্ত সংকলনকারী মনে করেন। এগুলো সবই প্রথম শতাব্দীর পক্ষে মত; কিন্তু পুইন কোনো নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ না করায় সবগুলোর মতের জন্যই দরজা খোলা থাকে। বিশেষজ্ঞ গবেষণার বৈশিষ্ট্য হলো সূক্ষ্মতা, এটা থাকতেই হবে। ১১ হিজরিতে নবিজির ওফাতের সাথে ওহি আগমন-ধারার পরিসমাপ্তি ঘটে। বিদ্যমান কুরআনকে প্রত্যক্ষ বা বাহ্যিকরূপে খলিফা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আমলে (মৃত্যু: ১৩ হিজরি) একত্র করা হয়। এরপর খলিফা উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রমিত বানান নির্দিষ্ট করে তা বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করেন (২৫-৩০ হিজরি)। এই হলো মুসলিমদের দৃষ্টিকোণ। মুসলিমরা কখনোই কুরআনকে উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর তত্ত্বাবধানে সর্বপ্রথম সংকলিত হওয়ার দাবি করে না। তাই পুইন যদি এমন কিছু ইঙ্গিত করেন, তাহলে তা অবশ্যই মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব করে না।
পৃথিবীর বিভিন্ন পাঠাগারে কয়েক ডজন কুরআনের পাণ্ডুলিপি আছে, যেগুলো প্রথম শতাব্দীতে লেখা।[১] আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায় সম্পূর্ণ বা আংশিক অবস্থায় বিশ্বজুড়ে কুরআনের প্রায় ২.৫ লক্ষ মুসহাফ রয়েছে।[২] নিচে প্রথম শতাব্দীর তারিখযুক্ত কিছু পান্ডুলিপির তালিকা দেওয়া হলো। এক্ষেত্রে আমি কে. আওয়াদের গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়েছি।[৩] তার নিজস্ব তালিকা (বোল্ড অক্ষরে) থেকে শুধু প্রথম শতাব্দীর মুসহাফগুলো বেছে নিয়ে নাম অনুযায়ী তালিকাটিকে পুনর্বিন্যস্ত করেছি[৪]_
১. (১) খলিফা উসমান ইবনু আফফানের বলে ধারণাকৃত একটি অনুলিপি। আমানাত খিজানা, তোপকাপি সারাই, ইস্তাম্বুল, নম্বর ১।
২. (২) উসমান ইবনু আফফানের বলে ধারণাকৃত আরেকটি অনুলিপি। আমানাত খিজানা, তোপকাপি সারাই, নম্বর ২০৮। এই অনুলিপির প্রায় ৩০০টি ফোলিও আছে এবং এর শুরু ও শেষ উভয় দিক থেকে কিছু অংশ পাওয়া যায়নি।
৩. (৩) উসমান ইবনু আফফানের বলে ধারণাকৃত আরেকটি। আমানাত খিজানা, তোপকাপি সারাই, নম্বর ১০। এর পাতা মাত্র ৮৩টি। লিপিকারের নাম লেখা, তুর্কি ভাষায় টীকাও রয়েছে এতে।
৪. (১২) ইস্তাম্বুলের মিউজিয়াম অব ইসলামিক আর্টে থাকা অনুলিপি, যা খলিফা উসমানের বলে ধারণাকৃত। শুরু, মধ্যখান ও শেষে কিছু পাতা পাওয়া যায়নি। ড. আল-মুনাজ্জিদ একে প্রথম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের বলে অভিহিত করেছেন।
৫. (৪৩) খলিফা উসমানের বলে ধারণাকৃত অনুলিপি, তাসখন্দ, ৩৫৩ পৃষ্ঠা যুক্ত।
৬. (৪৬) এক হাজার পৃষ্ঠা সম্বলিত একটি বড় অনুলিপি, যা ২৫-৩১ হিজরির মাঝে লেখা হয়। রাওয়াক আল-মাগারিবা, আল-আজহার, কায়রো।
৭. (৫৮) খলিফা উসমানের বলে ধারণাকৃত। দ্য ইজিপশিয়ান লাইব্রেরি, কায়রো।
৮. (৪) প্যালিম্পসেস্টে লিখিত এবং খলিফা আলি ইবনু আবি তালিবের বলে ধারণাকৃত। মুজেসি কুতুফানেসি, তোপকাপি সারাই, নম্বর ৩৬ ই. এইচ. ২৯। এর পাতা ১৪৭টি।
৯. (৫) খলিফা আলির বলে ধারণাকৃত। আমানাত খিজানা, তোপকাপি সারাই, নম্বর ৩৩। পাতা মাত্র ৪৮টি।
১০. (১১) খলিফা আলির বলে ধারণাকৃত। আমানাত খিজানা, তোপকাপি সারাই, নম্বর ২৫ ই. এইচ. ২। পাতাসংখ্যা ৪১৪।
১১. (৩৭) খলিফা আলির বলে ধারণাকৃত। রাজা লাইব্রেরি, রামপুর, ইন্ডিয়া, নম্বর ১। পাতাসংখ্যা ৩৪৩।
১২. (৪২) খলিফা আলির হিসেবে ধারণাকৃত। সানআ, ইয়েমেন।
১৩. (৫৭) খলিফা আলির হিসেবে ধারণাকৃত। আল-মাশহাদ আল-হুসাইনি, কায়রো।
১৪. (৮৪) খলিফা আলির হিসেবে ধারণাকৃত। ১২৭ পাতা। নাজাফ, ইরাক।
১৫. (৮৫) খলিফা আলির হিসেবে ধারণাকৃত। এটাও ইরাকের নাজাফে।
১৬. (৮০) হুসাইন ইবনু আলির (মৃত্যু: ৫০ হিজরি) বলে ধারণাকৃত। ৪১ পাতা, মাশহাদ, ইরান।
১৭. (৮১) হাসান ইবনু আলির হিসেবে ধারণাকৃত। ১২৪ পাতা, মাশহাদ, ইরান, নম্বর ১২।
১৮. (৮৬) হাসান ইবনু আলির বলে ধারণাকৃত। ১২৪ পাতা, নাজাফ, ইরাক।
১৯. (৫০) ৩৩২ পাতা সম্বলিত একটি অনুলিপি, যা খুব সম্ভবত প্রথম শতাব্দীর প্রথমার্ধের শুরুর দিকের। দ্য ইজিপশিয়ান লাইব্রেরি, কায়রো, ১৩৯ নং মাসাহিফ।
২০. (৬) খুদাইজ ইবনু মুয়াওয়িয়ার (মৃত্যু: ৬৩ হিজরি) হিসেবে দাবিকৃত এবং ৪৯ হিজরিতে লিখিত। আমানার খিজানা, তোপকাপি সারাই, নম্বর ৪৪। এতে ২২৬টি পাতা আছে।
২২. (৮) কুফীয় লিপিতে ৭৪ হিজরিতে লিখিত একটি মুসহাফ। আমানাত খিজানা, তোপকাপি সারাই, নম্বর ২। এতে ৪০৬টি পাতা আছে।
২৩. (৪৯) ৭৭ হিজরিতে আল-হাসান আল-বাসরির লিখিত একটি অনুলিপি। দ্য ইজিপশান লাইব্রেরি, কায়রো, ৫০ নং মাসাহিফ।
২৪. (১৩) ইস্তাম্বুলের মিউজিয়াম অব ইসলামিক আর্টে রাখা একটি অনুলিপি, নম্বর ৩৫৮। ড. আল-মুনাজ্জিদের মতে এটি প্রথম শতাব্দীর।
২৫. (৭৫) ১১২ পৃষ্ঠা সম্বলিত একটি অনুলিপি। দ্য ব্রিটিশ মিউজিয়াম, লন্ডন।
২৬. (৫১) ২৭ পৃষ্ঠা বিশিষ্ট একটি অনুলিপি। দ্য ইজিপশান লাইব্রেরি, কায়রো, নম্বর ২৪৭।
২৭. (৯৬) বিভিন্ন পান্ডুলিপি থেকে প্রায় ৫০০০ পৃষ্ঠা বিশিষ্ট একটি অনুলিপি যা Bibliotheque Nationale de France-এ রয়েছে। এর অনেক পান্ডুলিপিই প্রথম শতাব্দীর। তার মাঝে একটি (Arabe 328(a)) সম্প্রতি প্রতিলিপি সংস্করণ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।
এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা নয়। এমন আরও কত যে ব্যক্তিগত সংগ্রহ রয়েছে, যেগুলো হয়তো মালিকের অনুমতির অভাবে কখনো জানাও যাবে না। জার্মানিতে অবস্থিত Muenster Institute of the New Testament Textual Research[৫]-এর মতো কিছু মুসলিমদের নেই। সানআ খণ্ডাংশগুলোর চেয়ে Türk ve Islam Eserleri Müzesi জাদুঘরের সংগ্রহগুলো অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এখনও পর্যন্ত কোনো নিবেদিতপ্রাণ গবেষক এগুলো নিয়ে কাজ শুরু করেননি। এত রয়েসয়ে হিসেব করা সত্ত্বেও উপরের তালিকা থেকে দেখা যাচ্ছে—ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই অসংখ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক মুসহাফ অস্তিত্বশীল ছিল। এর মধ্যে কিছু হয়তো উসমানি মুসহাফের চেয়েও পুরোনো।
সানআর মুসহাফগুলোতে অবশ্যই কিছু আলাদা অর্থোগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে; কিন্তু কুরআন যে ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই পূর্ণরূপে অস্তিত্বশীল, এর সপক্ষে বিদ্যমান প্রমাণের ভান্ডারে এ-সব মুসহাফ আহামরি কোনো সংযোজন নয়।
টিকাঃ
১. মজার ব্যাপার হলো, সারা বিশ্বে প্রায় ২৩২৭ কপি সহিহুল বুখারি রয়েছে। (আল-ফিহরিস আশ-শামিল লিত-তুরাস আল-আরাবি আল-ইসলামি আল-মাখতুত: আল-হাদিস আন-নববি আশ-শারিফ ওয়া উলুমুহু ওয়া রিজালুহু, আলুল-বাইত ফাউন্ডেশন, আম্মান, ১৯৯১, ১ : ৪৯৩-৫৬৫). এই ক্যাটালগ সম্পূর্ণ যথার্থ না। তাতেই এই বিশাল সংখ্যার বিচারে বলা যায় যে, মুসহাফ পান্ডুলিপির পরিমাণ এর চেয়ে বহুগুণ বেশি।
২. সংখ্যাটা রয়েসয়ে ধরা হয়েছে। বাস্তবে আরও অনেক বেশি হতে পারে। ইস্তাম্বুলরে Türk ve Islam Eserleri Müzesi এর সংরক্ষণে প্রায় ২১০০০০ টি ফোলিও আছে (F. Deroche, 'The Qur'an of Amagur', Manuscripts of the Middle East, Leiden, 1990-91, vol. 5, p. 59)। এরপর আরও আছে, 'সানআর গ্রেট মস্ক থেকে প্রাপ্ত প্রায় ৪০০০০ টুকরো পুরোনো পার্চমেন্ট...' (G.R. Puin, 'Methods of Research on Qur'anic Manuscripts - A Few Ideas', Masahif Sana, p. 9) বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ রয়েছে।
৩. কে. আওয়াদ, আকদামুল মাখতুতাতিল আরাবিয়্যা ফি মাকতাবাতিল-আলাম, পৃষ্ঠা: ৩১-৫৯।
৪. তালিকা সম্পর্কে কিছু কথা: (i) যদিও অনেক মুসহাফই অমুক-তমুক লিখেছে বলা হচ্ছে, তবু এগুলোকে নিশ্চিতভাবে গ্রহণ বা অস্বীকার করার উপায় নেই। কারণ এই ব্যাপারে খোদ মুসহাফই নীরব। লিপিকারদের নাম অন্যান্য সূত্র থেকে জানা যায়। সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী তারিখ জানার জন্য নিজেরা গবেষণা করতে হবে। কোনো মুসহাফকে উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর বলে দাবি করার অর্থ এমনও হতে পারে, তা প্রেরিত কোনো উসমানি মুসহাফের অনুলিপি। (৬) নতুন অনেক লেখা আবিষ্কৃত হয়েছে, যার দ্বারা আমরা লিপির বিবর্তন সম্পর্কে জানতে পারি। দেখতে খারাপ হলেই তা সুন্দর কোনো লিপির চেয়ে পুরোনো মনে করার কোনো কারণ নেই। এরকম উদাহরণের সম্মুখীন নিজেই হয়েছি: বারাকা প্যালেসে প্রাপ্ত কিছু চকচকে শিলালিপি একই স্থান থেকে প্রাপ্ত কিছু মলিন শিলালিপির চেয়ে পুরোনো ছিল। (ইবরাহিম জুম'আ, দিরাসাত ফি তাতাওউরিল-কিতাবাতিল-কৃফিইয়া, পৃষ্ঠা: ১২৭) আবার হস্তশৈলী সুন্দর হওয়া মানেই তা পুরোনো নয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও আল-মুনাজ্জিদসহ অনেকেই অন্ধভাবে কিছু অপ্রমাণিত তত্ত্বের অনুসরণ করেছেন।
৫. এই অফিসের কাজ হলো নিউ টেস্টামেন্টের প্রতিটি পান্ডুলিপি নিবন্ধিত রাখা। সেটি বিশালাকৃতি কোনো পুস্তিকা বা ২০০ সে. মি. খণ্ডাংশ যা-ই হোক না কেন। দ্রষ্টব্য: Metzger, The Text of the New Testament, pp. 260-263.