📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 ফুগালের কুরআন-বিকৃতির চেষ্টা

📄 ফুগালের কুরআন-বিকৃতির চেষ্টা


আক্রমণের চতুর্থ পন্থা হলো কুরআনুল কারিমকে বিকৃত দাবি করা। গোল্ডজিহার এবং জেফরির রূপভেদ-সংক্রান্ত তত্ত্বগুলো নিয়ে ইতোমধ্যেই কাটাছেঁড়া করেছি আমরা। তবে এগুলো ছাড়াও আরও কিছু উল্লেখযোগ্য অভিযোগ রয়েছে।
১৮৪৭ সালে ফ্লুগাল (Fluegel) কুরআনের প্রধান শব্দগুলোর একটি বর্ণানুক্রমিক সূচি প্রকাশ করেন। কুরআনের একটি আরবি টেক্সটও তৈরি করেন; কিন্তু তিনি এমন জগাখিচুড়ি পাকালেন, যা কোনো কারির কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। সাত কিরাতের যেকোনো একটি অনুসরণ করার ব্যাপারে মুসলিমদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ঐকমত্য আছে।[২] এগুলোর সবই উসমানি গঠন এবং কিরাতের সুন্নাত অনুযায়ী হওয়া আবশ্যক। উচ্চারণ-চিহ্নের যে সামান্য বৈচিত্র্য আছে, তা আয়াতের বিষয়বস্তুর ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। প্রতিটি মুদ্রিত মুসহাফ সাত কিরাতের কোনো একটি অনুযায়ী প্রকাশিত। যে কিরাতই হোক না কেন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তা সম্পূর্ণভাবে অনুসরণ করা হয়; কিন্তু ফ্লুগাল একটি কিরাতের সাথে আরেকটির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। এই ভিত্তিহীন জগাখিচুড়ির পক্ষে কোনো যুক্তিও উপস্থাপন করেননি। এ-ব্যাপারে জেফরি পর্যন্ত বলেছেন, 'বহুল প্রচলিত-প্রকাশিত ফুগালের সংস্করণটি আসলে খুবই দুর্বল একটি গ্রন্থ। কারণ এটি বিশুদ্ধভাবে কোনো প্রকার
প্রাচ্যীয় টেক্সট-রীতিও অনুসরণ করে না, আবার তার এই টেক্সটের নিশ্চিত কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও নেই।'[১]

টিকাঃ
১. A. Jeffery. Materials, p. 4.
২. অধ্যায় ১১.২ দ্রষ্টব্য

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 ব্লাশিরের কুরআন-বিকৃতির চেষ্টা

📄 ব্লাশিরের কুরআন-বিকৃতির চেষ্টা


ফরাসি-ভাষায় কুরআন (Le Coran, 1949) অনুবাদ করতে গিয়ে রেজিস ব্লাশির (Regis Blachere) শুধু সুরা বিন্যাসেই পরিবর্তন আনেননি, সেইসাথে দুটো বানোয়াট আয়াতও তাতে যুক্ত করে দেন।

চিত্র: জাল আয়াতসহ ব্লাশিরের কুরআন অনুবাদ
তার এই কাজের ভিত্তি হলো একটি বানোয়াট বর্ণনা। সেখানে এই আয়াতগুলোকে শয়তানের পক্ষ থেকে আগত ‘প্রত্যাদেশ’ বলে দাবি করা হয়। এই বর্ণনার দাবি অনুযায়ী, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাকি এতই অবুঝ যে, আল্লাহর বাণী আর ওইসব শিরকি বুলির মাঝে পার্থক্য করতে না পেরে দুটো মিশিয়ে ফেলেছেন। অথচ অদ্যাপি বর্তমান ২৫০,০০০ কুরআনের পাণ্ডুলিপি কিংবা কিরাতের কোনো বর্ণনাতেই উক্ত আয়াতদ্বয়ের অস্তিত্ব মেলে না। এর আগে-পরের সকল আয়াত এবং গোটা কুরআনের মূল বার্তার সাথেই তা সরাসরি সাংঘর্ষিক।[১]
জাল আয়াত ('20 bis' ও '20 ter') দুটিতে প্রাক-ইসলামি মক্কার মূর্তিগুলোর স্তুতি করতে আহ্বান করা হয়েছে।[২]
এমন একটি বর্ণনা থেকে ফায়দা অর্জন করার লোভ প্রাচ্যবিদরা সংবরণ করতে পারেনি। রেভারেন্ড গিয়োম (Guillaume) অনূদিত Sirat Ibn Ishaq ১৯৬৭ সাল থেকে মুসলিম দেশগুলোতে প্রকাশিত হচ্ছে। অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি এতবার অসাধুতার আশ্রয় নিয়েছেন, এখানে তা উল্লেখ করাও দুষ্কর। এর মধ্যে তাবারির একটি গ্রন্থ থেকে দুটি পৃষ্ঠা উদ্ধৃত করেছেন তিনি। পূর্বোক্ত বানোয়াট গল্পটি লোককথা হিসেবে প্রচলিত থাকার কারণে তাবারি সেখানে তা বর্ণনা করেছিলেন; কিন্তু গিয়োম সেটি বর্ণনা করার সময় ইবনু ইসহাকের মূল পাঠ্য থেকে আলাদা করেননি। এটা যে একটি আলাদা উদ্ধৃতি তা তিনি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ না করে, কেবল বন্ধনীর মধ্যে স্থাপন করে মূল টেক্সটে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। আর শুরুতে বড় করে লিখেছেন 'T'; এর কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি।[৩] স্বাভাবিকভাবেই (গিয়োমের অনুবাদ পড়ে) সাধারণ মুসলিম সমাজ সত্যের সাথে কিছু শিরকি গল্প হজম করে এবং অসতর্কতাবশত এটিকে ইবনু ইসহাকের ঐতিহাসিক গ্রন্থের নিশ্চিত অংশ হিসেবে মনে করে বসে।

টিকাঃ
১. এ সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন-'Urwah b. az-Zubair, al-Maghazi, pp. 106-110, বিশেষত পাদটীকাগুলো।
২. জাল আয়াত বাদেও রাশির, রডওয়েল এবং রিচার্ড বেল সহ অন্যরা তাদের অনুবাদে সুরা বিন্যাস পরিবর্তন করেছেন। তাদের অনুমান-নির্ভর মুসহাফে কথিত ইবনে মাসউদের সুরা-বিন্যাস অনুযায়ী নিজেদের সুবিধাজনক পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করে কুরআনের পবিত্রতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রয়াস চালিয়েছেন।
৩. Guillaume, The Life of Muhammad: A Translation of Ibn Ishaq's Sirat Rasul Allah, 8th impression, Oxford Univ. Press, Karachi, 1987, p. 165.

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 রেভারেন্ড মিংগানার কুরআন-বিকৃতির চেষ্টা

📄 রেভারেন্ড মিংগানার কুরআন-বিকৃতির চেষ্টা


অনেকে অধ্যাপক মিংগানাকে 'মস্ত আরবি বোদ্ধা'[১] বলে অভিহিত করে। অথচ খুব বেশি হলে উক্ত বিষয় সম্পর্কে তার ভাসাভাসা কিছু জানাশোনা রয়েছে। An Important Manuscript of the Traditions of Bukhari[২] গ্রন্থে মাত্র কয়েক লাইন তুলতে গিয়ে তিনি মারাত্মক কিছু ভুল করেছেন। যেমন: وحدثني - কে তিনি পড়েছেন; ابوالفضل - بن أبو المظفر - কে বিন আবু আল মুজাফফর পড়েছেন; مقابلة - এর মতো কিছু শব্দ বাদ দিয়েছেন; আবার اجازة-এর মতো নির্দিষ্ট কিছু শব্দ পড়তে না পেরে ছেড়েই দিয়েছেন; অতিরিক্ত এ-যুক্ত করেছেন; ঢাঁ এবং ३-এর মতো পরিভাষাগুলোর ভুল অনুবাদ করেছেন। এভাবে পাইকারি হারে করা এই ভুলগুলোকে কেবল দক্ষতার অভাব হিসেবেই চিহ্নিত করা যায়।
The Traditions of Bukhari একটি হাদিস সংকলন ছিল। মিংগানার আরবির দৌড় কতটুকু, তা বোঝাতে উদাহরণ হিসেবে এনেছি মাত্র। কুরআনের প্রসঙ্গে ফেরত আসি। এখানেও মিংগানা একই রকম অজ্ঞতার স্বাক্ষর রেখেছেন। Leaves from Three Ancient Qurans, Possibly Pre-Othmanic with a list of their Variants নামের একটি গ্রন্থ আছে তার।[৩]
মূল পাণ্ডুলিপিটি ভেলামের[৪] ওপর লেখা একটি প্যালিম্পসেস্ট[৫]। এর ওপর কুরআনের আয়াত লিপিবদ্ধ ছিল। একজন আরব খ্রিষ্টান কালি মুছে সেখানে ওভাররাইট করে (লেখার ওপর দিয়ে লিখে দেয়)। আগের লেখাটি পুনরুদ্ধার করার উদ্দেশ্যে মিংগানা তিনটি পাতায় ইনফ্রারেড রশ্মি ব্যবহার করে পার্থক্য করার চেষ্টা করেন।[৬] চিত্রটি দ্রষ্টব্য—

চিত্র: মিংগানার ব্যবহৃত একটি ‘প্যালিম্পসেস্ট’ পত্র। সূত্র: Mingana & Lewis (eds.), Leaves from Three Ancient Qurans, Plate Quran B
পাতাগুলো বিশ্লেষণ করে মিংগানা এর থেকে কুরআনের তথাকথিত রূপভেদের একটি তালিকা সাজান এবং ইংরেজি অনুবাদও যুক্ত করেন। এক্ষেত্রে তার সীমাহীন অসততা ধরে ফেলা খুব কঠিন কিছু নয়। আরবিতে দুর্বল পাঠকগোষ্ঠী ছিল তার প্রতারণার মূল শিকার। ব্যাপারটি সামনেই পরিষ্কার হবে:
১. মিংগানা লিখেছেন:
(‘প্যালিম্পসেস্ট’ পত্রে পাওয়া) (الكم) বা ( ) এর অর্থ করাঘাত করা, ঘুষি মারা, মুষ্টিযুদ্ধ; শব্দটি যদি এমন না হয় তাহলে তা অস্পষ্ট। কুরআনে আছে, إنهم لن يغنوا عنك من الله شيئا অর্থাৎ ‘নিশ্চয় তারা আল্লাহর মুকাবিলায় আপনার কোনো কাজেই আসবে না।’ আর আমরা যা (প্যালিম্পসেস্টে) খুঁজে পেয়েছি সে হিসেবে বাক্যটি হলো এমন, اللك هكيا الله إنهم لن يغنوا عنك من اللكم অর্থাৎ ‘উপহাসের মধ্যেও ঘুষি বা করাঘাত প্রতিহত করতে নিশ্চয় তারা আপনার কাজে আসবে না।’ যদি এই অর্থ প্রত্যাখ্যান করা হয় তাহলে মূল উপাদানের (অর্থাৎ ইসম বা বিশেষ্যের) অর্থে সমস্যা হয়ে যাবে। অভিধানে الكم বা اللك এর অর্থ দেওয়া আছে, الضرب باليد مجموعة اللكز والدفع (অর্থাৎ হাত দিয়ে আঘাত করা যা চড় মারা বা প্রতিহত করা উভয়কে বোঝায়)। আর مكثما শব্দটি মাসদার বা ক্রিয়ামূল যা هَكُمْ এর পরিবর্তে এসেছে। এই শব্দটি কুরআন সংকলনের পরে খুব বেশি ব্যবহার না হলেও অনেক ভালো ভালো লেখকের লেখায় পাওয়া যায়।'[৭]
মন্তব্য: অনর্থক একটি বিষয় প্রমাণের উদ্দেশ্যে সুন্দর একটি ভাষাতাত্ত্বিক কসরত দেখালেন মিংগানা। যেখানে তিনি বুখারির স্পষ্ট পান্ডুলিপি পড়তে হিমশিম খান, সেখানে প্যালিম্পসেস্টের পাঠোদ্ধার করার কথা বাদই দিলাম। মিংগানার অনুবাদ এখানে পুরোপুরি ভুল। কারণ আয়াতের প্রেক্ষাপটের সাথে শেষাংশের কোনো সামঞ্জস্যই নেই। اللكم শব্দটি শুধুই মুষ্টিযুদ্ধাঙ্গনে ব্যবহৃত হয়, কুরআনে নয়। সর্বোচ্চ ছাড় দিলেও এর অনুবাদ দাঁড়ায়, 'দুরাচারবশত তারা আপনাকে ঘুসি থেকে রক্ষা করবে না (যদ্দষ্টং)' শেষ দুটো শব্দ যে লিপিকারের ভুল, তা তো একদম স্পষ্ট। না-হলে ইচ্ছাকৃতভাবে আয়াত পালটাতে চাইলে লিপিকার এরকম হাস্যকর শব্দ কেন ব্যবহার করবে? মিংগানা তবুও মানতে নারাজ।
২. সুরা বনি ইসরাইলের প্রথম আয়াত থেকে [৮]
মুদ্রিত কুরআন (মিংগানা প্রদত্ত) হوله باركنا
মিংগানার পান্ডুলিপি হوله بركنا
মন্তব্য: বর্তমানে মদিনায় যে মুসহাফ মুদ্রিত হয়, তাতে চোখ বুলালে সেখানে بركنا] বানানটি দেখা যাবে, بَاركْنا বানানটি নয়। প্রথম ক্ষেত্রে মিংগানা নিজের মতো করে আলিফ যুক্ত করেছেন। আর 'রূপভেদ' তৈরির উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তা বাদ দিয়েছেন। এছাড়া بر শব্দটি দ্বারা কল্যাণ এবং নতজানু দুটি অর্থই বোঝায়; কিন্তু অনুবাদ করার সময় সুযোগ বুঝে মিংগানা প্রথম ক্ষেত্রে (অতিরিক্ত আলিফ যুক্ত) 'কল্যাণময় করেছি' এবং পরেরটিতে 'নতজানু করেছি' অর্থ করেছেন।
৩. সুরা তাওবার ৩৭ নং আয়াত[৯]
মুদ্রিত কুরআন (মিংগানা প্রদত্ত) ميغانا পান্ডুলিপি
(الكافرين ) لا يهدي القوم (الكافرين ) لا يهدا القوم يهدي
নোট: আবারও সেই একই চাতুরি, তবে একটু পেঁচিয়ে। ينفعهم থেকে '' সরানো হয়েছে এবং (এ এর বদলে (یکن বানানোর জন্য মিংগানা নুক্তাহীন পাঠ্যে (ينفعهم থেকে সরানো নুক্তাহীন ‘ইয়া’-এর উপর) নিজের ইচ্ছেমতো নুক্তা যোগ করে (‘নুন’ বানিয়ে) দিয়েছেন।

টিকাঃ
১. Ibn Warraq (ed.), Origins of the Koran, p. 410.
২. Cambridge, 1936
৩. Cambridge, 1914.
৪. ভেলাম (Vellum) হলো প্রস্তুতকৃত পশুচর্ম। পার্চমেন্টের সাথে এর পার্থক্য হলো, এটি শুধু বাছুরের চামড়া দিয়ে বানানো হয়। স্ক্রোল, কোডাইস, গ্রন্থ লেখার কাজে উন্নত মানের এই পশুচর্মের ব্যবহার লক্ষ করা যায়।-অনুবাদক
৫. প্রাচীনকালে লেখার পৃষ্ঠ অনেক দুষ্প্রাপ্য ছিল। প্রায়ই তা একাধিকবার ব্যবহৃত হতো। নতুন কিছু লিপিবদ্ধ করার জন্য যে পান্ডুলিপি থেকে মূল লেখা মুছে ফেলা হয় তাকে প্যালিম্পসেস্ট (Palimpsest) বলে। তবে মোছার প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি খুব শক্তিশালী না হওয়ায় আধুনিক গবেষকগণ অনেক ক্ষেত্রে নতুন লেখার নিচে পুরোনো লুপ্ত লেখা আবিষ্কার করতে সমর্থ হন।-অনুবাদক
৬. Mingana & Lewis (eds.), Leaves from Three Ancient Qurans, Plate Quran B.
৭. ibid, p. xxxvii.
৮. ibid, p. xxxviii.
৯. Mingana, Leaves from Three Ancient Qurans, p. xxxix. He also uses the same word for 9:24.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00