📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 জোড়াতালি দিয়ে আত্মস্থ করার অভিযোগ

📄 জোড়াতালি দিয়ে আত্মস্থ করার অভিযোগ


Encyclopaedia Britannica (1891)-এর একটি প্রবন্ধে অগ্রগণ্য প্রাচ্যবিদ নোয়েলডেক কুরআনে বর্ণিত ইহুদিদের আদি ইতিহাস-সংক্রান্ত অসংখ্য ভুলের (তার দাবি অনুসারে) জন্য 'মুহাম্মাদের অজ্ঞতাকে' দায়ী করেছেন। এগুলোকে ইহুদিদের উৎস থেকে চুরি করে আনাড়িদের মতো ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। তার মতে-
'সবচেয়ে মূর্খ ইহুদিও হামানকে (আহশ্বেরশের মন্ত্রী) ফিরাউনের মন্ত্রী বলবে না, কিংবা মোশির বোন মিরিয়ামকে যিশুর মাতা মেরির (= মিরিয়াম) সাথে মিলাবে না...। আরবের বাইরের জগৎ সম্পর্কে তার অজ্ঞতার কারণে তিনি মিশরের উর্বরতাকে বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল বলেছেন। অথচ সেখানে বৃষ্টি বলতে গেলে হয়ই না। নীলনদের পরিপ্লাবনের ওপর তারা নির্ভরশীল (xii. 49)।'[১]
ইসলামকে বিধর্মী পরিভাষায় উপস্থাপনের আরেকটি দুঃখজনক উদাহরণ এটি। মানে, তাদের ধর্মীয় গ্রন্থে উল্লেখ নেই দেখে ফিরাউনের হামান নামের কোনো মন্ত্রী থাকতে পারে না? কুরআনে যে ঈসা আলাইহিস সালামের মা-কে মুসার বোন না বলে 'হারুনের বোন' [২] বলা হয়েছে, তা নোয়েলডেক সুচতুরভাবে এড়িয়ে গেছেন। নিউ টেস্টামেন্টে মেরির জ্ঞাতিবোন এবং জন দ্য ব্যাপ্টিস্টের মা এলিজাবেথের কথা জানা যায়। তিনি ছিলেন পুরোহিত পরিবারের সদস্য। আর বনি ইসরাইলের মধ্যে পৌরোহিত্যের জন্য এরোনের (হারুন) নাম প্রসিদ্ধ থাকায় এলিজাবেথকে 'এরোন বংশীয়' বলা হয়েছে। [৩] ঠিক একইভাবে বৃহত্তর দৃষ্টিতে মেরি বা এলিজাবেথকেও 'হারুনের বোন' বা '(হারুনের পিতা) ইমরানের কন্যা' বলা চলে। [৪]
এবার মিশরের উর্বরতা বিষয়ে নোয়েলডেকের অভিযোগের ব্যাপারে আলোচনা করা যাক। নীলনদ প্লাবিত হওয়ার সবচেয়ে বড় উৎসই হলো বৃষ্টি। বৃষ্টির তারতম্যের ওপর তা নির্ভরশীল। যেকোনো ইকোলজিস্ট এটা স্বীকার করবেন। তবে সে কথা আপাতত সরিয়ে রাখি। কুরআনের আয়াতে মনোযোগী হওয়া যাক—
'এরপর আসবে এমন এক বছর, যাতে মানুষ পরিত্রাণ পাবে এবং যাতে তারা (আঙুর ও জয়তুনের) রস নিংড়াবে।' [৫]
এই আয়াতে নির্দিষ্টভাবে বৃষ্টি শব্দটি কোথায় আছে, তা পাঠকের বিবেচনার উপরেই ছেড়ে দিলাম। 'পরিত্রাণ' কে নোয়েলডেক 'বৃষ্টি'-এর জন্য ব্যবহৃত বিশেষ্য ভেবে সব গোলমাল পাকিয়েছেন।

টিকাঃ
১. See 'The Koran', Encyclopaedia Britannica, 9th edition, 1891, vol. 16, pp. 597ff. Reprinted in Ibn Warraq (ed.), The Origins of the Koran: Classic Essays on Islam's Holy Book, Prometheus Books, Amherst, NY, 1998, pp. 36-63.
২. T. Noeldeke, "The Koran', in Ibn Warraq (ed.), The Origins of the Koran, p. 43.
৩. সুরা মারইয়াম, আয়াত: ২৮
৪. লুক ১ এর ৫ ও ৩৬ নং শ্লোক দ্রষ্টব্য
৫. ইউসুফ আলির কুরআন তর্জমা এবং ৩:৩৫ ও ১৯:২৮ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য। একটি হাদিস অনুসারে আক্ষরিকভাবেই মারইয়াম আলাইহাস সালাম ছিলেন 'হারুনের বোন'। সেকালে বনি ইসরাইলের লোকেরা নবিদের নাম অনুসারে সন্তানদের নাম দিত। অর্থাৎ মারইয়াম ছিলেন 'হাবুন' নামে কোনো ব্যক্তির বোন। 'মুগিরা ইবনু শুবা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে নাজরানের দিকে পাঠান। তারা আমাকে বলল, 'তোমরা কি কুরআনে এ বাক্য পড় না- (أُخْتُ هَارُونَ) 'হে হারুনের বোন'; সুরা মারইয়ামের ২৮নং আয়াত)? অথচ মুসা ও ঈসার মাঝে কত কালের ব্যবধান?' আমি তাদের এ প্রশ্নের কী উত্তর দেব, জানতাম না। তাই নবিজি (ﷺ)-এর কাছে ফিরে এসে তাকে এ কথা জানালাম। তিনি বললেন, 'তুমি কি তাদের এ সংবাদ দিতে পারলে না যে, তারা পূর্ববর্তী নবি ও পুণ্যবান লোকদের নামে তাদের নাম রাখত।' (জামিউত তিরমিযি, অধ্যায় ৪৭ (কুরআন তাফসির অধ্যায়), হাদিস : ৩১৫৫, সহিহ (দারুস সালাম); সহিহ মুসলিমেও অনুরূপ হাদিস বর্ণিত আছে। কাজেই কুরআনে মোটেই মুসা আলাইহিস সালামের ভাই নবি হারুন আলাইহিস সালামের বোনের সঙ্গে মারইয়াম আলাইহাস সালামকে মিলিয়ে ফেলা হয়নি; বরং মারইয়াম আলাইহাস সালামের সেই একই নামে একজন ভাই ছিলেন...সম্পাদক
৬. সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৪৯; আরবিতে এখানে 'نجاة' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এর যথাযথ অর্থ 'পরিত্রাণ'। আয়াতের প্রেক্ষাপটে বৃষ্টি কিংবা পানি যেকোনো কিছু দ্বারাই 'পরিত্রাণ' হতে পারে। কিন্তু ভাষাতাত্ত্বিকভাবে শুধু 'বৃষ্টি' এর অর্থ নয়। কেবল বৃষ্টি অর্থ করতে হলে 'مطر' বিশেষ্যটি থাকতে হবে, যেমনটি সুরা নিসার ১০২ নং আয়াতে আছে। তাই পরিষ্কারভাবেই 'بِنَاءِ' শব্দটি দ্বারা শুধু 'বৃষ্টি' নির্দিষ্ট করা যায় না। ইংরেজ প্রাচ্যবিদ এ.জে. আরবেরিও এই আয়াতের অনুবাদে 'succour' (পরিত্রাণ) শব্দটি ব্যবহার করেছেন—শাইখ ইমতিয়াজ দামিয়েল।

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 বাইবেলের নকল

📄 বাইবেলের নকল


কুরআনের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উত্থাপন করেছেন হার্শফেল্ড।[১] বাইবেল বলতে যদি তিনি নিউ টেস্টামেন্ট বোঝান, তাহলে আদিপাপ এবং প্রায়শ্চিত্তের প্রসঙ্গে আসা যাক। এগুলো খ্রিষ্টধর্মের প্রধান দুটি বিশ্বাস। আদমসন্তান হওয়ার ফলে সকল মানুষ জন্ম থেকে পাপের ভার বহন করার বিশ্বাসকে আদিপাপ বলে। আর ঈশ্বর নিজ পুত্রকে উৎসর্গ করে মানবজাতিকে পাপমুক্ত করার বিশ্বাস হলো প্রায়শ্চিত্ত। কুরআন উভয় বিশ্বাসকেই স্পষ্টত প্রত্যাখ্যান করে—
'তারপর আদম তার রবের কাছ থেকে কিছু বাণী পেলেন। অতঃপর আল্লাহ তার তাওবা কবুল করলেন।' [২]
'প্রত্যেকেই স্বীয় কৃতকর্মের জন্য দায়ী হবে এবং কেউ অন্য কারও ভার বহন করবে না।' [৩]
যিশুকে মুক্তিদাতা এবং ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করা বর্তমান খ্রিষ্টধর্মের মূল মতবাদ। অথচ কুরআনুল কারিমে তা সোজাসুজি প্রত্যাখান করা হয়েছে।
'আপনি বলুন-তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং জন্ম নেনওনি। আর তাঁর কোনো সমকক্ষও নেই।' [৪] নকলটা তাহলে করা হয়েছে কোথায়? আর যদি ওল্ড টেস্টামেন্টের নকল বোঝানো
হয়ে থাকে (যেটা ওয়ান্সব্রোহ, নোয়েলডেক প্রমুখের অভিযোগ), সেখানে তো ইয়াহওয়েহকে একচ্ছত্রভাবে ইসরায়েলিদের ঈশ্বর বলা হয়েছে। এমনকি সামারীয় বা ইদোমীয়দের সাথেও তাঁকে সম্বন্ধযুক্ত করা হয়নি। তাহলে আল্লাহকে গোত্রীয় ঈশ্বর হিসেবে চিত্রিত করা একটি ধর্মগ্রন্থ থেকে কেন নবি নকল করতে উদ্যত হবেন?
অথচ কুরআনের শুরুতেই লেখা— 'অনন্ত করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)। সকল প্রশংসা আল্লাহর— যিনি সৃষ্টিকুলের প্রতিপালক।'[১]
এখানে সর্বজনীনভাবে সকল জাতি, গোত্র নির্বিশেষে আল্লাহর দিকে ডাকা হচ্ছে। এমন সুন্দর হীরা কোনোদিন কুড়িয়ে পাওয়া নুড়ির অংশ হতে পারে না।

টিকাঃ
১. A. Mingana, 'The Transmission of the Koran', in Ibn Warraq (ed.), The Origins of the Koran, p. 112.
২. সুরা বাকারা, আয়াত: ৩৭
৩. সুরা আনআম, আয়াত: ১৬৪
৪. সুরা ইখলাস, আয়াত: ১-৪
৫. সুরা ফাতিহা, আয়াত: ১-২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00