📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 যিশুর ঐশ্বরিকতা

📄 যিশুর ঐশ্বরিকতা


যিশু নিজেকে ঈশ্বরের পুত্র হিসেবে দাবি করেছে কি না, তা প্রায় পুরোপুরি লুক ১০-এর ২২ নং শ্লোকের ওপর নির্ভরশীল—
'একমাত্র পিতা ছাড়া আর কেউ পুত্রের পরিচয় জানে না। অথবা পিতাকে পুত্র ব্যতীত আর কেউ জানে না। শুধু পুত্র যার কাছে প্রকাশ করতে চান, সেই জানে।'
একই কথা বলা হয়েছে মাথর ১১: ২৭ শ্লোকে। কারণ লুক এবং মথি উভয়েই Q থেকে উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু উক্ত শ্লোকটি Q-এর তৃতীয় পর্যায়ের অর্থাৎ ৭০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে খ্রিস্টানদের করা সংযোজন।[১] পূর্ববর্তী দুই পর্যায়ের একটিতেও যিশু ঈশ্বর হওয়ার ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। যিশুর আদি অনুসারীদের দ্বারা সংরক্ষিত মূল Q-এর মধ্যে এমন কিছু ছিল না।[২] একইভাবে 'ঈশ্বরের পুত্র' কথাটি ওল্ড টেস্টামেন্টে আলাদা আলাদা অর্থে বিভিন্নভাবে এসেছে। এগুলোর একটিও আক্ষরিক পুত্র হওয়া নির্দেশ করে না।[৩] নাহলে ইহুদিধর্মের একত্ববাদের সাথে তা সাংঘর্ষিক হয়ে যেত।[৪]
ইহুদি বিশ্বাস অনুযায়ী, 'ঈশ্বরের পুত্র' বলতে মূলত নৈতিকভাবে ঈশ্বরের সাথে সম্পর্কযুক্ত বোঝায় (জৈবিক অর্থে নয়)। প্রথমযুগের খ্রিস্টানরা ইহুদি সংস্কৃতির সাথে পরিচিত ছিল। তাই যিশুকে 'ঈশ্বরের পুত্র' বলতে খুব সম্ভবত তারা ইহুদিদের অর্থ ব্যবহার করেছে; কিন্তু পরবর্তী সময়ে খ্রিষ্টানরা তা ব্যবহার করেছে আক্ষরিকভাবে। এক্ষেত্রে হেলেনিজম বা গ্রিক ভাবধারার প্রভাবকে দায়ী করা যায়। কারণ হেলেনিস্টিক মতবাদ অনুযায়ী সম্রাটরা নিজেদের সরাসরি ঈশ্বরের বংশধর মনে করত। এভাবে খ্রিষ্টের ব্যাপারে পরবর্তী খ্রিষ্টানদের দৃষ্টিভঙ্গি নৈতিক অর্থ খুইয়ে সরাসরি জৈবিক হয়ে দাঁড়ায়।
KJV বাইবেলে ১ তিমথি ৩: ১৬ শ্লোকে যিশুর ঐশ্বরিকতাকে মানব অবতাররূপে উপস্থাপন করা হয়েছে—
'And without controversy great is the mystery of godliness: God was manifest in the flesh...'
অর্থ: 'ধার্মিকতার গুপ্তরহস্য মহৎ! তা প্রশ্নাতীত: ঈশ্বর দেহ ধারণ করে প্রকাশিত হলেন...'
কিন্তু আধুনিক পাঠ্য-বিশ্লেষণবিদ্যা এমন পাঠের ব্যাপারে সন্দিহান। তাই বর্তমান সংস্করণগুলোতে লেখা হয়-
'He (or Who or Which) was manifest in the flesh,'
অর্থ: 'তিনি (বা যিনি বা যা) রক্ত-মাংসে প্রকাশিত হলেন (বা হলো)।'
আরও অনেক পাঠ্য-সমালোচনা আছে, যা যিশুকে ঈশ্বর বলার দাবিকে দুর্বল প্রতিপন্ন করে। যেমন:
» মার্ক ১: ১ ('the Son of God' বাদ দেওয়া হয়েছে)
» যোহন ৬ : ৬৯ ('Christ, the Son of the living God' এর পরিবর্তে 'the Holy One of God')
» মার্ক ৮: ৩৭ ('I believe that Jesus Christ is the Son of God' অংশটিসহ পুরো শ্লোক বাদ দেওয়া হয়েছে)।[৫]
» ১ করিন্থীয় ১৫: ৪৭ ('the second man is the Lord from heaven' এর পরিবর্তে 'the second man is from heaven')[৬]

টিকাঃ
১. অধ্যায় ১৭.১
২. B.L. Mack, The Lost Gospel: The Book of Q & Christian Origins, pp. 89, 172.
৩. আদিপুস্তক ৬: ২, ইয়োবে ৩৮: ৭, যাত্রাপুস্তক ৪: ২২ দ্রষ্টব্য
৪. Dictionary of the Bible, p. 143.
৫. অধ্যাপক কমফোর্ট শ্লোকটিকে নিশ্চিতভাবে সংযোজন হিসেবে বিশ্বাস করেন (p. 128).
৬. শ্লোকগুলো Revised Standard Version থেকে গৃহীত।

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 প্রায়শ্চিত্ত (Atonement)

📄 প্রায়শ্চিত্ত (Atonement)


আদিপাপের জন্য গোটা মানবজাতির হয়ে যিশুর প্রায়শ্চিত্ত আদায়কে বোঝানো হচ্ছে। খ্রিষ্টান ধর্মের সর্বোচ্চ ভালোবাসা এবং উৎসর্গের দৃশ্য চিত্রিত হয়েছে এখানে। কঠিন কষ্টের মুহূর্তে যিশু পুরো মানবজাতির জন্য সুপারিশ করছেন—'পিতা, এদের ক্ষমা করো; কারণ এরা কী করছে তা জানে না।'
লুক ২৩: ৩৪-এর এই শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বাইবেলের সর্বাধিক উদ্ধৃত একটি শ্লোক; কিন্তু অসংখ্য প্রাচীন পান্ডুলিপিতে তা একেবারেই অনুপস্থিত। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনোটি আনুমানিক ২০০ খ্রিষ্টাব্দের। অধ্যাপক কমফোর্ট উল্লেখ করেছেন, 'বরঞ্চ দেখা যাচ্ছে, এটি লুকের মূল টেক্সটের অংশ নয়; পরবর্তী সময়ে একটি মৌখিক বর্ণনা থেকে তা সংযোজিত হয়েছে।'। কিন্তু সুসমাচার বর্ণনাগুলোর জন্য এই শ্লোকটি এতটা গুরুত্বপূর্ণ, প্রত্যেক প্রকাশক এটিকে অন্তর্ভুক্ত করে সাথে পাদটীকা জুড়ে দেয়।[১]
অনুরূপভাবে যোহন ৬ : ৪৭-এর কথা উল্লেখ্য। KJV অনুবাদ করেছে, 'He that believeth on me hath everlasting life.' বা 'যে আমার ওপর বিশ্বাস করে, সে-ই অনন্ত জীবন পায়।' কিন্তু পাঠ্য-পর্যালোচনার পর অসংখ্য আধুনিক বাইবেল থেকে 'on me' অংশটুকু বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ 'যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে, সে-ই অনন্ত জীবন পায়।' কাজেই এই শ্লোক এখন আর খ্রিষ্টকে আদৌ মুক্তিদাতা হিসেবে আখ্যায়িত করে না।

টিকাঃ
১. Comfort. p. 101.

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 স্বর্গারোহণ (The Ascension)

📄 স্বর্গারোহণ (The Ascension)


যিশুর স্বর্গারোহণের ব্যাপারে সুসমাচার চতুষ্টয়ের একটিতেও নির্ভরযোগ্য কোনো বর্ণনা নেই। মথি এবং যোহনে কোনো প্রকার সূত্র উল্লেখ না করেই স্বর্গারোহণের প্রসঙ্গ আনা হয়েছে। লুক ২৪: ৫১ ('এবং সেই অবস্থায়ই তাদের কাছ থেকে পৃথক হয়ে স্বর্গে উন্নীত হলেন') শ্লোকটি বিভিন্ন আদি পান্ডুলিপিতে অনুপস্থিত।[১] তাই প্রায়ই পাদটীকায় এটিকে স্থান দেওয়া হয়।
তবে সবচেয়ে উদ্ভট হলো মার্কের ব্যাপারটি। অসংখ্য পান্ডুলিপিতে স্বর্গারোহণের ঘটনাসহ বারোটি শ্লোকের (মার্ক ১৬: ৯-২০) কোনো অস্তিত্বই নেই। এতে করে সামসময়িক বাইবেলগুলোকে দুটি আলাদা সমাপ্তি টানার মতো বিতিকিচ্ছিরি অবস্থায় পড়তে হয়। একটি প্রলম্বিত এবং একটি সংক্ষিপ্ত।[২] চার সুসমাচারের স্বর্গারোহণ সংক্রান্ত একটি শ্লোকও শেষমেশ পাঠ্য নিরীক্ষণে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।[৩]

টিকাঃ
১. ibid, p. 103.
২. RSV বাইবেলে মার্ক ১৬: ৯-২০ শ্লোকগুলোকে পাদটীকায় সতর্কতামূলক নোটসহ সংযুক্ত করা হয়েছে। CEV বাইবেলে আবার দুটি নোটের মধ্যে স্থান দেওয়া হয়েছে। নোটগুলো হলো 'ONE OLD ENDING TO MARK'S GOSPEL' এবং 'ANOTHER OLD ENDING TO MARK'S GOSPEL'
৩. ঈসা আলাইহিস সালামের ঊর্ধ্বগমন প্রসঙ্গে কুরআন অবশ্য পরিষ্কার। মুসলিমরা তার ক্রুশবিদ্ধতা বিশ্বাস না করলেও ঊর্ধ্বগমনের ব্যাপারে নিশ্চিত। সুরা নিসার ১৫৮ নং আয়াত দ্রষ্টব্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00