📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 নিউ টেস্টামেন্টের পাঠ ভিন্নতা

📄 নিউ টেস্টামেন্টের পাঠ ভিন্নতা


প্রাচীন যুগে গ্রিক হস্তলেখার দুটি ধরন ছিল। একটি ছিল প্যাঁচানো এবং অন্যটিকে আনসিয়াল (Uncial) বলা হতো। প্রথমটি ব্যবহৃত হতো দৈনন্দিন কাজে এবং ব্যাপক আকারে। আর দ্বিতীয়টি অপেক্ষাকৃত আনুষ্ঠানিক কার্যাবলির ক্ষেত্রে [১]

চিত্র: গ্রিক আনসিয়াল লিপির উদাহরণ। সংলগ্ন শব্দগুলোর মধ্যে পার্থক্যকারী চিহ্নের অনুপস্থিতি লক্ষণীয়। উৎস: মেটজগার, The Text of the New Testament, পৃষ্ঠা: ১০।
সময়ের সাথে আনসিয়াল লিপির অবস্থার অবনতি ঘটে। ফলে নবম শতাব্দীতে লিপিসংস্কারের প্রয়োজন দেখা যায়। তখন মিনিস্কিউল (Minuscule) নামের একটি সংস্করণ সৃষ্টি হয়।[২] মিনিস্কিউল লিপিতে নিউ টেস্টামেন্টের প্রায় ২৮০০ খণ্ডিত অংশ পাওয়া যায়। আর আনসিয়ালে পাওয়া যায় এর এক-দশমাংশ। আর যদি শুধু পূর্ণাঙ্গ নিউ টেস্টামেন্টের পান্ডুলিপির হিসাব করি, তাহলে সংখ্যাটা কমে ৫৮টি মিনিস্কিউল এবং মাত্র ১টি আনসিয়ালে এসে ঠেকে। [৩] সংখ্যাগুলো দেখে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। বিশেষ করে মিনিস্কিউল অনুলিপির সংখ্যা বেশ চিন্তার উদ্রেক ঘটায়।[৪]

চিত্র: গ্রিক মিনিস্কিউলের উদাহরণ। সূত্র: মেটযগার, The Text of the New Testament, p. 11.
পাশাপাশি লিখিত শব্দ এবং বাক্যের মাঝে গ্রিক আনসিয়াল লিপিতে কোনো পার্থক্য-চিহ্ন নেই। অথচ আগের হিব্রুতে কিন্তু তা ছিল। অর্থাৎ এর ব্যবহার অপ্রচলিত কিছু নয়। এই ত্রুটির ফলে অনেক শ্লোকের অর্থ এবং ব্যাখ্যার তারতম্য সৃষ্টি হয়েছে। এর একটি বড়সড়ো উদাহরণ হলো Manuscript 75 (Bodmer Papyrus XIV-XV), এখানে যোহন ১:১৮ শ্লোকটি দুভাবে পড়া যায়। ‘এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বর’ কিংবা ‘একমাত্র পুত্র যিনি নিজেই ঈশ্বর’। অথচ দুটোর মাঝে অর্থের বিশাল পার্থক্য। পরেরটিতে ত্রিত্ববাদের ইঙ্গিত থাকলেও আগেরটিতে মোটেও এমন কিছু বলা হয়নি। আক্ষরিকভাবে এর মূল অনুবাদ হলো 'অনন্য ঈশ্বর'। অথচ তা কিন্তু লেখা হয় না।[৫]

চিত্র: আনসিয়াল লিপিতে লেখা Manuscript 75 (Bodmer Papyrus XIV-XV).
এখানে যোহন ১: ১৬-৩৩ এর শ্লোকগুলো দেখা যাচ্ছে। ওপর থেকে পঞ্চম শ্লোকটিতে 'এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বর' অথবা 'একমাত্র পুত্র; যিনি নিজেই ঈশ্বর' দুটো অর্থই পড়া সম্ভব। Bibliotheca Bodmeriana-এর অনুমতিক্রমে ছাপানো।
ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত পরিবর্তন আনার ফলে আরও বিচ্যুতি ঘটেছে। ফলে স্পর্শকাতর কিছু শ্লোকের বিভিন্ন প্রকরণ তৈরি হয়। যেমন:
» যোহন ১ : ১৮। এখানে 'এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বর' (বা 'একমাত্র পুত্র যিনি নিজেই ঈশ্বর') এর একটি রূপভেদ হলো 'ঈশ্বরের অনন্য পুত্র'। [৬]
» যোহন ১ : ৩৪। এখানে 'ঈশ্বরের পুত্র'-এর আরেকটি প্রকরণ 'ঈশ্বরের মনোনীত'।[৭]
» যোহন ৭: ৫৩, ৮: ১১। একটি মাত্র ব্যতিক্রম ব্যতীত নবম শতাব্দী পর্যন্ত কোনো গ্রিক পাণ্ডুলিপিতে যিশু এবং ব্যভিচারী নারীর ঘটনা পাওয়া যায় না; কিন্তু জনপ্রচলন থাকায় বর্তমান সকল নিউ টেস্টামেন্টে এর অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে। যদিও শেষে একটি সতর্কতামূলক পাদটীকা সংযুক্ত থাকে।[৮]
» যোহন ৮: ১৬। এই শ্লোকের ‘পিতা, যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন’ অংশের রূপভেদ হলো- ‘যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন’।[৯]
» যোহন ৯: ৩৫। যিশুর ‘ঈশ্বরপুত্র’ খেতাবের একটি শক্তিশালী প্রামাণিক রূপভেদ হলো ‘মানবপুত্র’ (মসীহ শব্দটির বিকল্প পরিভাষা)।[১০]
» মার্ক ১৬: ৯-২০। কিছু পাণ্ডুলিপিতে মার্কের শেষ ১২টি শ্লোককে বদলে ছোট একটি উপসংহার টানা হয়েছে। সেখানে শিষ্যদের কাছে যিশুর পুনরাবির্ভাব এবং স্বর্গারোহণের ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই।[১১]
» লুক ৩: ২২। ‘তুমি আমার প্রিয় পুত্র, তোমাতেই আমি পরম তুষ্ট’ অংশটির রূপভেদ হলো ‘তুমি আমার পুত্র, এদিন আমি তোমায় জন্ম দিয়েছি’।[১২]
» লুক ২৩: ৩৪ - ‘তখন যিশু বললেন, পিতা ক্ষমা কর এদের; কারণ এরা কী করছে, তা জানে না।’ কিছু ভিন্ন পাণ্ডুলিপিতে এই অংশটি বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সর্বপুরোনোটি আনুমানিক ২০০ খ্রিষ্টাব্দে রচিত। খুব সম্ভবত লুক লিখিত সুসমাচারে এই শ্লোকটি ছিলই না, মৌখিক বর্ণনা থেকে পরে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়; কিন্তু কাহিনিটির জনপ্রিয়াত দেখে অনুবাদকগণ তা উপেক্ষা করতে কুণ্ঠিত হন। তাই বিভিন্ন পাণ্ডুলিপিতে যে এর কোনো অস্তিত্ব নেই, তা পাদটীকায় তারা যুক্ত করে দেন।[১৩]
» লুক ২৪: ৬, ২৪: ১২। ষষ্ঠ শ্লোকের ‘তিনি এখানে নেই, কিন্তু উত্থিত হয়েছেন' এবং দ্বাদশ শ্লোকের পুরোটাই কিছু পুরোনো পাণ্ডুলিপিতে বর্জন করা হয়েছে।[১৪]
» লুক ২৪ : ৫১, ২৪ : ৫২। 'তাকে স্বর্গে তুলে নেওয়া হলো। তখন তারা উবুড় হয়ে তাকে প্রণাম করলেন' অংশটি নির্দিষ্ট কিছু পুরোনো পাণ্ডুলিপিতে অনুপস্থিত।[১৫]

টিকাঃ
১. Metzger, pp. 8-9.
২. ibid, pp. 9.
৩. ibid. pp. 262-3
৪. অবশ্যই টেক্সটগুলো তাদের মুখের ভাষায় লেখা হয়নি। তাই সাধারণ মানুষের যদি লিখিত অনুলিপি দেখার সৌভাগ্য হয়েও থাকে, তবুও কোনো লাভ নেই। ছয়শ বছরের মধ্যে গোটা খ্রিষ্টান জাতির জন্য মাত্র ৫৮টি অনুলিপির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তৎকালীন ঠিক কত শতাংশ পাদ্রির কাছে পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ ছিল? অথচ এটিই তো তাদের ধর্মপ্রচারের উৎস হওয়ার কথা।
৫. Comfort, p. 105.
৬. ibid. p. 115.
৭. ibid. p. 107.
৮. ibid. p. 115.
৯. ibid. p. 117.
১০. ibid. p. 118.
১১. অধ্যায় ১৭.৮ এর স্বর্গারোহণ অংশটি দ্রষ্টব্য।
১২. Comfort, p. 89.
১৩. ibid, p. 201.
১৪. ibid, p. 102.
১৫. ibid, pp. 103-4.

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 লিপিকারদের করা পরিবর্তন

📄 লিপিকারদের করা পরিবর্তন


এখন লিপিকারদের ইচ্ছাকৃত এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো পরিবর্তনগুলো কোন পর্যায়ের, তা দেখা যাক। নিউ টেস্টামেন্টের পণ্ডিতগণ এগুলো চিহ্নিত করেছেন। এতে করে ভুলের মাত্রার ধরন স্পষ্ট হবে।
অনিচ্ছাকৃত পরিবর্তনগুলোর ব্যাখ্যায় পণ্ডিতগণ মনোবিজ্ঞানের দ্বারস্থ হন। হাজার বছরেরও আগে মারা যাওয়া লিপিকারদের মনের অবস্থা উদঘাটনের চেষ্টা করেন তারা। প্রায় একই ধরনের গ্রিক বর্ণের স্থান পরিবর্তনের কারণ হিসেবে অ্যাস্টিগমাটিজমকে (বিষমকেন্দ্রিকতা) দায়ী করা হয়। শ্লোকের পুনরাবৃত্তি বা অপসারণের কারণ হিসেবে বলা হয় নজরের ক্ষণিক হেরফেরের কথা। শ্রুতিলিখনের সময় ভুল করা, চিত্তবিক্ষেপের ফলে শব্দক্রম পরিবর্তন এবং নিরেট বোকামিসহ সকল প্রকার সমস্যার কথাই বিবেচনায় নেওয়া হয়।[১]
সবচেয়ে বেশি সমস্যা সৃষ্টি করেছে ইচ্ছাকৃত পরিবর্তনগুলো। অধ্যাপক কমফোর্ট এগুলোকে সাত শ্রেণিতে ভাগ করেছেন:
i. মৌখিক বর্ণনা থেকে গৃহীত তথ্য (যেমন যোহনে ব্যভিচারিণী সংক্রান্ত শ্লোক ৭ : ৫৩-৮: ১১)।
ii. গণপ্রার্থনার বিধিসংক্রান্ত সংযোজন।
iii. বৈরাগ্যবাদের প্রসারের ফলে আনিত সংযোজন (যেমন মার্কের ৯: ২৯ শ্লোকে 'প্রার্থনা' শব্দের পর 'এবং উপোস' এর সংযোজন)।
iv. কিছু খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের তৈরি বিকৃতি। (যেমন এডাপশনিস্টরা বিশ্বাস করে ব্যাপ্টিজমের মুহূর্তে যিশু ঈশ্বরের পুত্রে পরিণত হন। তাই ‘তুমি আমার প্রিয় পুত্র, তোমাতেই আমি পরম তুষ্ট’ এর পরিবর্তে ‘তুমি আমার পুত্র, এদিন আমি তোমায় জন্ম দিয়েছি’ যুক্ত করে)।
v. মতবাদগত গোঁড়ামির কারণে। বিশেষ করে পবিত্র আত্মা সংক্রান্ত বিষয়ে।
vi. সমন্বয় সাধন করার জন্য।
vii. পাঠকরা যাতে যিশু সম্পর্কে ‘ভুল’ ধারণা না পায়, সেজন্য লিপিকারদের দ্বারা কৃত পরিবর্তন। [২]
তৃতীয় শতাব্দীতে পাঠ্য-সমালোচক অরিগেনের অভিযোগ তাই অবাক করা কিছু নয়। তিনি বলেছেন পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যকার পার্থক্যের কারণ হলো—
কিছু অনুলিপিকারের গাফিলতি কিংবা টেক্সট সংশোধনের নামে পথভ্রষ্টতামূলক ঔদ্ধত্য, কিংবা সংশোধনকারীদের ভুলে, যারা ইচ্ছামতো বর্ধন বা কর্তন করেছে।[৩]
আগেই আলোচনা হয়েছে, যিশু সম্পর্কে অন্যান্য খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ভিন্ন মতাদর্শগুলো (যেমন Adoptionism, Docetism, Separationism, and Patripassianism) দমনের উদ্দেশ্যে অর্থোডক্স চার্চ ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু পরিবর্তন সাধন করে। [৪] নিজেদের ধর্মতত্ত্বীয় অবস্থান প্রভাবশালী করার লক্ষ্যে প্রতিটি পক্ষই শ্লোকগুলোতে পরিবর্তন এনেছে বলে সন্দেহ করা হয়। [৫] প্রতিটি রূপভেদ টেক্সটের মূলরূপকে ক্রমে বিস্মৃতির অতলে নিয়ে যেতে থাকে।

টিকাঃ
১. Metzger, pp. 186-195.
২. Comfort, p. ৪. ইচ্ছাকৃত বিকৃতির ওপর বিস্তারিত গবেষণা জানতে দ্রষ্টব্য—The Orthodox Corruption of Scripture, B.D. Ehrman.
৩. Comfort, p. 8.
৪. The Orthodox Corruption of Scripture, p. xii.
৫. ibid. p. 279.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00