📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 প্রথম যুগের খ্রিষ্টানদের ওপর অত্যাচার

📄 প্রথম যুগের খ্রিষ্টানদের ওপর অত্যাচার


রোমানদের কাছে ইহুদিধর্ম ছিল এক প্রকার উৎপাত। তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের ছন্নছাড়া প্রচেষ্টাগুলো একেবারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবুও বিদ্রোহ করার আগ পর্যন্ত রোমানরা তাদেরকে বরদাস্ত করে নিয়েছিল। এদিকে খ্রিষ্টানদের ভাগ্য এরকম ছিল না। সম্রাটের প্রতি তারা আনুগত্য প্রকাশ করেছিল বটে; কিন্তু
'দেবতাদের মন্দিরে উপাসনা না করায় তাদের নাস্তিক হিসেবে অভিহিত করা হয়।[১] এরপরেই তাদের ওপর নেমে আসে রাষ্ট্রীয় এবং প্রকাশ্য অত্যাচার। এমনকি বুদ্ধিজীবি শ্রেণি তখন খ্রিষ্টধর্মকে কুসংস্কার হিসেবে উপহাসের বস্তুতে পরিণত করে। গ্রিক-রোমান জীবন দর্শনের বিপরীতে খ্রিষ্টানদের হুমকিস্বরূপ ভাবা হতো। কারণ সমাজ থেকে তারা পৃথক ছিল এবং গোপনে উপাসনা করত। 'খবর চাউর হয়, নিজেদের ধর্মীয় জমায়েতে খ্রিষ্টানরা যৌন-উচ্ছৃঙ্খলতায় লিপ্ত হয়।'[২] সামগ্রিক প্রতিকূলতা এবং সামাজিক অত্যাচার সত্ত্বেও ৩য় শতাব্দীর মধ্যভাগের ভেতর খ্রিষ্টান ধর্ম রোমান সাম্রাজ্যের অধিকাংশ রাজ্যে শেকড় বিস্তার করে।
সামাজিক অত্যাচার ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে পরিণত হয়। ৩য় শতাব্দীর শেষের দিকে রোমান সাম্রাজ্য বিলুপ্তির পথে এগোতে থাকে। পতন ঠেকাতে তাই ২৪৯ খ্রিষ্টাব্দে দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রজাদের বলি চড়ানোর আদেশ প্রদান করা হয়। এই আদেশ মানতে অস্বীকার করা খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ নেয় রোমানরা। চার্চগামীদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। ২৬০ খ্রিষ্টাব্দে পারসিকদের হাতে সম্রাট ভ্যালেরিয়ান আটক হওয়ার পর অবশেষে বন্ধ হয় এই নিপীড়ন। এর পরের চার দশকে গির্জার কার্যক্রম বিকশিত হয়; কিন্তু ৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে আবারও প্রতিকূলে চলে যায় স্রোত। এরকম কঠিন নিগ্রহ খ্রিষ্টান সম্প্রদায় আগে কখনো আস্বাদন করেনি। হাজার না হলেও অন্তত শত-শত খ্রিষ্টান প্রাণ হারায়। অবশেষে ৩১২ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট-পদপ্রত্যাশী কনস্ট্যান্টাইনের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘ অত্যাচারের অবসান ঘটে। এবার রোমান শাসনের অধীনে দ্রুত ছড়াতে থাকে খ্রিষ্টধর্ম।[৩]

টিকাঃ
১. K.S. Latourette, Christianity through the Ages, Harper & Row, Publishers, New York, 1965. p. 32.
২. ibid. p. 35.
৩. ibid, pp. 32-36.

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 প্রাথমিক যুগের বিশ্বাস ও ধর্মচর্চা এবং ফলাফল

📄 প্রাথমিক যুগের বিশ্বাস ও ধর্মচর্চা এবং ফলাফল


একদিকে যিশুর প্রকৃত শিক্ষা-সংক্রান্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব, অন্যদিকে চতুর্থ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত খ্রিষ্টানদের ওপর টানা অত্যাচার-নির্যাতন। ফলে খ্রিষ্টধর্মের ছাতার তলে বিভিন্ন প্রকার ধর্মমতের আবির্ভাব ঘটে। এরম্যান বলেছেন—
একেশ্বরবাদী খ্রিষ্টান অবশ্যই ছিল। কিন্তু, দুই ঈশ্বরের দাবি তোলা খ্রিষ্টানও ছিল। অনেকে বিশ্বাস করত ৩০, ৩৬৫ কিংবা তার চেয়েও অধিক ঈশ্বরে...
কোনো কোনো খ্রিষ্টানের মতে খ্রিষ্ট একই সাথে মানব ও ঈশ্বর; কেউ বলত তিনি মানব, কিন্তু ঈশ্বর নন; কারও মতে তিনি ঈশ্বর, কিন্তু মানব নন; আবার কারও দাবি অনুযায়ী তিনি একজন মানুষ, যার ওপর অস্থায়ীভাবে ঈশ্বর অবতরণ করেছিলেন। যিশুর মৃত্যুকে কিছু খ্রিষ্টান বিশ্বের জন্য মুক্তি মনে করত; কেউ কেউ তার মৃত্যুর সাথে মুক্তির সম্পর্ককে অগ্রাহ্য করত; আবার কারও মতে তিনি মৃত্যু বরণই করেননি।[১]
ধর্ম হিসেবে নতুন অবস্থাতেই একে অপরের ওপর কর্তৃত্ব লাভ করতে চাওয়া ধর্মমতগুলোর কারণে যিশুর প্রকৃত শিক্ষাগুলোর সংকলন (Q) হারিয়ে যায়।[২] শূন্যতা পূরণে তাই পরবর্তী সময়ে খ্রিষ্টানদের মধ্যে উদ্ভূত টেক্সটগুলোই ধর্মগ্রন্থের মর্যাদা পায়। এসব গ্রন্থকে পুঁজি করে সততাহীন ও নড়বড়ে ধর্মতত্ত্ব তখন নিজেদের বিশ্বাসের ভিত অন্বেষণ করতে থাকে। যিশুর জীবন নিয়ে মতপার্থক্য ব্যাপক আকার ধারণ করে। এসব খ্রিষ্টান সম্প্রদায় তখন নিজ নিজ ধর্মতত্ত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সুবিধা মতো পাঠ্য রূপায়ন এবং সংস্কার করে নেয়।
অবশেষে অর্থোডক্স চার্চ অন্য সকল খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। প্রচলিত অন্যান্য মতবাদকে তারা পথভ্রষ্টতা হিসেবে চিহ্নিত করে। যেমন : Adoptionism (যিশু একজন মানব, কিন্তু ঈশ্বর নন); Docetism (যিশু ঈশ্বর, মানব নন); Separationism (যিশুর ঐশ্বরিক এবং মানব সত্তা ভিন্ন)। ভবিষ্যতে অর্থোডক্স চার্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চলা সম্প্রদায়টি প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেদের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে জেনেশুনে ধর্মপুস্তকগুলোতে পরিবর্তন আনে। ফলে বিপরীত সকল মতবাদ গুরুত্বহীন সাব্যস্ত হয়। [৩]

টিকাঃ
১. Bart D. Ehrman, The Orthodox Corruption of Scripture, Oxford : Univ. Press, 1993, P. 3. Cited thereafter as The Orthodox Corruption of Scripture.
২. Burton L. Mack, The Lost Gospel : The Book of Q & Christian Origins, Harper San Prancisco, 1993, p. 1. Q নামটি জার্মান শব্দ Quelle থেকে আগত, যার অর্থ 'উৎস'। আনুষঙ্গিক আরও তথ্য পাওয়া যাবে অধ্যায় ১৭-তে।
৩. The Orthodox Corruption of Scripture, p. xii.

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 অধ্যায় শেষে

📄 অধ্যায় শেষে


বিষয়গুলো খেয়াল করুন, বাইবেলে যিশুর শিষ্যদের নড়বড়ে চরিত্র দেখা যায়; প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর বিভিন্ন ধর্মমতের বিপরীতে প্রাথমিক অবস্থাতেই যিশুর
মূল ইঞ্জিল (Q) হারিয়ে যায়; নির্দিষ্ট ধর্মবিশ্বাস না থাকায় শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে যাওয়ার পর নতুন ধর্মতত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে নাইসীয় ধর্মমত ঘোষণা করা হয়; ঐশীসত্ত্বা সংক্রান্ত মতপার্থক্যের ছড়াছড়ির ফলে নিজেদের দৃষ্টিকোণকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে গ্রন্থ বিকৃতি; একদিকে ধর্মতত্ত্বের এই জগাখিচুড়ি, এর ওপর প্রথম তিন শতাব্দীর খ্রিষ্টান ইতিহাস ছিল অত্যাচার-নিপীড়ন দ্বারা জর্জরিত। খ্রিষ্টীয় ধর্মগ্রন্থের সংরক্ষণ এবং সঞ্চরণের জন্য এরকম একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোটেও উপযোগী ছিল না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00