📄 প্রথম শতাব্দীর অখ্রিষ্টীয় গ্রন্থাবলিতে যিশু
ইহুদি ইতিহাসবিদ জোসেফাসের (আনুমানিক ১০০ খ্রিষ্টাব্দ) রচনায় ৭৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনাবলির তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে কিন্তু যিশুখ্রিষ্ট সম্পর্কে দুটি অংশ রয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘ অংশটি অবশ্যই খ্রিষ্টানদের করা ভাবার্থ। কারণ 'এমন রঙচঙে বিবরণ কোনো অর্থোডক্স ইহুদির পক্ষে লেখা সম্ভব নয়।' [১]
আর দ্বিতীয় অংশটি শুরোর, যাহন, ফন ডবসুত্য, জাস্টার এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন। সেখানে (খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস অনুযায়ী) 'যিশুর ভাই জেমস, সেই যিশু, যাকে খ্রিষ্ট বলা হয়' অংশটিকে তারা আরেকটি জালিয়াতি বলে উল্লেখ করেছেন।[২] এদিকে একমাত্র পৌত্তলিক সূত্র হিসেবে ট্যাসিটাসের বিবৃতি দেখা যাক-
'খ্রিষ্টানদের জন্য খ্রিষ্ট হলো তাদের পরিচয় ও উৎপত্তির উৎস। টাইবেরিয়াসের শাসনামলে তাকে গভর্নর পন্টিয়াস পাইলেটের আদেশে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।'[৩]
টিকাঃ
১. ibid, p. 10.
২. ibid, p. 11; মূল ইহুদি লেখক এখানে জেরুজালেমের জেমসের কথা বলার সম্ভাবনা অত্যধিক। জেমস একজন ইহুদি নেতা ছিলেন; কিন্তু খ্রিস্টান পাঠক সেটাকে নিজেদের ধর্মীয় বর্ণনা অনুযায়ী যিশুখ্রিষ্টের ভাই জেমস মনে করে বসে। এজন্য মার্জিনে মথির বর্ণনা অনুযায়ী জেমসের পরিচয় টুকে দেন। পরবর্তী সময়ে যিনি তা কপি করেছেন তিনি এটাকে মূল টেক্সটের অংশ ভেবে গ্রহণ করে নেন।
৩. ibid. p. 13.
📄 খ্রিষ্টান-সমাজে ঐতিহাসিক খ্রিষ্ট
আমরা দেখলাম, মুখ্য উৎস থেকে যিশুকে ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। যদি তাকে বাস্তব এবং ঐশীসত্ত্বার মূল বলে ধরে নিই, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই খ্রিষ্টানরা তার সকল তথ্য সংরক্ষণ করেছে বলে প্রতীয়মান হওয়ার কথা। একজন খেলোয়াড় বা সিনে-তারকার সকল খুঁটিনাটি তার ভক্তরা পরম যত্নের সহিত টুকে রাখে। যিশুর ব্যাপারটিও তেমন হওয়ার কথা; কিন্তু বাস্তবতা প্রায় উলটো।
ক. যিশুর জীবন: গৌণ উৎসাবলি
পশ্চিমা সভ্যতার ওপর যিশুখ্রিষ্টের প্রভাব অপরিসীম। তাই তার জীবন-সংক্রান্ত সকল শিক্ষা এবং তথ্য সংগ্রহ করা একজন আধুনিক বিশেষজ্ঞের জন্য অপরিহার্য। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা খুবই কঠিন। উৎস বলতে আছে শুধু নিউ টেস্টামেন্ট। আরও নির্দিষ্ট করে বললে চারটি সুসমাচার। যেহেতু এগুলো মূলত বিধর্মীদের ধর্মান্তর ও বিশ্বাসীদের ধর্মবিশ্বাস দৃঢ়তর করার উদ্দেশ্যেই রচিত, সেহেতু জীবনীকারদের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঐতিহাসিক তথ্য এখানে নেই। সেজন্য ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে ব্যাখ্যাকারীরা স্বাধীনতা চর্চার সুযোগ পান। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই যিশু সম্পর্কে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী পাঠ্যগুলোকে বিচার করে তারা ভুল করেন। শেষমেশ নিজের মতের বাইরে তারা আর কিছু দেখতে পান না সেখানে।[১]
খ্রিষ্টানদের এ-সকল সূত্র তথা চারটি সুসমাচার ও নিউ টেস্টামেন্টের অন্যান্য লেখা থেকে প্রাপ্ত তথ্য এতটাই কম যে-তা দিয়ে পূর্ণ মাত্রার জীবনী রচনা সম্ভব নয়। সত্যি বলতে, খ্রিষ্টীয় মতবাদের প্রচার-প্রসার ছাড়া আর কোনো বিষয়ে যিশুর জীবন-সংক্রান্ত আলোচনা প্রাসঙ্গিক ছিল না। আর ধর্মীয় সমাবেশগুলোতে যেহেতু সুসমাচারের হাতে গোনা কয়েকটি অনুচ্ছেদই ঘুরেফিরে আওড়ানো হয় (মরিস বুকাইলির মন্তব্য অনুযায়ী)।[২] তাই ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে যিশুর আলোচনা তেমন গুরুত্বই পায় না।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে হামবর্গের প্রাচ্যভাষার অধ্যাপক হারম্যান রেইমারাস একেবারে প্রথম ঐতিহাসিকভাবে যিশুর জীবন পুনঃনির্মাণের চেষ্টা করেন।[৩] রেইমারাসের আগে 'যিশুর জীবন-সংক্রান্ত একমাত্র কাজটি ফারসিভাষায় একজন জেস্যুটের[৪] হাতে রচিত।'। ষোড়শ খ্রিষ্টীয় শতাব্দীর শেষার্ধে এটি রচিত হয়েছিল মুঘল সম্রাট আকবরের জন্য। জীবনীটি মূলত একটি 'দক্ষ হাতে বিকৃত করা যিশুর জীবনী। এর মধ্যে কিছু বিয়োজন এবং অ্যাপোক্রিফা[৫] থেকে গৃহীত সংযোজন রয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল উদারমনা সম্রাটের সামনে একজন মহান যিশুকে তুলে ধরা। সম্রাটকে আঘাত করার মতো কিছু সেখানে রাখা হয়নি।[৬]
সংশয়পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও প্রায় এক শতাব্দী পর উক্ত জীবনী ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করা হয়। মূলত রিফর্মড চার্চের একজন ধর্মবিদ ক্যাথলিকবাদকে কলঙ্কিত করার উদ্দেশ্যে কাজটি করেন।[৭] কাজেই যিশুর মৃত্যুর ১৬শ বছর পর তার জীবনী রচনার প্রথম চেষ্টাটি ছিল মূলত ঐতিহাসিকভাবে ভুল একটি মিশনারি টেক্সট। এটি ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মতবাদগত যুদ্ধের গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এমনকি পরবর্তী বিশেষজ্ঞগণও টেকসই কোনো জীবনী রচনা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। মূল ইঞ্জিল হারিয়ে যাওয়ার পর দুই হাজার বছরেও যিশুর ঐতিহাসিক বিবরণ রচনার প্রতি কোনো সফল প্রচেষ্টার নজির দেখা যায় না। আমেরিকান বাইবেল পণ্ডিত রবার্ট ফাঙ্ক বলেছেন :
আমার অনুসন্ধান অনুযায়ী, যিশুর মৃত্যু-পরবর্তী তিনশ বছরের মধ্যে কেউ তার সকল বাণীর একটি সামগ্রিক তালিকা সংকলন করতে সমর্থ হয়নি... বিগত শতাব্দী এবং তার আগের পন্ডিতদের রচিত গ্রন্থাবলিতে তার বাণী বা কর্মকাণ্ডের কোনো বিশ্লেষণাত্মক তালিকা আমি পাইনি... (আমার সহকর্মীদের মধ্যেও) কেউই বিশুদ্ধ তালিকা করতে পারেনি... (যদিও) তারা প্রায় প্রতিদিন যিশুকে নিয়ে বক্তৃতা দেয়, লেখালেখি করে। [৮]
কেউ চাইলে বিশ্বাসের ভিত্তিতে নিউ টেস্টামেন্টের যিশুকে মেনে নিতেই পারে; কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত এতটাই অপ্রতুল যে, বিশটি শতক পেরিয়ে যাওয়ার পর এখন প্রাথমিক রূপরেখা টানাও বড় মুশকিল। [৯]
টিকাঃ
১. Dictionary of the Bible, p. 477.
২. Maurice Bucaille, The Bible, The Qur'an and Science, American Trust Publications, Indianapolis, Indiana, 1978.
৩. Albert Schweitzer, The Quest of the Historical Jesus, Collier Books, 1968, p. 13. Cited thereafter as Schweitzer.
৪. রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের 'Society of Jesus' নামক ধর্মসংঘের সদস্যকে জেস্যুট বলে- অনুবাদক
৫. অনেক পুস্তক রয়েছে যেগুলো প্রাচীনকাল থেকে ইহুদি-সমাজে ও প্রথম শতাব্দীগুলোর খ্রিস্টান-সমাজে আসমানি গ্রন্থ হিসেবে প্রচলিত ছিল। পরবর্তী যুগের ইহুদি-খ্রিস্টান পন্ডিতরা সেগুলো গ্রহণ করেননি। এগুলো এপোক্রিফা বা গোপন বা সন্দেহজনক পুস্তক বলে। তবে তাদের স্বীকৃত কোনো কোনো পুস্তক এবং বাইবেলের অনেক প্রাচীন পাণ্ডুলিপির মধ্যেও এসব পুস্তক পাওয়া যায়। সন্দেহজনক নতুন নিয়ম বলতে একশরও বেশি পুস্তক বোঝানো হয় যেগুলো খ্রিস্টানরা ২য় থেকে ৪র্থ শতাব্দীর মধ্যে লিখেছেন-অনুবাদক
৬. ibid, 13.
৭. ibid. p. 14.
৮. R.W. Funk, B.B. Scott and J.R. Butts, The Parables of Jesus: Red Letter Edition, Polebridge Press, Sonoma, California, 1988, p. xi.
৯. Bultmann, as referred to by G.A. Wells, Did Jesus exist?, p. 9.
📄 খ্রিষ্টের ভাষা
তথ্যের অপ্রতুলতার দরুণ যিশুর চরিত্রের মৌলিক অনেক বৈশিষ্ট্যই আমরা জানি না। তার প্রচারিত বাণীর পূর্ণাঙ্গ কোনো তালিকা তার অনুসারীরা তৈরি করতে পারেননি। অন্তত তিনি যেই ভাষায় এগুলো বলেছিলেন, তার ব্যাপারেও কি বিশেষজ্ঞগণ একমত হতে পেরেছেন? সুসমাচার থেকে এর কোনো নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যায় না। বর্তমান ও অতীতের খ্রিষ্টান রচয়িতারাও এর পরিষ্কার কোনো উত্তর দিতে পারেননি। এই বিষয়ে পূর্বেকার বিশেষজ্ঞগণের কিছু অনুমানভিত্তিক মত রয়েছে। সম্ভাব্য ভাষাগুলো হলো ক্যালডাইক (জে. জে. স্ক্যালিগার); সিরিয়াক (ক্লড সমেইজ); ওঙ্কেলোস এবং জোনাথনের আঞ্চলিক ভাষা (ডিলিটশ ও রেশ); আরামাইক (মায়ার)। এমনকি ল্যাটিনের পক্ষেও মত মেলে, যার প্রবক্তা ইনশোফার বলেছেন, 'এছাড়া পৃথিবীতে প্রভু আর কোনো ভাষা ব্যবহার করতে পারেন না। কারণ স্বর্গবাসী সাধুরা এই ভাষায় কথা বলেন।' [১]
টিকাঃ
১. Schweitzer, pp. 271, 275.
📄 খ্রিষ্ট : ঈশ্বরের নৈতিক বৈশিষ্ট্য?
খ্রিস্টকে বলা হয় ঐশীসত্ত্বার তিন অংশের একটি; কিন্তু যেকোনো গির্জায় প্রবেশ করলে এই ঐশীসত্তার বাকি দুই অংশের অনুপস্থিতি স্পষ্ট ধরা পড়বে। শুধু যিশুর প্রতিকৃতিকেই মনে হবে প্রধান। একদিকে পিতা এবং পবিত্র আত্মা প্রায় পুরোপুরি উপেক্ষিত, অন্যদিকে যিশু প্রকটভাবে পরিস্ফুট।
আবার এত বেশি সম্মানের পাত্র হওয়ার পরেও কিছু খ্রিষ্টান লেখকের কলমে তার চরিত্রের ওপর প্রচুর কালিমা পড়েছে। ফলে যিশু বিশ্বজনীনভাবে খ্রিষ্টানদের ভালোবাসার পাত্র কি না বা অন্তত নৈতিকভাবে অনুকরণযোগ্য কি না-তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
ক. ক্যানন মন্টেফিওর: যিশু কি সমকামী ছিলেন?
১৯৬৭ সালে অক্সফোর্ডে মডার্ন চার্চমেনস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। ক্যানন হিউ মন্টেফিওর তখন কেমব্রিজের গ্রেট সেন্ট মেরির ভিকার পদে ছিলেন। যিশু সম্পর্কে নিজের বক্তৃতায় তিনি বলেছেন-
'নারীরা তার বন্ধু ছিল; কিন্তু বলা হয়, তিনি ভালোবাসতেন মূলত পুরুষদের। এক্ষেত্রে তার অবিবাহিত থাকাটা একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। পুরুষরা বিয়ে না করার কারণ ছিল সাধারণত তিনটি-
১. সামর্থ্যের অভাব, ২. নারীর অভাব, অথবা ৩. স্বভাবগত সমকামিতা।'[১]
খ. মার্টিন লুথার : যিশুর তিনবার যিনা
লুথারের রচনা থেকেও যিশুর মন্দ চিত্র প্রকাশ পায়। তার Table Talk গ্রন্থে পাওয়া যাবে এটি। বিব্রতকর হলেও এর সত্যতা নিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ প্রশ্ন তোলেনি। আরনল্ড লুন লিখেছেন-
'Table Talk থেকে উইমার একটি অংশ উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে যিশু তিনবার ব্যভিচার করেছেন বলে লুথার বিবৃত করেন। প্রথমবার কুয়োর পাশে মহিলার সাথে, দ্বিতীয়বার মেরি ম্যাগড্যালেন এবং তৃতীয়বার ব্যভিচারে ধৃত মহিলার সাথে; যাকে তিনি অনেক সহজে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এইভাবে মহাপবিত্র খ্রিষ্টও মৃত্যুর আগে ব্যভিচারে লিপ্ত হন।'[২]
টিকাঃ
১. The Times, Jul 28, 1967.
২. Arnold Lunn, The Revolt Against Reason, Eyre & Spottiswoode (Publishers). London, 1950. p. 233. Original: “Christus adulter. Christus ist am ersten ein ebrecher worden Joh. 4, bei dem brunn cum muliere, quia illi dicebant: Nemo significat, quid facit cum ea? Item cum Magdalena, item cum adultera Joan. 8, die er so leicht davon lies. Also mus der from Christus auch am ersten ein ebrecher werden ehe er starb.”