📄 অধ্যায় শেষে
সিনাই পর্বত থেকে মোশির প্রত্যাদেশ পাওয়া এবং হিব্রু টেক্সটের প্রমিতকরণের মাঝে রয়েছে বহু শতাব্দীর ব্যবধান। কালের এই বিশাল পরিক্রমায় পাঠ্যগুলোতে কোনো রকম ভুল, পরিবর্তন ও সংযোজন না থাকাটা হবে অলৌকিকতার নামান্তর। আর নিশ্চিতভাবেই ইহুদিদের ইতিহাস থেকে এমন কোনো অলৌকিকতার তথ্য পাওয়া যায় না। ফিলিস্তিনের তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থা খুব সহজেই আমরা দেখতে পাই। এমনকি ঐক্যবদ্ধ ইহুদিরাষ্ট্র থাকাকালীনও ওল্ড টেস্টামেন্টের বিশুদ্ধ ও যথাযথ প্রচারের মতো পরিবেশ সেখানে ছিল না। রাজারা এর প্রচার-প্রসার থেকে বিমুখ ছিলেন এবং ধর্মগ্রন্থের প্রতি তাদের কোনো প্রকার অনুরক্তিও ছিল না। এদিকে জনগণ মূর্তি নির্মাণ এবং শিশু বলিদানের মতো পৌত্তলিক সংস্কৃতিকে আপন করে নেয়। এর ওপর খোদ টেক্সটই বার বার খোয়া গেছে এবং প্রতিবারই কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত তা নিখোঁজ থেকেছে।
ইহুদিদের ধর্মীয় ও সাহিত্য-সংস্কৃতির ভিত্তি আহরণ করা হয়েছে অ-ইহুদি সমাজ থেকে। ফলে তাদের ইতিহাসের শুরু থেকেই ওল্ড টেস্টামেন্টে বাইরে থেকে অনেক কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটেছে। যেমন:
(ক) ফোনেশীয়দের কাছ থেকে হিব্রু ভাষা ধার করা।
(খ) ইহুদিদের নিজস্ব কোনো লিপি না থাকা; বরং আরামীয় ও আসিরীয়দেরটা আত্মস্থ করা।
(গ) হিব্রু তোরাহ-এর উচ্চারণ-চিহ্ন যুক্ত করার পদ্ধতি আরবি থেকে ধার করা।
(ঘ) চুক্তির অধ্যায় বা the Book of the Covenant (যাত্রাপুস্তক ২০: ২২-২৩ : ১৯) খুব সম্ভব হাম্মুরাবি কোডের আলোকে রচনা করা। এরকম আরও অনেক বিষয় রয়েছে।
মোশির মৃত্যুর পর প্রায় ২৩০০ বছর অর্থাৎ দশম শতাব্দী পর্যন্ত টেক্সট পরিবর্তনশীল অবস্থায় ছিল। অর্থাৎ মতাদর্শের দোহাই দিয়ে পাঠ্য পরিবর্তন করার সুযোগ ছিল। পরিবর্তন সম্পন্ন হওয়ার পর মূল উৎসটিকেই নতুন সংস্করণের বিপরীতে ‘ত্রুটিযুক্ত’ আখ্যায়িত করা হয় ও তা নিশ্চিহ্ন করা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। এতে করে অনেক পুরোনো ও অখণ্ড সূত্র ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়।
এখন কুরআনের একটি আয়াত লক্ষ করা যাক—
‘যারা অনুসরণ করে রাসুলের, নিরক্ষর নবির, যার উল্লেখ তারা তাদের তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিপিবদ্ধ পায়।’[১] অর্থাৎ তাদের পরিবর্তিত গ্রন্থেও স্পষ্টভাবে শেষ নবির কথা উল্লেখ ছিল। অনেক সাহাবি এবং তাবিয়ি সেসব সূত্র দেখেছেন।[২] কিন্তু পরে তা ব্যাপকভাবে সাফ করা হয়।[৩] দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি পেশ করে আমি চলতি অধ্যায়ের সমাপ্তি টানছি—
‘প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রে ঐশী প্রত্যাদেশ ছিল, তবে অংশ আকারে। এটা সনাতন ইহুদিধর্মের মুখ্য বিশ্বাস। সিনাইয়ে ঈশ্বর দুই প্রকার প্রত্যাদেশ প্রদান করেছেন। লিখিত অংশটি সবাই জানে। মৌখিক অংশটিও মহান শাস্ত্রীয় মহাপুরুষগণ সংরক্ষণ করেছেন। দূরবর্তী অতীতে পূর্বপুরুষগণ নবিদের কাছ থেকে সেগুলো পান এবং সবশেষে তা ফিলিস্তিনি ও ব্যাবিলনীয় তালমুদের রচয়িতা র্যাবাইদের হাতে পৌঁছে দেন।’[৪]
‘(কুমরান থেকে প্রাপ্ত) নমুনাগুলো এখন হাতে থাকায় পাঠ্য-বিশেষজ্ঞরা… এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চলেছেন যে, এটি বিগত দুই হাজার বছর ধরে বাহ্যত
অপরিবর্তিত রয়েছে।[১]
অথচ ওল্ড টেস্টামেন্টের যে ইতিহাস আমরা জানলাম, তার বিপরীতে উল্লিখিত বিবৃতিগুলো বড়জোর অতিকল্পনার ফসল বলা চলে। এর বিপরীতে কুরআনের বিশুদ্ধতা নিশ্চিতকরণে মুসলিমদের অনুসৃত প্রক্রিয়াগুলোর কথা একবার স্মরণ করুন। যদিও হুঁশিয়ার পাঠক ইতোমধ্যেই তা করে ফেলেছেন নিশ্চয়। সামনে নিউ টেস্টামেন্টের আলোচনা থেকে আরও অনেক চিন্তার খোরাক আসবে বলে আশা রাখি।
টিকাঃ
১. সুরা আরাফ, আয়াত: ১৫৭
২. ইবনু কাসির, তাফসির, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২২৯-২৩৪ দ্রষ্টব্য।
৩. উল্লেখ্য, এখনো কিছু আলামত বিদ্যমান রয়েছে। ইউসুফ আলির Translation of Holy Qur’an গ্রন্থের ৪৮: ২৯ এর পাদটীকা দ্রষ্টব্য।
৪. The Way of Torah, J. Neusner, p. 81.
৫. Geza Vermes, The Dead Sea Scroll in English, Pelican Books, 2nd edition, 1965, p. 12.