📄 ইসলামি ধারা থেকে প্রবর্তিত উচ্চারণচিহ্ন
'উচ্চারণ বোঝানোর জন্য কোনো লিখিতরীতি ছিল না, যার দ্বারা পাঠ্যের উচ্চারণ বা স্বরভঙ্গি বোঝা যায়। উচ্চারণচিহ্ন উৎপত্তির সময়কাল অজানা।'[১]
পঞ্চম শতাব্দীতে এর সূচনা মর্মে উত্থাপিত দাবি এখন বাতিল। ব্যাবিলনীয় তালমুদে যেহেতু কোনো উচ্চারণচিহ্ন নেই, তাই ব্রুনো কিয়েসা ৬৫০-৭৫০ খ্রিষ্টাব্দকে এর সূচনা লগ্ন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এটা আসলে অনুমান। কারণ তার মতে ব্যাবলনীয় তালমুদের কাজের সমাপ্তিকাল আনুমানিক ৬০০ খ্রিষ্টাব্দ। Dictionary of Bible অনুযায়ী ৫০০ খ্রিষ্টাব্দ, আবার নিউসনারের মতে ছয় খণ্ডের মধ্যে মাত্র চারটি খণ্ডের ভিত্তি করে উচ্চারণচিহ্ন গোড়াপত্তনের হিসাব কষা একেবারেই নিরর্থক।
(মোশি গোশেন-গটস্টেইন) ৭০০ খ্রিষ্টাব্দের আশেপাশের কোনো এক সময়কে এইচে ইসলামি যুদ্ধজয় কাল হিসেবে। তার মতে, উচ্চারণ এবং স্বরচিহ্নের উদ্ভাবনের পেছনে ইসলামি যুদ্ধজয়গুলোর প্রভাব আছে। কারণ এর ফলে যথাযথ পাঠপদ্ধতি বিলুপ্তির হুমকির মুখে পড়ে গিয়েছিল।[২]
স্বরচিহ্ন উদ্ভাবনকে ইসলামি আক্রমণের হুমকির প্রতিক্রিয়া বলে ভাবাটা খুব একটা বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তা নয়; বরং অতীব সম্ভাবনা এটিই যে, তা আরবি সুরচিহ্ন পদ্ধতির অনুসরণেই উদ্ভাবিত। ইসলামের সাথে মুসলিমদের এই সুরপদ্ধতিও ছড়িয়ে যাচ্ছিল সর্বদিকে।
'সপ্তম শতাব্দীতে ব্যঞ্জনবর্ণের ওপরে ও নিচে স্বরচিহ্ন ব্যবহারের একটি পদ্ধতির প্রচলন ঘটে। খুব সম্ভবত তা সিরিয়াকের আদলে গঠিত। ইহুদি পরিভাষায় তা পরিচিতি পায় "পয়েন্টিং" নামে।'[৩]
এ বিষয়ে দশম অধ্যায়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। ৪৫০ সাল থেকে নিসিবিসে অনেক মঠ ও কলেজের পাশাপাশি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থাকার পরেও সিরিয়ানরা ৭০০ খ্রিষ্টাব্দের আগে উচ্চারণ চিহ্নের মুখ দেখেনি। সিরিয়াক ব্যাকরণের জনক হুনাইন ইবনু ইসহাক (৮১০-৮৭৩ খ্রি.) ছিলেন বিখ্যাত আরবি ব্যাকরণবিদ খলিল ইবনু আহমাদ ফারাদিহি (৭১৮-৭৮৬ খ্রি.) রাহিমাহুল্লাহর ছাত্রের ছাত্র।[৪] এই ক্রমধারা থেকে 'পয়েন্টিং' একটি মুসলিম উদ্ভাবন বলে স্পষ্ট হয়। এখান থেকে সিরিয়াক এবং তাদের থেকে ইহুদিরা তা গ্রহণ করে।
'হিব্রু টেক্সটের ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে স্বরধ্বনি যুক্ত করার তারিখ নির্ণয় করতে গেলে তা খুব বেশি হলে বড় একটি সময়-কালের মধ্যে স্থির করা সম্ভব। তালমুদ (আনুমানিক ৫০০ খ্রিষ্টাব্দ) কিংবা জেরোমি (৪২০ খ্রিষ্টাব্দ) কোনোটা থেকেই লিখিত উচ্চারণের ব্যাপারে কিছু জানা যায় না। জিন্সবার্গের মতে লৈখিক চিহ্নের প্রচলন আনুমানিক ৬৫০-৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে ঘটে। এদিকে মেসোরেটদের কাজ আনুমানিক ৭০০ খ্রিষ্টাব্দে সমাপ্ত হয়।'[৫]
উক্ত তারিখগুলোর ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে; কিন্তু তাদেরই দেওয়া এসব তারিখ ইসলামের সূচনালগ্নের সাথে খাপে খাপে মিলে যায়। পয়েন্টিং পদ্ধতির নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে আরেকটি বড় ব্যাপার হলো-
'জাতীয় ভাষা হিসেবে হিব্রু যখন জীবিত ছিল, তার সাথে টাইবেরিয়ার মেসোরীয়দের এক হাজার বছরেরও বেশি ব্যবধান। সব মিলিয়ে এটি অনুমেয় যে, মধ্যবর্তী এই সময়ে হিব্রুর উচ্চারণে কিছু পরিবর্তন এসেছে। তাতে কোনো স্বরচিহ্ন না থাকার কারণে ব্যাপারটি আরও স্পষ্ট হয়... টাইবেরীয় পদ্ধতিতে তাই দরকার অনুযায়ী কিছু কৃত্রিম নিয়মের প্রবেশ ঘটা প্রত্যাশিত বলা যায়। শুদ্ধ উচ্চারণ ধার্য করার প্রচেষ্টায় মেসোরাহা মিশরীয়াক এবং ইসলামি শব্দতত্ত্বের মতো বহিরাগত প্রভাব গ্রহণ করে নিতে আগ্রহী হয়ে পড়ে।[৬]
টিকাঃ
১. ibid, p. 21
২. ibid, p. 21
৩. ibid. p. 22.
৪. কাহহালা, মুজামুল মুওয়াল্লিফিন, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৬৬২
৫. Dictionary of the Bible. p. 972.
৬. Wuerthwein, pp. 26-7
📄 ইসলামি প্রভাবে পশ্চিমে মেসোরীয় কার্যক্রমের বিকাশ
কারায়াইট প্রভাবে আবারও পশ্চিমে মেসোরীয় কর্মতৎপরতা ৭৮০-৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে সমৃদ্ধি লাভ করে... ফিলিস্তিনী পদ্ধতির আলোকে গড়ে ওঠে একটি নতুন টাইবেরীয় পদ্ধতি। উচ্চারণ থেকেই অন্তর্নিহিত দ্যোতনা বোঝানোর একটি পদ্ধতি তৈরি হয় এতে। এতে বাইবেলীয় পাঠ্যের স্বরভঙ্গি এবং উচ্চারণের সূক্ষ্ম খুঁটিনাটিও বোঝা যায়।[১]
কারায়াইট আন্দোলনের[২] জন্মই হয়েছে ইসলামি সভ্যতার ছায়াতলে। এই আন্দোলন যদি টাইবেরীয় পদ্ধতি সৃষ্টির পেছনে মূল প্রেরণা হয়ে থাকে, তাহলে বলাই যায়—পুরো ব্যাপারটি মুসলিমদের ভাষাচর্চা থেকে উদ্ভূত। টাইবেরীয় পদ্ধতির আবির্ভাবের একশ বছরেরও আগে থেকে কুরআনে (প্রতিটি শব্দের সঠিক স্বরধ্বনি প্রকাশের জন্য) উচ্চারণচিহ্নের বিশদ ব্যবহার বর্তমান ছিল।[৩]
টিকাঃ
১. ibid, p. 24
২. কোজমানের মতে, তারা একটি ইহুদি সম্প্রদায় যারা শুধু তাওরাত বিশ্বাস করে এবং তালমুদ অস্বীকার করে। (Qamus 'lbri-'Arabi, Beirut, 1970, p. 835)
৩. ইহুদিসমাজে ইসলামি সভ্যতার প্রভাব কেবল গুটিকয়েক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের সংস্কৃতি প্রাঙ্গণের প্রায় সর্বত্রই এক বিশাল পুনর্জাগরণের প্রভাব ফেলেছে ইসলাম। আজকের ইহুদিদের যে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক রূপ আমরা দেখতে পাই, তার পেছনে মধ্যযুগের ক্রমবিকাশমান ইসলামি সভ্যতার বহুমুখী প্রভাব রয়েছে। সিনাগগের রীতিনীতি, ইহুদিজীবন পরিচালনার জন্য বিধিবিধানের কাঠামোর একটি আদর্শ রূপ গঠিত হয় সে সময়। ইহুদি দর্শনের মূলভিত্তি গড়ে তোলা গ্রন্থগুলোও এ সময়ে রচিত। সায়াদইয়ার Book of Beliefs and Opinions (c. 936) ও মাইমোনাইডেসের Guide to the Perplexed (1990) সেইসব গ্রন্থের মধ্যে অন্যতম। আর এগুলো তৎকালীন সময়েই রচিত। (Norman A. Stillman, The Jews of Arab Lands: A History and Source Book, The Jewish Publication Society of America, Philadelphia, 1979, pp. 40-41.)
📄 তালমুদে ইসলামের প্রভাব
বনি ইসরাইলের মহাযাত্রার তেরশ বছর পর ধর্মপুস্তকগুলো ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে শূন্যস্থান দেখা দেয়। অসংখ্য মিশনাহ প্রচলিত থাকায় সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা নির্মূলের প্রচেষ্টাও চলতে থাকে। আনুমানিক ২০০ খ্রিষ্টাব্দে র্যাবাই জুদাহ হা-নাসির সম্পাদনা কর্মের ফলে অন্য সংকলনগুলো গুরুত্বহীন হয়ে যায়। অবশ্য তার শিক্ষার্থী এবং আরও কিছু অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরও এতে সমন্বিত অবদান আছে। [১] তালমুদের একদম মূলের সাথে এই মিশনাহর সম্পর্ক বিদ্যমান। এর সাথে আরও মন্তব্য ও ব্যাখ্যা যুক্ত হয়।
'ধর্মের সকল বিষয়ে তালমুদকে অন্তত অর্থোডক্স ইহুদিরা সর্বোচ্চ পর্যায়ের মনে করে... মন্তব্য এবং ব্যাখ্যাগুলোর মাধ্যমে ধর্মপুস্তকের অর্থ জানা যায়। এই আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যাগুলো ছাড়া ধর্মীয় পুস্তকের প্রায়োগিক মূল্য ইহুদিদের জন্য অনেকটাই কমে যেত... তাই অর্থোডক্স ইহুদিধর্মে তালমুদের অবস্থান ধর্মীয় গ্রন্থের মতোই বলাটা কোনো অত্যুক্তি নয়।' [২]
তালমুদ রচিত হয় দুটি—এক. ফিলিস্তিনি। দুই. ব্যাবিলনীয়।
এর মধ্যে দ্বিতীয়টি বেশি প্রসিদ্ধ। তবে তাদের রচনাকাল নিয়ে রয়েছে প্রচণ্ড মতবিরোধ। [৩]
ব্যাবিলনীয় তালমুদের রচনাসমাপপ্তির আনুমানিক সময়কাল হিসেবে প্রস্তাব করা হয় ৪০০, ৫০০, ৬০০ ও ৭০০ খ্রিষ্টাব্দকে। এতেই বোঝা যায় তথ্য-প্রমাণ যা-ও বা আছে, সেটাও কতটা অনিশ্চিত। তবে নিউজনারের তারিখ নিরূপণ সঠিক হলেও এর চূড়ান্ত সম্পাদনা সংঘটিত হয় ইসলামি শাসনামলে ইরাকে ইসলামি ফিকহশাস্ত্রের ছায়াতলে। এমনকি ১৩ শতাব্দীতেও মিশনাহর ব্যাখ্যা রচনা চলমান ছিল; যার ওপর মুসলিম সংস্কৃতির বিপুল প্রভাব বিদ্যমান। ড্যানবির ভাষায়—
মুসলিমদের ব্যাবিলন জয়ের পর কয়েক শতাব্দী ধরে তা র্যাবাইদের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে... আরব আলিমদের সান্নিধ্যে আসার ফলে যেন নতুন উদ্যম সৃষ্টি হয়। নবম এবং দশম শতাব্দীতে হয় হিব্রু সাহিত্যের ব্যাকরণ এবং ভাষাবিজ্ঞানের সূচনা। অদ্যাবধি পাওয়া মিশনাহর সবচেয়ে পুরোনো ব্যাখ্যা (সাধারণ অর্থে) প্রদান করেছেন হাই গাওন... তিনি প্রায় পুরোপুরিভাবে ভাষাতাত্ত্বিক সমস্যা নিয়ে কাজ করেছেন। অস্পষ্ট শব্দগুলোর উৎপত্তি অন্বেষণে তিনি আরবিকে বেশ ভালোভাবেই ব্যবহার করেছেন। [৪]
মধ্যযুগের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব মাইমোনিডিজ (১১৩৫-১২০৪) যুবক বয়সের প্রথমদিকে সম্পূর্ণ মিশনাহর ভূমিকা এবং ব্যাখ্যা লিখেছিলেন। আরবি ভাষায় লিখিত এই গ্রন্থটির নাম ছিল কিতাবুস সিরাজ অর্থাৎ 'আলোর কিতাব'। শুধু ব্যাখ্যা করেই তিনি ক্ষান্ত হননি। পাঠকের সামনে পাঠ্য বিষয়ের সাধারণ মূলনীতিও তুলে ধরার চেষ্টা করেন। মিশনাহ বোঝার ক্ষেত্রে বড় একটি সমস্যা দূরীভূত হয়।[৫]
টিকাঃ
১. Dictionary of the Bible, p. 954.
২. ibid, p. 956.
৩. অধ্যায় ১৫.৬. দ্রষ্টব্য।
৪. Danby (trans), The Mishnah, Introduction, pp. xxviii-xxix.
৫. ibid, p. xxix.