📄 মতধারাগত কারণে ইচ্ছাকৃত পরিবর্তন
ইচ্ছাকৃত পরিবর্তনগুলোই অধিক মনোযোগের দাবিদার। কারণ স্বাভাবিকভাবেই সেগুলো অনেক বেশি মারাত্মক পর্যায়ের। মধ্যযুগ পর্যন্ত ওল্ড টেস্টামেন্টের কোনো প্রতিষ্ঠিত পাঠ্য ছিল না এবং 'স্বীকৃত টেক্সট প্রতিষ্ঠালাভের আগপর্যন্ত সেটাকে অপরিবর্তনীয়ও মনে করা হতো না।'[১] এজন্য প্রচারকারী এবং লিপিকারগণ যখনই প্রয়োজন মনে করেছে, পরিবর্তন এনেছে তাতে। তাদের উদ্দেশ্য যেটাই হোক না কেন, মূলপাঠ্য এতে সত্যিই বিকৃত হয়েছে। এমনকি যেই মেসোরেটিক পাঠ্যের উদ্দেশ্য ছিল ওল্ড টেস্টামেন্টকে পরিবর্তন থেকে রক্ষা করা, তা নিজেও পরিবর্তন থেকে বাঁচতে পারেনি।[২]
প্রথম দিককার (মেসোটেরিক) টেক্সটগুলো পুনরুদ্ধার, পুনর্গঠন করার ব্যাপারটা (র্যাবাইগণের) ক্রিয়াকলাপের একটি উদাহরণ মাত্র। সমালোচনার অবকাশ থাকা সত্ত্বেও তারা সেগুলো সংরক্ষণ করেছেন। কিন্তু এর বিরূপ চিত্রও দেখা যায়। নিজেদের মতধারাগত যথেষ্ট কারণ থাকলে নির্দ্বিধায় পাঠ্য পরিবর্তন করার স্পষ্ট প্রমাণ আছে।[৩]
কী ছিল সেসব অতীব গুরুত্বপূর্ণ কারণ যার জন্য পাঠ্য পরিবর্তনের মতো কাজ করতে হলো? কখনো ধর্মীয়ভাবে আপত্তিকর শব্দ মুছে দিয়ে পরিবর্তন করা হয়েছে। আবার কখনো হয়তো একটি কঠিন শব্দ বদলে দিয়ে বসানো হয়েছে প্রচলিত শব্দ। মানে সামান্য ভাষাগত কারণে টেক্সট পরিবর্তন। তবে সবচেয়ে মারাত্মক হলো নির্দিস্ট একটি বয়ান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এমন কোনো শব্দ যুক্ত করা, যাতে শ্লোক-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যাখ্যাগুলো ঢাকা পড়ে যায়।[৪] এসব পরিবর্তনের সীমিত একটি তালিকা টীকা আকারে সংরক্ষণ করেছে ইহুদিরা। সেগুলো Tiqqune sopherim এবং Itture sopherim নামে পরিচিত। এসব কাজ যে পরিবর্তন সাধনের পরবর্তী সময়ের, তা বলাই বাহুল্য।
ক. Tiqqune sopherim-এর মধ্যে মতধারা সংশ্লিষ্ট কারণে কিছু পরিবর্তনের উল্লেখ রয়েছে। যেমন : একটি মেসোরীয় সূত্রে বলা হয়েছে, 'ঈশ্বরের প্রতি আপত্তিকর অভিব্যক্তি' দূরীকরণে আঠারোটি স্থানে পরিবর্তন আনা হয়েছে।[৫]
খ. Itture sopherim-এর মধ্যে লিপিকারদের ইচ্ছানুযায়ী মূলটেক্সটের কিছু শব্দ পরিবর্তনের তালিকা পাওয়া যায়। যেমন : ব্যাবিলনীয় তালমুদে (Ned. 37b) এমন পাঁচটি অংশ আছে, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বাদ দিয়ে যেতে হবে। আবার এমন সাতটি অংশ আছে যেখানে পাঠ্যবহির্ভূত কিছু শব্দ পাঠ করতে হবে।[৬]
এ-সকল কর্মকাণ্ড আসলে একটি বৃহত্তর প্রক্রিয়ার ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র।[৭]
টিকাঃ
১. Wuerthwein, p. 111
২. ibid, p. iii
৩. ibid, p. 17
৪. ibid, pp. 111-112
৫. ibid. p. 17
৬. ibid. p. 18
৭. ibid. p. 18
📄 ১০০ খ্রিষ্টাব্দের আগ পর্যন্ত ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রামাণ্য টেক্সটের অনুপস্থিতি
কুমরান থেকে প্রাপ্ত কিছু পাণ্ডুলিপির সাথে মেসোরীয় টেক্সটের অনেকটাই মিল আছে। এগুলোর কাজ মধ্যযুগে সমাপ্ত হয়েছে।
'কিন্তু বাহ্যিক অনেক মিল থাকলেও একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। মেসোরীয় সদৃশ কুমরান পাঠ্যগুলো ছিল প্রচলিত কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের মধ্যে একটি মাত্র... অন্যগুলোর চেয়ে তা পাঠ্যগুলোর ক্ষেত্রে তো বটেই, পুরো ইহুদিজগতেও একটিও প্রামাণ্য পাঠ্য ছিল না।'[১]
ইহুদি পুনর্জাগরণ যুগে এসে এই টেক্সটগুলোর মধ্যে একটি প্রাধান্য পেতে শুরু করে। প্রথম খ্রিষ্টীয় শতাব্দীর আগপর্যন্ত প্রচলিত বাকি সব টেক্সটকে ছাপিয়ে ওঠে এটি।
কুমরান গুহায় মূলত তিন প্রকারের স্বতন্ত্র টেক্সট পাওয়া যায়: সামারীয় পেন্টাটিউক, সেপ্টুয়াগিন্ট এবং মেসোরীয়। উয়ের্থওয়াইনের সূত্রমতে এগুলো ৭০-১৩৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে প্রামাণ্য হয়ে উঠতে থাকে।[২] যদিও এই উপসংহারের ভিত্তি ত্রুটিপূর্ণ। কুমরান এবং ওয়াদি মুরাব্বায়াতের কিছু গুহার বয়স নির্ণয় করা হয়েছে ভুলভাবে। সেখান থেকেই উক্ত সিদ্ধান্তের উদ্ভব। এ বিষয়ে সামনে আলোচনা আসবে।
টিকাঃ
১. ibid, p. 14
২. ibid, p. 14
📄 দশম শতাব্দীতে ওল্ড টেস্টামেন্ট বিধিবদ্ধকরণ এবং পূর্ববর্তী পাণ্ডুলিপি ধ্বংস
ত্রুটিপূর্ণ ও ক্ষয়প্রাপ্ত পাণ্ডুলিপি ধ্বংস করা ইহুদিদের জন্য জরুরি হয়ে পড়ে। দশম শতাব্দীতে পণ্ডিতগণ অবশেষে টেক্সট বিধিবদ্ধ করতে সক্ষম হন। ক্রমবিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ের পুরোনো সকল পাণ্ডুলিপি তখন স্বাভাবিকভাবেই অসম্পূর্ণ বলে বিবেচিত হতে থাকে। সময়ের সাথে হারিয়ে যায় সেগুলো।[১]
দশম শতাব্দীতে যখন এই একক পাঠ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, একই সময়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে মেসোরার। অর্থাৎ উচ্চারণ এবং স্বরচিহ্ন পদ্ধতি, যার উদ্দেশ্য ভবিষ্যৎ লেখিক ত্রুটি এড়ানো। এরমধ্যে ইহুদিদের প্রধান ব্যাবিলনীয় বসতি গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে এবং দশম এবং একাদশ শতাব্দীর মধ্যে তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে আরও সহজ হয়ে যায় এই 'ত্রুটিপূর্ণ' পাণ্ডুলিপি ধ্বংস এবং মেসোরাহ পদ্ধতির বাস্তবায়ন কার্যক্রম।
'পশ্চিমারা আবারও ইহুদিধর্মের আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব অধিগ্রহণ করে। পশ্চিমা মেসোরীয়রা নেমে পড়ে নিজেদের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সকল টেক্সট নিশ্চিহ্ন করার কাজে। (পশ্চিমা) টাইবেরিয়াস ঘরানার চিন্তাধারা ভবিষ্যতের আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। হাজার বছরের জন্য হারিয়ে যায় পূর্বীয় ধারা।'[২]
মেসোরা পদ্ধতি যুক্ত করার পর এটিকেই ভবিষ্যৎ সকল প্রজন্মের জন্য পাঠ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। অথচ দশম ও একাদশ শতাব্দীর এই অতিগুরুত্বপূর্ণ হিব্রু পাণ্ডুলিপিগুলো সংখ্যার দিক থেকে খুবই দুর্লভ, মাত্র একত্রিশটি। এর অধিকাংশ আবার খণ্ডিত আকারের।[৩]
টিকাঃ
১. ibid, p. 11
২. ibid, p. 12
৩. অধ্যায় ১৫.৪. দ্রষ্টব্য
📄 মেসোরা এবং পাঠ্যের শুদ্ধতা
নির্দিষ্ট এক প্রকারের পাঠ্যের প্রচলন শুরু হয়ে গেল। ফলে টেক্সট পরিবর্তনে আগের মতো স্বাধীনতা চর্চার স্থানও থাকল না আর। র্যাবাই আকিবাকে উদ্ধৃত করে উয়ের্থওয়াইন লিখেছেন, 'মেসোরা হলো বিধানকে (The Law) ঘিরে থাকা একটি (নিরাপত্তা) বেষ্টনী। লিপিকারদের যত্নশীল কাজের উদ্দেশ্য এটিই ছিল। তারা বিধান এবং গ্রন্থাবলির প্রতিটি শ্লোক, শব্দ এবং বর্ণসংখ্যা গুনে রেখেছেন। এটি ছিল পাণ্ডুলিপি নিরীক্ষা এবং তার বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের একটি অংশ।' [১]
র্যাবাই আকিবার বক্তব্য ঠিক পরিষ্কার নয়। শ্লোক এবং শব্দ গণনার ব্যাপারটি তার সময়ের (আনুমানিক ৫৫-১৩৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) সাথে একেবারেই যায় না। নবমের শেষ এবং দশম শতাব্দীর শুরুর ভাগ হলে তা যুক্তিসংগত হতো। তখন মেসোরীয় পদ্ধতির প্রচলন ঘটে। উয়ের্থওয়াইন নিজেই মন্তব্য করেছেন—
কাজেই আমরা ধরে নিতে পারি, আনুমানিক ১০০ খ্রিষ্টাব্দে ব্যঞ্জননির্ভর পাঠ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সাথে সাথেই অন্য সকল প্রকার পাঠ্য ধামাচাপা পড়ে যায়নি। ভিন্ন ভিন্ন পাঠ্য সংবলিত পাণ্ডুলিপি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত চালু থেকেছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যাপারটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য। দশম শতাব্দী থেকে সব পাণ্ডুলিপি চমৎকারভাবে একইরকম হয়ে যাওয়ার কারণ হলো... পর এবং পূর্বেকার মেসোরেটদের শ্রম। প্রামাণ্য পাঠ্যটিকে সর্বত্র প্রচলিত করার মাধ্যমে তারা একে অন্য সকল পাঠ্যভিন্নতার ওপর জয়ী করেন।[২]
উয়ের্থওয়াইনের নিজের ভাষ্য অনুযায়ীই তাই প্রমাণ মেলে, টেক্সটের এই চমৎকার মিল দশম শতাব্দীর অর্জন, প্রথম শতাব্দীর নয়।
টিকাঃ
১. Wuerthwein, p. 19. পাদটীকায় উয়ের্থওয়াইন আবার নিজের জায়গা ঠিক রেখেছেন—অবশ্য এটা নিশ্চিত না যে, রযাবাই আকিবার বক্তব্যে (Pirqe Aboth 3: 13) 'মেসোরা' শব্দটি দিয়ে কি সাধারণভাবে গৃহীত অর্থে পাঠ্য প্রচার-প্রসার কর্মকাণ্ড বুঝিয়েছেন... নাকি বুঝিয়েছেন যে, মৌখিক আইনের উদ্দেশ্য ছিল লিখিত আইনের বিকৃতি প্রতিরোধ।' (p. 18, footnote 24).
২. ibid, p. 20