📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 সামারীয় এবং ইহুদিদের পেন্টাটিউকের মাঝেই প্রায় ৬০০০ অমিল

📄 সামারীয় এবং ইহুদিদের পেন্টাটিউকের মাঝেই প্রায় ৬০০০ অমিল


সামারীয়রা আলাদা একটি ধর্মীয় ভাবধারা ও জাতিসত্তার হিব্রু সম্প্রদায়। তারা মোশি এবং তাওরাতকে নিজেদের একমাত্র নবি এবং একমাত্র গ্রন্থ বলে দাবি করে। তাদের মতে, ইহুদিরা নয়, তারাই এই বিশুদ্ধতার (Recension) একমাত্র অধিকারী।[১] ইহুদিদের থেকে সামারীয়দের বিভক্তির সঠিক তারিখ জানা যায় না। ধারণা করা হয়- ম্যাকাবীয় আমলে (১৬৬-৬৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) শেচেম ও মাউন্ট গেরিজিম উপাসানালয় ধ্বংসের মাধ্যমে এর সূচনা।[২]
সামারীয় পেন্টাটিউকের সমস্যা হলো (মেসোরীয় হিব্রু পাঠ্যের সাথে এর) ছয় হাজার পার্থক্য আছে...(অনেকগুলোই) একদম ছোট-খাটো, যা পাঠ্যের অর্থের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না; কিন্তু উল্লেখ্য যে, প্রায় উনিশ শত স্থানে (সেপ্টয়াজিন্টের)[৩] সাথে সামারীয় পেন্টাটিউকের সামঞ্জস্য এবং মেসোরীয় পাঠ্যের বৈপরীত্য বিদ্যমান)। (সামারীয় পেন্টাটিউকের) কিছু ভিন্নতাকে অবশ্যই পরিবর্তন হিসেবে আখ্যায়িত করতে হবে। নিজেদের প্রথা অনুযায়ী সেগুলো উদ্ভাবন করেছিল তারা। বিশেষ করে যাত্রাপুস্তক ২০ : ১৭-তে মাউন্ট গেরিজিমের উপাসনালয় তৈরির আদেশ, দ্বিতীয় বিবরণী ১১ : ৩০-এ -তে যুক্ত করা, এবং দ্বিতীয় বিবরণীর আরও উনিশটি অংশে, যেখানে অতীতে পবিত্র স্থানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং শেচেমের প্রতি ইঙ্গিত স্পষ্টতর করা হয়েছে।[৪]
উক্ত ৬০০০ অমিলের কতগুলো সামারীয় এবং কতগুলো ইহুদিদের দ্বারা পরিবর্তিত হয়েছে-তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ অন্তত প্রথম খ্রিস্টীয় শতাব্দীর আগে ওল্ড টেস্টামেন্টের কোনো শুদ্ধকৃত সংস্করণ ছিল না। সেখানে বিশ্বস্ততার সাথে যুগে যুগে চলে আসা কোনো নির্ভরযোগ্য সংস্করণ থাকার কোনো প্রশ্নই আসে না। সেপ্টয়াজিন্ট এবং সামারীয় পেন্টাটিউকের মাঝে প্রায় উনিশশত মিল রয়েছে। এগুলো মেসোরীয় পাঠ্যের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাহলে এটা অনুমেয়, মেসোরীয় পাঠ্যে পরিবর্তন এনেছে ইহুদিরা। কারণ সেপ্টয়াজিন্ট খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতকে বনি ইসরাইলের প্রতিটি গোত্র থেকে ছয়জন করে অনুবাদকের তত্ত্বাবধানে তৈরি করা হয়।[৫] তাহলে সেপ্টয়াজিন্ট এবং শুদ্ধকৃত ওল্ড টেস্টামেন্টের মধ্যে প্রায় তিন থেকে চার শতাব্দীর পার্থক্য। এদিকে ইহুদি ও সামারীয়দের মধ্যে বৈরিতা ছিল এবং সামারীয়রা এককভাবে বিশুদ্ধতার দাবি করে আসছিল। সেক্ষেত্রে ইহুদিদের সেপ্টয়াজিন্টের সাথে মিল করতে সামারীয়রা নিজেদের পেন্টাটিউক বদলে ফেলার সম্ভাবনা বাস্তবতা বিবর্জিত। তাই সবচেয়ে বিশুদ্ধ উপসংহার হলো উক্ত উনিশশত স্থানে মেসোরীয় পাঠ্যে বিকৃতি হয়েছে।[৬] এটা খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতাব্দীর পরের ঘটনা। তারও আগে সেন্টুজিয়ান্ট টেক্সটে আরও কী কী বিকৃতি প্রবেশ করেছে, সে কথা তো বাদই।

টিকাঃ
১. Dictionary of the Bible, p. 880. Recension হলো প্রাপ্ত সকল পাণ্ডুলিপি নিরীক্ষা করে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে একটি পাঠ্য তৈরি করার প্রক্রিয়া।
২. Wuerthwein, p. 45.
৩. ওল্ড টেস্টামেন্টের গ্রিক অনুবাদকে সেপ্টুয়াজিন্ট বলে। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে তা অনুবাদিত হয় বলে ধারণা করা হয়। গ্রিস অঞ্চলে বাসরত ইহুদিরা তাদের ধর্মীয় পুস্তককে পরিচিত ভাষায় পাঠ করার জন্য তা ব্যবহার করে। উয়ের্থওয়াইন লিখেছেন, ‘সেপ্টুয়াজিন্ট কোনো একক সংস্করণ নয়; বরং এটি হলো বিভিন্ন লেখকের সংস্করণের সংকলন। তাদের একেকজনের অনুবাদের পদ্ধতি, হিব্রু জ্ঞান, ধরণ এবং অন্যান্য বিষয়ে ব্যাপক পার্থক্য ছিল।' (ibid, pp. 53-4)
৪. ibid, p. 46. সংস্করণ চিহ্নগুলো অনুবাদ করে তৃতীয় বন্ধনীর মাঝে রাখা হয়েছে।
৫. মোট ৭২ জন অনুবাদক (১২ গোত্র থেকে ৬ জন করে)। 'Septuagint' এর আক্ষরিক অর্থ 'সত্তরের সংস্করণ'। সাধারণত একে রোমান সংখ্যা LXX (৭০) দিয়ে প্রকাশ করা হয়.। (Dictionary of the Bible, p. 347)
৬. বোঝার সুবিধার্থে সংক্ষিপ্তাকারে সাজালে ব্যাপারটি হলো, সেন্টুয়াজিন্ট খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে তৈরি করা হয়। এর সাথে সামারীয় পেন্টাটিউকের প্রায় উনিশশত মিল রয়েছে। এদিকে মেসোরীয় টেক্সটের বাইবেলগুলো নবম-একাদশ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে লেখা হয়েছিল। তথাপি, সেপ্টয়াজিন্টের সাথে সামারীয় পেন্টাটিউকের মিলগুলোর সাথে মেসোরীয় টেক্সট অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কাজেই, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের পর উক্ত উনিশশত স্থানে মেসোরীয় টেক্সটে বিকৃতি হয়েছে।- অনুবাদক

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 অনিচ্ছাকৃত বিকৃতি

📄 অনিচ্ছাকৃত বিকৃতি


কোনো টেক্সটে যেকোনো দিক থেকে ভুলের সন্নিবেশ ঘটতে পারে। এ কথা একজন সুদক্ষ অনুলেখকও মেনে নেবেন। বেশির ভাগ ভুলই অনিচ্ছাকৃত। এগুলোর বিভিন্ন পরিভাষা বের করেছেন ওল্ড টেস্টামেন্টের পণ্ডিতগণ। সাধারণ কিছু প্রকার হলো : একই রকম বর্ণের বিভ্রান্তি (যেমন ১ ও ১, ה ও n); ডিটোগ্রাফি (ভুলবশত পুনরাবৃত্তি), হ্যাপলোগ্রাফি (শব্দের ডাবলেট বর্ণকে ভুলে বাদ দেওয়া), হোমোয়োটিলেউটন (দুটি শব্দের শেষটা একই রকম দেখে লিপিকার প্রথমটিকে রেখে দ্বিতীয়টিতে যায়, মাঝের সব বাদ দিয়ে দেয়); স্বরধ্বনি সংক্রান্ত ভুল ইত্যাদি। [১]
পুরোনো খণ্ডগুলোর নির্দিষ্ট কিছু বিচ্যুতির ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে চোখ বুলালে সমকালীন লেখকদের প্রায়ই হোমোয়োটিলেউটন (উদাহরণস্বরূপ) টেনে নিয়ে আসতে দেখা যায়। লিপিকার যে ইচ্ছা করেও পরিবর্তন করতে পারে, এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য। অন্যান্য সমাদৃত পান্ডুলিপিতে একই ভুল থেকে থাকলেও একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে পেশ করা হয় এটাকে।[২]

টিকাঃ
১. Wuerthwein, pp. 108-110.
২. Wuerthwein, p. 154.

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 মতধারাগত কারণে ইচ্ছাকৃত পরিবর্তন

📄 মতধারাগত কারণে ইচ্ছাকৃত পরিবর্তন


ইচ্ছাকৃত পরিবর্তনগুলোই অধিক মনোযোগের দাবিদার। কারণ স্বাভাবিকভাবেই সেগুলো অনেক বেশি মারাত্মক পর্যায়ের। মধ্যযুগ পর্যন্ত ওল্ড টেস্টামেন্টের কোনো প্রতিষ্ঠিত পাঠ্য ছিল না এবং 'স্বীকৃত টেক্সট প্রতিষ্ঠালাভের আগপর্যন্ত সেটাকে অপরিবর্তনীয়ও মনে করা হতো না।'[১] এজন্য প্রচারকারী এবং লিপিকারগণ যখনই প্রয়োজন মনে করেছে, পরিবর্তন এনেছে তাতে। তাদের উদ্দেশ্য যেটাই হোক না কেন, মূলপাঠ্য এতে সত্যিই বিকৃত হয়েছে। এমনকি যেই মেসোরেটিক পাঠ্যের উদ্দেশ্য ছিল ওল্ড টেস্টামেন্টকে পরিবর্তন থেকে রক্ষা করা, তা নিজেও পরিবর্তন থেকে বাঁচতে পারেনি।[২]
প্রথম দিককার (মেসোটেরিক) টেক্সটগুলো পুনরুদ্ধার, পুনর্গঠন করার ব্যাপারটা (র‍্যাবাইগণের) ক্রিয়াকলাপের একটি উদাহরণ মাত্র। সমালোচনার অবকাশ থাকা সত্ত্বেও তারা সেগুলো সংরক্ষণ করেছেন। কিন্তু এর বিরূপ চিত্রও দেখা যায়। নিজেদের মতধারাগত যথেষ্ট কারণ থাকলে নির্দ্বিধায় পাঠ্য পরিবর্তন করার স্পষ্ট প্রমাণ আছে।[৩]
কী ছিল সেসব অতীব গুরুত্বপূর্ণ কারণ যার জন্য পাঠ্য পরিবর্তনের মতো কাজ করতে হলো? কখনো ধর্মীয়ভাবে আপত্তিকর শব্দ মুছে দিয়ে পরিবর্তন করা হয়েছে। আবার কখনো হয়তো একটি কঠিন শব্দ বদলে দিয়ে বসানো হয়েছে প্রচলিত শব্দ। মানে সামান্য ভাষাগত কারণে টেক্সট পরিবর্তন। তবে সবচেয়ে মারাত্মক হলো নির্দিস্ট একটি বয়ান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এমন কোনো শব্দ যুক্ত করা, যাতে শ্লোক-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যাখ্যাগুলো ঢাকা পড়ে যায়।[৪] এসব পরিবর্তনের সীমিত একটি তালিকা টীকা আকারে সংরক্ষণ করেছে ইহুদিরা। সেগুলো Tiqqune sopherim এবং Itture sopherim নামে পরিচিত। এসব কাজ যে পরিবর্তন সাধনের পরবর্তী সময়ের, তা বলাই বাহুল্য।
ক. Tiqqune sopherim-এর মধ্যে মতধারা সংশ্লিষ্ট কারণে কিছু পরিবর্তনের উল্লেখ রয়েছে। যেমন : একটি মেসোরীয় সূত্রে বলা হয়েছে, 'ঈশ্বরের প্রতি আপত্তিকর অভিব্যক্তি' দূরীকরণে আঠারোটি স্থানে পরিবর্তন আনা হয়েছে।[৫]
খ. Itture sopherim-এর মধ্যে লিপিকারদের ইচ্ছানুযায়ী মূলটেক্সটের কিছু শব্দ পরিবর্তনের তালিকা পাওয়া যায়। যেমন : ব্যাবিলনীয় তালমুদে (Ned. 37b) এমন পাঁচটি অংশ আছে, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বাদ দিয়ে যেতে হবে। আবার এমন সাতটি অংশ আছে যেখানে পাঠ্যবহির্ভূত কিছু শব্দ পাঠ করতে হবে।[৬]
এ-সকল কর্মকাণ্ড আসলে একটি বৃহত্তর প্রক্রিয়ার ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র।[৭]

টিকাঃ
১. Wuerthwein, p. 111
২. ibid, p. iii
৩. ibid, p. 17
৪. ibid, pp. 111-112
৫. ibid. p. 17
৬. ibid. p. 18
৭. ibid. p. 18

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 ১০০ খ্রিষ্টাব্দের আগ পর্যন্ত ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রামাণ্য টেক্সটের অনুপস্থিতি

📄 ১০০ খ্রিষ্টাব্দের আগ পর্যন্ত ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রামাণ্য টেক্সটের অনুপস্থিতি


কুমরান থেকে প্রাপ্ত কিছু পাণ্ডুলিপির সাথে মেসোরীয় টেক্সটের অনেকটাই মিল আছে। এগুলোর কাজ মধ্যযুগে সমাপ্ত হয়েছে।
'কিন্তু বাহ্যিক অনেক মিল থাকলেও একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। মেসোরীয় সদৃশ কুমরান পাঠ্যগুলো ছিল প্রচলিত কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের মধ্যে একটি মাত্র... অন্যগুলোর চেয়ে তা পাঠ্যগুলোর ক্ষেত্রে তো বটেই, পুরো ইহুদিজগতেও একটিও প্রামাণ্য পাঠ্য ছিল না।'[১]
ইহুদি পুনর্জাগরণ যুগে এসে এই টেক্সটগুলোর মধ্যে একটি প্রাধান্য পেতে শুরু করে। প্রথম খ্রিষ্টীয় শতাব্দীর আগপর্যন্ত প্রচলিত বাকি সব টেক্সটকে ছাপিয়ে ওঠে এটি।
কুমরান গুহায় মূলত তিন প্রকারের স্বতন্ত্র টেক্সট পাওয়া যায়: সামারীয় পেন্টাটিউক, সেপ্টুয়াগিন্ট এবং মেসোরীয়। উয়ের্থওয়াইনের সূত্রমতে এগুলো ৭০-১৩৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে প্রামাণ্য হয়ে উঠতে থাকে।[২] যদিও এই উপসংহারের ভিত্তি ত্রুটিপূর্ণ। কুমরান এবং ওয়াদি মুরাব্বায়াতের কিছু গুহার বয়স নির্ণয় করা হয়েছে ভুলভাবে। সেখান থেকেই উক্ত সিদ্ধান্তের উদ্ভব। এ বিষয়ে সামনে আলোচনা আসবে।

টিকাঃ
১. ibid, p. 14
২. ibid, p. 14

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00