📄 জামনিয়া পরিষদের (Council of Jamnia) ভূমিকা
উয়ের্থওয়াইন লিখেছেন, 'মধ্যযুগীয় পাণ্ডুলিপিগুলোর ব্যঞ্জনভিত্তিক টেক্সটের ইতিহাস সেই ১০০ খ্রিস্টাব্দের। বর্তমান সংস্করণগুলোর ভিত্তিও এটি। ৭০ খ্রিস্টাব্দের বিপর্যয়-পরবর্তী সময়টা ছিল ইহুদি পুনর্জাগরণের। এই সময়ে ওল্ড টেস্টামেন্টের কিছু বিতর্কিত পুস্তিকার বিশুদ্ধতা নির্ধারণ করা হয় জামনিয়া পরিষদে (প্রথম শতাব্দীর শেষভাগে)। এভাবে অস্তিত্ব লাভ করে ওল্ড টেস্টামেন্টের একটি প্রামাণিক টেক্সট।'[১]
ফারিসীরা ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী দল। ৭০ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে তাই তাদের পাঠ্যটি সংরক্ষিত হয়। বিলুপ্ত হয়ে যায় কম প্রভাবশালী দলগুলোর সমর্থিত পাঠ্য। তাই বর্তমানের আদর্শ টেক্সটটি আসলে দীর্ঘ ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের ফল।[২] জামনিয়া পরিষদ প্রামাণ্য পাঠ্য তৈরি করেছে বলে উয়ের্থওয়াইন যে মত দিয়েছেন, তা অমূলক কল্পনা। তিনিই অন্যত্র দাবি করেছেন, ওল্ড টেস্টামেন্টের টেক্সট চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয় দশম শতাব্দীতে।[৩] এ দুটি মত পরস্পর সাংঘর্ষিক।
টিকাঃ
১. ibid, p. 13
২. ibid, p. 14.
৩. চলমান অধ্যায়ের 'মেসোরা এবং পাঠ্যের শুদ্ধতা' অংশ দ্রষ্টব্য।
📄 ওল্ড টেস্টামেন্টের টেক্সটের ভিন্নতা
প্রতিটি যুগে ওল্ড টেস্টামেন্টকে একদম অক্ষরে অক্ষরে প্রচার করা হয়েছে বলে সাধারণ পাঠকদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।[১] অথচ বাস্তবতা তা নয়। টেন কমান্ডমেন্ট পর্যন্ত দুটি সংস্করণে পাওয়া যায়।[২]
প্রাক-খ্রিষ্টীয় যুগের পরে ওল্ড টেস্টামেন্টের বিভিন্ন রীতি বর্তমান ছিল। গবেষকগণ এ ব্যাপারে একমত। একটির সাথে অপরটির বহুমুখী ভিন্নতাও স্পষ্ট। টেক্সটের এই বহুবিধ প্রকারভেদের বিপাক থেকে কাটিয়ে উঠতে পণ্ডিতগণ নানা পন্থা অবলম্বন করেছেন। 'ফ্র্যাঙ্ক এম ক্রস এগুলোকে অভিহিত করেছেন একই পাঠ্যের ফিলিস্তিনী, মিশরীয় এবং ব্যাবিলনীয় স্থানীয় রূপ হিসেবে।'[৩] অর্থাৎ এ-সকল অঞ্চলে নিজস্ব রীতির টেক্সট প্রচলিত ছিল। অন্য দেশে প্রচলিত ওল্ড টেস্টামেন্টের সাথে এর কোনো লেনাদেনা নেই।
ব্রুসের এই মতের সাথে শেমারইয়াহু ট্যালমন বিমত পোষণ করেছেন। তার মতে, তৎকালীন লিপিকার, সংকলক, প্রচারক এবং লেখকগণের এই পন্থাকে ভিন্ন টেক্সট অনুসরণের এক প্রকার নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা বলা চলে… পাণ্ডুলিপি প্রচারের একদম প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ওল্ড টেস্টামেন্টের টেক্সট সম্পর্কিত বিভিন্ন রীতি প্রচলিত ছিল, যেগুলোর মাঝে একটির সাথে অপরটির কম-বেশি পার্থক্য বিদ্যমান।[৪]
তাহলে ব্রুসের মতে প্রতিটি কেন্দ্রীয় অঞ্চলে নিজস্ব পাঠ্যরূপ ছিল। আর ট্যালমন বলছেন যে, পার্থক্যগুলো অঞ্চলের কারণে নয়; বরং সংকলক এবং লিপিকাররা শুরু থেকেই টেক্সট পুনর্গঠনের ব্যাপারে সীমিত পরিসরে স্বাধীনতা চর্চা করেছেন। উত্তর যেটাই হোক না কেন, টেক্সটের রূপভিন্নতার অস্তিত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
টিকাঃ
১. 'Are Torah Scrolls Exactly the Same?', Bible Review, vol. xiii, no. 6, Dec. 1997, pp. 5-6.
২. ন্যাশ প্যাপিরাস নিয়ে উয়ের্থওয়াইনের বিশ্লেষণ। (Wuerthwein, p. 34)
৩. ibid. pp. 14-15
৪. ibid. pp. 14-15
📄 সামারীয় এবং ইহুদিদের পেন্টাটিউকের মাঝেই প্রায় ৬০০০ অমিল
সামারীয়রা আলাদা একটি ধর্মীয় ভাবধারা ও জাতিসত্তার হিব্রু সম্প্রদায়। তারা মোশি এবং তাওরাতকে নিজেদের একমাত্র নবি এবং একমাত্র গ্রন্থ বলে দাবি করে। তাদের মতে, ইহুদিরা নয়, তারাই এই বিশুদ্ধতার (Recension) একমাত্র অধিকারী।[১] ইহুদিদের থেকে সামারীয়দের বিভক্তির সঠিক তারিখ জানা যায় না। ধারণা করা হয়- ম্যাকাবীয় আমলে (১৬৬-৬৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) শেচেম ও মাউন্ট গেরিজিম উপাসানালয় ধ্বংসের মাধ্যমে এর সূচনা।[২]
সামারীয় পেন্টাটিউকের সমস্যা হলো (মেসোরীয় হিব্রু পাঠ্যের সাথে এর) ছয় হাজার পার্থক্য আছে...(অনেকগুলোই) একদম ছোট-খাটো, যা পাঠ্যের অর্থের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না; কিন্তু উল্লেখ্য যে, প্রায় উনিশ শত স্থানে (সেপ্টয়াজিন্টের)[৩] সাথে সামারীয় পেন্টাটিউকের সামঞ্জস্য এবং মেসোরীয় পাঠ্যের বৈপরীত্য বিদ্যমান)। (সামারীয় পেন্টাটিউকের) কিছু ভিন্নতাকে অবশ্যই পরিবর্তন হিসেবে আখ্যায়িত করতে হবে। নিজেদের প্রথা অনুযায়ী সেগুলো উদ্ভাবন করেছিল তারা। বিশেষ করে যাত্রাপুস্তক ২০ : ১৭-তে মাউন্ট গেরিজিমের উপাসনালয় তৈরির আদেশ, দ্বিতীয় বিবরণী ১১ : ৩০-এ -তে যুক্ত করা, এবং দ্বিতীয় বিবরণীর আরও উনিশটি অংশে, যেখানে অতীতে পবিত্র স্থানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং শেচেমের প্রতি ইঙ্গিত স্পষ্টতর করা হয়েছে।[৪]
উক্ত ৬০০০ অমিলের কতগুলো সামারীয় এবং কতগুলো ইহুদিদের দ্বারা পরিবর্তিত হয়েছে-তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ অন্তত প্রথম খ্রিস্টীয় শতাব্দীর আগে ওল্ড টেস্টামেন্টের কোনো শুদ্ধকৃত সংস্করণ ছিল না। সেখানে বিশ্বস্ততার সাথে যুগে যুগে চলে আসা কোনো নির্ভরযোগ্য সংস্করণ থাকার কোনো প্রশ্নই আসে না। সেপ্টয়াজিন্ট এবং সামারীয় পেন্টাটিউকের মাঝে প্রায় উনিশশত মিল রয়েছে। এগুলো মেসোরীয় পাঠ্যের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাহলে এটা অনুমেয়, মেসোরীয় পাঠ্যে পরিবর্তন এনেছে ইহুদিরা। কারণ সেপ্টয়াজিন্ট খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতকে বনি ইসরাইলের প্রতিটি গোত্র থেকে ছয়জন করে অনুবাদকের তত্ত্বাবধানে তৈরি করা হয়।[৫] তাহলে সেপ্টয়াজিন্ট এবং শুদ্ধকৃত ওল্ড টেস্টামেন্টের মধ্যে প্রায় তিন থেকে চার শতাব্দীর পার্থক্য। এদিকে ইহুদি ও সামারীয়দের মধ্যে বৈরিতা ছিল এবং সামারীয়রা এককভাবে বিশুদ্ধতার দাবি করে আসছিল। সেক্ষেত্রে ইহুদিদের সেপ্টয়াজিন্টের সাথে মিল করতে সামারীয়রা নিজেদের পেন্টাটিউক বদলে ফেলার সম্ভাবনা বাস্তবতা বিবর্জিত। তাই সবচেয়ে বিশুদ্ধ উপসংহার হলো উক্ত উনিশশত স্থানে মেসোরীয় পাঠ্যে বিকৃতি হয়েছে।[৬] এটা খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতাব্দীর পরের ঘটনা। তারও আগে সেন্টুজিয়ান্ট টেক্সটে আরও কী কী বিকৃতি প্রবেশ করেছে, সে কথা তো বাদই।
টিকাঃ
১. Dictionary of the Bible, p. 880. Recension হলো প্রাপ্ত সকল পাণ্ডুলিপি নিরীক্ষা করে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে একটি পাঠ্য তৈরি করার প্রক্রিয়া।
২. Wuerthwein, p. 45.
৩. ওল্ড টেস্টামেন্টের গ্রিক অনুবাদকে সেপ্টুয়াজিন্ট বলে। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে তা অনুবাদিত হয় বলে ধারণা করা হয়। গ্রিস অঞ্চলে বাসরত ইহুদিরা তাদের ধর্মীয় পুস্তককে পরিচিত ভাষায় পাঠ করার জন্য তা ব্যবহার করে। উয়ের্থওয়াইন লিখেছেন, ‘সেপ্টুয়াজিন্ট কোনো একক সংস্করণ নয়; বরং এটি হলো বিভিন্ন লেখকের সংস্করণের সংকলন। তাদের একেকজনের অনুবাদের পদ্ধতি, হিব্রু জ্ঞান, ধরণ এবং অন্যান্য বিষয়ে ব্যাপক পার্থক্য ছিল।' (ibid, pp. 53-4)
৪. ibid, p. 46. সংস্করণ চিহ্নগুলো অনুবাদ করে তৃতীয় বন্ধনীর মাঝে রাখা হয়েছে।
৫. মোট ৭২ জন অনুবাদক (১২ গোত্র থেকে ৬ জন করে)। 'Septuagint' এর আক্ষরিক অর্থ 'সত্তরের সংস্করণ'। সাধারণত একে রোমান সংখ্যা LXX (৭০) দিয়ে প্রকাশ করা হয়.। (Dictionary of the Bible, p. 347)
৬. বোঝার সুবিধার্থে সংক্ষিপ্তাকারে সাজালে ব্যাপারটি হলো, সেন্টুয়াজিন্ট খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে তৈরি করা হয়। এর সাথে সামারীয় পেন্টাটিউকের প্রায় উনিশশত মিল রয়েছে। এদিকে মেসোরীয় টেক্সটের বাইবেলগুলো নবম-একাদশ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে লেখা হয়েছিল। তথাপি, সেপ্টয়াজিন্টের সাথে সামারীয় পেন্টাটিউকের মিলগুলোর সাথে মেসোরীয় টেক্সট অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কাজেই, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের পর উক্ত উনিশশত স্থানে মেসোরীয় টেক্সটে বিকৃতি হয়েছে।- অনুবাদক
📄 অনিচ্ছাকৃত বিকৃতি
কোনো টেক্সটে যেকোনো দিক থেকে ভুলের সন্নিবেশ ঘটতে পারে। এ কথা একজন সুদক্ষ অনুলেখকও মেনে নেবেন। বেশির ভাগ ভুলই অনিচ্ছাকৃত। এগুলোর বিভিন্ন পরিভাষা বের করেছেন ওল্ড টেস্টামেন্টের পণ্ডিতগণ। সাধারণ কিছু প্রকার হলো : একই রকম বর্ণের বিভ্রান্তি (যেমন ১ ও ১, ה ও n); ডিটোগ্রাফি (ভুলবশত পুনরাবৃত্তি), হ্যাপলোগ্রাফি (শব্দের ডাবলেট বর্ণকে ভুলে বাদ দেওয়া), হোমোয়োটিলেউটন (দুটি শব্দের শেষটা একই রকম দেখে লিপিকার প্রথমটিকে রেখে দ্বিতীয়টিতে যায়, মাঝের সব বাদ দিয়ে দেয়); স্বরধ্বনি সংক্রান্ত ভুল ইত্যাদি। [১]
পুরোনো খণ্ডগুলোর নির্দিষ্ট কিছু বিচ্যুতির ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে চোখ বুলালে সমকালীন লেখকদের প্রায়ই হোমোয়োটিলেউটন (উদাহরণস্বরূপ) টেনে নিয়ে আসতে দেখা যায়। লিপিকার যে ইচ্ছা করেও পরিবর্তন করতে পারে, এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য। অন্যান্য সমাদৃত পান্ডুলিপিতে একই ভুল থেকে থাকলেও একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে পেশ করা হয় এটাকে।[২]
টিকাঃ
১. Wuerthwein, pp. 108-110.
২. Wuerthwein, p. 154.