📄 মৌখিক বিধানের ইতিহাস
ইহুদিদের মতে, লিখিত বিধান (তোরাহ) এবং মৌখিক বিধান (বহু শতাব্দী পর্যন্ত মুখে মুখে প্রচলিত) উভয়ই মোশির সময়ে এসেছে। লিখিত বিধান বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যাখ্যা প্রদান করা হয় মৌখিকভাবে। মিশনাহ হলো এই মৌখিক বিধানের সংকলন।[৩]
'মিশনার অ্যাবথ পুস্তকে উল্লেখ রয়েছে, সিনাই পর্বতে মোশিকে লিখিত বিধান দেওয়ার সময়ে মৌখিক বিধানও প্রদান করা হয়েছিল এবং মৌখিকভাবেই তা পরবর্তী প্রজন্ম থেকে প্রজান্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।'[১]
এবোথ থেকে মৌখিক বিধানের ইতিহাস নিচে তুলে ধরা হলো—
» সিনাই থেকে প্রাপ্ত বিধান মোশি জিহোশুয়াকে বুঝিয়ে দিয়ে যান। এরপর জিহোশুয় থেকে তা এল্ডারদের কাছে, সেখান থেকে নবিদের কাছে এবং নবিদের কাছ থেকে তা গ্রেট সিনাগগের ধর্মগুরুদের কাছে পৌঁছয়। তারা তিনটি ব্যাপারে বলেছিলেন : সতর্কতার সাথে বিচার করো, বিধানশাস্ত্র সুরক্ষিত করো এবং পাঠার্থী গড়ে তোলো।
» গ্রেট সিনাগগের শেষ সদস্যদের মধ্যে সিমিওন দ্য জাস্ট[২] ছিলেন...।
» সিমিওনের কাছ থেকে সোকোর এন্টিগোনাস বিধান গ্রহণ করেন...।
» জেরেদাহের জোসে বি জোয়েজার এবং জেরুসালেমের জোসে বি জোহানান তাদের কাছ থেকে বিধান পান...।[৩]
এভাবে ক্রমান্বয় বর্ণনা এসেছে। মোটকথা, মিশনাহর বৈধতা সম্পর্কে তথ্য প্রদান করা হয়েছে মিশনাহর এই অংশের মধ্যেই। মূলত মৌখিক বিধানাবলির প্রশংসা এবং প্রতি প্রজন্মে এর প্রচারক শিক্ষকগণের নাম বলা হয়েছে এখানে। 'তবে শেষ চারটি অনুচ্ছেদের বর্ণনাগুলো নামবিহীন।'[৪]
নির্বাসন পরবর্তী জেরুসালেমেও মোশির প্রাপ্ত মৌখিক বিধানগুলো র্যাবাইদের কাছে ধারাবাহিকভাবে পৌঁছুনোর দাবিটি ইতিহাসের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাদের ইতিহাসের দিক তাকালে খুব সহজেই তা গ্রহণযোগ্যতা হারায়।
২ রাজাবলির ২২-২৩ শ্লোক থেকে আমরা জানতে পারি, জোসিয়াহর রাজত্বকালে
(৬৪০-৬০৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) একটি 'বিধানগ্রন্থ' উদ্ধার করা হয়।১৯ তদনুযায়ী তিনি পৌত্তলিক অর্চনাবেদি ও পুরুষ দেহব্যবসায়ীদের নিবাস ধ্বংস করেন, শিশুবলি বন্ধ করা সহ অসংখ্য সংস্কার সাধন করেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হয়-বিধানের একদম মৌলিক বিষয়গুলোও তাদের মাঝে আর অবশিষ্ট ছিল না। তৎকালীন এসব পৌত্তলিক রীতিনীতি থেকে বোঝা যায়, যাদের মাধ্যমে মৌখিক বিধানের ধারা সংরক্ষিত হয়ে আসার কথা বলা হয়েছে, তাদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল তখন। কারণ তারাই ছিল যুগে যুগে তা মুখস্থ এবং প্রচার করার দায়িত্বপ্রাপ্ত ইহুদি পণ্ডিত। অথচ বাইবেলে উদ্ভূত পরিস্থিতির বিপরীতে তাদের অস্তিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
লিখিত বিধানের ব্যাখ্যা হলো মৌখিক বিধান। লিখিতটা যদি কোনো কারণে হারিয়েও যায়, তবু নির্ভরযোগ্য সূত্রে সংরক্ষিত থাকা মৌখিক বিধান থেকে পৌত্তলিক রীতিনীতি পালনের অধর্মাচারণ সম্পর্কে র্যাবাইরা (ইহুদি ধর্মগুরুরা) জেনে যাওয়ার কথা। তাহলে যুগে যুগে সেই বিধান বর্ণনাকারী পণ্ডিতরা তখন কোথায় ছিল? রাজা মানাসসেহ অর্থাৎ জোসিয়ার নিজের দাদাই মনে করত, হেজেকিয়াহর আমলে ধ্বংসকৃত বা'লের পূজাবেদী পুনঃস্থাপন করে সে মূলত 'জাতিকে সনাতন উপাসনার রীতিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পূজিত বা'লকে খুব সম্ভবত তার জাতি মূল ঈশ্বর ইয়াহওয়েহ-এর অনুরূপ ধরে নিয়েছিল।'[২]
মোশির মৌখিক বিধানের রূপ যা-ই হোক না কেন, তা কয়েক হাজার বছর আগে হারিয়ে গিয়েছে। আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। বর্তমান মৌখিক বিধান 'সম্ভবত লিখিত বিধান যখন প্রথমবার (এজরা কর্তৃক) মানুষের সামনে পাঠ এবং সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়, সেই সময়ের। (এজরার পাঠ শোনার পর) এখান থেকে অনিবার্যভাবে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড়িয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে তাই নির্ভরযোগ্য এবং শুদ্ধ ব্যাখ্যা লিপিবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আর এই প্রক্রিয়া শুরু হয় হিল্লেল এবং শাম্মাই-এর আমলে (খ্রিষ্টপূর্ব ১ম শতকের শেষভাগে)। একেই মিশনাহ বলা হয়... এরপর একেকজন শিক্ষক নিজ নিজ মিশনাহ সংকলন করেন।'[৩]
অনুসরণ করার জন্য কোনো মূল উৎস ছিল না। এর ওপর ছিল অর্থ নিয়ে মতবিরোধ। ফলে শিক্ষকগণ প্রত্যেকে নিজ নিজ মৌখিক বিধান সংকলন শুরু করেন। প্রশ্ন আসে, আজকের মিশনাহ তাহলে কতটুকু নির্ভরযোগ্য? কালের খেয়ায় হারিয়ে
যাওয়া পণ্ডিতদের লেখা মিশনাহগুলোর ওপর এটির ঐশী প্রাধান্য কতটুকু? এবং কে নির্ধারণ করবে যে এটিই প্রকৃত মিশনাহ?
টিকাঃ
১. Herbert Danby (trans), The Mishnah, Introduction, Oxford Univ. Press, 1933, p. xvii.
২. হয় ওনিয়াসের পুত্র সিমিওন, প্রধান বিচারপতি আনুমানিক ২৮০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ অথবা দ্বিতীয় সিমিওন, প্রধান বিচারপতি, আনুমানিক ২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ।
৩. H. Danby (trans), The Mishnah, p. 446
৪. ibid. p. 446, footnote no. 1.
৫. Dictionary of the Bible, p. 382.
৬. ibid. p. 616.
৭. ibid. p. 954.
📄 ইচ্ছাকৃত কিতাব বিকৃতি
ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে একটি উদাহরণ তুলে ধরছি। ইচ্ছাকৃত বিকৃতির ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে যাবে। আদিপুস্তকের ১৭তম অধ্যায়ে আব্রাহামের কাছে সারা নিজের দাসী হাজারকে 'স্ত্রী' হিসেবে প্রদান করেন। তার গর্ভেই প্রথম সন্তান ইশমায়েলের (ইসমাইল আলাইহিস সালামের) জন্ম। এর তের বছর পরের ঘটনা দেখা যাক—
আদিপুস্তক ১৭ (King James Version অনুযায়ী)
১. আব্রামের নিরানব্বই বছর বয়সে প্রভু পরমেশ্বর তাকে দর্শন দিয়ে বললেন, আমি সর্বশক্তিমান ঈশ্বর, তুমি আমার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে জীবন যাপন কর এবং পূর্ণতা লাভ কর।
২. আমি তোমার সঙ্গে এক সন্ধির চুক্তিতে আবদ্ধ হব এবং তোমার বংশকে বহুগুণে বর্ধিত করব। আব্রাম তখন উপুড় হয়ে প্রণিপাত করলেন।
৩. ঈশ্বর তাকে বললেন,
৪. দেখ, তোমার সঙ্গে আমি সন্ধির চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছি, সেই অনুযায়ী তুমি হবে বহুজাতির আদি পিতা।
৫. তোমার নাম আর আব্রাম (মহান পিতা) থাকবে না, তোমার নাম হবে আব্রাহাম। কারণ আমি তোমাকে বহু জাতির আদি পিতা করব।
৬. আমি তোমাকে প্রজাবন্ত করব, তোমা থেকে উৎপন্ন করব বহু জাতি। নৃপতিরা জন্মাবে তোমার বংশে।
৭. তোমার সঙ্গে এবং পুরুষানুক্রমে তোমার বংশধরদের সঙ্গে আমি যে সন্ধির চুক্তিতে আবদ্ধ হব, তা হবে চিরস্থায়ী। আমি তোমার ঈশ্বর এবং তোমার বংশধরদেরও ঈশ্বর হব।
৮. তুমি যে দেশে প্রবাস করছ, সেই সমগ্র কেনান দেশের সত্তাধিকার তোমাকে এবং
তোমার বংশধরদের চিরকালের জন্য দান করব, আর আমিই হব তোমার ঈশ্বর।
৯. ঈশ্বর আব্রাহামকে আরও বললেন, তুমি আমার সঙ্গে স্থাপিত সন্ধি চুক্তি পালন করবে, তোমার উত্তরপুরুষরা পুরুষানুক্রমে তা পালন করবে।
১০. তোমার সঙ্গে এবং তোমার উত্তরপুরুষদের সঙ্গে আমার সন্ধিচুক্তির শর্ত হলো এই-তোমাদের মধ্যে যারা পুরুষ তাদের প্রত্যেকের লিঙ্গাগ্রচর্ম ছেদন করতে হবে।
১১. তোমরা নিজেদের লিঙ্গাগ্রচর্ম ছেদন করবে, তা-ই হবে তোমাদের সঙ্গে আমার স্থাপিত সন্ধি চুক্তির নিদর্শন।
১৪. লিঙ্গাগ্রচর্ম ছেদন করা হয়নি এমন কোনো পুরুষ স্বজাতিচ্যুত হবে; কারণ সে আমার সন্ধিচুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে।
১৫. ঈশ্বর আব্রাহামকে আরও বললেন, তুমি তোমার স্ত্রী সারীকে আর সারী বলে ডাকবে না। তার নাম হবে সারা। আমি তাকে আশীর্বাদ করব, সে হবে বহুজাতির আদিমাতা এবং তার থেকে উৎপন্ন হবে প্রজাকুলের নৃপতিবৃন্দ।
১৬. আব্রাহাম তখন উপুড় হয়ে প্রণিপাত করলেন ও হাসলেন।
১৭. তিনি মনে মনে বললেন, একশ বছর বয়স যার, সেই বৃদ্ধের কি সন্তান হবে? নব্বই বছরের বৃদ্ধা সারা কি সন্তান প্রসব করবে?
১৮. আব্রাহাম ঈশ্বরকে বললেন, তোমার অনুগ্রহে ইশমায়েলই বেঁচে থাকুক।
১৯. ঈশ্বর বললেন, কিন্তু তোমার স্ত্রী সারা অবশ্যই পুত্রের জননী হবে, তুমি তার নাম রেখ ইসহাক। আমি তার সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপন করব এবং তার ভাবী বংশধরদের সঙ্গে তা হবে চিরস্থায়ী সম্বন্ধ।
২০. ইশমায়েল সম্পর্কে তোমার নিবেদনও আমি গ্রাহ্য করলাম। আমি তাকেও আশীর্বাদ করব। তাকে আমি প্রজাবন্ত করব, তার বংশকে করব বহুগুণে বর্ধিত। তার বংশে বারোজন গোষ্ঠীপতি উৎপন্ন হবে এবং আমি তাকে এক বিরাট জাতিতে পরিণত করব।
২১. কিন্তু আগামী বছর এই সময়ে সারার যে পুত্র জন্মগ্রহণ করবে, সেই ইসহাকের সঙ্গেই আমি আবদ্ধ হব এই সন্ধি চুক্তিতে।
২২. কথা শেষ করে ঈশ্বর আব্রাহামের কাছ থেকে অন্তর্হিত হলেন।
২৩. আব্রাহ সঙ্গে পরিব তাদের সকে
২৫. আর ত
২৬. একই। হলো [১]
বস্তুনিষ্ঠ পাঠা বার আব্রাহামে লিঙ্গাগ্রচর্ম যে একমাত্র সন্তা কোনো কারণ তার নিজের ক
সতেরো তম ও সন্তানের সুসংব আসবে। অথচ।
১০. তাদের মে আসব, আর ত দাঁড়িয়ে সারা এ:
১১. তাদের অনে তাই সারা মনে ম
১২. আমি ও আ
১৩. তিনি আব্রাহ সত্যিই সন্তানের ম
১৪. আমি তো বৃদ্ধ ঋতুতে নির্দিষ্ট সঙ্গ
২৩. আব্রাহাম ঈশ্বরের নির্দেশ অনুযায়ী সেই দিনই তার পুত্র ইশমায়েল এবং তার সঙ্গে পরিবারে যত জাত এবং অর্থমূল্যে ক্রীত আব্রাহামের পরিবারে যত পুরুষ ছিল তাদের সকলেরই লিঙ্গাগ্রচর্ম ছেদন করলেন।
২৫. আর তার পুত্র ইশমায়েলের বয়স ছিল তের বছর।
২৬. একই দিনে আব্রাহাম ও তার পুত্র ইশমায়েল উভয়ের লিঙ্গাগ্রচর্ম ছেদন করা হলো।
বস্তুনিষ্ঠ পাঠকের মনে উল্লিখিত বর্ণনা সমস্যাপূর্ণ মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। ঈশ্বর বার বার আব্রাহামের সাথে চুক্তির কথা চূড়ান্ত করেছেন। সেই চুক্তির চিহ্ন হিসেবে বলেছেন লিঙ্গাগ্রচর্ম ছেদনের কথা। তখন তের বছর বয়সী ইশমায়েলই ছিল আব্রাহামের একমাত্র সন্তান। পিতা-পুত্র উভয়ে একইদিনে ত্বক ছেদ করেন। তথাপি উপযুক্ত কোনো কারণ ছাড়াই চুক্তি থেকে ইশমায়েলকে হটিয়ে দেওয়া হলো। বাইবেলের ঈশ্বর তার নিজের কথার বিপরীতে গিয়ে বালক ইশমায়েলকে চুক্তির বাইরে রাখলেন।
সতেরো তম অধ্যায়ের ১৬-২১ নং শ্লোকে আব্রাহামকে ইসহাক নামের আরেকজন সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। সে ‘পরের বছর একই সময়ে সারার’ গর্ভে আসবে। অথচ আঠারোতম অর্থাৎ ঠিক পরের অধ্যায়ে আমরা দেখি—
১০. তাদের মধ্যে একজন বললেন, আজ থেকে নয় মাস পরে তোমার কাছে আবার আসব, আর তখন তোমার স্ত্রীর একটি পুত্র সন্তান হবে। তাঁবুর দরজার পিছনে দাঁড়িয়ে সারা এ কথা শুনলেন। সেই সময়ে আব্রাহাম ও সারা দুজনেই বৃদ্ধ হয়েছিলেন।
১১. তাদের অনেক বয়স হয়েছিল এবং সারার সন্তান ধারণের ক্ষমতা নিবৃত্ত হয়েছিল। তাই সারা মনে মনে হেসে বললেন—
১২. আমি ও আমার স্বামী বৃদ্ধ হওয়ার পরেও কি এই আনন্দ উপভোগ করব?
১৩. তিনি আব্রাহামকে বললেন, সারা কেন হাসল আর মনে মনে বলল, আমি কি সত্যিই সন্তানের মা হব?
১৪. আমি তো বৃদ্ধা। প্রভু পরমেশ্বরের অসাধ্য কোনো কাজ আছে কি? আগামী এই ঋতুতে নির্দিষ্ট সময়ে আমি আবার তোমার কাছে আসব।
গর্ভে সন্তানধারণের সংবাদ শুনে সারা প্রচণ্ড বিস্মিত হন। বিস্ময়ের চোটে মনে মনে হাসিও চলে আসে। অথচ একই আলোচনা আগের অধ্যায়েও হয়েছে—
‘ঈশ্বর বললেন, কিন্তু তোমার স্ত্রী সারা অবশ্যই পুত্রের জননী হবে, তুমি তার নাম রেখো ইসহাক। আমি তার সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপন করব এবং তার আসন্ন বংশধরদের সঙ্গে তা হবে চিরস্থায়ী সম্বন্ধ।’
উক্ত শ্লোকটি সত্য হলে পরবর্তী সময়ে সারার বিস্মিত হওয়ার কোনো কারণ থাকে না; কিন্তু দেখা যাচ্ছে সারা এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না। অর্থাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে আদিপুস্তক ১৭-এর শ্লোকে পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। আসল উদ্দেশ্য ইশমায়েলকে ঈশ্বরের চুক্তি থেকে বাতিল প্রতিপন্ন করা। এখানে তার ত্বক ছেদ হয়েছে কি হয়নি, তা কোনো গুরুত্ব রাখে না।
এখন ইতিহাসবিদ জোসেফাসের ব্যাপারে আলোচনা করা যাক। নিজ গ্রন্থে শুরুতে ইশমায়েলকে আব্রাহামের প্রথম সন্তান বলে উল্লেখ করেন তিনি। এরপর হঠাৎ ইসহাককে আব্রাহামের বৈধ এবং একমাত্র ঔরসজাত সন্তান হিসেবে অভিহিত করেছেন।[১] কীসের ভিত্তিতে ইসহাক বৈধ এবং ইশমায়েল বাতিল? ইশমায়েল কি তাহলে অবৈধ? আব্রাহাম একজন ব্যভিচারী? জোসেফাসের উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়। তবে ইশমায়েলকে উপেক্ষিত রাখার বাইবেলীয় চিত্রকে তিনি পরিষ্কার তুলে ধরেছেন। এই উপেক্ষা অন্য আরও শ্লোকে পরিলক্ষিত হয়। আদিপুস্তক ২২:২ এ আছে—
‘ঈশ্বর বললেন, তোমার একমাত্র পুত্র ইসহাক, যাকে তুমি ভালোবাস, তাকে নিয়ে তুমি মোরিয়া দেশে যাও এবং সেখানে যে পর্বতের কথা আমি বলব, সেই পর্বতের ওপর তাকে বলিদান করে হোমানলে উৎসর্গ কর।’
ইসহাক কীভাবে একমাত্র পুত্র হতে পারেন, যেখানে ইশমায়েল তার চেয়ে কমপক্ষে তের বছরের বড়? 'যাকে তুমি ভালোবাস' কথার মধ্যে হয়তো ভালোবাসার ব্যাপারটি বোঝানো হয়েছে। তবে কম ভালোবাসা আর সন্তান অবৈধ হওয়া তো এক জিনিস নয়। আর যদি ইশমায়েলের মা দাসী হওয়ার কারণে এই শ্লোকে ইসহাককে একমাত্র বৈধ পুত্র বোঝানো হয়, তাহলে ইয়াকুবের বারো পুত্রের ব্যাপারে কী হবে? তাদের মায়েরা স্ত্রী ছিলেন নাকি উপপত্নী, সে পরিচয় তো গুরুত্বপূর্ণ নয়। বনি ইসরাইলের বারো গোত্রের প্রত্যেক আদিপুরুষই একই মর্যাদা পাবে। কিন্তু ইশমায়েলের বংশের প্রতি ইসরাইলীয়দের ঘৃণা থেকেই হয়তো ইশমায়েল-সংক্রান্ত পাঠ্যে বিকৃতি ঘটেছে।
গীতসংহিতার ৮৩ তম অধ্যায়ে এই শত্রুভাবাপন্নতা একদম পরিষ্কার প্রতীয়মান—
১. ঈশ্বর, নীরব থাকবেন না! কান বন্ধ করে রাখবেন না! ঈশ্বর আপনি কিছু বলুন।
২. ঈশ্বর, শত্রুরা আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে এবং খুব শীঘ্রই ওরা আক্রমণ করবে।
৪. ঐ শত্রুরা বলাবলি করছে, এসো, "আমরা ওদের পুরোপুরি ধ্বংস করে দিই। তাহলে কোনো ব্যক্তি আর কোনোদিনের জন্যও ইসরায়েলের নাম স্মরণ করবে না।”
৫. ঈশ্বর, ওই সব লোক আপনার বিরুদ্ধে এবং আমাদের সঙ্গে আপনি যে চুক্তি করেছেন, তার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য, এক জোট হয়েছে।
৬. ওই শত্রুরা আমাদের সঙ্গে লড়াই করবে বলে এক জোট হয়েছে: ওদের মধ্যে যারা রয়েছে তারা হলো ইদোমবাসী, ইশমায়েলের বংশধর, মোযাব ও হাগারের উত্তরপুরুষ।
৭. গবাল, আম্মোন ও আমালেকের অধিবাসী, সোর দেশের লোক এবং ফিলিস্তিনের লোকেরা। ঐসব লোক আমাদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য একজোট হয়েছে...
১০. হে ঈশ্বর, খড় কুটো যেমন বাতাসে উড়ে যায়, তেমনিভাবে আপনি ওদের উড়িয়ে দিন। ঝড়ো হাওয়ায় খড় যেমন ছড়িয়ে যায় তেমনিভাবে ওদের ইতঃস্তত ছড়িয়ে দিন।
১৭. ঈশ্বর, চিরদিনের মতো ওদের ভীত ও লজ্জিত করে দিন। ওদের অপমানিত ও বিনষ্ট করুন।
ইশমায়েলের বংশের প্রতি এরকম ঐতিহাসিক ঘৃণা লালন করা ইহুদি লিপিকারদের পক্ষে কি ধর্মগ্রন্থের পাঠ্য লেখার সময় খোদ ইশমায়েলের ব্যাপারে উদারতা প্রদর্শন করা সম্ভব? অন্ততপক্ষে সততার স্থানটুকুও কি তারা রেখেছে? নাকি সুযোগ বুঝে তাকে অবৈধ সন্তান, গুরুত্বহীন ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরে নিজেদের পূর্বসূরী ইসহাককে উপরে তুলেছে? এগুলো খুব ভালোভাবে খেয়াল করতে হবে।
চুক্তির আওতাবঞ্চিত অবশ্য শুধু একা ইশমায়েলকে করা হয়নি। ৬ নং শ্লোকে ‘ইদোমবাসী’-এর উল্লেখ দ্বারা ইসহাকের অর্ধেক বংশও বঞ্চিত হয়ে গেছে। কারণ
ওল্ড টেস্টামেন্ট অনুযায়ী ইসহাকের দুজন পুত্র[১]—এক. এযৌ বা ইদোম। দুই. জ্যাকব বা ইয়াকুব।
এষৌ প্রথম জন্মান। এদিকে জ্যাকব বনি ইসরাইলের বারো গোত্রের আদিপুরুষ।
ওল্ড টেস্টামেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, জ্যাকব দুবার তার ভাইকে প্রতারিত করেন। এষৌ প্রথম সন্তান; কিন্তু ডালের ঝোলের বদলে তার থেকে অসদুপায়ে এ মর্যাদা কিনে নেন জ্যাকব। অথচ তখন ক্ষুধার যন্ত্রণায় এষৌর অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল।[২] দ্বিতীয়বার সুযোগ বুঝে তিনি মায়ের সাথে মিলে এষৌর জন্য বরাদ্দকৃত আশীর্বাদ ছিনিয়ে নেন। অন্ধকারে ইসহাক সেটা বুঝতে পারেননি। নিজের হাতকে এযৌর মতো লোমশ করার জন্য জ্যাকব নকল লোমের সাহায্য নেন।[৩] প্রতারণার পরেও জ্যাকবের বংশধরকে বনি ইসহাকের একমাত্র ধারা হিসেবে অব্যাহত রাখা হয়। বঞ্চিত করা হয় এষৌ বা ইদোমের বংশধরদের।
‘ইসরাইলীয়রা জানত—ইদোমীয়রা তাদের নিকটাত্মীয় এবং প্রাচীনতর জাতি... (এষৌ এবং জ্যাকবের মধ্যকার শত্রুতা)-এর মাধ্যমে ইদোমীয় এবং ইসরাইলীয়দের বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের প্রকৃত অবস্থা জানা যায়। এর জন্য ইসরাইলীয়দের যথেষ্ট দায় রয়েছে।’[৪]
এই ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বকে সামনে রাখলে মোশির কাছে আসা ঈশ্বরের বার্তা থেকে ইশমায়েল ও এষৌর নাম বাদ যাওয়ার কারণ পরিষ্কার হয়ে যায়—
‘প্রভু পরমেশ্বর মোশিকে বললেন, আব্রাহাম, ইস্হাক ও জ্যাকবের কাছে শপথ করে তাদের বংশধরদের যে দেশ দেওয়ার শপথ আমি করেছিলাম, এই সেই দেশ। সেই দেশ আমি তোমাকে দেখতে দিলাম মাত্র; কিন্তু সেখানে তুমি প্রবেশের অধিকার পাবে না।’[৫]
প্রথমে ইশমায়েলকে চুক্তি থেকে বঞ্চিত করা হলো। কারণ ঈশ্বর শুধু ইসহাকের মাধ্যমে আব্রাহামের সাথে করা চুক্তি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছিলেন; কিন্তু
সেটিও সত্য হলো না। কারণ জ্যাকবের কর্মকাণ্ডের ফলে ইসহাকের অর্ধেক বংশধারা ঐশী চুক্তি হতে বঞ্চিত হয়ে যায়। এদিকে জ্যাকবকে নিজের জন্য এবং স্ত্রী-উপপত্নী নির্বিশেষে সকলের গর্ভে জন্মানো বারো সন্তানের জন্য চুক্তি নিশ্চিত রাখতে দেখা যায়।[১] ইশমায়েল, এষৌ ও তাদের সন্তানদেরকে বাদ দেওয়ার এই নিয়মতান্ত্রিক জালিয়াতির উদ্ভব হয়েছে ঐসব সূত্র থেকে, যারা জ্যাকব ও তার বংশধারার প্রতি প্রচন্ডভাবে পক্ষপাতদুষ্ট।
কেউ যদি ঐশী চুক্তিকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ ও অনুগ্রহ বলে ধরে নেয়, তাহলে তিনি তা কোথায় দেবেন, না-দেবেন, সেটাও তাঁরই সিদ্ধান্ত; কিন্তু ইশমায়েল ও এষৌকে এভাবে ক্রমাগত ছাঁটাই তাঁর নিজের অধ্যাদেশের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ আদিপুস্তকে আছে, 'তুমি যে দেশে প্রবাস করছ, সেই সমগ্র কেনান দেশের সত্ত্বাধিকার তোমাকে এবং তোমার বংশধরদের চিরকালের জন্য দান করব, আর আমিই হব তোমার ঈশ্বর।' [২] কিন্তু ইতিহাস বলছে, আনুমানিক আড়াইশ বছরের বেশি বনি ইসরাইল 'সমগ্র কেনান দেশ' শাসন করতে পারেনি। ডেভিডের শাসনামল (আনু. ১০০০-৯৬২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) থেকে শুরু করে সামারিয়ার আত্মসমর্পণ ও উত্তর ইসরাইল রাজ্যের পতন (৭২১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) পর্যন্ত ইতিহাস তাই সাব্যস্ত করে। ঈশ্বরপ্রদত্ত চিরকালীন মালিকানার প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব ইতিহাস তাহলে পরস্পর সাংঘর্ষিক প্রমাণিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে হয় ঈশ্বরের ঘোষণাকে বাতিল করতে হবে। অথবা ইশমায়েল ও তার বংশধরদের উপেক্ষা করা বিকৃত শ্লোকগুলো প্রত্যাখ্যান করতে হবে। দ্বিতীয়টি করলে ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতি সত্য হয়। কারণ কেনান সর্বদা আব্রাহামের বংশের অধীন থেকেছে।
আদিপুস্তক ১৩ থেকে কয়েকটি শ্লোক দেখা যাক—
১৪. আব্রামের কাছ থেকে লোত পৃথক হয়ে যাওয়ার পর প্রভু পরমেশ্বর আব্রামকে বললেন, তুমি যেখানে আছ সেখান থেকে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তাকাও।
১৫. যে দেশ তুমি দেখছ, সেই সমগ্র দেশ আমি তোমাকে ও তোমার বংশধরদের চিরকালের জন্য দান করব।
১৬. পৃথিবীর ধূলিকণার মতো আমি তোমার বংশের বৃদ্ধি ঘটাব। কেউ যদি পৃথিবীর
সব ধূলিকণা গণনা করতে পারে, তবে তোমার বংশধরদের সংখ্যাও নির্ধারিত করা যাবে।
উল্লিখিত শ্লোকগুলো আদিপুস্তক ১৭-এর শ্লোকবিকৃতিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। এক্ষেত্রে আদিপুস্তক ১৫-এর কিছু শ্লোক থেকে ব্যাপারটি আরও জোরালো হয়। ঐতিহাসিকভাবে ইহুদিরা সংখ্যার দিক থেকে ইসমাইল-বংশীয় আরবীয়দের তুলনায় অনেক কম ছিল। 'পৃথিবীর ধূলিকণার মতো' হতে হলে শুধু ইহুদি জনসংখ্যা যথেষ্ট নয় (ইসমাইল বংশীয় আরবীয়রাও বিবেচ্য)। কাজেই ঈশ্বরের চুক্তি থেকে ইশমায়েলকে বাদ দেওয়াটা ইচ্ছাকৃত পক্ষপাতদুষ্টতা হিসেবে দেখতে ইতিহাস আমাদের বাধ্য করছে।
টিকাঃ
১. Josephus, Antiq., Book 1, Ch. 12, No.3 (215), and Book 1, Ch. 13, No. 1 (222).
২. Wuerthwein, p. 17.
৩. আদিপুস্তক ২৫: ২৩-২৬
৪. আদিপুস্তক ২৫: ২৯-৩৪
৫. আদিপুস্তক ২৭
৬. Dictionary of the Bible. p. 229.
৭. দ্বিতীয় বিবরণী ৩৪:৪
৮. ইয়াকুবের দুই স্ত্রীর গর্ভে বারো সন্তানের আটজন এবং উপপত্নীদের গর্ভে বাকি চারজন জন্মগ্রহণ করে।
৯. আদিপুস্তক ১৭: ৮; গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ইটালিক করা।
১০. আদিপুস্তক ১৩ : ১৪-১৬। গুরত্বপূর্ণ স্থানে ইটালিক করা। আরও দেখতে পারেন, আদিপুস্তক ১৫ : ৩-৫
📄 অধ্যায় শেষে
সিনাই পর্বত থেকে মোশির প্রত্যাদেশ পাওয়া এবং হিব্রু টেক্সটের প্রমিতকরণের মাঝে রয়েছে বহু শতাব্দীর ব্যবধান। কালের এই বিশাল পরিক্রমায় পাঠ্যগুলোতে কোনো রকম ভুল, পরিবর্তন ও সংযোজন না থাকাটা হবে অলৌকিকতার নামান্তর। আর নিশ্চিতভাবেই ইহুদিদের ইতিহাস থেকে এমন কোনো অলৌকিকতার তথ্য পাওয়া যায় না। ফিলিস্তিনের তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থা খুব সহজেই আমরা দেখতে পাই। এমনকি ঐক্যবদ্ধ ইহুদিরাষ্ট্র থাকাকালীনও ওল্ড টেস্টামেন্টের বিশুদ্ধ ও যথাযথ প্রচারের মতো পরিবেশ সেখানে ছিল না। রাজারা এর প্রচার-প্রসার থেকে বিমুখ ছিলেন এবং ধর্মগ্রন্থের প্রতি তাদের কোনো প্রকার অনুরক্তিও ছিল না। এদিকে জনগণ মূর্তি নির্মাণ এবং শিশু বলিদানের মতো পৌত্তলিক সংস্কৃতিকে আপন করে নেয়। এর ওপর খোদ টেক্সটই বার বার খোয়া গেছে এবং প্রতিবারই কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত তা নিখোঁজ থেকেছে।
ইহুদিদের ধর্মীয় ও সাহিত্য-সংস্কৃতির ভিত্তি আহরণ করা হয়েছে অ-ইহুদি সমাজ থেকে। ফলে তাদের ইতিহাসের শুরু থেকেই ওল্ড টেস্টামেন্টে বাইরে থেকে অনেক কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটেছে। যেমন:
(ক) ফোনেশীয়দের কাছ থেকে হিব্রু ভাষা ধার করা।
(খ) ইহুদিদের নিজস্ব কোনো লিপি না থাকা; বরং আরামীয় ও আসিরীয়দেরটা আত্মস্থ করা।
(গ) হিব্রু তোরাহ-এর উচ্চারণ-চিহ্ন যুক্ত করার পদ্ধতি আরবি থেকে ধার করা।
(ঘ) চুক্তির অধ্যায় বা the Book of the Covenant (যাত্রাপুস্তক ২০: ২২-২৩ : ১৯) খুব সম্ভব হাম্মুরাবি কোডের আলোকে রচনা করা। এরকম আরও অনেক বিষয় রয়েছে।
মোশির মৃত্যুর পর প্রায় ২৩০০ বছর অর্থাৎ দশম শতাব্দী পর্যন্ত টেক্সট পরিবর্তনশীল অবস্থায় ছিল। অর্থাৎ মতাদর্শের দোহাই দিয়ে পাঠ্য পরিবর্তন করার সুযোগ ছিল। পরিবর্তন সম্পন্ন হওয়ার পর মূল উৎসটিকেই নতুন সংস্করণের বিপরীতে ‘ত্রুটিযুক্ত’ আখ্যায়িত করা হয় ও তা নিশ্চিহ্ন করা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। এতে করে অনেক পুরোনো ও অখণ্ড সূত্র ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়।
এখন কুরআনের একটি আয়াত লক্ষ করা যাক—
‘যারা অনুসরণ করে রাসুলের, নিরক্ষর নবির, যার উল্লেখ তারা তাদের তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিপিবদ্ধ পায়।’[১] অর্থাৎ তাদের পরিবর্তিত গ্রন্থেও স্পষ্টভাবে শেষ নবির কথা উল্লেখ ছিল। অনেক সাহাবি এবং তাবিয়ি সেসব সূত্র দেখেছেন।[২] কিন্তু পরে তা ব্যাপকভাবে সাফ করা হয়।[৩] দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি পেশ করে আমি চলতি অধ্যায়ের সমাপ্তি টানছি—
‘প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রে ঐশী প্রত্যাদেশ ছিল, তবে অংশ আকারে। এটা সনাতন ইহুদিধর্মের মুখ্য বিশ্বাস। সিনাইয়ে ঈশ্বর দুই প্রকার প্রত্যাদেশ প্রদান করেছেন। লিখিত অংশটি সবাই জানে। মৌখিক অংশটিও মহান শাস্ত্রীয় মহাপুরুষগণ সংরক্ষণ করেছেন। দূরবর্তী অতীতে পূর্বপুরুষগণ নবিদের কাছ থেকে সেগুলো পান এবং সবশেষে তা ফিলিস্তিনি ও ব্যাবিলনীয় তালমুদের রচয়িতা র্যাবাইদের হাতে পৌঁছে দেন।’[৪]
‘(কুমরান থেকে প্রাপ্ত) নমুনাগুলো এখন হাতে থাকায় পাঠ্য-বিশেষজ্ঞরা… এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চলেছেন যে, এটি বিগত দুই হাজার বছর ধরে বাহ্যত
অপরিবর্তিত রয়েছে।[১]
অথচ ওল্ড টেস্টামেন্টের যে ইতিহাস আমরা জানলাম, তার বিপরীতে উল্লিখিত বিবৃতিগুলো বড়জোর অতিকল্পনার ফসল বলা চলে। এর বিপরীতে কুরআনের বিশুদ্ধতা নিশ্চিতকরণে মুসলিমদের অনুসৃত প্রক্রিয়াগুলোর কথা একবার স্মরণ করুন। যদিও হুঁশিয়ার পাঠক ইতোমধ্যেই তা করে ফেলেছেন নিশ্চয়। সামনে নিউ টেস্টামেন্টের আলোচনা থেকে আরও অনেক চিন্তার খোরাক আসবে বলে আশা রাখি।
টিকাঃ
১. সুরা আরাফ, আয়াত: ১৫৭
২. ইবনু কাসির, তাফসির, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২২৯-২৩৪ দ্রষ্টব্য।
৩. উল্লেখ্য, এখনো কিছু আলামত বিদ্যমান রয়েছে। ইউসুফ আলির Translation of Holy Qur’an গ্রন্থের ৪৮: ২৯ এর পাদটীকা দ্রষ্টব্য।
৪. The Way of Torah, J. Neusner, p. 81.
৫. Geza Vermes, The Dead Sea Scroll in English, Pelican Books, 2nd edition, 1965, p. 12.