📄 ওল্ড টেস্টেমেন্টের মূল ভাষার নাম হিব্রু ছিল না
নির্বাসনপূর্ব ইহুদিসমাজ কেনানীয় উপভাষায় কথা বলত। এর নাম হিব্রু ছিল না। ফোনেশীয়রা আনুমানিক ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রথমবার প্রকৃত বর্ণমালা উদ্ভাবন করে। কেনানীয় বললে অবশ্য আরও যথার্থ হবে। বর্ণনামূলক ছবির স্থলে শুরু হয় বর্ণের প্রচলন। তাই পরবর্তীতে আসা সকল বর্ণমালা কেনানীয়দের এই কীর্তির প্রতি কৃতজ্ঞ।[১]
সাধারণ কৃষ্টি-কালচারেও কেনানীয়দের অবদান কম নয়। সেই সংস্কৃতির বিন্দু পরিমাণও হিব্রুরা গ্রহণ করতে পারেনি... নির্মাণকাজে তাদের খুব বেশি দক্ষতা ছিল না। শিল্পকলা এবং কারুশিল্পেও নেই তেমন পারদর্শিতার ছাপ। তাই এসব ক্ষেত্রে কেনানীয়দের ওপর নির্ভর করা ছাড়া কোনো গতি ছিল না তাদের। ফিলিস্তিনে বসবাসের আগ পর্যন্ত হিব্রুদের ভাষা যেটিই হয়ে থাক না কেন, তা ছিল কেনানীয়দের একটি উপভাষা। বসতি গড়ার পর এটিই তাদের ভাষায় পরিণত হয়।[২]
অনেক পণ্ডিত মনে করেন যে, হিব্রু এবং আরামাইক হলো কেনানীয় দুটি উপভাষা মাত্র।[৩] নির্বাসনপূর্ব ইহুদিলিপি মূলত কেনানীয় ছিল; কিন্তু বর্তমানে এটিকে সনাতন হিব্রু বা পালিও-হিব্রু বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। কেনানে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এবং তার বংশধরদের ছোট বসতি নিজস্ব একটি ভাষা তৈরির জন্য যথেষ্ট ছিল না। তাই যোগাযোগের প্রয়োজনে প্রচলিত কেনানীয় ভাষা ব্যবহার করাটা ছিল স্বাভাবিক। সংখ্যায় এত কম, দুর্দশাগ্রস্ত এবং দাসজীবনে অভ্যস্ত থাকা ইসরায়েলিদের পক্ষে একটি নতুন ভাষা দাঁড় করানোর সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোটায়। খুব বেশি হলে কেনানীয়দের কোনো উপভাষাকে তারা গ্রহণ করে থাকতে পারে। নতুন কিংবা মৌলিক কিছু সেখানে ছিল না। এমনকি ওল্ড টেস্টামেন্টের কোথাও ইহুদিদের ভাষা হিব্রু বলে উল্লেখ করা হয়নি। খোদ যিশাইয়তে আছে—
'তখন ইলিয়াকিম, শেবনা ও যোয়াহ্ তাকে বললেন, দয়া করে আমাদের সঙ্গে ইহুদিভাষায় নয়, আরামীয় ভাষাতেই কথা বলুন, আমরা বুঝতে পারব। কারণ প্রাচীরের ওপরে আমাদের লোকেরা বসে আছে। তারা আমাদের কথা শুনছে; কিন্তু রবশাকি বললেন, তোমরা কি ভেবেছ, আসিরিয়ার সম্রাট শুধু তোমাদের কাছে ও তোমাদের রাজার কাছে এই কথা বলতে আমাদের পাঠিয়েছেন? না, ওই প্রাচীরের ওপরে যারা বসে আছে, তোমাদেরই মতো যাদের সকলকেই নিজেদের মলমূত্র খেতে হবে, তাদেরও আমরা এই কথা বলতে এসেছি। তারপর তিনি উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ইহুদিভাষায় বলতে আরম্ভ করলেন, শোনো তোমরা, আসিরিয়ার সম্রাট তোমাদের কী বলেছেন।' [৪]
King James Version-এর শ্লোকগুলো থেকে আমরা এটাই জানতে পারি। New World Translation[৫], the Revised Standard Version[৬], the Holy Bible from the Ancient Eastern Text[৭] এবং আরবি সংস্করণেও আছে একই বাক্য। শেষের তিনটাতে 'আরামীয়' ভাষার স্থলে 'সুরিয়ানি' ভাষার কথা এসেছে; কিন্তু 'হিব্রু' কোনোটাতেই বলা হয়নি।[৮] একই ব্যাপার ২ রাজাবলি ১৮ : ২৬ এবং ২ বংশাবলি ৩২ : ১৮-তেও। আবার যিশাইয়তেই আরেক অধ্যায়ে আছে-
'সেইদিন মিশরের পাঁচটি নগরের মানুষ কেনানের ভাষায় কথা বলবে। সেখানকার মানুষ সর্বাধিপতি প্রভু পরমেশ্বরের নামে শপথ নেবে। নগরগুলির মধ্যে একটি নগরের নাম হবে ধ্বংসের শহর।' [৯]
উপরিউক্ত অনুবাদগুলো একে অপরকে সমর্থন করছে। হিব্রুর অস্তিত্ব যদি তখন থেকেই থাকত, তাহলে ওল্ড টেস্টামেন্টে তা পাওয়া যেত। 'ইহুদিভাষা' বা 'কেনানের ভাষা' জাতীয় অনির্দিষ্টতা স্থান পেত না।[১০] কেনানের ভাষা বা কেনানীয় ভাষা প্রসঙ্গে বাইবেলের ভাষ্য থেকে সহজেই অনুমেয়, ইসরাইল ও ইয়াহুদা রাজ্যের আমলে ইসরায়েলিদের নিজস্ব কোনো ভাষা ছিল না।
'হিব্রু' শব্দটির অস্তিত্ব ছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা ইসরাইল জাতির আরও আগে থেকেই। তখন এর দ্বারা ইহুদি জাতীয় কিছু বোঝানো হতো না। 'ইব্রী' (হাবিরু) এবং 'ইবরানি' (হিব্রু) শব্দদ্বয় ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দেও প্রচলিত ছিল। এর দ্বারা বোঝানো হতো উত্তর আরব উপদ্বীপের একদল আরব গোত্রকে। তাদের বসবাস ছিল সিরিয়ার মরুভূমিতে। কালক্রমে শব্দটি আশেপাশের সব গোত্রের ক্ষেত্রেই ব্যবহার হতে থাকে। একপর্যায়ে এর অর্থ গিয়ে দাঁড়ায় 'মরুসন্তান'। ইসরাইলিদের আগে কীলকলিপি এবং ফারাওনিক লিপিতেও ইব্রী, হাবিরি, হাবিবু, খাবিরু এবং আবিরু প্রভৃতি শব্দ পাওয়া যায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে 'ইবরানি' বলতে আবিরু গোত্রের সদস্য বোঝায়। শব্দটিকে বাইবেলে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে এবং তিনি এ গোত্রের অংশ ছিলেন। ইহুদি বোঝাতে 'ইব্রীল' শব্দটির প্রচলন ফিলিস্তিনের ধর্মগুরুরা শুরু করেন।[১১]
টিকাঃ
১. Isra'il Wilfinson, Tarikh al-Lugst as-Samiyya (History of Semitic Languages), Dar al-Qalam, Beirut, Lebanon, P.O. Box 3874, ND, p. 54. Cited thereafter as Wilfinson.
২. Dictionary of the Bible, p. 121; italics added.
৩. Wilfinson, p. 75.
৪. যিশাইয়: ৩৬: ১১-১৩
৫. New World Translation of the Holy Scriptures, Watchtower Bible and Tract Society of New York, Inc., 1984.
৬. Thomas Nelson & Sons, 1952.
৭. George M. Lamsa’s translation from the Aramaic of the Peshitta, Harper, San Francisco.
৮. The Revised Standard Version-এ বলা হয়েছে 'language of Judah.'
৯. KJV, Isaiah 19:18; BSI থেকে মুদ্রিত বাংলা পবিত্র বাইবেল-এর পুরোনো সংস্করণ দ্রষ্টব্য।
১০. আমার কাছে থাকা সংস্করণগুলোর মধ্যে শুধু CEV বাইবেলে 'হিব্রু' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। অন্য সংস্করণগুলো মূল টেক্সটের কাছাকাছি হলেও CEV-এর এমন কাজ নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। বিস্তারিত অধ্যায় ৭.৭ দ্রষ্টব্য।
১১. Wilfinson, pp. 73-79.
📄 প্রাচীন ইহুদি-লিপি: কেনানীয় এবং আসিরীয়
ব্যাবিলনে নির্বাসিত হওয়ার আগে ইহুদিরা কেনানীয় লিপি ব্যবহার করত।[১] প্রাচীন নিকট প্রাচ্যের মুখের ভাষা হিসেবে আরামীয় প্রাধান্য লাভ করার পর তা ইহুদিরাও তা গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে লেখার ক্ষেত্রেও এই ভাষাই ব্যবহার করে, যা তখন আসিরীয় নামে পরিচিত ছিল।[২]
'এই כתב אשור বা אשורית "আসিরীয় লিপি”-কে এই নামে ডাকার কারণ এটি আসলে “ফোনেশীয় লিপি”-এর আরামীয় রূপ। এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছিল... খ্রিষ্টপূর্ব ৮ম শতক থেকে। নির্বাসনোত্তর ইহুদিরা আবার এটিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এই বর্ণমালা থেকেই চতুর্ভুজাকৃতির লিপি বা "Square script" (כתב מרבע) উদ্ভূত হয়।'[৩]
এই চতুর্ভুজ লিপিও হিব্রু হিসেবে পরিচিত ছিল না শুরুতে। ১ম খ্রিষ্ট শতাব্দীতে ইবনু সারা এবং জোসেফাস এই লিপি ব্যবহার করে। মিশনাহ এবং তালমুদও লিখিত আকার লাভ করে এই লিপিতেই।[৪] এগুলো অনেক পরে অস্তিত্ব লাভ করলেও এর ফলে আনুষ্ঠানিক ভাষাটির নাম হয় হিব্রু।
তাহলে ওল্ড টেস্টামেন্ট মূলত কোন ভাষায় লিপিবদ্ধ হয়েছিল? ওপরে প্রদত্ত তথ্য থেকে আমরা ক্রমপরিবর্তনের যে ধারা দেখতে পাই তা হলো-কেনানীয়, আরামীয় (আসিরীয়) এবং সবশেষে চতুর্ভুজাকৃতির লিপি; যা পরবর্তী সময়ে হিব্রু হিসেবে পরিচিতি পায়। তাহলে পরিষ্কারভাবে, ব্যাবিলনের নির্বাসন থেকে ফেরার আগে অর্থাৎ ৫৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে ইহুদিদের নিজস্ব কোনো লিপি ছিল না। মজার বিষয় হলো, কেনানীয় বর্ণমালার ব্যাপারে উর্থওয়াইন (Wuerthwein) বলেছেন, 'এটি হলো ফোনেশীয়-সনাতন হিব্রু লিপি এবং বর্তমান ও পূর্বের সকল বর্ণমালার জনক।'[৫]
টিকাঃ
১. Wilfinson, p. 91.
২. Ernst Wuerthwein, The Text of the Old Testament, 2nd Edition, William B. Eerdmans Publishing Company, Grand Rapids, Michigan, 1995, pp. 1-2. Cited thereafter as Wuerthwein.
৩. ibid, p. 2, footnote 4.
৪. Wilfinson, p. 75
৫. Wuerthwein, p. 2. ইতিহাস বিকৃতির এই মহড়ায় আরও একটি ব্যাপার রয়ে গেছে। মিশরের ১৯০০-১৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে খোদাই করা লিপিটি আবিষ্কার করেছেন ড. ডার্নেল এবং তার স্ত্রী ডেবোরাহ। বিস্তারিত ছবি তুলতে সেখানে যান (J.N. Wilford, “Discovery of Egyptian Inscriptions Indicates an Earlier Date for Origin of the Alphabet”, The New York Times, Nov. 13, 1999): ইদানীং সেমিটিক এবং এন্টি-সেমিটিক শব্দগুলো যেহেতু আরব এবং আরামীয়দের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত না হয়ে শুধু ইহুদিদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তাই বর্ণমালা আবিষ্কারের কৃতিত্ব এখন ফোনেশীয়দের থেকে সরিয়ে ইহুদিদের পূর্বপুরুষদেরকে প্রদান করার পাঁয়তারা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
📄 তাওরাতের উৎস
ক. ইহুদি উৎস
জুলিয়াস ওয়েলহাউসেন (১৮৮৪-১৯১৮) তাওরাতের চারটি মূল উৎসের কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো- J (ইয়াহওয়েহীয় প্রফেটিক বর্ণনা, আনুমানিক ৮৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), E (এলহীয় প্রফেটিক বর্ণনা), D (দ্বিতীয় বিবরণ এবং অন্যান্য দ্বিতীয় বিবরণীয় নোট, আনুমানিক ৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), P (প্রিস্টলি কোড, লেবীয় পুস্তক এবং অন্যান্য সংস্করণে এর বিশেষ উল্লেখ আছে, আনুমানিক ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। [১] আরও অনেক সূত্র পাওয়া গিয়েছে। সেগুলোর সবই ইহুদি উৎস বলে অনুমান করা হয়।
খ. অ-ইহুদীয় উৎস
সমস্যা হলো অ-ইহুদীয় উৎস থেকেও একই রকম বার্তা পাওয়া যায় যেগুলোর কোনো কোনোটা খোদ ওল্ড টেস্টামেন্টের চেয়েই অন্তত পাঁচশ বছর পুরোনো। যাত্রাপুস্তক ২০ অনুযায়ী, ঈশ্বর মৌখিকভাবে ১০টি আজ্ঞা ঘোষণা করেন এবং দুটি প্রস্তর ফলকে তা খোদাই করে সিনাই পর্বতে মোশিকে প্রদান করেন।
‘সাদৃশ্যের দিক থেকে সবচেয়ে নিকটতম এবং বিখ্যাত হলো হাম্মুরাবি কোড... (আনুমানিক ১৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)। সদৃশতার আধিক্যে প্রথম প্রথম এমন বিবৃতিও এসেছে যে, ঐশী আজ্ঞাগুলো হাম্মুরাবির বিধান থেকে ধার বা গ্রহণ করা হয়েছে। উভয়ই যে একই উৎস এবং সুবিস্তৃত একটি বিধানের অংশ, তা এখন বোধগম্য। হিব্রু বিধান যদিও পরবর্তী সময়ে এসেছে, তবুও তা হাম্মুরাবি অপেক্ষা অধিকতর সহজ এবং বুনিয়াদি।' [২]
সিরিয়ার রাস শামরা থেকে প্রাপ্ত লিখিত উৎস থেকে আরও চাঞ্চল্যকর উদাহরণ পাওয়া যায়। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিন থেকে তুলে ধরছি—
‘এমনকি অ্যাডাম এবং ইভের কথাও রাস শামরার টেক্সটগুলোতে আছে। পূর্বের কোনো এক চোখ ধাঁধান বাগানে তারা বাস করতেন। বাসস্থানের বিবরণ অস্পষ্ট হলেও তা বাইবেলের বর্ণনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ... উগারীয় লিপিকার সেখানে লিখেছেন, অ্যাডাম ছিল কেনানীয় সেমাইট জাতির জনক। সম্ভবত তিনি ছিলেন প্রাচীনতম একজন রাজা বা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তিনি একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব।' [৩]
লেখক-প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী এই ফলকগুলো খ্রিষ্টপূর্ব ১৪ বা ১৫ শতকের সময়কার। কাজেই তা মোশিরও অন্তত প্রায় এক শতাব্দী আগের।
টিকাঃ
১. Dictionary of the Bible, p. 104.
২. ibid, p. 568; The Book of the Covenant or Covenant Code is roughly Ex 20:22-23 :19. (ibid, p. 568). অ্যাসিরিয়বিদ্যার জনক ফ্রেডরিখ ডিলিৎশ Babel and Bible এবং Die Grosse Taeuschung গ্রন্থদ্বয়ে দেখিয়েছেন—ইসরাইলি বিশ্বাস, ধর্ম, ও সমাজের উৎসগুলো মূলত ব্যাবিলনীয় উৎস থেকে উদ্ভূত। (S. Bunimovitz, 'How Mute Stones Speak: Interpreting What We Dig Up'. Biblical Archaeology Review, March/April 1995, vol. 21, no. 2, p. 61).
৩. C.EA. Schaeffer, 'Secrets from Syrian Hills', The National Geographic Magazine, vol. Ixiv. no. 1, July 1933, pp. 125-6.