📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 ইহুদিদের উৎস থেকে তাওরাতের ইতিহাস

📄 ইহুদিদের উৎস থেকে তাওরাতের ইতিহাস


ক. লেবীয়দের কাছে মুসার তাওরাত হস্তান্তর
‘মোশি তখন এই বিধান লিপিবদ্ধ করলেন এবং লেবি বংশীয় পুরোহিত, যারা চুক্তি সিন্দুক বহন করত, তাদের ও ইসরায়েলীদের প্রবীণ নেতৃবৃন্দের হাতে দিলেন। মোশি তাদের নির্দেশ দিলেন, প্রতেক সপ্তম বৎসরে মুক্তিবর্ষে কুটিরবাস পর্বের সময় সমগ্র ইসরায়েল জাতি যখন তোমাদের আরাধ্য ঈশ্বর প্রভু পরমেশ্বরের মনোনীত স্থানে তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হবে, তখন তোমরা ইসরায়েলীদের সকলের সামনে এই বিধান পড়ে শোনাবে।’[১]
‘এই বিধিব্যবস্থার আদ্যোপান্ত মোশি একটি পুস্তকে লিপিবদ্ধ করলেন। প্রভু পরমেশ্বরের সঙ্গে চুক্তি সিন্দুক বহনকারী সেই লেবীয়দের তিনি নির্দেশ দিলেন : চুক্তি সিন্দুকের পাশে এই বিধান পুস্তকটি রাখ। এটি সেখানে তোমাদের বিপক্ষে সাক্ষী হয়ে থাকবে। কারণ তোমাদের বিরুদ্ধাচরণ ও অবাধ্যতার কথা আমি জানি। দেখ, তোমাদের মাঝে আজ আমি জীবিত থাকতেই তোমরা প্রভুর বিরুদ্ধাচরণ করছ, আমার মৃত্যুর পরে তোমরা আরও কী না করবে? তোমাদের নিজ নিজ গোষ্ঠীর প্রবীণ নেতা ও পরিচালকদের সকলকে আমার কাছে একত্র কর। আমি স্বর্গ ও মর্ত্যকে সাক্ষী রেখে তাদের এই সমস্ত কথা শোনাব। কেননা, আমি জানি আমার মৃত্যুর পরে তোমরা দুষ্কর্মে প্রবৃত্ত হবে এবং আমার নির্দেশিত পথ ছেড়ে বিপথগামী হবে। ভবিষ্যতে তোমাদের অমঙ্গল ঘটবে; কারণ প্রভু পরমেশ্বরের দৃষ্টিতে যা মন্দ তোমরা তাই করবে এবং তোমাদের আচরণের দ্বারা তাঁর ক্রোধের উদ্রেক করবে।[২]
খ. হারিয়ে যাওয়া এবং পুনরুদ্ধার
প্রথম মন্দিরের যুগে তাওরাতের অস্তিত্ব এবং প্রয়োগ সংক্রান্ত প্রমাণ খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর। এরন ডেমস্কি বলেছেন, ‘কুটিরবাস (টেবারনেকেলস) পর্বের ছুটিতে জনসম্মুখে তাওরাত পাঠ করা প্রতি সপ্তম বর্ষপূর্তির আরেকটি বৈশিষ্ট্য। এর মাধ্যমে বছর সমাপ্ত হয় (দ্বিতীয় বিবরণ ৩১: ১০-১৩)। প্রথম মন্দিরের যুগে প্রতি সপ্তম বর্ষপূর্তি এবং জয়ন্তী পালনের কোনো লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনকি বংশাবলির লেখক... দাবি করেছেন, ইসরায়েলিদের কেনান বিজয় থেকে শুরু করে প্রথম মন্দির ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত ৭০টি সপ্তম বর্ষপূর্তি পালন করা হয়নি।[৩]
দামেশক নথি[৪] থেকে জানা যায়, মোশিকে প্রভু লিখিত তাওরাত প্রদান করেছিলেন। প্রায় পাঁচ শতাব্দী পর্যন্ত এগুলো সিন্দুকে বন্ধ থাকে। জনমানুষ তাই এর সাথে একদমই পরিচিত ছিল না। বাতসেবার সাথে দাউদের অবৈধ সম্পর্ক সত্ত্বেও তাকে হত্যা না করার আলোচনার ব্যাখ্যায় দামেশক নথিতে বলা হয়েছে—
জিহোশূয়ের সময় (আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০) থেকে ইয়াহুদার রাজা জোসিয়ার আমল (খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দী) পর্যন্ত বিধান পুস্তকগুলো চুক্তি সিন্দুকে আবদ্ধ ছিল। জোসিয়ার শাসনকালে তা পুনরুদ্ধার এবং পুনরায় প্রকাশিত হয় (দ্রষ্টব্য ২ রাজাবলি ২২)।[৫]
অর্থাৎ বাইবেল অনুযায়ী দাউদ এবং তৎকালীন ধর্মগুরুরা জানতেনই না তাওরাতে কী লেখা আছে।
তাওরাতের অবস্থান চুক্তি সিন্দুকের ভেতরে না পাশে, তা বের করা যথেষ্ট দুরূহ। ফিলিস্তিনিদের আক্রমণের সময় (খ্রিষ্টপূর্ব ১০৫০-১০২০) খোদ সিন্দুকই সাত মাসের জন্য খোয়া যায়। এটি পুনরুদ্ধারের পর বেথ-শেমেশের সাতান্ন হাজার ইসরায়েলিকে ধ্বংস করে দেন ঈশ্বর। কারণ তারা সিন্দুকের ভেতর দৃষ্টিপাত করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল।[৬]
এর মধ্যে সিন্দুকটি প্রথম মন্দিরে স্থানান্তরিত করা হয় রাজা সলোমনের নির্দেশে। ১ রাজাবলি ৮ : ৯ অনুযায়ী, সিনাই থেকে মোশির আনা দুটি প্রস্তর ফলক সেই সিন্দুকে ছিল। পরিপূর্ণ বিধান ছিল না তাতে। আর যদি সিন্দুক থেকে তাওরাত আলাদাও থেকে থাকে, তবুও ইহুদিদের জীবন থেকে তা শতাব্দীর পর শতাব্দী অনুপস্থিত ছিল।
সত্তরটি সপ্তম বর্ষপূর্তি অর্থাৎ কমপক্ষে পাঁচ শতাব্দী ধরে জনসমক্ষে ঐশী বিধান পড়ে শোনানো হয়নি। ফলে ইসরায়েলিদের ধর্মীয় জীবনে স্থান করে নেয় পৌত্তলিক রীতিনীতি এবং বিধর্মীদের দেব-দেবী। তাওরাতের ব্যাপারে গোটা জাতির বেখেয়ালি একদম পরিষ্কার। রাজা জোসিয়ার শাসনের আঠারতম বর্ষে অলৌকিকভাবে তাওরাত পুনরুদ্ধারের আগপর্যন্ত এমনটাই চলতে থাকে।[৭] এরপর জোসিয়া শিশু বলিদানসহ অসংখ্য পৌত্তলিক রীতি নির্মূল করেন। তা সত্ত্বেও, আরও অন্তত দুই শতাব্দী পর্যন্ত তাওরাত তেমন চর্চা হয়নি। যেভাবে হঠাৎ করে এটি এসেছিল, সেভাবেই আবার তা ইহুদিদের চিন্তাজগৎ থেকে হারিয়ে যায়। মুসার পর সবিস্তারে প্রথমবার জনসমক্ষে বিধান পাঠ এবং ব্যাখ্যা করা হয় এজরা নবির আমলে (আনুমানিক ৪৪৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ); কিন্তু তাওরাত পুনরুদ্ধার (খ্রিষ্টপূর্ব ৬২১) এবং এযরার যুগের মধ্যে ১৭০ বছরের দীর্ঘ ব্যবধান সুস্পষ্ট।[৮]

টিকাঃ
১. দ্বিতীয় বিবরণ ৩১: ৯-১২
২. প্রাগুক্ত, ৩১: ২৪-২৯
৩. A. Demsky, ‘Who Returned First: Ezra or Nehemiah’, Bible Review, vol. xii, no. 2, April 1996, p. 33.
৪. G.A. Anderson, ‘Torah Before Sinai - The Do’s and Don’ts Before the Ten Commandments’, Bible Review, vol. xii, no. 3, June 1996, p. 43.
৫. দ্রষ্টব্য ২ রাজাবলি ২২
৬. দ্রষ্টব্য ১ শমুয়েল ৬ : ১৯
৭. ২ রাজাবলি ২৩: ২-১০
৮. Dictionary of the Bible, p. 954.

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 আধুনিক গবেষকদের দৃষ্টিতে তাওরাতের ইতিহাস

📄 আধুনিক গবেষকদের দৃষ্টিতে তাওরাতের ইতিহাস


বাইবেল পর্যালোচনাশাস্ত্রে ওল্ড টেস্টামেন্টের কালানুক্রমিক রূপরেখা নিয়ে, সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য একটি মত আছে। সেটা দিয়ে শুরু করলে ভালো হবে। নিচের টেবিলটির উৎস The Bible Today. [১] নোট: তারিখগুলো ত্রুটিপূর্ণ। ওল্ড টেস্টামেন্টের পুস্তকগুলোর তারিখ নির্ধারণের বিভিন্ন ধারা সম্পর্কে রাওলির আলোচনা রয়েছে। [২] তবে এই পার্থক্যগুলো আলোচ্য বিষয়ের ওপর খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না।

খ্রিষ্টপূর্ব শতক ঘটনা
XIII (বা তার আগে) মিশর থেকে যাত্রা
XII ফিলিস্তিনে বসবাস
কেনানীয়দের সাথে সংঘর্ষ ইত্যাদি।
রাজশাসন প্রতিষ্ঠা।
XI (দাউদ, ১০০০ খ্রিষ্টপূর্ব) (পরবর্তী সময়ে লিখিত সংরক্ষণে আসা মৌখিক প্রচলন (আইন, উপকথা কবিতা))
X রাজাবলির শুরু।
IX প্রাথমিক নিয়ম-নীতি লিপিবদ্ধ: ইহুদী সংকলন (J), এফ্রাইমীয় সংকলন (E)। পরবর্তী সময়ে আদিপুস্তক-জিহোশুয়ের পুস্তকের অন্তর্ভুক্ত।
VIII আমোস, হোসিয়া, মিকাহ, ইসাইয়া। (সামারিয়ার পতন, ৭২১ খ্রিষ্টপূর্ব)
VII জোসিয়ার সংস্কারকর্ম, খ্রিষ্টপূর্ব ৬২১: দ্বিতীয় বিবরণ, জিরমিয়, সফনিয়, নহুম।
VI হবকুক, বিচারপতি ও জননায়কদের বিবরণ, শামুয়েল, রাজাবলি। (জেরুযালেমের পতন, ৫৮৬ খ্রিস্টপূর্ব), জিহিঙ্কেল, জিশাইয়, হগয়, সখরিয়।
V পূর্ববর্তী বর্ণনানুসারে ‘প্রিস্টলি’ কোড এবং আদিপুস্তক-জিহোশুয় ('P') পর্যন্ত ধারাবাহিক বর্ণনা লিপিবদ্ধ। মালাখি, ইয়োবে।
IV আদিপুস্তক থেকে জিহোশুয়েত সংকলন ('J, 'E', 'P' এবং দ্বিতীয় বিবরণ থেকে)।
III বংশাবলি, উপদেশক।
II গীতসংহিতার কাজ সম্পন্ন।
I বুক অব উইজডম প্রভৃতি
ইসরায়েলের পুরোনো বিধানাবলিকে একত্র করে তথাকথিত পেন্টাটিউক [৩] বা মোশির পাঁচ গ্রন্থ নাম দেওয়া হয়েছে। সি.এইচ. ডডের মতে এগুলো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় আনুমানিক চতুর্থ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। সম্পাদনা করা হয় নবিদের ঘটনাগুলো। ঐতিহাসিক তথ্যগুলোতে তাদের শিক্ষানুযায়ী পরিববর্তন আনা হয়।[৪]
ক. খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম থেকে দ্বিতীয় শতকে বাইবেলের উৎস পরিমার্জনা
উইলিয়াম ডেভারের কথা এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ার ইস্টার্ন আর্কিওলোজি অ্যান্ড অ্যানথ্রোপোলোজির অধ্যাপক। তার মতে, পারসিক শাসনের (খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম-৪র্থ শতাব্দী) শেষভাগ এবং হেলিনিস্টিক আমলে (খ্রিষ্টপূর্ব ৩য়-২য় শতাব্দী) বাইবেলীয় উৎসগুলোকে পরিমার্জিত করা হয়। এছাড়াও কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের টম থমসন, নিলস লেমশে এবং শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলিপ ডেভিস, 'এবং ইউরোপ-আমেরিকার আরও অনেক বিদ্বান বিশ্বাস করেন যে, পারসিক/হেলিনিস্টিক আমলে হিব্রু বাইবেল শুধু পরিমার্জনই নয়; বরং লেখাও হয়েছে।'[৫]
কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফ্রেডরিখ ক্রাইয়ার হিব্রু বাইবেল সম্পর্কে বলেছেন, 'এতে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো এখন যেভাবে আছে, হেলিনিস্টিক আমলের আগে সেভাবে ছিল না।'[৬]
আজকে যাদের আমরা ইসরায়েলি বলে ডাকি, খ্রিষ্টপূর্ব ৪র্থ শতকের আগে তারা নিজেরাও এই নামে তাদের পরিচয় দিত না। সাউল এবং ডেভিড সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো সম্রাট আলেকজান্ডারকে নিয়ে লেখা হেলিনিস্টিক সাহিত্য দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ধর্মগ্রন্থের পাঠ্যগুলো এত পরে লেখা হয়েছে যে, বাধ্য হয়ে এটিকে শুধুই একটি ঐতিহাসিক উৎসগ্রন্থ বলতে হয়।[৭]
নিলস লেমশে তো আদি ইসরাইলের ধারণার সাথে জার্মানির তুলনা দিয়েছেন, যারা সকল সভ্যতাকে নিজেদের জাতি-রাষ্ট্রের ধারণার ভিত্তিতেই দেখত। তার মতে, আদি ইসরাইল সম্পর্কিত সামাজিক ও রাজনৈতিক ধারণাগুলো কল্পনাপ্রসূত [৮] জাতিরাষ্ট্র সম্পর্কে ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপের আহ্লাদ থেকে এর জন্ম।

টিকাঃ
১. C.H. Dodd, The Bible To-day, Cambridge University Press, 1952, p. 33.
২. H.H. Rowley, The OT and Modern Study, Oxford University Press, 1961, p. xxvii.
৩. ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রথম পাঁচটি পুস্তক অর্থাৎ আদিপুস্তক, যাত্রাপুস্তক, লেবীয় পুস্তক, গণনা পুস্তক এবং দ্বিতীয় বিবরণকে একত্রে Books of Moses বা Pentateuch বলা হয়। এটা Torah নামেও প্রচলিত। - অনুবাদক
৪. C. H. Dodd, The Bible To-day, pp. 59-60.
৫. H. Shanks, 'Is This Man a Biblical Archaeologist?', Biblical Archaeology Review, July/August 1996, vol. 22, no. 4, p. 35
৬. H. Shanks, 'New Orleans Gumbo: Plenty of Spice at Annual Meeting', Biblical Archaeology Review, March/April 1997, vol. 23, no. 2, p. 58.
৭. ibid.
৮. ibid, p. 58.
৯. মুসলিমরা এরকম ধারণা লালন করতে পারে না। আসল তাওরাতের দাউদ আলাইহিস সালাম ও সুলাইমান আলাইহিস সালাম এর অস্তিত্ব বিশ্বাস আনতে হবে তাদের।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00