📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 অধ্যায় শেষে

📄 অধ্যায় শেষে


ইহুদি-খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণ কুরআনের প্রকারভিন্নতা খোঁজার জন্য বহু বছর চাতক
পাখির মতো চেয়ে থেকেছে, কিন্তু আল্লাহ তা এতটা নিরাপদভাবে সংরক্ষিত রেখেছেন, ব্যর্থ হয়েছে তাদের সকল উপকরণ ও প্রচেষ্টা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে কুরআন গবেষণা ইন্সটিটিউট খোলা হয়। সেখানে বিভিন্ন দেশ ও কালের প্রায় ৪০ হাজার কুরআনের অনুলিপি রয়েছে। অধিকাংশই অবশ্য মূলের ছবি আকারে। কুরআনের রূপভেদ খুঁজে পাওয়ার জন্য অনুলিপিগুলোর প্রতিটি শব্দ তারা তন্নতন্ন করে একত্র করেছে।
'দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু আগে একটি প্রাথমিক ও সম্ভাব্য প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। কুরআনের পান্ডুলিপিগুলোতে অনুলিখনজনিত ত্রুটি থাকলেও কোনো রূপভিন্নতা নেই বলে সেখানে উঠে আসে। যুদ্ধচলাকালীন মার্কিন বোমা বর্ষণে ইন্সটিটিউটটি ধ্বংস হয়ে যায়। এর সাথে হারিয়ে যায় সকল কর্মরত পরিচালক, কর্মচারী, পাঠাগার এবং সবই... তবে এতটুকু প্রমাণিত, প্রথম শতাব্দী থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কুরআনের অনুলিপিগুলোর মাঝে কোনো রূপভেদ (Variants) নেই।'[১]
ক্ষীণস্বরে হলেও জেফরি তা স্বীকার করে বলেছেন, 'প্রাচীন গ্রন্থাদি এবং অংশবিশেষকে ঘিরে যথেষ্ট যাচাই-বাছাই হয়েছে। সেগুলোর টেক্সট সব একই। প্রকারভিন্নতার প্রায় সবগুলোকেই লেখার ভুল হিসেবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।'[২]
একই রকম সিদ্ধান্তে উপনীত হন বার্গস্ট্রেসারও।[৩] যদিও জেফরি গোঁয়ারের মতো বলেন, টেক্সটের এ ধরনটি 'তৃতীয় হিজরি শতাব্দীর আগ পর্যন্ত কেমন যেন স্থিতিশীল ছিল না।[৪]... (তাই) যাচাইকৃত খণ্ডাংশগুলোর টেক্সটের আর কোনো প্রকারভেদ টিকে না থাকাটা কৌতূহলের উদ্রেক ঘটায়।[৫] তার প্রশ্নের উত্তর একদম পরিষ্কার। গাছের কারণে বন দেখতে না পাওয়ার মতো অবস্থা। সহজে বললে প্রকার মাত্র একটিই। এছাড়া ভিন্ন কোনো প্রকার কখনো ছিলই না।
প্রাচ্যবিদদের নীতি স্রোতের সাথে পালটায়। তাই তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ না করে আমাদের উচিত মুহাদ্দিসগণের নীতি অবলম্বন করা। মুসলিমদের নীতি অনুযায়ী বাইবেল যাচাই করলে অবস্থা কী দাঁড়াবে? উদাহরণের মাধ্যমে তাদের ভিত্তির ভঙ্গুরতা তুলে ধরা যাক। Dictionary of Bible-এ 'Jesus Christ' বা যিশুকে নিয়ে লিখিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, 'যিশুকে সমাধিস্থ করার একমাত্র সাক্ষী দুজন মহিলা...' এরপর 'Resurrection' বা পুনরুত্থান সম্পর্কে লিখেছে, 'উক্ত বিষয়ে বহু জটিলতা তো আছেই, এ সংক্রান্ত বর্ণনার পরিমাণও দুঃখজনকভাবে কম। আছে পারস্পরিক বৈসাদৃশ্য ও অসামঞ্জস্যও। কিন্তু ইতিহাসশাস্ত্রের নিয়ম-কানুন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করলে যেকোনো ইতিহাসবিদের কাছে আলোচ্য সাক্ষ্য যথেষ্ট বলে গণ্য হবে।' [১]
কিন্তু আমাদের পন্থা অবলম্বন করলে ব্যাপারটি কী দাঁড়াত? যিশুকে সমাধিস্থ করার ঘটনার ব্যাপারে আমরা কী বলতাম? প্রথমত এ ঘটনার লেখক কে? তাদের কোনো নাম-পরিচয় জানা যায় না। ফলে বর্ণনাটি তৎক্ষণাৎ বাতিল। দ্বিতীয়ত, লেখকের কাছে দুজন নারীর সাক্ষ্য কে বর্ণনা করেছে? এটিও অজানা। তৃতীয়ত, ইসনাদ-সংক্রান্ত বিস্তারিত কী জানা যায়? কিছুই নেই। পুরো ঘটনাটি মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনাই তাই সবচেয়ে বেশি।
কুরআনের প্রকারভেদ খোঁজা এখনো চলছে। এ যাত্রায় ব্রিলের Encyclopaedia of the Quran গ্রন্থটি অবদান রাখতে চলেছে। এর উপদেষ্টা কমিটিতে ইহুদি ও খ্রিষ্টান পণ্ডিতদের পাশাপাশি আছেন এম. আর্কোন ও নাসর আবু যাইদের মতো ব্যক্তিবর্গ। ইসলামি মহলে তারা ধর্মচ্যুত হিসেবে স্বীকৃত।
বাইবেলকে ঘিরে কিছু অনিয়মতান্ত্রিক ধোঁয়াশাপূর্ণ বিষয়ের কথা এর মধ্যেই উল্লেখ করেছি বেশ কয়েকবার। বলেছি একইরকম অনিশ্চয়তার বীজ কুরআনের মাঝেও খোঁজার ব্যর্থ প্রচেষ্টার কথা। এখন আমরা আরেক ধাপ এগিয়ে সরাসরি তাদের ধর্মীয় গ্রন্থের ইতিহাস সম্পর্কে জানব। শুধু তুলনা করা আমাদের উদ্দেশ্য না। সকল বোদ্ধা এবং সমালোচক তাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশেরই ফলাফল। আর প্রাচ্যবিদরা হলো ইহুদি-খ্রিষ্টীয় প্রেক্ষাপটের ফলাফল। তা সে ইহুদি, খ্রিষ্টান, নাস্তিক—যা-ই হোক না কেন। ইসলাম সম্পর্কিত তাদের সব চিন্তায় এর প্রভাব থাকে। ইসলামিক স্টাডিজকে তারা বিভিন্ন বাইবেলীয় পরিভাষা ব্যবহারের দ্বারা পুরোপুরি ভিন্ন জিনিসে পরিণত করে। যেমন: Introduction au Coran গ্রন্থে উসমানি মুসহাফের ক্ষেত্রে রাশির
'Vulgate' শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কুরআনকে জেফরি বলেছেন 'Masoretic text'. অথচ এসব শব্দ হিব্রু ওল্ড টেস্টামেন্টের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ওয়ান্সব্রোহ তো কুরআনের সকল পরিভাষা এক প্রকার বাদই দিয়েছেন। উলটো নিজেদের শাস্ত্র থেকে Haggadic exegesis, Halakhik exegesis এবং Deutungsbeduerftigkeit -এর মতো পরিভাষা এনে বসিয়ে দিয়েছেন।[১] কুরআনের সাথে canonisation এবং ইবনু মাসউদের মুসহাফের সাথে codice জাতীয় বাইবেলীয় পরিভাষাও তারা ব্যবহার করেছে। মুসলিম জনতা এসব ভাষার কিছুই বোঝে না।
এর মধ্যেই জেফরি, গোল্ডজিহারসহ অনেকের তত্ত্ব নিয়েই আলোচনা হয়েছে। সেগুলো সবগুলোই বাতিল বলে প্রমাণিত। কিন্তু তাদের এসব কর্মের উদ্দেশ্য এখনও জানা হয়নি। আমরা সেগুলো মূল্যায়ন করে দেখব। প্রাথমিক জুডিও-খ্রিষ্টান ইতিহাস এবং ওল্ড ও নিউ টেস্টামেন্টের ইতিহাসটুকু জানা থাকলে উক্ত বোদ্ধা মহলের চিন্তাজগৎ সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা পাওয়া যাবে। বিস্তারিত বোধগম্য হবে কুরআন প্রসঙ্গে পশ্চিমা উদ্দেশ্য।

টিকাঃ
১. M. Hamidullah, 'The Practicability of Islam in This World', Islamic Cultural Forum, Tokyo Japan, April 1977, p. 15; see also A. Jeffrey, Materials, Preface, p. 1.
২. Arthur Jeffery's review of 'The Rise of the North Arabic Script and It's Kur'anic Development by Nabia Abbott', The Moslem World, vol. 30 (1940), p. 191. আরও বিস্তারিতভাবে বুঝতে অধ্যায় ১১.৩ দ্রষ্টব্য।
৩. Theodor Noeldeke, Geschichte des Qorans, Georg Olms Verlag, Hildesheim -New York, 1981, p. 60-96.
৪. প্রথম শতাব্দীর পান্ডুলিপি যেখানে একে অন্যটিকে সমর্থন করে, সেখানে তৃতীয় শতাব্দীর আগ পর্যন্ত তা নির্দিষ্ট না থাকার কী প্রমাণ আছে?
৫. ibid, p. 191.
৬. Dictionary of the Bible, p. 490.
৭. 1. Wansbrough, Quranic Studies: Sources and methods of scriptural interpretation, Oxford Univ. Press, 1977, Table of Contents.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00