📄 আয়াত যাচাইয়ের মূলনীতি
» শুধু একটিমাত্র সূত্রে প্রাপ্ত কিরাত গ্রহণযোগ্য নয়। নিশ্চিত নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছায়, এমন অসংখ্য সূত্র থাকতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে কিরাতের প্রামাণ্যতা।
» উসমানি মুসহাফের টেক্সটের অনুসরণে কিরাত হতে হবে।
» শুদ্ধ আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী উচ্চারণ থাকা লাগবে।
কিরাতের ওপর রচিত যত নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ আছে, সবগুলোতে সাধারণত প্রতিটি প্রসিদ্ধ ইসলামি শাসনকেন্দ্র থেকে একজন কারি এবং তার দু-তিনজন ছাত্রের নাম উল্লেখ রয়েছে। যেমন: ইবনু মুজাহিদের কিতাবুস সাবআ ফিল কিরাআত। এ রকম অপ্রতুল তালিকা আপাত দৃষ্টিতে আমাদের প্রথম মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ঠেকছে না। ধরা যাক, বসরার মাত্র একজন কারি এবং দুজন ছাত্রের নাম উল্লেখ করা আছে। এর দ্বারা কিরাতের একাধিক সূত্রের প্রমাণ কীভাবে মেলে? এক্ষেত্রে আগের অধ্যায়ে আলোচিত ‘পাঠ প্রত্যয়নপত্র’র প্রসঙ্গ এসে যাবে।
ইবনু কুদামার সূত্র দেখিয়ে অধ্যাপক রবসন এবং ইসহাক খান সুনানু ইবনি মাজাহ-এর যে বর্ণনাধারা তৈরি করেছেন, তাতে খুব বেশি নাম পাওয়া যায় না। অথচ রিডিং সার্টিফিকেট থেকে সাড়ে ৪ শতাধিক ছাত্রের নাম আমরা জানতে পারি। তাও মাত্র একটি পাণ্ডুলিপি থেকে। একই ক্রমধারার অন্যান্য অনুলিপি থেকে হয়তো এ তালিকা আরও দীর্ঘায়িত হবে। এ কারণেই বর্ণনাধারার দু-তিনজন ছাত্রের নাম উল্লেখ করাই যথেষ্ট। এতে করে লেখকের সময় এবং কালি সাশ্রয় হয়। আগ্রহী পাঠক চাইলে রিডিং নোট থেকে বিস্তারিত জেনে নিতে পারেন।
একক সূত্র থেকে বর্ণনার ক্ষেত্রে হাদিস এবং কুরআনের মাঝে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। মুখস্থ হাদিস বলার সময় শিক্ষক ভুলে যাওয়া শব্দকে সমার্থক শব্দ দ্বারা প্রতিস্থাপিত করে ফেলতে পারেন। তিনি ছাড়া আর কোনো বর্ণনাকারী না থাকলে উক্ত বিচ্যুতি চোখের আড়ালে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই ব্যাপার কুরআনের ক্ষেত্রে হলে কী হতো? দৈনিক তিন ওয়াক্ত যাহিরি সালাত, জুমআ, তারাবি এবং ঈদের সালাতে সশব্দে গোটা জামাতের সামনে কিরাত পড়েন ইমাম। কারও কোনো আপত্তি না থাকার অর্থ কিরাতের প্রতি সম্মিলিত সমর্থন। সংখ্যায় তারা শত শত, হাজারে হাজার কিংবা শত সহস্রও হতে পারে। কিন্তু সালাত চলাকালীন কেউ আপত্তি করা সত্ত্বেও ইমাম যদি উসমানি মুসহাফ-বহির্ভূত কিরাত চালিয়ে যায়, তাহলে তৎক্ষণাৎ পদচ্যুত হবেন তিনি। কিরাতে ভুল করে পার পাওয়ার কোনো উপায় নেই। এর বিপরীত সকল কিছুর মূল উৎপাটিত হবে। এটি কুরআনের জন্য অনেক শক্তিশালী একটি নিরাপত্তাবলয়।[১]
এখন উপরিউক্ত নীতিগুলোর আলোকে কুরআন বলে দাবিকৃত কোনো খণ্ডকে যাচাই করা যাক। স্পষ্টত প্রথম নীতিই এখানে অনুপস্থিত। কারণ খণ্ডাংশ থেকে কখনো জানা যাবে না, তা কার কার সূত্রে এসেছে। এবার উসমানি মুসহাফের সাথে মিল থাকা হলো দ্বিতীয় শর্ত। মূল গঠনের সাথে সামান্যতম অমিলই তা বাতিল হওয়ার জন্য যথেষ্ট। তা কোনোভাবেই আর কুরআনের অংশ থাকে না। বিগত ১৪ শত বছর ধরে মুসলিমজাতি এ ব্যাপারে একমত আছে।
গঠন প্রসঙ্গে লিপিকারদের বিবেচনা অনুযায়ী স্বরবর্ণগুলোর (বিশেষত শব্দের মাঝে আলিফের) প্রতিনিয়ত অর্থোগ্রাফিক পরিবর্তনের কথা বলতে হয়।[২] সম্প্রতি ফ্রান্সে প্রকাশিত কুরআন খণ্ডের অনুলিপির কথাও উল্লেখ্য।[৩] সেখানে টি-কে قلوا লেখা হয়েছে। একই ব্যাপার ইয়েমেনি খণ্ডাংশগুলোর ব্যাপারেও প্রযোজ্য। এ ধরনের পার্থক্যের কারণে কোনো ধোঁয়াশা তৈরি হয় না। ব্যাপারটি 'গাড়ি' বনাম 'গাড়ী' কিংবা 'দাবী' বনাম 'দাবি' বানানের পার্থক্যের মতো। অর্থোগ্রাফিক পার্থক্য হলো একটি ভাষার আভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য। [৪] কিন্তু অর্থোগ্রাফিক পার্থক্যের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যদি তা উসমানি মুসহাফের বানানের সাথে না মেলে, তাহলে তা বাতিল এবং বিকৃত হিসেবে ধরা হবে। কিন্তু যদি ভুলবশত কোনো ব্যঞ্জনবর্ণ বাদ পড়ে যায়, ভুলের ব্যাপারটা মাথায় রেখে তা গ্রহণ করা হবে। যেমন: 'الفوحش' লিখতে গিয়ে লেখক ভুলে 'الوحش' লিখেছে।[৫]
টিকাঃ
১. মাসজিদুল হারামে ১৬ এবং ২৩ রামাদানের (১৪২০ হিজরি) জুমআর সালাতে প্রায় ১.৬ মিলিয়ন লোক সালাত আদায় করেছিল। প্রথমটিতে আমি নিজেই ছিলাম আর পরেরটি টিভিতে দেখেছি। এত বড় জামাতে উপস্থিত মুসল্লিরা একেকজন কুরআনের একেক স্থান থেকে আয়াত মুখস্থ বলে দিতে পারেন। ইমাম ভুল করে ফেললে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ সশব্দে তাকে শুধরে দেন। একইভাবে তাদের চুপ থাকার দ্বারা কিরাতের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ মিলিয়ন মিলিয়ন মসলিমের সমর্থন আপনা-আপনি যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
২. অধ্যায় ২.২ দ্রষ্টব্য
৩. F. Deroche and S.N. Noseda, Sources de la transmission manuscrite du texte Coranique, Les manuscrits de style higazi, Volume 1. Le manuscrit arabe 328(a) de fa Bibliotheque nationale de France, 1998.
৪. মূল পাঠ্যের আরও কিছু গাঠনিক বানানগত পার্থক্যের উদাহরণ দেওয়া যায়। 'Bridge'-কে যেমন 'Brij' উচ্চারণ করা হয়, তেমনি من بعد কে 'মিম বা'দ' পড়া হয়। কোনোভাবেই তাই এটিকে উসমানি মুসহাফ থেকে বিচ্যুত হওয়া বলে না।
৫. F. Deroche and S.N. Noseda, Sources de la transmission manuscrite du texte Coranique, Les manuscrits de style higazi, Volume: 1, p. 126.
📄 মূলনীতি রক্ষা না করার জন্য শাস্তিপ্রাপ্ত আলিম
» ইবনু শানবুষ (মৃত্যু: ৩২৮ হিজরি) তার সময়কার একজন বিখ্যাত কারি। কিন্তু তিনি উসমানি মুসহাফ অনুযায়ী তিলাওয়াত না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন। কারণ তার তিলাওয়াত বিভিন্ন সূত্র মতে শুদ্ধ এবং ব্যাকরণসম্মত। তাই উসমানি মুসহাফ থেকে ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও তিনি তা বৈধ বলে দাবি করেন। এটা নিয়ে বিচার বসলে তিনি তওবা করেন এবং তাকে ১০ দোররা শাস্তি দেওয়া হয়। [১]
তার স্বীকারোক্তিমূলক পত্র আন-নাদিম বর্ণনা করেছেন, [২]
وكتب : يقول محمد بن أحمد بن أيوب قد كنت أقرأ حروفا تخالف مصحف عثمان بن عفان) المجمع عليه, والذي اتفق أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم على قرائته, ثم بان لي أن ذلك خطأ وأنا من نائب, وعنه مقلع, وإلى الله جل اسمه منه برئ, إذ كان مصحف عثمان هو الحق الذي لا يجوز خلافه ولا يقرأ غير
উক্ত পত্রে ইবনু শানবুষ মুসলিমজাতির একমাত্র মুসহাফ অবমাননার অপরাধ স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
» ইবনু মিকসামকেও (মৃত্যু: ৩৫৪ হিজরি) ফকিহ ও কারিগণের সামনে ক্ষমা চাইতে হয়েছে। তার মতে, মুসহাফ এবং ভাষার নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো কিরাত শুদ্ধ। এখানে বর্ণনাসূত্র এবং সঠিক হরকত যাচাইয়ের প্রয়োজন নেই।[৩]
তাদের একজন দ্বিতীয় মূলনীতি এবং অপরজন প্রথম মূলনীতি লঙ্ঘন করেছেন। রেভারেন্ড মিংগানার মনে তাদের জন্য বড়ই সহমর্মিতা। [৪] অবশ্য উইলিয়াম টিনডেলের (মৃত্যু: ১৫৩৬ খ্রিষ্টাব্দ) মতো অবস্থা তাদের হয়নি। বাইবেলের ইংরেজি অনুবাদ করার অপরাধে তাকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল।[৫]
টিকাঃ
১. আল জাজারি, তাবাকাতুল কুররা, ii: ৫৩-৫৪
২. আন-নাদিম, আল-ফিহরিস্ত, পৃষ্ঠা: ৩৫
৩. প্রাগুক্ত, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১২৪
৪. Mingana, Transmission, pp. 231-2.
৫. ‘William Tyndale’, Encyclopaedia Britannica (Micropaedia), 15th edition. 1974. x 218